বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন

কারাগারেই কেটেছে জীবনের এক চতুর্থাশ

বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন।  বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই অগাস্ট কিছু বিপদগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর জীবনকাল  ৫৪ বছর ৫ মাস। এই জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন মেয়াদে ৫৭ দফায় মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন বা ১২.৮২ বছর কারাগারে ছিলেন। এটি কাগজ কলমের হিসাব। বঙ্গবন্ধু গবেষকদের কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত কারাবাস আরো বেশি। কারাগার হতে ছাড়া পেতে অনেক সময় দুই-একদিন বেশি লেগে যায়। সে হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রায় ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন। এছাড়া তিনি ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের সমাবেশ করতে গিয়ে কমপক্ষে ৩৭টি সমাবেশে যোগ দিতে গেলে সরকার সমাবেশ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বন্ধ করার জন্য তাঁকে ধরে থানায় নিয়ে যেতেন এবং গভীর রাতে ছেড়ে দিতেন।  কমপক্ষে ৩৭টি সমাবেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। এই ৩৭টি সমাবেশে বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন গড়ে ৭ ঘণ্টা করে মোট ২৫৯ ঘণ্টা  বা ১১ দিন কারাগারে ছিলেন। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকে তার মোট জীবনের এক চতুর্থাংশ কারাগারে কাটাতে হয়েছে। অর্থৎ বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রতি চার দিনের এক দিন কারাগরে ছিলেন। ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু ধরলে বঙ্গবন্ধু পরিণত জীবন পেয়েছেন ৩৬ বছর ৫ মাস। এ হিসেবে তিনি পরিণত বয়সের প্রতি ৩ দিনের ১ দিনই কারাগারে কাটিয়েছেন।

আন্দোলনে ব্যয়িত সময়

বঙ্গবন্ধু ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ ১৮ বছর বয়স হতে প্রত্যক্ষভাবে সমাজসেবা এবং পরোক্ষভাবে রাজনীতি করে আসছেন। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে সর্বোতভাবে সক্রিয় ছিলেন। স্ট্যাটিকটিস অ্যান্ড ডাটা ইন্টারন্যাশনালের এক হিসেবে মতে, বঙ্গবন্ধু গড়ে প্রতিদিন ৮.৬৭ ঘণ্টা সভাসমাবেশ সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করেছেন। সে হিসেবে তিনি ৩৬ বছরে ৪৭৪৭ দিন  বা ১৩ বছর সভাসমাবেশে করেছেন। ১৩ বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। ঘুম অপর প্রাত্যহিক কাজ-সহ সব মিলিয়ে নিজের জন্য সময় ছিল মাত্র ২৮ বছর।

জীবন নয়, সংগ্রামের প্রতিভু

৫৪ বছর ৫ মাসের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ বছর অসুস্থ,  ১৩ বছর কারাগারে এবং ১৩ বছর জনসমাবেশে কাটিয়েও বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রকে স্বাধীন করেছেন, একটি জাতির জন্ম দিয়েছেন। তিনি জীবনটা যাপন করলেন কখন? তিনি মূলত সংগ্রামকেই যাপন করেছেন। তাঁর জীবন আসলে জীবন নয়, সংগ্রামের প্রতিভু।

ছয় দফার জন্য কারাগার

ছয় দফা দাবির পক্ষে জনমত গড়ে  তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশ করার জন্য যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই তিনি গ্রেফতার হয়েছেন।  এরূপ ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৯০ দিন কারাগারে অন্তরিণ থাকার পর হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

ছয় দফার জন্য সাময়িক আটক

পূর্ববর্ণিত ৩২ সভা ছাড়াও ছয় দফ দাবিকে জনসমক্ষে তোলা ধরার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আর ৩৭ টি সমাবেশে তাকে গ্রেফতার করে গড়ে ৭ ঘণ্টা করে আটক  রেখে সমাবেশের সময় শেষ হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

গণঅভ্যুত্থানে মুক্তি

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসি ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দাবি নস্যা করার হীন উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই মে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাভোগের পর উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। এসময় তাকে ১০২১ দিন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। কারামুক্তির পর তাকে ছাত্র-গণ সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

জীবদ্দশার সর্বশেষ কারাগার

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে করাচি নিয়ে যায়। এ দফায় তাঁকে পাকিস্তানের মিয়ানালী কারাগারে একটি সেলের মধ্যে ২৮৮ দিন আটকে রাখা হয়।

কারাগারে বন্ধু : কারাগারে তেইশ বার

error: Content is protected !!