বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina) 

চতুর্দশ শতকে রাজপুত্র শাসিত বসনিয়া দক্ষিণের ডিউক শাসিত হার্জেগোভিনার সঙ্গে মিলে একটি ক্ষণস্থায়ী মধ্যযুগীয় রাজ্য গঠন করেছিল। বর্তমান বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রাষ্ট্রটিও অনুরূপ উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে বিভক্ত। দেশটির উত্তরে ও পশ্চিমে ক্রোয়েশিয়া এবং দক্ষিণে ও পূর্বে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো প্রজাতন্ত্র। আড্রিয়াটিক সাগরে ক্রোয়েশিয়ার মাঝ দিয়ে বসনিয়ার প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখা আছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশের পূর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রের অংশ ছিল। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। এর পরপরই বসনীয় মুসলমান, ক্রোয়েশীয় ও সার্বীয় জাতির লোকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে  যুদ্ধ শেষে সার্বীয়রা  দেশের ৪৯% এলাকা দখলে নিতে সক্ষম হয় এবং এর নাম দেয় সার্ব প্রজাতন্ত্র। বসনীয় ও ক্রোয়েশীয়রা দেশের বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। যার নাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফেডারেশন। এই ফেডারেশন ও সার্ব প্রজাতন্ত্র একত্রে বর্তমানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রাষ্ট্র নামে পরিচিত।

প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়াকে ভেঙে ছয়টি রাষ্ট্র করা হয়েছে। রাষ্টগুলো হচ্ছে : বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, মেসেডোনিয়া, মন্টেনেগ্রো, স্লোভেনিয়া ও সার্বিয়া। এবার দেখা যাক, যুগোশ্লাভিয়া নামের ব্যুৎপত্তি। যুগোশ্লাভিযা (Jugoslavija) শব্দ হতে যুগোশ্লাভিয়া (Yugoslavia) শব্দের উৎপত্তি। যুগোশ্লাভিয়া যুগ (jug) ও শ্লাভিযা (slavija) শব্দ সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌগিক শব্দ। মেসিডোনিয়ান (Macedonian), সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান (Serbo-Croatian) ও শ্লোভেন (Slovene) ভাষায় জুগ শব্দের অর্থ দক্ষিণ এবং শ্লাভিয়া শব্দের অর্থ শ্লাভদের দেশ। সুতরাং যুগোশ্লাভিযা শব্দের অর্থ দক্ষিণ শ্লাভিয়া বা দক্ষিণ শ্লাভদের দেশ। এ নামকরণের মাধ্যমে ছয়টি দক্ষিণ শ্লাভিক জাতি, যথা- ক্রোয়েটস, মেসিডোনিয়ানস, মন্টেনগ্রিনস, মুসলিমস, সার্বস ও শ্লোভেনসকে Croats, Macedonians, Montenegrins, Muslims, Serbs and Slovenes) একত্রিত করা হয়।

অনেকে বলেন, বসনিয়া নদী হতে সম্ভবত বসনিয়া নামক দেশটির নাম চয়িত। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান ইতিহাসবেত্তা মার্কাস ভেলিয়াস প্যাটারকুলাস Marcus Velleius Paterculus) প্রথম বসনিয়া নামটি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে বাথিনাস প্লুমেন (Bathinus flumen) হতে বসনিয়া নামের উদ্ভব। কথিত হয়, ৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ডি রেগনো স্কালভোলাম এর সূত্রে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান আর্চ বিশপ বসনিয়া নামকরণ করেন। ভাষাবিজ্ঞানী অ্যান্তন মেয়া (Anton Mayer) বলেন, ইলাইরিয়ান (Illyrian) বাস-অ্যান-অ্যাস (Bass-an-as) হতে বসনিয়া নামের উদ্ভব। নামটি প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়ান বস (bos) বা বজ (bogh) হতে এসেছে। যার অর্থ ধাবমান পানি বা প্রবাহিত জল।   মোস্তফা ইমামোভিকের মতে, স্ল্যাভিক (Slavic) ও থারচিয়ান (Thracian) উৎসের দুর্লভ ল্যাটিন শব্দ বসিনা (bosina) শব্দের অর্থ সীমানা।

জার্মান হার্জোগ (Herzog) বা প্রাচীন সার্বিয়ান হার্চেগ (herceg) শব্দের অর্থ ডিউক। এর সঙ্গে সমন্ধসূচক পদ (-ov)  এবং সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান স্ত্রীবাচক প্রত্যয় (-ina) যুক্ত হয়ে হার্জেগোভিনা শব্দটি গঠিত হয়েছে। ইনা শব্দের অর্থ উপগোত্র বা দেশ বা খাজনা আদায়ের এলাকা। সুতরাং হার্জেগোভিনা শব্দের অর্থ হচ্ছে ডিউকের দেশ বা ডিউকের উপগোত্র বা ডিউকের অধীনস্ত এলাকা, যেখান হতে ডিউক খাজনা আদায়ের অধিকারী। মধ্যযুগের প্রারম্ভে আলোচ্য জনপদে দক্ষিণ স্লাভের ঝাচালেউম্বা (Zachlumoi) উপজাতির লোকেরা নিবাস গড়ে তোলার পর অঞ্চলটি ঝাহামুলিয়া (Zahumlje) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। শব্দটির অর্থ ঝঙ্কার (Hum)।

১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ হতে এটি বসনিয়ার শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং জনপদটি মধ্যযুগীয় বসনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ১৪৪৮ খ্রিষ্টাব্দে  স্টিফেন ভুকসিক কোসাকা Stephen Vukcic Kosaca) নামের একজন বিখ্যাত বসনিয়ান শাসক ভয়ভোড অব বসনিয়া (Voivode of Bosnia) পদবির পরিবর্তে  হার্চেগ বা হার্জেগ পদবি গ্রহণ করে। হার্জগ জার্মান শব্দ যার অর্থ ডিউক। ফলে তার শাসনাধীন এলাকার নাম হয়ে পড়ে হার্জেগোভিনা। এ ব্যাখ্যামতে ওভিনা (-ovina) শব্দের অর্থ ভূমি বা দেশ।  ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হার্জেগোভিনা ওটোমান সাম্রাজ্যের অংশ হিসাবে শাসিত হতে থাকে। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে  আলী পাশা রিজভানবেগোভিক হার্জেগিভিনাকে বসনিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। ফলে এটির নাম হয় বসনিয়া- হার্জেগোভিনা।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার আয়তন ৫১,১৯৭ বর্গকিলোমিটার বা ১৯,৭৪১ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.৮%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখ্যা ৩৮,৭১,৬৪৩ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৭৫.৬২। আয়তন বিবেচনায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা পৃথিবীর ১২৭-তম বৃহত্তম দেশ। সারাজেভো বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর। রাজ্য পর্যায়ে দেশটির দাপ্তরিক ভাষা বসনিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান, সার্বেয়িান ও সর্বপ্রকার সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান। জাতীয় পর্যায়ে দাপ্তরিক ভাষা বসনিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান ও সার্বিয়ান। সরকারিভাবে এ দেশের নাগরিকগণ বসনিয়ান ও হার্জেগোভিনিয়ান নামে পরিচিত। সরকার ব্যবস্থা ফেডারেল সংসদীয় প্রজাতন্ত্র। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ দেশটি যুগোশ্লাভিয়া হতে স্বাধীনতা লাভ করে।১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা প্রথম গৃহীত হয় এবং ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ আগস্ট কিছুটা সংস্কার করে পুনরায় গৃহীত হয়।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জিডিপি (পিপিপি) ৩৮.০৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৯,৮০০ এবং জিডিপি (নমিনাল) ১৫.৫৬৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার ও মাথাপিছু আয় ৪,০২৯ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম কনভার্টিবল মার্ক।

যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সার্বরা ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে সেব্রেনিচা শহরটি দখল করে নেয়। জাতিসংঘের ৮১৯ নম্বর প্রস্তাবে সেব্রেনিচা নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সার্বরা জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের  কোনো বাধা ছাড়াই শহরটি দখল করে সেখানে আশ্রিত হাজার হাজার  বেসামরিক মুসলমানকে হত্যা করে এবং হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করে। রাতকো মিলাদিচের নেতৃত্বাধীন বর্বর সার্ব বাহিনী এই গণহত্যা চালায়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যা। ডাচ শান্তিরক্ষীদের নিস্ক্রিয়তায় ও গ্রিক সেচ্ছাসেবী বাহিনীর সহায়তায় সার্বরা এ গণহত্যা চালায়। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে  বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর খ্রিস্ট্রান জঙ্গিদের হাতে এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হন ৮,৩৭২ জন মুসলিম।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মানচিত্রের আকৃতি অনেকটা হৃদপিন্ডের মতো। এজন্য এটাকে  হৃদয়াকৃতির ভূমি (Heart Shaped Land)) বলা হয়। কপি পানে বসনিয়া ও হার্জেগোভনির অধিবাসীরা বিশ্বে দশম। এ দেশের মুদ্রাকে পৃথিবীর কোথাও বিনিময় করা যায় না। কারণ আইনগতভাবে এ দেশের মুদ্রা বাইরে আনা নিষিদ্ধ। এ দেশের দাপ্তরিক ভাষা তিনটি হলেও মূলত সবগুলো প্রায় অভিন্ন।

আযারবাইজান (Azerbaijan) : ইতিহাস ও নামকরণ

বেলারুশ (Belarush) : ইতিহাস ও নামকরণ

বেলজিয়াম (Belgium) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

Language
error: Content is protected !!