বাংলাদেশের দ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা/১

মহেশখালী
মহেশখালী কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। এটি বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ যেখানে পাহাড় আছে। তাই এটাকে পাহাড়িয়া দ্বীপ বলা হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি মহেশখালী দ্বীপ নামে পরিচিত। মহেশখালী দ্বীপটাই মহেশখালী উপজেলা। এর আয়তন ৩৮৮.৫০ বর্গ কিলোমিটার। এ উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও কুতুবদিয়া উপজেলা; উত্তর-পূর্বে পেকুয়া উপজেলা; পূর্বে মহেশখালী চ্যানেল, চকরিয়া উপজেলা ও কক্সবাজার সদর উপজেলা; দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার সদর উপজেলা এবং দক্ষিণে ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর।১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মহেশখালী থানা গঠিত হয়। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই ডিসেম্বর এ থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। মহেশখালী উপজেলা আরো তিনটি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হলো : সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা।

কুতুবদিয়া
কুতুবদিয়া বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত একটি দ্বীপ উপজেলা। উপজেলাটি কুতুবদিয়া চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন। এর আয়তন ২১৫.৮০ বর্গ কিলোমিটার। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে মহেশখালী থানা থেকে পৃথক করে কুতুবদিয়া থানা গঠিত হয় এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। হযরত কুতুবুদ্দীন নামের এক কামেল আলী আকবর ও আলী ফকির-সহ কিছু সঙ্গী নিয়ে মগ ও পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে এ দ্বীপে আস্তানা স্থাপন করেন। তাই দ্বীপটির নাম হয় কুতুবদিয়া। দিয়া মানে দ্বীপ। কুতুবদিয়া দ্বীপ বাতি ঘরের জন্য বিখ্যাত।

সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ
সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মায়ানমার উপকূল হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। এই দ্বীপে প্রায় সাড়ে চার হাজারা মতো লোক বসবাস করে। প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নাম রেখেছিল জিঞ্জিরা। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দ্বীপে বসতি স্থাপনের জন্য আসে। প্রথম অধিবাসী হিসাবে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। আগে এই দ্বীপে কেয়া এবং ঝাউগাছ ছিল। বাঙালি জেলেরা জলকষ্ট দূর করার জন্য প্রচুর নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করে। ফলে পুরো দ্বীপটি “নারকেল গাছ প্রধান” দ্বীপে পরিণত হয়। এ সূত্রে স্থানীয় অধিবাসীরা দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে অভিহিত করা শুরু করে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ব্রিটিশ ভূ-জরিপ দল দ্বীপটিকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসাবে গ্রহণ করে। জরিপে খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপটির নাম সেন্ট মার্টিন রাখা হয়।

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের আয়তন
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। এগুলোকে ধরলে এর আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গ কিলোমিটার। এ দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের গড় উচ্চতা ৩.৬ মিটার। এর পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর।

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের বিভাজন
ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া। দক্ষিণ অংশকে বলা হয় দক্ষিণ পাড়া এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সঙ্কীর্ণ লেজের মতো এলাকা। সঙ্কীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত।

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের উদ্ভিদ-প্রাণী
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর এবং ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়।

সোনাদিয়া
সোনাদিয়া দ্বীপ কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এটি জীববৈচিত্র্যের দ্বীপ নামেও পরিচিতি। এটি মূলত প্যারাদ্বীপ নামে পরিচিতি। এখানে প্রচুর সামুদ্রিক মৎস্য ধরা পড়ে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সাহিত্যে এ দ্বীপ প্রবল প্রতাপে বিদ্যমান। এ দ্বীপ কক্সবাজার শহর থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমের দূরে সাগর গর্ভে অবস্থিত। দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার। তিন দিকে রয়েছে সমুদ্র সৈকত, সাগর লতায় ঢাকা বালিয়াড়ি, কেয়া-নিশিন্দার ঝোপ, ছোট-বড়ো খাল বিশিষ্ট প্যারাবন। এটি মহেশখালী ক্যানেল দ্বারা কক্সবাজারের মূল ভূখন্ড থেকে বিছিন্ন। এটি দেশের প্রধান শুটকি মাছ উৎপাদন কেন্দ্র। ম্যানগ্রোভ বনঞ্চল অধ্যুষিত এ দ্বীপটি গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

শাহপরীর দ্বীপ
শাপরী, শাহপরী, শাহপরীর, শাহপুরা বা শিনমাব্যু দ্বীপ (বর্মি:) নাফ নদীর মোহনায় বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। প্রথম ইংরেজ-বার্মা যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা এই দ্বীপ দাবি করে। শাহ পরী টেকনাফের সর্বদক্ষিণ ভূ-ভাগের খুবই নিকটবর্তী একটি দ্বীপ এবং টেকনাফ উপজেলার উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বীপের বাম পাশে নাফ নদী। নদীর ওই পাড়ে বার্মা বা মায়ানমার সীমান্ত। কথিত হয়, পলাতক শাহজাদা শাহ সুজার ‘শাহ’ এবং তাঁর স্ত্রী পরীবানুর ‘পরী’ মিলিয়ে দ্বীপটির নাম হয় “শাহপরীর দ্বীপ”। কারো কারো মতে ‘শাহ ফরিদ’ আউলিয়ার নামে দ্বীপের নামকরণ হয়েছে। অষ্টাদশ শতকের কবি সা’বারিদ খাঁ’র ‘হানিফা ও কয়রাপরী’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম চরিত্র ‘শাহপরী’। রোখাম রাজ্যের রানি কয়রাপরীর মেয়ে শাহপরীর নামেই দ্বীপের নামকরণ হয়েছে বলেও অনেকে বলেন। স্বাধীনতার আগে শাহপরীর দ্বীপের দৈর্ঘ্য ঠিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১০ কিলোমিটার। বর্তমানে তা ছোট হয়ে দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৩ কিলোমিটার হয়ে গেছে।

error: Content is protected !!