বাংলাপ্রেমী উর্দুভাষী আবু সয়ীদ আইয়ুব

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলাপ্রেমী উর্দুভাষী: আবু সয়ীদ আইয়ুব

বাংলা সাহিত্য সমালোচক, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যপ্রেমী, রবীন্দ্রকাব্য ও সংগীতের রসজ্ঞবিশ্লেষক খ্যাতিমান বাংলাপ্রেমী আবু সয়ীদ আইয়ুব ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই এপ্রিল কলকাতার দ্বারবাঙ্গায় অতি রক্ষণশীল এক  উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতা আবুল মকারেদ আব্বাস বড়লাটের বিশ্বস্ত কেরানি  ছিলেন। সে সময় এ পদটি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। আবু সয়ীদের পূর্বসূরিগণ ছিলেন অবাঙালি।  তিন পুরুষ যাবৎ কলকাতায় বসবাস করলেও বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাহিত্যের সঙ্গে বিন্দুমাত্র পরিচয় ছিল না।  কিশোর আইয়ুব  কাহকুশান নামের এক উর্দু পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পড়ে এতই মুগ্ধ হন যে, ষোলো বছর বয়সে বাংলা শেখা শুরু করেন। অচিরে তিনি বাংলা ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেন। তাঁর  প্রথম বাংলা প্রবন্ধ বুদ্ধিবিভ্রাট ও অপরোক্ষানুভূতি। 

আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ  (১৯৬৮) তাঁর লেখা কালজয়ী বাংলা গ্রন্থ। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শন বিভাগে নিজাম অধ্যাপক হিসেবে স্বল্পকাল অধ্যাপনা করেন।  অধ্যাপনাকালে ১৯৫৪  খ্রিষ্টাব্দে আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর ছাত্রী গৌরী দত্তের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উভয়ের বয়সের বিস্তর তফাত ছিল। গৌরী দত্ত ছিলেন দর্শনের প্রখ্যাত অধ্যাপক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা। এই অসমবয়সী আন্তঃধর্মীয় বিবাহ সে সময় সারা বঙ্গে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।  গৌরী দত্তকে তাঁর পিতা  ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। তবে আবু সয়ীদ আইয়ুব ও গৌরী আইয়ুব দত্ত ছিলেন কলকাতার বোদ্ধা সমাজে অতি উচ্চ সম্মানে বারিত  এক সম্ভ্রান্ত দম্পতি।

গৌরী আইয়ুব দত্ত ছিলেন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ  ও লেখক। তাঁদের একমাত্র সন্তান ড. পুষাণ আইয়ুব মুম্বইয়ে টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক।  

রক্ষণশীল উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও  আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের শক্তিতে  বাংলাভাষা শিখে বাংলাভাষায় অসাধারণ গ্রন্থ রচনা করে সর্বমহলে বিস্ময় প্রতিভার অধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর চিন্তাচেতনা, প্রজ্ঞা ও বৃদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের অসাধারণ প্রকাশ  ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ ( এপ্রিল ১৯৬৮)। ‘পান্থজনের সখা ‘ (অক্টোবর ১৯৭৩), ‘পথের শেষ কোথায়’ (মে ১৯৭৭ ),  ‘ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক’ (১৯৯১), গালিবের গজল থেকে প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

উপমহাদেশের সরকারি কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ শামসুল ওলেমা খানবাহাদুর কামাল উদ্দিন ছিলেন তাঁর পিতৃব্য। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের ভাগ্নে এবং ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ফুপাতো ভাই। বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দেশিকোত্তম উপাধি প্রদান করে। তিনি ছাড়া আর কোনো অবাঙালি বাংলায় লেখালিখি করে এমন স্বীকৃতি-সম্মান অর্জন করতে পারেননি।

১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ডিসেম্বর আবু সয়ীদ আইয়ুব মারা যান।

error: Content is protected !!