বাংলার পদ-পদবি: পদ পদবি; তপাদার তফাদার চৌধুরী তরফদার ঠাকুর ঘড়েল পেশকার

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/বাংলার-পদ-পদবি-পদ-পদবি-তপা/
ড. মোহাম্মদ আমীন

চৌধুরি পদবির উদ্ভব

হিন্দি চৌধুরি অর্থ (বিশেষ্যে.) নৌ হস্তী অশ্ব ও পদাতিরূপ চার শক্তির অধিকারী সামন্ত রাজা; গ্রামের মোড়ল, নগরের প্রধান ব্যবসায়ী, পদবিশেষ।
উপমহাদেশে দীর্ঘকাল থেকে রাজা-সম্রাটদের নিয়োজিত নৌ হস্তী অশ্ব ও পদাতিরূপ চার শক্তির অধিকারী সামন্ত রাজাকে চৌধুরি পদবিতে ভূষিত করা হতো। মুসলিম আমলেও পদবিটি কিছুট একই ধরন নিয়ে কিছুকাল অক্ষুণ্ন থেকে যায়। তবে তার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করা হতে থাকে। সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চৌধুরি পদের অধিক্ষেত্র কমে যায়। ফলে তাদের ক্ষমতা এবং জৌলুশ পূর্বের তুলনায় কমে যেতে থাকে।
ইংরেজ আমলে প্রাচীন চৌধুরি পদবির দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিলোপ করে ইংরেজদের বশংবদ প্রভাবশালী কিছু ভূস্বামীদের অঞ্চলভেদে চৌধুরি পদবিতে ভূষিত করা হয়। এরপর গ্রামের মোড়ল এবং নগরের অনেক ব্যবসায়ীকেও এই পদবি প্রদান করা হয়। ফলে চৌধুরি পদবি তার সৃষ্টিকালীন বিশাল মর্যাদা হারিয়ে অনেকটা সাধারণ মর্যাদার হয়ে যায়। এই চৌধুরিদের কাজ ছিল ইংরেজ প্রশাসকদের সন্তুষ্ট রাখা। বিনিময়ে কিছু সরকারি সুবিধা তার ভোগ করতে পারত।
চৌধুরির সঙ্গে স্থানবিশেষে মজুমদার, রায় প্রভৃতি পদবির উপস্থিতিও ছিল।এমন পদবিধারীদের জমিদার ও প্রশাসনে কিছুটা খাতির ছিল। চৌধুরি পদবি পেয়ে তারা খুশি হতো এবং সরকারের প্রতি আরও অনুগত হয়ে নির্দ্বিধচিত্তে আদেশ পালন করে যেত। উপাধিটি দেওয়া হতো ব্যক্তিকে। কিন্তু তা ব্যক্তি হতে উত্তরপুরুষ হয়ে প্রজন্মান্তরিত হতে থাকে। ফলে চৌধুরির সংখ্যা হুহু করে বেড়ে যায়।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে চৌধুরি পদবিটা খুব জনপ্রিয় ছিল। নোয়াখালীতে মজুমদার এবং কুমিল্লায় রায় (বিশেষত হিন্দুদের) পদবির প্রচুর লোক ছিল। এখনো চট্টগ্রামে চৌধুরি, নোয়াখালীতে মজুমদার এবং কুমিল্লায় প্রচুর রায় পদবির লোক পাওয়া যায়। এজন্য বলা হয়:
নোয়াখালীর মজুমদার কুমিল্লার রায়
চট্টগ্রামের চৌধুরি জলে ভেসে যায়
তরফদার
আরবি উৎসের ‘তরফ’ ও ফারসি উৎসের ‘দার’ মিলে তরফদার শব্দ গঠিত। ফারসি ভাষার ‘তরফদার’ অর্থ— তরফের কর্তা, তরফের মালিক, তরফের ভূস্বামী। মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারের আয়ত্তাধীন পরগনার বিশেষ ভূমি বা এলাকাকে ‘তরফ’ বলা হতো। তরফের মালিক বা ভূস্বামীকে বলা হতো তরফদার। এ মালিকানা ছিল বংশানুক্রমিক। এরা বেশ প্রভাবশালী ছিল। হিন্দু-মুসলিম উভয়ে তরফের ভূস্বামী ছিলেন। সে সূত্রে ‘তরফদার’ কথাটি বাংলাদেশ ও ভারতে মুসলিম আর হিন্দুদের বংশানুক্রমে ব্যবহৃত একটি পদবি।
 
তফাদার
 তফাদার পদবিটির উৎস বানান— তোপদার/তোপাদার। যা থেকে এসেছে তপাদার। এই তপাদার থেকে এসেছে তফাদার। এটি তুর্কি উৎসের শব্দ।
তুর্কি উৎসের বাংলা শব্দ ‘তোপ’ অর্থ— গোলা ছোড়া যায় এমন আগ্নেয়াস্ত্র, কামান। তোপ থেকে তোপা। তোপা অর্থ— কামান ছোড়া।

কামান দাগা বা গোলা নিক্ষেপ করার দায়িত্বে নিয়োজিত কিছু সংখ্যক সৈনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে বলা হতো— তোপদার বা তোপাদার।

পরবর্তীকালে কিছু কিছু এলাকায় তোপদার শব্দটির বানান পরিবর্তিত হয়ে তফাদার হয়ে যায়। তফা হচ্ছে তুর্কি উৎসের বাংলা তপ/তপা শব্দের অপভ্রংশ বা বিকৃত রূপ।

এর সমপ্রকৃতির পদবি গোলদার, গোলন্দাজ প্রভৃতি। প্রসঙ্গত , ফারসি গোলন্দাজ থেকে গোলদার।

ঠাকুর
‘ঠাকুর’ বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের পদবি হিসেবে বহুল পরিচিত একটি শব্দ। শব্দটি ছিল তুর্কি ভাষায় ‘তিগির/ তাগরি’।তুর্কি থেকে এসে শব্দটি সংস্কৃত ও প্রাকৃতে হয়ে যায় ‘ঠক্কুর’। বাংলায় ঠক্কুর থেকে হলো ‘ঠাকুর’। কেউ কেউ মনে করেন শব্দটির মূল উৎস ফারসি। যাই হোক, তুর্কি/ফারসি উৎসের শব্দ (তু. তাগরি/তিগির =দেবতা); স. ঠক্কুর>ঠাকুর।
ঠাকুর কোনো বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পদবি নয়। চৌধুরি, মজুমদার, মুস্তাফি প্রভৃতি পদবির মতো ঠাকুর পদবিও মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ধারণ করতেন। যেমন: কোরেশী মাগন ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, হরিদাস ঠাকুর।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ঠক্কুর থেকে উদ্ভূত ঠাকুর অর্থ (বিশেষ্যে) ভগবান, দেবতা, প্রতিমা, প্রভু, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, গুরু, ব্রাহ্মণ, পুরোহিত, পাচক ব্রাহ্মণ, পদবিশেষ। স্ত্রীলিঙ্গে ঠাকুরানি।
পদবির চেয়ে অন্যান্য অর্থ বা সম্বোধনে ঠাকুর শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে শব্দটি হিন্দু সম্প্রদায়ে বহুল প্রচলিত। যেমন, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, ঠাকুরঘর, ঠাকুরজামাই, ঠাকুরঝি, ঠাকুরদালান, ঠাকুরপূজা, ঠাকুরপো, ঠাকুরমশাই, ঠাকুরাল, বাবুর্চি ঠাকুর, হিন্দু ঠাকুর, মুসলিম ঠাকুর প্রভৃতি।ঠাকুরজামাই তো খুবই পরিচিত সম্বোধন:
“বলি ও ননদি আর দুমুঠো চাল ফেলে দেয় হাঁড়িতে
ঠাকুরজামাই এল বাড়িতে
ও ননদি ঠাকুরজামাই এলো বাড়িতে—”।

ঘড়েল: ঘড়ি ও ঘটিকা

ঘড়েল শব্দের আভিধানিক অর্থ: ফন্দিবাজ, কুচক্রী, ধুরন্ধর প্রভৃতি। ঘড়া মানে বড়ো আকারের জলপাত্র বা বড়ো কলস। ঘড়ি বা ঘটি বা ঘটিকা মানে ছোটো আকারের জলপাত্র বা কলসি। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য জলঘড়ি ব্যবহার করত। এ জলঘড়ির সময়রক্ষক পদবি থেকে ঘড়েল শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু কীভাবে?
বড়ো একটা ঘড়া থেকে ঘটিকা বা ঘটিতে জল ফেলে সময় জানার জন্য বিশেষ কৌশলে জলঘড়ি তৈরি করা হতো। ঘড়ার নিচে থাকত ছিদ্র। সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়ার নিচে রাখা ঘটিকায় বিন্দু বিন্দু জল পড়ত। ঘটি পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে রেখে দেওয়া হতো।
এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো, সময় বলা হতো তত ঘটিকা। বর্তমান ঘটিকা শব্দটি এ ঘটি হতে এসেছে। ঘড়ি শব্দটি এসেছে ঘড়া হতে। কোনো সাধারণ লোকের বাড়িতে জলঘড়ি থাকত না। রাজা, জমিদার প্রমুখ বিত্তশীলদের বাড়িতে জলঘড়ি রাখা হতো। কেউ সময় জানতে চাইলে রাজবাড়িতে এসে তা জেনে নিত। রাজবাড়িতে জলঘড়ির পূর্ণ ঘটিকার হিসাব রাখার দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত থাকত তার পদবি ছিল ‘ঘটিকাপাল’। এ ঘটিকাপাল শব্দটি ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে ‘ঘড়েল’ শব্দে এসে স্থিতি পায়।
এখন একটা প্রশ্ন থেকে যায়, ঘটিকাপাল কীভাবে ফন্দিবাজ, কুচক্রী বা ধুরন্ধর হয়ে গেল? ঘটিকাপালকে ঘটিকা পূর্ণ হওয়া মাত্র ঘণ্টা বাজিয়ে ঘটিকার হিসাব জানিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো। এক মুহূর্তের অসতর্কতার জন্য সময়ের হেরফের হয়ে যেত। তাই সবসময় চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের বেতনও ছিল অন্যান্য সম-মানের কর্মচারীদের তুলনায় অধিক। তাই চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান বিশেষণগুলো ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগের অন্যতম শর্ত হয়ে যায়। আর এ কথা কার না-জানা, যিনি বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর তিনি সাধারণত ধুরন্ধর, ফন্দিবাজ ও কুচক্রীও হন!
পেশকার
 যিনি পেশ করেন তিনি পেশকার। আদালতে যিনি নথিপত্র বিচারকের কাছে উপস্থাপন করেন তার পদবি এখনও পেশকার।
বাকি অংশ এবং শুবাচ অভিধান:
error: Content is protected !!