বাংলার বরপুত্র বাংলার দর্শন উপভাষাতত্ত্বের জনক স্যার জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলার বরপুত্র বাংলার দর্শন উপভাষাতত্ত্বের জনক স্যার জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন

আজ বাংলার বরপুত্র, বাংলার দর্শন ও উপভাষাতত্ত্বের জনক স্যার জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন (Sir George Abraham Grierson)-এর জন্মদিন। শুবাচ তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে।

বাংলা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে যার নাম সবার আগে সশ্রদ্ধচিত্তে অসীম কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করতে হয় তিনি হচ্ছেন জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন। তিনি বাঙালি ছিলেন না। তবু বাংলা ভাষার জন্য যা করেছেন ত বিস্মৃত হওয়া বাংলাভাষীর পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার উপভাষাত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা গিয়ারসন Linguistic Survey of India গ্রন্থে উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা বিষয়ে যে জরিপ ও গবেষণা কার্য করেছেন তাতে প্রাণিত হয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন করেছেন।

স্যার জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন (Sir George Abraham Grierson)  গিয়ারসন ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারি ডাবলিন কাউন্টির গ্লিনাগেয়ারি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। ট্রিনিটি কলেজ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন সমাপ্ত করার পর ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে ২৮-তম স্থান দখল করে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উন্নীত হন। এরপর ট্রিনিটি কলেজে দুই বছর চাকুরির প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করার পর ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির উদ্দেশে ইংল্যান্ড ত্যাগ করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই মার্চ ৯০ বছর বয়সে মারা যান।

গিয়ারসন ইংরেজ, বাঙালি নন। তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে চাকরি করার জন্য ভারতে এসেছিলেন। চাকুরির প্রচণ্ড ব্যস্ততার মাঝে ইংরেজ হয়েও ভারতীয় ভাষা গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করে উপমহাদেশের ভাষাদর্শন, শ্রেণিবিন্যাস এবং উপভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। উনবিংশ শতকের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাবিজ্ঞানীদের বাংলা উপভাষাতত্ত্বের বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। গিয়ারসন প্রথম তার কর্ম  ও গবেষণার মাধ্যমে  ভারতীয় উপমহাদেশে উপভাষাতত্ত্বকে পরিচিত করে তুলেন। এজন্য তাকে বলা হয় উপমহাদেশে উপভাষাতত্ত্বের জনক।  

 ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোল শাস্ত্রের উদ্ভাবক ফরাসি পণ্ডিত জুল গিলিয়েগা। তিনি ফরাসি উপভাষা জরিপের জন্য দুই হাজার প্রশ্নসম্বলিত একটি প্রশ্নমালা ব্যবহার করেছিলেন। বিংশ শতকের শুরুতে এ কাজ আরম্ভ হয় এবং ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে তা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন ভারতীয় অঞ্চলের উপভাষা জরিপের কাজ সম্পন্ন করেন। অথচ তিনি হাজার প্রশ্নসম্বলিত কোনো প্রশ্নপত্র ব্যবহার করেননি। কারণ তিনি জানতেন এত প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে পাওয়া যাবে না। গিয়ারসনের এই জরিপ কাজটি  ছিল উমহাদেশের ভাষার ইতিহাসে একটি অনবদ্য ঘটনা। 

এ জরিপের মাধ্যমে গিয়ারসন ভারতীয় ভাষার বংশ পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, ভাষাভাষীর এলাকা চিহ্নিতকরণ, ভাষার সমস্যা বা লক্ষণের ভিত্তিতে ভাষাকে শ্রেণিবদ্ধকরণের মতো কঠিন কাজ সম্পন্ন করেন। যা ভারতীয় ভাষা গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের এই গ্রন্থ প্রকাশের পূর্বে বাংলা ভাষায় এসব তথ্য নিয়ে রচিত কোনো পুস্তক ছিল না। উৎস বা ইঙ্গিতমূলক কোনো পুস্তিকাও পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় গিয়ারসন  একটি প্রচলিত লোককাহিনিকে সাধু ভাষায় লিখে বিভিন্ন স্কুল শিক্ষকদের কাছে প্রেরণ করেন। শিক্ষকদের নিজ নিজ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় গল্পটি রূপান্তরিত করে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। এভাবে  সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনি তাঁর জরিপ কার্য সম্পন্ন করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।  এ গ্রন্থের ধারণা থেকেই ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন করেন।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত পুস্তক  Linguistic Survey of India ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে  প্রকাশিত হয়। এর ৫ম খণ্ডের প্রথম ভাগে রয়েছে বাংলা ভাষার উপভাষার আলোচনা। তার এই কাজটি ছিল বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের প্রথম আশীর্বাদ। এজন্য তাকে বলা যায় বাংলা ভাষার বরপুত্র।


শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর সমগ্র

শুবাচ প্রায়োগিক বাংলা ও সাধারণ জ্ঞান

error: Content is protected !!