বাংলা আকাদেমি (পশ্চিমবঙ্গ) প্রণীত মান্য বানানবিধি

সংগ্রহ: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রণীত মান্য বানানবিধি
বাংলা বানানের সমতাবিধান এবং লিখনরীতি ও লিপির সরলীকরণের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রাপ্ত বিভিন্ন মতামত বিশ্লেষণ করে কতকগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ‘বাংলা বানানবিধি’ শিরোনামের একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেছে। ‘বাংলা বানানবিধি’ হতে এরকম কিছু নিয়ম নিচে দেওয়া হলো। এ নিয়মগুলো বাংলা একাডেমি প্রমিত বানান রীতির অনুরূপ।


১. হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরচিহ্ন

১.১ : তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে যেখানে হ্রস্ব-ই, হ্রস্ব-উ/ই-কার উ-কার এবং দীর্ঘ ঈ, দীর্ঘ-ঊ/ঈ-কার ঊ-কার দুটো রূপই প্রচলিত ও গৃহীত, সেখানে সাধারণভাবে হ্রস্ব বিকল্পটাকেই গ্রহণ করা হয়েছে।
যেমন— অবনি, উষা, কটি, কোটি, চিৎকার, চুল্লি, ধমনি, তরি, দীপাবলি, পদবি, পরিপাটি, পল্লি, পাটি, পেশি, রজনি, সরণি, সূচি।
অবশ্য হ্রস্ব বিকল্পে না-থাকলে তৎসম শব্দের বানানে দীর্ঘ স্বরচিহ্নই লিখতে হবে।

১.২ : সংস্কৃত-ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ

সংস্কৃত ইন-প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলো (গুণিন্, মন্ত্রিন্ ইত্যাদি) কর্তৃকারকের একবচনে দীর্ঘ ঈ-কারান্ত হয় এবং এই দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপেই এগুলো বাংলায় পরিচিত— (অধিকারী, অভিমুখী, আততায়ী, কৃতী ইত্যাদি)। সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে সমাসবদ্ধ কিংবা প্রত্যয়যুক্ত

প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

হলে এইসব শব্দের দীর্ঘ ঈ-কার আবার হ্রস্ব ই-কারে ফিরে যায়, যেমন— গুণিজন, মন্ত্রিসভা, একাকিত্ব, কৃতিত্ব, সহযোগিতা।
কিন্তু বাংলা বানানে এই নিয়মের প্রচুর ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন— আগামীকাল, পরবর্তীকাল, প্রাণীবিদ্যা, হস্তীদল।
সমাসবদ্ধ শব্দের বেলায় সংস্কৃত মূল শব্দটাকে দীর্ঘ ঈ-কারান্ত ‘বাংলা’ শব্দ ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ সমাস হলেও তার দীর্ঘ ঈ-কারের ব্যত্যয় ঘটানো চলবে না। যেমন— আগামীকাল, পরবর্তীকাল, মন্ত্রীসভা, শশীভূষণ।
কিন্তু, তৎসম ত্ব ও তা প্রত্যয় যোগ করা হলে এইসব শব্দের হ্রস্ব ঈ-কারান্ত (অর্থাৎ ইন্-এর ন লোপের পর যা থাকে) মূল প্রাতিপাদিক রূপেই লেখা হবে। যেমন— প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, মন্ত্রিত্ব, সহমর্মিতা, স্থায়িত্ব ইত্যাদি।
এছাড়া লিঙ্গান্তরের ক্ষেত্রেও নী-যোগের আগে এই নিয়ম পালিত হবে। যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিনী, প্রতিযোগিতা।
অবশ্য অতৎসম প্রত্যয় যুক্ত হলেও উপরের ‘মন্ত্রীগণ’ সংক্রান্ত বিধি প্রযোজ্য হবে। যেমন— মন্ত্রীগিরি।

১.২.১ : কোনো কোনো তৎসম শব্দে বাংলা প্রত্যয়-ই লাগিয়ে বিশেষণ করা হয়। যেমন—আগমনি, উত্তরপ্রদেশি, কৃত্তিবাসি, দক্ষিণি, প্রণামি, বয়সি, বিহারি ইত্যাদি। এই প্রত্যয় অর্থ বা প্রয়োগের দিক থেকে সংস্কৃত-ইন্ প্রত্যয়ের সমতুল্য নয়। তাই এ ধরনের নানা শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
‘পণ্ডিত’ থেকে বাংলা ঈ-প্রত্যয়ের বিশেষ্য ‘পণ্ডিতি’তেও হ্রস্ব ই-কার দিতে হবে।


২. বিসর্গ (ঃ) চিহ্নের রক্ষা/বর্জন

তৎসম শব্দের বিসর্গ সব জায়গায় রাখা হবে কি না এ বিষয়ে বাংলা আকাদেমি জানিয়েছে :
২.১: যেখানে -তস্ বা -শস্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলোতে অন্ত্যবিসর্গের প্রয়োগ প্রচলিত ছিল সেগুলোতে এখন আর বিসর্গ দিতে হবে না। যেমন— অন্তত, প্রথমত, ফলত, বস্তুত, ক্রমশ, প্রায়শ।
বিসর্গসন্ধিযুক্ত পদেও অন্ত্যবিসর্গ বাদ যাবে। যেমন— ইতস্তত, অহরহ, মুহুর্মুহু। তবে অধঃপাত বিসর্গ যুক্ত করে লেখা হবে।
কিন্তু সন্ধিতে যেখানে পদমধ্যে বিসর্গ রক্ষিত থাকে সেখানে পদমধ্যস্থ বিসর্গ লিখতে হবে। যেমন— অতঃপর, অধঃপাত, অন্তঃকরণ, বয়ঃসন্ধি, মনঃপূত।
২.২: সন্ধি-সমাস নিষ্পন্নরূপেই গৃহীত ও প্রচলিত শব্দের ক্ষেত্রে বিসর্গসন্ধিজাত ও-কারের প্রচলিত ও দীর্ঘকাল গৃহীত রূপগুলো রাখতে হবে। যেমন— অকুতোভয়, ততোধিক, বয়োজ্যেষ্ঠ, মনোযোগ, মনোরঞ্জন, মনোরম। ‘মনমোহন’ কোনো কোনো নামে, বিশেষত অবাঙালি নামে,  ওই ধরনের বাংলা বিশেষণ ও নাম শব্দ হিসাবে তৎসম মনোমোহন-ই গ্রহণীয়। তবে অর্ধতৎসম শব্দ ‘মন’-কে পূর্বপদ হিসাবে রেখে সমাস করলে ও-কার যোগ হবে না। যেমন— মনপবন, মনমাঝি, মনমেজাজ ইত্যাদি।
২.২.১: ‘ছন্দ’ শব্দটার বেলায় এটাকে বাংলা অর্ধতৎসম শব্দ ধরে নিয়ে বিসর্গ-সন্ধিজাত ও-কারকে বর্জন করতে হবে। যেমন— ছন্দগুরু, ছন্দবিজ্ঞান, চন্দমুক্তি, ছন্দলিপি।
অনুরূপভাবে ‘চক্ষু’ শব্দটাকে অর্ধতৎসম ধরে নিয়ে সংস্কৃত ব্যাকরণসিদ্ধ ‘চক্ষূ রোগ’ এর বদলে ‘চক্ষুরোগ’ লিখতে হবে। তবে বহুপ্রচলিত ঐকিক শব্দ হিসাবে ‘চক্ষুষ্মান’ বানানই চলবে। একইভাবে জ্যোতি, কিন্তু জ্যোতির্ময়, জ্যোতিষ্মান লিখতে হবে।
২.৩: বিকল্পরূপ থাকলেও লিখতে হবে: দুস্থ, নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ, বয়স্থ, মনস্থ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্তঃস্থ আর অন্তস্থ দুটো ভিন্নার্থক শব্দ : প্রথমটার অর্থ ‘ভিতরকার’ (অন্তঃ+স্থ) আর দ্বিতীয়টার ‘শেষের’ (অন্ত+স্থ)। তাই অন্তঃস্থ শব্দটার বিসর্গ থাকবে।

৩. হস্ চিহ্ন

৩.১: পদান্তের হস্ চিহ্নকে পরস্বরহীন অর্থাৎ ব্যঞ্জনাস্ত উচ্চারণ বোঝানোর চিহ্ন বা ধ্বনিমাত্রচিহ্ন (diacritical mark) হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলায় কয়েকটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া অ-কারান্ত শব্দ প্রায় সর্বত্র ব্যঞ্জনান্ত উচ্চারিত হয়। এই রীতি অনুসারে পদের শেষে হস্ চিহ্নের ব্যবহার বাহুল্যসূচক (redundant), এজন্য লিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে পদান্ত হস্ বর্জিত হবে।
অবাক, আশিস, দিক, ধিক, পরিষদ, পৃথক, বণিক, বিপদ, বিরাট, সভাসদ, সম্রাট ইত্যাদি শব্দগুলো হস্ চিহ্ন ছাড়াই ব্যবহার করতে হবে।
৩.২: তদ্ধিত মতুপ প্রত্যয়ের হসন্ত মান্ আর কৃৎ শানচ্ প্রত্যয়ের হস্ চিহ্নিত মান নিয়ে বিভ্রমের অবকাশ থাকলেও উভয় ক্ষেত্রেই হস্‌বিহীন ‘মান’ ব্যবহৃত হবে। যেমন— রুচিমান, শক্তিমান, শ্রীমান, সংস্কৃতিমান এবং ঘটমান, ম্রিয়মান, ধাবমান, বর্তমান ইত্যাদি।
৩.২.১: অনুরূপভাবে, বতুপ্ প্রত্যয়জাত বান্ও বান-রূপে লিখতে হবে। যেমন— জ্ঞানবান, ধনবান, ভগবান।
৩.৩: তবে সংস্কৃত সন্ধিজাত শব্দে পূর্বপদের শেষে হস্ চিহ্ন থাকবে। যেমন— দিগ্‌ভ্রান্ত, পৃথক্‌করণ, প্রাগ্‌জ্যোতিষ, বাক্‌সিদ্ধ, বাগ্‌ধারা, বাগ্‌রূপ।
৩.৪: ষড়্‌যন্ত্র শব্দটা ষড়যন্ত্র হিসাবেই প্রচলিত। এরকমই ষড়দর্শন রূপে। এ প্রচলন মানতে হবে।


৪. রেফের নিচে ব্যঞ্জনের চিহ্ন

রেফ-এর নিচে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব সর্বত্রই বর্জিত হবে। দ্বিত্বহীন এই রেফযুক্ত শব্দগুলোর বানান লক্ষণীয়— অর্চনা, অর্জন, আর্য, ঊর্ধ্ব, কর্ম, চর্চা, তূর্য, পূর্ব, বর্জন, ভট্টাচার্য, মূর্ছনা, সূর্য, হার্দিক ইত্যাদিতে তো বটেই, এমনকি কৃত্তিকা থেকে উৎপন্ন কার্তিক বা বৃদ্ধ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বার্ধক্য-তেও যথাক্রমে ত ও ধ-এর দ্বিত্ব অপ্রয়োজনীয়।


৫. ঙ আর ং

৫.১: ঙ আর ং দুটোই যে-বানানে (সংস্কৃত ব্যাকরণমতে) শুদ্ধ, সেখানে কেবল ং ই ব্যবহৃত হবে। তবে যেখানে ং প্রয়োগ (ওই ব্যাকরণে) অস্বীকৃত সেখানে কিন্তু ং লেখা অসমীচীন। কয়েকটা সংগত ং-এর দৃষ্টান্ত : অলংকার, অহংকার, ভয়ংকর, শংকর, সংগত, সংগীত।

৫.২: কিন্তু যেসব শব্দে ম্-এর সন্ধি-পরিণাম হিসাবে ং আসেনি, ষেখানে ং ব্যবহার অবৈধ। তাই অংক নয়, অঙ্ক (অন্ক্ + অল্); বংগ নয়, বঙ্গ; শংকা নয়, শঙ্কা; সংগে নয়, সঙ্গে লিখতে হবে। এরকম : আতঙ্ক, কঙ্কাল, পঙ্ক।

৫.২.১: সম্+গীত> সংগীত হলেও সম্+বোধন কিন্তু সংবোধন নয়, হবে সম্বোধন। ম্-এর পরে বর্গীয় ব থাকলে তা ম্-ই থাকবে, ং হবে না; ম্-এর পরে অন্তঃস্থ ব থাকলে তবেই সেটা ং হবে। যেমন— কিংবদন্তি, কিংবা, সংবর্ধনা, সংবাদ। কিন্তু সম্বন্ধ, সম্বোধন, সম্বুদ্ধ, সম্বোধি।


৬. কিছু বিশেষ শব্দের য-ফলা

দারিদ্র্য, বৈচিত্র্য ইত্যাদি কোনো কোনো তৎসম শব্দে য-ফলাহীন বিকল্প বানান সংস্কৃতেই লক্ষ করা যায়। কিন্তু কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে য-ফলাহীন বানান W. R. বা Wrong reading হিসাবে মনিয়ের ইউলিয়ামস দেখিয়েছেন। সমতার জন্য এ জাতীয় সমস্ত শব্দকেই য-ফলা দিয়ে লিখতে হবে। যেমন— চারিত্র্য, দারিদ্র্য, বৈচিত্র্য, বৈদগ্ধ্য, বৈমাত্র্য, সৌগন্ধ্য, সৌভ্রাত্র্য, সৌহার্দ্য, নৈঃশব্দ্য ইত্যাদি।

৭. বিশেষ ক্ষেত্রে ব-ফলা য-ফলা ভেঙে লেখা

‘ব’ এবং ‘য’-এর উচ্চারণ যেখানে পৃথকভাবে যথাক্রমে ব্ এবং ‘জ্’ রূপে করা হয় সেখানে ব-ফলা এবং য-ফলার বদলে ‘ব’ ও ‘য’ আলাদা ভেঙে লেখাই উচিত। নইলে উচ্চারণ-বিভ্রমের  আশংকা থাকে। তাই লিখতে হবে— উদ্‌বাস্তু, উদ্‌বিগ্ন, উদ্‌বেগ, উদ্‌বোধন।
অন্যদিকে, উদ্যোগ যদি ‘উদ্‌জোগ্’ উচ্চারিত হয় তা ‘উদ্‌যোগ’ আকারে লেখা হবে। বলাবাহুল্য, ব-ফলা, য-ফলার আলাদা ব্ ও জ্ উচ্চারণ না থাকলে ব-ফলা য-ফলাই থাকবে। যেমন: বিদ্বান, উদ্যম, উদ্যান।

৮. শ-ষ-স

যেসব তৎসম শব্দে শ-ষ বা শ-স দুটোই সংস্কৃত অভিধানে স্বীকৃত সেগুলোর ক্ষেত্রে শুধু শ ব্যবহার করা হবে। এসব বিকল্পের প্রথমটাই গ্রহণীয় : উশীর— উষীর, কিশলয়—কিসলয়, কোশ—কোষ, শরণি—সরণি, শায়ন—সায়ক ইত্যাদি।

অতৎসম শব্দের বানান

৯. হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ঈ-কার

অতৎসম শব্দে ঈ-কার বর্জন করতে হবে। যেমন— কাহিনি, কুমির, গাভি, দিঘি, পাখি, বাড়ি, হাতি, হিরে ইত্যাদি শব্দে সবসময়েই হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হবে।


৯.১: কাহিনি তদ্ভব শব্দ বলে এতে দীর্ঘ ঈ-কর রাখার কোনো যুক্তি নেই। চিন, চিনা-ও প্রাচীন বাংলায় চিনা (কঙ্গুচিনা) হিসাবেই পাই। ‘চিনাবাদাম’ও প্রচলিত। ফলে এই দেশ নামটাকে তৎসম হিসাবে গণ্য করা অসংগত। তবু চিন ও চীন বিকল্প রাখা হয়েছে। ভীত ও নীচ-এর সঙ্গে সমতার জন্য ভীতু ও নীচু বানান সুপারিশ করা হলো। গাভী-ও তৎসম নয়। ফলে এ শব্দটা ‘গাভি’ হিসাবে লিখতে হবে।

৯.২: সংস্কৃত নিয়মে অভূততদ্ভাবে  চ্বি প্রত্যয় যোগ করলে প্রত্যয়-পূর্ব শব্দের সঙ্গে ঈ-কার যুক্ত হয়ে বানান হয়— সমীকরণ, বশীকরণ ইত্যাদি এবং পূর্বপদে হ্রস্ব-উ থাকলে ঊ হয়; যেমন— লঘূকরণ, ঋজূকরণ।

বর্তমানে এই ধরনের নতুন শব্দ তৈরির পদ্ধতি হবে: মূল শব্দ+করণ, ভবন (এসব ক্ষেত্রে পূর্ব স্বরের পরিবর্তন হবে না)। উদাহরণ— বন্ধ্যাকরণ, রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, রাষ্ট্রীয়করণ ইত্যাদি। বাংলায় প্রচলন অনুযায়ী লঘুকরণ বানান গ্রহণযোগ্য। (যদিও ব্যাকরণমতে হওয়া উচিত লঘূকরণ।)

৯.৩: জীবিকা, ভাষা, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতি বোঝানোর জন্য যে ই-কারান্ত প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় তা দীর্ঘ ঈ-কার হবে না, সবসময় হ্রস্ব ই-কার হবে। যেমন—ওকালতি, জমিদারি, ডাক্তারি, পণ্ডিতি, মাস্টারি, মারাঠি, ফারসি, আরবি, ইংরেজি, হিন্দি, কংগ্রেসি, ইরাকি, ওড়িশি, পাকিস্তানি, বাঙালি।

৯.৪: কিছু অতৎসম, মিশ্র ও বিদেশি বিশেষণ শব্দে যে ই-প্রত্যয় যুক্ত হয় তাও হ্রস্ব ই-কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন— আসামি, কয়েদি, খুনি, জঙ্গি, জবানবন্দি, জরুরি, দরকারি, দরদি, দেশি, বিদেশি, মৌসুমি, সরকারি, হিসেবি।

৯.৫: কিছু দেশি-বিদেশি সাধারণ বিশেষ্য শব্দেও হ্রস্ব ই-কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন— কেরামতি, খবরদারি, গোলামি, চালাকি, চালিয়াতি, সালিশি, হুজ্জতি।

৯.৬: সংস্কৃত ঈয় প্রত্যয় যদি অতৎসম শব্দ বা শব্দাংশের সঙ্গে যুক্ত হয় সেক্ষেত্রে অর্থবোধের সুবিধার জন্য দীর্ঘ ঈ-কার বজায় রাখতে হবে। যেমন— অস্ট্রেলীয়, ইউরোপীয়, ইতালীয়, এশীয়।

১০. কী আর কি

১০.১: ‘কী’-এর প্রয়োগ কখনো কর্মবাচক, কখনো প্রশ্নমূলক সর্বনাম, কখনো বিশেষণের বিশেষণ হিসাবে হয়। যেমন— তুমি কী দেখেছ বলবে তো! বা কী চমৎকার! কী বা তার শোভা। বিকল্পাত্মক বিশেষণ হিসাবেও কী ব্যবহৃত হবে: কী রাম কী শ্যাম— দুটোই সমান পাজি! এই সঙ্গে কীসে এবং কীসের দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে লিখতে হবে।

১০.২: কিন্তু, যে প্রশ্নের উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’ হবে, না হয় ‘না’ হবে (Yes-No question) সে-ক্ষেত্রেই শুধু হ্রস্ব ই-কারযুক্ত ‘কি’ ব্যবহৃত হবে। যেমন—
তুমি কি দেখছ বইটা?— এর উত্তর হবে হ্যাঁ বা না
তুমি কী দেখছ?— এর উত্তর হবে শ্রোতা যা দেখেছে তার নাম বা বর্ণনা।

১১. হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার

১১.২: অতৎসম শব্দে হ্রস্ব উ-কার হবে। যেমন— ধুলো, পুজো, পুরো, উনিশ, চুনি ইত্যাদি।

১১.২: দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত তৎসম শব্দ কিংবা উপসর্গের সঙ্গে বাংলা প্রত্যয় কিংবা শব্দ যুক্ত হলেও দ্রুত অর্থবোধের সহায়ক বলে মূলের দীর্ঘ ঊ-কার পালটানো যাবে না। যেমন— ধূর্তামি, মূর্খামি, পূজারি।

১১.৩: কিন্তু শব্দগুলো অর্ধতৎসম রূপ গ্রহণ করলে দীর্ঘ ঊ-কারের বদলে হ্রস্ব উ-কারই হবে। যেমন— উনত্রিশ, উনচল্লিশ, উনপঞ্চাশ ইত্যাদি।

১২. শব্দান্তে ও-কার

১২.১: ও-ধ্বনির উচ্চারণ বোঝাতে এইসব শব্দে ও-কারান্ত রূপ থাকবে : কালো, খাটো, চোটে, ছোটোগল্প, বড়ো, বড়োদিন, ভালো, ভালোবাসা, মতো, এগারো, বারো, তেরো, চোদ্দো, পনেরো, ষোলো, সতেরো, আঠারো।
কিন্তু এত, কত, তত, যত ইত্যাদি শব্দে ও-কার বসবে না।

১২.২: কোন্-কোন-কোনো-কোনও— এই বানানগুলোর মধ্যে দুটো ভিন্ন অর্থে ‘কোন্’ (বিশেষ-বাচক প্রশ্নবাচক সর্বনাম (Particularising which), আর ‘কোনো’ অনিশ্চয়সূচক সর্বনাম (Some, any) ব্যবহার করতে হবে। অনেকগুলোর মধ্যে কয়েকটা বোঝানোর জন্য লিখতে হবে ‘কোনো কোনো’।
একইভাবে, কখনও, কখনোই, আরও, কিন্তু আরোই।

১২.৩: Too অর্থে ‘ও’ যোগ করলে অর্থাৎ সংযোগাত্মক (inclusive) প্রত্যয় ও-কে ও-দিকে (ও-কার না দিয়ে) লেখাই উচিত। তাই আজো, আরো, এখনো, তোমারো, রামেরো, নয়, লিখতে হবে— আজও, আরও, এখনও, তোমারও, রামেরও ইত্যাদি। পদ্যে ছন্দের কারণে ও-কারের বানান থাকতেই পারে।

১২.৪: বিনির্দেশক (exclusive) ই-প্রত্যয় অন্তত গদ্যে আলাদাভাবে লিখতে হবে। যেমন— আজই, কেবলই, তোমারই, সকলই। পদ্যে মিল বা ছন্দের প্রয়েজনে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে।

আদি দল বা অক্ষরে (syllable-এ) স্বরধ্বনি অ-যুক্ত মূল শব্দের সঙ্গে -উয়া প্রত্যয় জুড়ে যে রূপ হয়, সেখানে দুটো ও-কার দিতে হবে। যেমন জলুয়া থেকে জোলো, পড়–য়া থেকে পোড়ো, পটুয়া থেকে পোটো। এইভাবে— থোলো, বোড়ো, টোকো (-ফল)।

১২.৫: বিশেষণের ‘লো’-প্রত্যয় ও -কার হবে। যেমন— ঘোরালো, ছুঁচোলো, জোরালো, ধারালো, টিকালো, প্যাঁচালো।

১২.৬: তো এবং সেই সূত্রে হয়তো, নয়তো ও-কার যুক্ত হবে।

১২.৭: ক্রিয়াপদের বিভিন্ন রূপে নিচের পার্থক্যগুলো বজায় রাখতে হবে। যেমন নিয়মিত অভ্যস্ত ঘটনাসূচক নিত্যবর্তমানকালে অ-কারান্ত— তুমি কোন্ কাগজ পড়?
বর্তমান অনুজ্ঞায় ও-কারান্ত— এটা পড়ো তো দেখি।
তুচ্ছার্থক বর্তমান অনুজ্ঞায় শেষ ব্যঞ্জনে হস্ চিহ্ন : তুই পড়্। ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় অর্থাৎ আদেশে, অনুরোধে একাধিক ও -কার : এ বইটা অবশ্যই পোড়ো।
বস্ ধাতুর ক্ষেত্রে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার রূপ হবে বোসো।

২.৮: তবে ক্রিয়াপদের অতীত ও ভবিষ্যৎ রূপে শেষ বর্ণে ও-কার হবে না; অর্থাৎ বলল, বলত, বলব লিখতে হবে। হল (< হইল), হত (< হইত) ও-কার ছাড়াই লিখতে হবে।

১২.৯: সাধিত ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের শেষে নো থাকবে। যেমন— করানো, দেখানো, শোনানো, বলানো, চালানো, লাগানো, পাঠানো, খাওয়ানো।

১২.১০: দ্বি-দল (bisyllabic) ধাতুর ব্যঞ্জনে ও-কার দিতে হবে। যেমন— এগোবে, জুড়োল, পিছোবে, পৌঁছোল, ফুরোল, ভিড়োবে, লুকোবে।

১২.১১: অসমাপিকা ক্রিয়ার কোনো রূপেই স্বরসংগতিতে ও-কার বা ঊর্ধকমার দরকার নেই। উদাহরণ— বলে, কয়ে, হয়ে, সয়ে, পড়ে, চলে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে অর্থবোধে সংশয় দেখা দিলে ঊর্ধকমার প্রয়োগ চলতে পারে।

১২.১২: এই কয়েকটা ক্রিয়াপদের অনুজ্ঞা-রূপে ও-উচ্চারণ বোঝানোর জন্য ও-কার দিতে হবে। যেমন—বোস্, বোসো, হোক, হোন, হোস।

১২.১৩: সাধিত প্রযোজক ধাতুর ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় ইও-র বদলে ইয়ো লিখতে হবে। যেমন— করিয়ো, দেখিয়ো, শুনিয়ো।
সিদ্ধ স্বরান্ত (খা-, দে-, যা-) ধাতুর মধ্যম পুরুষের অনুজ্ঞার ক্ষেত্রেও ওইভাবে য়ো হবে। যেমন— খেয়ো, দিয়ো, যেয়ো।

১৩. ঐ ঐ-কার, ঔ ঔ-কারের বিশ্লেষণ

১৩.১: ঐ-কার বা ঔ-কারের বদলে অই বা অউ ব্যবহার প্রয়োজনমতো করা যেতে পারে। যেমন— কই, দই, বই, (বই কি), হইচই, পইতে, রইরই, পইপই ইত্যাদি শব্দ ঐ-কার ছাড়া লিখতে হবে। তেমনই বউ, মউকে ঔ-কার ছাড়া।
তবে কৈফিয়ত, মৌরালা, মৌরি, মৌলবি, মৌলানা, মৌলানি ইত্যাদি প্রচলন মেনে লিখতে হবে।

১৪. ঙ বনাম ঙ্গ

১৪.১: কিছু কিছু শব্দের বানান মান্য উচ্চারণের ভিত্তিতে লিখতে হবে। যেমন— কাঙাল, গোঙানি, টাঙানো, ডাঙা, ডিঙি, ডোঙা, ঢ্যাঙা, বাঙালি, ভাঙা, ভেঙে, রাঙা, রঙিন, লাঙল।

১৪.২: যেখানে সাধারণত ঙ্গ উচ্চারণ হয়, সেখানে গ্-যুক্ত ঙ্গ-ই লিখতে হবে। যেমন— চুঙ্গি, জঙ্গল, জঙ্গি, দাঙ্গা, ভঙ্গি, লুঙ্গি, হাঙ্গামা।

১৫. জ এবং য

১৫.১: অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দে জ-এর বদলে য ব্যবহার করতে হবে। যেমন— যখন, যত, যন্তনা, যন্তর, যবে, যাওয়া, যিনি, যে ইত্যাদি।

১৫.২: প্রচলিত কয়েকটা ক্ষেত্রে য-এর বদলে জ হবে। যেমন— কাজ, জাঁতা, জুঁই, জুতসই, জো, জোগাড়, জোগান, জোড়, জোড়া, জোত, জোয়াল।


১৬. ণ এবং ন

১৬.১: সংস্কৃত ণ-ত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তৎসম নয়, অথবা বাংলা ব্যাকরণের নিয়মে পরিবর্তিত এই সব শব্দে ন হবে। যেমন— অঘ্রান, কান, কোনাকুনি, ঘোরানো, চিরুনি, চুন, ঠাকরুন, দরুন, নরুন, পুরানো, পুরোনো, মানিক, রানি, সোনা ইত্যাদি।

১৬.২: অতৎসম শব্দে মূর্ধন্য বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ন-এর ক্ষেত্রে দন্ত্য ন লিখতে হবে। যেমন— ঝন্টু, প্যান্ট, লন্ঠন, ঝান্ডা, লন্ডভন্ড ইত্যাদি।

১৬.৩: কিন্তু তৎসম-জাত অর্ধতৎসম শব্দে ণ্ড ব্যবহৃত হবে। যেমন— আণ্ডা, কুণ্ডু, মুণ্ডু, ষণ্ড।

১৬.৪: পুণ্য, গণ্য ইত্যাদি শব্দে পুণ্যি, গণ্যি লিখতে হবে।


১৭. য-ফলা

১৭.১: অতৎসম শব্দে বিশেষত অর্ধতৎসম শব্দে য-ফলা হবে। যেমন— কাব্যি, জন্যে, মান্যিগণ্যি, সাধ্যি ইত্যাদি।
১৭.২: বিদেশি শব্দের বেলাতে য-ফলার দরকার নেই। লিখতে হবে— লস্‌সি, হিস্‌সা মফস্‌সল।

১৮. শ, ষ, স

অতৎসম, বিশেষত তদ্ভব শব্দে প্রচলন অনুযায়ী শ-ষ-স তিনটেরই ব্যবহার হবে। যেমন— ভাশুর, ষাঁড়, মোষ, মাসি, পিসি।

লিংক: https://draminbd.com/বাংলা-আকাদেমি-পশ্চিমবঙ্/

বাংলা আকাদেমি (পশ্চিমবঙ্গ) প্রণীত মান্য বানানবিধি

১০. কী আর কি/ ১১. হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার/১২. শব্দান্তে ও-কার/১৩. ঐ ঐ-কার ঔ ঔ-কারের বিশ্লেষণ/১৪. ঙ বনাম ঙ্গ.১৫. জ এবং য/ ১৬. ণ এবং ল/১৭. য-ফলা এবং ১৮. শ, ষ, স” ইত্যাদি জানার জন্য নিচের লিংক:

সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

error: Content is protected !!