বাংলা একাডেমির ‘দায়’ এবং আমাদের ‘ভার’

 
 
০১.
কিছুদিন পূর্বে প্রকাশনার একটা কাজ করিয়েছি নীলক্ষেতে। কম্পোজম্যান লিখেছে ‘পীপিলীকা’। আমি বললাম ‘পীপিলীকা’ শব্দের ‘-ি’-কে ‘-ী’ এবং ‘-ী’-কে ‘-ি’ করে দাও। ছেলেটা ফাইলটা ধরে এক আছাড় দিয়ে বলল, “ভাই কাজ করাইলে করান, না করাইলে যান। এই ‘-ি’, ‘-ী’-এর যন্ত্রণায় আমার লাইফটা শ্যাষ। ব্যাবসা লাডে উইট্টা যাই্ত্যাছে ; বউ, বাচ্চা উপাস কইরা মরতাছে।” বললাম, ভাই… … … ! ছেলেটা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ আরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যার ৪৮ ফর্মার একটা বই কম্পোজ করাইছে ৬ মাস আগে , গত ৬ মাস ধইরা কতোদিন যাবত ‘-ি’গুলা ‘-ী’ করবে , আবার কয়দিন পর আইসা ‘-ী’-গুলা ‘-ি’ করবে। জীবনডারে ত্যাজপাতা বানাইয়া দিলো। মনে হয় এই শালার বই’র ‘-ি’, ‘-ী’ দেওয়ার লইগ্গাই আমার জন্ম অইছে। ভাই, কোনো কোনো দিন ৫০০ টাকা ক্যাশ পর্যন্ত করতে পারি না। ” ব্যাপারটা আমাদের কিছুটা কমেডির আনন্দ জোগালেও ছেলেটার দিক থেকে কিন্তু এক ট্রাজেডি !
 
বহুদিন ধরে রহমান তাওহিদের সম্পাদনায় বগুড়া থেকে বের হয় কিশোর-কবিতার ছোটকাগজ ‘অন্তমিল’। কয়েকটি সংখ্যা বের হওয়ার পরেই শুরু হল ‘অন্তমিল/অন্ত্যমিল/অন্তঃমিল’ শুদ্ধ বানান কোনটি ? পর পর দুটি সংখ্যায় এ-নিয়ে কিছু লেখাও ছাপা হল। এ-রকম বিষয় নিয়ে বন্ধুদের মাঝে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন হতে দেখেছি। কোনো কোনো সাহিত্য আড্ডায় এসব নিয়ে উচ্চবাচ্য দেখেছি কখনও কখনও। এর কিছুটা ঘটেছে তথ্য দুর্লভ হওয়ার কারণে, কিছুটা আমাদের অজ্ঞতার কারণে। এখনও কার, ফলা, স/ছ, জ/য, ঙ/ং, য়/ঞ, রি/ঋ, ত/ৎ প্রভৃতি বিষয়ক বেশ কিছু জটিলতা আছে। গত ৬৫ বছরে বাংলা একাডেমি এর তেমন কোনো সমাধান দিতে পারেনি। নিজের নামের বানানটা ঠিক করতেও লাগল অর্ধ-শতাব্দী। এই হল আমাদের বাংলা ভাষার নীতি-নির্ধারক প্রতিষ্ঠান। ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও মিটাতে পারেনি বলেই, নীলক্ষেতের সেই ছেলের মতো অনেকের জীবন যেমন ‘ত্যাজপাতা’ হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক হয়েছে টঙ-দোকানীর শালা ! ইবনে বতুতা থেকে টঙ-দোকানী পর্যন্ত সকলের শালা হয়েই থাকতে হল আমাদের !
 
০২.
আমাদেরএকটা গ্রুপ আছে “সন্ধ্যের আড্ডা”। সম্প্রতি কথা উঠেছে ‘সন্ধ্যে’ বানানটা নিয়ে ! বানানটির শুদ্ধ রূপ কোনটি ? “বাংলা একাডেমি ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান” গ্রন্থে “সন্ধ্যা, সন্ধ্যে, সন্ধে” তিনটি বানানই আছে। কিন্তু কোনটি কেন কী পরিচয়ে আছে, তার নির্দেশনা নেই। প্রসঙ্গত “সন্ধ্যা, সন্ধে, সন্ধ্যে” তিনটি বানানের ব্যাবহারই আমরা বাংলা ভাষায় দেখতে পাই।
 
(ক) সন্ধ্যা – পরিচ্ছেদ নাহি সন্ধ্যা দিবসরজনি। (মুকুন্দরাম, ১৬০০)। এক সন্ধ্যা ভক্ষ যদি থাকে তার ঘরে। (আলাওল, ১৮৬০)। ব্যাকরণ-সিদ্ধ “সন্ধ্যাবেলা, সন্ধ্যাকাল, সন্ধ্যাকাশ, সন্ধ্যাতারা, সন্ধ্যাদীপ, সন্ধ্যাপূজা, সন্ধ্যাফুল, সন্ধ্যাবন্দনা, সন্ধ্যাসব, সন্ধ্যারাগ” এরকম আরো বেশ কিছু শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষায় আছে।
 
(খ) সন্ধে – সন্ধের সময় এক ছেট লোহার সিন্দুক চুরি গিয়াছে। (ক্যালকাটা গেজেট, ১৮০০)। যেতে যেতে সন্ধে হবে খড়কেডাঙার হাটে। (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩৭)। ব্যাকরণ-সিদ্ধ “সন্ধেবেলা, সন্ধেতারা, সন্ধেদীপ” এসব যুক্ত-বানান ব্যবহারও দেখা যায়।
 
(গ) সন্ধ্যে– সন্ধ্যে বেলা ব্রহ্মসভায় মিটিং ও ক্লাবে হাঁফ ছাড়েন। (কালীপ্রসন্ন সিংহ, ১৮৬১)। কার কি জানি কখন সন্ধ্যে হয়। (দ্বিজেন্দ্রলাল, ১৮৯৭)। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি যে সন্ধ্যে হয়েছে।(প্রমথ চৌধুরী, ১৯২৭)। তবে ব্যাকরণ-সিদ্ধ ‘সন্ধ্যে’ বানান-ব্যবহার আমার চোখে পড়েনি। এছাড়া এই শব্দের উপভাষা ও আঞ্চলিক কিছু ব্যবহারও রয়েছে। যেমন, “কি দিয়ে মেরেছিল রে সন্দে বেলা“। (বিভূতিভূষণ, ১৯২৯)।
অতএব ব্যবহারিক বিবেচনায় আমরা “সন্ধ্যা, সন্ধ্যে, সন্ধে” তিনটিকেই শুদ্ধ বলে ধরে নিতে পারি। তবে ব্যাকরণ-সিদ্ধ তথা সন্ধি বা সমাসবদ্ধ পদ করার ক্ষেত্রে “সন্ধ্যা, সন্ধে” ব্যবহারই প্রচলিত। অবশ্য ‘সন্ধ্যে’ শব্দের ‘য-ফলা’ উঠিয়ে ‘সন্ধে’ করার একটা যুক্তি আছে; তা হল, তৎসম ‘সন্ধ্যা’ থেকে তদ্ভব ‘সন্ধ্যে’, এর কোমল রূপ ‘সন্ধে’ ব্যবহার করা, অর্থ্যাৎ ‘সন্ধ্যা’>‘সন্ধ্যে’>‘সন্ধে’। যদিও এমনটা সর্বত্র প্রযোজ্য বা ব্যবহৃত নয়।
 
বাংলাভাষায় ‘ধৈ’ বা ‘ধ্যৈ’ ক্রিয়ামূলের কিছু শব্দ দেখা যাক ‘সন্ধ্যা’=বি. { সম্+√ধৈ+অ(অঙ্)+আ(টাপ্)}। ‘ধ্যান’=বি. {√ধ্যৈ+অন(ল্যুট্)}। ‘বিন্ধ্য’=বি. { বি+√ধ্যৈ+অ(ড)}। ‘ধ্যেয়’=বিন. {√ধ্যৈ+য(যৎ)}। ‘ধ্যাত‘=বিন. {√ধ্যৈ+ত(ক্ত)}। ‘ধী’=বি. {√ধ্যৈ+(ক্বিপ্)}। ‘সুধা’=বি. {সু+√ধ্যৈ+অ(অঙ্)}। এখানকার প্রায় শব্দেরই কিন্তু কোমল রূপ হয় না। তাছাড়া এই ‘ধৈ’ বা ‘ধ্যৈ’ ক্রিয়ামূলের শব্দগুলোর ‘ধ’ ও ‘য-ফলা’ সাধারণত অক্ষুণ্ণ থাকে। তবুও শব্দান্তে অনুচ্চারিত ফলার একটা যথাযথ ব্যবহার-বিধি যদি বাংলা একাডেমি প্রণয়ন করতো, তবে আমরা এসব জটিল বিষয়ের সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।
 
০৩.
‘সন্ধ্যা’ শব্দটি নিয়ে আরেকটু কথা, সেটা হল: ‘সন্ধ্যা’ বলতে আমরা বুঝি “দিন ও রাতের মিলনকাল” অর্থাৎ “দিনের শেষ এবং রাতের শুরুর সমন্বিত ক্ষণ”। এই অর্থটার আমূলে একটা গোল রয়ে গেছে। এই ‘গোলটা’ ধরা পড়ে যখন ‘ত্রিসন্ধ্যা’ বা ‘সন্ধ্যাত্রয়’ শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করি। ‘ত্রিসন্ধ্যা’ বা ‘সন্ধ্যাত্রয়’ বলতে বুঝায় “প্রাতঃকাল, মধ্যাহ্ন, সায়ংকাল”। অতএব ‘সন্ধ্যা’ বলতে শুধু “দিন ও রাতের মিলনকাল” নয়, “যে-কোনো দুটি কাল বা সময়ের মিলনকাল”। আরেকটু গভীরভাবে দেখলে বলতে হয় “দুটি অবস্থার মিলনকাল”। কারণ, দুটি সময় মূলত ভিন্ন ভিন্ন দুটি অবস্থার কথাই বলে। আবার অর্থগত দিক বিবেচনায় “সন্দেহ>সন্ধ্যা”। সন্দেহযুক্ত বলেই কিন্তু ‘সান্ধভাষা’। ‘সন্দে/সন্দেহ’ হল যে মিশে আছে, আর ‘সন্ধে’ হল যে মিশ্রণকে ধারণ করে আছে। ‘দ’ হল ‘যে-দেয়’ আর ‘ধ’ হল ‘যে-ধারণ-করে’। যেমন “জ্ঞান দেয় যে= জ্ঞানদ”, “জল দেয় যে=জলদ”; “জল ধরে রাখে যে=জলধি”, “মগরা রয় যেখানে= মগধ”। ‘দান’ থামলে পরে ‘ধন’। সন্ধ্যা এর মধ্যকার ‘ধ’ বর্ণটি ‘ধারক’ এর প্রতীক। যেমন : ‘ধ’ করে যে= ধক। ‘ধ’ অন (on) যেখানে= ধন। ‘ধ’ পালিত যেখানে= ধপ। দেখা যায়, অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ ধ্বনি কেবল উচ্চারণ ও বনানের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অর্থের বেলায়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
 
০৪.
ভাষার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যেক সৃষ্ট ‘শব্দ’ ও ‘শব্দের অর্থ’-এর একটি ভাষিক ও নৈতিক যুক্তি আছে। এমনকি এর একটি দৃশ্য-কল্পচিত্র এবং শ্রবণ-কল্পচিত্রও আছে। প্রত্যেক শব্দ ও শব্দের অর্থের সাথে অন্তর্গত সম্পর্কটি থাকে বর্ণের। আমরা যাকে ‘বর্ণ’ বলি, ভাষার নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসে এই ‘বর্ণ’ হল ‘রঙ’। প্রথম প্রাচীন চীন ও পেরু দেশে রশ্মিতে বিভিন্ন ‘রঙ’ করে ঘটনার ইমেজ ধরে রাখা হত, এবং ঘটনা অনুযায়ী ‘গিট্ঠু’ দেয়া হতো। কালের পরিক্রমায় সেই ‘রঙ’>‘বর্ণ’ আর ‘গিট্ঠু’>‘গ্রন্থ’ হয়েছে। আর আমরা যাকে ‘শব্দ’ বলি তা মূলত ‘ধ্বন্যাত্মক-শব্দ’ (onomatopoetic-sound), আর যাকে ‘ধ্বনি/ধ্বনিগুচ্ছ’ বলি তা হল ‘ধ্বন্যাত্মক-শব্দাংশ’ (onomatopoetic-syllable)।
 
ধরা যাক “খাবারের জন্য পাখির ছানাগুলো চীৎকার করছে”। এখানে চিৎকার/চীৎকার শব্দটি এসেছে ‘√চিৎ’ থেকে। ‘চিৎ’ হল এমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা, যখন বক্ষদেশ উপরে থাকে। কোনো প্রাণীর চিৎকার-অবস্থায় এমনটা দৃশ্যমান হয়। ‘√চিৎ’ থেকে এলে ‘চিৎকার’ লিখব, কিন্তু ‘চীৎকার’ কেনো লেখা হয়? এখানে একটা মজার বিষয় হলো, ‘চিৎকার’ শব্দের উৎসমূলে রয়েছে মূলত ‘চী’ ধ্বন্যাত্মক-শব্দ। পাখির ছানা ক্ষুধায় ‘চী চী’ থেকে ‘চীৎকার’; আর ক্ষুধার যাতনায় জোরে এবং দীর্ঘ শব্দ করে বলেই ‘চি’ নয় ‘চী’, এজন্য ‘চীৎকার’ লিখি। আর চিৎ হয়ে ডাক-করে বলে ‘চিৎকার’ অথবা ছোট বাচ্চা ডাকতে ডাকতে চিৎ হয়ে যায় বলে ‘চিৎকার’ লিখি। বাংলাভাষার প্রত্যেক শব্দ ও শব্দের পেছনে এমন এক বা একাধিক মজার ব্যাপার আছে।
 
*
খুব বিচ্ছিন্ন ভাবেই প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক বা অল্প-প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বললাম। বললাম এইজন্য যে, যাতে ‘বর্ণ-শব্দ-ভাষা’ এর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ আরো বাড়ে এবং আমরা আরো দায়িত্বশীল হয়ে উঠি। এমন না হয় যে, “একটা লিখলেই হল”। এই হেয়ালীপনায় পৌঁছে ভাষার সম্মানবোধ নিজের ভেতর থেকে যেন উবে না যায়।
 
এই পোস্টের সংযোগ
https://draminbd.com/বাংলা-একাডেমির-দায়-এবং/
 
 
 
error: Content is protected !!