বাংলা কি সিয়েরা লিওন-এর দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা?

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমার জ্ঞানমতে, এমন কোনো তথ্য বাংলাদেশ সরকারের জানা নেই। অথচ, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে আমি প্রশাসনে কাজ করে আসছি। এরূপ কোনো প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকার কখনো সিয়েরা লিওন সরকারের কাছে পাঠায়নি। পাঠাবেনই বা কেন? এমন কোনো হেতুর তো উদ্ভব হয়নি। আর সিয়ের লিওন সরকারই বা বাংলাকে কেন রাষ্ট্রভাষা করতে যাবে? ওখানকার কেউ তো বাংলায় কথা বলে না। একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার যেসব কারণ থাকে এবং যেসব প্রাসঙ্গিক কাজ করতে হয় তা কখন হলো? কীভাবে হলো? এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বা সরকারিভাবে কখনও কিছু বলা হয়েছে- এমন কিছু আমার জানা নেই।
জনাব Morshed Alam -এর ‘বাংলা সিয়েরা লিওন-এর দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা নয়’ শিরোনামের যযাতির পরিপ্রেক্ষিতে শুবাচে বিষয়টি আলোচনায় আসে। আলোচনা এবং মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যের এক পর্যায়ে বিভিন্ন উপায়ে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি। আমার ঘনিষ্ঠ স্বজন এবং বিশ্বস্ত মাধ্যম ও সূত্রে সিয়েরা লিওনে খবর নিয়ে জানতে পারি— তাদের রাষ্ট্রভাষা দুটি। একটি ইংরেজি এবং অন্যটি ক্রিয়ো। তবে ইংরেজি ভাষাই বহুল প্রচলিত। বাংলা ওই দেশের রাষ্ট্রভাষা এটি ঠিক নয়।
শুবাচের অন্যতম সঞ্চালক প্রমিতা তার গবেষণার অংশ হিসেবে সিয়েরা লিওনের ত্রাণমিশন বীক্ষণ করতে গিয়েছিল। তার অভিমত, “বাংলা সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রভাষা— এটি হাস্যকর। নিশ্চয় কেউ উপহাস করে বলেছে। বাংলা সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রভাষা নয়। সে নিশ্চিত করেছে, “এমন কোনো ঘোষণা সম্পর্কে সিয়েরা লিওনের কেউ অবহিত নন।” শুবাচের অন্যতম অ্যাডমিন মিশুর মন্তব্যও অনুরূপ।
এই প্রসঙ্গে, শুবাচের অন্যতম উপদেষ্টা জনাব খুরশেদ আহমদের মন্তব্য পরিষ্কার। শুবাচে তিনি মুরশেদ আলমের যযাতিতে মন্তব্য জানালায় লিখেছেন, “২০১৫ সালে আমি সিয়েরা লিওনে বেড়াতে গেছি। আমার বউ তখন—ইবোলা মহামারির সময়— ইউএনউইমেন সিয়েরালিওনে কাজ করে। ওদেশে বাংলা ভাষার সরকারি মর্যাদা সম্পর্কে ওখানকার লোকজনদের জিজ্ঞেস করেছি। প্রশ্নটি শুনে ওরা আকাশ থেকে পড়েছে। এ-ব্যাপারে ওরা কিছুই জানে না।ওটা পাকিস্তানি এক ওয়েবসাইটের বানানো গুজব মাত্র, যা এখন পল্লবিত হয়ে উইকিপিডিয়া ও বাংলাদেশের পাঠ্য বইকেও সংক্রমিত করেছে।ভাইরাস সম্পর্কে সতর্ক থাকুন— সেটা ইবোলা হোক, করোনা হোক, কিংবা হোক পাকিস্তানি ভাইরাস!”
মুরশেদ আলম লিখেছেন,  ‘বাংলা’ সিয়েরা লিওন-এর দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা নয় । এ সম্পর্কিত কোন অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট আমার চোখে পড়েনি। মূলত পাকিস্তানি একটি নিউজ পোর্টাল (www.dailytimes. com.pk) প্রকাশিত সংবাদপত্রের উপর ভিত্তি করে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে । Bangla Made One of The Official Languages of Sierra Leone – 2002-12-27 এই শিরোনামে নিউজ পোর্টালটি গুজবটি ছড়ায়। পরবর্তীকালে ওই পোর্টালটি এটি সরিয়ে নেয়। আফসোস! আমাদের দেশীয় কিছু গণমাধ্যম এর পাশাপাশি ;উইকিপিডিয়া ও এই ভুল তথ্যটি এখন পর্যন্ত আপডেট রেখেছে ।”
জনাব  Zakaria Ahsan এর মন্তব্য,  আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসি ও সম্মান করি। কোনো দেশের দ্বিতীয় ভাষা বাংলা হোক কিংবা না হোক তাতে আমাদের মাতৃভাষার সম্মান ও মর্যাদা কোনো অংশে কমে যাবে না। খুবই আশ্চর্যের বিষয়, এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই জনগণের মুখেমুখে এমনকি পাঠ্যবই পর্যন্ত সয়লাব হয়ে গেছে।”
অতএব, গুজবে কান দিলেও কানে গুজব দিয়ে নিজের কান এবং পুরো অস্তিত্বকে গুজব বানিয়ে ফেলবেন না। বাংলা এমন একটি বিশ্ববিস্তৃত ও অপরিসীম সৃজনশীলতার অধিকারী ভাষা, যার মর্যাদা সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হওয়া বা না হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বাংলা তার সৃষ্টিতে এতই সমুজ্জ্বল যে, যে-কোনো বিবেচনায় সে অতুলনীয়।
—————-

All Link

error: Content is protected !!