বাংলা বর্ণমালার বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

অভিজিৎ অভি, শুদ্ধ বানান চর্চা শুবাচ

একশ্রেণির বাঙালি বাংলা বানান শিখতে পারুক বা না পারুক, বাংলা বর্ণমালা নিয়ে তাদের বেজায় আপত্তি। তারা নানা রকম বৈজ্ঞানিক যুক্তি হাজির করে, কিছু বর্ণ সংযোজন ও বিয়োজনের প্রস্তাব দেয়, বর্ণমালাকে পুরোপুরি পাল্টে ফেলতে চায়।

তাদের দাবি অনুযায়ী:

১। ই,ঈ এর মধ্যে একটা থাকাই যথেষ্ট।
২। উ,ঊ এর ক্ষেত্রেও একটা রাখা হোক।
৩। ণ,ন এর একটা থাকা উচিত।
৪। শ,ষ,স এর একটা থাকলেই হয়।
৫। ঙ,ং দুটির কী প্রয়োজন?
৬। বাংলায় অ্যা ধ্বনি আছে কিন্তু বর্ণ নেই। অন্তঃস্থ ব থাকলেও তা দেখতে এবং উচ্চারণে বর্গীয় ব এর মত। তাই এই দুটিকে নতুন কোন প্রতীক দ্বারা বর্ণমালায় স্থান দেওয়া যায়।
৭। ঋ কে ব্যঞ্জনবর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। ঋ কার তুলে দিয়ে র-ফলা হ্রস্ব ই কার ব্যবহার করা।
৮। বাংলা যুক্তবর্ণের অস্বচ্ছ রূপ দূর করে যথাসম্ভব দুটি বর্ণের পূর্ণপ্রতীক লিখে প্রকাশ করা হোক।
৯। কিছু বর্ণ পূর্ণমাত্রা, কিছু অর্ধেক, কিছু মাত্রাহীন; এমন বিড়ম্বনা বাদ দিয়ে সব পূর্ণমাত্রা বা সব মাত্রাহীন করা উচিত।
১০। জ,য এর একটা থাকুক।
প্রভৃতি প্রভৃতি………

এই সবগুলো দাবিই যুক্তিপূর্ণ, এর পিছনে ধ্বনিবিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ যুক্তি প্রদর্শন করা যায়। কোন আবেগ বা তর্ক দিয়ে এসব যুক্তি খণ্ডন করা যায় না। তাহলে কেন এই মুহূর্তেই আমরা এই সংস্কারগুলো সাধন করে বাংলা বর্ণমালার বৈপ্লবিক যুগান্তরে পদক্ষেপ গ্রহণ করছি না?

প্রথম কথা, আমি প্রাচীনপন্থী এবং ভাষার এমন সংস্কারের বিরোধী। আপনারা যারা বলবেন আমার কথা হচ্ছে “সব মানি কিন্তু তালগাছ আমার” টাইপের, তাদের প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই। তাদের যুক্তি খণ্ডনের উপযুক্ত বক্তব্য নেই আমার কাছে। আমি কেবল আমার অভিমত ব্যক্ত করতে চাই। কারও দাবিকে হেয় করে নয়, কারও যুক্তিকে ভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নয়- কেবল নিজের মতটুকু প্রকাশ করতে চাই।

ভাষা ও সাহিত্য বৈজ্ঞানিক যুক্তি দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবীর কোন ভাষার বর্ণমালা এতটা মেপে তৈরি করা হয়নি যে, কেবল যতগুলো ধ্বনি আছে ততগুলোই বর্ণ আছে। এমন হলে পৃথিবীর সব ভাষার বর্ণমালায় বর্ণের সংখ্যা সমান বা কাছাকাছি হতো।
একটি ধ্বনির জন্য একাধিক বর্ণের উপস্থিতি কোন ভাষাতেই বিরল নয়। তাই বলে কি সব ভাষা তাদের বর্ণবর্জন করে বর্ণমালা খাটো করে ফেলছে? হাতের পাঁচটা আঙুল কাজে লাগে না বলে নিশ্চয় আমরা একটি কেটে বাদ দিতে চাই না!

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালায় উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন। তিনি ৠ, ৡ বর্ণদ্বয় বর্জন করেন এবং ড়, ঢ়, য় প্রভৃতি বর্ণ সংযোজন করেন। অনুস্বার, বিসর্গ ও চন্দ্রবিন্দুকে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় নিয়ে আসেন। এগুলো বাংলা বর্ণমালায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন, এর আগে বাংলা মূলত বর্ণমালা সংস্কৃতের অনুরূপ ছিল। বাংলার আধুনিক যুগের প্রারম্ভে, আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছেন, তেমন কোন যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটানোর অধিকার বর্তমান যুগের প্রত্যেকের থাকা উচিত নয়। নদীতে বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ১০০ বছরে একবার নেওয়া যায়, প্রতিদিন নদীর ভিন্ন ভিন্ন তটে বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া বাতুলতা।

আপনার যুক্তিগুলো আমি জানি- বিদ্যাসাগর যতটা বাংলা জানেন, আপনি তার চেয়ে কম জ্ঞানী নন। বাংলা ভাষা বিদ্যাসাগরের একার সম্পত্তি নয় যে কেবল উনি এর সংস্কার করতে পারবেন, অন্য কেউ পারবে না। বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের যে অধিকার বিদ্যাসাগর বা বাংলা একাডেমির আছে, তা আপনারও আছে। সুতরাং আপনার প্রস্তাবে আমি আপত্তি করার কে?

তবে ব্যাপারটা এই যে, আপনার একজনের কথা শুনতে গেলে বাকি দশজনেরটাও শুনতে হয়। এরকম নিত্যনতুন পরিবর্তন ভাষার স্বাভাবিক গতিশীলতা নষ্ট করে। নদীর গতিপথের মত ভাষা প্রাকৃতিকভাবেই পরিবর্তিত হয়, অযথা বর্ণমালা সংস্কার করে এর স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করা কি ঠিক? উপরে যেসব পরিবর্তনের দাবি বলা হল, সেগুলো করলেই কি এই মানুষগুলোর ভাষাসংক্রান্ত সব আপত্তি মিটে যাবে? আমার মনে হয় না, এগুলো পূরণ করা হলেও নানা আপত্তি ও নতুন নতুন পরিবর্তনের দাবি উঠবে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেলে বাংলার স্বাভাবিক রূপের বিলুপ্তি সুনিশ্চিত। চিরপরিচিত বাংলা দেখতে তখন অচেনা মনে হবে।

মা দেখতে বিশ্বসুন্দরী না হলেও আমরা মাকে ভালবাসি, প্লাস্টিক সার্জারি করে মায়ের মুখ বদলাতে চাই না। মাতৃভাষাকেও মায়ের মতই ভালবাসতে হবে, বর্ণ শব্দ লিপি ঘষামাজা করে তার পরিচিত উজ্জ্বল মুখটি পাল্টানো কি ঠিক হবে?
তাহলে বাংলা একাডেমি যে পরিবর্তনগুলো করছে সেগুলোর ব্যাপারে? আমার মনে হয় বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার কোন পরিবর্তন আনছে না, যেসব শব্দের একাধিক বানান প্রচলিত সেগুলোর একটিকে প্রমিত করছে মাত্র। বানান প্রমিত করা আর বর্ণ বর্জন করা এক বিষয় নয়। বর্ণমালা ভাষার একটি ভিত্তিস্বরূপ, এই ভিত্তিকে যেনতেনভাবে না নাড়ানোই ভাল।

বর্তমানে বাংলায় যে বর্ণগুলো আছে, সেগুলো দিয়ে আমরা ঠিকভাবে সকল শব্দ লিখতে পারছি এবং বিদেশী যে কোন ভাষার শব্দও প্রতিবর্ণীকৃত করতে পারছি। সুতরাং আমাদের আর কী চাই? নিজেদের বানান মনে থাকে না বলে ভাষার অঙ্গহানির প্রস্তাব করতেও আমরা কুণ্ঠিত হব না?

প্রিয় মাতৃভাষার অনাকাঙ্ক্ষিত রূপবিকৃতি দেখতে চাই না বলেই এই কথাগুলো বলা। যদি ছোটমুখে অসঙ্গত কিছু বলে থাকি, তবে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।

সূত্র : শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বাংলা শেখার প্রয়োজনীয় লিংক

error: Content is protected !!