বাংলা বাংলিশদের নিয়ে নষ্টামি

জাহিদ হোসাইন

বর্তমান বাংলাদেশে কিছু চ্যানেলে বাংলিশ উপস্থাপনার জয় জয়কার চলছে। এ ক্ষেত্রে উপস্থাপিকাদের দৌরাত্ম্য যেন একটু বেশী। এক নি:শ্বাসে কয়েক

জাহিদ হোসাইন

হাজার শব্দের প্রক্ষেপণ ঘটায় তারা। তাতে কোনো বিরাম চিহ্নের প্রতিক ধরতে হলে একজনকে নতুন করে বাংলিশের ক,খ,গ,ঘ,ঙ উচ্চারণভঙ্গি রপ্ত করতে হবে। অবশ্য বিষয়টা খুব কঠিন বলে মনে হয় না। শুধু ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে কোনো একটির আশেপাশে কিছুদিন আসা-যাওয়া করলেই হবে। কারণ সেসব ক্যাম্পাস নামক পাখির বাসাগুলোতে সারাক্ষণ  ওই সব বাংলিশ সাধনা চলে।

যেহেতু বাংলিশ বাংলারই অস্বাভাবিক ও বিকৃতরূপ তাই একজন বাঙালির কাছে এটা রপ্ত করা মরিচ পুড়ে পান্তাভাত খাওয়ার মতো সহজ ব্যাপার। প্রথম দুএক দিন একটু সমস্যা হয়তো হবে। তথাপি একজন গ্রাম থেকে আসা লোক ওই সব বিদ্যাপিঠের নিকট থেকে গমন করলে তাকে ওই সব বোঝার চিন্তায় ফেলবে এবং সহসা বলে উঠবে এটা কি বাইল্লার (বাবুই পাখী) বাসা নাকি। কারণ শব্দগুলো আসে ওপর থেকে। নিচে কাঁচাবাজার, রিক্সার গ্যারেজ কিংবা ভাঙারির দোকান আর উপরে কিচিরমিচির শব্দ। তার জ্ঞাত বিশ্ববিদ্যালয় তো এমন পরিবেশে হওয়ার কথা না! তাই ওপরে অবশ্যই পাখির বাসা জাতীয় কিছু হয়তো হবে, ভাবনা তার মানসপটে ভেসে ওঠবে। দু-তিনদিন বাদে যখন সেই লোকটি অর্থহীন ওই শব্দগুলো ধরে ফেলতে পারবে তখন সেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলিশ বাচনভঙ্গি শুরু করে দেবে। কারণ বাংলিশের মধ্যে অসংখ্য ভুলভাল ইংরেজি শব্দ  থাকে।

কার্যত নতুন হাটে ওঠা কেউ একজন অজানা কিছুর সামনে পড়লে তা মহৎ কিছু মনে করে। তাই বাংলিশ বচনের মহত্ব কম হওয়ার কথা নয় তার মনে।নিশ্চয় ভেবে বসবে যে বলছে বাংলা কিন্তু শুনতে ইংরেজির মতো লাগছে! বেশ এটাই তো চাই। গ্রামে ফিরে এসব বলব, আর লোকেরা যতই শুনবে ততই চমকিত হবে। মূলত অতিঅল্প সময়ে শিক্ষিত হিসাবে স্বীয় সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কম আনন্দের কথা নয়। অতএব চালাও মন্টু ঘোড়া নাই কুত্তার কান্দে দে গাড়ির জোয়ালটা। কথাগুলো বলার হেতু হচ্ছে সেদিন শুনি একজন উপস্থাপিকা গায়ক আসিফের নাম বলছে অ্যাজইফ (As if)! এটার কারণ বোধহয় বাক্যস্থিত পদগুলোকে ইংরেজি শব্দ ভঙ্গিমা দ্বারা প্রয়োগের, ভাদ্রা-কুকুরের পিছনের জ্বালার মতো তীব্র মানসিক আকাঙ্ক্ষা।

বস্তুত এই সমস্যাগুলো আজ নতুন কিছু নয় এদেশে। আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন দেখতাম শিক্ষিত লোকেরা হুদাকামে ইংরেজি শব্দ বাংলা বাক্যের মধ্যে কথার ফাঁকে ঠুকিয়ে দিচ্ছেন। একদিন আমাদের এক শিক্ষক বলছেন, “তোমরা দুপুর আড়াইটায় অবশ্যই এখানে আসবা আমার টাইম কম, ওয়েট করতে পারব না বেশি, আন্ডারস্টুড”? তৃতীয় শ্রেণির একজন ছাত্রের জন্য ওই স্যার কতটুকু শিক্ষা এখানে দিয়েছিলেন ওই সময়ের প্রেক্ষাপট বিচার করলে যে কেউ তা বুঝতে পারবে। কারণ সে সময়ে মিডিয়াভিত্তিক সংস্কৃতি এ দেশে ছিল না। তাই ইংলিশের ছড়াছড়িও এত ছিল না এদেশে।

আসলে এই ধরনের ইংরেজি চর্চাই বাংলিশের জন্মদান করেছে এই বাংলায়। দান করেছে অকৃপণ ও উদারহস্তে নানা রঙে রঙিলা ইংলিশ বাচনভঙ্গির বাংলা শব্দসমূহ। ওপার বাংলার অবস্থা আরও খারাপ বা বলা যায় বাদুড় বরাবর, না পাখি না পশুর মতো শোচনীয়। ওরা বাংলাকে হিংলা (হিন্দি+বাঙলা) ও বাংলিশ দুটি ভিন্ন ধাতুসূত্র দ্বারা গঠিত এক ধরনের আশ্চর্য-মলম বানিয়ে পাগলা মলম বরাবর অন্যের কর্ণকুহরে ছুড়ে দেয়। ইংলিশ আন্তর্জাতিক ভাষা, সেটাকে রপ্ত করা ফরজে আইন আর রাষ্ট্রভাষা বাংলা নফল বা মুস্তাহাব যারা মনে করেন তাদের জন্য মন্তব্য হলো, যে সব উন্নত দেশে মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তারা কিন্তু বাঙালির মতো নিজের ভাষাকে ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে বহুবিবাহিত পুরুষের মতো বড়ো বউ মনে করে না। তারপরও তারা উন্নত এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে ইংরেজিওয়ালাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশিই যেমন চিন, জাপান, কেরিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি।

অন্যদিকে বাংলা শুদ্ধভাবে লেখা বা বলার কোনো রাষ্টীয় বাস্তব কার্যক্রম এ দেশে নাই। যা আছে তার কোনো পদ্ধতিগত শিক্ষার প্রয়োগ সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাতে প্রায় অনুপস্থিত। সব ভাষাতেই উচ্চারণের কিছু ব্যাকরণ থাকে। বাংলাতেও তা আছে কি না তা প্রায় সবার অজানা। বাংলা বানানরীতিও স্কুলে সঠিকভাবে শিখানো হয় না। অথচ ভুল আরবি উচ্চারণে কোরান পাঠ করলে উল্টাপাল্টা অর্থ দাঁড়ায় তাই কারিয়ানা শিক্ষা ব্যবস্থা এদেশে চালু আছে। কিন্তু দেখা যায় শুদ্ধ করে বাংলা বলতে পারে না অথচ শুদ্ধ আরবি উচ্চারণের ব্যর্থ চেষ্টা চলে এদেশের গ্রামগঞ্জের মাদ্রাসাগুলোতে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মাতৃভাষার উচ্চারণ সঠিক না হলে কখনোই দ্বিতীয় কোনো ভাষা শুদ্ধ হয় না। বাস্তবে তাই দেখেছি যে একজন সঠিক উচ্চারণে বাংলা বলতে পারা লোক সুন্দর উচ্চারণে আরবি কিংবা ইংলিশ বলছেন।

বস্তুত শুদ্ধ বা প্রমিত উচ্চারণ যে কোনও ভাষার মূলভিত্তি সমূহের একটি সে সম্পর্কে ভাসা-ভাসা ধারণাই বাঙালিকে বাংলিশ নামক গণিকা-সুধা পানে প্রলুব্ধ করে। আর নিজের শোবার ঘরের চেয়ে মাঝে মধ্যে বেশ্যালয়ে গমনে যে অভিনব আনন্দ থাকে তা একজন অপরিণামদর্শীর কাছে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: জাহিদ হোসাইন, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)।


All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

error: Content is protected !!