বাংলা বানান: শব্দের অপপ্রয়োগ প্রয়োগ ও প্রমিত প্রয়োগ

ড. মোহাম্মদ আমীন

অশ্রুজল:অনেকে বলেন ‘অশ্রুজল’ শব্দটি বাহুল্য ও অপপ্রয়োগ। এ প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য ‘অশ্রু’ ও ‘জল’ সমার্থক। ‘অশ্রু’ ও ‘জল’ পৃথকভাবে সমার্থক হলেও ‘অশ্রুজল’ ভিন্ন অর্থদ্যোতক একটি নতুন শব্দ। তাই  ‘অশ্রুজল’ শব্দটি বাহুল্য— এটি  আদৌ ঠিক নয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘অশ্রুজল’ শব্দটিকে প্রমিত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ওই অভিধানমতে শব্দটির অর্থ— চোখের জল। তাই নির্দ্বিধচিত্তে ব্যবহার করুন ‘অশ্রুজল’।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ও বইমেলা : বই আর গ্রন্থ পরস্পর সমার্থক। তাই ‘বইমেলা’ মানে ‘গ্রন্থমেলা’। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বই নিলয়’ রাখা হলে সেটিকে `Book House’ বলা যায় না, তেমনি বলা যায় না ‘গ্রন্থ নিলয়’।কেননা, ‘নাম’ হচ্ছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচায়ক, এর কোনো ভাষান্তর সাধারণত হয় না। এটি কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুকেই নির্দেশ করে। সমার্থ শব্দ নিয়ে কোনো নামকে প্রকাশ করা মানে, ওই নামকে বিকৃত করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বইঘর’ হলে তাকে কেউ ‘গ্রন্থঘর’ বলে না, বলা হয় না ‘পুস্তকঘর’ কিংবা পুথিঘর বা বুকহাউজ, এমন বলাও উচিত নয়; কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে পরিচালিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আমাদের অনেকের মুখে ‘বইমেলা’ হয়ে যায়।‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ একটি নাম। এটাকে বিকৃত করে ‘বইমেলা’ বলা সমীচীন নয়। তারপরও বলে যাচ্ছি। এটি আমাদের ঐতিহ্য ও স্বকীয়তার দুর্বল একটা দিক।

আন্তর্জাতিক: অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক শব্দটির আভিধানিক অর্থ— জাতির অন্তর্গত বা জাতির অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কিত। এজন্য International, বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধীয় প্রভৃতি অর্থে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটির ব্যবহার শুদ্ধ নয়। তাদের এ দাবি সম্পূর্ণ ভুল এবং হাস্যকর। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘আন্তর্জাতিক(অন্তর্জাতি+ইক)’ শব্দের অর্থ— বিশেষণে বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধনীয় (International)। যেমন: জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক[বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধনীয় (International)] সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। একই অভিধানমতে, বাংলায় আন্তর্জাতিক শব্দটির অর্থ— ‘সার্বরাষ্ট্রিক’। যেমন: জাতিসংঘ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং International, বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধীয় প্রভৃতি অর্থে আন্তর্জাতিক শব্দের ব্যবহার শুদ্ধ সিদ্ধ ও প্রমিত।

একুশে ফেব্রুয়ারি: কেউ কেউ বলেন— ২১শে ফেব্রুয়ারি মানে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ নয়। তাদের মতে— এখন এই ২১ সংখ্যাটিকে যদি বানান করে লেখা হয় তাহলে হবে ‘একুশ’। এর সাথে যখন ‘শে’ যুক্ত করা হয় তখন সংখ্যাটি হয় ‘একুশশে’ অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ২১০০তম দিনে ভাষাশহিদেরা

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

জীবন দিয়েছেন – যা সম্পূর্ণ ভুল। তাই সঠিক বানান হবে ২১এ ফেব্রুয়ারি। এটি একটি প্রচলিত হাস্যকর ধারণা। ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, একুশে ফেব্রুয়ারি বা ২১শে ফেব্রুয়ারি শুদ্ধ সিদ্ধ ও প্রমিত।

কাব্যগ্রন্থ:    প্রচলিত ধারণার উপর নির্ভর করে অনেকে বলে থাকেন— কবিতার বই অর্থে ‘কাব্যগ্রন্থ’ শব্দটি বাহুল্য, তাই অপপ্রয়োগ। কিন্তু অভিধান তা বলে না। ‘কাব্য’ অর্থ কবিতা এবং ‘কাব্যগ্রন্থ’ অর্থ কবিতার বই। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ‘কাব্যগ্রন্থ’ অর্থ— কবিতার বই।তারপরও অনেকে বলেন— কবিতার বই অর্থে ‘কাব্যগ্রন্থ’ লেখা বাহুল্য এবং অপপ্রয়োগ।  তা ঠিক নয়। কবিতার বই অর্থে ‘কাব্যগ্রন্থ’ শব্দের প্রয়োগ শুদ্ধ, সিদ্ধ ও প্রমিত।
 
কেবলমাত্র:  ‘কেবল’ ও ‘মাত্র’ শব্দদ্বয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রায় সমার্থক বলে অনেকে মনে করেন— ‘কেবলমাত্র’ শব্দটি বাহুল্য। আমিও তাই মনে করতাম। শিক্ষকবৃন্দ আমাকে ওভাবে শিখিয়েছেন। এখন দেখি — ‘কেবলমাত্র’ শব্দ বাহুল্য বা অসিদ্ধ হলে বাংলার আরও অনেক শব্দ বাহুল্য বা অশুদ্ধ হয়ে যাবে।‘কেবলমাত্র’ শব্দটি কেবল ‘কেবল’ ও ‘মাত্র’ দুটি অভিন্ন অর্থ-দ্যোতক শব্দ দিয়ে গঠিত একটি দ্বিত্ব শব্দ, তাই শব্দটিকে এরূপ অন্যান্য সঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা না করে সরাসরি বাহুল্য বলা সমীচীন নয়। এটি একটি নতুন শব্দ এবং সর্বপ্রথম, অশ্রুজল, বাসাবাড়ি প্রভৃতির মতো নতুন অর্থদ্যোতক শব্দ। ‘কেবলমাত্র’ একটি শব্দদ্বিত্ব বা দ্বৈতশব্দ বা দ্বিরুক্তি। সুতরাং এটি ভুল বা অসিদ্ধ কিংবা বাহুল্য নয়। বিশেষ অর্থ প্রকাশের জন্য যেসব শব্দ দুইবার ব্যবহৃত হয় তাদের মধ্যে ‘কেবলমাত্র’ অন্যতম একটি বিশেষ অর্থজ্ঞাপক। 

ধূমপান নিষেধ: কেউ কেউ বলেন, ‘ধূমপান নিষেধ’, ‘প্রবেশ নিষেধ’ প্রভৃতি বাক্যে ‘নিষেধ’ শব্দটি অপপ্রয়োগ। এই অনেকের বক্তব্য

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

ব্যাকরণমতে আদৌ ঠিক নয়। এক্ষেত্রে ‘নিষেধ’ ও ‘নিষিদ্ধ’ দুটোই শুদ্ধ সিদ্ধ ও প্রমিত।বরং ‘নিষেধ’ শব্দটি যেমন বহুল প্রচলিত। তেমনি ব্যাকরণগতভাবেও শুদ্ধ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] গ্রন্থে ‘নিষেধ’ শব্দটিকে বিশেষ্যও বলা হয়েছে আবার বিশেষণও বলা হয়েছে। সে হিসেবে ‘ধূমপান নিষেধ’‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ দুটো প্রকাশভঙ্গিই শুদ্ধ। তাহলে, কোনটি লিখব? যে-কোনো একটি লিখতে পারেন।তবে, আমি লিখি- নিষেধ

বিরাট গোরু ছাগলের হাট: কেউ কেউ বলেন, “বিরাট গোরু ছাগলের হাট”, ‘‘খাঁটি গোরুর দুধ” প্রভৃতি অশুদ্ধ ও অপপ্রয়োগ।তাদের মতে এগুলোর শুদ্ধ প্রয়োগ হবে যথাক্রমে, “গোরু ছাগলের বিরাট হাট” এবং “গোরুর খাঁটি দুধ”। তাদের এ বক্তব্য আদৌ ঠিক নয়। ব্যাকরণগতভাবে “গোরু ছাগলের বিরাট হাট” এবং “গোরুর খাঁটি দূধ” কথাগুলো যেমন শুদ্ধ তেমনি “বিরাট গোরু ছাগলের হাট” ও “খাঁটি গোরুর দুধ” কথাগুলোও শুদ্ধ। ‘‘খাঁটি গোরুর দুধ’’ একটি বহুল প্রচলিত বাক্য। এই বাক্যে বিশেষ্য ‘গোরু’ নয়, ‘গোরুর দুধ’ এবং বিশেষণ হচ্ছে ‘খাঁটি’। তাই বাংলা ব্যাকরণের নিয়মানুসারে ‘খাঁটি’ শব্দটি ‘গোরুর দুধ’ কথার আগে বসবে। “খাঁটি গোরুর দুধ” বাক্যটিকে “কী খাঁটি?” প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায় ‘‘গোরুর দুধ”; সংস্কৃতে যাকে বলা হয় গোদুগ্ধ। অতএব “খাঁটি গোরুর দুধ” কথাটি অশুদ্ধ বলা যায় না। তেমনি “বিরাট গোরু ছাগলের হাট” বাক্যে বিশেষণ হচ্ছে ‘বিরাট’ এবং বিশেষ্য হচ্ছে ‘গোরু ছাগলের হাট’। এ বাক্যকে ‘‘কী বিরাট?” প্রশ্ন করলে উত্তর আসে, “গোরু ছাগলের হাট”। সুতরাং এ বাক্যটিকেও অশুদ্ধ বলার কোনো যুক্তি নেই।

শহিদ মিনারশহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নির্মিত মিনার বা শহিদদের নিমিত্ত মিনার বা শহিদের স্মরণে মিনার— প্রভৃতি অর্থ প্রকাশের জন্য ‘শহিদমিনার’ বা ‘শহিদ মিনার’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। তাই সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে শহিদমিনার হবে, শহিদ মিনার নয়। কারণ  সমাসবদ্ধ শব্দে ফাঁক

রাখা যায় না। তাই ‘শহিদ মিনার’ কথাটি শুদ্ধ নয়। শুদ্ধ হবে ‘শহিদমিনার’ বা ‘শহিদ-মিনার’। তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। ‘শহিদ মিনার’ কথাটি অশুদ্ধ নয়, বরং ব্যাকরণগতভাবে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও প্রমিত। কারণ, এটিও সমাসবদ্ধ পদ। সমাসবদ্ধ পদকে ফাঁক রেখে লিখলে তাকে বলা হয় অসংলগ্ন সমাস। যেমন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, নিখিল ভারত মুসলিম যুব সংহতি প্রভৃতি।

সঠিক:সঠিক’ শব্দটির ব্যবহারে অনেকের আপত্তি দেখা যায়। তারা মনে করেন, ‘সঠিক’ শব্দটির স-বর্ণটি বাহুল্য। তাই শব্দটির প্রয়োগ সমীচীন নয়। প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে সৃষ্ট একটি অপরিপক্ব ধারণা থেকে তারা এমন মন্তব্য করে থাকেন। বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান

ড. মোহাম্মদ আমীন

উভয়মতে ‘সঠিক’ শব্দটি পুরোপুরি সঠিক। তাই নির্দ্বিধচিত্তে লিখুন সঠিক শব্দের ব্যবহার পুরোপুরি সঠিক। 

সূর্য উঠা : অনেকে বলে থাকেন ‘‘পূর্বদিকে সূর্য ওঠে’’ বাক্যে ‘ওঠে’ শব্দটির প্রয়োগ অশুদ্ধ। তাদের মতে— সূর্য ওঠে না, উদিত হয়। তাই এখানে ‘উদিত হয়’ লিখতে হবে। অভিধার্থ বিবেচনায় তাদের এ ধারণা অশুদ্ধ  এবং হাস্যকর। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ‘উঠে’ শব্দের একটি প্রধান অর্থ উদিত হওয়া। তাই ‘‘পূর্বদিকে সূর্য উদিত হয়” এবং ‘‘পূর্বদিকে সূর্য ওঠে/উঠে” উভয় বাক্য শুদ্ধ সিদ্ধ ও প্রমিত।
সূত্র: সমার্থক ও সমোচ্চারিত শব্দের অর্থভেদ: প্রয়োগ ও প্রমিত প্রয়োগ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
বাংলা ভাষার মজা, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
———————————————————–

All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত বাংলা বানান বিধি : বানান শেখার বই

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

প্রশাসনিক প্রাশাসনিক  ও সমসাময়িক ও সামসময়িক

বিবিধ এবং হযবরল : জ্ঞান কোষ

সেবা কিন্তু পরিষেবা কেন

ভাষা নদীর মতো নয় প্রকৃতির মতো

এককথায় প্রকাশ

error: Content is protected !!