বাংলা বানান সংস্কার: প্রমিত বানান কথার জন্ম ও বর্তমান হালচাল (১৯৩০ থেকে ২০২০)

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রমিত বানানের জন্মদাতা: ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট ভাষা অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসাবে ২ বছরের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যোগদানের অল্প কয়েক দিন পর অ্যাকাডেমিক সভা ডেকে তিনি বাংলা চলিত বানান প্রমিত করার প্রস্তাব করেন। এই সভায় তিনি প্রমিত বানানের স্বরূপ ও প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেন। সভায় উপস্থিত সবাই অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে সহমত পোষণ করেন।
 
প্রমিত বানান বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব:  ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। অনুমোদিত প্রস্তাবের অনুকূলে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গবেষণা সহকারীর একটি পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তৎপরিপ্রেক্ষিতে গবেষণা সহকারী পদে বিজনবিহারী ভট্টাচার্যকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। বিজনবিহারীর সহযোগিতায়  অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি প্রমিত (আদর্শ বা মান) বানান প্রতিষ্ঠার  লক্ষ্যে বেশ কিছু  সুনির্দিষ্ট খসড়া প্রস্তাব পেশ করেন।
 
কেন্দ্রীয় বানান সংস্কার সমিতি গঠন: রবীন্দ্রনাথের খসড়া প্রস্তাব পর্যালোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে রাজশেখর বসুকে সভাপতি, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক এবং প্রমথ চৌধুরী ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-সহ ১১ জন পণ্ডিতকে সদস্য করে কেন্দ্রীয় বানানসংস্কার সমিতি গঠন করা হয়।
 
কেন্দ্রীয় পরিভাষা কমিটি:  প্রমিত বানানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও বিষয়ভিত্তিক শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে  রাজশেখর বসুকে সভাপতি ও চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় পরিভাষা সমিতি গঠন করা হয়।
 
সমিতির কার্যপ্রণালি ও জরিপ: কেন্দ্রীয় বানান সংস্কার সমিতি রবীন্দ্রনাথের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর  বানান সংস্কার বিষয়ে  সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতামত গ্রহণের জন্য প্রশ্নমালা তৈরি করেন। প্রায় তিন শতাধিক লেখক ও অধ্যাপকের নিকট  প্রশ্নমালা প্রেরণ করে লিখিত মতামত প্রদানের অনুরোধ করা হয়। তন্মধ্যে ২০৩ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত মতামত পাওয়া যায়।
 
 
বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকার প্রথম সংস্করণ:  প্রাপ্ত ২০৩টি লিখিত মতামত এবং নানা জনের  মৌখিক মতামত পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় বানানসংস্কার সমিতি ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই মে ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ শিরোনামের  একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। যা প্রথম সংস্করণ নামে পরিচিত।  এটিই হচ্ছে প্রচলিত বাংলা বানান সংস্কার করে  প্রমিত বাংলা বানান প্রতিষ্ঠার প্রথম লিখিত ও সুস্পষ্ট বিধি। এটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পক্ষেবিপক্ষে তুমুল আলোচনা, পর্যালোচনা ও কঠোর সমালোচনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে মারাত্মক গালি বিনিময় শুরু হয়।
 
বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকার দ্বিতীয় সংস্করণ: কেন্দ্রীয় বানান সংস্কার সমিতি বানান বিষয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, আলোচনা, পর্যালোচনা, সমালোচনা, কঠোর সমালোচনা, গালি এবং মৌখিক আলোচনায় প্রকাশিত মতামত আর নানাভাবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট লেখাসমূহ বিশ্লেষণ করে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবর ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে এই সংস্করণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর রাখা হয়।
 
বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকার তৃতীয় সংস্করণ: জরিপ-মতামত-সহ খ্যাতিমান লেখকবৃন্দের সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও  নানা মহল থেকে বাংলা বানানের নতুন নিয়ম  নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক এবং কোথাও কোথাও আগের মতো  কড়া সমালোচনা অব্যাহত থাকে। সমিতি বাংলা বানানের নতুন নিয়ম নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা-সমালোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক পর্যালোচনা করে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে মে ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকার তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।
 
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে মে দীর্ঘ পাঁচ বছর অবধি বিভিন্ন জনের মতামত বিবেচনা করে তৃতীয় সংস্করণে প্রমিত বাংলা বানানের  বিধান দেওয়া হয়েছিল। ওই বিধানে কিছু বিকল্প বানান অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে  বলা হয়েছিল, তারা আস্তে আস্তে এই নতুন বানানে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। বিকল্প বানান বহাল রাখায় নম্বর কাটা যাওয়ার আশঙ্কা  ছিল না। সে থেকে নানা   আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক বা ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও বিগত একশ বছর  বিকল্প বানান নিয়ে ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকার নিয়মাবলি বাংলা প্রমিত বানান হিসাবে অধিকাংশ মানুষের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু গোল বাঁধায় পরবর্তী ধাপ।
 
বানান সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপ ও প্রমিত বানানের বর্তমান হালচাল
 পাঠপুস্তকে বাংলা বানান সমতাবিধানের উদ্যোগ:  ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে অক্টোবর এনসিটিবি’র উদ্যোগে ইউনিসেফের সহায়তায় কুমিল্লার বার্ড-এ ‘সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বানানের সমতাবিধান-বিষয়ক জাতীয় কর্মশিবির’  অনুষ্ঠিত হয়।  কর্মশিবির সফল করার জন্য ১১২ জন  কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও গবেষককে ৩ দিনের জন্য কুমিল্লায় বার্ড-এ নিয়ে যাওয়া হয়।
 
এনসিটিবির নতুন বানান বিধি: ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে অক্টোবর সকালে কর্মশালা শুরু হয়। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে অক্টোবর বিকেলে  বুদ্ধিজীবীরা ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকায় নির্দেশিত  কিছু কিছু বিধান পরিবর্তন এবং কিছু কিছু বিষয়ে  পরিপূরক বিধান প্রদান করে পাঠ্যপুস্তক রচনার জন্য একটি নতুন বানানবিধি জারি করে। নাম দেওয়া হয় পাঠ্য বইয়ের বানান। রবীন্দ্রনাথ ও কেন্দ্রীয় বানান সংস্কার সমিতির যে কাজটি করতে লেগেছে পাঁচ বছর, বাংলাদেশের কয়েকজন তা করে ফেলল মাত্র তিন দিনে। হাতি ঘোড়া গেল তল, চামচিকা বলে কত জল।
 
কার-চিহ্ন ও যুক্তব্যঞ্জনের অস্পষ্ট রূপ বর্জন:  বার্ড-এ অনুষ্ঠিত তিন দিনের  কর্মশালায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কোনো চিন্তা না করে  কারচিহ্ন ও যুক্তবর্ণের অস্পষ্ট রূপকে যথাসম্ভব বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ব্যঞ্জনের সঙ্গে কার-চিহ্ন যুক্ত হওয়া ৬টি টাইপ এবং ব্যঞ্জনের সঙ্গে ব্যঞ্জন ও তার সঙ্গে কার-চিহ্ন যুক্ত হওয়া ৩৬টি যুক্তবর্ণের টাইপ-সহ  মোট ৪২টি টাইপের আকৃতি পরিবর্তন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
 
 বানান জটিলতার স্বরূপ:  বাংলা ভাষায় কমপক্ষে সাড়ে বারো হাজার শব্দের বানানে পরিবর্তিত ৪২টি টাইপ ব্যবহার  করতে হয়। যা মাত্র তিন দিনের আলোচনায় পরিবর্তন করে ফেলার সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। ফলে শুরু হয় বানান বিপর্যয়।  এদিকে এনসিটিবির এক পাঠ্য পুস্তকের সঙ্গে অন্য পাঠ্যপুস্তকের; অন্যদিকে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে এনসিটিবির বাইরে প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্যকর্ম, পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য প্রকাশনার বানানে মারাত্মক সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি হয়। যা বাংলা বানানে সৃষ্টি করে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা ও অপরিমেয় অরাজকতা। বাংলা বানান পড়ে যায় মাৎস্যন্যায়-এর মতো যথেচ্ছাচারের কবলে। এ সুযোগে যে যেমন ইচ্ছা বানান লিখতে শুরু করে।
 
‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ পুস্তিকা: ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ই ফেব্রুয়ারি সর্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অধ্যাদেশ পাশ (অ্যাক্ট নাম্বার ২৭, ১৯৯০) পাশ হয়। এনসিটিবি তা বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দেয় সরকার।  ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের অনুষ্ঠিত কর্মশালায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনসিটিবি ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ পুস্তক প্রকাশ করে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্টীকৃত  ৪২টি টাইপের অস্পষ্ট রূপ শিক্ষার্থীদের না শেখানোর অনুকূলে অনড় সিদ্ধান্ত নিয়ে পাঠ্যবই প্রণয়ন করার প্রয়াস নেয়।
 
এনসিটিবি বনাম বাংলা একাডেমি সাংঘর্ষিকতার চূড়ান্ত রূপ:  অন্যদিকে, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে  বাংলা একাডেমি ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিাক প্রকা করে।  একাডেমির এই পুস্তিকায় এনসিটিবির কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কিছু বর্জন ও কিছু নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।  অধিকন্তু, একাডেমি কারচিহ্ন ও যুক্তবর্ণের স্পষ্টরূপ ব্যবহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে অভিধানে  প্রচলিত ‘অস্পষ্ট’ রূপ  চালু রাখে।ফলে এনসিটিবি ও বাংলা একাডেমির বানানবিধি পড়ে যায় সংঘর্ষের কবলে। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে নভেম্বর বাংলা একাডেমি ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকা  সংশোধন ও পরিমার্জন করে। এই পুস্তিকায়  কার-চিহ্ন ও যুক্তবর্ণের ‘অস্পষ্ট’ প্রচলিত রূপ বহাল রাখে। ফলে এনসিটির বানানবিধি আরও অগ্রহণীয় হয়ে পড়ে।
 
পাঠ্য বইয়ের বানান পুস্তিকার সংশোধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ: ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের  নভেম্বর মাসে  এনসিটিবি ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ পুস্তকের সংশোধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করে। এখানে  ১৫ বছর আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে  শিক্ষার্থীদের কার-চিহ্ন ও যুক্তবর্ণের পূর্বতন ‘অস্পষ্ট’ রূপকে পরিবর্তিত ‘স্পষ্ট’ রূপের পাশে শেখানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে, একাডেমির অনুসরণে কিছু শব্দের বানান আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
 
 
পাঠ্য বইয়ের বানান পুস্তিকার মৃত্যু:  ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকার পরিমাজিত সংস্করণ প্রকাশ করে। এই সংস্করণে পূর্বে নির্দেশিত  বানানবিধির সংশোধন ও পরিমার্জন-সহ কিছু বিকল্প বানান ব্যবহারের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। অন্যদিকে সরকারের নির্দেশে এনসিটিবি নিজের বানানবিধি বাতিল করে একাডেমির বানানবিধি অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।  এসব কারণে বানানে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তার দায় এখনো আমাদের বহন করে যেতে হচ্ছে।
 
সাম্প্রতিক বাংলা বানান:  ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে  বিকল্প  বানান বাদ দিয়ে নতুন অভিধান প্রণয়ন করা হয়। বিকল্প বানান বাদ দেওয়ায় বাংলা বানানে আদর্শ মান প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। তবে, এখানে এমন কিছু বানান পরিবর্তন করা হয় যা ইতোঃপূর্বে অন্য কোনো অভিধানে ছিল না। আবার এমন কিছু বানানকে অভিধান হতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, যা অন্যান্য অভিধানে রয়ে গেছে। অভিধানটিতে একাডেমি প্রণীত বানানবিধি নিয়েও কিছু সাংঘর্ষিকতা রয়েছে। সাংঘর্ষিকতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভাষা বিষয়ে সবকিছু গণিতের মতো গাণিতিক হয় না। কিছু সাংঘর্ষিকতা থাকলেও, আমি মনে করি এটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অভিধানসমূহের মধ্যে সেরা একটি অভিধান।
 
একটি উদাহরণ:
বাংলা একাডেমির সর্বশেষ অভিধান, ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’। এই গ্রন্থে ‘ব্যবহারিক’ বানানের কোনো শব্দ কেউ পাবেন না। ওই অভিধানমতে, এই অর্থে একমাত্র শুদ্ধ ও প্রমিত বানান— ‘ব্যাবহারিক’। আপনি ‘ব্যবহারিক’ শব্দটি যেখানেই পেয়ে থাকুন না কেন,যতবারই লিখে থাকুন না কেন, বাংলা একাডেমির সর্বশেষ সিদ্ধান্তমতে, এটি প্রমিত নয়— ভুল, অসিদ্ধ ও অশুদ্ধ ঘোষিত পরিত্যক্ত শব্দ। তাই তাদের সর্বশেষ অভিধানে ‘ব্যবহারিক’ শব্দটিকে স্থান না-দিয়ে একমাত্র ‘ব্যাবহারিক’ শব্দটিকে শুদ্ধ ও প্রমিত ঘোষণা করা হয়েছে। আগের বহুল প্রচলিত ‘ব্যবহারিক’ এখন পরিত্যক্ত— ক্ষমতায় ব্যক্তি পরিবর্তনের কারণে প্রশাসনে ব্যক্তির পদহরণরীতি শব্দকেও রেহাই দিল না। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির মন্তব্য কিন্তু অযৌক্তিক নয় বেশ যৌক্তিক। তাদের মতে— ইক-প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দের প্রথম বর্ণের অ-কার পরিবর্তন হয়ে আ-কার হয়ে যায়। যেমন: বর্ষ+ইক = বার্ষিক; মঙ্গল+ইক= মাঙ্গলিক।
প্রশ্ন আসতে পারে— ‘ব্যবহারিক’ অশুদ্ধ হলে এতদিন বাংলা একাডেমির অভিধানে ছিল কেন? হঠাৎ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে এসে কেন তাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলো? ইক-প্রত্যয়ের অনেক ব্যতিক্রম তো রয়েছে, এটিও তো থাকতে পারত— অন্তত অভিধানে রাখা যেত। এর উত্তরে বাংলা একাডেমির বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাকাতুয়ার মতো বলতে পারি — ব্যবহারিক বানান ভুল ছিল। ভুল না-হলে বাংলা একাডেমি ‘ব্যবহারিক’ শব্দটিকে তাদের সর্বশেষ অভিধানে রাখত।”
 

বাংলা বানান সংস্কার: ‘প্রমিত বানান’ কথার জন্ম ও বর্তমান হালচাল (১৯৩০ থেকে ২০২০)

 লিংক: https://draminbd.com/বাংলা-বানান-সংস্কার-প্রম/

 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
 
লিংক:  https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-5/
 
 
লিংক: https://draminbd.com/শুদ্ধ-বানান-চর্চা-শুবাচ-থ-4/
 
 
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
১, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
২. বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
৩. কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!