বাংলা ব্যাকরণ অভিধান: ব্যাকরণ অভিধান: একমলাটে ব্যাকরণ অভিধান

ড. মোহাম্মদ আমীন 

ব্যাকরণ অভিধান

পৃষ্ঠা ১  : অ

পৃষ্ঠ ২  : আ

পৃষ্ঠা ৩  : ই

পৃষ্ঠা ৪  : ঈ

পৃষ্ঠা ৫  : উ

পৃষ্ঠা ৬  : ঊ

পৃষ্ঠা ৭  : ঋ

পৃষ্ঠা ৩  : এ

পৃষ্ঠা ৮   : ঐ

পৃষ্ঠা ৯   : ও

পৃষ্ঠা ১০  : ঔ

পৃষ্ঠা ১১  : ক

পৃষ্ঠা ১২  : খ

পৃষ্ঠা ১৩  : গ

পৃষ্ঠা ১৪  : ঘ

সংযোগ: https://draminbd.com/বাংলা-ব্যাকরণ-অভিধান-ব্য/

অ১ : ‘অ’ বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ। নাম স্বরে-অ। বর্ণটি বাংলা বর্ণমালার মৌলিক স্বরধ্বনি ‘অ’-এর লিখিত প্রতীক। উচ্চারণ বিবেচনায় ‘অ’ নিম্নমধ্য, অর্ধবিবৃত, পশ্চাৎ, বর্তুল ও কণ্ঠ্য— বিভিন্ন প্রকার হয়। স্বরধ্বনির শ্রেণিবিভাগে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ‘অ’ এবং অ-কারের দুই প্রকার উচ্চারণ বাঙ্গালায় পাওয়া যায়। (১) সাধারণ উচ্চারণ— অনেকটা ইংরেজি ষধ,ি পধঁমযঃ-এর স্বরধ্বনির মতো; যেমন— কথা, চলা, অধীর ইত্যাদি। ইহাই বাঙ্গালা ‘অ’ এর স্বকীয় উচ্চারণ। (২) ও-কারের উচ্চারণ—সাধারণত; পরবর্তী অক্ষরে ‘ই’ বা ‘উ’ ধ্বনি থাকিলে, বা য-ফলা অথবা ‘ক্ষ [ = বাঙ্গালা উচ্চারণে খ্য]’ থাকিলে, অ-কার ও-কারবৎ উচ্চারিত হয়; যেমন— অতি [= ওতি], বসু [বোশু]; ‘সে করে’ কিন্তু ‘আমি করি [ = কোরি]’ ই-কার থাকায় এখানে অ-এর ও-ধ্বনি; ‘চলুক [ = চোলুক], ‘সত্য [ = শোত্তো], ‘তাৎপর্য [ = তাৎর্পোজো]’ প্রভৃতি।— সুনীতিকুমার।
বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণে একটি স্বরধ্বনি ‘অ’ নিহিত থাকে এবং ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ সাধারণত একটি ‘অ’ যোগে সম্পন্ন হয়। তাই স্বরধ্বনি ‘অ’-এর কোনো পৃথক স্বরচিহ্ন নেই। শব্দের প্রথমের ‘অ’ এবং শব্দের মধ্যে নিহিত ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘অ’ অথবা ‘ও’— এই দুরকম হতে পারে। শব্দশেষের নিহিত ‘অ’ প্রায়শ ‘ও’ উচ্চারিত হয়।
যেমন— ‘অ’ : অনল, অমিল। যেমন প্রথমে ‘ও’ : অতিওতি; রবি রোবি। যেমন মধ্যে ‘অ’ : বিবর্ণ; অকর্ণ; কিংকর। যেমন মধ্যে ‘ও’ : কলমকলোম; চরণচরোন। যেমন শেষে ‘ও’ : আমন্ত্রিত আমোন্ত্রিতো; বাহিতবাহিতো।
‘অ’ এবং নিহিত ‘অ’ কখন, কীভাবে উচ্চারিত হবে (অর্থাৎ ‘অ’ হবে, না ‘ও’ হবে), তা শব্দের অন্যান্য ধ্বনির ওপর নির্ভর করে। তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যতিক্রমহীন নিয়ম করা যায় না।
শব্দের প্রথমের ‘অ’ যদি নঞর্থক উপসর্গ হয় [দেখুন- অ২], তখন তার উচ্চারণ ‘অ’, ‘ও’ নয়। যেমন- অদৃশ্য (ওদৃশ্য নয়); অতুল (ওতুল নয়); অনবরত (অনোবরোতো ওনোবরোতো নয়)।
বাংলায় অনেক ক্ষেত্রেই শব্দমধ্যের কিংবা শব্দশেষের ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণে নিহিত ‘অ’ বাদ যায় এবং হসন্ত উচ্চারিত হয়। তবে এর জন্য কোনো হস্চিহ্নের দরকার হয় না। যেমন- বাদলা বাদ্লা; ম্র্রিয়মাণ ম্রিয়োমাণ্; অন্ধকার অন্ধোর্কা; টনটন টন্টন্; চরকা র্চকা। [দেখুন- স্বরবর্ণ; স্বরধ্বনির শ্রেণিবিভাগ]।

অ২ : বাংলা উপসর্গ। সাধারণত ‘না’ কিংবা ‘নয়’ প্রকাশের জন্য শব্দের আগে অ উপসর্গ যুক্ত করা হয়। অন্য কয়েকটি অর্থেও এর ব্যবহার আছে। যেমন- নয় অর্থে : অদৃশ্য (দৃশ্য নয়); অমুসলিম (মুসলিম নয়); অবাঙলি (বাঙালি নয়); অযোগ্য (যোগ্য নয়); যেমন- খারাপ অর্থে : অবেলা (খারাপ বা অপ্রকৃষ্ট সময় বা বেলা); অকাজ (খারাপ বা নিষ্ফল কাজ); অকথা (খারাপ কথা); নেই অর্থে : অমিল (মিল নেই); অনামা (নাম নেই); অবনিবনা (বনিবনা নেই); অশান্তি (শান্তি নেই বা শান্তির অভাব); অখুশি (খুশির অভাব)। যেমন- প্রকৃষ্ট অর্থে : অঘোর (বেশিরকম ঘোর); অকুমারী (দুটো অর্থেই ব্যবহৃত হয় কুমারী নয় অথবা প্রকৃষ্ট কুমারী)। এ উপসর্গের আরও নানা ধরনের প্রয়োগ আছে। যেমন- অমূল্য (মূল্য নিরূপণ করা যায় না অর্থাৎ খুব দামি); অগুন্তি (এত বেশি যে গুনে শেষ করা যায় না)। [দেখুন- নঞ্ তৎপুরুষ]।

অ৩ : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। প্রত্যয়টি যুক্ত করে ধাতু থেকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য সৃষ্টি হতে পারে। স্বরান্ত ধাতুর সঙ্গে এ প্রত্যয় যুক্ত হয় না। যেমন- মিশ্ + অ = মিশ (তেলে জলে মিশ খায় না); জিৎ + অ = জিত (হারজিত জীবনে থাকবে); র্হা + অ = হার (হার জয়ের স্তম্ভ); দুল্ + অ = দোল (দোল দোল দোলুনি, রাঙামাথায় চিরুনি)। [দেখুন- কৃৎপ্রত্যয়]।

অ৪ : সংস্কৃত কৃৎপত্যয় অঙ্, অচ্, অঞ্, অণ্, অপ্, ক, কঞ্, কপ্, খ, খচ্, খল্, খশ্, ঘ, ঘঞ্, ট, টক্, ড, শ প্রভৃতি প্রত্যয় থেকে ধাতুর সঙ্গে কেবল ‘অ’ যুক্ত হয়। এ বিচারে ‘অ’-কে প্রত্যয়ও বলা যেতে পারে। অঙ্, অচ্ ইত্যাদি অনুবন্ধ যুক্ত রূপ বা প্রত্যয়ের নাম। অনুবন্ধ বাদ দিলে কেবল ‘অ’ থাকে। [উদাহরণের জন্য অঙ্, অচ্ ইত্যাদি দেখুন]।

অ৫ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় অচ্, অঞ্, অণ্, অৎ, ক, টচ্, ডট্, ণ প্রভৃতি প্রত্যয় থেকে শব্দের সঙ্গে কেবল ‘অ’ যুক্ত হয়। এজন্য ‘অ’-কে একটি তদ্ধিত প্রত্যয় বলা যেতে পারে। উল্লিখিত প্রত্যয়গুলো অনুবন্ধ যুক্ত রূপ। অনুবন্ধ বাদ দিলে কেবল ‘অ’ থাকে। [উদাহরণের জন্য অচ্, অঞ্ ইত্যাদি দেখুন।]

অ৬ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে সন্-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে দ্বিতীয় যে ধাতু তৈরি হয়, তার সঙ্গে অ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন- পা + স (সন্) = পিপাস্ + অ = পিপাস। কিন্তু এ ধরনের শব্দ বাংলায় দেখা যায় না। এর সঙ্গে স্ত্রী-প্রত্যয় ‘আ’ যুক্ত করে যে রূপটি হয় সেটি বাংলা শব্দ হিসাবে গণ্য করা হয়। যেমন- পা + স (সন্) = পিপাস্ + অ  পিপাস + আ = পিপাসা; দৃশ্ + স (সন্) = দিদৃক্ষ্ + অ  দিদৃক্ষ + আ = দিদৃক্ষা; তিজ্ + স (সন্) = তিতিক্ষ্ + অ  তিতিক্ষ + আ = তিতিক্ষা। এছাড়া অ-প্রত্যয়ের অন্য ব্যবহারও আছে। যেমন- লজ্ + অ = লজ্জ + আ  লজ্জা; শিক্ষ্ + অ = শিক্ষ + আ  শিক্ষা। [দেখুন- প্রত্যয়, সন্, কৃৎপ্রত্যয়, স্ত্রী-প্রত্যয়]।

অ৭ : অ-বর্গে জাত শব্দবংশের তালিকা অংশ্, অঙ্ক্ (অন্ক্), অঞ্চ্ (অন্চ্), অঞ্জ্ (অন্জ্), অঙ্গ্ (অন্গ্, অম্), অট্, অণ্, অত্, অদ্, অন্ (অন্ধ্, অন্ধ্), অব্, অম্ (অন্গ্, অন্ত্), অর্চ্ (অর্চ, ঋচ্) অর্জ্ (অজ্র্, ঋজ্), অর্থ্, অর্হ্, অল্, অশ্, অস্, অ; মোট ১৯ + ১।
অংশ সম্বন্ধ : সম্বন্ধিত পদ সম্বন্ধপদের অংশ, প্রত্যঙ্গ বা ওই জাতীয় কিছু হলে সম্বন্ধটিকে বলা হয় অংশ সম্বন্ধ বা অঙ্গ সম্বন্ধ বা অঙ্গাঅঙ্গি সম্বন্ধ। চোখের পাতা এখানে সম্বন্ধপদ ‘চোখের’; পাতা চোখেরই একটা অংশ সম্পূর্ণ জিনিসটা হলো চোখ। তাই, সম্বন্ধপদটি সমগ্র অথবা সম্পূর্ণ, আর সম্বন্ধিত তার কোনো অংশ হলে, তাকে বলে অংশ সম্বন্ধ এভাবেও বলা চলে। যেমন- মনের মানুষ, কলিজার টুকরা, হাতের আঙুল; সম্বন্ধপদ হাতের; সম্বন্ধিত আঙুল এবং আঙুল হাতেরই অংশ। এরকম- পুকুরের পানি, মানুষের মন, গাছের শিকড়, পাখির ঠোঁট, জামার বোতাম, চোখের মণি। [দেখুন- সম্বন্ধ পদ]

অক১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ক্বুন্, গ¦ুল, ®ু^ণ্ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ধাতুর শেষে ‘অক’ যুক্ত হয়। এ সমস্ত প্রত্যয়ের অনুবন্ধহীন রূপ হলো অক। যেমন- আ- মল্ + অক (ক্বুন্) = আমলক;  অল্ + অক (ক্বুন্) = অলক; অংশ্ + অক (ণ্বুল্) = অংশক; রন্জ্ + অক (®ু^ণ্) = রঞ্জক।

অক২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় অকচ্, ড্বুন, বুঞ্ (বন্), ষ্কন্ প্রত্যয় শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দশেষে ‘অক’ হয়। যেমন- শনৈস্ + অক (অকচ্) = শনকৈস্  শনকৈঃ (মন্দ); পশ্চাশৎ + অক (ড্বুন্) + আ (টাপ্) = পঞ্চাশিকা; আচার্য + অক (বুঞ্ বা বুন্) = আচার্যক; পথিন্ + অক (ষ্কন্) = পথিক।
অকচ্ (অক) : সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়। অনুবন্ধহীন রূপ (অক)। যেমন- শনৈস্ + অক (অকচ্) = শনকৈস্  শনকৈঃ (মন্দ)।
অকর্তৃক ক্রিয়া : অনেক ক্রিয়াপদের কর্তা থাকে না বা থাকলেও নির্ণয় করা যায় না। এরূপ ক্রিয়াপদকে অকর্তৃক ক্রিয়া বা কর্তাহীন ক্রিয়া বলে। যেমন- ভয় করছে, শীত করছে, গরম লাগছে, খিদে পেয়েছে, মেঘ করেছে। অকর্তৃক ক্রিয়ার সঙ্গে সম্বন্ধসূচক বিভক্তিযুক্ত বা ষষ্ঠীবিভক্তি-যুক্ত, কর্তা-স্থানীয় পদ যুক্ত হতে পারে। এরকম কর্তাকে বলা হয় প্রতীয়মান কর্তা। যেমন- তার ভয় করছে। আমাদের লজ্জা করে। মীমের খিদে পেয়েছে। [দেখুন- ক্রিয়া]
অকর্মক ক্রিয়া : যে ক্রিয়ার কর্ম নেই এবং কর্ম থাকাও সম্ভব নয়, তাকে বলা হয় অকর্মক ক্রিয়া। এ ধরনের ক্রিয়ায় কেবল ঘটনাটা বোঝায়, কার অথবা কীসের ওপর তা ঘটছে এসবের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। যেমন- হাসান যায়। “সে আসে ধীরে যায় লাজে ফিরে” রবীন্দ্র। জাহাজ জলে ভাসে। এখানে ‘যায়’, ‘আসে’, ‘ভাসে’ প্রভৃতি ক্রিয়াপদগুলো অকর্মক ক্রিয়া। অনেক সময় সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম ঊহ্য থাকতে পারে। ‘তুমি কি খেয়েছ?’ ‘যে সহে সে রহে’ ইত্যাদি বাক্যের ক্রিয়াপদ ‘খেয়েছ’ কিংবা ‘সহে’-র কোনো কর্ম নেই। কিন্তু ক্রিয়া দুটি সমর্থক । অর্থাৎ ক্রিয়া ঊহ্য থাকলে তা অকর্মক হয়ে যায় না। [দেখুন- ক্রিয়া; কর্ম; সকর্মক ক্রিয়া; দ্বিকর্মক ক্রিয়া]।

অক্ষর১ : বিস্তারিত দেখুন- দল।

অক্ষর২ : বর্ণ অর্থাৎ ধ্বনির প্রতীককেও অক্ষর বলা হয়। এ হিসাবে অ, আ, ক, খ ইত্যাদি বর্ণ অক্ষর। ফলে অক্ষর ও বর্ণ সমার্থক হয়ে যায়। বাংলায় যুক্তবর্ণকে যুক্তাক্ষর বলাও হয়। অক্ষর শব্দটি দল বা সিলেবল অর্থেও ব্যবহৃত হয়। পারিভাষিক প্রয়োগে একই শব্দের একাধিক অর্থে জটিলতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই এখানে সিলেব্ল নির্দেশে দল, ধ্বনির প্রতীককে বর্ণ ও বর্ণের লিখিত রূপকে অক্ষর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন অক্ষরজ্ঞান, হস্তাক্ষর, আক্ষরিক অর্থ।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ : অক্ষরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধস্বর কখনো একমাত্রা এবং কখনো দুই মাত্রা বহন করে। অর্থাৎ পর্বে মাত্রা গণনা রীতি কোথাও স্বরবৃত্তের আবার কোথাও মাত্রাবৃত্তের মতো বাহিত হয়। বদ্ধস্বর যদি শব্দের প্রথমে বা মাঝে থাকে তবে তা এক মাত্রা কিন্তু শব্দের শেষে অবস্থান করলে দুই মাত্রা বহন করে। এ ছন্দে অক্ষর উচ্চারণের ধ্বনি আচ্ছন্ন করে একটি অতিরিক্ত তান বা সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। ফলে যুক্তাক্ষরবিহীন ও যুক্তাক্ষরবহুল সব চরণই এ ছন্দে দেখা যায়। মন্থর বা ধীর লয় বা গতির এ ছন্দ সাধারণত দুই পর্বের হয় এবং ৬, ৮ ও ১০ মাত্রার পর্বই এ ছন্দে বেশি দেখা যায়। বৈচিত্র্যপূর্ণ নানা ছন্দ এ ছন্দের অন্তর্ভুক্ত।

অক্ষরাত্মক বর্ণ : দেখুন- দলাত্মক বর্ণ।

অক্ষুণ্ন কর্ম : যে কর্মবাচ্য পরিবর্তন করার পরও অভিন্ন থেকে যায়, তাকে বলা হয় অক্ষুণ্ন কর্ম। যেমন- শামীম আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। এ বাক্যে কর্ম ‘আমাকে’ ও ‘অনেক কষ্ট’। বাক্যটির বাচ্য পরিবর্তন করলে হবে শামীমের দ্বারা আমাকে অনেক কষ্ট দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, বাক্যটির এ পরিবর্তিত রূপেও কর্ম দুটি অভিন্ন বা অক্ষুণ্ন আছে। তাই এ দুটি অক্ষুণ্ন কর্ম। [দেখুন- কর্ম]।
অগ্রজিহ্ব্য ধ্বনি : যেসব ধ্বনির উচ্চারণে জিভ মুখের সামনের দিকে এগিয়ে আসে, তাদের অগ্রজিহ্ব্য ধ্বনি বলে। ধ্বনিটির উচ্চারণের সময় এগিয়ে-আসা জিভ কোথায় লাগছে বা আঘাত করছে, সে বিচারে অগ্রজিহ্ব্য ধ্বনিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে : ১. তালুদন্তমূলীয় (জ্, য়্, শ্) ধ্বনি ও ২. অগ্রতালব্য (সংস্কৃত ঞ্) ধ্বনি।
অগ্রতালব্য ধ্বনি : যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ সামনের দিকে এসে তালুর সম্মুখ অংশ স্পর্শ করে, তাকে বলা হয় অগ্রতালব্য ধ্বনি। সংস্কৃত ঞ্-ধ্বনি এ শ্রেণির।

অঘোষধ্বনি : “ধ্বনির গান্তীর্যকে ধ্বনিবিজ্ঞানে বলা হয় ঘোষ” সুনীতিকুমার । যে ধ্বনির উচ্চারণে ঘোষ নেই অর্থাৎ গাম্ভীর্য কম সেটি অঘোষধ্বনি। বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ণের উচ্চারণে যে ধ্বনি তা অঘোষ বা ঘোষহীন। এ বিচারে বাংলা অঘোষধ্বনি হলো : ক্, খ্, চ্, ছ্, ট্, ঠ্, ত্, থ্, প্ এবং ফ্। স্বরতন্ত্রীর কম্পন বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ণের উচ্চারণে যতটা তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ণের উচ্চরণে তা তার চেয়ে বেশি।

অঘোষর্ণ : যেসব ধ্বনির উচ্চারণে ঘোষ নেই, তাদের লেখার জন্য যে প্রতীক বা বর্ণ ব্যবহৃত হয় সেগুলো অঘোষবর্ণ। এগুলোকে শ্বাসবর্ণও বলা হয়। পূর্বে অঘোষধ্বনি ও অঘোষবর্ণ বলতে একই বিষয় বোঝানো হতো। কিন্তু ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য এখন সুনির্ধারিত। তাই অঘোষবর্ণ পরিভাষাটি এখন অপ্রয়োজনীয়। যেমন- ব্যঞ্জনবর্ণ ক, খ, চ, ছ, ট, ঠ, ত, থ, প, ফ-কে অঘোষবর্ণ বলা যায়। অর্থাৎ বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ণগুলো অঘোষ।

অঘোষীভবন : উচ্চারণের কারণে কোনো কোনো ঘোষধ্বনি অঘোষধ্বনিতে পরিণত হয়, এ পরিবর্তনকে বলা হয় অঘোষীভবন। যেমন- কাগজ> কাগচ; বীজ> বিচি।

অঙ্ (অ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ঙ্’ লোপ পায়, ‘অ’ থাকে। এ প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দের সঙ্গে স্ত্রী-প্রত্যয় ‘আ’ যুক্ত করে যে শব্দ হয়, বাংলায় তার ব্যবহার অধিক। যেমন- অনু-জ্ঞা + অ (অঙ্)  অনুজ্ঞ + আ (স্ত্রী-প্রত্যয়) = অনুজ্ঞা; চিন্ত্ + অ (অঙ্)  চিন্ত + আ = চিন্তা; আ- ভা + অ (অঙ্)  আভ + আ = আভা; শ্রদ্- ধা + অ (অঙ্)  শ্রদ্ধা + আ = শ্রদ্ধা।

অঙ্গ : অঙ্গচ্ নামের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়ের অনুবন্ধহীন রূপ।

অঙ্গাঅঙ্গি সম্বন্ধ : দেখুন- অংশ সম্বন্ধ।

অঙ্গচ্ (অঙ্গ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অঙ্গ’ থাকে। যেমন- তৃ + অঙ্গ (অঙ্গচ্) = তরঙ্গ; মদ্ + অঙ্গ (অঙ্গচ্) = মদঙ্গ।

অঙ্গ সম্বন্ধ : দেখুন- অংশ সম্বন্ধ।

অচ্ (অ)১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ব্যবহারের সময় ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অ’ থাকে। যেমন- অংশ + অ (অচ্) = অংশ; হৃ + অ (অচ্) = হর; অঙ্ক্ + অ (অচ্) = অঙ্ক; ভাবি + অ (অচ্) = ভাব;  নন্দ্ + অ (অচ্) = নন্দ; র্চ + অ (অচ্) = চর; র্চু + অ (অচ্) = চোর; জি + অ (অচ্) = জয়; প্র-নী + অ (অচ্) = প্রণয়; বি- নী + অ (অচ্) = বিনয়; স্তু + অ (অচ্) = স্তব।
অচ্ (অ)২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। প্রত্যয়টি যুক্ত হওয়ার পরও শব্দটির কোনো আপাত পরিবর্তন হয় না। যেমন- অঘ + অ (অচ্) = অঘ; অঙ্গ + অ (অচ্) = অঙ্গ। এজন্য একে শূন্যপ্রত্যয় বলাও চলে। তবে প্রত্যয় যুক্ত হওয়র আগে শব্দটি বিশেষ্য, প্রত্যয়যোগে তা হয়ে যায় বিশেষণ। যেমন- কৃচ্ছ্র + অ (অচ্) = কৃচ্ছ্র; শিব + অ (অচ্) = শিব।

অচ : বনচ্ নামের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় থেকে ধাতুর সঙ্গে ‘অচ’ যুক্ত হয়।

অজ্ঞাতমূল ধাতু : বিস্তারিত দেখুন- সিদ্ধধাতু।

অজ্ঞাতমূল শব্দ : বিস্তারিত দেখুন- দেশি শব্দ।

অঞ্ (অ)১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ঞ্’ বাদ যায়, ‘অ’ থাকে। যেমন- উচ্ + অ (অঞ্) = ওঘ।
অঞ্ (অ)২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। ব্যবহারের সময় ‘ঞ্’ বাদ যায়, ‘অ’ থাকে এবং আগের স্বরের বৃদ্ধি হয়। সন্তান-অর্থে এ প্রত্যয়ের ব্যবহার বেশি। যেমন- দুহিতৃ + অ (অঞ্) = দৌহিত্র; পুত্র + অ (অঞ্) = পৌত্র।

অট্১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ‘অটি’ থেকে ধাতুর শেষে ‘অট্’ যুক্ত হয়।

অট২ : ‘অটন্’ নামের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর শেষে ‘অট’ যুক্ত হয়।

অটন্ (অট) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে দন্ত্য-ন্ বাদ যায়, ‘অট’ থাকে। যেমন- কপ্ + অট (অটন্) = কপট; চৃপ্ + অট (অটন্) = চর্পট; ছো + অট (অটন্) + আ = ছটা; শক্ + অট (অটন্) = শকট; বর্ব্ + অট (অটন্) = বর্বট; খব্র্ + অট (অটন্) = খর্বট।
অটি (অট্) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ই’ বাদ যায়, ‘অট্’ থাকে। যেমন- সৃ + অট্ (অটি) = সরট্ (কৃকলাশ)। প্রমিত বাংলায় পদের শেষে হস্-চিহ্ন দেওয়া হয় না।

অঠ (অঠ)১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন— কম্ + অঠ (অঠ) = কমঠ।

অঠ২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় ‘অঠচ্’-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অঠচ্ (অঠ) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অঠ’ থাকে। যেমন- কর্মণ্ + অঠ (অঠচ্) = কর্মঠ।

অণ্ (অ)১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ণ্’ বাদ যায়, ‘অ’ অবশিষ্ট থাকে। সাধারণত পূর্বে কোনো পদ-থাকা ধাতুতে এ প্রত্যয়টি যুক্ত হয় এবং ধাতুর প্রথম স্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন- কুম্ভ- কৃ + অ (অণ্) = কুম্ভকার; গ্রন্থ- কৃ + অ (অণ্) = গ্রন্থকার; তন্তু- বে + অ (অণ্) = তন্তুবায়; পূর্বপদ ছাড়াও এই প্রত্যয়ের অনেক ব্যবহার আছে। যেমন- বহ্ + অ (অণ্) = বাহ; হৃ + অ (অণ্) = হার; পালি + অ (অণ্) = পাল।

অণ্ (অ)২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। প্রয়োগের সময় ‘ণ্’ বাদ যায়, ‘অ’ অবশিষ্ট থাকে এবং শব্দের আদ্যস্বরের বৃদ্ধি হয়। সন্তান, ভক্ত ইত্যাদি অর্থে প্রত্যয়টির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন- গঙ্গা + অ (অণ্) = গাঙ্গ; মনু + অ (অণ্) = মানব; পাণ্ডু + অ (অণ্) = পাণ্ডব; শিব + অ (অণ্) = শৈব; সুমিত্রা + অ (অণ্) = সৌমিত্র। এছাড়া উপসর্গযুক্ত শব্দের সঙ্গেও অণ্-প্রত্যয় যুক্ত হতে পারে। যেমন- বিমাতৃ + অ (অণ্) = বৈমাত্র; সুভ্রাতৃ + অ (অণ্) = সৌভ্রাত্র।

অণ্৩ : অণ্ ক্রিয়ামূলের বংশে জাত শব্দসমূহের তালিকা : অণ্, অণি, অণিমা, অণী, অণীমাণ্ডব্য, অণীয়ান, অণু, অণুবাদ, অণুবীক্ষণ, অণুমাত্র, অণুমাত্রিক, অণুরেণু, অণ্ড, অণ্ডক, অণ্ডকটাহ, অণ্ডকোশ, অণ্ডকোষ, অণ্ডকোষক, অণ্ডজ, অণ্ডজেশ্বর, অণ্ডবর্দ্ধন, অণ্ডবৃদ্ধি, অণ্ডাকার, অণ্ডকাটা, আঁড়রা, আণব, আণবিক, আণ্ডা, আণ্ডিয়া, আণ্ডির, আণ্ড্রা, আণ্ড্রাকাটা, এঁড়ে।
অণুশব্দ : দেখুন এককধ্বনি।

অৎ১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অতি, অতৃন্ ও অতৃ থেকে ধাতুশেষে অৎ যুক্ত হয়।

অৎ২ (অ) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। প্রয়োগে ‘ৎ’ বাদ যায়, ‘অ’ থাকে। যেমন- সপত্নী + অ (অৎ) = সপত্ন (শত্রু, প্রতিপক্ষ)।

অত১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অত, অতক্, অতচ্ থেকে ধাতুর শেষে ‘অত’ যুক্ত হয়।

অত (অত)২ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- কঙ্ক্ + অত (অত) = কঙ্কত (চুল আঁচড়ানো)।

অত৩, অতি, অতা : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ্য, বিশেষণ ইত্যাদি শব্দ তৈরি করে। যেমন- র্ফি + অত = ফিরত  ফেরত; র্ফি + অতি = ফিরতি; চল্ + অতি = চলতি; উঠ্ + অতি = উঠতি; কম্ + অতি + কমতি; বহ্ + অতা = বহতা; জ্ন + অতা = জান্তা।

অতক্ (অত) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। প্রয়োগের সময় ‘ক্’ বাদ যায়, ‘অত’ থাকে। যেমন- বৃ + অত (অতক্) = ব্রত।
অতচ্ (অত) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। প্রয়োগের সময় ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অত’ থাকে। যেমন- ভৃ + অত (অতচ্) = ভরত; মল্ + অত (অতচ্) + ঈ (ঙীষ্) = মালতী।
অতম : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় ডমতচ্ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দের শেষে ‘অতম’ হয়ে থাকে।
অতর : সংস্কৃতি তদ্ধিতপ্রত্যয় ডতরচ্ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দের শেষে ‘অতর’ হয়ে থাকে।
অতস্ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় অতসুচ্ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দশেষে ‘অতস্’ হয়ে থাকে।
অতসুচ্ (অতস্) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। অনুবন্ধহীন রূপ ‘অতস্’। শেষের ‘স্’ প্রথমার একবচনে বিসর্গ (ঃ) হয়ে যায়। যেমন- দক্ষিণ + অতস্ (অতসুচ্) = দক্ষিণতস্  দক্ষিণতঃ; পূর্ব + অতস্ (অতসুচ্) = পূর্বতস্  পূর্বতঃ  পুরতঃ। প্রমিত বাংলায় শেষের বিসর্গ বর্জন করা হয়েছে।
অতা : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। দেখুন- অত৩।
অতি১ : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। দেখুন- অত৩।
অতি২ : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এ উপসর্গের ব্যবহার আছে। যেমন- আধিক্য অর্থে : অতিশয়, অতিবৃষ্টি, অতিরঞ্জন। যেমন- ছাড়িয়ে গিয়েছে অর্থে : অতিমানব, অতিপ্রাকৃত। যেমন- পার অথবা উত্তীর্ণ হওয়া অর্থে : অতিক্রমণ, অতিক্রম।
অতি৩ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অতিচ্, ডচি-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অতি৪ : (অৎ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ই’ বাদ যায়, ‘অৎ’ থাকে। যেমন- ঈষ্ + অৎ (অতি) = ঈষৎ; পৃষ্ + অৎ (অতি) = পৃষৎ (সেচক); সন্ + অৎ (অতি) = সনৎ।
অতি৫ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় ডতি-র অনুবন্ধহীন রূপ।
অতিচ্ (অতি) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। প্রয়োগে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অতি’ থাকে। যেমন- খল্ + অতি (অতিচ্) = খলতি; নি- বস্ + অতি (অতিচ্) = নিবসতি।

অতীতকাল : সমাপিকা ক্রিয়াপদের যে রূপসমূহে ক্রিয়ার সংঘটন এখন না হয়ে আগে হওয়ার ভাব প্রকাশ করে, তা অতীতকাল বা অতীত কালরূপ। অতীতকাল কেবল নির্দেশকভাবে হতে পারে, অনুজ্ঞাভাব হতে পারে না। সাধারণ বিচারে অতীতকাল চার প্রকার : ১. সাধারণ বা নিত্য বা সামান্য অতীত। যেমন- আমি চললাম। তিনি বললেন। তুমি জানলে। ২. ঘটমান অতীত। যেমন- কামাল বলছিল। রহিম খাচ্ছিল। তারা খেলছিল। সে বলিতেছিল। তিনি বলিতেছিলেন। তারা খেলিতেছিল। ৩. পুরাঘটিত অতীত। যেমন- তিনি বলেছিলেন। মিনহা শুনেছিল। “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে” রবীন্দ্র। তাঁরা দেখেছিলেন। এ্যানি শুনিয়াছিল। ছেলেরা ভয় পাইয়াছিল। তাঁরা দেখিয়াছিলেন। ৪. নিত্যবৃত্ত অতীত। যেমন- আমি বলতাম। মীম বলত। তখন দেখতাম। আমি বলিতাম। সামি গাইত। আমি দেখিতাম।
এছাড়া অতীতকালের আরও কয়েকটি রূপ দেখা যায়। ১. ঘটমান পুরানিত্যবৃত্ত। যেমন- ‘নয়নযুগল হইতে অবিরাম বাষ্পবারি বিগলিত হইতে থাকিত’। সে মনে মনে জ্বলতে থাকত। ২. পুরাঘটিত নিত্যবৃত্ত বা পুরাসম্ভাব্য নিত্যবৃত্ত। যেমন- তিনি সারারাত জেগে থাকতেন। সে অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিত। ৩. সম্ভাব্য অতীত বা পুরাঘটিত সম্ভাব্য। যেমন- মিনহা এতক্ষণে খবরটি পেয়ে থাকবে।
অতীত কালরূপে বর্তমানকালের ব্যবহার : বিস্তারিত দেখুন- সাধারণ বর্তমান, ঘটমান বর্তমান, পুরাঘটিত বর্তমান।
অতীতার্থক প্রত্যয় : যে প্রত্যয় ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদকে অতীতকালের দ্যোতক করে তোলে, তাকে অতীতার্থক প্রত্যয় বলে। ইল্, ইত্ এ শ্রেণিতে পড়ে। তন্মধ্যে ‘ইল্’ সাধারণ বা নিত্য অতীতে এবং ইত্ নিত্যবৃত্ত অতীতে ব্যবহৃত হয়। যেমন- র্ক + ইল্ (অতীতার্থক প্রত্যয়) + অ (পুরুষ বিভক্তি) = করিল  করল; এরকম, করিলেন (র্ক + ইল্ + এন্)  করলেন; করিলাম (র্ক + ইল + আম)  করলাম। যেমন- বল্ + ইত্ (অতীতার্থক প্রত্যয়) + অ (পুরুষ বিভক্তি) = বলিত  বলত; এরকম, বলিতেন (বল্ + ইত্ + এন)  বলতেন; বলিতাম (বল + ইত্ + আম)  বলতাম।

অতু : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় কতু থেকে ধাতুর শেষে ‘অতু’ যুক্ত হয়।
অতৃন্ (অৎ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। এ থেকে ধাতু শেষে ‘অৎ’ যুক্ত হয়, অর্থাৎ ‘ঋ’ ও ‘ন্’ বাদ যায়। যেমন- জৃ + অৎ (অতৃন্) = জরৎ।
অত্নি : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অত্নিচ্ থেকে ধাতুর শেষে ‘অত্নি’ যুক্ত হয়।
অত্র : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অত্রন্ থেকে ধাতু শেষে যুক্ত হয় ‘অত্র’। প্রসঙ্গত, শব্দটির অর্থ এখানে, ইংরেজি যবৎব.
অত্রন্ (অত্র) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুতে যুক্ত হলে ‘ন্’ বাদ যায়, ‘অত্র’ থাকে। যেমন- গড্ + অত্র (অত্রন্) = কুত্র (আদেশ, গ-স্থানে ক); বৃ + অত্র (অত্রন্) = বরত্র।
অত্রি : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ‘অত্রিন্’-এর প্রয়োগে ধাতুশেষে ‘অত্রি’ যুক্ত হয়।
অত্রিন্ (অতি) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুতে যুক্ত হলে ‘ন্’ বাদ যায়, ‘অত্রি’ থাকে। যেমন- পত্ + অত্রি (অত্রিন্) = পতত্রি।
অথ১ : অথ, অথচ্, কথন্— এ নামের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় থেকে ধাতুর সঙ্গে ‘অথ’ যুক্তহয়।
অথ২ (অথ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- শপ্ + অথ = শপথ।
অথচ্ (অথ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অথ’ থাকে। প্রতি- বস্ + অথ (অথচ্) = প্রতিবসথ (গ্রাম)।
অথু : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অথুচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অথুচ্ (অথু) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অথু’ থাকে। যেমন- নন্দ্ + অথু (অথুচ্) = নন্দথু; নি- মস্জ্ + অথু (অথুচ্) = নিমজ্জথু।

অর্থগত দোষ : নিচের পাঁচটি এ দোষের [দেখুন: দোষ] অন্তর্গত। (১) নিরর্থকতা: কেবল শব্দ-পূরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় শব্দের ব্যবহার। যেমন: কেবলমাত্র (‘কেবল’/‘মাত্র’ স্থলে), শুধুমাত্র (শুধু/মাত্র)। (২) অধিকপদতা: অনাবশ্যক বা অধিক পদের ব্যবহার; যেমন: তিনি বাক্য বললেন; আমরা আহার খাই। (৩) ন্যূনপদতা: আবশ্যক পদের অভাব। (৪) অনবীকৃততা, পুনরুক্তি : এক শব্দ বারবার প্রয়োগ। (৫) অবাচকতা : কাঙ্ক্ষিত অর্থে শব্দের প্রয়োগ আছে কি না তা লক্ষ না-করে শব্দের অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ। যেমন: তাহাকে গলাধঃকরণ করিয়া বিদায় করিয়া দিল; আপনি একটা প্রকাণ্ড অজ্ঞ। (৬) নিহতার্থতা: “অনেকার্থ-যুক্ত শব্দের অপ্রসিদ্ধ অর্থে প্রয়োগ। যেমন: তোমার গোরসে গো পাইব করতলে (গো = বচন, স্বর্গ)” সুনীতিকুমার।

অর্থালংকার : অর্থ ও অলংকার শব্দের মিলনে অর্থালংকার। অলংকারের কাজ সৌন্দর্য বর্ধন, আকর্ষণ সৃষ্টি এবং হৃদয়ানুভূতিতে আবেগময় প্রশান্তির দ্যোতনা আনয়ন। বস্তুগত জীবনের চেয়ে কাব্যজীবনে এর গুরুত্ব আরও বেশি। এজন্য বলা হয় কাব্যকায়ার শোভাকর ধর্মই ‘অলংকার’। এর মাধ্যমে কাব্য-শরীরে শ্রীবৃদ্ধি ও আকর্ষণীয় অবয়বের রূপায়ণ সম্ভব। কোনো বাক্য পাঠ করার সময় তার দুটি দিক পাঠককে আকৃষ্ট করে। একটি ধ্বনি (ঝড়ঁহফ) ও অন্যটি অর্থ (ঝবহংব)। মূলত অর্থের বহুমাত্রিকতা, বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য-বিধায়ক কাজকে বলা হয় অর্থালংকার। এককথায় বলা যায়, শব্দের অর্থকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অলংকার বা সৌন্দর্য প্রকাশক বাক্সময়তাকে বলা হয় অর্থালংকার। যেমন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। ‘সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি’। প্রথম বাক্যে ‘সোনা’ বলতে সোনা নামের কোনো ধাতুকে বুঝানো হয়নি, এর দ্বারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাকে সোনার মতো দামি প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় বাক্যে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘রানি’ শব্দ দিয়ে কোনো রাজ্যের রানিকে বুঝাননি, বরং জন্মভূমিকে রানির মতো শ্রেষ্ঠ হিসাবে প্রকাশ করেছেন। এ দুটি শব্দের অর্থে যে বৈচিত্র্যময়তা, সৌন্দর্য ও অনুভূতির স্ফুরণ ঘটেছে সেটিই হচ্ছে অর্থালংকার।

অদ্ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ‘অদি’-র অনুবন্ধহীন রূপ।
অদি (অদ্) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ই’ বাদ যায়, ‘অদ্’ থাকে। যেমন- শৃ + অদ্ (অদি) = শরদ্  শরৎ।
অধি : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এই উপসর্গের প্রয়োগ আছে। যেমন- সবার উপরে বা প্রধান অর্থে : অধিকর্তা, অধিপতি, অধিনায়ক, অধীশ্বর, অধিদেবতা, অধিরাজ। যেমন- মধ্য বা অন্তর্গত অর্থে : অধিবাসী, অধিগত, অধিকার, অধিকরণ, অধিগ্রহণ। যেমন- উপরে অর্থে : অধিরোহণ, অধিশয়ন, অধিশোষণ, অধিত্বক, অধিবৃত্ত, অধিমাংস।

অধিকরণ কারক : ক্রিয়ার সংঘটন যে স্থানে, সময়ে কিংবা যে বিষয়কে অবলম্বন করে সংঘটিত হয়, বাক্যের ক্রিয়াপদের সঙ্গে সে স্থান, সময় কিংবা বিষয়ের সম্পর্ককে বলা হয় অধিকরণ কারক। এ কারকের জন্য ‘এ’, ‘য়’, ‘তে’ প্রভৃতি বিভক্তি এবং ‘দিয়ে’, ‘করে’ প্রভৃতি অনুসর্গ ব্যবহার করা যায়। কোথায়, কীসে, কাহাতে, কখন, কবে প্রভৃতি পদযুক্ত প্রশ্নের উত্তরে অধিকরণ কারক পাওয়া যায়। বাংলায় অধিকরণ কারকে সপ্তমী বিভক্তির প্রয়োগ বেশি হয়। যেমন- আকাশে মেঘ জমেছে। “লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে” নজরুল ইসলাম। সুন্দরবনে বাঘ আছে। “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে” রবীন্দ্র।
অধিকরণ কারক প্রধানত তিন প্রকার : ১. আধার অধিকরণ, ২. কালাধিকরণ, ৩. ভাবাধিকরণ। এ ভাগগুলোর উপবিভাগও রয়েছে।
১. আধার অধিকরণ : (ক) স্থানবাচক : যেমন- মাছ জলে থাকে। (খ) ব্যাপ্তিবাচক : যেমন- দুধে মাখন আছে। (গ) বিষয়বাচক : যেমন- সে গণিতে কাঁচা। (ঘ) সামীপ্যবাচক : যেমন- মাঠে খেলা হয়। “আমার হৃদয় পানে চাইনি”রবীন্দ্র।
২. কালাধিকরণ : [দেখুন] : (ক) ক্ষণমূলক : যেমন- বিকেল পাঁচটায় তিনি আসবেন। (খ) ব্যাপ্তিমূলক : যেমন- গ্রীষ্মকালে পাহাড়ে প্রচণ্ড গরম পড়ে। “দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা”— নজরুল।
৩. ভাবাধিকরণ [দেখুন] : যেমন- “সকাল আমার গেল মিছে” রবীন্দ্র। সে দুঃখে পড়েছে। গন্ডগোলে হারিয়ে গেল।

অধিকরণ কারকের বিভক্তি : অধিকরণ কারকের জন্য বাংলায় কোনো নির্দিষ্ট ও পৃথক বিভিক্তি নেই। এ, য়, তে, এতে প্রভৃতি বিভক্তি এবং দিয়ে, করে, মধ্যে প্রভৃতি অনুসর্গ-যোগে এ কারক হতে পারে। এছাড়া শূন্য বিভক্তি এবং বীপ্সায়ও অধিকরণ পদ হয়। যেমন- এ : জলে মাছ থাকে। “আকাশে আজ কোন্ চরণের আসা-যাওয়া”। রবীন্দ্র। যেমন- য় : ধান কেটে নৌকায় রাখছে। যেমন- য়ে : “গায়ে আমার পুলক লাগে,” রবীন্দ্র। যেমন- কে : আজকে নয় কালকে এসো। যেমন- তে : ধান কেটে নৌকোতে রাখছে। সে মাটিতে বসেছে। মেঝেতে চাদর বিছানো। যেমন- এতে : “ঘরেতে ভ্রমর এল গুন্গুনিয়ে।” রবীন্দ্র। উত্তরেতে বন্দিলাম শিব-মহেশ্বর। যেমন- অনুসর্গ যোগে : সে তখন ঘরের মধ্যে ছিল। “সখী, ওই বুঝি বাঁশি বাজে বনমাঝে কি মনোমাঝে।” রবীন্দ্র। আমার মনের ভিতরে। মাথায় করে রেখেছে। যেমন- শূন্য বিভক্তি : এই বছর ভালো ফসল হয়নি। ট্রেন দোহাজারি পৌঁছোল। সারারাত্রি গান শুনলাম। “কেন সারা দিন ধীরে ধীরে/বালু নিয়ে শুধু খেল তীরে।” রবীন্দ্র। শুক্রবার তিনি আসবেন। যেমন- বীপ্সায় : ফুলে ফুলে মধু খায়। “কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও,” রবীন্দ্র । [দেখুন- অধিকরণ কারক।]

অধিকরণ তৎপুরুষ : তৎপুরুষ সমাসের একটি শ্রেণি। এ সমাসে পূর্বপদ উত্তরপদের অধিকরণ কারক স্থানীয় হয়। সমাসবদ্ধ পদ তৈরি হওয়ার সময় পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়। এ সমাসের অন্য নাম সপ্তমী তৎপুরুষ। যেমন- গাছপাকা (গাছে পাকা); ঝুড়িভরতি (ঝুড়িতে ভরতি); ভূলুণ্ঠিত (ভূ বা ভূমিতে লুণ্ঠিত); ধ্যানমগ্ন (ধ্যানে মগ্ন); গৃহাগত (গৃহে আগত); দেশবিখ্যাত (দেশে বিখ্যাত); রাতকানা (রাতে কানা।)
অলুক সমাসেও অধিকরণ তৎপুরুষ হয়। যেমন- দিনে ডাকাতি (দিনের বেলায় ডাকাতি); গায়ে-পড়া (গায়েতে পড়া); যুধিষ্ঠির (যুদ্ধে স্থির)।

অধিকরণ সম্বন্ধ : কোনো সম্বন্ধ পদ সম্বন্ধিতে অধিষ্ঠান বা অবস্থানবাচক হলে, সম্বন্ধকে বলা হয় অধিকরণ সম্বন্ধ। জলের মাছ এ বাক্যাংশে সম্বন্ধ পদ ‘জলের’, সম্বন্ধিত ‘মাছ’। জল মাছের থাকার জায়গা, তাই ‘জলের’ ও ‘মাছ’-এর যে সম্বন্ধ তা অধিকরণ সম্বন্ধ এবং সম্বন্ধটি স্থানাধিকরণ-এর অনুরূপ। রাতের অন্ধকার— এখানে অধিকরণ সম্বন্ধটি সময়সূচক বা কালাধিকরণ বাচক। যেমন- গাঁয়ের লোক, কলেজের ছাত্র, আধুনিক ছেলে, সেকালের মানুষ।
অধিকার সম্বন্ধ : সম্বন্ধপদের সঙ্গে সম্বন্ধিতের সম্পর্ক মালিকানা, অধিকার ইত্যাদি সংক্রান্ত হলে পরস্পরের মধ্যে অধিকার সম্বন্ধ বা স্বামিত্ব সম্বন্ধ হয়। যেমন- আমার বই, মিনহার কলেজ, বাঙালিদের রাজ্য, শিবলুর মা, আমাদের দেশ।

অধীন খণ্ডবাক্য : দেখুন- অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
অন্ : দেখুন- নঞ্ তৎপুরুষ।
অন১ : অনট্ বা ল্যুট্, কনিন্, ক্যু, ক্যুন্, যুচ্ প্রভৃতি প্রত্যয়ের অনুবন্ধহীন রূপ।
অন২ : বাংলা কৃৎপ্রত্যয় বা ধাতু প্রত্যয়। এ প্রত্যয় যুক্ত হলে ধাতু থেকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য তৈরি হয়। যেমন- থাক্ + অন = থাকন; ফল্ + অন = ফলন; ঝাড়্ + অন্ = ঝাড়ন; চল্ + অন = চলন; র্ধ + অন = ধরন।

অনট্, ল্যুট্ (অন) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। অন্য নাম ল্যুট্। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ট্’ বাদ যায়, শুধু ‘অন’ থাকে। ধাতুর শেষে ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ থাকলে অনট্ প্রত্যয় যুক্ত করার সময় তাদের গুণ [দেখুন] হয়। এ প্রত্যয়ান্ত শব্দ সংস্কৃত মতে ক্লীবলিঙ্গ (বাংলায় লিঙ্গবিচার অনাবশ্যক) ও অর্থের দিক থেকে ক্রিয়ার ভাববোধক হয়। যেমন- অঙ্ক্ + অন (অনট্ বা ল্যুট্) = অঙ্কন; কৃ + অন (অনট্) = করণ; গম্ + অন (অনট্) = গমন; সাধ্ + অন (অনট্) = সাধন; নী + অন (অনট্) = নয়ন; আ- রুহ্ + অন (অনট্) = আরোহণ; স্থা + অন (অনট্) = স্থান।

অনন্বয়ী অব্যয় : যে অব্যয় পদ বাক্যের অন্য পদগুলোর সঙ্গে অন্বিত বা সম্পর্কযুক্ত নয়, তা অনন্বয়ী অব্যয় নামে পরিচিত। এ শ্রেণির অব্যয় প্রধানত মনোভাববাচক বা অন্তর্ভাবার্থক । যেমন- “আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,”রবীন্দ্র। উহ্্, এত যানজট ভালো লাগে না। [দেখুন- অব্যয়]।
অনর্থক অব্যয় : দেখুন- বাক্যালংকার অব্যয়।
অনস্ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ‘কনসি’-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অনা১ : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। এ প্রত্যয় যুক্ত করে ধাতু থেকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য পাওয়া যায়। যেমন- কাদ্ + অনা = কাদনা  কান্না; রান্ধ্ + অনা = রান্ধনা  রান্না; বাজ্ + অনা = বাজনা; বাট্ + অনা = বাটনা; ভাব্ + অনা = ভাবনা।
অনা২ : বাংলা শব্দপ্রত্যয়। প্রত্যয়টি শব্দকে সম্প্রসারিত করে, কিন্তু তার মূল অর্থের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। যেমন- পাখ + অনা = পাখনা (পালক অর্থে); ছা + অনা = ছানা (শাবক অর্থে)।
অনা৩ : বাংলা উপসর্গ। বিভিন্ন অর্থে এর ব্যবহার রয়েছে। খারাপ অর্থে: অনাসৃষ্টি, অনামুখো। অভাব অর্থে : অনাবৃষ্টি। তবে, অনাচার, অনাবশ্যক, অনাদর ইত্যাদি তৎসম শব্দের আদিতে ‘অনা’ থাকলেও এ ‘অনা’ উপসর্গ নয়। [ বিস্তারিত দেখুন- নঞ্ তৎপুরুষ]।

অনি১ (অনি) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- অট্ + অনি = অটনি; অশ্ + অনি = অশনি; অব্ + অনি = অবনি; শো + অনি = শনি।

অনি২, অনী, উনি : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। এ প্রত্যয়গুলো যুক্ত করে ধাতু থেকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য পাওয়া যায়। যেমন- গোঙা + অনি = গোঙানি; ঢাক্ + অনি = ঢাকনি; বাঁধ্ + অনি = বাঁধনি । যেমন- নাচ্ + উনি = নাচুনি; জ্বল্ + উনি = জ্বলুনি; কাঁপ + উনি = কাঁপুনি; ছা + উনি = ছাউনি; চাল+ উনি = চালুনি। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যয়টি যুক্ত হলে ক্রিয়া যে সম্পাদন করে তাকেও বোঝায়। যেমন- রাঁধ্ + উনি = রাঁধুনি (যে রাঁধে); নাচ্ + উনি = নাচুনি (যে নাচে)। প্রসঙ্গত, সম্পাদন যে করে সে স্ত্রীবাচক হলে ‘অনী’ কিংবা ‘উনী’ হয়। যেমন নাচুনী, রাঁধুনী। কিন্তু এ ‘ঈ-কার’-এর ব্যবহার প্রমিত বানানে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

অনির্দিষ্ট কর্তা : অনেক সময়ে বাক্যের কর্তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রাণী কিংবা বস্তু না হয়ে সাধারণ তথা অনির্ধারিত হতে পারে। এ শ্রেণির কর্তাকে বলা হয় অনির্দিষ্ট কর্তা। এসব ক্ষেত্রে কর্তৃকারকে এ, তে, য় প্রভৃতি বিভক্তির প্রয়োগ হতে পারে। যেমন- লোকে বলে (কোনো বিশেষ লোক নয়)। গোরুতে ঘাস খায় (কোনো বিশেষ গোরু নয়)। পাগলে কী না বলে? (সব পাগলের কথা বলা হচ্ছে)।

অনির্দেশক সর্বনাম : যে সর্বনাম কোনো কিছুকে সরাসরি নির্দিষ্ট করে দেয় না, তাকে বলা হয় অনির্দেশক সর্বনাম বা অনিশ্চয়বাচক সর্বনাম। যে ব্যক্তি কিংবা বস্তুর পরিচয় জানা নেই, তার পরিবর্তে ব্যবহার্য সর্বনামকেও এ শ্রেণিভুক্ত বলা যায়। যেমন- কাহারও, কেউ, কিছু, অমুক, কোথাও, কখনো। একাধিক সর্বনাম অথবা সর্বনামের দ্বিত্ব অনির্দেশক সর্বনামের কাজ করতে পারে। তখন এদের যৌগিক সর্বনাম বলা হয় । যেমন- যে কেউ, কেউ কেউ, কোনো কিছু, যা কিছু, অন্য কেউ, কিছু কিছু, যার যার প্রভৃতি।
অনিশ্চয়বাচক সর্বনাম : দেখুন- অনির্দেশক সর্বনাম।
অনী : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। দেখুন- অনি২।

অনীয় : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অনীর্য়-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অনীর্য় (অনীয়) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে র্‘’ বাদ যায়, ‘অনীয়’ থাকে। উচিত কিংবা আবশ্যকতা অর্থ প্রকাশের জন্য এ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। অনীর্য় প্রত্যয়ান্ত শব্দ বিশেষণ। যেমন- পূজ্ + অনীয় (অনীর্য়) = পূজনীয়; সহ + অনীয় (অনীর্য়) = সহনীয়; গ্রহ্ + অনীয় (অনীর্য়) = গ্রহণীয়; স্পৃহ্ + অনীয় (অনীর্য়) = স্পৃহণীয়; পা + অনীয় (অনীর্য়) = পানীয়।
অনু : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এ উপসর্গের ব্যবহার আছে। যেমন- পরে অর্থে : অনুজ, অনুতাপ। যেমন- পিছন অর্থে : অনুসরণ, অনুধাবন। যেমন- সর্বদা অর্থে : অনুক্ষণ, অনূদিন। যেমন- অন্যান্য বিবিধ অর্থে : অনুকম্পা, অনুবাদ, অনুশীলন প্রভৃতি।
অনুকার অব্যয় : বিস্তারিত দেখুন- ধ্বন্যাত্মক অব্যয়।
অনুকার ধ্বনিজ ধাতু : দেখুন- ধ্বন্যাত্মক ধাতু।

অনুকার শব্দ : একটি শব্দকে অনুকরণ করে তার পাশে একই ধ্বনিবিশিষ্ট একটি শব্দ যখন বসে, তখনই অনুকার ধ্বনির সৃষ্টি হয়। চুপচাপ, ফিটফাট, ফুলটুল, গাছটাছ, বইটই, চাকরবাকর, নেশাটেশা, ছেলেটেলে, টাকাফাঁকা, ইঁদুরফিদুর প্রভৃতি শব্দযুগলের মধ্যে দ্বিতীয়টি, যা কোনো অর্থবহ নয়, তাকে বলা হয় অনুকার শব্দ। অনুকার শব্দদ্বৈতে এক অংশে অর্থ, অন্য অংশে নিরর্থকতা। এ সার্থক-নিরর্থকের সমন্বয়ে যে অর্থ প্রকাশিত হয়, স্পষ্টার্থক জোড়-শব্দেও তা মেলে না; এটাই অনুকার শব্দের বৈচিত্র্য। বাংলায় অনুকার শব্দ আসলে কোনটিকে বলা হবে, তার মীমাংসা এখনও হয়নি। প্রথম অর্থটি নেওয়া হলে চাপ্, ফাট্, টুল্, টাছ্, টই্, বার্ক, টেশা, টেলে, ফটাস, দুম, ধপাস, টাং প্রভৃতিকে এর উদাহরণ বলে মানতে হয়। অন্যদিকে বইটই-এর ‘টই’, অর্থাৎ উল্লিখিত উদহরণের ‘-টুল’ ‘-টাছ’ ‘-বাকর’, ‘-টেশা’, ‘-টেলে’, ‘-ফাঁকা’, ‘-ফিদুর’ প্রভৃতি অর্থহীন শব্দ, যা এদের পূর্বের শব্দগুলোর প্রতিধ্বনির মতো, সেগুলোই হবে অনুকার শব্দ। দ্বিতীয় মতটিই এখন প্রাধান্য পাচ্ছে। [দেখুন- শব্দদ্বৈত; দ্বিরুক্ত শব্দ।]

অনুক্ত কর্তা : কর্মবাচ্য অথবা ভাববাচ্যে বিভক্তি কিংবা অনুসর্গ-যুক্ত কর্তাপদকে বলা হয় অনুক্ত কর্তা। যেমন- কর্মবাচ্যে : তোমার দ্বারা এ কাজ হবে না। পুলিশ কর্তৃক চোর ধৃত হলো। যেমন- ভাববাচ্যে : তার আর বাড়ি যাওয়া হলো না। আপনার কোথায় থাকা হয়? [দেখুন-কর্তা; কর্তৃকারক]।
অনুগামী শব্দ : অনেক সময় কোনো একটি শব্দের সঙ্গে সমার্থক অথবা প্রায় সমার্থক অন্য একটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে ব্যবহার করা হয়। আধিক্য প্রকাশ, জোর দেওয়া ইত্যাদি কারণে এ ধরনের জোড় শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন গাছগাছালি, রাজরাজড়া, চিঠিপত্র, সন্তানসন্ততি, মানুষজন, লতাপাতা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রতিক্ষেত্রে দ্বিতীয় শব্দটি প্রথমটির সমার্থক। এরকম ব্যবহারে গাছালি, রাজড়া, পত্র, সন্ততি, জন, পাতা প্রভৃতি হবে অনুগামী শব্দ। এদের সহচর শব্দও বলা হয়। যেমন- মাঠময়দান, পয়সাকড়ি, যুদ্ধবিগ্রহ, টাকাপয়সা ইত্যাদি।

অনুজ্ঞা ভাব : আজ্ঞার মধ্যে অনুজ্ঞা নিহিত। আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ, অনুনয়, প্রার্থনা, অনুমতি প্রভৃতি অর্থে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কালে মধ্যম পুরুষে ক্রিয়াপদের যে রূপ হয়, সেটি অনুজ্ঞাপদ। অর্থাৎ অন্য কাউকে কিছু করার জন্য বলা, অর্থাৎ আদেশ, অনুরোধ, উপদেশ, আহ্বান, আশীর্বাদ, অভিশাপ প্রভৃতি জ্ঞাপনের জন্য ক্রিয়ার যে প্রকার বা ভাব হয়, তাকে বলা হয় অনুজ্ঞা ভাব, নিয়োজক ভাব বা আজ্ঞাদ্যোতক ভাব। অনুজ্ঞার জন্য পৃথক ক্রিয়ারূপ আছে। বর্তমানকালে মধ্যম ও প্রথম পুরুষে আর ভবিষ্যৎকালে কেবল মধ্যম পুরুষে অনুজ্ঞা ভাব হতে পারে। অতীতকালে এ ক্রিয়ারূপ হয় না। যেমন- বর্তমানকাল, মধ্যম পুরুষ : তুমি যাও। দীনে দয়া করো, “অন্ধজনে দেহো আলো” রবীন্দ্র। “একবার তোরা মা বলিয়া ডাক্,” রবীন্দ্র। একদিন এসো। ভালোভাবে লেখাপড়া করো। সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক। যেমন- বর্তমানকাল, প্রথম পুরুষ : বলুক সে একথা আর একবার। তা তিনি আসুন, কথা বলুন আমাদের সঙ্গে। জনগণ জানুক যে আইন অমান্য করে রেহাই পাওয়া যায় না। যেমন- ভবিষ্যৎকাল, মধ্যম পুরুষ : তাকে বলো যে সে এলে আমি খুশি হব। তাকে আমার কথা জানাবেন। এই বড়ি সকালে ও বিকেলে একটা করে খাবেন। “ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে॥”রবীন্দ্র । [দেখুন- ক্রিয়ার ভাব]।

অনুজ্ঞা ভাবে ক্রিয়ার কাল : কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালেই ক্রিয়ার অনুজ্ঞা ভাব হতে পারে। বর্তমানকালে মধ্যম ও প্রথম পুরুষে, আর ভবিষ্যৎকালে শুধু মধ্যম পুরুষে ক্রিয়ার এ ভাব হয়। [দেখুন- অনুজ্ঞা ভাব]।
অনুজ্ঞাসূচক বাক্য : দেখুন- আজ্ঞাবাচক বাক্য।

অনুনাসিক স্বর : স্বরধ্বনির উচ্চারণ নাকি হলে অর্থাৎ উচ্চারণে নাক দিয়ে বাতাস বের করতে হলে যেরূপ ধ্বনি হয়, তাকে বলা হয় অনুনাসিক স্বর বা সানুনাসিক স্বর। অনুসানিক উচ্চারণের চিহ্ন চন্দ্রবিন্দু এবং এটি সংশ্লিষ্ট বর্ণের মাথায় বসে। বাংলায় যেসব শব্দে অনুনাসিক উচ্চারণ আছে, তার অধিকাংশই নাসিক্যধ্বনি-যুক্ত (ঙ, ম্, ন্) কোনো না কোনো মূল শব্দ থেকে ধ্বনিপরিবর্তন হয়ে এসেছে। যেমন- কংশ হতে কাঁশ, বংশ হতে বাঁশ, বংশী হতে বাঁশি, চন্দ্র হতে চাঁদ, ছন্দ হতে ছাঁদ, বঙ্ক হতে বাঁক, পঙ্ক হতে পাঁক, বন্ধন হতে বাঁধ ইত্যাদি।

অনুপ্রাস : “এক-ই বা একাধিক ব্যঞ্জন-ধ্বনির পুনরাবৃত্তি বা বারংবার প্রয়োগকে ‘অনুপ্রাস’ বলে। শব্দের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে এই অনুপ্রাস দেখা যায়।” সুনীতিকুমার। যেমন দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। জোর যার মুলুক তার। পদপ্রান্তে রাখ সেবকে, শান্তি-সদন সাধন-ধন দেব দেব হে।
বাংলা কাব্য-সাহিত্যে প্রধানত ৬ প্রকার অনুপ্রাস নিয়ে আলোচনা করা হয়। যথা : (১) সরল অনুপ্রাস : একটি বা দুটি বর্ণ একাধিকবার ধ্বনিত হলে সরল অনুপ্রাস সৃষ্টি হয়। যেমন কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল। কেতকী কেশরে কেশপাশ কর সুরভি। (২) গুচ্ছানুপ্রাস: ব্যঞ্জনবর্ণের গুচ্ছ বা একাধিক ব্যঞ্জনবর্ণ অভিন্ন বা একই ক্রমে অনেকবার ধ্বনিত হলে গুচ্ছানুপ্রাস অলংকার হয়। যেমন ভূলোক দ্যুলোক গোলক ছাড়িয়া। না মানে শাসন ব্যসন অশন আসন যত। (৩) অন্ত্যানুপ্রাস : কবিতার এক চরণের শেষে যে শব্দধ্বনি থাকে অন্য চরণের শেষে তারই পুনরাবৃত্তিতে যে অনুপ্রাস অলংকারের সৃষ্টি হয় তার নাম অন্ত্যানুপ্রাস। একে অন্ত্যমিলও বলা হয়ে থাকে। যেমন “দিনের আলো নিভে এলো সুয্যি ডোবে ডোবে, আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এখানে, ‘ডোবে’ আর ‘লোভে’র অন্ত্যমিল তাই এটি অলংকার অন্ত্যানুপ্রাস। গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা ‘আম্মা গো, পানি দাও, ফেটে গেল ছাতি মা’। (নজরুল)। (৪) ছেকানুপ্রাস : দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত বা বিযুক্ত ভাবে একইক্রমে মাত্র দুবার ধ্বনিত হলে যে অলংকারের সৃষ্টি হয় তার নাম ছেকানুপ্রাস। একে শ্রুত্যানুপ্রাস, লাটানুপ্রাস, মালানুপ্রাস, গুচ্ছানুপ্রাস, আদ্যানুপ্রাস বা সর্বানুপ্রাস হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার যে একক ব্যঞ্জনে কোনোক্রমেই ছেকানুপ্রাস হয় না। এ ধরনের অনুপ্রাসের ব্যবহার বাংলায় খুব বেশি দেখা যায় না। যেমন “করিয়াছ পান চুম্বন ভরা সরস বিম্বাধরে।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এখানে যুক্তব্যঞ্জন ‘ম্ব’ একের অধিকবার ক্রমানুসারে ধ্বনিত হয়েছে চুম্বন ও বিম্বাধরে এর মধ্যে, তাই এটি অলংকার ছেকানুপ্রাস। (৫) বৃত্ত্যনুপ্রাস : বৃত্ত্যনুপ্রাস একটি ব্যঞ্জনধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হলে, বর্ণগুচ্ছ যথার্থ ক্রমানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হলে যে অনুপ্রাসের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় বৃত্ত্যনুপ্রাস। যেমন— “সাগর জলে সিনান করি সজল এলোচুলে।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এখানে একক ব্যঞ্জন ‘স’ ও ‘ল’ পরপর তিনবার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় এটি অলংকার বৃত্ত্যনুপ্রাস। (৬) মালানুপ্রাস : অনুপ্রাসের মালা অর্থাৎ একাধিক অনুপ্রাস থাকলে তাকে মালানুপ্রাস বলে। যেমন আজন্ম সাধন-ধন সুন্দরী আমার/কবিতা কল্পনালতা।

অনুবন্ধ : সংস্কৃত কৃৎ ও তদ্ধিতপ্রত্যয়ে ধাতু ও শব্দের সঙ্গে যা যুক্ত হয়, তা অনুবন্ধ। প্রত্যয়টির নাম সর্বদা তা নয়। নামকরণে প্রত্যয়টির সঙ্গে বাড়তি কিছু ধ্বনি যুক্ত করে দেওয়া হয়। এ ধ্বনি অথবা ধ্বনিগুলোর নাম অনুবন্ধ। এর কয়েকটি কারণ আছে। ‘ক্রিন্’ প্রত্যয় থেকে যুক্ত হয় ‘রি’, ‘সন্’ থেকে ‘স’, ‘অচ্’, ‘অন’ থেকে ‘অ’। প্রকৃতপক্ষে, ‘অ’ প্রত্যয় ‘অচ্’ কিংবা ‘অন্’ থেকে এলেও তাদের ব্যবহার আলাদা। যেমন কৃ + অ (অ যদি ‘অচ্’ থেকে আসে) = কর ; আবার কৃ + অ (অ যদি ‘অন্’ থেকে আসে) = কার। এজন্য প্রত্যয়ের সংক্ষিপ্ততম রূপ থেকে তার স্বরূপ অনুমান করা সর্বদা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যয়গুলোর সঙ্গে অন্য কিছু ধ্বনি জুড়ে তাকে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যে ধ্বনিগুলো জোড়া হয় তা অনুবন্ধ। ব্যবহারের সময় অনুবন্ধ পড়ে যায়। এ বাদ পড়ার নাম ‘ইৎ’। নিচের উদহারণে বিষয়টি দেখানো হয়েছে :
প্রত্যয় অনুবন্ধ প্রত্যয় (স্থূলাক্ষরে) + অনুবন্ধ অনুবন্ধযুক্ত রূপ বা প্রত্যয়ের নাম
অ চ্ অ + চ্ অচ্
অ ঘ্, ঞ্ ঘ্ + অ + ঞ্ ঘঞ্
অ খ্, চ্ খ্ + অ + চ্ খচ্
অ প্ অ + প্ অপ্
অ ক্, প্ ক্ + অ + প্ কপ্
উ ক্ ক্ + উ কু
য ক্, অ, প্ ক্ + য্ + অ + প্ ক্যপ্
আন চ্, শ্ চ্ + আ + ন্ + অ + শ্ চানশ্
ছ ০ ছ্ + অ ছ
ইন্ ণ্ ণ্ + ই + ন্ + ই ণিনি
ফ অ, ক ফ্ + অ + ক্ ফক্
শব্দের ব্যুৎপত্তি লেখার সময় সাধারণত অনুবন্ধহীন অংশ বাইরে ও অনুবন্ধযুক্ত প্রত্যয় নামটি বন্ধনীর মধ্যে লেখা হয়। যেমন কৃ + তি (ক্তিন্) = কৃতি; অশ্ + ব (®^ন্) = অশ্ব; উভ + অয় (অয়চ্) = উভয়।

অনুবন্ধযুক্ত প্রত্যয় : নাম থেকে অনুবন্ধ ধ্বনি ‘ইৎ’ হলে (অর্থাৎ বাদ হলেই) প্রত্যয় বেরিয়ে আসে। তবে এ নিয়ম সর্বদা খাটে না। যেমন ‘যুচ্’ প্রত্যয় থেকে ‘অন’ যুক্ত হয়। কিন্তু ‘যুচ’-কে ভেঙে (য্ + উ + চ্) তা থেকে ‘অন’ বের করা যায় না।
অনুমতিবোধক যৌগিক ক্রিয়া : দেখুন- যৌগিক ক্রিয়া।

অনুমোদনবোধক যৌগিক ক্রিয়া : দেখুন- যৌগিক ক্রিয়া।
অনুমোদনসূচক অব্যয় : দেখুন- প্রশংসাবাচক অব্যয়।

অনুসর্গ : ব্যাকরণে বর্ণিত অব্যয় পদের একটি বিভাগ বিশেষ। কিছু শব্দ আছে সেগুলো বাক্যের কোনো পদের পরে বসে পদটিকে বাক্যের সঙ্গে অন্বিত করে। এ শব্দগুলোকে অনুসর্গ বলা হয়। এ জাতীয় অব্যয় অন্য পদের পরে পৃথকভাবে বসে পদটিকে বাক্যের অন্যান্য অংশের সাথে সম্পর্কিত করে বা বিভক্তির ন্যায় আচরণ করে। এর অন্য নাম কর্মপ্রবচনীয়, বা পরসর্গ বা সম্বন্ধীয়। অনুসর্গকে ‘বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত পদ’-ও বলা চলে। দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক, মধ্যে, থেকে ইত্যাদি শব্দ অনুসর্গ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- হাত দিয়ে তোল জল, পা দিয়ে খেল বল। ঘরের মধ্যেই বিভীষণ। বাড়ি থেকে দেখলাম। অনুসর্গ পদ যে পদকে অন্বিত করে, সেটি অন্য কোনো বিভক্তিযুক্ত কিংবা বিভক্তিহীন। এগুলো দুরকম হতে পারে। যেমন- বিভক্তিযুক্ত পদের সঙ্গে

অনুসর্গ : আমার থেকে বড়ো। লাঠির দ্বারা আঘাত করল। নিজে থেকে বলল। যেমন- বিভক্তিহীন পদের সঙ্গে অনুসর্গ : ছাদ থেকে দেখছে। বেত দিয়ে মারল। সবার থেকে আপন ইত্যাদি।
বাংলা অনুসর্গগুলোকে কারক অনুযায়ী বিভাজন করা যায়। যেমন- করণ কারকে : দিয়া, দিয়ে, দ্বারা, কর্তৃক; করে, করিয়া। যেমন- নিমিত্ত কারকে : তরে, জন্য; নিমিত্ত, কারণে, হেতু। যেমন- অপদান কারকে : আগে, আগেতে; উপর, উপরে, নিচে; পাছে, পিছে; বাহিরে, বাইরে, ভিতরে, ভেতরে; মাঝ, মাঝে ইত্যাদি। এছাড়াও বিবিধ অর্থে অনুসর্গের ব্যবহার হয়। যেমন- ব্যতীত অর্থে : ছাড়া, ব্যতীত, বিনা, বিহনে, বই, বেগর ইত্যাদি। যেমন- সাহচর্য অর্থে : সঙ্গে, সাথে; সহিতে, সহিত, সনে ইত্যাদি। যেমন- দিক বোঝানোর জন্য : পাছে, পিছনে; পেছনে, পাশে, পানে প্রভৃতি।
অনেক অনুসর্গই অব্যয়। অসমাপিকা ক্রিয়াও অনুসর্গ হয়। যেমন- দিয়া, দিয়ে; করিয়া, করে; হইতে, হতে। আমা হতে …, সে কী দিয়ে …, আমি কাজটি করিয়া …।

অনুস্বার : ‘ং’ বাংলা বর্ণমালার এ চিহ্নটির নাম অনুস্বার। উচ্চারণে ‘ং’ ও ‘ঙ’-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বর্ণ হিসাবে অনুস্বার অযোগবাহ বর্ণ [দেখুন]। স্বরবর্ণ অথবা ব্যঞ্জনবর্ণএ দুটোর কোনো দলেই অনুস্বার ( ং) পড়ে না। না পড়ুক, তবু এটি ছাড়া বাংলা ভাষা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়বে।

অন্ত১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় কচ্ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে প্রকৃতপক্ষে ‘অন্ত’ যুক্ত হয় ।

অন্ত২, অন্তী : বাংলা ধাতুপ্রত্যয়। কোনো কাজ চলছে এমন ভাব প্রকাশের জন্য প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয়। ‘অন্ত’ স্ত্রীলিঙ্গে কখনো ‘অন্তী’ হয়। যেমন- জী +

অন্ত = জীয়ন্ত  জ্যান্ত; চল্ + অন্ত = চলন্ত; উড়্ + অন্ত = উড়ন্ত; উঠ্ + অন্ত = উঠন্ত কিংবা অঠ্ + অন্তী = উঠন্তী, ফুট + অন্ত = ফুটন্ত। এ প্রত্যয়ান্ত শব্দের পদ হয় বিশেষণ।

অন্তঃ : সংস্কৃত শব্দ। ভিতরে বা মধ্যে অবস্থিত— প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে শব্দটি উপসর্গের মতো ব্যবহৃত হয়। যেমন- অন্তঃ + গত = অন্তর্গত; অন্তঃ + পুর = অন্তঃপুর; অন্তঃ + সলিলা = অন্তঃসলিলা; অন্তঃ + ঈক্ষ = অন্তরীক্ষ; অন্তঃ + দহন = অন্তর্দহন; অন্তঃ + স্থ = অন্তঃস্থ প্রভৃতি।

অন্তঃস্থ-ব : দেখুন- অন্তঃস্থবর্ণ; ব।

অন্তঃস্থবর্ণ : য, য়, র, ল ও অন্তঃস্থ-ব, বর্ণগুলোর উচ্চারণের ধ্বনিকে ধ্বনি-বিচারে স্বরধ্বনি অথবা ব্যঞ্জনধ্বনি কোনোটাই বলা চলে না। এদের উচ্চারণে শ্বাসবায়ু সম্পূর্ণ বাধামুক্ত থাকে না। আবার সম্পূর্ণ বাধাযুক্তও হয় না। এদের অবস্থা স্পর্শ ও উষ্মবর্ণের মাঝামাঝি। তাই এসব বর্ণকে অন্তঃস্থবর্ণ বলা হয়। এ বর্ণগুলোর মধ্যে ‘য়’ ও অন্তঃস্থ ব-কে বলা হয় অর্ধস্বর এবং ‘র’, ‘ল’-কে বলা হয় তরলস্বর। উচ্চারণস্থান অনুযায়ী ‘য’ তালব্য; ‘র’, ‘ল’ দন্তমূলীয়; ‘অন্তঃস্থ-ব’ দন্তৌষ্ঠ্য। বাংলায় অন্তঃস্থ-ব-এর কোনো পৃথক উচ্চারণ নেই, এটি বর্গীয়-ব-এর মতো উচ্চারিত হয়। [দেখুন- উষ্মব্যঞ্জন, স্পর্শব্যঞ্জন, অর্ধস্বর]।

অন্তঃস্থ ব-শ্রুতি : সংস্কৃত কিংবা হিন্দিরীতিতে অন্তঃস্থ-ব-এর উচ্চারণ অনেকটা ‘ওয়্’-ধ্বনির মতো। বাংলা উচ্চারণে অবশ্য এ দুই ‘ব’-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু পরপর দুটি স্বরধ্বনি থাকলে তাদের উচ্চারণের সুবিধার জন্য অন্য কোনো ধ্বনি আনার প্রয়োজন হয়। যেমন পা + আ উচ্চারণ করতে অসুবিধে হয়ে দাঁড়ায়, ফলে এটি হয়েছে ‘পাওয়া’। অর্থাৎ দুটো ‘আ’-ধ্বনির মাঝখানে একটা ‘ওয়’-ধ্বনি এসে যাচ্ছে। মাঝখানে এসে-যাওয়া এই ধ্বনির নাম শ্রুতিধ্বনি [দেখুন]; এবং যেহেতু তা শুনতে অন্তঃস্থ-ব-এর প্রকৃত ধ্বনির মতো, তাই এ শ্রুতিধ্বনির নাম হয়েছে অন্তঃস্থ ব-শ্রুতি। যেমন- পা + আ = পাওয়া, দে + আ = দেওয়া, যা + আ = যাওয়া, খা+ আ = খাওয়া প্রভৃতি। [দেখুন- যৌগিক স্বরধ্বনি, অন্তঃস্থ-ব]।
অন্তঃস্থ য়-শ্রুতি : দেখুন- য়-শ্রুতি।

অন্তর্ভাবাত্মক অব্যয় : দেখুন- মনোভাববাচক অব্যয়।

অন্তি : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় ঝিচ্ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে প্রত্যয়ান্ত শব্দটির শেষে ‘অন্তি’ হয়।

অন্তিক (অন্তিক) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- লল্ + অন্তিক (অন্তিক)  ললন্তিক + আ (টাপ্) = ললন্তিকা।

অন্তী : দেখুন- অন্ত২।

অন্ত্যপদ : সন্ধিতে কিংবা সমাসে যে শব্দ বা পদ পরে বা শেষে থাকে তাকে বলা হয় অন্ত্যপদ। এর অন্য নাম উত্তরপদ। বিদ্যালয় একটি সমাসবদ্ধ শব্দ। এ শব্দটিতে আছে দুটো শব্দ, ‘বিদ্যা’ ‘আলয়’। এর মধ্যে আলয় হলো অন্ত্যপদ বা উত্তরপদ। যেমন- মহাশয়, উত্তরপদ শয়; শব্দকোষ কোষ; শব্দাভিধান অভিধান। [দেখুন- পূর্বপদ]।

অন্ত্যস্বর লোপ : ধ্বনিলোপের [দেখুন] ক্ষেত্রে শব্দের শেষের স্বরধ্বনি উচ্চারণ থেকে বাদ গেলে অন্ত্যস্বর লোপ হয়। যেমন- বন্যা  বান; লজ্জা  লাজ; চাকা  চাক (কুমোরের চাক); কাঁদি  কাঁদ।
অন্ত্যস্বরাগম : দেখুন- ধ্বন্যাগম।

অন্বয় : বাক্যের পদগুলোর পরস্পর সম্পর্ককে অন্বয় বলা হয় । এ সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো ক্রিয়াপদ, যদিও ক্রিয়াপদ কখনো ঊহ্য থাকতে পারে। ক্রিয়াপদের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্কের নাম কারক। কারক-সম্পর্কযুক্ত পদগুলোর বিশেষণ অথবা সম্বন্ধপদ হয়ে আরও অনেক পদ বাক্যে যুক্ত হতে পারে। ক্রিয়ারও বিশেষণ হয়। এছাড়া কারক-সম্পর্কহীন নানা ধরনের অব্যয় পদও বাক্যে থাকে। পদের পরস্পর সম্পর্ক বা অন্বয়কে নিচের মতো করে সাজানো চলে : প্রথম. ক্রিয়াপদ। দ্বিতীয়. ক্রিয়ার সঙ্গে কারকসম্পর্কযুক্ত পদ। তৃতীয়. ক্রিয়াপদের গুণাগুণ প্রকাশক পদ। চতুর্থ. কারকসম্পর্কযুক্ত পদের গুণাগুণ প্রকাশক পদ। পঞ্চম. ক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্বন্ধহীন অন্য পদ। [দেখুন- বাক্য, কারক]

অন্য (অন্য) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ঋ + অন্য = অরণ্য।; পৃষ্ + অন্য = পর্জন্য।

অন্যথাসূচক অব্যয় : দেখুন- ব্যতিরেকাত্মক অব্যয়।
অন্যনির্ভর সামর্থ্যবোধক যৌগিক ক্রিয়া : দেখুন- যৌগিকা ক্রিয়া।

অন্যাদিবাচক সর্বনাম : যে সর্বনাম নিজ-ভিন্ন অন্যকে প্রকাশ করে, সেটিই অন্যাদিবাচক সর্বনাম। যেমন- অন্য, অপর, অমুক।

অন্যান্য ভাষা থেকে আগত শব্দ : বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যা সংস্কৃত ভাষা ছাড়া অন্য দেশীয় ও বিদেশি ভাষা থেকে এসেছে। এসব শব্দ মূল শব্দের মতো কিংবা কিছুটা পরিবর্তিত। বাংলায় তাদের উচ্চারণ অনুযায়ী প্রতিবর্ণীকৃত রূপ লেখা হয়, যদিও এ প্রতিবর্ণীকরণের কোনো সাধারণ নিয়ম গড়ে ওঠেনি। এসব শব্দকেই সাধারণভাবে বলা হয়, অন্যান্য ভাষা থেকে আগত শব্দ বা আগন্তুক শব্দ বা বিদেশি শব্দ। যেমন- আরবি থেকে : অকু, অদলবদল, অছি, আক্কেল, ইমারত, ইশারা, খালি, জলসা, ফোয়ারা, দলিল, নকিব, নজর, নবাব, নজির, অকুব, ফজলি, ফিফির, মাইকেল ইত্যাদি। ফারসি থেকে : অজুহাত, অন্দর, আপোশ, কারবার, খরচ, গোয়েন্দা, চাবুক, চেহারা, তিরন্দাজ, দাবি, নালিশ, পরদা, পোশাক, বরফ, সরগরম, হরদম, হাজার। ইংরেজি থেকে : অফিস, আরদালি, কমা, গারদ, গেলাস, টাইপ, টেবিল, ডাক্তার, নম্বর, বাক্স, হাইকোর্ট, হাসপাতাল। পর্তুগিজ থেকে : আচার, আতা, ইস্পাত, কামরা, গামলা, গির্জা, তামার, তোয়ালে, পাঁউরুটি, পেরেক, বালতি, বেহালা, মিস্ত্রি, সাবান। ফরাসি থেকে : কার্তুজ, কুপন, রেস্তরাঁ। জার্মান থেকে : নাৎসি, কিন্ডারগারটেন। ইতালীয় থেকে : ওপেরা, আউন্স। স্পেনীয় থেকে : ডেঙ্গু। ওলন্দাজ থেকে : ইস্কাপন। রুশ থেকে : বলশেভিক, স্পুটনিক। জাপানি থেকে : হাসনাহেনা, টাইফুন। চৈনিক থেকে : চা, চিনি, লিচু। মালয়ি থেকে : কাকাতুয়া। সিংহলি থেকে : বেরিবেরি। বর্মি থেকে : লুঙ্গি। উপমহাদেশীয় ভাষা থেকে : হিন্দি আলাল, ইস্তক, কাহিনি, চাহিদা, ঝান্ডা, বন্ধ্, লোটা। গুজরাটি : গরবা, তকলি, হরতাল। মারাঠি : বর্গি। তামিল : চুরুট। তেলুগু : প্যান্ডেল।

অন্যোন্য সমীভবন : দেখুন- ব্যঞ্জনসংগতি।

অপ্ (অ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘প’ বাদ যায় ‘অ’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- তৃ + অ (অপ্) = তর; জপ্ + অ (অপ্) = জপ; আ- দৃ + অ (অপ্) = আদর; ভূ + অ (অপ্) = ভব; নি- ক্কণ্ + অ (অপ্) + নিক্কণ; সম্- যপ্ + অ (অপ্) = সংযম। [লক্ষণীয় : হস্ + অ (অপ্) = হস, কিন্তু হস্ + অ (ঘঞ্) = হাস; বি- স্তৃ + অ (অপ্) = বিস্তর, কিন্তু বি- স্তৃ + অ (ঘঞ্) = বিস্তার]।

অপ১ : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এ উপসর্গের ব্যবহার আছে। যেমন- বিপরীত অর্থে : অপকার, অপমান, অপবাদ। খারাপ অর্থে : অপকৃষ্ট, অপসংস্কৃতি, অপকর্ম, অপদেবতা। দূর থেকে কিংবা মধ্য থেকে অর্থে : অপকেন্দ্র, অপভ্রষ্ট। এছাড়াও আরও নানা অর্থে এ উপসর্গের প্রয়োগ আছে। বৃথা, ক্ষতিকারক ইত্যাদি। যেমন- অপসরণ, অপসারণ (দূরীকরণ); অপব্যয়, অপচয় (বৃথা)। অপমৃত্যু, অপঘাত (অস্বাভাবিক)।

অপ২ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় কপন্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অপ৩ : (অপ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- সৃ + অপ (অপ) = সর্ষপ।

অপশ্রুতি : স্বরধ্বনির পরিবর্তন সংক্রান্ত গুণ [দেখুন], বৃদ্ধি [দেখুন], সম্প্রসারণ [দেখুন]। এই তিনটিকে একত্রে অপশ্রুতি বলা হয় ।

অপভ্রংশ : দেখুন- ভাষাবংশ।

অপশব্দ : কোনো কোনো শব্দ লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে অঞ্চলবিশেষে বিশেষ ধরনের রূপ পেয়ে যায়, তাদের বলা হয় অপশব্দ। এ ধরনের শব্দ সংলাপ অথবা প্রত্যক্ষ উক্তি ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয় না। যেমন- এই দিকে > অ্যাম দে; কোন স্থিতে > কুন্ঠে; কেন > ক্যানে; কোথা > কুতি, কোতি; কোথায় > কুথাকে, পোলাটা পরহেজগার > হোলাটা হরেজগার ।

অপাদান কারক : “যাহা কোনও ঘটনার উৎপত্তি-স্থান— যাহা হইতে কোনও বস্তু বা ব্যক্তি উৎপন্ন, চলিত, নির্গত, নিঃসৃত, উত্থিত, পতিত, প্রেরিত, গৃহীত, দৃষ্ট, শ্রুত, সূচিত, নিবারিত, অন্তর্হিত, রক্ষিত ইত্যাদি হয়— তাহাকে অপাদান কারক বলে।” সুনীতিকুমার। অর্থাৎ, বাক্যে ক্রিয়ার সম্পাদন যে স্থান থেকে হয়, ক্রিয়ার সঙ্গে সে স্থানের সম্পর্কের নাম অপাদান কারক। কী বা কাহা হতে, কীসের থেকে প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তরে অপাদান কারক পাওয়া যায়। যেমন- শিয়ালটি বন থেকে বের হলো। গাছ থেকে টানতে লাগল, বাড়ি হতে আজান শোনা যায়, সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে। তিল থেকে তৈল হয়। ক্রিয়াটি কোথা থেকে হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তরে অপাদান কারককে চিহ্নিত করা যায়। অপাদান কারকে পঞ্চমী বিভক্তির প্রয়োগ বেশি।
অপদান কারকের কয়েকটি শ্রেণিবিভাগ আছে : ১. স্থানবাচক : যেমন- তিনি রংপুর থেকে এসেছেন। ছাদে উঠে দেখলাম। ট্রেনটা সীতাকুণ্ডু ছেড়েছে। ২. কালবাচক : যেমন- “কাল থেকে মনে মোর লেগে আছে খটকা” সুকুমার রায়। “জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে/ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে”রবীন্দ্র। ৩. দূরত্ববাচক : যেমন- ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অনেক মাইল দূর। ৪. উৎসবাচক : যেমন- দুধে দই হয়। তিল থেকে তৈল হয়। ৫. কারণবাচক : ‘ভূতের ভয়ে ঘুম আসে না রাতে,  রোদের ভয়ে ঘুমিয়ে পড়ে প্রাতে।’— ড. মোহাম্মদ আমীন।

অপাদান কারকের কোনো নির্দিষ্ট বিভক্তি নেই। এ, তে, কে, র প্রভৃতি বিভক্তি এবং থেকে, হতে প্রভৃতি অনুসর্গ এ কারকে ব্যবহৃত হয়। [বিস্তারিত- অপাদান কারকের বিভক্তি]। সংস্কৃত মতে অপাদান কারকের বিভক্তিকে পঞ্চমী বিভক্তি বলা হয়।

অপাদান কারকের বিভক্তি : অপাদান কারকের জন্য বাংলায় কোনো নির্দিষ্ট বিভক্তি নেই। এ, তে, কে, র প্রভৃতি বিভক্তি ও কিছু অনুসর্গ এ কারকের জন্য ব্যবহৃত হয়। এ কারকের বিভক্তিকে সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী পঞ্চমী বিভক্তিও বলা হয়। এ : যেমন- এ পুকুরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। তিলে তৈল হয়। য় : যেমন- টাকায় টাকা আনে। এতে : যেমন- দুধ থেকে দই হয়। তার মুখেতে শোনা কথা। তে : যেমন সাঁতারুর নদীতে ভয় নেই। কে : যেমন- বিপদকে ভয় কী? র : যেমন— তার গলার গান চমৎকার। এর : যেমন- যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। অনুসর্গযোগে : থেকে : যেমন- কাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে অবিরাম। তিনি রাজশাহী থেকে এসেছেনে। হতে : যেমন- “কোথা হতে শুনতে যেন পাই”রবীন্দ্র। দিয়ে : যেমন- কলের মুখ দিয়ে জল পড়ছে। চাইতে, চেয়ে : যেমন- সোলাইমানের চেয়ে জ্ঞানী। বাঘের চেয়ে ভয়ংকর।

অপাদান তৎপুরুষ : তৎপুরুষ সমাসের শ্রেণিবিশেষ। এ সমাসে পূর্বপদ উত্তরপদের অপাদান কারক-স্থানীয় হয়। পূর্বপদে অপাদান কারকের বিভক্তি অথবা অনুসর্গ লোপ হয়ে সমাসবদ্ধ শব্দটি তৈরি হয়। পঞ্চমী তৎপুরুষ এ সমাসের অন্য নাম। তবে এ নামের ব্যবহার এখন কমে আসছে। যেমন- ঘরছাড়া (ঘর থেকে ছাড়া); অগ্নিভয় (আগুন থেকে ভয়); স্কুলপালানো (স্কুল থেকে পালানো); দুগ্ধজাত (দুগ্ধ হতে জাত)।
অলুক সমাসেও অপাদান তৎপুরুষ হতে পারে। যেমন- সারাৎসার (সার থেকে সার); পরাৎপর (পরের থেকে পর)।

অপাদান সম্বন্ধ : সম্বন্ধপদ ও সম্বন্ধিতের সম্পর্ক অপাদান কারক-বাচক হলে তাকে অপাদান সম্বন্ধ বলা হয়। যেমন- ভূতের ভয় (ভূত হতে ভয়); কর্ণফুলীর পূর্বে (কর্ণফুলী থেকে পূর্ব দিকে); চোখের জল (চোখ থেকে পড়া জল); চন্দনাইশের বাইরে (চন্দনাইশ থেকে বাইরে)।

অপার্থভাষা : গোপনীয়তা রক্ষার জন্য অথবা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে, কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে কিছু ভাষা তৈরি করে নিতে পারে। দুই ব্যক্তি নিজেদের তৈরি কোনো ভাষায় কথা বলতে পারে; যা কি না উপস্থিত তৃতীয় ব্যক্তির কাছে অবোধ্য। এরূপ ভাষাকে সাধারণভাবে বলা হয় অপার্থভাষা বা সংকেত ভাষা। অনেক সময় শব্দার্থের পরিবর্তন ঘটিয়ে তা ব্যবহার করা হয়। অপরাধ-জগতে এরকম অনেক শব্দ আছে। মামা মানে পুলিশ, খোকা> পিস্তল, মাল মানে মদ/মহিলা/ অবৈধ বস্তু। এধরনের অনেক শব্দ সমাজবিরোধীদের মধ্যে গুপ্ত বিষয় প্রকাশে চালু রয়েছে। গুপ্তচর ও গোয়েন্দাদেরও অনেক সংকেত ভাষা থাকে। যেমন: চার্লি, ডেল্টা, অপারেশন প্রভৃতি। ধাঁধা ইত্যাদিতেও বহুরকম সংকেত ভাষা পাওয়া যায়।

অপি : সংস্কৃত উপসর্গ। বাংলায় অপি-আদি শব্দ খুব বেশি নেই। সম্মুখে বা সামনে বোঝানোর জন্য এ উপসর্গের ব্যবহার। যেমন- অপিধান (আচ্ছাদন, আবরণ); অপিনদ্ধ (পরিহিত); অপিনিহিতি। ‘অপি’-র আদ্যস্বর লোপ হয়ে কখনো ‘পি’ শব্দের সামনে আসে। যেমন- পিনদ্ধ।

অপিনিহিতি : শব্দের মধ্যে ‘ই’ কিংবা ‘উ’-ধ্বনি থাকলে সে ‘ই’ বা ‘উ’- কে যথাস্থানের আগে উচ্চারণ করার প্রবণতা বাংলা ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য। এভাবে ‘ই’, ‘উ’-এর উচ্চারণ আগে এসে পড়াকে ব্যাকরণের ভাষায় অপিনিহিতি বলে। যেমন: আজি শব্দের ধ্বনিক্রম আ + জ্ + ই। ‘ই’ যদি স্থান পরিবর্তন করে ‘আ’ ও ‘জ’-এর মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাহলে শব্দটির উচ্চারণ হয় ‘আইজ’। ‘আজি’ শব্দের ‘আইজ’-এ রূপান্তরের কারণ অপিনিহিতি। যেমন- কালি  কাইল; জলুয়া  জউলুয়া  জউলা। যাবি যাইবি। রাতি  রাইত প্রভৃতি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষায় এর প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি, য-ফলার অন্তর্নিহিত ই-ধ্বনিরও অপিনিহিতি হয়। যেমন- ভাগ্য  ভাইগ্য; বাক্য  বাইক্য; কন্যা  কইন্যা। এছাড়া জ্ঞ, ক্ষ যার উচ্চারণ য-ফলা-যুক্ত ব্যঞ্জনের কাছাকছি সেখানেও অপিনিহিতি হয়ে থাকে। যেমন- বক্ষ  বইক্ষ; লক্ষ  লইক্ষ; যজ্ঞ  যইজ্ঞ, সখ্য সইখ্য। প্রমিত চলিত বাংলা ও সাধু ভাষায় অপিনিহিতি নেই।

অপূর্ণরূপ ক্রিয়া : দেখুন- অসম্পূর্ণ ক্রিয়া।

অপ্রধান খণ্ডবাক্য : জটিল বাক্যে যে খণ্ডবাক্য বাক্যের অন্য কোনো খণ্ডবাক্যের সাপেক্ষ অথবা নির্ভরশীল থাকে, তাদের বলা হয় অপ্রধান খণ্ডবাক্য বা অধীন খণ্ডবাক্য বা আশ্রিত খণ্ডবাক্য। অপ্রধান খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের ভাব এবং বক্তব্যকে সম্পূর্ণভাবে পরিস্ফুট করতে সাহায্য করে। ‘আমি জানতাম যে সে পরীক্ষায় ভালো করবে’ এ বাক্যের ‘সে… করবে’ অংশ ‘আমি জানতাম’ এ খণ্ডবাক্যের ভাব কিংবা বক্তব্যকে সম্পূর্ণ করছে। তাই এ অংশ অপ্রধান খণ্ডবাক্য। ১. যেমন- আমি জানতাম যে সে পরীক্ষায় ভালো করবে। ছেলেটা দেখে কারোই মনে হয়নি যে, সে এত খারাপ একটা কাজ করবে। ২. যেমন- যারা মন দিয়ে লেখাপড়া করেছে, তারা সবাই পরীক্ষায় ভালো ফল পেয়েছে। ভালো ভালো গায়কেরা গাইবেন, আসর তো জমবেই। ৩. যেমন- “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” রবীন্দ্র । দেখেশুনে গাড়ি চালাবে নইলে দুর্ঘটনা হতে পারে।
অপ্রধান খণ্ডবাক্যের তিনটি শ্রেণি হওয়া সম্ভব : ১. সংজ্ঞা বা বিশেষ্যধর্মী, ২. বিশেষণধর্মী, ৩. ক্রিয়া বিশেষণধর্মী। উপরের উদাহরণে যথাক্রমে এ তিনটি রূপ দেখানো হয়েছে।

অপ্রস্তুত প্রশংসা : যেখানে অপ্রস্তুত বিষয়ের বর্ণনা দ্বারা প্রস্তুত বিষয়ের প্রতীতি হয়, সেখানে অপ্রস্তুত প্রশংসা অলংকার রূপ লাভ করে। যেমন:  প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম-গোত্র-হীন/ফুটিয়াছে ফুল এক অতিশয় দীন//ধিক ধিক করে তারে কাননে সবাই,/সূর্য উঠি বলে তারে, ভাল আছ ভাই।

অপ্রাণিবাচক সর্বনাম : দেখুন- সর্বনাম।
অব১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অবন্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অব২ : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এর ব্যবহার আছে। যেমন- নিচ বা নিম্ন অর্থে : অবগমন, অবতরণ, অবরোহণ, অবনমন, অবনয়ন, অবগাহন। যেমন- খারাপ অর্থে : অবমান, অবজ্ঞা। যেমন- সবদিক অর্থে : অবগুণ্ঠন, অবরোধ, অবক্ষয়, অবনতি, অবসর।
অবধারক ভাব : দেখুন- নির্দেশক ভাব।

অবন্ (অব) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ন্’ বাদ যায়, ‘অব’ থাকে। যেমন- পল্ + অব (অবন্) = পেলব।
অবলম্বন সম্বন্ধ : সম্বন্ধিত পদটি সম্বন্ধপদের সহায়, অবলম্বন, সাহায্যকারী ইত্যাদি হলে সম্বন্ধটির নাম হয় অবলম্বন সম্বন্ধ। যেমন- অন্ধের যষ্টি, অকূলের কূল, নিরাশ্রয়ের শরণ, দীনের দয়াল, অগতির গতি।

অবস্থাত্মক অব্যয় : সমুচ্চয়ী অব্যয়ের শ্রেণিবিশেষ। এ ধরনের অব্যয় সাধারণত বাক্যের প্রথমে বসে পরের খণ্ডবাক্য দুটিকে জুড়ে দেয় এবং সে সঙ্গে একটি খণ্ডবাক্যকে অন্যটির সাপেক্ষ ও শর্তাধীন করে দেয়। অবস্থাত্মক অব্যয়ের অন্য নাম ঘটনাসূচক অব্যয়। যেমন- “যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম।” রবীন্দ্র । যদি আমার সামর্থ্য থাকত তোমাকে ফেরাতাম না কখনো। যদি আর একবার সুযোগ পাই, তবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেই ছাড়ব।

অবস্থানবাচক অপাদান কারক : দেখুন- স্থানবাচক অপাদান কারক।

অবস্থানবাচক পদান্বয়ী অব্যয় : পদান্বয়ী অব্যয়ের শ্রেণিবিশেষ। যে পদান্বয়ী অব্যয় বাক্যে বিধৃত বা বর্ণিত কোনো কিছুর অবস্থান, স্থান প্রভৃতি নির্দেশ করে, সেটি অবস্থানবাচক পদান্বয়ী অব্যয়। যেমন- খোকন চলেছে সবার আগে। ঘরের পিছনেই বিশাল মাঠ। বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া পুকুরে গোসল করি রোজ । [দেখুন- পদান্বয়ী অব্যয়]।

অবস্থানবাচক বিশেষণ : নাম বিশেষণের শ্রেণিবিশেষ। এ শ্রেণির বিশেষণ বিশেষিত পদের অবস্থান নির্দেশ করে। যেমন- জাপানি ক্যালকুলেটর, বেনারসি শাড়ি, পাহাড়ি নদী, মিশরীয় সভ্যতা, সামুদ্রিক ঝড়, তার্কিস টুপি।

অবস্থানবাচক বিশেষণ : নাম বিশেষণের অন্যতম শ্রেণিবিভাগ। এ শ্রেণির বিশেষণ বাক্যের কোনো পদের অবস্থা (যে অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব) প্রকাশ করে। যেমন- চলন্ত গাড়ি, উড়ন্ত বিমান, থেমে-থাকা গাড়ি, রুগ্ণ মানুষ, সুস্থ লোক, গরিব লোক, পরাজিত পক্ষ, তরল পদার্থ, মজা পুকুর, রোরুদ্যমান শিশু।
অবস্থাবাচক বিশেষ্য : বিশেষ্যের শ্রেণিবিশেষ। এতে কোনো অবস্থার নাম বোঝায়। যেমন- দুর্ভিক্ষ, বার্ধক্য, স্বচ্ছন্দ্য, সন্ধ্যা, রাত্রি, বাল্য, স্বাধীনতা, পরাধীনতা, সুখ, শান্তি, অশান্তি, দুঃখ প্রভৃতি।

অবি (অবি) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- অট্ + অবি (অবি) = অটবি, বিকল্পে + স্ত্রীপ্রত্যয় ঈ (ঙীপ্) = অটবী। তবে অটবী প্রমিত।

অবিভক্তিক রূপ : দেখুন- সর্বনাম।

অব্যয় : অ + বি + ই (অচ্)-ক। যার ব্যয় বা বিপরীত দিকে যাওয়া নেই। ব্যয়হীন, অপক্ষয়রহিত, ক্ষয়শূন্য, অবিনাশী, নিত্য, শাশ্বত, বিকারশূন্য, কৃপণ, ন্যূনতাহীন, অক্ষয়, বিষ্ণু, শিব, লিঙ্গ, বচন ও বিভক্তিতে অবিকৃত শব্দবিশেষ।

অব্যয় পদ : “বাংলা শব্দকে যে প্রধান পাঁচটি পদ-পর্যায়ে ভাগ করা হয়, তার একটি অব্যয়। “বাক্যগত উক্তিকে এবং বাক্যস্থ অন্যান্য পদগুলির পরস্পর সম্বন্ধকে স্থান-, কাল-, পাত্র- ও প্রকার বিষয়ে সুপরিস্ফুট করিয়া দেয়, এমন পদকে অব্যয় বলে।” সুনীতিকুমার। বাংলা ব্যাকরণে অব্যয় পদের সংজ্ঞা তেমন স্পষ্ট নয়। অব্যয়ের সংজ্ঞা অন্যভাবেও দেওয়া হয়। যেমন পদ হিসাবে বাক্যে ব্যবহৃত হলেও যার সঙ্গে কোনো বিভক্তি কিংবা প্রত্যয় যুক্ত করা যায় না, অর্থাৎ রূপ অভিন্ন থাকে, তা-ই অব্যয়। এর কোনো ব্যয় বা ব্যত্যয় হয় না। এ সংজ্ঞাটি অবশ্য সর্বত্র খাটে না, অনেক ব্যতিক্রম দেখা যায়। অব্যয়ের শ্রেণিবিভাগ নিয়েও নানা মত রয়েছে। এসব মতের সমন্বয়ে অব্যয়ের যে শ্রেণিবিভাগ করা চলে তা নিচে দেওয়া হলো : ১. অনন্বয়ী অব্যয় ২. সমুচ্চয়ী অব্যয় ৩. পদান্বয়ী অব্যয় ৪. ধ্বন্যাত্মক অব্যয় বা অনুকার অব্যয়।
১. অনন্বয়ী অব্যয় : যে অব্যয় বাক্যের অন্বয়ে কোনো ভূমিকা নেয় না তা অনন্বয়ী অব্যয়। এ শ্রেণির অব্যয় প্রধানত মনোভাববাচক বা অন্তর্ভাবাত্মক। যেমন- বাঃ, কী সুন্দর দৃশ্য। আয় রে আয় টিয়ে। “আহা, তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা,”রবীন্দ্র । এর আরও কয়েকটা উপশ্রেণি আছে। [দেখুন- মনোভাববাচক অব্যয়]।
২. সমুচ্চয়ী অব্যয় : যে অব্যয় বাক্যের অন্বয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট, তাকে বলা হয় সমুচ্চয়ী অব্যয়। [দেখুন-।] যেমন- বরং, এবং, পরন্তু, অধিকন্তু, না হয়, কিন্তু। সমুচ্চয়ী অব্যয়ের কয়েকটি উপশ্রেণি আছে।
৩. পদান্বয়ী অব্যয় : বাক্যের একটি পদের সঙ্গে অন্য পদের সংযোগ ঘটায় যে অব্যয়, তাকে পদান্বয়ী অব্যয় বলা হয় । প্রকৃতপক্ষে এ জাতীয় অব্যয় হলো অনুসর্গ। যেমন- দ্বারা, কর্তৃক, জন্য।
৪. ধ্বন্যাত্মক অব্যয় : বাংলায় প্রচুর ধ্বন্যাত্মক শব্দ আছে ঝলমল, কপাৎ, দুম, ফটাস, শনশন। এগুলোকেও অব্যয় বলে গণ্য করা হয়। তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ধ্বন্যাত্মক অব্যয় বা অনুকার অব্যয় [দেখুন]।

অব্যয়জাত বিশেষণ : বিশেষণ হিসাবে অব্যয় ব্যবহৃত হলে তাকে বলে অব্যয়জাত বিশেষণ। যেমন- অকস্মাৎ বৃষ্টি। “তুমি হঠাৎ-হাওয়ায় ভেসে-আসা ধন”রবীন্দ্র । আচ্ছা বিপদ। এভাবে কষ্ট দিয়ে চলে গেলে ধন।
অব্যয়যোগে ষষ্ঠী : কিছু কিছু বাক্যে অব্যয়ের সঙ্গে সম্বন্ধপদ ব্যবহৃত হয়। সম্বন্ধপদের বিভক্তিকে ষষ্ঠীবিভক্তি বলার রীতি আছে। এ কারণে সম্বন্ধপদের সঙ্গে অব্যয়ের ব্যবহারকে বলা হয় অব্যয়যোগে ষষ্ঠী। যেমন- বউয়ের সঙ্গে লড়াই। জোরের সঙ্গে বলা। মনের মতো মানুষ। পানির জন্য হাহাকার, বিদ্যুতের জন্য কাজ শেষ হয়নি।

অব্যয়ীভাব সমাস : সমাসের শ্রেণিবিশেষ। এ সমাসে পূর্বপদ অব্যয় কিংবা উপসর্গ। উত্তরপদ বিশেষ্য। যেমন- উপকূল (কূলের কাছে), গরমিল (মিলের অভাব), আকণ্ঠ (কণ্ঠ পর্যন্ত), আলুনি (নুনের অভাব), অনুগমন (পিছনে যাওয়া), উদ্বাস্তু (বাস্তু থেকে চ্যুত), প্রতিমূর্তি (মূর্তির মতো মূর্তি) (মূর্তির অনুরূপ)।
পূর্বপদে উপসর্গ থাকলে এ সমাসকে প্রাদি (প্র-আদি) সমাসও বলা হয়, প্রথমে ‘প্র’ ইত্যাদি উপসর্গের অস্তিত্বই এ নামকরণের কারণ। যেমন- প্রভাত (প্রকৃষ্টরূপে ভাত), প্রমনা (প্রকৃষ্ট মন যার)।
অভ্যয়ীভাব নামটি এই সমাসের গঠন অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। অর্থের বিচারে অনেক অব্যয়ীভাব সমাস অন্য শ্রেণির সমাসের মধ্যেও গণ্য হতে পারে। যেমন: প্রভাত, প্রমনা এই সমাসবদ্ধ শব্দ দুটি বহুব্রীহি শ্রেণির।
অব্যয়ের বিশেষণ : অব্যয় পদের বিশেষণকে বলা হয় অব্যয়ের বিশেষণ। যেমন- ঠিক সামনে নজর রাখ। অতি অকস্মাৎই ঘটল ঘটনাটা।
অবহট্ঠ : দেখুন- ভাষাবংশ।
অভ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অভচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অভচ্ (অভ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ’ বাদ যায় ‘অভ’ থাকে। যেমন- ঋষ্ + অভ (অভচ্) = ঋষভ; কৃ + অভ (অভচ্) = করভ; বৃষ্ + অভ (অভচ্) = বৃষভ; রাস্ + অভ (অভচ্) = রাষভ; গর্দ্ + অভ (অভচ্) = গর্দভ।
অভি : সংস্কৃত উপসর্গ। একাধিক অর্থে এ উপসর্গ ব্যবহৃত হয়। যেমন- সামনের দিক অর্থে : অভিমুখ, অভিগমন, অভিকেন্দ্র। যেমন- সম্যক অর্থে : অভিষেক, অভিভূত, অভিনিবেশ, অভিনন্দন, অভিভাবন। যেমন- খারাপ অর্থে : অভিশাপ, অভিচার, অভিসন্ধি।
অভিধা : দেখুন- প্রসিদ্ধ অর্থ।

অভিধান : ‘অভিধান’ কথাটির মূলে আছে ‘অভিধা’ শব্দ, যার অর্থ— ‘শব্দনিষ্ঠ অর্থবোধজনক শক্তিবিশেষ’। ‘সাহিত্যদর্পণে’ ‘অভিধা’র অর্থ— ‘সংকেকিত অর্থবোধক শব্দের শক্তিবিশেষ’। শব্দের যে শক্তিতে তার মুখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ প্রতীত হয়, সেটি হলো শব্দের ‘অভিধা’ শক্তি। এ হিসাবে ‘অভিধান’ কথাটির অর্থ হলো : ‘শব্দের অর্থধারক বা অর্থ-প্রকাশক গ্রন্থ’। অভি (সম্যক) ধা (ধাবন) + অন। অতএব অভিধানের সঙ্গে ব্যাকরণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। ইংরেজি : (উরপঃরড়হধৎু, ড়িৎফনড়ড়শ, ষবীরপড়হ অথবা াড়পধনঁষধৎু) এক ধরনের বই, যাতে একটি নির্দিষ্ট ভাষার শব্দসমূহ বর্ণানুক্রমে তালিকাভুক্ত থাকে এবং শব্দসমূহের অর্থ, উচ্চারণ, ব্যুৎপত্তি, ব্যবহার ইত্যাদি বর্ণিত ও ব্যাখ্যায়িত থাকে। অভিধান বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন কোনো অভিধানে শব্দের এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ থাকতে পারে, কোনো অভিধানে কোন শব্দ কীভাবে ব্যবহার হবে সেটির বর্ণনা থাকতে পারে; জীবনী-অভিধানে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনীর সংকলন থাকতে পারে, প্রযুক্তি সম্পর্কিত অভিধানে প্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট বিভাগ সম্পর্কিত শব্দসমূহের অর্থ ও ব্যাখ্যা থাকে। অনেক সময় অভিধানের ব্যাপ্তি বিস্তৃত হয়ে বিশ্বকোষের কাছাকাছি চলে যেতে পারে। যদিও বিশ্বকোষে ভুক্তিসমূহের বিস্তৃত ব্যাখ্যা থাকে যেখানে অভিধান শব্দসমূহের ভাষাগত দিক সম্পর্কে মনযোগ দিয়ে থাকে।

অভিধান (শব্দ-সংকেত) : অক্রি. > অসমাপিকা ক্রিয়া, অনু. > অনুকারক শব্দ, শব্দদ্বৈত, অব্য. > অব্যয়, অব্যয়ী. > অব্যয়ীভাব সমাস, আক্ষ. > আক্ষরিক, আল. > আলংকারিক, উপ. > উপসর্গ, একব. > একবচন, কর্মধা. > কর্মধারয় সমাস, ক্রি. > ক্রিয়া, ক্রিবি. > ক্রিয়া-বিশেষ্য, ক্রিবিণ. > ক্রিয়া-বিশেষণ, ক্লীব. > ক্লীবলিঙ্গ, তৎ. > তৎপুরুষ সমাস, তুল. > তুলনীয়, দ্বন্দ্ব. > দ্বন্দ্ব সমাস, দ্বিগু. > দ্বিগু সমাস, ধ্বন্যা. > ধ্বন্যাত্মক, নতৎ. > নঞ্ তৎপুরুষ সমাস, নিত্য. > নিত্য সমাস, পু. > পুংলিঙ্গ, প্রব. > প্রবচন, বহু. > বহুব্রীহি সমাস, বহুব > বহুবচন, বাগ. > বাগবিধি, বি. > বিশেষ্য, বিণ. > বিশেষণ, বিবিণ > বিশেষ্যের বিশেষণ, বিণ-বিণ. > বিশেষণের বিশেষণ, বিপ. > বিপরীতার্থক শব্দ, ব্য. > ব্যঙ্গার্থ, ব্যা. > ব্যাকরণ, মধ্য. > মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস, সং. > সংক্ষেপ, সচ. > সচরাচর, সম্বো. > সম্বোধনে, সম্মা. > সম্মানসূচক, সর্ব. > সর্বনাম, স্ত্রী. > স্ত্রীলিঙ্গ। অভিধান ব্যবহার নির্দেশিকা, বাংলা একাডেমি ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ, অষ্টাদশ পুনর্মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১৫।
অভিধা শক্তি : দেখুন- বাচ্যার্থ।

অভিশ্রুতি : অপিনিহিতির প্রভাবজাত ‘ই’ কিংবা ‘উ’-ধ্বনি পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সঙ্গে মিলে শব্দের পরিবর্তন ঘটায়। পরিবর্তনকে বলে অভিশ্রুতি। অভিশ্রুতির পরিবর্তনগুলো কয়েকটি ধাপে হয়। এর মধ্যে অপিনিহিত, স্বরসংগতি (দেখুন) ধ্বনিলোপ (দেখুন) সবকটি ক্রিয়া পরপর ঘটতে পারে। যেমন- মানিয়া  (অপিনিহিতির জন্য) মাইন্যা  মাইনিয়া  (স্বরসংগতির ফলে) মাইনিয়ে  (ধ্বনিলোপের জন্য) মাইনে  (আ + ই) মেইনে  (‘ই’-ধ্বনি লোপ) মেনে। যেমন- আজি  (অপিনিহিতির জন্য) আইজ  (‘ই’-ধ্বনি লোপ) আজ। এরকম যেমন- বাছিয়া  বেছে, চলিল  চলল, ধরিল  ধরল, মাঠুয়া  মেঠো, পানিহাটি  পেনেটি, নদীয়ার  নদের, আসিয়া  এসে [দেখুন- ধ্বনি পরিবর্তন]।

অভেদ সম্বন্ধ : সম্বন্ধপদটির সঙ্গে সম্বন্ধিতের ভেদ নেই, এমন কল্পনা করা হলে অভেদ সম্বন্ধ হয়। যেমন- জ্ঞানের আলো, দুঃখের পারাবার, বিলাসের ফাঁস।

অভ্যাসবোধক যৌগিক ক্রিয়া : দেখুন- যৌগিক ক্রিয়া।
অম১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অম, অমচ্, কমচ্, ণমূল ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ধাতুশেষে ‘অম’ যুক্ত হয়।
অম২ (অম) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- কর্দ্ + অম (অম) = কর্দম।
অমচ্ (অম) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘অম’ থাকে ‘চ্’, বাদ যায়। যেমন- অব্ + অম (অমচ্) = অবম; র্চ + অম (অমচ্) = চরম; প্রথ্ + অম (অমচ্) = প্রথম।
অমন : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় কমনচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অম্ব : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অম্বচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অম্বচ্ (অম্ব) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়। ‘অম্ব’ থাকে। যেমন- কড্ + অম্ব (অম্বচ্) = করম্ব; কদি + অম্ব (অম্বচ্) = কদম্ব।
অযু (অযু) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- সৃ + অযু (অযু) = সরযু।
অযোগবাহ বর্ণ : অনুস্বর (ং) ও বিসর্গ (ঃ) এ দুটি বর্ণকে বলা হয় অযোগবাহ বর্ণ। কারণ, “অন্য স্বর ও ব্যঞ্জনের সহিত ইহাদের যোগ কল্পিত হয় নাই, ইহারা যেন স্বর ও ব্যঞ্জনমালার বাহিরে অবস্থান করে”; সুনীতিকুমার।
অয়১ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় কয়ন্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অয়২ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় অয়চ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অয়চ্ (অয়) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায় ‘অয়’ থাকে। যেমন- উভ + অয় (অয়চ্) = উভয়; ত্রি + অয় (অয়চ্) = ত্রয়; দ্বি + অয় (অয়চ্) = দ্বয়।
অর্ : সংস্কৃত কৃৎপত্যয় অরন্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অর : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অরচ্, করন্, ক্ররন্, ডরন্ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দশেষে অর হয়।
অরচ্ (অর) : চম্ + অর (অরচ্) = চমর; বদ্ + অর (অরচ্) = বদর; শম্ব্ + অর (অরচ্) = শম্বর।
অরন্ (অর) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘নিহিত অ’ ও ‘ন্’ বাদ যায়, ‘র্অ’ থাকে। যেমন- অম্ + র্অ (অরন্) = অন্তর  অন্তঃ; ঋ + র্অ (অরন্) = অর্র; আ- ডম্ব্ + র্অ (অরন্) = আড়র্ম্ব। বাংলায় অবশ্য শেষের হস্-চিহ্ন দেওয়ার দরকার হয় না। প্রমিত বানানে শব্দের শেষে হস্ চিহ্ন নিরুৎসাহিত।
অর্থ : দেখুন- শব্দার্থ।

অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ (শব্দের) : সাধিত শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও প্রচলিত অর্থ অনেক সময় অভিন্ন হয় না। এদের পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্য হচ্ছে কি না, আর হলে কীভাবে হচ্ছে, এসব বিচারে শব্দকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এ ধরনের বিভাগীকরণকে বলা হয় শব্দের অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ। এ শ্রেণিগুলো হলো :
১. যৌগিক শব্দ : এ শ্রেণির শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও প্রচলিত অর্থ একই। যেমন- রাখাল, মিতালি, অণ্ডজ, মালগাড়ি, বৃক্ষশাখা।
২. রূঢ়ি বা রূঢ়শব্দ : এ শ্রেণির শব্দে ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সঙ্গে প্রচলিত অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই বা থাকলেও তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। যেমন- মণ্ডপ, প্রকৃত অর্থ যে মণ্ড পান করে। প্রচলিত অর্থ দেবালয় কিংবা ছাউনি। এরকম যেমন- হরিণ (শাব্দিক অর্থ যে হরণ করে), প্রচলিত অর্থ এক জাতীয় পশু। যেমন- মহাজন (শাব্দিক অর্থ মহান যে জন), প্রচলিত অর্থ পাওনাদার।
৩. যোগরূঢ় শব্দ : এ শ্রেণির শব্দে ব্যুৎপত্তিগত অর্থের কিছুটা সংকোচন হয়। যেমন- পঙ্কজ প্রচলিত অর্থে পদ্ম। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ পঙ্কে যা জন্মায়। পঙ্কে অনেক কিছুই জন্মায়, কিন্তু পঙ্কজ বলতে কেবল পদ্মকে বোঝায়। এরকম : জলদ মেঘ, আদিত্য সূর্য। পারিভাষিক শব্দ কিংবা পরিভাষাও এ শ্রেণির গণ্য হতে পারে। [দেখুন- শব্দ; শব্দার্থের পরিবর্তন]।
অর্থের অবনতি : দেখুন- শব্দার্থের অবনতি।
অর্থের উন্নতি : দেখুন- শব্দার্থের উন্নতি।
অর্থের পরিবর্তন : দেখুন- শব্দার্থের পরিবর্তন।
অর্থের প্রসার : দেখুন- শব্দার্থের প্রসার।
অর্থের সংকোচ : দেখুন- শব্দার্থের সংকোচ।

অর্থের সংশ্লেষ : শব্দের অর্থের প্রসার, সংকোচ, উন্নতি— এসব প্রক্রিয়ার ফলে অনেক সময় মৌলিক বা প্রাথমিক অর্থ থেকে শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে পড়ে, ফলে তাদের যোগসূত্র বের করা দুরূহ হয়ে যায়। এরকম হলে তাকে বলে অর্থের সংশ্লেষ। যেমন- ঘর্ম শব্দের মূল অর্থ গরম, কিন্তু বাংলায় হয়েছে ঘাম। যেমন- পাষণ্ড শব্দের মূল অর্থ ধর্ম সম্প্রদায়। কিন্তু এখন তার অর্থ ধর্মহীন অথবা অত্যাচারী। যেমন- দীব্য ছিল জুয়াখেলার পণ, হয়েছে দিব্যি বা শপথ। [দেখুন- রূঢ় শব্দ]
অর্ধচ্ছেদ : দেখুন- সেমিকোলন।

অর্ধতৎসম শব্দ : অনেক সংস্কৃত শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় ব্যবহৃত হয়। এ পরিবর্তনের পদ্ধতির দুটো প্রকারভেদ আছে। যেসব সংস্কৃত মুখের কথায়, কবিতার ভাষায় কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে এবং তাদের বানানও বদলে গেছে সেভাবে— সেসব শব্দই অর্ধতৎসম। [অন্যভাবে পরিবর্তিত রূপ— তদ্ভব শব্দ [দেখুন]। সংস্কৃত শব্দ ‘গৃহিণী’। ঐতিহাসিক ক্রমে তা হয়েছে ‘ঘরণী’। ঘরণী তদ্ভব শব্দ। কিন্তু লোকমুখে ‘গৃহিণী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গিন্নি’। এ গিন্নি অর্ধতৎসম শব্দ। এ জাতীয় শব্দ মুখের কথায় ও কবিতায় বেশি পাওয়া যায়। মুখের কথা থেকে অবশ্য অনেক অর্ধতৎসম শব্দ চলিত ভাষায় ঢুকে পড়েছে। যেমন- ভক্তি— ভকতি; রৌদ্র— রোদ; ত্রাস— তরাস; দর্শন— দরশন; জন্ম—জনম; স্বস্তি— সোয়াস্তি। [দেখুন- উৎসগত শ্রেণিবিভাগ (শব্দের); তৎসম শব্দ]।

অর্ধবিবৃত স্বরধ্বনি : উচ্চারণের সময়ে ঠোঁট কতটা ফাঁক হচ্ছে এ বিষয় বিচার করে স্বরধ্বনিকে যে কয়েকটি শ্রেণিতে ফেলা যায়, অর্ধবিবৃত স্বরধ্বনি তার একটি; এ ধ্বনির উচ্চারণে ঠোঁট দুটি আংশিকভাবে খোলা থাকে। স্বরধ্বনি ‘অ্যা’ ও ‘অ’ এ পর্যায়ে পড়ে। এ শ্রেণির স্বরধ্বনি সর্বদা নিম্নমধ্য। তন্মধ্যে ‘অ্যা’ সম্মুখ ও ‘অ’ পশ্চাৎ স্বরধ্বনি। [দেখুন- স্বরধ্বনির শ্রেণিবিভাগ]।

অর্ধব্যঞ্জন : ম্, ল্,র্ , ন্— এ চারটি ব্যঞ্জনধ্বনি অন্য ব্যঞ্জনধ্বনির বাহক হয়ে কোনো স্বরধ্বনির সাহায্য ব্যতীত দ্বিতীয় ব্যঞ্জনধ্বনিটিকে নিয়ে উচ্চারিত হতে পারে, এজন্য এদের বলা হয় অর্ধব্যঞ্জন। শ, ষ, স-এর ধ্বনিও এ পর্যায়ে পড়তে পারে। বাংলায় অর্ধব্যঞ্জনের ব্যবহার বিশেষ তেমন নেই। ইংরেজি বাট্ন্, বট্ল্, ইস্ম্, ব্যাট্ল্ প্রভৃতি শব্দের দ্বিতীয় দলের ন্, ল্, ম্ অর্ধব্যঞ্জনের উদাহরণ।
অর্ধমাগধী : দেখুন- ভাষাবংশ।

অর্ধসংবৃত স্বরধ্বনি : উচ্চারণের সময় ঠোঁট দুটি কতটা ফাঁক হচ্ছে বা করতে হয় এ বিচারে স্বরধ্বনিকে যতগুলো শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, অর্ধসংবৃত স্বরধ্বনি তন্মধ্যে অন্যতম একটা শ্রেণি। যে স্বরের উচ্চারণে ঠোঁট আংশিক বন্ধ থাকে, তা এ শ্রেণিতে পড়ে। যেমন- এ, ও। এ শ্রেণির স্বরধ্বনি সর্বদাই ঊর্ধ্বমধ্য। এর মধ্যে ‘এ’ হলো সম্মুখ স্বরধ্বনি আর ‘ও’ পশ্চাৎ স্বরধ্বনি। [দেখুন- স্বরধ্বনির শ্রেণিবিভাগ]

অর্ধস্বর : অন্তঃস্থ য (ইয়্), ও অন্তঃস্থ ব (ওয়্)— এ দুটি ধ্বনিকে বলা হয় অর্ধস্বর। বাংলায় অবশ্য এ ‘য’ ও ‘ব’-এর উচ্চারণ যেভাবে হয় তাকে আর অর্ধস্বর বলা চলে না। বরং ‘য়’ (ইয়্) উচ্চারণের বিচারে অর্ধস্বর। উল্লেখ্য, এ নামকরণটি ইংরেজি সেমি-ভাওয়েলের অনুকরণে করা হয়েছে।

অল : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অলচ্, কল্, কলচ্, কলন্ প্রত্যয়ের অনুবন্ধহীন রূপ।

অলচ্ (অল) : সংস্কৃত কৃৎপ্রতৃয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অল’ থাকে। যেমন— অঞ্চ্ + অল (অলচ্) = অঞ্চল; কুণ্ড + অল (অলচ্) = কুণ্ডল; কম্ব্ + অল (অলচ্) = কম্বল।

অলম্ : সংস্কৃত অব্যয়, কিন্তু এ অব্যয় উপসর্গের মতো ব্যবহৃত হয়। যে অব্যয়কে এভাবে ব্যবহার করা যায়, তাকে বলে গতি [দেখুন]। ‘অলম্’ একই সঙ্গে অব্যয় ও গতি। যেমন- অলম্ + কার = অলংকার; অলম্ + করণ = অলংকরণ।

অলংকার : যে গুণ দ্বারা ভাষার শক্তি বর্ধন ও সৌন্দর্য সম্পাদন হয় তাকে অলংকার বলা হয়।— সুনীতিকুমার। অলংকার দুই প্রকার। যথা : (১) শব্দগত বা ধ্বনিতগত অলংকার— শব্দালংকার। উদাহরণ : জোর যার, মুলুক তার; কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যক্ত চরাচর/ যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর। এবং (২) অর্থগত বা ভাবগত অলংকার— অর্থালংকার। যেমন— শিশির বিন্দুর ছলে/ উমাদেবী কুতুহলে। অন্যকথায়, অনুপ্রাস, উপমা, রূপক ইত্যাদি যেসব আভরণ কাব্য-দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তাকে অলংকার বলে। যেমন— “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” সুকান্ত।
অলি : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অলিচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অলিচ্ (অলি) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অলি’ থাকে। যেমন- অঞ্জ্ + অলি (অলিচ্) = অঞ্জলি।

অলু (অলু) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। যেমন- ক- মণ্ড্ + অলু (অলু) = কমণ্ডলু।

অলুক্ তৎপুরুষ সমাস : যে অলুক্ সমাস [দেখুন] তৎপুরুষ পর্যায়ভুক্ত, তাকে বলা হয় অলুক্ তৎপুরুষ সমাস। তৎপুরুষ সমাসে যতগুলো শ্রেণি আছে, অলুক্ তৎপুরুষ তার সব শ্রেণির হতে পারে। যেমন- ভ্রাতুষ্পুত্র (অলুক্ সমাস, সন্বন্ধ তৎপুরুষ); তেলেভাজা (অলুক্ সমাস, করণ তৎপুরুষ); পরাৎপর (অলুক্ সমাস, অপাদান তৎপুরুষ); দিনে ডাকাতি (অলুক্ সমাস, অধিকরণ তৎপুরুষ); গায়ে-পড়া (অলুক্ সমাস, উপপদ তৎপুরুষ)।
উপরে বর্ণিত উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় যে, তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ না হলে তাকে অলুক্ তৎপুরুষ সমাস বলে।

অলুক্ দ্বন্দ্ব সমাস : যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে বলে অলুক্ সমাস। কোনো দ্বন্দ্ব সমাসে [দেখুন] পূর্বপদের বিভক্তি বজায় থাকলে অলুক্ দ্বন্দ্ব সমাস হয়। যেমন- বুকেপিঠে (বুকে ও পিঠে); ঘরে বাইরে (ঘরে ও বাইরে); হাতে কলমে (হাতে এবং কলমে)। লক্ষণীয়, এ সমাসে উত্তরপদের বিভক্তিও বজায় থাকে।

অলুক্ বহুব্রীহি সমাস : যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে বলে অলুক্ সমাস। কোনো বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি বজায় থাকলে অলুক্ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন- মুখেভাত (যে অনুষ্ঠানে শিশুকে প্রথম ভাত খাওয়ানো হয়); মুখেমধু (মুখে মধু যার); গায়েহলুদ (গায়ে হলুদ দেওয়ার জন্য যে অনুষ্ঠান)।

অলুক্ সমাস : যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে বলা হয় অলুক্ সমাস। সমাসের এ শ্রেণিটি সমাসবদ্ধ শব্দটির গঠন বিচার করে করা হয়েছে। যেমন- বুকেপিঠে, তেলেভাজা, ভ্রাতুষ্পুত্র। অর্থের বিচারেও অলুক সমাসের কয়েকটি শ্রেণি হতে পারে : ১. অলুক দ্বন্দ্ব [দেখুন] : যেমন- বুকেপিঠে (বুকে এবং পিঠে)। ২. ‘অলুক্ বহুব্রীহি [দেখুন] : যেমন- মুখেমধু (মধু মুখে যার)। ৩. অলুক্ তৎপুরুষ [দেখুন] : যেমন দিনে ডাকাতি (দিনের বেলায় ডাকাতি)।

অল্পপ্রাণ ধ্বনি : যেসব ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণে জোরে নিঃশ্বাস-বায়ু ছাড়ার প্রয়োজন হয় না, তাদের বলা হয় অল্পপ্রাণ ধ্বনি। নিঃশ্বাস-বায়ুর অন্য নাম প্রাণ, কেউ কেউ বলেন প্রাণবায়ু। প্রাণ থেকে এ নামকরণ। বর্গের প্রথম, তৃতীয় এবং র, ল, শ, স, ড় বর্ণের উচ্চারণধ্বনি অল্পপ্রাণ। এ বিচারে বাংলা অল্পপ্রাণ ধ্বনি হলো : ক্, গ্, চ্, জ্, ট্, ড্, ড়্, ত্, দ্, প্, ব্,র্ , ল্, শ্, স্। [দেখুন- মহাপ্রাণ ধ্বনি]।
অল্পপ্রাণ বর্ণ : বাংলা অল্পপ্রাণ ধ্বনির [দেখুন] লিখিত প্রতীকগুলোকে বলা হয় অল্পপ্রাণ বর্ণ। যেমন- ক, গ, চ, জ, ট, ড, ড়, ত, দ, প. ব, র, ল, শ, স।
অশ্রুতি : মাঝের ‘য়’ উঠে যায়। যেমন—  মায়ের > মার, চায়ের > চার।
অস্ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অসি ও অসুন্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
অস : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় অসচ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।

অসংলগ্ন সমাস : সাধারণত সমাসবদ্ধ শব্দের পূর্বপদ ও উত্তরপদ একসঙ্গে জুড়ে লেখা হয়, যাতে তাদের একটি শব্দ বলে মনে হয়। অনেকসময় দু-পদের মাঝখানে হাইফেন দিয়েও সমাসবদ্ধ পদ লেখা হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক সময় সমাসবদ্ধ পদকেও পৃথকভাবে লেখা হয়। যেমন: হাতে তৈরি, গাছে পাকা, বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু। এসব উদাহরণের স্থূলাক্ষর অংশ প্রকৃতপক্ষে সমাসবদ্ধ। পৃথকভাবে লেখার জন্য তাদের প্রায়শ সমাস হিসাবে চেনা যায় না। এ ধরনের সমাসকে বলা হয় অসংলগ্ন সমাস। যেমন- বাংলা বানান সংস্কার, শুদ্ধ বানান চর্চা, ফুটবল খেলা, বিশ্ব কবি সম্মেলন।

অসচ্ (অস) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’ বাদ যায়, ‘অস’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- অত + অস (অসচ্)  অতস + (স্ত্রী-প্রত্যয়) ঈ = অতসী, চম্ + অস (অসচ্) = চমস, পন্ + অস (অসচ্) = পনস।

অসমাপিকা ক্রিয়া : যে ক্রিয়ারূপ বাক্যকে সম্পূর্ণতা দেয় না এবং বিধেয় এর বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু প্রকাশ করে না, তাকে বলে অসমাপিকা ক্রিয়া বা অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ। এরূপ ক্ষেত্রে বাক্য শেষ করতে হলে অন্য একটি ক্রিয়ার আগমন ঘটাতে হয়। যেমন- কথাটা শুনে তিনি খুশি [হলেন]; “আজ তোমারে দেখতে [এলেম]”— রবীন্দ্র; “টাকা মেরে পালালি শেষে?” সুকুমার। তুমি যে সুরের আগুন ছড়িয়ে [দিলে] মোর প্রাণে।”রবীন্দ্র।
এসব বাক্যে দেখতে, শুনে, মেরে প্রভৃতি অসমাপিকা ক্রিয়া। বাক্যে অসমাপিকা ক্রিয়া থাকলে, বাক্যটি সম্পূর্ণ করার জন্য সমাপিকা ক্রিয়ার [দেখুন] প্রয়োজন হয়। অসমাপিকা ক্রিয়ার কোনো কালরূপ হয় না। ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত করে অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ হয়। যেকোনো ধাতুর অসমাপিকা ও সমাপিকা দুরকম রূপ হতে পারে। কোন প্রত্যয় যুক্ত হচ্ছে— এ বিচারে অসমাপিকা ক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন ১. ল্যবর্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা পূর্বক্রিয়া। যেমন- তোমরা হাসিয়া খেলিয়া চলিয়া যাও। হেসে খেলে চলে যাও। “সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চূড়ামণি।”মাইকেল। ২. ভূতার্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা সাপেক্ষ সংযোজক। যেমন- তাড়াহুড়ো করলে কাজ হবে না। আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে ধন পায়। সভাপতি এলে সভার আসল কাজ শুরু হবে। ৩. তুমর্থ অসমাপিকা ক্রিয়া বা নিমিত্তার্থক অসমাপিকা ক্রিয়া। যেমন- সে গান শুনিতে গিয়েছিল। “আজ তোমারে দেখতে এলেম”রবীন্দ্র।

অসমাপিকা ক্রিয়াজাত ক্রিয়াবিশেষণ : অসমাপিকা ক্রিয়া যদি ক্রিয়া বিশেষণের কাজ করে, তবে তাকে অসমাপিকা ক্রিয়াজাত ক্রিয়াবিশেষণ বলা হয় । যেমন- সে চেঁচিয়ে বলল। লোকটি হাঁ-করে ঘুমায়। “গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে”অতুলপ্রসাদ।
অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যয় : ধাতুর সঙ্গে যে ধাতুপ্রত্যয় যুক্ত হলে অসমাপিকা ক্রিয়া হয়, সেটি হচ্ছে অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যয়। এর তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে— ১. ল্যবর্থ বা পূর্বক্রিয়াবোধক : ইয়া (সাধুভাষায়); এ, য়ে (চলিত ভাষায়)। যেমন- চল্ + ইয়া = চলিয়া; খা + ইয়া = খাইয়া; চল্ + এ = চলে; খা + য়ে = খায়ে  খেয়ে। ২. ভূতার্থ বা সাপেক্ষ সংযোজক : ইলে (সাধু); লে (চলিত)। যেমন- র্ক + ইলে = করিলে ; র্ক + লে = করলে। ৩. তুমর্থ বা নিমিত্তার্থক : ইতে (সাধু) ; তে (চলিত)। যেমন- র্ক + ইতে = করিতে ; র্ক + তে = করতে। এ প্রত্যয়ের চলিত রূপগুলোকে স্বতন্ত্র প্রত্যয় না বললেও চলে। বস্তুত খেয়ে, বলে, করলে, করতে প্রভৃতি চলিত রূপ যথাক্রমে খাইয়া, বলিয়া, করিলে, করিতে ইত্যাদি সাধুভাষার রূপগুলো পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। এ পরিবর্তনের মূলে আছে অভিশ্রুতি, অপিনিহিতি, স্বরসংগতি, স্বরধ্বনি লোপ ইত্যাদি।

অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ কর্ম : অনেক সময় অসমাপিকা ক্রিয়া বিশেষ্যের ভাব বহন করে এবং বাক্যে কর্মপদের কাজ করে। এরকম কর্মকে বলা হয় অসমাপিকা ক্রিয়ারূপ কর্ম। যেমন- “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে”— রবীন্দ্র। তিনি তো বাঁচতেই চেয়েছিলেন। তারা খেতে চেয়েছিল দুটো ভাত।
অসম্পূর্ণ ক্রিয়া : যেসব ক্রিয়াকে সবরকম কালে ও ভাবে ব্যবহার করা চলে না, তাদের বলা হয় অসম্পূর্ণ ক্রিয়া বা অপূর্ণরূপ ক্রিয়া বা পঙ্গু ক্রিয়া। যেসব ধাতু থেকে এ ধরনের ক্রিয়া হয়, তাদের নাম অসম্পূর্ণ ধাতু বা পঙ্গু ধাতু। যেমন- ‘আছ্’-ধাতুর ভবিষ্যৎকাল নেই, এই কালের জন্য ‘থাক্’-ধাতু ব্যবহার করতে হয়। যেমন- ‘বট্’-ধাতুর বর্তমানকাল ছাড়া অন্য কোনো কাল নেই। আমি আজ চোর, তুমি সাধু বটে। কিন্তু ‘বটব’, ‘বটতাম’ হয় না। যেমন- ‘যা’-ধাতুর ক্ষেত্রে অতীতকালে ‘গম্’-ধাতুর সাহায্য লাগে। যায়, যাবে কিন্তু গেল, গেলাম। পুরাঘটিত বর্তমানেও তাই।
অসম্পূর্ণ ধাতু : দেখুন- অসম্পূর্ণ ক্রিয়া।

অসম্মতিজ্ঞাপক অব্যয় : অনন্বয়ী অব্যয়ের শ্রেণিবিশেষ। নর্ঞ্থক বাক্য, অসম্মতিবোধক বাক্য প্রভৃতির জন্য এ ধরনের অব্যয় আবশ্যক। যেমন- না, মোটেও না, কখনোই না।

অসি১ (অস) : সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়। এটি শব্দে যুক্ত হলে ‘ই’ বাদ যায় ‘অস্’ অবশিষ্ট থাকে। প্রত্যয়ান্ত শব্দটির শেষের ‘স্’ বিসর্গ হয়। যেমন- অধর + অস্ (অসি) = অধস্  অধঃ, পূর্ব + অস্ (অসি) = পূরস্  পুরঃ।

অসি২ (অস্) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ই’ বাদ যায়, ‘অস্’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- উষ্ + অস্ (অসি) = উষস্  উষঃ; চন্দ্র- মা + অস্ (অসি) = চন্দ্রমস্  চন্দ্রমাঃ  চন্দ্রমা।

অসুন্ (অস্) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘উ’, ‘ন্’ বাদ যায়, ‘অস্’ থাকে। যেমন- অঙ্ঘ্ + অস্ (অসুন্) = অঙ্ঘস্  অঙ্ঘঃ; ঝ + অস্ (অসুন্) = অর্ণস্  অর্ণঃ; চিৎ + অস্ (অসুন্) = চেতস্  চেতঃ  চেত।

অস্ট্রিক : দেখুন- ভাষাবংশ।

অস্তিবাচক ক্রিয়া : দেখুন- অস্ত্যর্থ ক্রিয়া : দেখুন- নির্দেশাত্মক বাক্য।

অস্ত্যর্থক বাক্য : দেখুন- নির্দেশাত্মক বাক্য।

অস্ত্যর্থ ক্রিয়া : অস্তিত্ব, থাকা ইত্যাদি বোধক ক্রিয়াপদকে অস্ত্যর্থক ক্রিয়া বা অস্তিবাচক ক্রিয়া বলা হয়। হ, আছ্, বৃৎ, রহ্, থাক্ প্রভৃতি ধাতু থেকে এ শ্রেণির ক্রিয়া হয়। যেমন- বাড়িতে চাল আছে। তার অনেক টাকাকড়ি ছিল। তুমি আজ সাধু বটে। বট্-ধাতুর রূপ কেবল বর্তমান কালে হয়। [দেখুন- অসম্পূর্ণ ক্রিয়া]।

অ্যা : ‘অ্যা’ কোনো বাংলা স্বরবর্ণ নয়, কিন্তু অ্যাডভোকেট, অ্যাটম, অ্যাক্সিডেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি শব্দের উচ্চারণানুগ বানান লেখার জন্য ‘অ্যা’ ব্যবহার করা হয়। অ্যা-ধ্বনিটি বাংলায় বহুল ব্যবহৃত স্বরধ্বনি, কিন্তু এই স্বরধ্বনিটির জন্য কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বাংলা বর্ণমালায় নেই। তবে এই ধ্বনির প্রতীক হিসাবে অ্যা-এর ব্যবহার ব্যাপক। এ ধ্বনি নিম্নমধ্য, অর্ধবিবৃত, সম্মুখ, প্রসৃত ও তালব্য। ‘্যা’ চিহ্নটি বর্ণের সঙ্গে যুক্ত করে ‘অ্যা’ উচ্চারণ নির্দেশ করা হয়। সম্ভবত ত্যাগ, ব্যাকরণ প্রভৃতি সংস্কৃত শব্দের বাংলা উচ্চারণের অনুষঙ্গে এ চিহ্নটি, যা প্রকৃতপক্ষে য-ফলা আ-কার, ব্যবহারে এসেছে। সাধারণত বিদেশি ও অসংস্কৃত শব্দের অ্যা-ধ্বনি নির্দেশের জন্য ‘অ্যা’ কিংবা ‘্যা’ অধিক ব্যবহার করা হয়। কেন, খেলা, দেখা, এক, এত লেখা হয়, কিন্তু ক্যানো, খ্যালা, দ্যাখা, অ্যাক, অ্যাত হয় না। অন্যদিকে ক্যাপ, ক্যাটকেটে, ন্যাপথলিন, ব্যাগ, অ্যাসিড প্রভৃতি শব্দে ‘অ্যা’ অথবা ‘্যা’ লেখা হয়। অন্য আরও কিছু সংযুক্ত ব্যঞ্জনেরও ‘অ্যা’ উচ্চারণ আছে। যেমন- ব্যবহার (উচ্চারণ—ব্যাবোহার); জ্ঞান (উচ্চারণ—গ্যাঁন্)। অ্যা-ধ্বনির জন্য একটি পৃথক স্বরবর্ণ ও স্বরচিহ্ন প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এখনও তার প্রচলন হয়নি। বর্ণানুক্রমিক সূচি তৈরিতে ‘অ্যা’-কে অ-এ য-ফলা আ-কার ও ক্যা, ন্যা ইত্যাদিকে যথাক্রমে ক-এ য¬-ফলা আ-কার, ন-এ য-ফলা আ-কার ধরা হয়। বর্ণানুক্রমিক সূচিতে এভাবে তার স্থান নির্দিষ্ট হয়। [দেখুন- স্বরধ্বনির শ্রেণিবিভাগ]।

error: Content is protected !!