বাংলা ব্যাকরণ অভিধান: ব্যাকরণ অভিধান: একমলাটে ব্যাকরণ অভিধান

চ১ : বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ ও ‘চ্’-ধ্বনির প্রতীক। এটি প্রশস্ত দন্তমূলীয় অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি। চ-বর্গের প্রথম বর্ণ। চ্-ধ্বনি তালব্য, ঘৃষ্ট, অঘোষ ও অল্পপ্রাণ। এ ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনির অন্তর্গতও বলা হয়ে থাকে। [ দেখুন ব্যঞ্জনধ্বনি]।
চ২ : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় চট্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
চট্ (চ) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘ট্’ বাদ যায়, ‘চ’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- ্রসিব্ + চ (চট্) = সূচ।
চণ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় চরণ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
চণপ্ (চণ) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে ‘প্’ বাদ যায়, ‘চণ’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- মায়া + চণ (চণপ্) = মায়াচণ (মায়াখ্যাত)।
চতুর্থী তৎপুরুষ : দেখুন- সম্প্রদান তৎপুরুষ; নিমিত্ত তৎপুরুষ।
চতুর্থী বিভক্তি : দেখুন- সম্প্রদান কারকের বিভক্তি।
চন (চন) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে পুরোটাই থেকে যায়। যেমন- কথম্ + চন = কথঞ্চন; কদা + চন = কদাচন।
চন্দ্রবিন্দু : বাংলা বর্ণমালার অন্যতম বর্ণ ঁ প্রকৃতপক্ষে অনুনাসিক ধ্বনির চিহ্ন। চন্দ্রবিন্দু কোনো স্বরবর্ণ অথবা ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব্যবহৃত হয় এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণের কিংবা স্বরচিহ্নটির মাথায় বসে। যেমন- আঁশ, বাঁধা, গাঁইতি, বঁড়শি, পিঁড়ি, পৌঁছা, চাঁদ, সাঁকো ইত্যাদি।
চ-বর্গ : বাংলা বর্ণমালার ব্যঞ্জনবর্ণের পঁচিশটি বর্ণকে পাঁচটি বর্গে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি বর্গের প্রথম বর্ণের নামে বর্গটির নামকরণ করা হয়। চ, ছ, জ, ঝ, ঞ এ পাঁচটি বর্ণ চ-বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এদের প্রথম চারটি তালব্যব্যঞ্জন ও শেষটি, অর্থাৎ ‘ঞ’ নাসিক্যব্যঞ্জন।
চমস্কি : মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চম্স্কি সংগঠনবাদের বিরুদ্ধে লেখেন এবং ভাষা যে একটি মানসিক প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর সব ভাষাই যে কিছু সর্বজনীন বিন্যাস অনুসরণ করে, সে বিষয়ের ওপর জোর দেন। চম্স্কির এ লেখার ফলে ভাষাবিজ্ঞান প্রচলিত ধারা হতে একটি নতুন রূপ পায়। চম্স্কির মতে, কোনো ব্যক্তির অচেতন, অব্যক্ত ভাষাবোধ এবং ভাষাপ্রয়োগ দুটি ভিন্ন বস্তু। ভাষাবিজ্ঞানীর কাজ হলো মানুষের ভাষাবোধ যেসব অন্তর্নিহিত মানসিক সূত্র দিয়ে গঠিত সেগুলো আবিষ্কার করা। এ প্রস্তাবের সমর্থনে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ঝুহঃধপঃরপ ঝঃৎঁপঃঁৎবং শিরোনামের গ্রন্থে চম্স্কি উপস্থাপন করেন তাঁর উদ্ভাবিত ‘রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ’ নামের একটি ধারণা। এ গ্রন্থে বর্ণিত ব্যাকরণের সূত্রগুলো দিয়ে কোনো একটি ভাষার সমস্ত ‘বৈধ’ বাক্যের গঠন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। চম্স্কি আরও বলেন যে, সব ভাষার মানুষই ভাষাবিষয়ক কিছু সর্বজনীন ধারণা নিয়ে জন্মায়। তিনি যাদের সমষ্টিগত নাম দেন ‘বিশ্বজনীন ব্যাকরণ’। এই ব্যাকরণের সীমা উদ্ঘাটন করাও ভাষাবিজ্ঞানীর অন্যতম কাজ। প্রসঙ্গত, চম্স্কীয় ধারায় ‘ব্যাকরণ’ বলতে ভাষাবিষয়ক প্রথাগত কিছু আনুশাসনিক নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং মানবমনের বিমূর্ত ভাষাবোধ, যা মানুষকে কথা বলতে, বুঝতে কিংবা নতুন ভাষা শিখতে সাহায্য করে, সেটিকে নির্দেশকারী ও ব্যাখ্যাকারী ভাষাবৈজ্ঞানিক সূত্রসমষ্টিকে বোঝায়। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান মূলত চম্স্কি প্রস্তাবিত রূপান্তরমূলক ব্যাকরণের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তাবিত বিভিন্ন ধরনের ব্যাকরণিক কাঠামোর গবেষণা। চম্স্কি বাক্যতত্ত্বকে ভাষাবিজ্ঞানের মূলধারা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকের প্রাথমিক প্রকাশের পর চম্স্কির নিজস্ব তত্ত্বের বিবর্তন ঘটেছে বেশ কয়েকবার : ‘মানতত্ত্ব’ থেকে শুরু করে ‘সম্প্রসারিত মান তত্ত্ব’, ‘শাসন ও বন্ধন তত্ত্ব’, ‘নীতি ও পরামিতি’, এবং হালনাগাদ ‘ন্যূনতমবাদী প্রকল্প’। এছাড়া চম্স্কীয় তত্ত্বের অনুসরণে কিছু তত্ত্ব গড়ে উঠেছে, যেগুলো ভাষাবিজ্ঞানের লক্ষ্য-সংক্রান্ত চম্স্কীয় মতবাদ ও স্বতঃসিদ্ধগুলো বহুলাংশে মেনে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। তন্মধ্যে ‘কারক ব্যাকরণ’, ‘সাধারণীকৃত পদ সংগঠন ব্যাকরণ’, ‘সৃষ্টিশীল অর্থবিজ্ঞান’, ‘মস্তক-চালিত পদসংগঠন ব্যাকরণ’, ‘আভিধানিক কার্যমূলক ব্যাকরণ’, ‘সম্পর্কমূলক ব্যাকরণ’ ও ‘অপটিমালিটি তত্ত্ব’ অন্যতম। চম্স্কীয় মূলধারার বাইরে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে শ্রেণিকরণবাদী একটি ধারা আছে, যে ধারার অনুসারী ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষাকে তাঁদের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভাজনের চেষ্টা করেন।
চলিত ভাষা : “সাধারণ গদ্য-সাহিত্যে ব্যবহৃত বাঙ্গালা ভাষাকে সাধু-ভাষা বলে। সমগ্র বঙ্গদেশে গদ্য-লেখায়, চিঠি-পত্রাদিতে প্রায়শ এই ভাষাটি ব্যবহৃত হয়।সুনীতিকুমার।” ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, “তদ্ভব শব্দ, সঙ্কুচিত ক্রিয়া, হ্রস্বীকৃত সর্বনাম পদ এবং লেখকের মনোভাব অনুসারী পদবিন্যাস প্রণালীর ব্যবহারসহ যে স্বচ্ছন্দ, চটুল ও সর্বজনীন সাহিত্যিক গদ্যরীতি কলিকাতা ও ভাগীরথী তীরবর্তী অঞ্চলের মুখের ভাষার আদলে গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার নাম চলিত ভাষা।” বাংলা যাঁদের মাতৃভাষা, তাঁরা যে ভাষায় কথাবার্তা বলেন, সে ভাষা চলিত ভাষা। কিছুদিন আগেও (এবং অংশত এখনও) বাংলা কথা বলার ভাষা ও লেখার ভাষা আলাদা ছিল, এবং এ লেখার ভাষাকে বলা হয় সাধু ভাষা [দেখুন]। সাধু ও চলিত ভাষার প্রধান পার্থক্য ক্রিয়ার রূপে। সাধু ভাষার ক্রিয়া হইল, করিলাম, করিতেছে, বলিয়াছিল, চলিবে, ধরিতেছিলে। এর চলিত রূপ যথাক্রমে হলো, করলাম, করছে, বলেছিল, চলবে, ধরছিল। সর্বনাম ও প্রদার্শিত নির্দেশকের ব্যবহারেও কিছু তফাত আছে। মুখের ভাষা অঞ্চল ভেদে বদলায়। অর্থাৎ নানা অঞ্চলের চলিত ভাষার রূপ এক নয়। কলকাতায় চলিত ভাষা ঢাকা অথবা খুলনা অঞ্চলের চলিত ভাষায় অনেক পার্থক্য দেখা যায়। অথচ এসব অঞ্চলের সাধুভাষার রূপ অভিন্ন। কিন্তু সাধুভাষার পরিবর্তে যখন চলিত ভাষা সাহিত্যে, খবরের কাগজে, রেডিয়ো, টেলিভিশন ইত্যাদি মাধ্যমে ব্যবহৃত হতে লাগল, তখন দেখা গেল যে কলকাতা অঞ্চলে প্রচলিত চলিত ভাষাই সেখানে প্রাধান্য পেল। এ ভাষা এখন বাংলার প্রমিত চলিত ভাষা বা শিষ্ট চলিত ভাষা। স্থান বা অঞ্চলভেদে ভাষার যে রূপভেদ, তাকে বলা হয় আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা [দেখুন]।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী স্থানের ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজে ব্যবহৃত মৌখিক ভাষা, সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ মৌখিক ভাষা বলিয়া গৃহীত হইয়াছে। এই মৌখিক ভাষাকে বিশেষভাবে ‘চলিত ভাষা’ বলা হয়।”
চা : দেখুন- চে।
চানশ্ (আন) : সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ‘চ্’, ‘শ্’ বাদ যায়, ‘আন’ অবশিষ্ট থাকে। যেমন- ঈশ্ + আন (চানশ্) = ঈশান।
চি : বাংলায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দপ্রত্যয়। যেমন- মশাল + চি = মশালচি; তবলা + চি = তবলচি; বন্দুক + চি = বন্দুকচি; ধুনা + চি = ধুনাচি  ধুনুচি।
চিৎ (চিৎ) : সংস্কৃত তদ্ধিপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে পুরোট টিকে থাকে। যেমন- কিম্ + চিৎ = কিঞ্চিৎ; কথম্ + চিৎ = কথঞ্চিৎ; কদা + চিৎ = কদাচিৎ।
চুঞ্চু : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয় চুঞ্চুপ্-এর অনুবন্ধহীন রূপ।
চুঞ্চুপ্ (চুঞ্চু) : সংস্কৃত তদ্ধিপ্রত্যয়। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে ‘প্’ বাদ যায়, ‘চুঞ্চু’ অবশিষ্ট থাকে। অভ্যস্ততা, নৈপুণ্য ইত্যাদি বোঝানোর জন্য প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হয়। যেমন- অক্ষর + চুঞ্চু (চুঞ্চুপ্) = অক্ষরচুঞ্চু; তর্ক + চুঞ্চু (চুঞ্চুপ্) = তর্কচুঞ্চু; বিদ্যা + চুঞ্চু (চুঞ্চুপ্) = বিদ্যাচুঞ্চু।
চে, চা : বাংলা শব্দপ্রত্যয়। আভাস, আচরণ প্রভৃতি বোঝানোর জন্য এ প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়। যেমন- নীল + চে = নীলচে; লাল + চে = লালচে; কোনা + চে = কোনাচে। সাধুভাষায় কখনো ‘চা’ হয়। যেমন- নীল + চা = নীলচা; কোনা + চা = কোনাচা।
চি¡ : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। আগে ছিল না, কিন্তু এখন আছে বা হয়েছে এ অর্থে চি¡-প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়। চি¡-প্রত্যয়ান্ত শব্দ কৃ, ভূ প্রভৃতি ধাতুর পূর্বে বসে নতুন শব্দ তৈরি করে। চি¡-প্রত্যয়ের সবটুকু বাদ যায়। যে শব্দের সঙ্গে প্রত্যয়টি যুক্ত হয়, তার শেষে ‘অ’ থাকলে অ-স্থানে ‘ঈ’ হয়। এরকম, ‘ঋ’-স্থানে ‘রী’ ও অন্য হ্রস্বধ্বনি দীর্ঘ হয়। যেমন- লঘু + চি¡  লঘূ + কৃ + অনট্ = লঘূকরণ; স্ব + চি¡  স্বী + কৃ + অ (ঘঞ্) = স্বীকার; অঙ্গ + চি¡  অঙ্গী + কৃ + অন (ল্যুট্) = অঙ্গীকরণ; ভস্ম + চি¡  ভস্মী + ভূ + ত (ক্ত) = ভস্মীভূত; সম + চি¡  সমী + ভূ + অন (ল্যুট্) = সমীভবন; শ্রোতৃ + চি¡  শ্রোত্রী + ভূ + অনট্ = শ্রোত্রীভবন।

error: Content is protected !!