বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্ক

অসীম ভুঁইয়া

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্ক: শুবাচ

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/বাংলা-ব্যাকরণ-ও-বিতর্ক/

অনুসজ্জায়: শ্রাবন্তী নাহা অথই

 

অসীম ভুঁইয়া
 
 
সূচিপত্র
 
পর্ব-১  মাতৃভাষা ও শব্দ গঠনের ললিপপ
 
পর্ব ২: বাংলা লিঙ্গের (gender)ক্যাকটাস
 
পর্ব-৩: বাংলা অব্যয়ের বহু বিবাহ
 
পর্ব-৪: বাক্যের কত ঢং! 
পর্ব-৫: বাক্যের গঠনগত আড়াই প্যাঁচ
 
পর্ব-৬: বিশেষণপদের অসীম আকাশ 
 
পর্ব-৭: বিশেষ্য – শব্দের ঝাড়বাতি 
 
পর্ব-৮: শব্দের গঠন ও অর্থের মেরুকরণ 
 
পর্ব-৯: সর্বনামপদের জলসাঘর 
 
পর্ব-১০: বাচ্যের বীতাধুনিক ক্যারিশ্মা
 
পর্ব-১১: অনুসর্গের কেরামতি
 
পর্ব-১২: বাংলা ধাতুর বিচিত্র রূপ
 
পর্ব-১৩: উপসর্গের স্বর্গবাস
 
পর্ব-১৪:বাংলা উক্তি ও উক্তি-পরিবর্তনের মুক্তিপথ
 
পর্ব-১৫: বাংলা দল( syllable) ও তার বিশ্লেষণ 
 
পর্ব-১৬:  বাগধারা, বিশিষ্টার্থক শব্দ ও প্রবাদ-প্রবচন
 
পর্ব-১৭:  বাংলা শব্দদ্বৈত 
 
পর্ব-১৮:  বাংলা বচনের খেলাঘর
 
পর্ব-১৯:  শব্দার্থ পরিবর্তন ও তার কারণ
 
২০.শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা
 
 
 
 
 
 
 
 
পর্ব ১
মাতৃভাষা ও শব্দ গঠনের ললিপপ
 
“ব্যাকরণ ” শব্দটির মধ্যে কোথাও যেন একটা অকারণ ভীতি প্রতিশব্দের মতো স্থিতু হয়ে আছে। আর ব্যাকরণবিদ যেন নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা এক ভয় ভয় ভাবের গ্রহান্তরের জীব। এধরনের একটা চালু ধারণা প্রবাদের নামান্তর হতে বসেছে। তাই ব্যাকরণ ও ব্যাকরণবিদ দুজনকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। না জানি কখন কী সব ফুলটুল ধরে বসবে। কিন্তু আদতে কি তাই? এই ভীতি ও প্রবাদকল্পটি কি কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না সৃষ্টিশীলতা তথা ভাষামানতার ক্ষেত্রে? সত্যিই তাই, কিন্তু প্রথাগত ভাবনা থেকে বেরিয়ে গেলে দেখতে পাব “আলাদিনের সেই আশ্চর্য-প্রদীপ”  অথবা রোজ দশটি কবিতা লিখতে না পেরে ঘুম না আসা সেই জনৈক কবিকে। আমরা যারা কথা বলি বা ভাষা বলি, চালু নিয়মে তা কখনও ভুল বা ঠিক, কিন্তু বিষয়টি যে তার অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করে তা ধরিয়ে দিতেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আমরা যা বলি সবই প্রায় অজান্তেই ব্যাকরণ মেনেই বলি, বাংলা  যেহেতু মাতৃভাষা তাই তার একটা ব্যাকরণ শৈশব থেকেই মাথার ভেতরে কাজ করে চলে নীরবে-নিভৃতে। অর্থাৎ ব্যাকরণ বা ভাষা শেখার যন্ত্রটি মাথার ভেতরে বসানো থাকে জন্ম থেকেই। সর্বকালের অন্যতম সেরা ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি তাই মাথাকে ভাষা শেখার যন্ত্র বা পদ্ধতি বলেছেন। (Language acquisition device or language acquisition system, সংক্ষেপে LAD / LAS)। সেই কারণে ব্যাকরণকে ভয় পাওয়া  বা ভুল বোঝার কিছুই নেই। যেমন শিশু যদি আনমনে বলে ফেলে ‘আমার খিদে পেয়েছে’ বা ‘আমি একটা আইসক্রিম খাব।’  সেক্ষেত্রে সে অজান্তেই ব্যাকরণ মেনেই কথাটি বলল। অর্থাৎ মাতৃভাষার ক্ষেত্রে ব্যাকরণ অনেকটাই সহজাত, শুধু তাকে ধরিয়ে দিতে হয়, নামকরণ করতে হয়, বা কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সামান্য পরিমার্জনও করতে হয়, এইটুকু যা। আবার শিশু যখন একটুখানি বড় হয় তখন তাকে যদি শেখাই, ‘ আমি বাড়ি যাব।’ এই বাক্যটি। শিশু তা অনায়াসে বলতে পারবে এবং তারপর  সে বলতেই পারে, ‘বাড়ি যাব আমি। ‘বা ‘আমি যাব বাড়ি।’ অর্থাৎ সে একটা বাক্য থেকে শিখন কৌশল অটোমেটিক রপ্ত করে আরও দুটি বাক্য নিজেই তৈরি করে নিল, তার জন্য তাকে নতুন করে শিখতে হয় না। তার মাথায় যে অলিখিত ব্যাকরণ যন্ত্রটি রয়েছে সেই তাকে এভাবে শিখিয়ে দিচ্ছে। তাই ‘সহজাত’ শব্দটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি আফ্রিকান কোনো শিশুকে, ইংল্যান্ডের কোনো শিশুকে বা অন্য ভাষার কোনো শিশুকে এভাবে বাংলা শেখানো হয় তখন সে অন্য দুটি বাক্য বলতে পারবে কিনা সন্দেহ, অর্থাৎ মাতৃভাষার সহজাত ক্ষমতা অনেকটা পরম্পরায় তৈরি হয়ে যায়। তাই ব্যাকরণের আটপৌরে বাংলা এমন কোনো গ্রহান্তরের আজব বিষয় নয় যে শুনলেই ভয় পেতে হবে। আরেকটি বিষয় শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো। মুখের ভাষা ও লেখার ভাষা কি একই?  উত্তর, অনেক ক্ষেত্রে এক আবার অনেক ক্ষেত্রে এক নয়। কারণ আমরা লেখার ক্ষেত্রে বা গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে যে ভাষা সাধারণত ব্যবহার করি তাকে মান্য বাংলা বলা হয়ে থাকে, যদিও তা বহু বিতর্কিত একটি বিষয়। পরে তা আলোচনা করা যাবে।
 
 
 
তবে  মান্য চলিত ভাষাতে আমরা যে সবসময় কথা বলি এমনটা কিন্তু নয়। কারণ নানা উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছেন যারা তাদের ভাষা অনুযায়ী কথা বলে, যা হয়ত লেখায় খুব ব্যবহৃত হয় না। তবে সংলাপের ক্ষেত্রে এদের চল আছে। আর একটি বিষয় মনে রাখতে হয় প্রথাগত মান্য ভাষা হোক আর না হোক, একটি ভাষার ক্ষেত্রে তার উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব মান্য ভাষা থেকে কোনো দিক থেকেই কম বা বেশি নয়। সাধারণত জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা, শিক্ষার হার, লেখার মান, জনসংখ্যা প্রভৃতি নানা দিক থেকে এ ধরনের একটি প্যারামিটার আমরা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছি। সহজবোধ্যতারও একটা ভূমিকা অবশ্যই রয়েছে সেখানে। তবু আমরা আলোচনার সুবিধার্থে  মান্য চলিত বাংলাকে প্রাধান্য দিয়ে মান্য চলিত ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আর হ্যাঁ, মাতৃভাষা ব্যাপারটিও একটু বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ একটি ভাষার মাতৃভাষা একই ধরনের নাও হতে পারে। যেমন আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি , সার্বিকভাবে দেখতে গেলে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু বিষয়টিকে এত স্থূলভাবে দেখলে চলবে না। কারণ ঝাড়খন্ডি উপভাষার বাংলা রাঢ়ী উপভাষার মানুষ পরিষ্কার বুঝতে পারবে না যদি তার ওই  উপভাষা সম্পর্কে আগের থেকে জ্ঞান না থাকে। আবার বঙ্গালি উপভাষার  সঙ্গে কামরূপীর বিস্তর ফারাক। অন্যদিকে উড়িষ্যা বর্ডারের বাংলা, অসম বর্ডারের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তো একেবারেই বুঝতে পারবে না। যেমন পুরুলিয়া গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা খড়গপুর বা মেদিনীপুর শহরের মানুষ ঠিকঠাক বুঝতে পারে না, যদি কিছুটা পরিচিতি না থাকে। অর্থাৎ একদিকে উপভাষা অন্যদিকে তার অন্তর্গত বিভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার নানা বৈচিত্র্য রয়েছে।  তাই মাতৃভাষা বিষয়টি অত সহজ ব্যাপার নয়। কারণ একটি শিশু যদি ঢাকাতে জন্মায় সে যে বাংলায় কথা শিখবে সেটা তার মাতৃভাষা। দাঁতনের শিশু যে বাংলা শিখবে সেটি তার মাতৃভাষা। আবার মেদিনীপুর বা কলকাতার শিশু যে বাংলায় কথা শিখবে সেটি তার মাতৃভাষা। পরবর্তীকালে সে যখন বড় হতে থাকবে লেখার বাংলায় প্রবেশ করবে, মান্য বা প্রমিত বাংলা কী  বুঝতে পারবে তখন সে, ভাষার সেই রূপটি অনুধাবনের চেষ্টা করবে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে তখন তাকেও মাতৃভাষা বলা যেতে পারে। তাই বাংলা মাতৃভাষা মানেই মান্য চলিত বা প্রমিত বাংলা ভাষা নয়। উপভাষা বা আঞ্চলিক রূপ ব্যক্তিবিশেষে মাতৃভাষার গুরুত্ব পায় এবং তা যথেষ্ট মর্যাদারও।
 
 
 আজকের সাধারণ আলোচনায় ভাষার অন্যতম প্রাথমিক উপাদান হিসেবে শব্দ গঠন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক স্তরের আলোচনা সেরে নিতে  চাই। শব্দ   গঠনের ক্ষেত্রে একটি বা একাধিক বর্ণের সাহায্য নেওয়া হয়। যেমন, ভ, আ, ত নিয়ে ‘ভাত।’ বর্ণগুলো  একটা নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানোর পর অর্থবোধ তৈরি হলেই ‘শব্দ।’ বর্ণসজ্জা আগে পরে করলেই বিপদ। অর্থাৎ ‘ভতা’  লিখলে হবে না।  অর্থবোধের  ক্ষেত্রটা ঠিক থাকা চাই। অর্থবোধ বিষয়টি আবার বেশ মজার। কেউ যদি বলে ‘পথমানতা’ তো একটি শব্দ।
 
 
 আপনি কেন শব্দ নয়  বলছেন? ‘পথমানতার’ কোনো অর্থ নেই, তাই শব্দ নয়। প্রথাগতভাবে এটির প্রয়োগ ও প্রচারও নেই। কিন্তু কেউ যদি বলে ‘চলমানতার’ ‘মানতা’ ও  সঙ্গে ‘পথ’ শব্দটি বসিয়ে এই শব্দটি নতুন করে নির্মাণ করেছি এবং তার অর্থ ধারাবাহিক পথ চলা বা চলমানতারই এক অন্য রূপ। হ্যাঁ,  তখন তাকে শব্দ বলতেই হয়। অর্থাৎ এভাবে একটি নতুন শব্দ তৈরি হল। যা হয়তো আগে ছিল না, কিন্তু তার যদি অর্থবোধ তৈরি হয়ে যায় তবে তাকে শব্দ বলতে আর দ্বিধা থাকে না। নতুন নতুন শব্দ তো এভাবেই তৈরি হয়। তবে এই সমস্ত শব্দের গ্রহণযোগ্যতা যত বাড়তে থাকে তার প্রচারও ততই বাড়তে থাকে। অন্যরাও এর প্রয়োগ করে। আবার গ্রহণযোগ্যতা না তৈরি হলে তার বিপরীতটা ঘটে যায়। অর্থাৎ শব্দটির গুরুত্ব কমে যায় এবং পরে  হয়তো তা অপ্রচলিত হয়ে যায়। অন্যদিকে একটি বর্ণও শব্দ হাতে পারে। ‘এ’ একটি বর্ণ। আবার শব্দও। কারণ ‘এ’ অর্থ প্রকাশের ক্ষমতা রাখে। “এ জীবন এক মায়াকক্ষ”। এখানে ‘এ’  নির্দিষ্ট অর্থ বহন  করছে বৈকি! এভাবে এক বা একাধিক বর্ণ শব্দ তৈরি করে। শব্দের প্রয়োগ বৈচিত্র্যও বাংলা ভাষায় প্রচুর। শব্দের অর্থ যেমন তার সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে আবার সমসাময়িক একই শব্দও নানা অর্থে প্রয়োগ হতে পারে। প্রসঙ্গ, প্রয়োজনীয়তা, আভিধানিক ক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে আসা প্রভৃতি নানা দিক রয়েছে, যা এই  ব্যাকরণ – ধারাবাহিকে ধীরে ধীরে আলোচিত হবে।(চলবে)
 

 

পর্ব ২
 
বাংলা লিঙ্গের (gender)ক্যাকটাস
 
এই ব্যাকরণ ধারাবাহিকের মূল লক্ষ্য পাশ্চাত্য বা সংস্কৃত ব্যাকরণের অন্ধ অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে বিশুদ্ধ বাংলা ব্যাকরণ লেখার চেষ্টা… তবে ঐতিহ্যের যুক্তিগুলিকে অবশ্যই সম্মান দেওয়া।
  
  প্রথাগত ব্যাকরণে স্ত্রী বা পুরুষকে বোঝানোর জন্য কিছু চিহ্ন বা লক্ষণের আশ্রয়ে নেওয়া হয়। এই লক্ষণগুলি দেখে স্ত্রী-পুরুষ ভেদ যেমন বোঝা যায় তেমনি স্ত্রী-পুরুষ নয় এমন বস্তুর ভেদাভেদও বোঝা যায়। আবার অন্যদিকে এই চিহ্নগুলি স্ত্রী – পুরুষ উভয়কেও ইঙ্গিত করতে পারে। এ ধরনের চিহ্ন বা লক্ষণই লিঙ্গ। যেমন: বাবা, মা, দাদা, দিদি, চেয়ার, টেবিল, গাছ, নদ, নদী, শিশু, সন্তান প্রভৃতি। অর্থাৎ প্রথাগত ব্যাকরণে পুরুষ – বাচক শব্দ বোঝালে পুংলিঙ্গ, স্ত্রী বাচক শব্দে স্ত্রীলিঙ্গ, স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কে বোঝালে উভয়লিঙ্গ এবং জড়বস্তু ক্লীবলিঙ্গ৷ 
 
  প্রথাগত ব্যাকরণে এই চারটি লিঙ্গের অস্তিত্ব থাকলেও আধুনিক বাংলায় দুটি লিঙ্গই যথেষ্ট ও  অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে আমরা মনে করি। তারা হল পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ। ক্লীবলিঙ্গ ও উভয়লিঙ্গ যে একটি অন্তঃসারশূন্য ধারণা তা আমরা আলোচনার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করছি। 
 
  প্রথমে ক্লীব লিঙ্গের ক্ষেত্রে বলি, জড়বস্তুকে কোনো লিঙ্গ দিয়ে বোঝানো ঠিক নয়। ধরা যাক, বই বা কলম: এ দুটি ক্লীবলিঙ্গ, কেননা এরা জড় পদার্থ। সেদিক থেকে নদ-নদীও তো জড় পদার্থ, তাহলে তাদের প্রথাগত ব্যাকরণে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ বলা হয় কেন? তাছাড়া জড় পদার্থকে লিঙ্গ হিসেবে দেখলে আলো বা তাপকে (বিজ্ঞানে যারা পদার্থ নয়) তবে কী বলা হবে? নিশ্চয়ই ক্লীবলিঙ্গ নয়। অন্যদিকে লিঙ্গ বিষয়টি প্রাণী বা জীবসূচক হওয়াই শ্রেয়। তাই  বাংলা ভাষায় ক্লীবলিঙ্গ প্রয়োজনীয় নয়। উভয়লিঙ্গের ধারণাটিও বেশ বিভ্রান্তিকর। প্রথাগত ব্যাকরণে সন্তান বা শিশুকে উভয়লিঙ্গ বলা হয়। কারণ, শিশু বা সন্তান বললে ছেলে – মেয়ে উভয়কেই বোঝায়। কিন্তু যদি বাক্য লিখি, “বাবা-মা তাদের শিশুটিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন।” এখানে ‘ শিশু ‘ কী লিঙ্গ হবে? যদি উভয়লিঙ্গ বলি তাহলে অর্থ স্পষ্ট হবে কি? বাবা-মা তাহলে প্রকৃতপক্ষে কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে? হয় ছেলে অথবা মেয়ে। যদি ছেলে হয়, তো পুংলিঙ্গ আর মেয়ে হলে স্ত্রীলিঙ্গ। বাস্তবে ও অর্থের দিক থেকে তো একজন দুটি লিঙ্গ হতে পারে না। আর যদি ছেলেটি মেয়ের গুণসম্পন্ন বা মেয়েটি ছেলের গুণসম্পন্ন হয় (বৃহন্নলা) তাহলে যে বৈশিষ্ট্যটি (ছেলে বা মেয়ের) বেশি প্রকট তাকেই সাধারণভাবে মান্যতা দেওয়া হয়। তাই বাক্যে বাবা-মা যে শিশুটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তাকে উভয়লিঙ্গ বললে আদৌ বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ হবে কি? অর্থাৎ অনেক সময় বাক্য দেখেও লিঙ্গ নির্ধারণ করতে হয়। 
 
  আরেকটি বিষয়, ‘গাছ’  শব্দটিকে প্রথাগতভাবে কোন লিঙ্গের মধ্যে ধরা হয় জানি না। তবে গাছের প্রাণ থাকায় তাকে ক্লীবলিঙ্গ বলা যাবেই না। গাছ সাধারণত তিন ধরনের হয়: ১. যে সমস্ত গাছের পুংকেশর থাকে তারা পুরুষ গাছ। ২. যে সমস্ত গাছের গর্ভকেশর থাকে তারা স্ত্রী গাছ।  আর ৩. যে সমস্ত গাছের পুংকেশর ও গর্ভকেশর দুটোই থাকে তারা উভয়লিঙ্গ বিশিষ্ট গাছ। তবে উভয়লিঙ্গ বিশিষ্ট গাছ ফল ও ফুল দুটোই দেয়। আর স্ত্রীগাছও  ফুল ও ফল দেয়। কিন্তু পুরুষগাছ, শুধু পুংকেশর যার আছে, সে ফুল দেয় কিন্তু ফল দেয় না। এক্ষেত্রে উভয়লিঙ্গ ও  স্ত্রীলিঙ্গ বিশিষ্ট গাছকে এক শ্রেণিতে ফেলে স্ত্রীলিঙ্গ বলা যেতেই পারে, কারণ মাতৃত্বের বিষয়টি এই দুই প্রকার গাছেই বিদ্যমান। 
 
 তাই আমাদের মনে হয় আধুনিক বাংলায় লিঙ্গ দুধরনের: পুং লিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ।
  
  চরিত্র অনুযায়ী আবার লিঙ্গকে দু ভাবে দেখা হয়ে থাকে। এক, ব্যাকরণগত লিঙ্গ ও দুই, স্বভাবিক লিঙ্গ। ব্যাকরণগত লিঙ্গ হিন্দি, সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষায় প্রচলিত। এখানে স্ত্রী পুরুষের উপর লিঙ্গভেদ নির্ভর করে না। যেমন: পুলিশ, গাড়ি, হিন্দিতে স্ত্রীলিঙ্গ। সূর্য, চন্দ্র সংস্কৃতে পুংলিঙ্গ। ইংরেজিতে জাহাজ, ভাষা, নদী, এগুলো স্ত্রীলিঙ্গ। জার্মান ভাষায় আবার “কুমারী মেয়ে” ক্লীবলিঙ্গ। অর্থাৎ এখানে অনুভূতি বা সংস্কারের ওপরই লিঙ্গভেদ নির্ভর করছে। 
   
  আর স্বাভাবিক লিঙ্গের ক্ষেত্রে সাধারণত স্ত্রী ও পুরুষের ভেদাভেদের উপরই লিঙ্গভেদ নির্ভর করে। যেমন: ছেলে পুংলিঙ্গ, মেয়ে স্ত্রীলিঙ্গ। একইভাবে  বাবা পুংলিঙ্গ, মা স্ত্রীলিঙ্গ। বাংলা আধুনিক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক লিঙ্গই বেশি দেখা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকরণগত লিঙ্গেরও দৃষ্টান্ত পাই । যেমন:  অচল – অচলা, নদ – নদী। 
 
আরো কয়েক ধরনের লিঙ্গ প্রথাগত বাংলায় রয়েছে। আমরা আধুনিক মান্য বাংলা অনুযায়ী এগুলোর বিচার করে নতুন দিক নির্দেশ করার চেষ্টা করব। 
 
  প্রথমত, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, কবিরাজ, দারোগা, জমিদার ;  এদের প্রথাগত ব্যাকরণে নিত্য পুংলিঙ্গ বলা হয়, কারণ এদের লিঙ্গ পরিবর্তন হয় না। কিন্তু এই বিভাজন আমাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। প্রচলিত নিয়মে এরা উভয়লিঙ্গ হওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ নারী, পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এই পদগুলি ( designation) গ্রহণ করতে পারে। 
    
    দ্বিতীয়ত, কবি, কেরানি, চিকিৎসক, ডাক্তার, পুলিশ, প্রতিনিধি, জেলে, গরু, গোয়েন্দা, দোকানদার প্রভৃতি শব্দগুলিকে প্রথাগত ব্যাকরণে উভয়লিঙ্গ বলা হয়। এদের আগে বা পরে নারী বা স্ত্রীবাচক শব্দ জুড়ে স্ত্রীলিঙ্গ করা হয়। যেমন: কবি- মহিলা কবি, বেনে- বেনে বউ, হাতি- মাদি হাতি, চিকিৎসক- মহিলা চিকিৎসক। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রথাগত ব্যাকরণের নিয়মে উভয়লিঙ্গই হয়েছে। কিন্তু আমরা যেহেতু উভয়লিঙ্গের অস্তিত্ব স্বীকার করছি না, তাই এই শব্দগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গের মধ্যে জুড়ে দিয়ে বিচার করতে চাই। সাধারণত প্রথাগত নিয়মে স্ত্রীবাচক শব্দ দিয়ে লিঙ্গান্তর করা হয়। যেমন কবি –  মহিলা কবি। তাহলে কবিরাজ –  কবিরাজ পত্নী বা মহিলা কবিরাজ হওয়াই উচিত, বা দোকানদার – মহিলা দোকানদার। বাস্তবে কিন্তু তা হয় না। এখানে অনেকেরই মনে হতে পারে, যদি “মহিলা কবি” বলা হয় তাহলে “পুরুষ কবি” বলতে ক্ষতি কোথায়? ‘কবি’ শব্দটি শুধু পুরুষকেই বা কেন বোঝাবে? কথাটি অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। আসলে বাংলা ব্যাকরণ অনেকটাই পুরুষকেন্দ্রিক, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। তাই আমাদের মতে স্ত্রী বা পুরুষবাচক শব্দ দিয়ে লিঙ্গ পরিবর্তন না করে বাক্য ও অর্থ দেখেই লিঙ্গভেদ করা উচিত। যেমন:  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের ‘মুখ্যমন্ত্রী’ ছিলেন। এখানে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ পুংলিঙ্গ। মমতা ব্যানার্জি বর্তমান ‘মুখ্যমন্ত্রী।’ এখানে ‘মুখ্যমন্ত্রী ‘ স্ত্রীলিঙ্গ। 
 
  তৃতীয়ত, চালু নিয়মে সতীন, ধাত্রী, রূপসী, ললনা প্রভৃতি শব্দগুলো নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ। কারণ এদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুংলিঙ্গ করা যায় না। সত্যি সত্যিই তো, এদের পুংলিঙ্গ করা যাবেই না। বিশেষ করে শব্দ প্রয়োগের প্রেক্ষিতে। কারণ ‘বন্ধ্যা’ স্ত্রীলিঙ্গ  শব্দ। কিন্তু পুংলিঙ্গে ‘বন্ধ’ বা অন্য কিছু করলে হাস্যকর হবে। ললনা, রূপসী শব্দগুলোও অনুরূপ। তবে মনে রাখতে হবে শব্দের দিক থেকে এদের লিঙ্গ ভেদ করা না গেলেও বাস্তব ক্ষেত্রে কিন্তু এদের লিঙ্গভেদ হতেই পারে। যেমন ধাত্রীর কাজ যদি কোনো পুরুষ করে তাহলে তাকে তো স্ত্রীলিঙ্গ বলতে পারি না। তেমনি:  সতীন- স্ত্রীলিঙ্গ। একটি পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা পরস্পরের সতীন। ভালো কথা, তাহলে একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সতীনের বিপরীত কী হবে? এটিও একটি সমস্যা।  
 
  আরেকটি বিষয় বলে রাখি, বাংলায় সর্বনাম পদের স্ত্রীলিঙ্গ হয় না কিন্তু বিশেষণ পদের হয়। যেমন সুন্দর – সুন্দরী, চঞ্চল- চঞ্চলা। তবে বিশেষ্য পদ যদি স্ত্রীবাচক হয় তাহলে তার আগে স্ত্রীবাচক বিশেষণ না দেওয়াই ভালো, তাতে পুরো বিষয়টি সহজবোধ্য হয়। যেমন ‘নারী’  স্ত্রীবাচক শব্দ এবং ওই নারী দেখতে খুবই সুন্দর। সেক্ষেত্রে তাকে “সুন্দরী নারী” না বলে “সুন্দর নারী” বলাই শ্রেয়। এখানেও প্রশ্ন আসতে পারে, সুন্দর তো পুরুষবাচক শব্দ, পুংলিঙ্গ। তাহলে স্ত্রী লিঙ্গের আগে কেন জুড়তে যাব?  আর যদি জুড়তেই   হয়, তাহলে সুন্দর ছেলের ক্ষেত্রে কেন “সুন্দরী ছেলে” বলবো না?  বিতর্কটি যুক্তিযুক্ত। এ প্রসঙ্গে আগেই বলেছি পুরুষকেন্দ্রিক ব্যাপারটি এখানেও কার্যকরী, যা একটা ট্র্যাডিশন হিসেবে চলে আসছে। তাই আমাদের মনে হয় শ্রুতিমধুরতা ও ভাষার চাহিদা অনুযায়ী দুটোকেই ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই সুন্দর- সুন্দরী ভেদ যত দ্রুত ঘুঁচবে বাংলা ততই আধুনিক, সহজ- সরল ও জনপ্রিয় হবে। 
 
  আরেকটি কথা না বললেই নয়, “সুন্দর ছেলে” ব্যাকরণে ও বাস্তবে মান্য। “সুন্দর মেয়ে” বা “সুন্দরী মেয়ে”ও  বর্তমানে ব্যাকরণ স্বীকৃত। কিন্তু “সুন্দরী ছেলে” এখনো মান্যতা পায়নি। আমরা যদি বিশেষণ হিসেবে সুন্দর ও সুন্দরীর  যেকোনো একটি ব্যবহার করতে চাই তাহলে খুবই ভালো। সেক্ষেত্রে কোনো একটিকেই স্বীকৃতি দিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা
 ‘সুন্দরকে’ মান্যতা দিলে “সুন্দরী মেয়েদের”  একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আর কি!  প্রকারন্তরে হয়তো বা বাংলা ভাষাই লাভবান হবে। 
 
  অন্যদিকে, বিশেষ্য পদ গায়ক – গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, লেখক-লেখিকা, পরিচালক- পরিচালিকা, প্রকাশক- প্রকাশিকা প্রভৃতি শব্দগুলোর লিঙ্গভেদ জরুরি নয়। যারা গান করেন তারা গায়ক বা গায়িকা। যারা লেখালেখি করেন তারা লেখক বা লেখিকা। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে এই পেশাগুলি যে কেউ গ্রহণ করতে পারে। নারী-পুরুষের ভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাদের পেশা, নেশা বা পদগুলির (designation) লিঙ্গভেদ কেন থাকবে?  তাই আমাদের মনে হয় অকারণ জটিলতা না বাড়িয়ে ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য করার জন্য নারী পুরুষ নির্বিশেষে লেখক, পরিচালক, গায়ক, প্রকাশক, প্রভৃতি একটি শব্দই ব্যবহার করা উচিত।
 
   আর একটি কথা বলে আলোচনার ইতি টানব, তা হল লিঙ্গ নামকরণটি নিয়ে…  লিঙ্গ= লিন্ গ্  + অন। এটি ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ। এই নামকরণ বা পরিভাষাটি নিয়েও একটি ঝামেলা তৈরি করা যায়। কারণ লিঙ্গ শব্দের একাধিক অর্থ। যেমন: চিহ্ন বা লক্ষণ, সূচক, জননেন্দ্রিয় প্রভৃতি। এখানে চিহ্ন বা লক্ষণ অর্থেই নামটি গৃহীত হয়েছে। তবে নারী-পুরুষের বিষয়টি মুখ্য হওয়ায় শব্দটি যেন যৌনাঙ্গ কেন্দ্রিক বিভাজনকেই মনে করিয়ে দেয়। আর নামটি এমনিতেও খুব একটা সুখশ্রাব্য নয়। তাছাড়া চিহ্ন বা লক্ষণ অর্থেই যখন নামটি ব্যবহৃত তখন শুধু শুধু লিঙ্গ বলতে যাব কেন? সরাসরি চিহ্নই বলব। অন্যদিকে স্ত্রীলিঙ্গের স্ত্রী কথাটি নিয়েও ঘোরতর আপত্তি আছে। কারণ পুং বা পুরুষের বিপরীত স্ত্রী নয়, নারী। স্বামীর বিপরীত স্ত্রী হয়। একদিকে বলছি পুং বা পুরুষ লিঙ্গ, আবার তার বিপরীত করছি স্ত্রীলিঙ্গ!  অদ্ভুত তো! খুব স্বাভাবিকভাবে “নারীলিঙ্গ” হওয়াই  উচিত। নারী মানেই তো আর স্ত্রী নয়। তাই আমাদের প্রস্তাবিত নতুন নাম-  লিঙ্গের পরিবর্তে চিহ্ন।  আর দুটি চিহ্ন হল “পুরুষচিহ্ন” এবং “নারীচিহ্ন।” পুংলিঙ্গ বা  স্ত্রীলিঙ্গ কখনোই না।

 

পর্ব ৩
বাংলা অব্যয়ের বহু বিবাহ
 
এই ব্যাকরণ ধারাবাহিকে আমরা মূলত বাংলা ব্যাকরণের নতুন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। বহু প্রথিতযশা ব্যাকরণবিদদের উৎসাহ ও তাদের গ্রন্থ পাঠের নমুনা হিসেবেই ধারাবাহিকটি এগোতে চাই। প্রথাগত ব্যাকরণের সঠিক ধারণাগুলি যেমন এখানে রেখে দেব, তেমনি সচেতন পাঠের মধ্য দিয়ে তার ত্রুটিগুলো পেছনে ফেলে নতুনকে স্বাগত জানাব। বর্তমান স্কুলপাঠ্য ও সাধারণ ব্যাকরণ – ভাষাতত্ত্বের বইয়ে নতুন ধারণার বেশ কিছু সংযোজন এক্ষেত্রে ভালো লক্ষণ বলেই মনে হয়। 
   
  যাইহোক যে বিষয়টি নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব তা হল অব্যয়পদ। পদ কেন, অব্যয়শব্দ বলতে ক্ষতি কী? পদ তো শুধু বাক্যে প্রয়োগ হয়। তাই আমরা আলাদাভাবে অব্যয়শব্দই বলব।  অনেক ব্যাকরণবিদই অব্যয় ও তার শ্রেণি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এবং সে প্রশ্ন অতি সঙ্গত বলেই আমরা মনে করি। ড. পবিত্র সরকার তো সরাসরিই  বলেছেন-  “অব্যয়কে তো আমরা বাংলা ব্যাকরণ থেকে কুলোর বাতাস দিয়ে তাড়াতে চাই।” অনেক ভাষাবিদের তাই মত। কারণ চালু ব্যাকরণে সংস্কৃত – অনুসরণে যাদের অব্যয় বলে আসছি তারা তো অন্যান্য শব্দের সঙ্গে কবেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।  তারা কখনো অনুসর্গ, কখনো বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ, কখনো সংযোজক শব্দ, আবার কখনো আবেগ শব্দে বিলীন হয়ে গিয়েছে।  
 
 
  প্রথাগত ব্যাকরণে যার ব্যয় নেই অর্থাৎ কাল- লিঙ্গ- পুরুষ- বচন – বিভক্তিভেদে যার পরিবর্তন নেই, তাই অব্যয়। অথচ প্রথাগত ভাবনাতে পাশ, কাছ, ভেতর প্রভৃতি অব্যয় শব্দগুলোর সঙ্গে বেমালুম বিভক্তি যুক্ত হতে পারে।  যেমন- পাশ+এ= পাশে।  কাছ+এ= কাছে। ভেতর+এ = ভেতরে। অর্থাৎ সংজ্ঞাতেই সঙ্গতি নেই। অন্যদিকে কারকের ক্ষেত্রে কর্তা বা কিছু কর্মবাচক শব্দে বিভক্তি যুক্ত হয় না। তবে কি তাদেরও অব্যয় বলা যায়?  স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণে অনুসর্গ অংশে দেখানো হচ্ছে, পাশে, দূরে, সামনে, বাইরে প্রভৃতি অনুসর্গ, আবার অব্যয় অংশে এদের অব্যয় বলা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার এদের অব্যয় নামে চিহ্নিত করে অনুসর্গ হিসেবে প্রয়োগ হয়েছে বলে দেখাচ্ছেন। যদি তাই হয়, তাহলে অনুসর্গ হিসেবে আলাদা নামেরই বা কী দরকার? 
 
 
  এ ধরনের  সংশয়ের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠকদের সহজে ব্যাকরণ শেখা কি সম্ভব? তাদের মনেই তো নানা দ্বন্দ্ব… ব্যাকরণ বিমুখতার  অনেক কারণের এটিও একটি অন্যতম কারণ। 
      
 যাইহোক, মূল আলোচনা থেকে বেরিয়ে যেতে চাই না। “ঈষৎ ঠান্ডা”- ‘ঈষৎ’কে এখানে বিশেষণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আবার অব্যয়ও বলা হচ্ছে। তাহলে এটি আসলে কী শব্দ? বিশেষণ না অব্যয়? কোনো উত্তর নেই। ‘টুকটুক’ শব্দটিকে বিশেষ্য বলা যায়। আবার “টুকটুকে লাল ঠোঁট।” এখানে ‘টুকটুকে’ বিশেষণের বিশেষণ। অথচ অব্যয় অংশে একে “ধ্বন্যাত্মক অব্যয়” বলা হচ্ছে। এরকম আরও নানা দিক উল্লেখ করা যায় যেখানে অব্যয়ের অস্তিত্ব নিয়ে সত্যিই প্রশ্ন উঠে যায়।  
 
 
   তাই আমাদের মতে স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ থেকে খুব দ্রুত এই অব্যয় শব্দটিকে থেকে তুলে দিয়ে এদের নতুন নামে নতুনভাবে শ্রেণি নির্মাণ করা উচিত। এতে ছাত্র ছাত্রী থেকে সাধারণ পাঠক তথা শিক্ষকদের মন থেকেও অব্যয় সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর হবে। 
 
  আমরা সেই ধরনের একটি রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা করছি যেখানে প্রথাগত অব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই নতুন বিভাজন করা হচ্ছে। মূলত ভাষাচার্য পবিত্র সরকারের আধুনিক যুক্তিপূর্ণ শ্রেণিটিকেই আমরা একটু অন্য ভাবে সাজিয়ে আলোচনা করছি। এখানে প্রথাগত শ্রেণির নামগুলিকে বিকল্প রেখে, অপ্রাসঙ্গিক ও অতিরিক্ত শ্রেণিনামকে  মার্জ করে একটি  সহজবোধ্য শ্রেণি নির্মাণের চেষ্টা করছি। 
 
 
   প্রথাগত ব্যাকরণে এবং, ও, কিন্তু, আর, অবশ্য, অতএব, অতঃপর, ইদানিং, তথা, তথাপি, যদি, সাথে, অথচ, আবার, ওগো, আহা, হায় হায়, মরি মরি, শেষ পর্যন্ত, মাগো মা, বাবা গো, প্রভৃতি শব্দগুলি অব্যয়। প্রথাগতভাবে এই অব্যয়কে চারটি ভাগে ভাগ করা হত। এরা যথাক্রমে- পদান্বয়ী অব্যয়, সমুচ্চয়ী অব্যয়, অনন্বয়ী অব্যয় ও ধ্বন্যাত্বক অব্যয়।  
 
এবার আমরা প্রথাগত ও আধুনিক শ্রেণি পাশাপাশি দেখাচ্ছি।  
 
প্রথাগত শ্রেণি        আধুনিক শ্রেণি
——————-       ——————–
পদান্বয়ী অব্যয়           অনুসর্গ
 সমুচ্চয়ী অব্যয়         সংযোজক
 অনন্বয়ী অব্যয়        আবেগ শব্দ
ধ্বন্যাত্বক অব্যয়          নেই  (এটি বিশেষ্য ও বিশেষণ শব্দের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচিত।) 
 
  অনুসর্গ – থেকে, হতে, দিয়ে, পাশে, কাছে, দূরে, উপরে, নিচে ভেতরে, বাইরে প্রভৃতি। সংযোজক-  এবং, ও, আর, নতুবা, বরং, যদি না, কিংবা, তথা, অথবা, সেজন্য, যদি, তবে, পক্ষান্তরে, কাজেই, আবার, প্রভৃতি। সংযোজক শব্দগুলি বাক্যের সঙ্গে বা বাক্যের কোনো পদের সঙ্গে অন্যপদের সংযোগ ঘটায়। এখানে সংযোজক শব্দটি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে।  অর্থাৎ সংযোজক আসলে একাধিক বাক্য বা পদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করে। সেক্ষেত্রে সংকোচক, বিয়োজক প্রভৃতিকেও বোঝায়। কয়েকটি বাক্যে প্রয়োগ করে দেখাচ্ছি- ১.রোদ  ‘এবং’  বৃষ্টি দুটো একসঙ্গে হচ্ছে। ২.কাজের মাসি ‘আর’ তার মেয়েটা এসেছিল। ৩. ওর লেখার হাত খুব ভালো ‘তথা’ গানও গায় ভীষণ সুন্দর। ৪. তুমি ‘না হয়’ আমি যে কেউ গেলেই চলবে। শেষ সংযোজকটি দুটো বাক্যের মধ্যে বিরোধ নির্দেশ করছে। অর্থাৎ একটি বাক্যের ফল যা হওয়া উচিত তা না হয়ে তার বিপরীত ফল প্রকাশ করছে বা সংশোধনের একটা ভাব প্রকাশ করছে। এগুলো সাধারণত বিরোধমূলক সংযোজক। আবার হেতুবাচক সংযোজক – “আজ স্কুলে যাব না কারণ খুব শিলাবৃষ্টি হচ্ছে।” সাপেক্ষ সংযোজক – “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” 
 
 
 এবার আসি আবেগসূচক শব্দে। আবেগসূচক শব্দগুলি হল- আহা, আচ্ছা, তো, নারে, ওগো, হে রাম, কী দারুন, বাহ, হায় হায়, ওমা, বেশ, কী জ্বালা প্রভৃতি। যেমন, বাক্য – “ছিঃ ছিঃ! এমন কথা বলতে নেই।” “হে রাম! কী কান্ড করলি?” এই শব্দগুলি মনের নানা আবেগ প্রকাশ করছে অথচ এরা সরাসরি বাক্যের সঙ্গে যুক্ত নয়,  অনেকটা স্বাধীনভাবেই এরা বাক্যে ঘোরাফেরা করে। 
 
  প্রথাগত ব্যাকরণে যাদের অনন্বয়ী অব্যয় বলা হয় এখানে তারাই আবেগশব্দ। আবেগ শব্দগুলি প্রশংসা, আনন্দ, ভয়, দুঃখ, যন্ত্রণা, বিরক্তি, ঘৃণা, করুণা, শোক, সম্মতি, অসম্মতি, সিদ্ধান্ত, সম্বোধন, প্রভৃতি  প্রকাশ করে।  আলংকারিক হিসেবেও এগুলো ব্যবহৃত হয়। যেমন: “সে ‘তো’ আর আসবে না ‘রে’।” “কী  ‘যে’ বলছ  তার কোনো মাথামুন্ডু নেই।”  এই আলংকারিক শব্দগুলো মূলত বাক্যে অর্থের পরিবর্তন না ঘটিয়ে সৌন্দর্য, মাধুর্য, কমনীয়তা প্রভৃতি প্রকাশ করে। আবার এরা নানা বিচিত্র মনোভাব প্রকাশ করতেও সক্ষম।   
 
 
  সংযোজক শব্দগুলি আবার অন্যান্য পদ হিসেবেও ব্যবহৃত  হতে পারে। যেমন: “আবার বল।” এখানে ‘আবার’ সংযোজক, কিন্তু ক্রিয়া বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত।  অর্থাৎ বাংলায় শব্দের উৎস ও তার প্রয়োগবিধি বিচিত্র। মানে উৎসে শব্দটি যেভাবে প্রয়োগ হত, পরে তা অন্যভাবে প্রয়োগ হতেই পারে।  
  
  আরেকটি উদাহরণ: “এ রাম! একী কাণ্ড করেছে?” এখানে  “এ রাম” সংযোজক হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ্যপদ হিসেবে ব্যবহৃত।  
 
  অনুসর্গও একপ্রকার সংযোজকের কাজ করে। তবে এর অগাধ বিস্তৃতি ও ব্যাকরণগত গঠন আলাদা হওয়ায় আমরা পরে বিশেষভাবে একে আলোচনা করতে চাই।
 

error: Content is protected !!