বাংলা ব্যাকরণ সমগ্র: বাচ্য

বাচ্য

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাচ্য বাংলা ব্যাকরণে বহুল পরিচিতি একটি বাংলা পরিভাষা। ইংরেজি voice শব্দের বাংলা পরিভাষা হলো বাচ্য। বাক্যে অবস্থিত ক্রিয়ার কার্যের সঙ্গে বিশেষ সম্বন্ধযুক্ত পদকে বাচ্য বলা হয়। বাচ্য হচ্ছে বাক্যের প্রকাশভঙ্গির স্বরূর নির্ধারক পাঠ। তাই বাক্যের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ ভঙ্গিকে বাচ্য বলা যায়।

যেমন : হেরা ফুটবল খেলতে পারে না।
বাক্যটিতে মূল উপাদান তিনটি। যথা : কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া (সমাপিকা)।
পরস্পরের সম্পর্ক অনুযায়ী বাক্যের এই তিনটি উপাদান বক্তব্যের সঙ্গে নিবিড় সংগতি রক্ষা করে বাক্য কাঠামো গঠন করে। উপরের বাক্যে ‘ হেরা’ কর্তা, ‘ফুটবল’ কর্ম, খেলতে পাবে না’ যৌগিক সমাপিকা ক্রিয়া।
বাক্যের মধ্যে যেমন বক্তব্য বিষয় আছে তেমনি আছে একটি বিশেষ বাচনভঙ্গি। ব্যক্তিভেদে এই বাচনভঙ্গির পরিবর্তন ঘটতে পারে। এটাই স্বাভাবিক এবং এ পরিবর্তনের কারণে ভাষা এত সুন্দর, মনোরম ও বৈচিত্র্যময়। যেমন :
ক. হেরা ফুটবল খেলতে পারে না।
খ. হেরা কর্তৃক ফুটবল খেলা হবে না।
ওপরের দুটো বাক্যের বক্তব্য একই। কিন্তু বলার ভঙ্গি পৃথক। সেজন্য বাক্যের কাঠামোগত রূপও পৃথক। প্রথম বাক্যে ‘ হেরা’ কর্তার সঙ্গে ‘খেলতে পারে না’ ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। ‘ফুটবল’ কর্ম। দ্বিতীয় বাক্যে ‘কর্তৃক’ অনুসর্গযোগে ‘ হেরা’ হয়েছে অনুক্ত কর্তা। ‘ফুটবল’ কর্ম হয়েও কর্তার মতো। সেজন্য খেলা হবে না’ ক্রিয়ার সঙ্গে ‘ফুটবল’ এর সরাসরি সম্পর্ক হয়েছে। আবার বাক্য কর্মহীন হতে পারে। সে ক্ষেত্রেও ব্যক্তিভেদে বাচনভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব। যেমনÑ
ক. হেরা খেলল।
খ. হেরার খেলা হলো।
এ দুটি বাক্যের বক্তব্য ও এক। কিন্তু বাচনভঙ্গি পৃথক। প্রথম বাক্যে ‘ হেরা’ কর্তা, ‘ খেলল’ ক্রিয়া এবং কর্তার অনুসারী। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে ‘সুমিতা’, ‘সুমিতার’ হওয়ায় কর্তার প্রাধান্য লোপ পেয়েছে এবং ‘ খেলা হলো’ ক্রিয়া প্রধান হয়ে উঠেছে। সুতরাং বাচন ভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাক্য কাঠামোর যেমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, তেমনি কখনও কর্তা, কখন ও কর্ম, কখন ও ক্রিয়া প্রাধান্য পায়।বাক্যের বাচন ভঙ্গি অনুযায়ী কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়াপদের প্রাধান্য পায়। সবক্ষেত্রেই ক্রিয়া রূপের পরিবর্তন ঘটে। এরূপ পরিবর্তনকে বাচ্যের পরিবর্তন বলা হয়।

বাচ্যের সংজ্ঞার্থ : ইংরেজি voice শব্দের বাংলা পরিভাষা হলো বাচ্য। বাক্যের বাচনভঙ্গি অনুযায়ী কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়াপদের প্রাধান্য নির্দেশ করে ক্রিয়া পদের রূপের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে বাচ্য বলা হয়।

বাচ্যের প্রকারভেদ
বাচ্য চার প্রকার। যথা : কর্তৃবাচ্য, কর্মবাচ্য, ভাববাচ্য এবং কর্মকর্তৃবাচ্য।

কর্তৃবাচ্য : সাধারণত সংস্কৃত ব্যাকরণে কৃৎপ্রত্যয়-জাত শব্দের সঙ্গে শব্দের বাচ্য উল্লেখ করা হয়। মূলত শব্দ তৈরির পর উক্ত শব্দ বাক্যে কি কি অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে, তার নির্দেশ পাওয়া যায় এই বাচ্য নির্দেশে। এই বিচারে শব্দের বাচ্যগুলেকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : কর্তৃবাচ্য, কর্মবাচ্য, করণবাচ্য, অধিকরণবাচ্য, ভাববাচ্য।
অধিকরণবাচ্য
প্রত্যয়জাত কোনো শব্দের অর্থগত দিক যখন কোনো স্থান, বিষয় বা সময়কে নির্দেশ করে, তখন নির্দেশিত শব্দটিকে অধিকরণবাচ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যেমন : আকাশ = আ-কাশ্ + অ (ঘঞ্), অধিকরণবাচ্য

করণবাচ্য
প্রত্যয়জাত কোনো শব্দের অর্থগত দিক যখন ‘কোনো কিছুর দ্বারা’ অর্থ প্রকাশ করে, তখন তা করণবাচ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যেমন–
বিশেষ = {বি- ্রশিষ্ (শেষ থাকা, শেষ রাখা) + অ (অ), করণবাচ্য

কর্তৃবাচ্য
বাক্যে যখন কোনো বাক্যের উপস্থাপিত ক্রিয়া কর্তার দ্বারা সম্পন্ন হয় এবং উক্ত ক্রিয়া কর্তার অনুগামী হয় বলে প্রতীয়মান হয়, তখন তাকে কর্তৃবাচ্য বলা হয়। ইংরেজি ব্যাকরণের সমতুল্য শব্দ (Active voice)। যেমন- সে আসে। প্রত্যয়জাত কোনো শব্দ, অর্থের বিচারে কানো বাক্যে কর্তা হিসাবে ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, তখন ওই শব্দটি কর্তৃবাচ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। যেমন : অংশ √অংশ্ (ভাগ করা) + অক (ণ্বল), কর্তৃবাচ্য
এককথায় বলা যায়, যে বাচ্যে কর্তাই মুখ্য এবং ক্রিয়া কর্তার অনুসারী হয়, তাকে কর্তৃবাচ্য বলে। যেমন : কামাল বই পড়ছে।

কর্তৃবাচ্যের বৈশিষ্ট্য : কর্তৃবাচ্যে ক্রিয়াপদ সর্বদাই কর্তার অনুসারী হয়। কর্তার পুরুষ (আমি, তুমি, সে) ক্রিয়াপদের পুরুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। কর্তবাচ্যে কর্তায় প্রথমা বা শূন্য বিভক্তি এবং কর্মে দ্বিতীয়া, ষষ্ঠী, বা শুন্য বিভক্তি হয়। যেমন: শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পড়ান। বাবা বই পড়ছেন। কর্তৃবাচ্য যে কোনো পুরুষ (উত্তম, মধ্যম, নাম) হতে পারে এবং তা ক্রিয়াপদকে প্রভাবিত করে।

কর্মবাচ্য
যখন বাক্যে ব্যবহৃত কর্ম প্রধান হয়ে ওঠে এবং কর্তার চেয়ে কর্মের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক মূখ্য হয়ে ওঠে বলে মনে হয়, তখন ক্রিয়াপদটি কর্মবাচ্যের ক্রিয়া (Passive Voice) বলা হয়। কর্ম বাচ্যে কর্মের প্রাধান্য লক্ষণীয় এবং ক্রিয়া কর্মের অনুসারী। যেমনÑ রাখ কর্তৃক রাবণ নিহত হয়, লিপির কি অঙ্ক কষা হয়েছে?

কর্মবাচ্যের বাক্যে কর্মে প্রথমা, কর্তায় তৃতীয়া বিভিক্তি ও দ্বারা দিয়া (দিয়ে) কর্তৃক অনুসর্গের ব্যবহার এবং ক্রিয়াপদ কর্মের অনুসারী হয়। যেমন : কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কৃত হয়। ডাকাতটি ধরা পড়েছে। কর্মবাচ্যে, কখনও কর্মে দ্বিতীয় হতে পারে। যেমন: খুনীকে যাবজীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। চোরটিকে জরিমানা করা হয়েছে।

কর্মবাচ্যের বৈশিষ্ট্য :
১. এই জাতীয় বাক্যে তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি) দিয়ে কর্তাকে আবদ্ধ করা হয় এবং ক্রিয়াপদেরও পরিবর্তন ঘটে।
যেমন- আমার দ্বারা কাজটি সম্পন্ন হবে।
২. কখনো কখনো বাক্যে কর্তা অনুপস্থিত থাকে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিবাচক বা প্রাণিবাচক হলে দ্বিতীয়া/চতুর্থী বিভক্তি হয়।
যেমন-
কর্তৃবাচ্য : আমাকে দেখা যায়
কর্মবাচ্য : আমায় দেখা হয়
৩. দ্বিকর্মক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য কর্ম কর্তা হয়, গৌণকর্ম দ্বিতীয়া/চতুর্থী বিভক্তিযুক্ত হয়ে থেকে যায়।
কর্তৃবাচ্য : ভিখারিকে তিনি টাকা দিলেন।
কর্মবাচ্য : তাঁর দ্বারা ভিখারিকে টাকা দেওয়া হলো।

ভাববাচ্য : যে বাচ্যে কর্ম থাকে না এবং বাক্যে ক্রিয়ার অর্থই বিশেষভাবে ব্যক্তি হয় তাকে ‘ভাববাচ্য’ বলে। যেমন : বইটা পড়তে হবে। যখন বাক্যে ব্যবহৃত পদের ভিতর ক্রিয়াপদই প্রধান হয়ে প্রতিভাত হয়, তখন ব্যবহৃত পদটি ভাববাচ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। প্রত্যয়জাত কোনো বিশেষ্য পদে ক্রিয়ার ভাব বিদ্যমান থাকে, তখন তা ভাববাচ্য বিবেচিত হয়। যেমন : গ্রহণ=√গ্রহ্ (গ্রহণ করা) +অন্ (ল্যুট), ভাববাচক।

ভাববাচ্যের বৈশিষ্ট্য : ভাববাচ্যের ক্রিয়া সর্বদাই নাম পুরুষের হয়। ভাববাচ্যের কর্তায় সষ্ঠী, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয়া বিভক্তি প্রযুক্ত হয়। মেযন- আমার (কর্তায় ষষ্ঠী) খাওযা হল না। (নাম পুরুষের ক্রিয়া)।
আমাকে (কর্তায় দ্বিতীয়া) এখন যেতে হবে। (নামপুরুষের ক্রিয়া)।
১. ভাববাচ্যের ক্রিয়া সর্বদাই নাম পুরুষের হয়। ভাববাচ্যের কর্তায় সষ্ঠী, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয়া বিভক্তি প্রযুক্ত হয়। মেযনÑ আমার (কর্তায় ষষ্ঠী) খাওযা হল না। (নাম পুরুষের ক্রিয়া)।
২. কখনো কখনো ভাববাচ্যের কর্তা উহ্য থাকে, কর্ম দ্বারাই ভাববাচ্য গঠিত হয়। যেমন- এপথে চলা যায় না। এবার ট্রেনে ওঠা থাক। কোথা থেকে আসা হচ্ছে।
৩. মুল ক্রিয়ার সঙ্গে সহযোগী ক্রিয়ার সংযোগ ও বিভিন্ন অর্থ ভাব বাচ্যের ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন- এ ব্যাপারে আমাকে দায়ী করা চলে না। এ রাস্তা আমার চেনা নেই।

কর্মকর্তৃবাচ্য : যে বাক্যে কর্মপদ মুখ্য এবং কর্তৃত্বস্থানীয় হয়ে বাক্য গঠন করে, তাকে কর্মকর্তৃবাচ্যের বাক্য বলে। যেমন : হুইসেল বাজে। এই বাক্যে হুইসেল প্রকৃতপক্ষে কর্ম। ‘বাজে’ ক্রিযার সঙ্গে সম্পর্ক বিচারে মনে হয় ‘হুইসেল’ কর্তা।

অন্যান্য বাচ্য:
প্রতয়জাত শব্দের অর্থগত স্থান, বিষয়, সময়, বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় বাচ্যকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যেমন : (১) অধিকরণ বাচ্য ও (২) করণ বাচ্য।
অধিকরণবাচ্য : প্রত্যয়জাত কোনো শব্দের অর্থগত দিক যখন কোনো স্থান, বিষয় বা সময়কে নির্দেশ করে, তখন নির্দেশিত শব্দটিকে অধিকরণবাচ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যেমন–
আকাশ = আ-কাশ্ + অ (ঘঞ্), অধিকরণবাচ্য
করণবাচ্য
প্রত্যয়জাত কোনো শব্দের অর্থগত দিক যখন ‘কোনো কিছুর দ্বারা’ অর্থ প্রকাশ করে, তখন তা করণবাচ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যেমন :
বিশেষ = {বি- ্শিষ্ (শেষ থাকা, শেষ রাখা) + অ (অ), করণবাচ্য

কর্তৃবাচ্য ও ভাববাচ্যের মধ্যে পার্থক্য

কর্তৃবাচ্য ভাববাচ্য
১. কর্তৃবাচ্যে কর্তার প্রাধান্য লক্ষণীয়। ১. ভাববাচ্যে ‘ভাব’ অর্থাৎ ক্রিয়ার প্রাধান্য।
২. কর্তৃবাচ্যে ক্রিয়া সাধারণত কর্তার অনুসারী হয়। ২. ভাববাচ্যে ক্রিযাই স্ব-প্রধান, ক্রিয়াকে অপর কারো দাসত্ব করতে হয় না।
৩. কর্তৃবাচ্যে কর্তায় প্রধানত শূন্য বিভক্তি হয়। কখনও কখনও কখনো ‘এ’ এবং ‘তে’ বিভক্তিও লক্ষ করা যায়। ৩. ভাববাচ্যে কর্তৃপদে ‘র’ ‘এর’, বা ‘কে’ বিভক্তি যুক্ত হয়।
৪. উদাহরণ : আমিই আমেরিক যাব। ৪. উদাহরণ : আমাকেই আমেরিকা যেতে হবে।
কর্তবাচ্য ও কর্মবাচ্যের মধ্যে পার্থক্য

কর্তৃবাচ্য কর্মবাচ্য
১. কর্তৃবাচ্যে কর্তার প্রধান্য লক্ষণীয়। কর্মবাচ্যে কর্মের প্রাধান্য।
২. কতৃবাচ্যে ক্রিয়া কর্তার অনুসারী হয়। কর্মবাচ্যে কর্ম কর্তৃস্থানীয় বলে ক্রিয়া হয় কর্মের অনুসারী হয়।
২. কর্তার পুরুষ অনুযায়ী ক্রিয়ার পুরুষবাচক বিভক্তি হয়। কর্মের পুরুষ অনুযায়ী ক্রিয়ার পুরুষবাচক বিভক্তি হয়।
৩. কর্তবাচ্যে কর্তায় প্রধানত শূন্য বিভক্তি হয়, কখনো কখনো ‘এ’ বিভক্তি হয়। কর্তৃবাচ্যে ‘কর্তৃক’ ‘দিয়া/দিয়ে’, ‘দ্বারা প্রভৃতি অনুসর্গযোগে বা ‘র’ ‘এর’ বিভক্তিযোগে অনুক্ত কর্তা হয়। সময়ে কর্তা উহ্য থাকে, কর্মে শূন্য বিভক্তি হয়, সময়ে ‘কে’ বিভক্তি হয়।
৪. উদাহরণ : করিম বই পড়ছে। উদাহরণ : করিম কর্তৃক বই পড়া হচ্ছে।

ভাববাচ্য ও কর্ম কর্তৃবাচ্যের পার্থক্য
যে বাক্যে ক্রিয়ার অর্থের প্রাধান্য সুস্পষ্ট এবং ক্রিয়ায় বাক্যকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাতে কোন কর্ম থাকে না তখন তাকে ‘ভাববাচ্য’ বলে। ভাববাচ্যের ক্রিয়া সব-সময়ই নাম পুরুষের একবচনান্ত হয় এবং কর্তায় শূন্য বা ১মা, ২য়া, ৩য়া, ৬ষ্ঠী, এবং ৭মী বিভক্তি হয়। যেমন :
জামালের (কর্তায় ৬ষ্ঠী) যাওয়া হয়েছে।
আমাকে (কর্তায় ২য়া) এখনই বের হতে হবে।
অন্যদিকে, যে বাক্যে কর্মকারক কর্তার মতোই কাজ করে বা প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মকর্তবাচ্য বলে। কর্মকর্তৃবাচ্যের কর্তাসবসময় বস্তুবাচক হয় এবং ক্রিয়া সরাসরি কর্তাকে অনুসরণ করে। যেমনÑ পাখি ডাকে, বায়ু বহে।

Active voice
কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে রূপান্তরের সূত্র ও কৌশল:
১. বাচ্যের পরিবর্তন সত্ত্বেও বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ অপরিবর্তীত থাকবে এবং অর্থের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
২. কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া সকর্মক হলেই কর্মবাচ্যে পরিবর্তন করা যাবে। ক্রিয়া অকর্মক হলে সে বাক্যটি কর্মবাচ্য করা যায় না।
৩. কতৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কর্তা ও কর্মের রূপের পরিবর্তন ঘটে।
৪. দ্বারা, দিয়া বা দিয়ে কর্তৃক প্রভৃতি অনুসর্গ যোগে কিংবা ‘র’, ‘এর’ বিভক্তি যোগে কর্তা নিজে করণ কারকে বা অনুক্ত কর্তায় পরিণত হয়।
৫. কর্মের প্রাধান্যের কারণে ক্রিযা কর্মের অনুসারী হয়।
৬. মূল ক্রিয়া পদ ‘আ’ ‘আনো’ ইত্যাদি প্রত্যয়যুক্ত ক্রিয়াজাত বিশেষ্য বা ‘ও’ ‘ইত’ ইতাদি প্রত্যয়যুক্ত বিশেষণ হয় এবং তার সঙ্গে ‘হ’ ধাতুজাত ক্রিয়া বসে।

কয়েকটি উদাহরণ :
১. কর্তৃবাচ্য : ছেলেরা খেলা দেখছে।
কর্মবাচ্য : ছেলেদের দ্বারা খেলা দেখা হচ্ছে।
২. কর্তবাচ্য : জাভেদ ভাত খেয়েছি।
কর্মবাচ্য : জাভেদ কর্কৃক ভাত খাওয়া হয়েছে।
৩. কতৃবাচ্য : কামাল খাতা কিনবে।
কর্মবাচ্য : খালাম কর্তৃক খাতা কেনা হবে।
৪. কর্তৃবাচ্য : মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করেছেন।
কর্মবাচ্য : মীর মশাররফ হোসেন কর্তৃক ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচিত হয়েছে।
৫. কর্তৃবাচ্য : পুলিশ ডাকাত ধরেছে।
কর্মবাচ্য : পুলিশ কর্তৃক ডাকাত ধৃত হয়েছে।
কর্মবাচ্যকে কর্তৃবাচ্যে পরিবর্তনের সূত্র ও কৌশল:
ক. বাচ্যের পরিবর্তন সত্ত্বেও বাক্যের অর্থ অপরিবর্তিত থাকবে।
খ. কর্মবাচ্যে কর্তায় দিয়া, দ্বারা, কর্তৃক অনুসর্গযোগে যে করণ কারকের রূপ থাকে, কর্তৃবাচ্যে রূপান্তরের সময় দিয়া/ দিয়ে দ্বারা, কর্তৃক প্রভৃতি অনুসর্গ লুপ্ত হয়ে তা শূন্য বিভক্তিযুক্ত কর্তায় পরিণত হয়।
গ. ক্রিযা হয় কর্তার অনুসারী।
কয়েকটি উদাহরণ :
১. কর্মবাচ্য : আহমদ ছফা কর্তৃক ‘ওঙ্কার’ লিখিত হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য : আহমদ ছফা ‘ওঙ্কার’ লিখেছেন।
২. কর্মবাচ্য : পুলিশ কর্তৃক চোরটি প্রহৃত হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য : পুলিশ চোরকে প্রহার করেছেন।
৩. কর্মবাচ্য : আমাকে অনেক জিনিসপত্র কিনতে হবে।
কর্তৃবাচ্য : আমি অনেক জিনিসপত্র কিনব।
৪. কর্মবাচ্য : সরকারকে আয়কর দিতে হয়।।
কর্তৃবাচ্য : সরকারকে আয়কর দিই।
৫. কর্মবাচ্য : সবকিছু কি ঠিকঠাক পাওয়া যাবে?
কর্তৃবাচ্য : সবকিছু তো ঠিকঠাক পাব?
কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্যে পরিবর্তনের সূত্র ও কৌশল:
ক. বাচ্যের পরিবর্তন সত্ত্বেও বাক্যের অর্থ অপরিবর্তিত থাকবে।
খ. ক্রিয়ার প্রাধান্যই সূচিত হয়।
গ. কর্তৃবাচ্যের কর্তার সঙ্গে ‘র’ বা ‘এর’; ক্ষেত্রবিশেষ ‘কে’ বা ‘দের’ বিভক্তি যুক্ত হবে।
ঘ. সাধারণভাবে ‘হওয়া’ বা ‘হ’ ধাতুজ ক্রিয়া কর্তা অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়।
কয়েকটি উদাহরণ :
১. কর্তৃবাচ্য : অনুগ্রহ করে পুরো বর্ণনা করুন।
ভাববাচ্য : অনুগ্রহপূর্বক পুরো বর্ণনা করা হোক।
২. কর্তৃবাচ্য : আমরা চব্বিশ তলা ভবন থেকে নেমে এলাম।
ভাববাচ্য : আমাদের চব্বিশ তলা ভভন থেকে নেমে আসা হল।
৩. কর্তৃবাচ্য : কর্তৃবাচ্য আপনি লক্ষ করুন।
ভাববাচ্য : আপনার লক্ষ করা হোক।
৪. কর্তৃবাচ্য : আমি কিছুই জানতে পারিনি।
ভাববাচ্য : আমার কিছুই জানা নেই।
৫. কর্তৃবাচ্য : এলে কেন?
ভাববাচ্য : আসা হলো কেন?
৬. কর্তৃবাচ্য : মাম ঢাকা যাবে।
ভাববাচ্য : মামকে ঢাকা যেতে হবে।

ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাক্যে পরিবর্তনের সূত্র ও কৌশল:
ক. বাচ্যের পরিবর্তন হলেও বাক্যের অর্থ পরিবর্তিত থাকবে।
খ. র. এর, যে প্রভৃতি বিভক্তিযুক্ত পদের বিভক্তি লোপ পেয়ে কর্তৃপদে পরিণত হবে।
গ. কর্তৃপদের অনুসারী ক্রিয়া ব্যবহৃত হবে।
কয়েকটি উদাহরণ :
১. ভাববাচ্য : তাহলে সেখানেই যাবার ব্যবস্থা করা।
কর্তৃবাচ্য : তাহলে সেখানেই যাবার ব্যবস্থা করতাম।
২. ভাববাচ্য : তবে দেখা হোক।
কর্তৃবাচ্য : তবে দেখ।
৩. ভাববাচ্য : পুলিশ টের পেলে আর ফিরে আসতে হবে না।
কর্তৃবাচ্য : পুলিশ টের পেলে আর ফিরে আসতে পারবে না।
৪. ভাববাচ্য : মরতে একদিন তো হবেই।
কর্তৃবাচ্য : একদিন তো মরবই।
৫. ভাববাচ্য : তাতে বিশেষ ক্ষতি হয় না।
কর্তৃবাচ্য : তা বিশেষ ক্ষতি করে না।


All Link

গীতি ও সংগীত : নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীতের পার্থক্য

প্রায়শ ভুল হয় এমন কিছু শব্দের বানান/২

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

প্রশাসনিক প্রাশাসনিক  ও সমসাময়িক ও সামসময়িক

বিবিধ এবং হযবরল : জ্ঞান কোষ

সেবা কিন্তু পরিষেবা কেন

ভাষা নদীর মতো নয় প্রকৃতির মতো

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

ভূ ভূমি ভূগোল ভূতল ভূলোক কিন্তু ত্রিভুবন : ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

error: Content is protected !!