বাংলা ব্যাকরণ সমগ্র : সংজ্ঞার্থ ও ইতিহাস

ব্যাকরণ
ব্যাকরণ কী ও কেন, ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় এবং ব্যাকরণ কারিরর প্রয়োজনীয়তা
প্রথম পাঠ : এ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীরা জানতে বা শিখতে পারবে
ব্যাকরণ কী, ব্যাকরণের সংজ্ঞা, ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা, ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়, ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য, ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ, বাংলা ব্যাকরণের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস।
দ্বিতীয় পাঠ : অনুশীলনমূলক কাজ, সকল বোর্ডের বিগত বছরগুলোর প্রশ্নোত্তর এবং পরীক্ষার জন্য সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তর।

ব্যাকরণ কী ও কেন?
ভাষা বিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য দিয়ে শুরু করা যাক। তাঁরমতে, “যে বিদ্যার দ্বারা কোনও ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া তাহার সরূপটি আলোচিত হয় এবং সেই ভাষার গঠনেও লিখনে এবং তাহার স্বরূপটি আলোচিত হয় এবং সেই ভাষার গঠনেও লিখনে এবং তাহাতে কতোপকথনে শুদ্ধ-রূপে তাহার প্রয়োগ করা যায়, সেই বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ (এৎধসসধৎ) বলে।”

ব্যাকরণ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো (বি + আ + কৃ + অন)। বিশেষভাবে বিশ্লেষণ কোনো ভাষাকে শুদ্ধরূপে জানতে, শিখতে, বলতে ও লিখতে হলে সেই ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলা, তার উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিবর্তন বিবর্তনসহ এর গঠন-প্রকৃতি, স্বরূপ ও প্রয়োগরীতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ বিষয়ে, মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জর হায়দার চৌধুরীর বক্তব্য বেশ যুক্তিযুক্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁদের মতে, “যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিসদভাবে আলোচিত হয় তাকে ব্যাকরণ বলে। যে কারণেই ভাষাকে বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত বিধি-বিধান, নিয়ম-কানুন জানার জন্য ব্যাকরণের জন্ম। তাই বলা যায় যে, ব্যাকরণ হল একটি বিজ্ঞান। বিজ্ঞান মানে হল বিশেষ জ্ঞান। ভাষা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান দেয় যে শাস্ত্র তা অবশ্যই একটি বিজ্ঞান, ভাষার বিজ্ঞান। প-িতগণ এর নাম দিয়েছেন ব্যাকরণ। এই বিশ্ব ভ্রা-ারে যা কিছু আছে তার সবকিছুরই সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। নিয়মের বাইরে কোনো কিছুই বলতে পারে না। অতি ক্ষুদ্র অনু-পরমাণু থেকে শুরু করে সৌরজগতের সমস্ত গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র, সমুদ্র, পর্বত, বৃক্ষরাজিসহ বস্তু জগত ও প্রাণিজগতের সবকিছুই নিয়মের অধীন। ঠিক এমনিভাবে ভাষাও নিয়মের অধীন। ব্যাকরণের কাজ হল ভাষার সেই নিয়ম-কানুন খুঁজে বের করা। ভাষা বিজ্ঞান যেমন ভাষার বিজ্ঞান অর্থাৎ ভাষার গঠন প্রক্রিয়া, তার অন্তর্নিহিত বিন্যাস ও বিন্যাস ও বাহ্যিকরূপ নিয়ে বিমদ আলোচনা করে, তেমনি ব্যাকরণও ভাষাকেই বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত নিয়ম-শৃঙ্খলা, বিধি-বিধান সম্পর্কে সম্যক ধারণা তুলে ধরে। সুতরাং ব্যাকরণ ভাষা বিজ্ঞানেরই একটি মৌলিক ধারণা বা অংশ। পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি ভাষা রয়েছে। এসব ভাষার প্রত্যেকটির নিজস্ব নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে। ব্যাকরণের কাজ হচ্ছে ভাষার সেই সব নিয়ম-শৃঙ্খলা চিহ্নিত করে ভাষাকে শুদ্ধভাবে জানতে, পড়তে, লিখতে জ্ঞান দান করা। ভাষার ভেতরের নিয়মরীতি, ভাষার উপাদান, নানারকম বৈশিষ্ট্য, গঠন-প্রকৃতি, গতি-প্রকৃতি ও ব্যবহারবিধি ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়।

ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ
প্রাত্যহিক জীবনে পরস্পরের মধ্যে ভাব আদান-প্রদানের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। পৃথিবীর সকল ভাষাই ভিন্ন ভিন্ন উপাদান ও কৌশলে গঠিত হয়। গঠন ও উপাদানের ভিন্নতার কারণে প্রত্যেক ভাষারই নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এসব নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হলে ভাষা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ভাষা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষার উপাদানসমূহ বিচার এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়। ভাষার এরূপ বিশ্লেষণই ব্যাকরণ। বিভিন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ব্যাকরণ সম্পর্কে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা নিচে উল্লেখ করা হলো :
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : “যে শাস্ত্র জানলে ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায় তার নাম ব্যাকরণ।”
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় : “যে শাস্ত্রে কোনো ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ-প্রকৃতি ও প্রয়োগরীতি বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং যার সাহায্যে সেই ভাষা আলাপে ও লেখাতে শুদ্ধরূপে প্রয়োগ করতে পারা যায় সে শাস্ত্রকে সে ভাষার ব্যাকরণ বলে।”
ড. মুহম্মদ এনামুল হক : “যে শাস্ত্রের দ্বারা ভাষাকে বিশ্লেষণ করে এর বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ণয় করা যায় এবং ভাষা রচনাকালে আবশ্যকমতো সেই নির্ণীত তত্ত্ব ও তথ্য প্রয়োগ সম্ভবপর হয়ে ওঠে তার নাম ব্যাকরণ।”
ড. সুকুমার সেন : “যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার উপাদান সমগ্রভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় তাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে।”
মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী : “যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয় তাকে ব্যাকরণ বলে।”
ড. হুমায়ুন আজাদ : “এখন ব্যাকরণ বা গ্রামার বলতে বোঝায় এক শ্রেণির ভাষা বিশ্লেষণাত্মক পুস্তক, যাতে সন্নিবেশিত হয় বিশেষ বিশেষ ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ সূত্রাবলি।”
অর্থাৎ ব্যাকরণ হচ্ছে ভাষা বিশ্লেষণের বিভিন্ন নিয়মের সমন্বয়ে রচিত শাস্ত্র; যার মাধ্যমে ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। শুধু তাই নয় ব্যাকরণ জানা থাকলে সেই ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতেও পারা যায়।
সুতরাং বলা যায়, যে শাস্ত্র পাঠ করলে ভাষাকে বিশ্লেষণ করে এর স্বরূপ ও প্রকৃতি বিশেষভাবে নির্ণয় করা যায় এবং ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায়, তাকে ব্যাকরণ বলে।

উপর্যুক্ত সংজ্ঞার্থগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা একটা সংজ্ঞার্থ দিতে পারি : যে পুস্তকে বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ-প্রকৃতি ও প্রয়োগরীতি নির্ণয় করা হয় এবং যার সাহায্যে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে, বলতে ও ব্যখ্যা করতে পারা যায় তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।

ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য
‘ব্যাকরণ’ সংস্কৃত শব্দ। এর বুৎপত্তিগত (বি + আ + কৃ + অন্) অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। কোনো ভাষার স্বরূপ-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তার প্রয়োগরীতির ব্যাখ্যাদানই ব্যাকরণের উদ্দেশ্য। সকল ভাষারই অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা থাকে, সে শৃঙ্খলা আবিষ্কারই ব্যাকরণের উদ্দেশ্য।
ব্যাকরণকে বলা হয় ভাষার সংবিধান। অর্থাৎ ব্যাকরণ হচ্ছে নিয়ম-কানুনের সমষ্টি। তবে ব্যাকরণ কখনোই ভাষাকে শাসন করে না। কারণ ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে। ব্যাকরণ না জেনেও অনেক মানুষ ভাষা ব্যবহার করছে। তবে ব্যাকরণ ভাষার শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ে সহায়তা করে। ব্যাকরণ ভাষার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে মানুষের ব্যবহারের জন্য সহজ করে দেয়। ভাষা প্রবহমান নদীর মতো। বিভিন্ন সময়ে ভাষা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। ব্যাকরণও ভাষার পরিবর্তনের সাথে সাথে তার নিয়ম-কানুনে পরিবর্তন নিয়ে আসে। ব্যাকরণে সে পরিবর্তনের সূত্র আলোচিত হয়।
অর্থাৎ ভাষার শৃঙ্খলা আবিষ্কার, গতিপ্রকৃতি নির্ণয় ও স্বরূপ বিশ্লেষণই ব্যাকরণের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য।

বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
প্রাচীনকাল থেকেই ভারত উপমহাদেশে সংস্কৃত ব্যাকরণ চর্চা হতো। সংস্কৃত ব্যাকরণের আলোচনায় যাজ্ঞবাল্ক্য, পাণিনি, পতঞ্জলি প্রভৃতি প-িত অসামান্য পা-িত্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। অষ্টাদশ শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকার ভাওয়ালে পর্তুগিজ পাদ্রি ম্যানুএল দ্য আসসুম্পসাও পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। এরপর একজন ইংরেজ ‘ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড’ ১৭৭৮ সালে ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ (A Grammar of the Bengali Language) রচনা করেন। বিদেশিদের বাংলা ভাষা শেখার তাগিদেই তারা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনার উদ্যোগ নেয়। নির্মল দাশ, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও তার ক্রমবিকাশ, বিশ্বভারতী, দ্বিতীয় প্রকাশ, ২০০০; Abdur Rahim Khondkar, The Portugues contribution to Bengali Prose, Grammar and Lexicography, Dacca, 1976; MA Qayyum, A Critical Study of the Early Bengali Grammar: Halhed to Haugton, Dhaka, ১৯৮২ এবং বাংলাপিডিয়া প্রকাশিত আমীনুর রহমানের লেখা বিশ্লেষণে একটি চমৎকার কালক্রমিক বর্ণনা দেওয়া যায়।

বঙ্গদেশে প্রাচীন ও মধ্যযুগে প্রধানত সংস্কৃত ব্যাকরণেরই চর্চা হয়েছে; প্রাকৃত ব্যাকরণের চর্চা তেমন একটা হয়নি। তখন পাণিনির (আনু. খ্রি.পূ পঞ্চম শতক) অষ্টাধ্যায়ীর সূত্রের সংক্ষিপ্ত রূপান্তরই বেশি জনপ্রিয় ছিল। বাংলাদেশে অষ্টাধ্যায়ীর রূপান্তরগুলোর মধ্যে কাতন্ত্র (=ক্ষুদ্র তন্ত্র বা গ্রন্থ), বোপদেবের মুগ্ধবোধব্যাকরণ (মুগ্ধবোধ= মুগ্ধ অর্থাৎ মূঢ় বা অল্পজ্ঞদের বোধের নিমিত্ত রচিত ব্যাকরণ) এবং ক্রমদীশ্বরের (১৩শ শতক) সংক্ষিপ্তসার ও মহারাজ জুমরনন্দীকৃত (১৪শ শতক) এর বৃত্তি রসবতী বেশ প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাঙালির ব্যাকরণ চর্চা বলতে এ ধরনের টীকাভাষ্য রচনায় ছিল প্রধান। এ টীকাভষ্যগুলোর রচনার কাজ সপ্তম শতকের দিকে শুরু হয়ে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণকৌমুদী, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের রচিত চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কারের কাতন্ত্রছন্দঃপ্রক্রিয়া প্রভৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলা ভাষা পরবর্তীকালে মৌখিক ও নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা বা আধুনিক পর্যায়ের ভাষা ছিল বলে ব্যাকরণ আলোচনায় তখনকার পণ্ডিতদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি।

ইউরোপীয় পন্ডিতরা প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন । শুধু বাংলা ভাষার ব্যাকরণই নয়, নব্যভারতীয় প্রাদেশিক ভাষাগুলোর অধিকাংশেরই ব্যাকরণ রচনার সূত্রপাত ঘটে ইউরোপীয়ানদের হাতে। তারা নানা প্রয়োজনে ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষাসমূহ শিখতে ও সহগামীদের শিখিয়ে দেশ শাসনকে আরও কার্যকর করার জন্য এ উদ্যোগ নিয়েছিল। শখাতে বাধ্য হয়েছিল। এ প্রয়োজনের কারণে পর্তুগিজ ধর্মযাজক মনোএল দ্য আসসুম্পসাঁউ (Manoel da Assumpcam) পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। মনোএল ভাওয়ালের একটি গির্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনকালে ১৭৩৪-৪২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে Vocabolario em idioma Bengalla, e Potuguez dividido em duas partes শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটি দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। প্রথম অংশ বাংলা ব্যাকরণের একটি সংক্ষিপ্তসার এবং দ্বিতীয় অংশ বাংলা-পর্তুগিজ ও পর্তুগিজ-বাংলা শব্দের অভিধান। গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ ভাষায় রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। লাটিন ব্যাকরণ থেকে এর কাঠামোগত আদর্শ গৃহীত হয়েছে। তাই এটি লাতিন ভাষার অনুকরণে বর্ণিত হয়েছে। এ ব্যাকরণ গ্রন্থে শুধু রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে, ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণের রচয়িতা (Nathaniel Brassey Halhed: ১৭৫১-১৮৩০)। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এ ব্যাকরণ গ্রন্থটির নাম A Grammar of the Bengal Language। হ্যালহেড ভালো সংস্কৃত জানতেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলা ভাষার উদ্ভব সংস্কৃত থেকে। তাই তাঁর ব্যাকরণে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাব লক্ষণীয়। হ্যালহেডের ব্যাকরণের বিষয় বিন্যাস তৎকালীন ইংলিশ ব্যাকরণের অনুরূপ হলেও ক্ষেত্রবিশেষে তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের মূল সূত্রগুলোও ব্যাখ্যা করেছেন। মনোএল বাংলা ভাষাকে লাতিন ব্যাকরণের আদলে ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে হ্যালহেড বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করেছেন। একারণে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের পারিভাষিক শব্দকে বাংলা ব্যাকরণের পারিভাষিক শব্দ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস নিয়েছেন।

হ্যালহেডের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে রচিত হলেও এখানেই প্রথম বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়, এজন্য বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসেও গ্রন্থটি একটি মূল্যবান দলিল হিসাবে স্বীকৃত। চার্লস উইলকিনসন এবং পঞ্চানন কর্মকার একত্রে ছাপাখানার জন্য যে বাংলা হরফ (font) প্রবর্তন করেছিলেন, তার সাহায্যে হ্যালহেডের গ্রন্থে বাংলা উদাহরণগুলো মুদ্রিত হয়।

আঠারো শতকে রচিত বাংলা ব্যাকরণের এ দুটি নজির ছাড়া বাংলা ব্যাকরণের আর কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। উনিশ শতকে বাংলা ব্যাকরণ রচনায় একটি ছোটখাট স্রোত লক্ষ করা যায়। এ শতকের প্রথমার্ধে রচিত বাংলা ব্যাকরণগুলো প্রধান দুটি ধারায় বিভক্ত। প্রথম ধারার গ্রন্থগুলো বিদেশিদের দ্বারা ইংরেজি ভাষায় রচিত। এগুলির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয়ানদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া। (১৭৬১-১৮৩৪), হটন, ইয়েটস ও ওয়েঙ্গার এই ধারার ব্যাকরণবিদদের অন্যতম। দ্বিতীয় ধারার রচয়িতারা ছিলেন প্রধানত বাঙালি এবং তাঁদের রচনার ভাষা ছিল বাংলা। এ ধারার ব্যাকরণের পাঠক ছিল দেশীয় পাঠশালা ও ইংরেজি স্কুলগুসমূহের শিক্ষার্থীরা। প্রায় সবক্ষেত্রে এরকম ব্যাকরণের লেখক ছিলেন টোল বা চতুষ্পাঠীর সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতবর্গ। ফলে তাঁরা বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের আদর্শে বিচার করে এক ধরনের উপদেশমূলক ব্যাকরণ রচনা করেন। রামমোহন রায় এই দুই ধারার ব্যাকরণ রচয়েতাদের মধ্যে ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি বিদেশি বা টোল-চতুষ্পাঠীর প-িতদের মতো বাংলা-সংস্কৃতের সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে বাংলা ভাষার নিজস্ব উপাদান ও স্বাতন্ত্র্যের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রথমার্ধের দুটি ধারার আরও সম্প্রসারণ ঘটে। কিছু কিছু ব্যাকরণে (শ্যামারচণ সরকার, ডানকান ফোর্বস, জন বীম্স্ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য) বাংলার সংস্কৃত-ঘনিষ্ঠ শিষ্ট রূপটির পাশাপাশি কথ্য রূপের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ সময় দেশি-বিদেশি ভাষাবিজ্ঞানীদের (বীম্স্, হর্নলে, রামকৃষ্ণ গোপাল ভান্ডারকর) উদ্যোগে তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ব্যাকরণের গোড়াপত্তন হয়। তাছাড়া সৃজনশীল সাহিত্যিকদের (শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ) ভাষাবিষয়ক রচনায় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ভাষার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।

 উনিশ শতকের প্রারম্ভে রচিত হয় উইলিয়ম কেরির বাংলা ব্যাকরণ A Grammar of the Bengali Language। হ্যালহেডের ব্যাকরণের অনুকরণে কেরির গ্রন্থটি প্রণীত হয়েছে। তবে হ্যালহেড তাঁর গ্রন্থে বিশেষ্য, ক্রিয়াপদ বা পার্টিকেল ব্যবহারের ক্ষেত্র গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তবে কেরি তাঁর রচনায় ওই সব বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

হেলিবেরির তৎকালীন ইস্ট-ইন্ডিয়া কলেজের সংস্কৃত ও বাংলার অধ্যাপক জি.সি হটন (Graves Chamney Haughton: ১৭৮৮-১৮৪৯) লন্ডন থেকে ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেন Rudiments of Bengali Grammar। হেলিবেরি কলেজের বাংলা ভাষার শিক্ষার্থীদের জন্য হটন এটি রচনা করেছিলেন। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশী বৈয়াকরণেরা যে ধরনের ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন, সেগুলির বিষয়বস্তুকে সামান্য পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে হটন ব্যাকরণটি রচনা করেন।

বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাসে প্রকৃত অর্থে ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন রেভারেন্ড ডব্লিউ ইয়েটস (Rev. W Yates: ১৭৯২-১৮৪৫)। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ব্যাকরণ গ্রন্থটির নাম Introduction to the Bengali Language (১৮৪৭)। ইয়েটসের ব্যাকরণ দুটি খণ্ডে রচিত হয়েছিল। প্রথম খণ্ডে বাংলা ব্যাকরণ আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে সংকলিত হয়েছে বাঙালি কবিদের কবিতা ও সমসাময়িক সাহিত্যের অংশবিশেষ। ইয়েটস তাঁর ব্যাকরণের বিষয় বিন্যস্তকরণে প্রায় পুরোপুরি কেরীর ব্যাকরণের ওপর নির্ভর করেছেন। তবে বাংলা ভাষার শুদ্ধতার ব্যাপারে তিনি কেরীর চেয়ে অধিক সতর্কতা ও রক্ষণশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

রেভারেন্ড জে কীথ (Rev. J  Keith) রচিত A Grammar of the Bengalee Language গ্রন্থে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যাকরণ সম্পর্কিত সাধারণ বিষয়গুলো প্রশ্নোত্তর আকারে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রশ্নগুলো উত্তরের দিক থেকে রচিত হওয়ায় খুব একটা কৌতূহলোদ্দীপক ছিল না। দ্বিতীয়ত উত্তরগুলো আকারে সংক্ষিপ্ত, ফলে ব্যাকরণের খুঁটিনাটি বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

১৮২৬ খ্রিস্টাব্দের কলকাতার ইউনিটারিয়েন প্রেস থেকে রাজা রামমোহন রায়ের ইংরেজি ভাষায় রচিত ব্যাকরণ গ্রন্থ Bengali Grammar in the English Language প্রকাশিত হয়। রামমোহন রায় মিস্টার কেরি বা হটনের মতো সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে বড় করে দেখেননি। তিনি বাংলা ভাষার একটি মূল প্রবণতা লক্ষ্য করেছিলেন। তাই তিনিই প্রথম ব্যাকরণের বিভিন্ন প্রকরণ (বিশেষ্য, বিশেষণ, কারক ইত্যাদি) সম্পর্কে শুধু দৃষ্টান্ত নয়, খানিকটা তাত্ত্বিক আলোচনাও করেছেন। রামমোহন তাঁর আলোচনায় কোথাও সর্বজনবিদিত সংস্কৃত ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ ও পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কোথাও বাংলা ভাষার প্রকৃতির প্রয়োাজনে নতুন সংজ্ঞার্থ ও পরিভাষা রচনা করা হয়েছে। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে যে আলোচনা করেছেন, কালের দিক থেকে তা ছিল সম্পূর্ণ বিপ্লবাত্মক। তিনি ব্যাকরণকে কোনো ঔচিত্যমূলক শাস্ত্র হিসাবে বিবেচনা করেননি, বরং ব্যাকরণকে দেখেছেন ভাষার বিশ্লেষণ বা বর্ণনামূলক শাস্ত্র হিসাবে। পদ ও পদের বিভাজন, সন্ধি, সমাস, বিশেষত পধংব ও পধংব-এর শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে রামমোহনের ধারণা সমকালের সকল ব্যাকরণবিদদের ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, অভিনব ও বাংলা ভাষার মূল প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এ দেশে বেশ কিছু সংখ্যক ইংরেজি-বাংলা বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঠ্য ব্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এতকাল বাংলা ব্যাকরণ রচিত হয়েছিল মূলত বিদেশিদের বাংলা ভাষা শিক্ষাদানের কথা বিবেচনা করে। এবার এই নতুন প্রয়োজন মেটানোর জন্য পাঠ্য ব্যাকরণ রচনা শুরু হয়। কিন্তু এগুলো মূলত হয়ে ওঠে সংস্কৃত ব্যাকরণের বাংলা রূপান্তর। বিদেশীরা বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রকৃতি যতটুকু বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন বা রামমোহন যেভাবে বাংলা ভাষার মূল প্রকৃতিকে শনাক্ত করতে চেয়েছিলেন, স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণগুলোতে তার সবকিছুই বর্জিত হয়। পরবর্তী বহুদিন পর্যন্ত সেগুলিতে সংস্কৃতের প্রভাব বজায় ছিল। এর প্রধান কারণ তখন বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক ছিলেন সংস্কৃত প-িত। অধিকন্তু তখন স্কুল সোসাইটির অন্যতম উদ্যোক্তা যিনি ছিলেন, তিনি মনে করতেন সংস্কৃতজ্ঞান ছাড়া বাংলা ভাষার শুদ্ধ লিখন, পঠন ও কথন সম্ভব নয়। ফলে বাংলা ব্যাকরণের মূল প্রবণতা সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্রে আবদ্ধ হয়ে যায়।

বাঙালি কর্তৃক বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনার প্রথম প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় রাধাকান্ত দেবের বাঙ্গালা শিক্ষাগ্রন্থে (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮২১)। এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ নয়, অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয়ের সঙ্গে বাংলা বর্ণমালা, বর্ণের উচ্চারণ স্থান ও সংখ্যা, শব্দ, সন্ধি ইত্যাদি বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী বিবৃত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মগুলোই যথাসম্ভব সংক্ষিপ্তভাবে পুনর্বিন্যস্ত করে বাঙ্গালা শিক্ষাগ্রন্থে তিনি উপস্থাপন করেছেন। বাংলা ভাষায় বাঙালির রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণের কৃতিত্ব রাজা রামমোহন রায়ের প্রাপ্য। তিনি স্কুল সোসাইটির অনুরোধে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এটি রচনা করেন, যা ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি কোনো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি। তবে ব্যাকরণের পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা ব্যাকরণ রচনায় রামমোহনের মৌলিকত্ব এবং ভাষার প্রকৃতি বিচারে তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল যেমন সঙ্গত তেমনি যথাযথ। কিন্তু পরবর্তীকালের ব্যাকরণ রচয়িতারা তাঁকে অনুসরণ না করে বরং সংস্কৃতমুখী বাংলা ব্যাকরণ রচনার প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েন।

গৌড়ীয় ব্যাকরণ প্রকাশের পর উনিশ শতকের তিরিশের দশকে বাঙালির লেখা আরও কয়েকটি বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশিত হয়েছিল। সেসবের মধ্যে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত গোপালচন্দ্র চূড়ামণির ব্যাকরণ সংগ্রহ, তারকনাথ রায়ের ব্যাকরণ সার (প্রকাশকাল উল্লেখ নেই) এবং ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্র দে’র ব্যাকরণ উল্লেখযোগ্য।

উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বাংলা ব্যাকরণ রচিত হয়। সেগুলোর মধ্যে ভগবচ্চন্দ্র বিশারদের সাধু ভাষার ব্যাকরণসার সংগ্রহ (১৮৪০), ব্রজকিশোর গুপ্তের বঙ্গভাষা ব্যাকরণ (১৮৪০), রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের শিশুসেবধি (১৮৪০), ক্ষেত্রমোহন দত্তের গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৪১) এবং জন রবিনসনের বঙ্গ ভাষার ব্যাকরণ ও ধাতু সংগ্রহ (১৮৪৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভগবচ্চন্দ্রের ব্যাকরণ সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরণে রচিত এবং তার ভাষাও সংস্কৃত মিশ্রিত জটিল বাংলা। ব্রজকিশোর গুপ্তের ব্যাকরণও সংস্কৃত ব্যাকরণের ছায়ামাত্র। ক্ষেত্রমোহনের ব্যাকরণ রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণের পুনর্লিখন। আর রবিনসনের ব্যাকরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উইলিয়ম কেরির Grammar of the Bengali Language-এর বাংলা অনুবাদ।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধেও ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলা ব্যাকরণ রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে ইংরেজিতে শ্যামাচরণ সরকার (১৮১৪-৮২) রচিত Introduction to the Bengalee Language (১৮৫০) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকরণটির একটি বাংলা সংস্করণও (বাঙ্গালা ব্যাকরণ) প্রকাশিত হয়েছে ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থটির বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে রামমোহনের অনুকরণে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত আদর্শের পরিবর্তে বাংলা ভাষার স্বরূপে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা সে সময় আর কেউ করেননি। তাছাড়া শ্যামাচরণই প্রথম বাংলা ভাষার শিষ্টরূপের পাশাপাশি লৌকিক কথ্যরূপেরও পরিচয় দিয়েছেন এবং বাংলা ভাষায় দেশজ ও বিদেশি (আরবি, ফারসি ইত্যাদি) শব্দের প্রয়োাজনীয়তা ও তাৎপর্য নির্দেশ করেছেন।

ডানকান ফোর্বস (Duncan Forbes: ১৭৯৮-১৮৬৮) রচিত A Grammar of the Bengali Language to which added a selection of easy phrases and useful dialogues প্রকাশিত হয় ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। গ্রন্থটিতে তিনি হটনের অনুসরণে ব্যাকরণের প্রতিষ্ঠিত পুরাতন সূত্রগুলিকেই ছাত্রদের উপযোগী করে পুনর্বিন্যাস করেছেন। বিভাষী ছাত্রদের কথা বিবেচনা করে আরেকজন বিদেশী জি.এফ নিকল (GF Nicholl) রচনা করেন Manual of the Bengali Language, Comprising a Bengali Grammar and Lessons, with various appendices including an Assamese Grammar (১৮৮৫)।

জন বীম্স (১৮৩৭-১৯০২) ছিলেন প্রধানত একজন ভাষাতাত্ত্বিক। তাই বর্ণনামূলক ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে রচিত তাঁর The Oxford Oriental Series Grammar of the Bengali Language Literary and Colloquial (১৮৯১, ১৮৯৪) গ্রন্থে সমকালীন বাংলা ভাষার রূপ বিশ্লেষিত হয়েছে। যেহেতু বিদেশীদের কথ্য বাংলা শেখানোই ছিল ব্যাকরণটির প্রধান উদ্দেশ্য, সেহেতু কথ্য বাংলার রূপ ও ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয় প্রদানের ব্যাপারেই বীম্সের প্রধান আগ্রহ লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, প্রথমার্ধের মতোই বাংলা ভাষায় বেশ কিছু স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ রচিত হয়। যদিও সেগুলোর স্বতন্ত্র কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। দুএকজন ব্যাকরণবিদ প্রচলিত রীতি ভঙ্গ করে গদ্যের পরিবর্তে পদ্যে (নন্দকুমার রায়, ব্যাকরণ দর্পণ, ১৮৫২) এবং প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতে (রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ব্যাকরণ প্রবেশ, ১৮৬২) ব্যাকরণ রচনা করেন।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্ধশতাধিক উল্লেখযোগ্য ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হয়েছে। রচয়িতাদের মধ্যে একজন ছিলেন বিদেশী (ধাতুমালা, ১৮৫৭), বাকিরা বাঙালি। বাঙালিদের মধ্যে আবার অধিকাংশই ছিলেন কলকাতার। কলকাতার বাইরে শ্রীরামপুর, কৃষ্ণনগর, হুগলি, শান্তিপুর, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলের পন্ডিতরাও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন শ্যামাচরণ সরকার (বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ১৮৫২), নন্দকুমার রায় (ব্যাকরণ দর্শন, ১৮৫২), রাজেন্দ্রলাল মিত্র (ব্যাকরণ প্রবেশ, ১৮৬২), কৃষ্ণকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায় (সরল ব্যাকরণ, ১৮৭৭), হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ১৮৮২) প্রমুখ।

উনিশ শতকের মধ্যভাগে স্কুলপাঠ্য হিসেবে যেসব বাংলা ব্যাকরণ রচিত হয়, সেসবের অধিকাংশই ছিল সংস্কৃত ব্যাকরণের বঙ্গানুবাদ। বাংলা ভাষার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য সেগুলিতে বিধৃত করা হয়নি। কিন্তু বীমস্, হর্নলে বা ভান্ডারকর এ সময় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব চর্চার যে সূত্রপাত করেন, তাতে বেশ কিছু ব্যাকরণবিদ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা ব্যাকরণ রচনার তাগিদ অনুভব করেন। তাঁদের মধ্যে চিন্তমণি গঙ্গোপাধ্যায়ের (বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ১৮৮১), নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণের (ভাষাবোধ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ১৮৯৮) ও হূষিকেশ শাস্ত্রীর (বাঙ্গালা ব্যাকরণ, ১৯০০) ব্যাকরণ উল্লেখযোগ্য। এরা বাংলা ব্যাকরণ রচনায় সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাবমুক্ত ছিলেন না, কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণের বিষয়গুলো প্রথমে আলোচনা করে পরে বাংলা ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত করেছিলেন।

বাংলা ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে উনিশ শতকের তুলনায় বিশ শতক বহুমাত্রায় বৈচিত্র্যপূর্ণ। উনিশ শতকে এ বিষয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও কোন অনুসরণীয় আদর্শ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বিশ শতকে ভাষার আদর্শের মতো ব্যাকরণ রচনারও একটি আদর্শ রূপ ও পদ্ধতির অনুসন্ধানে বেশ কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। সেগুলির মধ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষা চর্চায় পরিষদের নিরন্তর উৎসাহ প্রদান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর পাঠ্য তালিকায় বাংলা ব্যাকরণ অন্তর্ভুক্তকরণের ফলে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া গ্রিয়ারসনের The Linguistic Survey of India-য় বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সন্নিবেশিত হওয়ায় এবং নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় (১৯১৩) বাংলা ভাষা বিদেশেও পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ ও ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২) এবং সেই প্রেরণায় বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা (১৯৫৫) বাংলা ভাষা চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি (১৯৮৫) বাংলা ভাষা চর্চায় যে গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রভাব বাংলা ব্যাকরণ চর্চার ক্ষেত্রেও পড়েছে। এ শতকে একাডেমিক ব্যাকরণ রচনার চেষ্টা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয় এবং ব্যাকরণ প্রণয়নে ভাষা বিজ্ঞানের কলাকৌশলও প্রয়োগ করা হয়।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের একটি সভায় (১৯০১) পঠিত ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ প্রবন্ধে সমগ্র উনিশ শতকের ব্যাকরণকে মূলত দুই ধরনের ‘প্যাটেন্টে’ চিহ্নিত করেছিলেন: মুগ্ধবোধ প্যাটেন্ট এবং হাইলি-প্যাটেন্ট। প্রথম ধরনের লেখকরা ছিলেন সংস্কৃত পন্ডিত, আর দ্বিতীয় ধরনের লেখকরা ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়া তৃতীয় এক ধরনের প্যাটেন্ট ব্যাকরণের কথাও তিনি বলেছিলেন, যাতে এই দুই ধরনের রচনার মিশ্রণ ঘটেছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উক্ত প্রবন্ধে বাংলা ভাষার প্যাটেন্ট ব্যাকরণ রচনার পরিবর্তে প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ রচনার পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশনাকে যথার্থ অর্থে কর্মে প্রয়োগ করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ে কোনো সম্পূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেননি, তবে তাঁর শব্দকথা (১৩২৪) গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধগুলিতে বাংলা ব্যাকরণ রচনা ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকরণ সম্পর্কে তাঁর রচিত প্রবন্ধগুলির মধ্যে রয়েছে ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ (১৩০৮), ‘বাঙ্গালা কৃৎ ও তদ্ধিত’ (১৩০৮), ‘কারক প্রকরণ’ (১৩১২), ‘না’ (১৩১২) ও ‘ধ্বনিবিচার’ (১৩১৪)। ব্যাকরণ রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনিই প্রথম বলেন, ব্যাকরণশাস্ত্রের উদ্দেশ্য ভাষার মধ্যকার প্রচ্ছন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলাগুলি আবিষ্কার করা, ভাষাকে শুদ্ধরূপে লিখতে, বলতে বা পড়তে শেখানো নয়।

বাংলা শব্দতত্ত্ব সম্পর্কে তরুণ বয়স থেকেই যে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর শব্দতত্ত্ব (১৩৪২) গ্রন্থে সংকলিত ভাষাবিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে। বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর ধারণার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লেখা বাংলাভাষা পরিচয় (১৯৩৮) গ্রন্থে। এতে তিনি বাংলা ভাষার চলিত রূপের পরিচয় বিধৃত করেছেন। তাঁর কাছে ভাষা হচ্ছে সচল সমাজমনের নিত্য প্রবহমান অভিব্যক্তি; আর এই অভিব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে চলিত ভাষায়। চলিত বাংলা রূপের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন, বাংলা হচ্ছে ভঙ্গিপ্রধান ভাষা এবং এই ভঙ্গির পরিচয়ই তিনি ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব এই তিন দিক থেকে উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন।

উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে বাংলা ব্যাকরণের রূপ ও প্রকৃতি নিয়ে যে তর্ক জমে ওঠে, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৮-১৯২৯) তার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেন। তাঁর ‘ব্যাকরণ বিভীষিকা’ (১৯১১), ‘সাধুভাষা বনাম চলিত ভাষা’ (১৯১৩), ‘বানান-সমস্যা’ (১৯১৩), ‘অনুপ্রাস’ (১৯১৩), ‘ক-কারের অহংকার’ (১৯১৫) প্রভৃতি রচনা তাঁর ওই চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ চর্চার আরেকটি প্রবণতা পরিস্ফুট হতে থাকে, যার সঙ্গে আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাচর্চার সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্ট। বর্তমানেও এ ধরনের ব্যাকরণচর্চা চলছে এবং অব্যাহত গতিতে তা এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দুই বাংলার ভাষা গবেষণায় যে প্রধান ধারাগুলি দেখা যায় সেগুলি হচ্ছে: ১. তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, ২. সাংগঠনিক ও রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ এবং ৩. উপভাষা তত্ত্ব। বিশ শতকের শুরুতেই প্রকাশিত হয় শ্রীনাথ সেনের ভাষাতত্ত্ব (১৯০০) গ্রন্থটি। এটিকেই, নানা অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও, বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার প্রথম নিদর্শন বলে বিবেচনা করা হয়। সমসাময়িককালে ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির (১৮৫৯-১৯৫৬) বাঙ্গালা ভাষা (১৯১২)। শ্রীনাথের তুলনায় যোগেশচন্দ্রের ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান ও ইতিহাস দৃষ্টি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণের অপর নিদর্শন হচ্ছে বিজয় চন্দ্র মজুমদারের (১৮৬১-১৯৪২) The History of the Bengali Language (১৯২০)। তিনিই প্রথম ঐতিহাসিকভাবে বাংলা ভাষায় বিদেশী উপাদানগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এ গ্রন্থটি প্রকাশের পর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of the Department of Letters (Vol. III, 1920)-এ “Outlines of an Historical Grammar of the Bengali Language” শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার আদর্শ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (১৮৯০-১৯৭৭) রচিত The Origin and Development of the Bengali Language’ (ODBL, ১৯২৬) নামক অদ্বিতীয় গবেষণা গ্রন্থে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা ভাষার উপাদানগুলো চিহ্নিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। এ গ্রন্থের মাধ্যমে বাঙালির মাতৃভাষা চর্চার যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার ওপরেই দাঁড়িয়েছে আছে পরবর্তী অনেকের ভাষাচর্চার সৌধ।

বাংলা ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে বাংলায় প্রথম টেক্সট বই রচনার কৃতিত্ব হেমন্তকুমার সরকারের। তাঁর গ্রন্থের নাম ভাষাতত্ত্ব ও বাংলা ভাষার ইতিহাস (১৯২৩)। তবে টেক্সট বইগুলির মধ্যে সুকুমার সেন রচিত ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৩৯) সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষার ইতিহাস বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট বই হচ্ছে পরেশচন্দ্র মজুমদারের বাঙলা ভাষা পরিক্রমা (১৩৬৩)। ঐতিহাসিক ব্যাকরণের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মুহম্মদ শহীদুল্লার বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত। সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞানের ধারা ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠায় ঐতিহাসিক ব্যাকরণ চর্চার ধারা বর্তমানে ক্ষীণ এবং প্রায় অবসিত হয়ে উঠেছে।

বাংলা ভাষায় আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে ইংল্যান্ডে তিনি বাংলা নাসিক্য ধ্বনি ও নাসিক্যীভবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন (A Phonetic and Phonological Study of Nasasl and Nasalization in Bengali, ১৯৬০)। দেশে ফিরে তিনি রচনা করেন ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব (১৯৬৪) গ্রন্থ। এর মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় ভাষাতত্ত্ব চর্চার গতি পরিবর্তিত হয়। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ভাষাতত্ত্বে শিক্ষাগ্রহণ ও গবেষণা করেন কাজী দীন মুহম্মদ (Verbal piece in colloquial Bengali: A Phonological Study, ১৯৬১), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (Some suprasegmental phonological features of Bengali, ১৯৫৯), (The Phonemes of Bengali, ১৯৬১, ফার্গুসনের সঙ্গে যৌথভাবে), আমিনুল ইসলাম (A phonetic study of inter-word relations in Bengali, ১৯৬১), রফিকুল ইসলাম (Bengali Graphemics, ১৯৬০), আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ (A study of Standard Bengali and the Noakhali Dialect, ১৯৭৫), হুমায়ুন আজাদ (Pronominalisation in Bengali, ১৯৭৬) প্রমুখ। এঁদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদের বাক্যতত্ত্ব (১৯৮৪) গ্রন্থটি চমস্কি সূচিত ভাষাবিজ্ঞানের ধারণাকে বাংলা ভাষায় সংযোজিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয় বাংলাদেশে তা সমৃদ্ধি অর্জনের অনেক পরে। সেখানে যাঁরা সাংগঠনিক ব্যাকরণ নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু (বাংলা ভাষার আধুনিক তত্ত্ব ও ইতিকথা), সুহাস চট্টোপাধ্যায়, শিশিরকুমার দাশ, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত, অনিমেষ কান্তি পাল, মঞ্জুলী ঘোষ, পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, সমীর ঘোষ, সুকুমার বিশ্বাস, রামেশ্বর শ্ব’ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে প্রবাল দাশগুপ্ত (হালের পশ্চিমী ব্যাকরণতত্ত্ব, ১৯৭৪), পবিত্র সরকার ((The Generative Phonological Component of the Grammar of Bengali, ১৯৭৫), উদয়নারায়ণ সিংহ (চর্যাবাক্যব্যবচ্ছেদবিষয়ক প্রস্তাব: ১ ক্রিয়াপদ, গাঙ্গেয়পত্র, ১৯৭৯; নোয়াম চমস্কি: সঞ্জননী ব্যাকরণবিপ্লব, ভাষা, ১৯৮৩), রামেশ্বর শ্ব’ (সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ১৯৮৪) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

বাংলা উপভাষা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ ও তার অভিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যে অসীম ধৈর্য ও শ্রমে পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (১৯৬৫) প্রণয়ন করেছেন তা অতুলনীয়। পরবর্তীকালে তাঁকে অনুসরণ করে প্রকাশিত হয় কামিনীকুমারের লৌকিক শব্দকোষ (১৯৬৮)। এরই অনুষঙ্গে অনেকেই আঞ্চলিক শব্দ ও তার বিবরণ সংগ্রহে এগিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে অনিমেষ কান্তি পাল, মনিরুজ্জামান, রাজীব হুমায়ুন প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদেশীদের মধ্যে অন্তত দুজনের নাম এখানে উল্লেখ করার মতো যাঁরা বাংলা উপভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা হলেন জ্যাক এ ড্যাবস (পূর্ববঙ্গ উপভাষা, ১৯৬৫) ও নোরিহিকো উচিদা (চট্টগ্রামী উপভাষা, ১৯৬৯)।

উপভাষা চর্চার পাশাপাশি সমাজ ভাষাবিজ্ঞান নিয়েও অনেকের আগ্রহ ও মূল্যবান কাজ ইদানীং সুধীমহলে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (খুলনা জেলার মাঝির ভাষা, ১৯২৪), সুকুমার সেন (Women’s dialect in Bengali, 1929; The caste dialects of the Muchis in South-western Burdwan, ১৯৬৫), পৃথ্বীশ চক্রবর্তী (Dialects of Ranakamars of Birbhum, ১৯৬৫), নির্মল দাশ (উত্তরবঙ্গের নারীর ভাষা, ১৯৭০), ভক্তিপ্রসাদ মল্লিক (অপরাধ জগতের ভাষা, ১৯৭২), আফিয়া দিল (Hindu-Muslim Dialects in Bengali, ১৯৭২), পবিত্র সরকার (বাংলা গালাগালির ভাষাতত্ত্ব, ১৯৭২; ভাষা-দেশ-কাল, ১৯৮৫); মনিরুজ্জামান (শিশুর ভাষা, ১৯৭৬), মনসুর মুসা (ভাষা পরিকল্পনার সমাজ ভাষাতত্ত্ব, ১৯৮৫), মৃণাল নাথ (সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের রূপরেখা, ১৯৮৯), রাজীব হুমায়ুন (সমাজ ভাষাবিজ্ঞান, ১৯৯৩), সত্রাজিৎ গোস্বামী (বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, ২০০০) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

উনিশ শতকের ন্যায় বিশ শতকেও বেশ কিছু বাংলা ব্যাকরণ বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় রচিত হয়েছে। এগুলোর পাঠক ছিলেন মূলত বিদেশি-বিভাষী বাংলা শিক্ষার্থীবৃন্দ। এগুলি উনিশ শতকে রচিত ব্যাকরণগুলির তুলনায় খুব বেশি নতুনত্বের দাবিদার ছিল না। তবে এ ব্যাকরণ গ্রন্থসমূহে বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে গ্রন্থগুলো ব্যাকরণের তুলনায় স্বশিখনের সহায়ক গ্রন্থ হয়ে উঠে। ইংরেজি, জার্মান, রুশ, জাপানি ও চেক ভাষায় রচিত এ ধরনের অন্তত ২৫ খানা গ্রন্থের কথা জানা যায়। এগুলির কোনো কোনোটির রচয়িতা বাঙালি, আবার কোনো কোনোটি বাঙালি-অবাঙালির যৌথ উদ্যোগের রচিত। এ ধারার গ্রন্থগুলোর মধ্যে : ইংরেজি Introduction to Bengali: Edward C Dimock, Jr. Somdev Bhattacharji and Suhas Chatterjee, Chicago University, 1959; Bengali Language Handbook: Punyaslok Roy, Washington, DC, 1966, cybg©y`«Y cwðge½  evsjv AvKv‡`wg, 1998;  An Introduction to Colloquial Bengali: Walter Sutton Page, Cambridge, 1934; Learn Bengali Yourself: Bidhubhusan Dasgupta, 2nd ed, Calcutta, 1948; Colloquial Bengali: Mufazzal Haider Choudhuri, Bangla Academy, Dacca, 1963; Rg©b Praktische grammatik der Bengalischen umgangsprache: Biren Banerji, Vienna-leipzig, 1923; Rvcvwb Bengarugo nyummon: Tsuyoshi Nara Tokyo, 1975; iæk Uchebnik Danilchuk: D Litton and others, Uchebnik Bengalskogo Yazyka, Moscow, 1959; †PK Ucebnico Bengalistiny: Dusan Zbavitel, Prag ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বিশ শতকে যাঁরা বাংলায় ছাত্রপাঠ্য ব্যাকরণ রচনা করেছেন তাঁদের অধিকাংশই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বা নতুন কোনো ব্যাকরণিক সত্য আবিষ্কারের পরিবর্তে কেবল প্রচলিত পাঠ্যসূচির নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এর বাইরেও কেউ কেউ সমসাময়িক ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার প্রতি দৃষ্টি রেখে ব্যাকরণ রচনা করেছেন। বিংশ শতকের প্রথম থেকে শেষ দশক পর্যন্ত বহু ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হয়েছে। সেসবের মধ্যে : ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৩৯), ব্যবহারিক বাঙ্গালা ব্যাকরণ (বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৪৪), অভিনব ব্যাকরণ (কাজী দীন মুহম্মদ ও সুকুমার সেন, ঢাকা, ১৯৪৮), ব্যাকরণ মঞ্জরী (মুহম্মদ এনামুল হক, রাজশাহী, ১৯৫১), ব্যাকরণ পরিচয় (মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ঢাকা, ১৯৫৩), বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও ইব্রাহিম খলিল, ঢাকা, ১৯৭২) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

এ শতকের ব্যাকরণগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ। এটি স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ হলেও মূলত তাঁর ওডিবিএল অনুসরণেই রচিত। ফলে প্রচলিত ব্যাকরণ কাঠামো ভেঙে সেখানে স্থান করে নিয়েছে আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। সুনীতিকুমারই প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মগুলো নির্বিচারে গ্রহণ না করে ইতিহাস ও উপযোগিতার সূত্রে গ্রহণ-বর্জন করেছেন। এ ব্যাকরণে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষার জন্য কোনো নিয়ম প্রতিষ্ঠা ও নিয়ম আরোপ করা নয়, বরং ভাষার অন্তর্নিহিত নিয়ম আবিষ্কার ও তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। বাংলা ব্যাকরণ রচনার এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় এখনও নতুন নতুন ব্যাকরণগ্রন্থ রচিত হচ্ছে, কিন্তু সেগুলির কোনোটিই নিরঙ্কুশ বাংলা ভাষার ব্যাকরণের মর্যাদা পায়নি; সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাব এখনও অনেকাংশে রয়ে গেছে।

ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় : ব্যাকরণের বিষয়বস্তু ও পরিধি
ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় ভাষা। ভাষার স্বরূপ-প্রকৃতি ও গঠনরীতি ব্যাকরণের পরিধির আওতাভুক্ত। ভাষা যে সকল উপাদানে গঠিত হয় তাই ব্যাকরণের আলোচনার বিষয়। ভাষার অংশগুলো হচ্ছে : ধ্বনি, শব্দ ও বাক্য। ভাষার সবচেয়ে ক্ষুদ্র উপাদান হচ্ছে ধ্বনি। ধ্বনির মিলনে যদি অর্থ প্রকাশিত হয় তাকে বলে শব্দ। আর একাধিক শব্দ মিলিত হয়ে যদি মনের ভাব প্রকাশিত হয় তাকে বলে বাক্য। বাংলা ব্যাকরণ প্রধানত পাচটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে। যেমন- ১. ধ্বনিতত্ত্ব; বা চিনি প্রকরণ ২. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব ৩. বাক্যতত্ত্ব বা বাক্য প্রকরণ ৪. অর্থতত্ত্ব ৫. ছন্দ ও অলংকার প্রকরণ ও (৬) অভিধান তত্ত্ব।
১. ধ্বনিতত্ত্ব ও ধ্বনি প্রকরণ : ব্যাকরণের এ অংশে বর্ণ ও বর্ণের ব্যবহার, বর্ণ ও ধ্বনির উচ্চারণ, বর্ণ ও ধ্বনি উচ্চারণের উৎস, ধ্বনির বিন্যাস, ধ্বনির পরিবর্তন, ধ্বনির লোপ, ধ্বনির উচ্চারণ স্থান ও উচ্চারণ প্রণালি, সন্ধি, ণ-ত্ববিধান, ষ-ত্ব বিধান, প্রভৃতি ধ্বনি সম্বন্ধীয় বিষয়গুলো আলোচিত হয়।

২. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব বা পদপ্রকরণ : ব্যাকরণের এ অংশে শব্দের প্রকার শব্দের পরিচয়, শব্দ গঠন, শব্দের উৎস পদ পরিচয়, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, পুরুষ, লিঙ্গ, বচন, ধাতু, শব্দরূপ, কারক, সমাস, ধাতুরূপ, ক্রিয়াপ্রকরণ, ক্রিয়ার কাল, ক্রিয়ার ভাব, ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করে।

৩. বাক্যতত্ত্ব বা বাক্য প্রকরণ : ব্যাকরণের এ অংশে বাক্য, বাক্যের গঠন, বাক্যের প্রকার, বাক্যের বিশ্লেষণ, বাক্য পরিবর্তন বাক্য সংশোধণ, বাক্য বিরাজন, বাক্য সংকোচন, বাগধারা বাগবিধি, যতি, বিরাম চিহ্ন প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়।
৪. অর্থতত্ত্ব : শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ, যেমন- মুখ্যার্থ, গোনার্থ, বিপরীতার্থ ইত্যাদি অর্থতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

৫. ছন্দ ও অলংকার প্রকরণ : ছন্দের প্রকার ও নিয়মসমূহ, অলংকারের সংজ্ঞা শব্দালংকার, অর্থালংকার বাক্যালংকার ইত্যাদি আলোচিত হয়। তবে ছন্দ ও অলংকার প্রকরণটিকে ব্যাকরণের আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

৬. অভিধানতত্ত্ব : অভিধানতত্ত্বে অভিধানের বিন্যাস, বাক্য ও শব্দের অর্থ, উদ্দেশ্য, অভিধানের গুরুত্ব, শব্দ অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া, ধ্বনি বা বর্ণের সজ্জা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বাংলা ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ

ভাষা বিজ্ঞান অনুসারে সাধারণভাবে বাংলা ব্যাকরণকে তিনভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা :
ক. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (Historical Grammar)
খ. তুলনামূলক ব্যাকরণ (Comparative Grammar)
গ. ব্যবহারিক ব্যাকরণ (Applied Grammar)

তবে, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ব্যাকরণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে ব্যাকরণকে চারভাগে ভাগ করেছেন। যথা :
ক. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (Historical Grammar)
খ. তুলনামূলক ব্যাকরণ (Comparative Grammar)
গ. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ (Diseriptive Grammar)
ঘ. দার্শনিক-বিচারমূলক ব্যাকরণ(Philosophical Grammar)

ক. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ : কোন ভাষার অতীত রূপের বিশ্লেষণ করে ভাষা বংশ, ভাষা বিবর্তনের ইতিহাস, শব্দের শ্রেণিকরণ, শব্দের ব্যুৎপত্তিগত বর্ণনা, নির্দিষ্ট যুগে ঐভাষার প্রয়োগরীতি এবং ভাষা বিকাশের রীতি ইত্যাদি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা ঐতিহাসিক ব্যাকরণের অন্তর্ভুক্ত।
খ. তুলনামূলক ব্যাকরণ : কোন নির্দিষ্টকালের দুই বা ততোধিক ভাষার গঠন, প্রয়োগরীতি, সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য ইত্যাদি তুলনামূলক আলোচনা করে যে ব্যাকরণ তাকে তুলনামূলক ব্যাকরণ বলে। তুলনামূলক ব্যাকরণে কোনো বিশেষ কালের কয়েকটি ভাষার গঠন, প্রয়োগরীতি ইত্যাদিও আলোচনা করা হয়ে থাকে।

গ. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ : বর্ণনাত্মক ব্যাকরণের রীতিতে ভাষার প্রয়োগ পদ্ধতি ও গঠনরীতি আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ কোন একটি নির্দিষ্টকালের বা যুগের ভাষার বিচার বিশ্লেষণ গঠনরীতি ও প্রয়োগ পদ্ধতি আলোচনা বর্ণনাত্মক ব্যাকরণের কাজ। বিশেষ কোনো যুগের কোনো একটি ভাষার রীতি ও প্রয়োগ বর্ণনা করা এই শ্রেণির ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য। এই শ্রেণির ব্যাকরণের কাজ হলো সেই বিশেষ কালের ভাষা যথাযথ ব্যবহার করতে সাহায্য করা।
ঘ. দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ : ভাষার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অর্থাৎ মানুষের ভাবনা চিন্তা প্রণালী আবিষ্কার ও অবলম্বন পূর্বক ভাষার রূপের উৎপত্তি ও বিবর্তন এবং প্রায়োগিক অর্থের তারতম্য কীভাবে ঘটে তার বিচার করা বা সেই সম্পর্কে আলোচনা করাই দার্শনিক-বিচারমুলক ব্যাকরণের উদ্দেশ্য। ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন ও বিকাশের অন্তর্নিহিত দর্শনকে বিবেচনায় রেখে ভাষাগত বিশ্লেষণ যে ব্যাকরণে করা হয়ে থাকে তাকে দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ বলে।

ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা
ব্যাকরণ হচ্ছে ভাষার সংবিধান। কোনো একটি ভাষার স্বরূপ, প্রকৃতি ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা থাকে ব্যাকরণে। কোনো ভাষা সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে সে ভাষার ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন। কেননা ব্যাকরণে সে ভাষার প্রয়োগ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া থাকে। ব্যাকরণ জানা থাকলে ভাষার সঠিক ব্যবহার সম্ভব হয়।

ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার থেকে প্রাপ্ত একটি বিষয়। ভাষা ব্যবহারের জন্য ব্যাকরণ পাঠ অপরিহার্য নয়। কেননা অনেক মানুষ রয়েছে যারা তাদের ভাষার ব্যাকরণ পাঠ করেনি কিন্তু ভাষা ব্যবহার করছে। কিন্তু সে ভাষা ব্যবহারে কোনো ভুল করলে ব্যাকরণ না জানার কারণে তার পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। আর এ সকল ভুল থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব ব্যাকরণ পাঠের মাধ্যমে। ভাষার গতিধারার বর্ণনা থাকে ব্যাকরণে। তাই ভাষার বিকাশ সম্পর্কে জানার জন্যও ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন। ব্যাকরণ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে ভাষার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ব্যাকরণ ভাষাকে সুশৃঙ্খল করে, নিয়মতান্ত্রিক করে। ভাষাকে প্রবহমান নদীর স্রোতধারার সাথে তুলনা করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে ভাষায় নানা পরিবর্তন সূচিত হয়। ভাষার এ সকল পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে জানতে হলে ব্যাকরণ পাঠ করতে হবে।

ব্যাকরণ সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তাদের ভাষা অমার্জিত, অসঙ্গত ও ত্রুটিপূর্ণ। মার্জিত শুদ্ধ ভাষা জানা ও ব্যবহারের জন্য ব্যাকরণ পাঠ বা জানা জরুরি। তবে একথাও ঠিক ব্যাকরণ নয় ভাষা আগে। ভাষার জন্য ব্যাকরণ, ব্যাকরণের জন্য ভাষা নয়। তাই যে সকল কারণে ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন তা নিম্নরূপ :
১. ভাষার গঠন, স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে ব্যাকরণ পাঠে ধারণা লাভ করা যায়।
২. ভাষার শুদ্ধ-অশুদ্ধ বিষয় জানার জন্য ব্যাকরণের জ্ঞান প্রয়োজন।
৩. ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষা ব্যবহারের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত থাকা যায়।
৪. ব্যাকরণ পাঠ করলে ভাষা শুদ্ধ রূপে ব্যবহার করা যায়।
৫. ভাষায় ব্যবহৃত প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্য ব্যাকরণ পাঠ প্রয়োজন।
৬. ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস ব্যাকরণ পাঠ করে জানা যায়।
৭. ভাষার প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধির জন্য ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন।
৮. ব্যাকরণ পাঠ করলে ভাষার প্রকৃত আদর্শ রক্ষা করা যায়।
৯. ব্যাকরণ ভাষা জ্ঞান বৃদ্ধি করে।
১০. সাহিত্যের যথার্থ রস আস্বাদনের জন্যও ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন।

বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়:
বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় চারটি। যথা-
(১) ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)
(২) শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব (Morphology)
(৩) বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax)
(৪) অর্থতত্ত্ব (Semantics)
এছাড়া অভিধানতত্ত্ব (Lexicography), ছন্দ ও অলঙ্কার প্রভৃতিও ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় হিসাবে স্বীকৃত।
(১) ধ্বনি-তত্ত্ব : এই অংশে ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনির বিন্যাস, ধ্বনির পরিবর্তন, বর্ণ, সন্ধি, ষ-ত্ব বিধান, ণ-ত্ব বিধান প্রভৃতি ধ্বনি-সম্বন্ধীয় ব্যাকরণগত বিষয়গুলো আলোচিত হয়।

(২) শব্দ বা রূপতত্ত্ব : শব্দের প্রকার, পদের পরিচয়, শব্দ গঠন, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, লিঙ্গ, বচন, ধাতু, শব্দরূপ, কারক, সমাস, ক্রিয়া- প্রকরণ, ক্রিয়ার কাল, ক্রিয়ার ভাব, শব্দের ব্যুৎপত্তি ইত্যাদি বিষয়য়ের আলোচনা পদ-প্রকরণের বিষয়বস্তু।
(৩) বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম: বাক্য, বাক্যের অংশ, বাক্যের প্রকার, বাক্য বিশ্লেষণ, বাক্য পরিবর্তন, পদক্রম, বাগ্ধারা, বাক্য সংকোচন, বাক্য সংযোজক, বাক্য বিয়োজন, যতিচ্ছেদ বা বিরামচিহ্ন প্রভৃতি বিষয় বাক্য- প্রকরণে আলোচিত হয়।
(৪) অর্থতত্ত্ব : শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ। যেমন- মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, বিপরীতার্থক শব্দ ইত্যাদি অর্থতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
(৫) ছন্দতত্ত্ব : এই বিভাগে ছন্দের প্রকার ও নিয়মসমূহ আলোচিত হয়।
(৬) অলংকারতত্ত্ব : এই বিভাগে অলংকারের সংজ্ঞা ও প্রকার ইত্যাদি আলোচনা করা হয়।
(৭) অভিধানতত্ত্ব : অভিধানতত্ত্বে অভিধানের বিন্যাস, বাক্য ও শব্দের অর্থ, উদ্দেশ্য, অভিধানের গুরুত্ব, শব্দ অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া, ধ্বনি বা বর্ণের সজ্জা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

error: Content is protected !!