বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ

ড. মোহাম্মদ আমীন

মাতৃভাষার অপপ্রয়োগ নিজ মায়ের প্রতি অসদাচরণের সামিল। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত তা করে যাচ্ছি। শুধু অজ্ঞতা নয়, অবহেলাও এর জন্য কম দায়ি নয়। একটু সতর্ক এবং সাবধান হলে অপপ্রয়োগ বহুলাংশে এড়ানো যায়। প্রতিনিয়ত যে অপপ্রয়োগ আমাদের গোচরে-অগোচরে হচ্ছে, এ অধ্যায়ে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হল। একবার চোখ বুলিয়ে নিলে অপপ্রয়োগের মত হীন ও লজ্জাকর কর্ম হতে মুক্ত থাকার তেমন কঠিন হবে না। বাঙালি হয়ে বাংলা ভাষার এমন অপপ্রয়োগ সত্যিকার অর্থে লজ্জাকর বিষয়।

অন্তরিন/ অন্তরীণ: অন্তরিন শব্দের অর্থ কারাগারের বাইরে কাউকে আবদ্ধ করে রাখা। অনেকে শব্দটিকে ‌‌‌’অন্তরীণ’ লিখে থাকেন। এমনটি লিখবেন না।অন্তরিন তৎসম শব্দ নয়। ইংরেজি intern শব্দ থেকে বাংলা অন্তরিন শব্দের উৎপত্তি।তাই প্রমিত বানান রীতি অনুযায়ী দীর্ঘ ঈ-কার ও মূর্ধন্য-ণ হবে না। অতএব লিখুন অন্তরিন। অন্তরীণ লিখবেন না।

অত্র যত্র তত্র অত্র শব্দের অর্থ -এখানে; যত্র শব্দের অর্থ – যেখানে এবং তত্র শব্দের অর্থ সেখানে। অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, প্রতিবেদন ইত্যাদিতে অত্র শব্দটিকে এই অর্থ প্রকাশের বেলায় লেখা হয়ে থাকে। অত্র অফিস শব্দের অর্থ এখানে অফিস এই অফিস নয়। তবু শিক্ষিত কর্তারা কোন্ আক্কেলে এই অফিস বুঝাতে অত্র অফিস লেখেন তা বোধগম্য নয়। অত্র অফিস না লিখে এই অফিস/ এ অফিস, লিখুন। ভাষাকে ভুলের এবং নিজেকে লজ্জার হাত হতে বাঁচান।

শয়তানের ফন্দি, বন্দী হল বন্দি: বন্দী শব্দের অর্থ বন্দনা করা কিন্তু বন্দি শব্দের অর্থ আটক। তবে আমাদের ভাষাজ্ঞান এত শক্ত কারাগারে বন্দি হয়ে পড়েছে যে, আমরা আটক বুঝাতে বন্দী লিখে বসি। সংগত কারণে আমাদের বন্দনা (বন্দী) শিক্ষা দেবীর কাছে পৌঁছতে পারছে না।

কি, কী এবং কীভাবে কি প্রশ্নবোধক অব্যয়। কোন প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া গেলে সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে কি লেখা হয়। যেমন: আমি কি যাবো?(Shall I go?) এ বাক্যটির উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেয়া সম্ভব। তুমি কী খাবে? (Which do you eat?) এ প্রশ্নের মাধ্যমে কোন্ জিনিস খাওয়া হবে তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। প্রশ্নটির উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কী শব্দের আরেকটি ব্যবহার হচ্ছে আশ্চর্যবোধক বাক্যে। যেমন- বাহ্ কী চমৎকার দৃশ্য! কোন্, কোন্‌টি, কোন্‌গুলো, কোনভাবে ইত্যাদি বুঝালে এবং বিস্ময়সূচক বাক্যে কী লিখতে হয়। সে হিসেবে আমরা বাক্যে কোনভাবে শব্দের পরিবর্তে কীভাবে লিখব, কখনও কিভাবে লিখব না।

এতদ্বারা/এতদ্দ্বারা অনেকে লিখেন: এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে যে, . . . .। ১. এত্‌+ দ্বারা = এতদ্বারা। এত্‌ (এত) শব্দের অর্থ অতিরিক্ত, বিশাল বা বেশি পরিমাণ। সুতরাং এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে শব্দের অর্থ হচ্ছে: অতিরিক্ত দ্বারা, বিশাল দ্বারা বা বেশি পরিমাণ দ্বারা জানানো যাচ্ছে যে; . . .। অনেকে এটার দ্বারা/ ইহার দ্বারা/ এর দ্বারা জানানো যাচ্ছে অর্থ বুঝাতে লিখেন এতদ্বারা। এটা শুধু ভুল নয়; মারাত্মক ভুল। কারণ এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে বাক্যের অর্থ অতিরিক্ত দ্বারা, বিশাল দ্বারা বা বেশি পরিমাণ দ্বারা জানানো যাচ্ছে, ..। এটি একটি হাস্যকর বাক্য। অন্যদিকে; এতদ্+ দ্বারা = এতদ্দ্বারা। এতদ্ অর্থ এটা, ইহা বা এর। সুতরাং এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে – বাক্যের অর্থ এর দ্বারা, এটার দ্বারা, ইহার দ্বারা বা এর দ্বারা জানানো যাচ্ছে যে,.. । অতএব লিখুন এতদ্দ্বারা। এতদ্বারা লিখবেন না।

প্রচার/ সম্প্রচার প্রচার ও সম্প্রচার উভয় শব্দের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অভিন্ন হলেও শব্দ দুটির প্রায়োগিক অর্থে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রচার শব্দের অর্থ ঘোষণা, বিজ্ঞপ্তি, প্রকাশ, সর্বসাধারণকে জ্ঞাত করানো, প্রচলন ইত্যাদি। কিন্তু সম্প্রচার শব্দের অর্থ ব্যাপকভাবে প্রচার। নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত কর্তৃত্বের অধিকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোন কিছু প্রকাশ করাকে প্রচার বা ঘোষণা বলা হয়। যদি কোন ব্যক্তি, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজে কোন কিছু ঘোষণা করে, সেটি হবে প্রচার। অন্যদিকে, সম্প্রচার হচ্ছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত কোন ঘোষণা। যে কেউ প্রচার করতে পারে কিন্তু শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া সম্প্রচার সম্ভব নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি কোন পাবলিক পরীক্ষার ফল নিজেরাই ঘোষণা করে সেটি হবে প্রচার; কিন্তু এ প্রচারটি যখন বেতার, টেলিভিশন বা অন্য কোন সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাহলে সেটি হবে সম্প্রচার। আর একটি বিষয়, প্রচার যাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত তারা ছাড়া অন্য কেউ নাও জানতে পারেন, কিন্তু সম্প্রচারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন নির্বিশেষে সবাই তা জেনে যায়। অতএব সকল সম্প্রচার প্রচার কিন্তু সকল প্রচার সম্প্রচার নয়। উদাহরণ: সরকার সম্প্রচারের জন্য বিজয়ীদের তালিকা বেতার কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করে।

প্রেক্ষিত/ পরিপ্রেক্ষিত পরিপ্রেক্ষিত ও প্রেক্ষিত শব্দের তফাৎ আকাশ-পাতাল। তবু উচ্চশিক্ষিত অনেকে অফিসে বসে পরিপ্রেক্ষিত অর্থে প্রেক্ষিত শব্দটি গর্বের প্রেক্ষিত হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। প্রেক্ষিত শব্দ হতে প্রেক্ষণ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ দৃষ্টি । প্রেক্ষিত হচ্ছে প্রেক্ষণ শব্দের বিশেষণ। এর অর্থ, যা দর্শন করা হয়েছে। প্রেক্ষণীয় শব্দের অর্থ যা দেখা উচিত বা যা দেখা হবে। সুতরাং ‘Perspective` or ‘Background` অর্থে প্রেক্ষিত লেখা চরম অজ্ঞতা। এ অর্থে পরিপ্রেক্ষিত লিখুন, প্রেক্ষিত নয়।

ফলশ্রুতি/ফল ফলশ্রুতি শব্দের আভিধানিক অর্থ ‌‌‌‌পূণ্যকর্মের ফলাফলের বিবরণ শ্রবণ করা। ফল আর শ্রুতি মিলে ফলশ্রুতি শব্দের উৎপত্তি। এটাতেও বুঝা যায় ফলশ্রুতি শব্দের অর্থ ফল-শ্রবণ। অফিস আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহে যে অর্থে ফলশ্রুতি লেখা হচ্ছে তা ভুল। ফলশ্রুতি বা পাপ-পূণ্যের ফলাফল বিবরণ লেখবেন না, পাপ বেড়ে যাবো। তার বদলে ফলাফল, ফল, পরিণতি, পরিণাম ইত্যাদি অর্থবোধক ও মাধুর্যমণ্ডিত শব্দ ব্যবহার করুন।

এরূপ আরও জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিংক নিচে দেওয়া হলো:

শুবাচ লিংক

শুবাচ লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

error: Content is protected !!