বাংলা ভাষার বিকৃতি ও সাহিত্যিকদের দায়

 
ওয়াদুদ খান ( Wadud Khan)
১.
সাহিত্যের ভাষাটা কেমন হওয়া উচিত— এ নিয়ে প্রাজ্ঞজনদের মধ্যে নানান মত পরিলক্ষিত হয়। তবে মোটাদাগে যেটি বলা হয়ে থাকে, সেটি হলো— সাহিত্যের ভাষা হবে সহজ-সরল-প্রাঞ্জল যাতে সাধারণ পাঠক দ্রুতই সেটি বুঝতে সক্ষম হয়। কেননা, একজন লেখকের লেখা পাঠ করে পাঠক যদি বুঝতে অসমর্থ হয়, তবে সেখানে লেখকও ব্যর্থ হয়। লেখক তো পাঠককে নিয়েই। পাঠককে বাদ দিলে লেখকের আর অস্তিত্ব থাকে না।
২.
সহজ-সরল-প্রাঞ্জল ভাষার নামে কিছু লেখক ফেসবুকীয় বিকৃত ভাষা ও শব্দশৈলী সাহিত্যের মতো মহান একটি প্লাটফর্মে রীতিমতো ব্যবহার করছেন। কিন্তু আমরা জানি, সাহিত্য একটি সমাজের আয়না। এই আয়নায় দৃশ্যমান হয় সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও ব্যবহৃত ভাষা।
৩.
একজন সাহিত্যিকের প্রচুর ফ্যানস এবং ফলোয়ার্স থাকে বিধায় তার দায়িত্ব ও কর্তব্যও বেশি। একজন সাহিত্যিক যখন বিকৃত ভাষা ও শব্দশৈলী সাহিত্যে প্রয়োগ করেন, তখন সেটি সাধারণ মানুষের কাছে আরও প্রাধান্য কিংবা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
৪.
এখন কিছু সাহিত্যিকের ভাষার নমুনা নিচে উল্লেখ করব। আশা করি, প্রাজ্ঞ পাঠক ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন।
উদাহরণগুলো লক্ষ করি:
আমাকে ভুল বুঝো নাহ। [বাক্যটি হওয়া উচিত— আমাকে ভুল বুঝো না। সাহিত্যের মতো জায়গায়— বাক্যের শেষে ‘নাহ’ লেখা অবধারিতভাবেই ভাষার বিকৃতি।]
আমি তোমার অবহেলা আর নিতে পারতেসি না। [বাক্যটি হওয়া উচিত— আমি তোমার অবহেলা আর নিতে পারছি না। পারতেসি, খাইতেসি, দিসি, গেসি, খাইসি— এইসব সাহিত্যের ভাষা হতে পারে না।
এছাড়াও,
মত/ মতো
ভারি/ ভারী
হল/ হলো
গেল/ গেলো
কেন/ কেনো
দেব/ দেবো
এইসব শব্দের অর্থগত ও ব্যাবহারিক পার্থক্য জানাটাও একজন সাহিত্যিকের জন্য জরুরি।
অর্থের বিকৃতি ঘটার সম্ভাবনা না থাকলে, শব্দের শেষে বাড়তি ও-কার ব্যবহারের যে প্রয়োজন নেই, এটাও জানতে হবে একজন হবে একজন সাহিত্যিককে।
সেই হিসেবে প্রচলিত ভুলগুলো হচ্ছে:
ছিলো, বললো, করলো, ধরলো, খেয়েছো, গিয়েছো, যাচ্ছো, বলবো, করবো, শুনবো, হাসবো— ইত্যাদি, ইত্যাদি।
উপরিউক্ত শব্দগুলোতে বাড়তি ও-কার প্রয়োজন নেই।
তবে হ্যাঁ, অর্থের বিকৃতি ঘটার সম্ভাবনা থাকলে বাড়তি ও-কার দেয়া যেতে পারে।
৫.
এখন কোনো লেখক যদি সাহিত্যকে তার ফেসবুক টাইমলাইন মনে করেন, আর যা মন চায় লিখতে থাকেন, তাহলে তো ভাষার বিকৃতি হবেই। এবং এর দায়ভার ওইসব তথাকথিত সাহিত্যিক কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না।
সাধারণ পাঠকদের মূল সমস্যা হচ্ছে, তারা বাংলা অভিধান ঘেটে দেখতে চান না। অমুক লেখকের বইয়ে তমুক বানান দেখেছি বলেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। অমুক লেখক তো তমুক বানান ভুলও করতে পারেন— এটা কেন মাথায় আসবে না।
কোনো লেখকের শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন অন্ধভাবে অনুসরণ করা পাঠকের জন্য অনুচিত।
আর লেখকদের উচিত প্রতিটি শব্দ ও বাক্য গঠনে শুদ্ধতার পরিচয় দেবার চেষ্টা করা। নাহলে বাংলা ভাষার আরও বিকৃতি ঘটতে বাধ্য। ভুলত্রুটি সবারই থাকবে। কিন্তু ভুলের ওপর জমে যাওয়া ক্ষতিকর।
 
 
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!