বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব

গরীব নেওয়াজ

পৃথিবীতে তালিকাভুক্ত ভাষা আছে ৬০৬০টি। এরমধ্যে ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। ত্রিশ কোটির বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। উপমহাদেশে প্রধান তিনটি ভাষা : উর্দু, হিন্দি ও বাংলা। এরমধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও বুনিয়াদি ভাষা হচ্ছে, বাংলা। উর্দুর জন্ম বড়জোর সাত শ’ বছর। মুঘল আমলে এর সৃষ্টি। প্রকৃত অর্থে হিন্দির জন্ম তো আরও পরে। প্রাচীন খাড়িবুলি ভাষা থেকে উদ্ভূত হিন্দুস্তানি ভাষা বা উর্দু ভাষা হতে আরবি ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃতবহুল হিন্দি ভাষার এই রূপ দেওেয়া হয়। আরবি লিপির বদলে দেবনাগরী লিপি গ্রহণ করা হয়। তবে ব্যাকরণ প্রায় একই রয়ে গিয়েছে। যে ব্যাকরণ গ্রহণ করা হয়েছে তা বাংলা ব্যাকরণের সাহায্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ৬০৬০টি ভাষার মধ্যে মাত্র এক শতাংশ ভাষার মানুষ নিজ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার যোগ্যতা রাখে। আমাদের কবি এক শ’ বছরেরও আগে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আমাদের মতো প্রাচীনত্ব, ঐতিহ্যমণ্ডিত আর সাহিত্যকর্মের ভাষা উপমহাদেশে আর একটিও নেই।
 
বাংলার মতো সুমিষ্ট ভাষা পৃথিবীতে আর কারও নেই। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধায়নে বাংলা ভাষাকে ‘Sweetest Language of the World’ নির্বাচিত করা হয়েছে। স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষাকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দেওয়া হয়েছে। এ ভাষার মোহনীয়তার দরুন সিয়েরালিয়েন রাষ্ট্র একে তাদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
 
পৃথিবীতে একমাত্র বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার জন্যই তার সন্তানেরা জীবন দিয়েছে। যার সূত্র ধরে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে–সারা পৃথিবীতে ( ১৯৩টি দেশে ) যা পালিত হয়। আর এই ভাষার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নামক দেশটি জন্ম নিয়েছে–যা পৃথিবীতে একমাত্র দৃষ্টান্ত।
 
এখন বাংলা ভাষার আর একটি মাহাত্ম্য দেখা যাক। ভাষার মূল হচ্ছে ধ্বনি বা বর্ণ। কোনো ভাষার উচ্চারিত শব্দকে বিশ্লেষণ করলে যে উপাদানসমূহ পাওয়া যায়, সেগুলোকে পৃথকভাবে ধ্বনি বলে। বিভিন্ন ধ্বনি পরপর সাজিয়ে তৈরি হয় শব্দ। আর অনেক শব্দ নানা বিন্যাসে সাজিয়ে গড়া অসংখ্য সব বাক্য নিয়ে তৈরি হয় একটি ভাষা। সব ভাষার শব্দ ও বাক্য গঠনের সূত্রগুলো প্রায় একই ধরনের। লিখে প্রকাশ করার সুবিধার্থে ধ্বনিগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে কিছু চিহ্ন তৈরি করা হয়েছে। এই চিহ্নের নাম বর্ণ।
 
প্রতিটি কথ্য ভাষায় স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি বা বর্ণ আছে। যেমন বাংলা ভাষায় অ, আ- – – ও, ঔ ১১টি স্বরবর্ণ রয়েছে, ইংরেজিতে আছে a, e, i, o, u এই পাঁচটি স্বরবর্ণ। বাংলায় ব্যঞ্জনবর্ণ রয়েছে ৩৯টি, ইংরেজিতে রয়েছে ২১টি। স্বরধ্বনি ব্যঞ্জনধ্বনির সাহায্য ছাড়া পূর্ণ ও স্পষ্টরূপে উচ্চারিত হয়। আর ব্যঞ্জনধ্বনি স্বরধ্বনির সাহায্যে উচ্চারিত হয়। যেমন : ক+অ = ক, চ+অ = চ, b+e = b, k+a = k ইত্যাদি।
 
বর্ণমালার সুনির্দিষ্ট সাজানো ক্রমকে বলা হয়, বর্ণমালা। আমাদের বর্ণ তৈরি ও তার সাজানো ( বর্ণমালা ) থেকেই দেখা যায় যে, আমাদের পৃর্ব পুরুষরা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। অ থেকে ঔ স্বরবর্ণগুলো প্রথমে সাজানো হয়েছে। সেখানেও এক জাতীয়গুলো একসঙ্গে রাখা হয়েছে, যেমন–অ আ, উ ঊ, এ ঐ ইত্যাদি। ব্যঞ্জনবর্ণগুলো স্বরবর্ণের পরে সাজানো হয়েছে। সবগুলো ব্যঞ্জনবর্ণ ‘অ’ স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত হয়। আবার দেখুন, উচ্চারণের স্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনবর্ণগুলো বিভিন্ন বর্গে ভাগ করে সাজানো হয়েছে। যেমন : ক বর্গ ( ক খ গ ঘ ঙ) হচ্ছে, কণ্ঠ বা জিহ্বামূল থেকে উচ্চারিত জিহ্বামূলীয় ধ্বনি; চ বর্গ ( চ ছ জ ঝ ঞ ) হচ্ছে, জিহ্বার তালু থেকে উচ্চারিত তালব্য ধ্বনি; মূর্ধা থেকে উচ্চারিত ট বর্গ ( ট ঠ ড ঢ ণ ) মূর্ধন্য ধ্বনি; ত বর্গ ( ত থ দ ধ ন ) দন্ত থেকে উচ্চারিত বলে দন্তমূলীয় ধ্বনি; ঠোঁট বা ওষ্ঠ থেকে উচ্চারিত প বর্গ ( প ফ ব ভ ম ) ওষ্ঠ ধ্বনি। অন্যান্য বর্ণগুলো উপরোক্ত বিভিন্ন বর্গে পড়ে। কত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে আমাদের বর্ণমালা। আবার দেখুন, ক বর্গের শেষ অক্ষর ঙ; ঙ-এর সঙ্গে ক বর্গের বাকি অক্ষরগুলো যুক্তাক্ষর তৈরি করে। সেরকম ঞ যুক্তাক্ষর তৈরি করে চ বর্গের বাকি অক্ষরের সঙ্গে, ন করে ত বর্গের এবং ণ করে ট বর্গের বাকি অক্ষরের সঙ্গে।
 
আবার অন্যান্য অনেক ভাষায় লিখা হয় এক রকম, আর পড়া হয় অন্য রকম। একই অক্ষর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়, অনেক অক্ষরের তো কোনো উচ্চারণই নেই। এধরনের গুরতর কোনো গোলযোগ নেই আমাদের ভাষায়। এ সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হয়েছে।
 
এবার সবচেয়ে প্রতাপশাশী ভাষা ইংরেজির দিকে নজর দেওয়া যাক। ইংরেজ তার সাম্রাজ্য হারালেও ইংরেজি ভাষা তার সাম্রাজ্য হারায়নি। বরঞ্চ প্রতিনিয়ত তা আরও বিস্তার লাভ করছে। ইংরেজিতে ২৬টি বর্ণ : A B C D E F G H I J K L M N O P Q R S T U V W X Y Z. এরমধ্যে A E I O U এই পাঁচটি স্বরবর্ণ। স্বরবর্ণগুলো বাংলার মতো করে একসাথে সাজানো হয় নি। আসলে বর্ণমালা তৈরির সময় স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের পার্থক্য তারা হিসাবে আনতে পারেনি। ব্যঞ্জনবর্ণগুলো সাজাতেও কোনো নিয়ম অনুসরণ করতে পারেনি। আমাদের মতো একটি স্বরবর্ণ ( অ ) দিয়ে সব ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারিত নয়। আবার দেখুন, A স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত হয় J ও K ব্যঞ্জনবর্ণ (J+A = J), K+A =K )। এ দুটি অক্ষর A থেকে কতদূরে। B C D উচ্চারিত হয় E স্বরবর্ণের সাহায্যে ( B+E = B, C+E = C, D+E = D। E এর খবর নেই, অথচ তার সাহায্যে উচ্চারিত B C D এসে গেল। আবার অনেক পরে আসলো E এর সাহায্যে উচ্চারিত G P T V ব্যঞ্জনবর্ণগুলো। I (আই) স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত Y অনেক পরে। অন্যগুলোর অবস্থা তথৈবচ। F L M N R S X V ব্যঞ্জনবর্ণগুলো কোন্ স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত হয় তা ঠিক বুঝা যায় না। এককথায় বলা যায়, ইংরেজরা একটা জগাখিচুড়ি মার্কা বর্ণমালা তৈরি করেছে, বুদ্ধি-জ্ঞানের লেশমাত্র নেই। অন্যান্য ভাষায়ও এধরনের অনেক অবস্থা রয়েছে–যা আলোচনা করে কলেবর বাড়াতে চাই না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আসলে ইংরেজি ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। ধার করা রোমান বর্ণ দিয়ে তাদের ভাষা লিখে থাকে। সংস্কৃত ভাষারও নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই।
 
আবার দেখুন, ইংরেজি অক্ষরের উচ্চারণ একরকম–আর তার ব্যবহার অন্যরকম। এটা লক্ষ করেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা লিখেছেন, তা হচ্ছে : ‘ ইংরেজি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ মুখস্থ করিতে গিয়াই বাঙালি ছেলের প্রাণ বাহির হইয়া যায়। প্রথমত ইংরেজি অক্ষরের নাম একরকম, তাহার কাজ আর এক রকম। অক্ষর দুইটি যখন আলাদা হইয়া থাকে তখন তাহারা এ বি, কিন্তু একত্র হইলেই তাহারা অ্যাব হইয়া যাইবে, ইহা কিছুতেই নিবারণ করা যায় না। এদিকে U কে মুখে বলিব ইউ, কিন্তু UP-এর মুখে যখন থাকেন তখন তিনি কোনো পুরুষে ইউ নন। ও পিসি এদিকে এসো, এই শব্দগুলো ইংরেজিতে লিখিতে হইলে উচিতমত লেখা উচিত — O pc adk so। পিসি যদি বলেন, এসেচি, তবে লেখো she; আর যদি পিসি বলেন এইচি, তবে আরো সংক্ষেপে–he। কিন্তু কোনো ইংরেজের পিসির সাধ্য নাই এরূপ বানান বুঝিয়া উঠে। আমাদের ক খ গ ঘ-র কোনো বালাই নাই ; তাহাদের কথার নড়চড় হয় না।’
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও লিখেছেন, ‘ এই তো গেল প্রথম নম্বর। তারপরে আবার এক অক্ষরের পাঁচ রকমের উচ্চারণ। অনেক কষ্টে যখন বি এ = বে, সি এ = কে মুখস্থ হইয়াছে, তখন শুনা গেল, বি এ বি = ব্যাব্, সি এ বি = ক্যাব্। তাও যখন মুখস্থ হইল তখন শুনি বি এ আর = বার্, সি এ আর = কার্। তাও যদিবা আয়ত্ত হইল তখন শুনি, বি এ ডবল্-এল = বল্, সি এ ডবল্-এল = কল্। এই আকূল বানান-পাথারের মধ্যে গুরু মহাশয় যে আমাদের কর্ণ ধরিয়া চালনা করেন, তাঁহার কম্পাসই বা কোথায়, তাঁহার ধ্রুবতারাই বা কোথায়। আবার এক এক জায়গায় অক্ষর আছে অথচ তাহার উচ্চারণ নাই; একটা কেন, এমন পাঁচটা অক্ষর দাঁড়াইয়া আছে, বাঙালির ছেলের মাথার পীড়া ও অম্লরোগ জন্মাইয়া দেওয়া ছাড়া তাহাদের আর কোনো সাধু উদ্দেশ্যই দেখা যায় না। মাস্টারমশায় Psalm শব্দের বানান জিজ্ঞাসা করিলে কিরূপ হৃৎকম্প উপস্থিত হইত তাহা কি আজও ভুলিতে পারিয়াছি। পেয়ারার মধ্যে যেমন অনেকগুলো বীজ কেবলমাত্র খাদকের পেট কামড়ানির প্রতি লক্ষ্য করিয়া বিরাজ করে, তেমনি ইংরেজি শব্দের উদর পরিপূর্ণ করিয়া অনেকগুলি অক্ষর কেবল রোগের বীজস্বরূপে থাকে মাত্র। বাংলায় এ উপদ্রব নাই।’
 
দেখতে পাই doubt এর b, psychology এর p এর কোনো কাজ নেই। এরকম অগণিত শব্দ রয়েছে। A কখন অ, আ, অ্য, অ্যা, আ্যা, এ, এ্য, এ্যা হবে তা বুঝা কঠিন। আছিয়া আর এশিয়ার পার্থক্য করা যায় না–দুটোই Asia। আবার i এর উচ্চারণ কখন i এর মতো কখন y এর মতো, বা y কখন y বা i এর মতো হবে তা জানতে অনেক কষ্ট। অনেক সময়ই e এর উচ্চারণ হয়ে যায় অ্যা। O হয়ে যায় অ্যা। u কখনো আ, কখনো উ হয়। g কখনো গ, কখনো জ হয়। c কখন ক, কখন চ, কখন স হবে তা মুখস্থ করতে হবে। আমাদের মতো পৃথকভাবে লিখার ক্ষমতা ওদের নেই। door হয় ডোর, কিন্তু poor হয় পুওর; but হয় বাট্, কিন্তু put হয় পুট।( Love) লোভী হয়ে গেল লাভ। to যদি টু হয়, তাহলে go কেন গু হয় না। পুরো ভাষা জুড়েই রয়েছে এই বিশৃঙ্খলা। ফেসবুকে দেখলাম, এক শিক্ষিকা ছোট-ছোট বাচ্চাদের সুর করে ইংরেজি NATURE এবং FUTURE শব্দ শিখাচ্ছেন এভাবে : NA–না, TU–টু, RE–রে = নাটুরে। FU–ফু, TU–টু, RE–রে = ফুটুরে। নাটুরে, ফুটুরে। ইংরেজি এরকমই। মূলত ইংরেজি শব্দগুলো মুখস্থ বিদ্যাপন্থি; বাংলা শব্দ এতটা মুখস্থপন্থি নয়, তা সুশৃঙ্খলিত ধ্বনিমূলক।
 
ধ্বনি বিজ্ঞানী মুহম্মদ আব্দুল হাই লিখেছেন, ‘ বাংলা লিপির বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এই যে, তা অত্যন্ত ধ্বনিভিত্তিক ( phonetic )। একটি হরফ অনেকগুলো ধ্বনির বাহন হয়ে শিক্ষার্থী কিংবা পাঠকের মনে কোনো সংশয় বা সন্দেহের উদ্রেক করে না।’
 
ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষমতা খুবই সীমিত। বাংলা বর্ণ অ আ চ ছ ত থ দ ধ শ ষ ড় ঢ় সহ আরও অনেকগুলো বর্ণের উচ্চারণের মতো উচ্চারণ করার কোনো বর্ণ ইংরেজিতে নেই। সে কারণে একজন ইংরেজ তুমিকে বলবে টুমি, দুধকে বলবে ডুড, দুর্নীতিকে বলবে ডুর্নিটি ইত্যাদি। কিন্তু একজন বাংলাভাষী এতটা বিকৃত করে অন্য ভাষা উচ্চারণ করবে না। কারণ বাংলা ভাষার মাহত্ম্যের জন্য বাঙালির শব্দ উচ্চারণের ক্ষমতা অনেক বেশি বিস্তৃত।
 
 
এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/বাংলা-ভাষার-শ্রেষ্ঠত্ব/
 
 
 
সমুদয় শুবাচ সংযোগ: http://subachbd.com/blog/blog_post/68
error: Content is protected !!