বাংলা ভাষা এত সমৃদ্ধ কেন: গল্পে গল্পে কথায় কথায় বাংলায় প্রচলিত বিদেশি শব্দ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা ভাষা এত সমৃদ্ধ কেন: গল্পে গল্পে কথায় কথায় বাংলায় প্রচলিত বিদেশি শব্দ

বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ১
 
প্রাদেশিক শব্দ: হিন্দি কলপচুলো কঞ্জুস খেলোয়াড়, লোটা-লাঠিম আর কবতুর হাতে গুজরাটি হরতালের দিন মারাঠি চৌথ-সহ কয়েকশ পাই নিয়ে মালয়ালম গুদাম-কিরিচ আর মুন্ডা বঁটি মামলার আসামি কালাজ্বরকে সঙ্গে করে তেলেগু ডিব্বায় পসতু আখরোট ভরে গুজরাটি খদ্দরে তৈরি ওড়িয়া বটুয়ায় হিন্দি সুজি-লাড়ু রেখে আচমকা ভুট্টা খেতে খেতে বললেন, আমি শুবাচের সদস্য হব।
 
কলপ: হিন্দি
কঞ্জুস: হিন্দি
খেলোয়াড়: হিন্দি
কবুতর: হিন্দি
লোটা-লাঠিম: হিন্দি
হরতাল: গুজরাটি
চৌথ: মারাঠি (খাজনা হিসেবে উৎপন্ন ফসলের এক চতুর্থাংশ)
পাই (পয়সা): মারাঠি
গুদামকিরিচ: মালয়লাম
বঁটি: মুন্ডা
কালাজ্বর: আসামি
ডিব্বা: তেলেগু
আখরোট: পসতু
খদ্দর: গুজরাটি
বটুয়া (কাপড়ে নির্মিত ছোটো থলে): ওড়িয়া
ইস্পাত: গ্রিক
আচমকা: হিন্দি
ভুট্টা: হিন্দিা।
 
ভেবে দেখুন: বাংলা কত সমৃদ্ধ।  ইংরেজি এত সমৃদ্ধ কেন? কারণ সে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি ভাষার শব্দ থেকে যখন যা প্রয়োজন হয়েছে উদারভাবে গ্রহণ করেছে। তবে বিনা প্রয়োজনে একটা শব্দও গ্রহণ করেনি। বাংলাও ইংরেজির মতো পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার শব্দ থেকে প্রয়োজন বিবেচনায় উদারভাবে গ্রহণ করেছে। তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা অল্প সময়ে সমৃদ্ধির মহাবিস্ময়ে উপনীত হতে পেরেছে। প্রয়োজন হলে আমরা বিদেশি শব্দ গ্রহণ করব। ব্যবহার করুক বা না করুক সম্ভব হলে তার উপযুক্ত পরিভাষা সৃষ্টি করব। তাতে ভাষা ঋদ্ধ হবে।
তবে অযথা এবং বিনা প্রয়োজনে মাতৃভাষাকে অবহেলা করে বিদেশি ভাষার শব্দগ্রহণ ভিক্ষাবৃত্তি ও আত্মমর্যাদাহীনতার পরিচায়ক। এমন করে কেবল ঐতিহ্যহীন জাতির কুলাঙ্গার সদস্যরা।
কবি আবদুল হাকিমের ভাষায়: যে সবে বঙ্গেত হিংসে বঙ্গবাণী —-  কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি। 
 
 
 
বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি 
হিন্দি শব্দ:  হোলি উৎসবে ঝান্ডা হাতে আনকোরা খেরুয়া পোশাক পরিহিত বাটপাড়  ও গুন্ডা-গোঁয়ার প্রকৃতির হামবড়া কিন্তু আনাড়ি এক সেয়ানাসন্ত গাঁজা-ভাং খেয়ে আনাজ, কাঁচা কদু-সবজি প্রভৃতি হাতে ভিখারি সেজে সারা শরীরে গঁদ কলপ মেখে জুতা পরে ছড়িকুঠি হতে বের হয়ে সিধা আচমকা পড়শি পঞ্চায়েত জমাদারের জমজমাট জুয়ার আসরে ঢুকে পাগড়িটা পাহারাদারের পানি আর রুটি পরোটায় ছুড়ে দিয়ে জিলাপি খেতে খেতে নানা কাহিনির মাঝে নিরেট গুজব ছড়িয়ে গোলমাল বাঁধিয়ে দিল। 
 
 
বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি 
ইঙ্গ-ভারতীয় শব্দ
নিচের মোটা হরফের পদগুলো ইঙ্গ-ভারতীয় শব্দ।
ভিস্তিওয়ালা ভিস্তি কাঁধে বাংলোর গেটে ডান্ডির (পালকিবিশেষ) পাশে দাঁড়িয়ে মালির সঙ্গে বাতে (আলাপ) মগ্ন। বাবুর্চি আর মশালচি কিচেনে। পাঞ্জাবি পরিহিত পাঙ্খা (খাঁটি) মুনশি বারান্দায় চুরুট টানছেন। খাসবরদার ডুলির (পালকি) আড়ালে তাড়ি পান করছেন।পণ্ডিত খসখসে (একপ্রকার শুষ্ক ঘাসের পর্দা) দাঁড়িয়ে তা দেখছেন।বিলাতি বড়ো সাহেব দুঘণ্টা আগে ছোটো হাজিরি (প্রাতঃরাশ) ফিনিশ করে পাঁচ পেগ পাঞ্চ (পাঁচমিশালি মদ) পান করেছিলেন। এখন তিনি গোসলখানায়। বের হয়ে বড়া হাজিরি (দ্বিপ্রহরের ভোজন, গুরুভোজন) করবেন। ক্যালিকো পরিহিতা মেম-সাহেব খাটে।  বয়-ছোকরা, ফরাস, নোকর সবাই রেডি। আয়া টিপয়ে করে কারি, কাবাব, চাপাতি, পোলাও চাটনি এবং চাউ চাউ নিয়ে এসেছেন। চাউ চাউ মেম সাহেবের খুব প্রিয়। খিদমতগার চাউ চাউ টেবিলে রাখছেন। ডাইনিংরুমে ব্যানিয়ন (একপ্রকার ছোটো জামা) পরিহিত  হুঁকাবরদার ব্যানিয়নের ( ইউরোপীয় সদাগরি অফিসের কর্মচারী) সঙ্গে বাত করতে করতে হুঁকা পরিষ্কার করছেন। এসময় বড়ো সাহেব গোসলখানা হতে টাট্টিতে (মাদুর)  জিঞ্জারে (এসে) ডাক দিলেন: দেখ্কো। 
 
 
 
বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি 
বাংলায় প্রচুর খানা দেখা যায়। যেমন: বড়োখানায় খানা খেয়ে ভদ্রলোক খানার পেছনের খানায় হাতখানা ধুয়ে নিলেন।
তবে দেশি খানা মাত্র একখানা। তাও এই খানা খানায় বসে আহার্য হিসেবে মুখ দিয়ে খাওয়া কোনো খানা নয়।
মুখ দিয়ে মানুষ যা খায় সে খানা বাংলা নয়। সে খানা হিন্দি হতে আমাদের বাংলায় বেড়াতে এসে বাংলা প্রেমে আটকে গেছে বেমালুম। তাই মেহমান হিসেবে হিন্দি খানা শব্দের প্রতি আমাদের এত দরদ। এই খানা দেখলে জিহ্বা শুধু খাইখাই করে।
 
অভিধানে খানা শব্দের চারটি পৃথক ভুক্তি পাওয়া যায়। যেমন:
 
১. সংস্কৃত খানা: সংস্কৃত খণ্ড থেকে উদ্ভূত -খানা অর্থ— (অব্যয় ও বিশেষ্যে) টুকরো। যেমন:
একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে,
এক ঝাঁক বুনোহাঁস পথ হারালো;
একা একা বসে আছি জানালাপাশে—
সে কি আসে আমি যারে বেসেছি ভালো?
সংস্কৃত হতে উদ্ভূত -খানা নির্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়নির্দেশক একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ (যেমন: বইখানা, শাড়িখানা)। এর আর একটি অর্থ— সংখ্যামাত্র। যেমন: তিনখানা বাড়ি, নয়খানা ওড়না।
 
২. দেশি খানা: দেশি খানা অর্থ— (বিশেষ্যে) গর্ত, গহ্বর, খাত (যেমন: খানাখন্দ); ছোটো জলশায় ( খানায় ছোটো মাছ ধরছেন বাবা)।
 
৩. ফারসি খানা: ফারসি খানা অর্থ— (বিশেষ্যে) গৃহ, কক্ষ ( যেমন: বৈঠকখানা, পায়খানা, হাজতখানা)। মুরুব্বিরা বৈঠকখানায় বসে গল্প করছেন।
 
৪. হিন্দি খানা: এই খানা সবচেয়ে জনপ্রিয় খানা। শুধু বাংলায় নয় হিন্দিতেও। ইংরেজিতে যাকে বলে food। হিন্দি খানা অর্থ— (বিশেষ্যে) খাদ্য, আহার্য ( খানাটা খেয়ে যাও); বৃহৎ ভোজসভা (রাজকীয় খানা, বড়োখানা)। চারদিকে কত খানা তবু চারদিকে খানার অভাব।
 
বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি 
 
আরবি ফাজিল ফারসি গু: ফারসি খানদানি হাজরা-হাজরির হাজি খানদান এক হালি তুর্কি বেগম, দুই খান-খানম, তিন পোর্তুগিজ আয়া এবং চার ফারসি খানসামার সাহায্যে তুর্কি-ফারসি খানবাহাদুরের আরবি খানকার ফারসি খানায় (বারান্দা) বসে হিন্দি খানা (খাদ্য) খাচ্ছিলেন। এসময় ফারসি খানকিগিরিতে ওস্তাদ এক আরবি ফাজিল ও দুই ফারসি খানকি হাজির হয়ে ইংরেজি কার্পেটে ফারসি গু নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাবার সময় দেশি খানায় (গর্ত) পড়ে সংস্কৃত পটোল তুলে আরবি কায়দায় দেশের মাটিতে চিত হয়ে গেলেন।
আরবি হুজুর রোমান কোরোনার ভয়ে জানাজা পড়াতে এলেন না।
 
 
 
এই পোস্টের লিংক
https://draminbd.com/বাংলা-ভাষা-এত-সমৃদ্ধ-কেন-গ/
 
error: Content is protected !!