বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

—————————————————————————————————————————————————————————-

প্রথম অধ্যায়
বাংলাভাষার পূর্ব-যুগ

দ্বিতীয় অধ্যায়
বাংলা লিপি ও বাংলা ভাষা

তৃতীয় অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন যুগ

চতুর্থ অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ

পঞ্চম অধ্যায়
বৈষ্ণব সাহিত্য, মহাভারতের অনুবাদ, দোভাষী পুঁথি সাহিত্য ও পদাবলী
 
ষষ্ঠ অধ্যায়
মঙ্গলকাব্যের কথা
 
সপ্তম অধ্যায়
মধ্যযুগের প্রথম ও প্রধান
 
অষ্টম অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মুসলমানের অবদান
 
নবম অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যে মুসলমান : প্রথম ও প্রধান
 
দশম অধ্যায়
গীতিকবিতা
 
একাদশ অধ্যায়
এক নজরে বাংলা গদ্যের উৎপত্তি ও বিকাশ
 
দ্বাদশ অধ্যায়
সাহিত্যবিষয়ক সংজ্ঞা ও ধারণা
 
ত্রয়োদশ অধ্যায়
সংবাদপত্র
 
চতুর্দশ অধ্যায়
বিদ্রোহী কবি
 
পঞ্চদশ অধ্যায়
ছদ্মনাম ও উপাধি এবং জনপ্রিয় কলি
 
ষোড়শ অধ্যায়
বঙ্গানুবাদে ধর্মগ্রন্থ, পরিভাষা, অভিধান ও আইনগ্রন্থ
 
সপ্তদশ
অধ্যায় বিবিধ : একের ভেতর অগনিত
অষ্টাদশ অধ্যায়
নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প
ঊনবিংশ অধ্যায়
ভাষা আন্দোলন : সূচনা হতে পরিণতি
বিংশ অধ্যায়
ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা ও অমর একুশে
 
একবিংশ
অধ্যায় শহিদ মিনার ও শহিদ দিবস
 
দ্বাবিংশ অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কয়েকজন
এবার শুরু করা যাক
 
 
 
প্রথম অধ্যায়

বাংলাভাষার পূর্ব-যুগ

বৈদিক যুগ, বেদ ও আর্য জাতির প্রথম গ্রন্থ
আর্য যুগকে বৈদিক যুগ বলা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ হতে খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ পর্যন্ত বৈদিক যুগের বিস্তৃতি। প্রায় চার হাজার বছর আগে আমাদের দেশে আর্য জাতি বাস করত। আর্যদের সৃষ্ট সভ্যতা বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত ছিল। ‘বেদ’ আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। ‘বেদ’ গ্রন্থে ব্যবহৃত ভাষাকে বৈদিক ভাষা বলা হয়। বেদ অর্থ জ্ঞান। সংস্কৃত ভাষায় লেখা ‘বেদ’ নামক গ্রন্থটি সমগ্র বিশ্বের আর্য জাতির প্রাচীনতম গ্রন্থ। ‘বেদ’ নির্দিষ্ট কোনো একজনের রচিত নয়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ‘বেদ’ এর বিভিন্ন অংশ রচনা করেন। দেবতাদের স্তুতিগান নিয়ে ‘বেদ’ রচিত। বেদ চার ভাগে বিভক্ত, যথা ঋক, সাম, যজু ও অর্থব। আবার প্রত্যেকটি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এ চার উপভাগে বিভক্ত। হিন্দুদের বিশ্বাস ‘বেদ’ মানব রচিত নয়, ঈশ্বর রচিত।

রামায়ণ ও মহাভারত
অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক হতে খ্রিষ্টীয় ২য় শতকের মধ্যবর্তীকালে ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ কাব্যগ্রন্থ দুটি রচিত। রামায়ণের রচিয়তা মহর্ষি বাল্মীকি এবং মহাভারতের রচিয়তা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। বাল্মীকি ও ব্যাসদেবকে কাব্যগ্রন্থদ্বয়ের রচিয়তা মনে করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো গ্রন্থই সম্পূর্ণভাবে একজনের রচিত নয়। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা লেখকদের রচনার ফলে মহাকাব্যদ্বয়ের সৃষ্টি। প্রত্যেক লেখক নিজেকে আদি রচয়িতার নামে পরিচিত করেছিলেন বলে পরবর্তী লেখকগণ অজ্ঞাত থেকে যান। বাংলা মহাভারতের প্রধান কবি কাশীরাম দাস। রামায়ণ কাব্যগ্রন্থটি বাল, অযোধ্যা, আরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দর, লঙ্কা ও উত্তর নামক মোট সাতটি কাণ্ডে বিভক্ত।

রামায়ণ : উপমহাদেশের আদি মহাকাব্য
রামায়ণ উপমহাদেশের আদি মহাকাব্য। সংস্কৃত কবি বাল্মীকি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রামায়ণ কাব্যগ্রন্থটি রচনার সূত্রপাত ঘটান। তাই তাঁকে রামায়ণের আদি রচয়িতা বলা হয়। মহাকাব্যটি চব্বিশ হাজার অনুষ্টুপ শ্লোকে রচিত এবং বাল, অযোধ্যা, আরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দর, লঙ্কা ও উত্তর কাণ্ড নামে সাতটি খণ্ডে বিভক্ত। অনার্যরাই রামায়ণে বর্ণিত গল্পের আদি জন্মদাতা। রামায়ণকে পৃথিবীর প্রথম সুবৃহৎ মহাকাব্য বলা হয়ে থাকে। বাল্মীকির ‘রামায়ণ’ অনুবাদ করে কৃত্তিবাস ওঝা মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্যের জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন। গৌড়েশ্বর রুকনুদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯১৪৭৪ খ্রি.) মতান্তরে রাজা গণেশের পুত্র জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ (১৪১৮১৪৩১ খ্রি.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কৃত্তিবাস ওঝা ‘রামায়ণ’-এর বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। গবেষকদের অভিমত, আনুমানিক ৫০ জনেরও অধিক কবি রামায়ণ অনুবাদ করেছেন।


মহাভারত ও মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদক
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতকের পূর্ব হতে এদেশে প্রচলিত কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ সংক্রান্ত নানা উপকাহিনি নিয়ে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতকে ‘মহাভারত’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন। উল্লেখ্য ‘মহাভারত’ কাব্যগ্রন্থে রামায়ণের কথা উল্লেখ আছে। মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদক কবীন্দ্র পরমেশ্বর। তিনি গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩১৫১৮ খ্রি.)-এর সেনাপতি পরাগল খানের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মহাভারত বঙ্গানুবাদ করেন। পরাগল খানের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ‘মহাভারত’ অনূদিত হয়েছিল বলে গ্রন্থটি ‘পরাগলী মহাভারত’ নামে পরিচিতি পায়। তাছাড়া বাংলা মহাভারতের মধ্যে পরাগল খানের পুত্র ছুটিখানের আদেশে জৈমিনি মহাভারতের উপর নির্ভর করে কেবল ‘অশ্বমেধ পর্বে’র অংশ নিয়ে শ্রীকর নন্দী রচিত ‘ছুটিখানী মহাভারত’ এবং কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত ‘সংস্কৃত মহাভারত’ অনুসরণে কাশীরাম দাস রচিত ‘মহাভারত’ মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য অনুবাদ।

পুরাণ ও ভাগবত
পুরাণ হচ্ছে আনুমানিক খ্রিষ্ট-পূর্ব চতুর্থ শতক হতে প্রচারিত সংস্কৃত ভাষায় রচিত এক প্রকার কাহিনিকেন্দ্রিক ধর্মগ্রন্থ। সর্বমোট ছয়ত্রিশখানি সংখ্যা নিয়ে পুরাণের পরিপূর্ণ অবয়ব গঠিত। তন্মধ্যে আঠারোখানি মহাপুরাণ এবং আঠারোখানি উত্তর পুরাণ। আঠারোখানি উত্তর পুরাণের অন্যতম হচ্ছে ভাগবত পুরাণ বা ভাগবত। ভাগবত অষ্টম শতকের পূর্বের রচনা। চতুর্দশ শতক হতে ভাগবত বাংলাদেশে প্রচারিত হয়। ভাগবত বারটি স্কন্ধ বা পর্বে বিভক্ত। প্রথম নয়টি স্কন্ধে বিভিন্ন গল্প-আখ্যান ও তত্ত্বকথা বর্ণিত হয়েছে এবং দশম হতে দ্বাদশ স্কন্ধে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন ও পরবর্তী লীলা স্থান পেয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তদের কর্মকাণ্ড পরবর্তী শেষ তিন পর্বকে এদেশে সুপরিচিত করে তুলে। এ তিন পর্বই সাধারণত বিভিন্ন নামে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চৈতন্যদেবের প্রভাবে ভাগবতের শেষ তিন স্কন্ধের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

বিশ্বের প্রথম আর্থনীতিক ও রাজনীতিক গ্রন্থ
বিখ্যাত মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের প্রধান পরামর্শদাতা কৌটিল্য লিখিত ‘অর্থশাস্ত্র’ নামক গ্রন্থটি বিশ্বের প্রথম ‘আর্থনীতিক ও রাজনীতিক’ গ্রন্থ। খ্রিষ্ট পূর্ব ৩২৪ খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫ সময়ের মধ্যে গ্রন্থটি লেখা হয়েছে।

পৃথিবীর আদিকবি
রামায়ণ রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকিকে পৃথিবীর আদিকবি বলা হয়। রামায়ণে ২৪ হাজার শ্লোক ও ৫ শত অধ্যায় রয়েছে। ‘রামায়ণ’ই পৃথিবীর একমাত্র প্রথম গ্রন্থ যা সাধারণ একটি কাব্যগ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সে যুগে বাল্মীকির মতো বিচক্ষণ জ্ঞান ও কল্পনার অধিকারী অন্য কোনো কবি ছিল না। তাই তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবি বলা হয়। পৃথিবীতে আর কোনো কবির গ্রন্থ অনুরূপ ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে নি।

প্রথম বৈয়াকরণিক ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপতাত্ত্বিক
পাণিনি উপমহাদেশের প্রথম বৈয়াকরণিক। তাঁর লেখা ‘অষ্টাধ্যায়ী’ উপমহাদেশের প্রথম ব্যাকরণ। গ্রন্থটি চার হাজার সূত্র নিয়ে গঠিত। কথ্য ও বৈদিকরূপের সংস্কারের মধ্যে পাণিনি ছিলেন অন্যতম। তাঁর লেখা ‘অষ্টাধ্যায়ী’ ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসের প্রথম ব্যাকরণ। তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপতাত্ত্বিক বলা হয়। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী‘কে ‘মানবমনীষার পরম উৎকর্ষের নিদর্শন’ বলা হয়। অষ্টাধ্যায়ী পৃথিবীর ইতিহাসের প্রাচীনতম শব্দশাস্ত্র গ্রন্থ। সংস্কৃত ভাষাতত্ত্বে পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ একমাত্র মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সালাতুরে (লাহোর) পাণিনি জন্মগ্রহণ করেন।

উপমহাদেশের প্রথম চিকিৎসাগ্রন্থ
খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের প্রথমভাগে রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্র যে গ্রন্থটি রচনা করেন সেটি উপমহাদেশের প্রথম চিকিৎসা গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে পরীক্ষামূলক বিবরণ সন্নিবেশিত করা হয়েছে। প্রকৃতি, বৃক্ষ ও দ্রব্যাদির গুনাগুণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা সংবলিত গ্রন্থটি উপমহাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রথম ও পথিকৃৎ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।‘সেক শুভোদয়া’ হলায়ুধ মিশ্রের অন্য একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি রাজা লক্ষ্মণ সেন এবং শেখ জালাল উদ্দিন তাবরেজির অলৌকিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত। শেখের শুভোদয় অর্থাৎ শেখের গৌরব। শেখ তথা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ হতে আগত মুসলমান মনীষীদের গৌরব বর্ণনাই ছিল গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্য।

ঋগ্‌বেদ
সিভিলিয়ান ও দক্ষ প্রশাসক রমেশ চন্দ্র দত্ত (১৮৪৮১৯০৯ খ্রি.) ঋগ্‌বেদের বঙ্গানুবাদ করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলার’ উপসংহার ‘মৃন্ময়ী’ লিখে জনপ্রিয় হয়েছিলেন দামোদর মুখোপাধ্যায় (১৮৫৩১৯০৭ খ্রি.)। ঋগে¦দ = (ঋক্ + বেদ) = ঋগ্‌বেদ। আবার ঋগ্ শব্দের অর্থ ছন্দ, বেদ অর্থ মন্ত্র বা শ্লোক। সুতরাং ঋগে¦দ অর্থ ছন্দে রচিত মন্ত্র বা শ্লোক।

সংস্কৃত ভাষায় লিখিত প্রথম প্রণয়কাহিনী, সংস্কৃত শব্দের উদ্ভাবক
সংস্কৃত সাহিত্যে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত প্রথম প্রণয়কাহিনি সুবন্ধুর ‘বাসবদত্তা’। সুবন্ধুর ‘বাসবদত্তা’র সাথে প্রাচীনতম ইরানি রোমান্স ‘Zariadres’ ও  ‘Odatis’ -এর প্রভাব লক্ষ্যণীয়। উল্লেখ্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সংস্কৃতি শব্দটির উদ্ভাবক।

শূন্যপুরাণ ও সেক শুভোদয়া
‘শূন্যপুরাণ’ রামাই পণ্ডিত রচিত ধর্মপূজার শাস্ত্রগ্রন্থ। এটি গদ্যপদ্য মিশ্রিত একটি চম্পুকাব্য। গ্রন্থটির অন্তর্গত নিরঞ্জনের রুষ্মা কবিতাটি প্রমাণ দেয় যে, গ্রন্থটি মুসলমান তুর্কিদের বঙ্গ বিজয়ের পর অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে রচিত। গ্রন্থটিতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উপর বৈদিক ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের কাহিনি বর্ণনার সঙ্গে মুসলমানদের জাজপুর প্রবেশ এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর রাতারাতি ধর্মান্তর গ্রহণের কাল্পনিক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে সংস্কৃত গদ্যপদ্যে রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্র ‘সেক শুভোদয়া’ চম্পুকাব্যটি রচনা করেন। রাজা লক্ষ্মণ সেন এবং শেখ জালালুদ্দীন তাবরেজির অলৌকিক কাহিনি অবলম্বনে গ্রন্থটি রচিত। শেখের শুভোদয় অর্থাৎ শেখের গৌরব ব্যাখ্যা পুস্তিকাটির উদ্দেশ্য। সেক শুভোদয়ার প্রেমসঙ্গীতটি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

 

 নিচেপূর্বতন সংস্করণের খসড়া। সংশোধন করার কাজ চলছে। মিনহা সিদ্দিকা 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়
বাংলা লিপি ও বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষার পূর্বপুরুষ
ভারতের মৌলিক লিপি ‘ব্রাহ্মী লিপি’ হতে ‘বাংলা লিপির’ উৎপত্তি। সকল ভারতীয় লিপিই ‘ব্রাহ্মী লিপি’ হতে সৃষ্ট। সম্রাট অশোকের অনুশাসন সুগঠিত ব্রাহ্মী লিপিতে উৎকীর্ণ। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ব্রাহ্মী লিপি হতে ‘পশ্চিমা লিপি’, ‘মধ্য ভারতীয় লিপি’ এবং ‘পূর্ব-লিপি’ নামে তিনটি শাখা লিপির সৃষ্টি হয়। এই লিপিসমূহের মধ্যে একাদশ-দ্বাদশ শতকে ‘পূর্ব-লিপি’ হতে ‘বাংলা লিপির’ উৎপত্তি ঘটে। অর্থাৎ ‘ ব্রাহ্মী লিপি’ হতে সৃষ্ট ‘পূর্ব লিপি’ বাংলা লিপির মূল উৎস। এ হিসেবে ব্রাহ্মী লিপির ধারক ‘পালি’ বাংলা ভাষার পূর্ব পুরুষ হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি
সংস্কৃত ভাষা হতে নয়, পূর্বাঞ্চলের অপভ্রংশ রূপ বা গৌড় অপভ্রংশ হতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় মূল-ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি স্বতন্ত্র ভাষা। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মূল ভাষাটির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। আড়াই হাজার খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে স্থানিক পরিবর্তনশীলতার কারণে মূল ভাষা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষার অনেকগুলো শাখা সৃষ্টি হতে থাকে। তন্মধ্যে আর্যশাখা অন্যতম। সাহিত্য ও ভাষা গবেষকদের ধারণা আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ভারতীয় আর্য ভাষার সৃষ্টি হয়। ভারতীয় আর্য ভাষার তিনটি স্তর ছিল। যথা (১) প্রাশ্চাত্য বা ইরানিক শাখা, (২) মধ্যবর্তী বা দারদিক শাখা ও (৩) প্রাচ্য বা প্রাচীন ভারতীয় আর্য শাখা। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার স্তরে (খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ হতে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত) বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। স্থানিক সমন্বয়তা এবং কথ্য প্রভাবের ভিন্নতার কারণে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা পরিবর্তিত হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষায় (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক হতে খ্রিস্টীয় দশম শতক পর্যন্ত) রূপান্তর ঘটে। মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষায় পালি, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ প্রচলিত ছিল। মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা প্রথমে পালি ও পরে প্রাকৃত ভাষা নামে পরিচিহ্নিত হয়। অন্যদিকে অঞ্চলভেদে প্রাকৃত ভাষা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তন্মমধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শ্রেণি ছিল মাগধি প্রাকৃত। মাগধি প্রাকৃত-এর প্রাচ্যতর রূপ ছিল গৌড় প্রাকৃত। এই গৌড় প্রাকৃত থেকে গৌড়ী অপভ্রংশের মাধ্যমে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে। কেউ কেউ বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল খ্রিস্টীয় দশম শতক বলে উল্লেখ করে থাকেন। তবে অধিকাংশ গবেষকদের অভিমত, বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক।


প্রচীনতম বাংলায় রচিত আদিপুস্তক
আধুনিক বাংলা ভাষার পূর্ববর্তী ভাষার নাম ছিল গৌড় অপভ্রংশ এবং গৌড় অপভ্রংশের পূর্ববর্তী ভাষা গৌড়ি প্রাকৃত। গৌড়ি প্রাকৃতের পূর্বে প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত ছিল। গৌড় অপভ্রংশ হতে প্রথম মৈথিলি ভাষা পরে উড়িয়া এবং অবশেষে বঙ্গ-কামরূপি ভাষা উৎপন্ন হয়। বঙ্গ-কামরূপি ভাষা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বাংলা ও আসামি ভাষা সৃষ্টি হয়। মাগধি প্রাকৃত-এর প্রাচ্যতর রূপ ছিল গৌড় প্রাকৃত। এ গৌড় প্রাকৃত থেকে গৌড়ি অপভ্রংশের মাধ্যমে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে। গৌড়ীয় অপ্রভ্রংশ হতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি বলে এক সময় বাংলা ভাষাকে গৌড়ীয় ভাষা বলা হত। উল্লেখ্য প্রাচীন প্রাকৃত ভাষা ‘পালি ভাষা’ নামে চিহ্নিত। অতএব আমরা পালিকে বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ বলতে পারি। গৌতম বুদ্ধ রচিত ‘ত্রিপিটক’ প্রাচীনতম বাংলায় রচিত আদিতম পুস্তক।

বাংলা লিপির উৎপত্তি
গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, ভারতবর্ষের মৌলিক লিপি ‘ব্রাহ্মী লিপি’ হতে ‘বাংলা লিপির’ উৎপত্তি। সিংহলি, ব্রহ্মি, শ্যামি, যবদ্বীপি ও তিব্বতি এক কথায় সকল ভারতীয় লিপি ‘ব্রাহ্মী লিপি’ হতে সৃষ্ট। সম্রাট অশোকের অনুশাসন সুগঠিত ব্রাহ্মী লিপিতে উৎকীর্ণ। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ব্রাহ্মী লিপি হতে ‘পশ্চিমা লিপি’, ‘মধ্য ভারতীয় লিপি’ এবং ‘পূর্বী-লিপি’ নামে তিনটি শাখা লিপির সৃষ্টি হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি হতে মধ্য ভারতীয় ও পূর্বী লিপির এবং দক্ষিণি ব্রাহ্মী লিপি হতে দক্ষিণ-পশ্চিমের নাগরি লিপির উদ্ভব। একাদশ-দ্বাদশ শতকে ‘পূর্বী-লিপি’ হতে ‘বাংলা লিপির’ উৎপত্তি ঘটে। অর্থাৎ ‘ ব্রাহ্মী লিপি’ হতে সৃষ্ট ‘পূর্ব লিপি’ বাংলা লিপির উৎস।

বাংলা বর্ণমালা ও শব্দসম্ভার
১১টি স্বরবর্ণ ও তিনটি অতিরিক্ত চিহ্নসহ ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে বাংলা বর্ণমালার অবয়ব। বর্ণগুলোর সমন্বয়ে তৎসম, দেশি, বিদেশি, তদ্ভব ইত্যাদি মিলে সর্বমোট সৃষ্ট শব্দের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার। এর মধ্যে পঞ্চাশ হাজার তৎসম, আড়াই হাজার আরবি-ফারসি, অনুমান চারশ তুর্কি, এক হাজার ইংরেজি, দেড়শ পর্তুগিজ-ফারসি, কিছু বিদেশি এবং বাদবাকি তদ্ভব ও দেশি শব্দ।

সংস্কৃত ভাষা
প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার দুটি রূপ ছিল। যথা কথ্য ও বৈদিক। বৈদিক রূপকে সাহিত্য ও ধর্মচর্চায় ব্যবহার করা হত। কালক্রমে বৈদিক রূপের সঙ্গে কথ্য রূপের মিশ্রণে ভাষায় অশুদ্ধ ও বিকৃত উচ্চারণ শুরু হয়। অশুদ্ধ ও বিকৃত উচ্চারণের পরিণতি হতে ভাষাকে রক্ষা করে শুদ্ধ ভাষা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য তৎকালীন ভাষাবিদ ও বৈয়াকরণিকগণ ভাষার কতগুলো নিয়ম বেঁধে দেন। কথ্যরূপ ও বৈদিক রূপের সংস্কারের ফলে যে ভাষাটি সৃষ্টি হয়েছে তাকে সংস্কৃত ভাষা বলা হয়। সংস্কৃত শব্দের অর্থ যাকে সংস্কার করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দের দিকে সংস্কৃত ভাষা বিধিবদ্ধ হতে থাকে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের ব্যাকরণবিদ পাণিনির হাতে এটি চূড়ান্তভাবে বিধিবদ্ধ হয়। সংস্কৃত ভাষা আর্য তথা বৈদিক ভাষার সংস্কারকৃত রূপ। অতএব সংস্কৃত বিদেশাগত আর্যদের ভাষা।

বাংলা ভাষার প্রসার
ভাষাভাষী জনসংখ্যা বিবেচনায় পৃথিবীতে বাংলা ভাষার স্থান বর্তমানে চতুর্থ। ২০ বছর আগেও এর স্থান ছিল ৮ম। ক্রমাগত বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাষার প্রসার ও প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র, বিহার, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যের কিয়দংশ এবং বার্মার আরাকানে বাংলা ভাষাভাষী বহু লোক বসবাস করে। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৭ কোটি অধিবাসীসহ বিশ্বের প্রায় ২৪ কোটি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে।

বাংলা ভাষায় সংকলিত না হয়েও বাঙালি জীবনের চিত্র সম্বলিত দুটি প্রাচীন গ্রন্থ
প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার স¤পর্ক ছিল একান্ত নিবিড়। এ প্রসঙ্গে ‘গাথা সপ্তদশতী’ ও ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ গ্রন্থদ্বয়ের কথা উল্লেখযোগ্য। কাব্যগ্রন্থ দুটি বাংলাদেশে সংকলিত না হলেও বাঙ্গালি জীবনের চিত্র পরিষ্ফুট।

বঙ্গ বা বাঙলা দেশের উৎপত্তি
খ্রিস্টপূর্ব তিন সহস্র বছর পূর্বে ঋগে¦দের ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ নামক একটি দেশের কথা উল্লেখ আছে। যা বর্তমান বাংলাদেশকে নির্দেশ করে মর্মে ভাষা বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা। অন্যান্য প্রাচীন সাহিত্যেও ‘বাংলা’ নামক একটি দেশের কথা উল্লেখ আছে। তবে বৈদিক যুগে বাংলা আর্য অধ্যুষিত অঞ্চলের বাইরে ছিল বিধায় ‘ঋগে¦দে’ বাংলা নামের উল্লেখ নেই। মহাকাব্যের যুগে ‘বাংলা’ প্রথম আর্য সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হয়। মহাভারত ও রামায়ণে ‘বঙ্গ’ এবং অন্যান্য জনপদের কথা উল্লেখ আছে। জৈন উপাঙ্গ গ্রন্থেও ‘বঙ্গ’ নামের উল্লেখ দেখা যায়। প্রাচীন বাঙলা অঞ্চলটি গৌড়, পুণ্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ়, তাম্রলিপ্ত, সমতট, বঙ্গ, বাঙ্গাল, হরিকেল প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত ছিল। সপ্তদশ শতকে বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা শশাঙ্ক জনপদগুলোকে একত্রিত করে পুণ্ড্র, গৌড় ও বঙ্গ নামের তিনটি জনপদে বিভক্ত করেন। মুসলমান আমলে বাংলার খণ্ড নামগুলোর অবসান ঘটে এবং বাংলা ভাষাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলকে একীভূত করে বঙ্গ নামে অভিহিত করা হতে থাকে। সম্রাট আকবরের আমলে সমগ্র বঙ্গদেশ ‘সুবহ-ই-বঙ্গালহ’ নামে পরিচিতি পায়। ফারসি শব্দ ‘বঙ্গালাহ’ শব্দ হতে পর্তুগিজ “ইবহমধষধ” বেঙ্গল এবং ইংরেজি ‘ইধহমধষধ’ শব্দের উৎপত্তি হয়। যে অঞ্চলে বং গোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করত সে অঞ্চলটি বং বা বঙ্গ নামে পরিচিতি পায়। সংস্কৃত ‘বঙ্গ’ শব্দ ‘বং’ বা ‘বঙ’ গোষ্ঠীর নাম। ভাগীরথী নদীর পূর্বতীর থেকে আসামের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বং গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের বসবাস ছিল।

বঙ্গ বা বাঙ্গলা নামের উৎপত্তি/দেশবাচক শব্দের প্রথম ব্যাবহার
বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি স¤পর্কে গবেষকদের অভিমত যে অঞ্চলে ‘বং’ জাতির লোকজন বসবাস করত তা ‘বং’ নামে পরিচিত ছিল। সংস্কৃত বঙ্গ শব্দ হতে ‘বং’ বা ‘বঙ’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। ‘বং’ গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের বাসভূমি নদীর পূর্বতীর হতে আসামের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল ‘আইন-ই- আকবরি’ গ্রন্থে প্রথম দেশবাচক শব্দ ব্যবহার করে এর উৎপত্তি নির্দেশ করেন। তাঁর মতে বঙ্গ-এর সঙ্গে বাঁধ বা জমির সীমাবাচক শব্দ ‘আল’ বা আলি বা আইল প্রত্যয়যোগে বাঙ্গাল/বাংলা শব্দ গঠিত হয়।

বঙ্গ বা বাঙ্গালা নামের উৎপত্তি
যে অঞ্চলে ‘বং’ জাতির লোকজন বসবাস করত তা ‘বং’ নামে পরিচিত ছিল। সংস্কৃত বঙ্গ শব্দ হতে ‘বং’ বা ‘বঙ’ গোষ্ঠীয় নামের উৎপত্তি। ‘বং’ গোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের বাসভূমিনদীর পূর্বতীর হতে আসামের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল ‘আইন-ই- আকবরি’ গ্রন্থে প্রথম দেশবাচক শব্দ ব্যবহার করে এর উৎপত্তি নির্দেশ করেন। তাঁর মতে ‘বঙ্গ’ শব্দের সাথে ‘আল’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘বাংলা’ (বঙ্গ + আল) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

বাংলা লিপির গঠন ও প্রভাব
সেন যুগে বাংলা লিপির গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেও পাঠান যুগে এসে তা মোটামুটি স্থায়ী আকার ধারণ করে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় বাংলা লিপি হাতে লেখা হত। তাই বাংলা লিপি ক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছে এবং কোনো স্থির বর্ণমালায় সুনির্দিষ্ট রূপ নিতে পারে নি। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ছাপাখানা স্থাপনের পর বাংলা লিপি সুনির্দিষ্ট অবয়ব ধারণ করে। এরপর বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তনশীলতা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বাংলা লিপির গঠনে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। ফলে বাংলা লিপি আদর্শ অবয়বে স্থিতিশীল হতে শুরু করে। উৎপত্তিগত কারণে উড়িষ্যা, মৈথিলি ও আসাম লিপির উপর বাংলা লিপির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

মাতৃভাষার সংখ্যা
ইউনেসকো-র সদর দপ্তর প্যারিস থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত একটি ফ্যাক্স বার্তার ভাষ্যমতে পৃথিবীতে মাতৃভাষার সংখ্যা ছয় হাজার। ভাষা বিজ্ঞানীগণ মনে করেন পৃথিবীতে সব মিলিয়ে তিন হতে চার হাজার ভাষা আছে। তন্মধ্যে চিনা, ইংরেজি, রুশ, ফরাসি, ফারসি, স্পেনিশ, আরবি, জার্মান, জাপানি, পর্তুগিজ, হিন্দি, উর্দু এবং বাংলা প্রধান ও বহুল প্রচলিত ভাষা। প্রতিবছর প্রায় ৭টি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ভারতে প্রচলিত-অপ্রচলিত মোট ভাষার সংখ্যা ১,৬৫২টি। ভারতে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ও অষ্টম তপসিলভুক্ত ভাষার সংখ্যা ১৮টি।

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

একনজরে বঙ্গবন্ধু এক মলাটে পুরো বই

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর সমগ্র

শুবাচ প্রায়োগিক বাংলা ও সাধারণ জ্ঞান

এক মিনিট সময় দিন বানানগুলো শিখে নিন

error: Content is protected !!