বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

একাদশ অধ্যায়
এক নজরে বাংলা গদ্যের উৎপত্তি ও বিকাশ

বাংলা গদ্যের আদি নিদর্শন
১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে কুচবিহার-রাজ নরনারায়ণ অহোমরাজ চুকোম্ফা স্বর্গদেবকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এ চিঠিটি বাংলা গদ্য সাহিত্যের আদি নিদর্শন। চিঠিখানির অংশবিশেষ হল-“ লেখনং কার্যঞ্চ। এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তর বাঞ্ছা করি। তখন তোমার আমার সন্তোষ স¤পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকুল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে…।” ষোড়শ শতকে সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভগ্ন সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘সেক সুভোদয়া’ গ্রন্থের অন্তরালে বাংলা গদ্যের আভাষ ছিল বলে অনেকে মনে করে থাকেন। সপ্তদশ শতকের প্রথমভাগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত “চৈতন্য-চরিতামৃত” গ্রন্থে গদ্যায়ত পদ্যের উৎকৃষ্ট সাহিত্য নিদর্শন পরিলক্ষিত। চণ্ডিদাস গদ্যপদ্যময় গীত রচনা করেছিলেন মর্মে প্রাচীন পুঁথি ‘পদকল্পতরু’তে উল্লেখ আছে। সপ্তদশ দশকের প্রথমার্ধে জনৈক সহজিয়া রচিত ‘চৈত্যপ্রাপ্তি’ নামক সাধনাতত্ত্ব গ্রন্থটিও গদ্যে লেখা হয়েছিল। একই সময়ে নেপালে রচিত ‘গোপীচাঁদের সন্যাস’ বিষয়ক একটি নাটকের ভাষা সাধু বাংলা গদ্যের অনুসারী ছিল। ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে লিখিত একটি চুক্তিপত্রে ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ হতে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বৈষ্ণব সাধকদের দ্বারা গদ্যে-পদ্যে ‘কড়চা’ জাতীয় কিছু পুস্তিকা রচিত হয়েছিল। ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ নন্দকুমারের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠিখানা সাধু ভাষায় লিখিত হয়েছিল। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা গদ্যে রচিত ‘মহারাজ বিক্রমাদিত্য চরিত্র’ নামক একটি গ্রন্থ ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ মিউজিয়াম হতে আবিষ্কার করেনে। এ গ্রন্থটি একটি গল্পগ্রন্থ, ভাষা বাংলা এবং গদ্যরূপে লিখিত। গ্রন্থটির গদ্য নমুনা ঊনিশ শতকের লেখক মৃতুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের গদ্যের ন্যায়। সার্বিক বিবেচনায় ‘মহারাজ বিক্রমাদিত্য চরিত্র’ বাংলা সাহিত্যের গদ্যের আদি নিদর্শন বলে চিহ্নিত। অনেক গবেষক অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে রচিত ‘শূণ্যপুরাণ’কে বাংলা গদ্যের আদিতম নির্দশন বলে দাবি করে থাকেন। ডঃ সুকুমার সেনের মতে, ‘এ সকল পুঁথি ও গদ্যপদ-বাচ্যের সন্ধান না করে গবেষকেরা শ্রীরামপুর মিশনের পাদরি এবং ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের শিক্ষকদের বাংলা সাহিত্যের গদ্যের প্রবর্তনকারী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।’
পর্তুগিজ মিশনারিদের বাংলা গদ্য চর্চা ও বাংলা সাহিত্যে সচেতন গদ্যে রচিত প্রথম পুস্তক
ঊনবিংশ শতকের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে কোনো বাংলা গদ্য পদ-বাচ্য ছিল না এ কথা সত্য নয়। তবে গদ্যপদ-বাচ্যের আলয়ে কোনো পরিকল্পিত সাহিত্য কর্ম ছিল না। যা ছিল তা হচ্ছে দলিল দস্তাবেজ, চিঠিপত্র, বৈষ্ণবদের গদ্য-পদ্য রচিত কড়চা ইত্যাদি। খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ পাদ্রীরা বাংলা সাহিত্যে প্রথম সু¯পষ্ট গদ্য পদ-বাচ্যের সূচনা ঘটান। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে দোমিনিক দ্যা সুজা সোনারগাঁয়ের নিকটবর্তী শ্রীপুর গ্রামে অবস্থানকালীন বাংলা শেখেন। সল্প ভাষাজ্ঞান সম্বল করে তিনি ‘জেসুইট’ পাদ্রী সম্প্রদায়ের প্রচারক ফ্রান্সিসকো ফারনান্দেজ রচিত দুখানি প্রচার পুস্তিকা বাংলায় অনুবাদ করেন। এ অনুদিত পুস্তিকা দুটি বাংলা ভাষায় অনুদিত প্রথম পুস্তিকা হিসেবে খ্যাত। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে ফাদার বারবিয়ার নামক একজন পাদ্রী বাংলা ভাষায় একটি ক্ষুদ্র বিতর্কমূলক প্রচার পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। এটি কোনো বিদেশি কর্তৃক বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম প্রচার পুস্তিকা। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে দোম আন্তনিও রচিত ‘ব্রাহ্মন রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ বাংলা সাহিত্যে গদ্যে রচিত বৃহদাকার একটি উল্লেখযোগ্য পুস্তক। ১২০ পৃষ্ঠা প্রলম্বিত পুস্তকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে ধর্মান্তরিত দোম আন্তনিও কর্তৃক হিন্দু ধর্মের তুলনায় খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করা।
বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক
ঢাকার ভাওয়ালে অবস্থানকালে পর্তুগিজ পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আস্ স¤পসাম্ কর্তৃক ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে ভাওয়ালের প্রচলিত মৌখিক ভাষায় লিখিত খ্রিস্টান প্রচার পুস্তিকা ‘কৃপাশাস্ত্রের অর্থভেদ’ বাংলা গদ্যে লিখিত প্রথম মুদ্রিত পুস্তক। পর্তুগালের রাজধানী লিসবন হতে ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পুস্তকটি রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। ‘কৃপাশাস্ত্রের অর্থভেদ’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক হিসেবে খ্যাত। উপাখ্যান কথার সাহায্যে রচয়িতা ম্যানুয়েল দ্যা আস্ স¤পসাম রোমান ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ব ব্যাখার মাধ্যমে খ্রিস্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব এবং হিন্দু ধর্মের অসারতা তুলে ধরেছেন। ধর্ম পুস্তক হলেও আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগের জন্য গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আস্ স¤পসাম্ ‘কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ’ ছাড়াও পর্তুগিজ ভাষায় একটি বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা শব্দকোষ সংকলন করেছিলেন। রোমান হরফে মুদ্রিত বাংলা গদ্যযন্ত্রের এবং প্রথম বৈয়াকরণ হিসেবে পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আস্ স¤পসাম্ এর নাম বাংলা গদ্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পর্তুগিজ নাগরিক রেস্তো ডি সেলভেস্তো বা ডি সুজা ‘প্রশ্নোত্তরমালা’ ও ‘প্রার্থনামালা’ নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
প্রথম বাংলা ব্যাকরণ
১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলী শহরে প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ যন্ত্র হতে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের ‘অ এৎধসসধৎ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলাভাষাবাসী অঞ্চল হতে মুদ্রিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ। হ্যালহ্যাড ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি রচনা শুরু করেছিলেন। গ্রন্থটির নাম ইংরেজি হলেও সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষায় রচিত নয়; কিয়দংশ বাংলা ছিল। অন্যান্য বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতাদের মধ্যে আসস্যাস¤পসু (১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ), হ্যালহেড (১৭৭৮), রামমোহন (১৮৩৩), জগদীশ চন্দ্র (১৩৪০বাং), হরনাথ (১৯৩৪), সুনীতি কুমার (১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে) প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।
ভারতবর্ষে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ
ভারতবর্ষে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে তামিল অক্ষরে মালায়ালাম ভাষায় প্রথম বই মুদ্রিত হয়। ¯েপনের এক পাদরি গ্রন্থটির রচয়িতা। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ হতে বাংলা অক্ষরে বাংলা ভাষায় বাংলাভাষাবাসীদের অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ যন্ত্র হতে গ্রন্থ প্রকাশের সূচনা ঘটে।
শ্রীরামপুর মিশনের উদ্যোক্তা/বাংলা মুদ্রণ যন্ত্রের আমদানী
শ্রীরামপুর মিশনের অন্যতম উদ্যোক্তাদের মধ্যে উইলিয়াম কেরি ও জন টমাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের সহকারী ছিলেন যথাক্রমে জশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড। তাঁরা শ্রীরামপুর মিশনের মাধ্যমে প্রথম বাংলা মুদ্রণযন্ত্রের আমদানির ব্যবস্থা করেন। সংগত কারণে বাংলা গদ্যের প্রথম যুগের গ্রন্থগুলো শ্রীরামপুর মিশনের মুদ্রণ যন্ত্র হতে মুদ্রিত হওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ
১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে কলিকাতা ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কো¤পানির ইংরেজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর উদ্দেশ্যে ১৮০১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ফোর্ড উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। শ্রী রামপুর মিশনের পাদ্রি ও বাইবেলের প্রথম বাংলা অনুবাদক উইলিয়াম কেরিকে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যক্ষ নিয়োগ করে তাঁর অধীনে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ও রামনাথ বাচ¯পতি নামক দুই জনকে পণ্ডিত এবং শ্রীপতি মুখোপাধ্যায়, আনন্দ চন্দ্র, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, কাশীনাথ, পদ্মলোচন চূড়ামণি ও রামরাম বসু নামক ছয়জন ব্যক্তিকে সহকারী পণ্ডিত নিযুক্ত করা হয়। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরিকে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের সর্বাধ্যক্ষ পদে উন্নীত করা হয়। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের হিল্সবারিতে কো¤পানি সরকার ব্রিটিশ কর্মচারিদের জন্য কলেজ স্থাপন করলে ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের গুরত্ব কমে যেতে থাকে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফোর্ড উইলিয়াম কলেজে শুধু বাংলা বিভাগই সক্রিয় ছিল। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথম গদ্যবাচ্য, বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যসূচি প্রস্তুতের সময় বাংলা গ্রন্থের অভাববোধ কেরিকে বাংলা গ্রন্থ রচনায় উৎসাহী করে তুলে। ঊনবিংশ শতকের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে গ্রহণযোগ্য কোনো গদ্যগ্রন্থ ছিল না। পর্তুগিজ পাদরিরা প্রথম; মূলত ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে গদ্য পদবাচ্যমূলক গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এ ধারার প্রাচীনতম বই দোস আন্তনিও রচিত ‘ব্রাক্ষ্মন রোমান ক্যাথালিক সংবাদ’। ১২০ পৃষ্ঠা পরিধির এ বইটি সপ্তদশ শতকের সপ্তম দশকের প্রথম পুস্তক। তবে ধর্ম প্রচারই ছিল গ্রন্থটি রচনার মূল উদ্দেশ্য। পর্তুগিজ পাদ্রীদের অপর বই ‘কৃপাশাস্ত্রের অর্থভেদ’। ৩৯১ পৃষ্ঠার এ পুস্তকটি ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আস্সু¤পস্যাম ভাওয়ালের প্রচলিত মৌখিক ভাষায় রচনা করেন। এটি বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক।
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ পর্ব
১৮০১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমযে কেরি ও তার সহযোগীরা তেরটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। ইংরেজ সিভিলিয়ানদে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত রচনা হিসেবে গ্রন্থগুলো তৎকালে খুবই মুল্যবান হিসেবে বিবেচিত হত। বাংলা গদ্য চর্চা ও গ্রন্থ প্রকাশের স্বীকৃতিস্বরূপ রামমোহন যুগের (১৮০১-১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম পনের বছর তথা ১৮০১-১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ কালকে ‘ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ পর্ব’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ হতে ৮ জন লেখক ১৩ টি গদ্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ হতে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ
রামরাম বসু রচিত রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ হতে ছাত্রদের জন্য প্রকাশিত প্রথম পাঠ্যপুস্তক। এটি ঊনিশ শতকের প্রথম বাংলা মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবেও খ্যাত। গ্রন্থটি বাঙালি লেখক কর্তৃক বাংলা ভাষায় লিখিত এবং বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ। ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম জীবন-চরিত বিষয়ক গ্রন্থ। রামরাম বসুর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘লিপিমালা’ (১৮০২)। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের লেখক গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক (৫টি) গ্রন্থের রচয়িতা। উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪), রামরাম বসু(১৭৫৩-১৮১৩), মৃতুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (১৭৬২-১৮৯৯) ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের শ্রেষ্ঠ লেখক।
উইলিয়াম কেরির গ্রন্থ
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের ইতিহাসে কেরির নামে দুটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। একটি ‘কথোপকথন’ এবং অন্যটি ‘ইতিহাসমালা’। কথোপকথন ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে এবং ইতিহাস মালা ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থদ্বয় শ্রীরামপুর মিশন থেকে মুদ্রিত হয়েছিল। উইলিয়াম কেরি ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে আসেন। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগষ্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৩৪ খ্রিস্টব্দের ৯ জুন মৃত্যুবরণ করেন। ‘কথোপকথন’ গ্রন্থটির ইংরেজি নাম ‘উরধষড়মঁবং রহঃবহফবফ ঃড় ভধপরষরঃধঃব ঃযব ধপয়ঁরৎরহম ড়ভ ঃযব ইবহমধষ খধহমঁধমবদ.
বাংলা সাহিত্যের প্রথম গল্পসংগ্রহ
১৪৮ টি গল্প ও কাহিনী সমন্বয়ে উইলিয়াম কেরি রচিত ও ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্রল্পসংগ্রহ ‘ইতিহাসমালা’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে খ্যাত।
বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম বাঙালি লেখক
রামরাম বসু বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি গদ্য লেখক। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ এবং ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘লিপিমালা’ রামরাম বসুর প্রসিদ্ধ গদ্যগ্রন্থ।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক-জীবনী
১৮০১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রামরাম বসু লিখিত ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিকজীবনী বা জীবনচরিত। এটা বাঙালির লেখা বাংলা ভাষায় ছাপানো প্রথম ‘গদ্যগ্রন্থ’। গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় গদ্যে রচিত প্রথম ‘জীবনচরিত’ হিসেবেও খ্যাত।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের ইংরেজ শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহারের জন্য ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত বেদান্ত চন্দ্রিকা বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ।
বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম সক্ষমশিল্পী
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার উইলিয়াম কেরির অধীনে প্রধান পণ্ডিত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি পাঁচটি বাংলা বই রচনা করেছিলেন। তাঁকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম সক্ষমশিল্পী বলা হয়। মৃত্যুঞ্জয়ের গ্রন্থসমূহ হল- (১) বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২ খ্রি. (২) হিতোপদেশ (১৮০৮ খ্রি.) (৩) রাজাবলী (১৮০৮ খিঃ) (৪) বেদান্ত চন্দ্রিকা (১৮১৭ খ্রি.) এবং প্রবোধ চন্দ্রিকা (১৮১৩, প্রকাশ ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ)। মৃত্যঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ‘বেদান্ত চন্দ্রিকা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ। তাঁর রচিত ‘প্রবোধ চন্দ্রিকা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম নীতি-উপদেশমূলক প্রবন্ধগ্রন্থ। তবে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক-প্রাবন্ধিক রাজা রামমোহন রায়।
পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রাজা রামমোহন রায়ের লেখা গ্রন্থ ‘বেদান্ত’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে তিনিই প্রথম গদ্যের প্রচলন করেন। তাঁকে ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক-মানুষ বলা হয়। রাজা রামমোহন রায় ফারসি ভাষায় ‘আখবার’ নামের একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রথম বাংলা-ইংরেজি অভিধান
রাজা রামমোহন রায়ের সমসাময়িক লেখক রামকমল সেন (১৭৮৩-১৮৪৪ খ্রি.) লিখিত এবং ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা-ইংরেজি অভিধানটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাংলা-ইংরেজি অভিধান। তিনি কলিকাতার স্কুল বুক সোসাইটির জন্য ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ‘হিতোপদেশ’ নামে একটি পাঠ্য পুস্তক রচনা করেন। ১৮১৮- ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাধাকান্ত দেব (১৭৮৪- ১৮৭৬ খ্রি.) ‘শব্দকল্পদ্রুম’ নামক একটি বিরাট অভিধান লিখে কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেছিলেন। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সুবৃহৎ অভিধান।
বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন
প্রাচীন গদ্যের যে সকল নিদর্শন এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে তন্মধ্যে ষোড়শ শতকে লেখা একটি পত্র সবচেয়ে প্রাচীন বলে খ্যাত। পত্রটি ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে কুচবিহারের মহারাজা নারায়ণ তৎকালীন আহোমরাজ চুক্কা স্বর্গদেবকে লিখেছিলেন।
বাংলা ভাষায় অনুদিত প্রথম আইন গ্রন্থ
দেশ শাসনের সুবিধার্থে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলা ভাষায় দক্ষ ইংরেজ কর্মচারি ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হেলহ্যাডেরে মাধ্যমে প্রচলিত মুসলিম এবং হিন্দু আইনসমূহ সংগ্রহ করেন। বাংলা ভাষায় সংগৃহীত মুসলিম ও হিন্দু আইন দুটিকে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ওয়ারেন হেস্টিংস এর অনুরোধে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘জেন্টু কোড’ নাম দিয়ে আইন গ্রন্থদ্বয় এন বি হ্যালহেড বাংলায় অনুবাদ করেন। গ্রন্থটির ভাষা ও বাক্যের গাঁথুনি দেখে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনার পূর্বে হ্যালহেড বাংলা ভাষায় প্রশংসনীয় দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বাংলা ভাষায় বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ
হ্যালহেড রচিত ব্যাকরণ ‘অ এৎধসসধৎ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব’ গ্রন্থটিতে প্রথম বাংলা টাইপ ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা ভাষায় বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ। ভগ্বদ্গীতার ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থ ‘ঞযব ইযধমাধঃ এরঃধ ড়ৎ উরধষড়মঁবং ড়ভ কৎরংযহধ ধহফ অৎলড়ড়হং’ এর অনুবাদক ইংরেজ কো¤পানির কর্মচারি চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকার প্রথম বাংলা টাইপ প্রস্তুত করেন। এ কারণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দকে বাংলা গদ্যের ‘ঐতিহাসিক যুগে’র আরম্ভ বৎসর বলা যায়। তবে যথার্থ গদ্যের সঝত্রপাত ঘটে ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা গদ্য সৃষ্টির প্রস্তুতিকাল বলা যায়।
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন ও শ্রীরামপুর মিশন প্রেস
১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের কাজ শুরু হয়। একই বছর মার্চ মাসে শ্রীরামপুর মিশনের প্রেসের কাজ আরম্ভ হয়। ‘মঙ্গল সমাচার মাতিউর রচিত’ এ প্রেস হতে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ।
বাংলা গদ্যগ্রন্থের প্রথম নিদর্শন
দোম অ্যান্তনিউ প্রণীত ‘ব্রাহ্মন রোমাণ ক্যাথালিক সংবাদ’ বাংলা গদ্য সাহিত্যের আদি নিদর্শন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের কিছু পূর্বে বইটি রচিত হয়েছিল। তবে গ্রন্থটি ছাপা হয় নি। পর্তুগালের এভোরা নগরে গ্রন্থটির মূল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। পর্তুগিজ পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আসসু¤পসাম বইটি পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ সেন পর্তুগালের এভেরো নগরে গিয়ে গ্রন্থটির অধিকাংশ নকল করে নিয়ে আসেন। দোম অ্যান্তনিউ ছিলেন ভূষণার রাজকুমার। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মগ দস্যুরা তাঁকে বন্দি করে আরকানে নিয়ে যায়। এক রোমান পাদ্রী টাকা দিয়ে তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন এবং খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করে দোম অ্যান্তনিউ নাম রাখেন।
বাংলা ভাষার প্রথম-ব্যাকরণ
ম্যানুয়াল দ্যা আসসু¤পসাম রচিত ‘ঠড়পধনঁষধৎরং ঊস ওফরড়সং ইবহমধষষধ’ গ্রন্থটি বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ এবং অভিধান হিেেসবে খ্যাত। এই গ্রন্থটি ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন হতে রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ
১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যানুয়াল দ্যা আসসু¤পসাম এর ‘ঈৎবঢ়বৎ ীধীঃৎবৎ ড়ৎঃযনবফ’ গ্রন্থটি বাংলা গদ্যে রচিত প্রথমগ্রন্থ। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন হতে রোমান হরফে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।
গদ্য আছে এমন একটি পুরাণ
রামাই পণ্ডিত রচিত ‘শুণ্য পুরাণে’ কিছু গদ্য আছে। তবে গদ্য হলেও গদ্যগুলো অনেকটা ছড়ার মতো। তবু এগুলোকে বাংলা পুরাণের গদ্য বলা হয়।
বাংলা গদ্যে লিখিত প্রথম পত্র
১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ নন্দ কুমারের সাধু সরল ভাষায় লিখিত একখানা পত্রই বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম গদ্য চিঠি এবং বাংলা গদ্য সৃষ্টির প্রয়াস।
বাংলাদেশে বাংলা বর্ণমালার ছেনী কাটার পূর্বের গ্রন্থ
বাংলাদেশে বাংলা টাইপের ছেনী কাঁটার পূর্বে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে রেভারেন্ড বিন্টো লণ্ডন নগরে তথাকার মুদ্রণযন্ত্রে ‘প্রার্থনামালা’ ও ‘প্রশ্নমালা’ নামক দুই খানি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থ দুটি বাংলা বর্ণমালার ছেনী কাটার পূর্বের গ্রন্থ।
বাংলা হরফে প্রথম মুদ্রিত ও প্রকাশিত প্রথমগ্রন্থ
ন্যাথিনিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের ‘অ এৎধসসধৎ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব’ এ প্রথম বাংলা টাইপের ব্যবহার করা হয়। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলী হতে চালর্স উইলকিন্স বাংলা অক্ষরে এ ব্যাকরণ মুদ্রণ ও প্রকাশ করেন। এর পর ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঔড়হধঃযধহ উঁহপধহ অনুদিত ‘ই¤েপ আইন’ এর বঙ্গানুবাদ কো¤পানির প্রেস হতে মুদ্রিত হয়। নাথিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন।
বাংলায় প্রথম ছাপার অক্ষর
প্রথম বাংলা ছাপার অক্ষর আবিষ্কার করেন চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকার। অবশ্য মিস্টার বোল্টস নামক জনৈক ব্যক্তি বাংলা ছাপার অক্ষর তৈরির প্রথম প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু সফল হতে পারেন নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কো¤পানির কর্মচারী স্যার চার্লস উইলকিন্স বাংলা টাইপের প্রথম ছেনী কাটেন। তিনি শ্রীরামপুরের পঞ্চানন কর্মকারকে ছেনী কাটা শিখিয়েছিলেন। ন্যাথিনিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের ‘অ এৎধসসধৎ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব’ গ্রন্থে প্রথম বাংলা টাইপের ব্যবহার করা হয়। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলী হতে চালর্স উইলকিন্স বাংলা অক্ষরে এ ব্যাকরণ গ্রন্থটি মুদ্রণ ও প্রকাশ করেন। এরপর ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঔড়হধঃযধহ উঁহপধহ অনুদিত ‘ই¤েপ আইন’ এর বঙ্গানুবাদ কো¤পানির প্রেস হতে মুদ্রিত হয়। উল্লেখ্য ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর হুগলীতে স্থাপিত এ ছাপাখানা ভারতবর্ষের প্রথম ছাপাখানা।
লাইনো টাইপের প্রথম ব্যবহার
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলা বাজার’ পত্রিকায় প্রথম লাইনো টাইপের ব্যবহার করা হয়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা বই
‘কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা বই। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যানুয়াল দ্যা আসসু¤পসাম এর ‘ঈৎবঢ়বৎ ীধীঃৎবৎ ড়ৎঃযনবফ’ রচিত হয়। বঙ্গদেশে বাংলা হরফ-ছেনী ও মুদ্রণ যন্ত্র ছিল না বলে ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন হতে গ্রন্থটি রোমান হরফে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্য গ্রন্থের নাম ‘ঠড়পধনঁষধৎরং ঊস ওফরড়সং ইবহমধষষধ’ এটি বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ও অভিধান হিেেসবে খ্যাত। গ্রন্থটি ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে লিসবন হতে রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত দ্বিতীয় বাংলা গ্রন্থ।
বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলা হয়। বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২ খ্রি.), হিতোপদেশ (১৮০৮ খ্রি.), রাজাবলী (১৮০৮ খ্রি.), বেদান্ত চন্দ্রিকা (১৮১৭ খ্রি.), প্রবোধ চন্দ্রিকা (১৮৩৩ খ্রি.) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ছয়টি গ্রন্থ। প্রবোধ চন্দ্রিকা মৃত্যুঞ্জয়ের প্রসিদ্ধ এবং বহুল প্রচলিত গ্রন্থ। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মৃত্যুবরণ করেন।
পাঠ্য-পুস্তকের বাইরে বাংলা গদ্যের প্রথম প্রচলক
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পাঠ্য পুস্তকের বাইরে বাংলা গদ্যের প্রথম প্রচলন করেন। তাঁর প্রথম-গ্রন্থ ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বেদান্ত সার’, দুটি গ্রন্থই ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। রামমোহন রায় ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ‘মীরাতুল আখবার’ নামে ফারসি ভাষায় একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গৌড়ীয় ভাষার উপর ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ নামের একটি ব্যাকরণ বই লিখেছিলেন। পূর্ণগ্রন্থ এবং প্রচার পুস্তিকা মিলে রামমোহন রায় রচিত বাংলা ভাষায় গ্রন্থের সংখ্যা ৩০। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙ্গালী লেখক ও প্রথম গল্পসংগ্রহ
১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ইতিহাসমালা ’ একটি গল্প সংগ্রহ। ১৪৮ টি গল্প ও কাহিনী সমন্বয়ে রচিত এ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে খ্যাত। রামরাম বসু বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাঙালি গদ্য লেখক। তাঁর লেখা দুটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। যথা (১) রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১ খ্রিস্টাব্দ) ও (২) লিপিমালা (১৮০২ খ্রিস্টাব্দ)।
বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম পত্র-সাহিত্য
রামরাম বসু লিখিত ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘লিপিমালা’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলায় রচিত প্রথম পত্রসাহিত্য। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ইতিহাসমালা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম গল্পগুচ্ছ। ১৫০টি ক্ষুদ্র গল্প নিয়ে বইটি রচিত।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক জীবনচরিত/বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা গ্রন্থ
রামরাম বসু লিখিত এবং ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’, গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যে লিখিত প্রথম ঐতিহাসিক জীবনী বা জীবনচরিত। এটা বাঙালির লেখা বাংলা ভাষায় ছাপানো প্রথম গদ্যগ্রন্থ হিসেবেও খ্যাত।
বাংলা ভাষায় মনস্তত্বের প্রথম পরীক্ষা
বাংলা ভাষায় মনস্তত্বের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রজনী’ গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থটিকে বাংলা ভাষায় মনস্তত্বের প্রথম পরীক্ষা বলা হয়।
বাংলা গদ্যে মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রথম সার্থক প্রয়াস
রামরাম বসু লিখিত ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা গদ্যে মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রথম সার্থক প্রয়াস হিসেবে খ্যত। গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম জীবনচরিতও বলা হয়। তাঁর অন্য গ্রন্থটির নাম ‘লিপিমালা’, যা ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মচরিত
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মচরিত। লেখকের নিজের কথা আত্মচরিত জাতীয় রচনার উপজীব্য।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রহসন
বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রহসন রচয়িতা হিসেবে মধুসূদন খ্যাত। তাঁর প্রথম প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রহসন। তাঁর দ্বিতীয় প্রহসন গ্রন্থ ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ)।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিজ্ঞানগ্রন্থ, বাংলা ভাষার বিজ্ঞান চর্চার প্রথম পথপ্রদর্শক
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার বঙ্গানুবাদ ‘বিদ্যাহারাবলী’ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ। অনুবাদক ছিলেন উইলিয়াম কেরির ছেলে ফিলিক্স কেরি। তাঁকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ‘প্রথম পথপ্রদর্শক’ বলা হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম অভিধান বা কোষগ্রন্থ
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে চারখণ্ডে প্রকাশিত ‘কেরি’স ডিকশনারি’ (ঈধৎবু’ং উরপঃরড়হধৎু) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম অভিধান। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম কোষগ্রন্থ হিসেবেও খ্যাত।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ
রঙ্গলালের ‘পদ্মিনী উপন্যাস’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। উল্লেখ্য রঙ্গলাল ওমর খৈয়ামের কবিতা রুবাইয়াতের বঙ্গানুবাদও করেছিলেন।
সাহিত্যের প্রথম ইতিহাসগ্রন্থ
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিস্তৃত ইতিহাসের রচয়িতা রামগতি ন্যায়রত্ন। রামগতি ন্যায়রত্ন লিখিত এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাহিত্য ইতিহাস গ্রন্থ। দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ) অনুরূপ দ্বিতীয় গ্রন্থ।
বাংলা ভাষায় রচিত মহিলা-শিক্ষামূলক প্রথম গ্রন্থ
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এবং প্যারীচাঁদ মিত্র লিখিত ‘রামারঞ্জিকা’ বাংলা সাহিত্যে বাংলা ভাষায় রচিত মহিলাদের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে রচিত স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যঙ্গাত্মক রচনা
ফোর্ড উইলিয়ামা কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠ্য পুস্তক হিসেবে রচিত ও ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত উইলিয়াম কেরির ‘ইতিহাসমালা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যঙ্গাত্বক রচনা।
বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে ভাষাকে উদ্দেশ্যানুগ ও বিষয়োচিত করে তোলার অলিখিত সংস্কার এর প্রবর্তক
বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে ভাষাকে উদ্দেশানুগ ও বিষয়োচিত করে তোলার অলিখিত সংস্কার মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (১৭৬২-১৮১৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম প্রবর্তন করেন।
জনকের জন্মের ৪৫ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণকারী
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। বাংলা গদ্যের জন্মের ৪৫ বছর পর তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি শুরু হলেও তিনিই আশ্চর্যজনকভাবে বাংলা গদ্যের জনক খ্যাতির অধিকারী।
শরৎচন্দ্রের প্রথম গল্প
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘মন্দির’ নামক গল্পটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম গল্প। গল্পটি কুন্তলীন গল্প প্রতিযোগিতায় পুরষ্কৃত হয়েছিল। তাঁর দ্বিতীয় গল্প ‘বড়দিদি’ ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
বাংলা গদ্যের জনক
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংল গদ্যের জনক বলা হয়। বাংলা গদ্যের উদ্ভবের অন্তত ৪৫ বছর পর তার সাহিত্য সৃষ্টি শুরু হলেও তিনিই বাংলা গদ্যের জনক খ্যাতির অধিকারী।
বাংলা গদ্যের ভাষাকে ‘উদ্দেশ্যানুগ ও বিষয়োচিত’ করার অলিখিত সংস্কারক
বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে ভাষাকে উদ্দেশ্যানুগ ও বিষয়োচিত করে তোলার লক্ষ্যে সুস্পষ্ঠ সংস্কার মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারই প্রথম প্রবর্তন করেন।
জগত্তরারিণী সুবর্ণপদক প্রাপ্ত প্রথম মহিলা
স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জেষ্ঠা ভগিনী। তিনি অনেক দিন ভারতী পত্রিকা পরিচালনা করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বসন্ত উৎসব’ একটি গীতিনাট্য। এটি ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তাররিণী সুবর্ণ-পদক’ প্রদান করেন। তিনিই এ জগত্তারারিণী সুবর্ণপদক প্রাপ্ত প্রথম মহিল।
সঞ্জীব চট্টেপাধ্যায় (১৮৩৪-১৮৯৩)
বিখ্যাত ‘পালামৌ’ ভ্রমণ গ্রন্থের লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ‘পালামৌ’ বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় ভাই। ‘মাধবীলতা’ ও ‘কণ্ঠমালা’ তার দুটি উপন্যাস।
গদ্যে প্রথম সংস্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা
ঋগে¦দের বঙ্গানুবাদের সূত্রপাতকারী ও গদ্যে প্রথম সংস্কৃত ব্যকরণ রচয়িতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ ও ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র প্রতিষ্ঠাতা ও গদ্যে প্রথম সংস্কৃত ব্যাকরণ রচয়িতা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত ও মৃত্যুর পর প্রকাশিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘স্বরচিত জীবনচরিত’ বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
বাংলা উপন্যাসের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পথের পাচালী (১৯১২)। উপন্যাসটি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার সাহিত্য পত্রিকা ‘মাসিক বিচিত্রায়’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৩৫০ বঙ্গাব্দের মহাদুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অশনি সংকেত’ বাংলা সাহিত্যে দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা প্রথম সার্থক উপন্যাস।

error: Content is protected !!