বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

দ্বাদশ অধ্যায়
সাহিত্যবিষয়ক সংজ্ঞা ও ধারণা

লোকসাহিত্য
অনেকে ইংরেজি ঋড়ষশ-ষড়ৎব শব্দটিকে লোকসাহিত্যের সমার্থক মনে করে থাকেন। কিন্তু লোকসাহিত্যকে ঋড়ষশ-ষড়ৎব শব্দটির মতো ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা সংগত নয়। বাংলার লোকসাহিত্য স¤পুর্ণ নিজস্ব ধ্যান ধারণায় সৃষ্ট ভিন্ন আঙ্গিকের একটি অনবদ্য সাহিত্য কর্ম। যা লিখিত না হয়েও লেখার চেয়েও অধিক স্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। লোকসাহিত্য বলতে সাধারণ জনগণের মুখে মুখে প্রচলিত গাথাকাহিনী, গান, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদি বুঝায়। সাধারণভাবে কোনো সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠির অলিখিত কিন্তু বহুলপ্রচলিত সাহিত্য লোকসাহিত্য। জাতীয় সংস্কৃতির নৈকট্য লাভকারী সাহিত্যগুণ স¤পন্ন যে সকল সাহিত্যকর্ম মূলত মৌখিক ধারা অনুসরণ করে সাধারণ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত সেগুলো লোকসাহিত্য। লোকসাহিত্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের একক সৃষ্টি নয়। সুসংবদ্ধ সমাজের সার্বিক সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যের লোকসাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’। মধ্যযুগে সৃষ্ট প্রায় সমস্ত সাহিত্য কোনো কোনোভাবে লোকসাহিত্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ফল। ছড়া, গান, গীতিকা, কথা, ধাঁধাঁ, প্রবাদ, প্রবচন, মার্সিয়া সাহিত্য, সওয়াল সাহিত্য ইত্যাদি লোকসাহিত্যের বিভিন্ন শাখা।
কবিগান ও কবিওয়ালা
দুই পক্ষের বিতর্কের উৎসরণে কবিওয়ালাদের প্রশ্ন-উত্তর ও পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতায় মুখেমুখে সুর ছন্দে রচিত গানকে কবিগান বলা হয়। ভারতচন্দ্রের মৃত্যুকাল হতে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনকাল পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিগানের কাল হিসেবে খ্যাত। কবিওয়ালাদের মধ্যে গোঁজালা গুঁই, ভবানী বেনে, রাসু-নৃসিংহ, হরু ঠাকুর, কেষ্টা মুচি, নিতাই বৈরাগী, রাম বসু, ভোলা ময়রা, এন্টনি ফিরিঙ্গি, শ্রীধর কথক, নীলমণি পাটনী, বলরাম বৈষ্ণব, রামসুন্দর স্যাকরা প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। যারা উপস্থিত ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয় নির্বাচন করে ছন্দোবদ্ধ পদ্য রচনা করতেন তাঁরা ‘কবিওয়ালা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কবিগানের প্রসার কবিওয়ালাদের কাল।
নাথসাহিত্য
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে নাথধর্মের কাহিনী অবলম্বনে রচিত আখ্যায়িকা কাব্যসমূহ নাথসাহিত্য নামে পরিচিত। শিব উপাসক যোগী সম্প্রদায় আচরিত ধর্মের নাম নাথধর্ম। নাথ অর্থ প্রভু। দীক্ষান্তে নামের শেষে তারা নাথ পদবি যুক্ত করতেন। নাথ সম্প্রদায়ের জন্য নাথসাহিত্য সৃষ্ঠি হয়েছে। নাথসাহিত্যে আদিনাথ শিব, পার্বতী, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িপা, কান্নপা, ময়নামতী ও গোপীচন্দ্রের কাহিনী স্থান পেয়েছে। নাথধর্ম সংক্রান্ত গল্পকাহিনী নিয়ে রচিত সাহিত্য দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন রংপুর হতে সংগৃহীত একটি গীতিকা ‘মানিকচন্দ্র রাজার গান’ নাম দিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ করেন। এরপর উত্তর ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল হতে ‘ময়নামতীর গান’ ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’ ইত্যাদি নামে একই কাহিনীভিত্তিক পুঁথি আবিষ্কৃত হয়। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ শেখ ফয়জুল্লা রচিত ‘গোরক্ষবিজয়’ পুঁথি আবিষ্কার করে প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে কবি ভীমসেন রচিত এবং পঞ্চানন মণ্ডল স¤পাদিত ‘গোরক্ষবিজয়’ নামক পুঁথিটিও উল্লেখযোগ্য। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গোপীচন্দ্রের গান (প্রথম খণ্ড) এবং ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে গোপীচন্দ্রের গান (দ্বিতীয় খণ্ড) প্রকাশিত হয়। ‘ময়নামতী’ বা গোপীচাঁদের গান’ রচয়িতার মধ্যে দুর্লভ মল্লিক, ভবানীদাস ও শুকুর মহম্মদের নাম উল্লেখযোগ্য। ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনী নিয়ে রচিত ‘গোপীচন্দ্র নাটক’ (রচনা কাল- ১৬২০-১৬৫৭) নেপাল হতে আবিষ্কৃত হয়েছে। শুকর মহম্মদের ‘গোপীচাঁদের সন্যাস’ ডঃ নলিনীকান্দ ভট্টশালীর স¤পাদনায় প্রকাশিত হয়।
নাথ গীতিকা
রাজা গোঁপীচাঁদ বা গোবিন্দচন্দ্র মায়ের নির্দেশে তরুন বয়সে নব যৌবনে দুই নবপরিণীতা বধু প্রাসাদে রেখে সন্ন্যাস অবলম্বন করেছিলেন। এ কাহিনীকে কেন্দ্র করে যে গীতিকাব্যের উদ্ভব হয়েছে তা বাংলা সাহিত্যে নাথগীতিকা নামে পরিচিত। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন রংপুর জেলার মুসলমান কৃষকদের নিকট হতে সংগৃহীত ‘মাণিকচন্দ্র রাজার গান’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে নাথ গীতিকা সুধী সমাজের দৃষ্টিতে আনেন।
মার্সিয়া সাহিত্য
মার্সিয়া আরবি শব্দ। এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। আরবি সাহিত্যে বিভিন্ন প্রকার শোকাবহ ঘটনা হতে মার্সিয়া সাহিত্যের উদ্ভব হলেও পরবর্তীকালে কারবালা প্রান্তরে শহিদ ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের আত্মাহুতির হৃদয়বিদারক ঘটনা মার্সিয়া সাহিত্যের অন্যতম উপজীব্য। মার্সিয়া সাহিত্য রচয়িতাদের মধ্যে মুঘল আমলে দৌলত উজির বাহরাম খান, মুহম্মদ খান, হায়াৎ মাহমুদ, জাফর, হামিদ, ইংরেজ আমলের হামিদুল্লাহ খান, গরীবুল্লাহ, রাধারমণ গোপ, মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। জারি গান মার্সিয়া সাহিত্যের একটি বিশেষ লোকরূপ। মার্সিয়া সাহিত্যের প্রথম গদ্যগ্রন্থ মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু।
সওয়াল সাহিত্য
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিরা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্মীয় শাস্ত্রকথা ও তত্ত্বচিন্তা প্রচারের জন্য এক প্রকার কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যগুলোকে ‘সওয়াল সাহিত্য’ নামে খ্যাত।
ছড়া
লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি ছড়া। ছড়ার ছন্দ বাংলা কবিতার প্রাচীনতম ছন্দ। নিছক আনন্দ সঞ্চারের লক্ষ্যে অ¯পষ্ট আভাস কিংবা ইঙ্গিতে সহজ-সরল ভাষায় সংক্ষিপ্ত-লঘুভায় সতত পরিবর্তনশীল অখচ বিমুগ্ধ ছন্দ ঝংকারে সমৃদ্ধ ভাব বিবেচনায় পরিণতিহীন কিন্তু আকর্ষণীয় বৈচিত্র্যের অধিকারী লোকসাহিত্যকে ছড়া বলা হয়।
লোকগীতি
কাহিনীবিহীন কিন্তু বিশেষ ভাব অবলম্বনে রচিত জীবনধর্মী এবং একটি বিষয়ে গীত হওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো অজানা রচয়িতার অজানা কোনো সময়ে রচিত ও অজানা সময় হতে গীত লোকসাহিত্যকে লোকগীতি বলে। আঞ্চলিক গীতি, উৎসবাদির গীতি, হাসিরগান, শ্রমসঙ্গীত, প্রেমসঙ্গীত, বারমাসী গীত ইত্যাদি লোকগীতির অন্তর্ভূক্ত।
গীতিকা
ইংরেজিতে যাকে ব্যালাড বলা হয় বাংলায় তাকে গীতিকা বলা যায়। একশ্রেণির আখ্যানমূলক লোকগীতি যাতে বিখ্যাত কোনো কাহিনীর দৃঢ়বদ্ধ চরিত্র নাটকীয় বিমোহনে পল্লবিত না হয়ে আদর্শ অনুসারে ক্রিয়া প্রাধান্যে রূপায়িত হয় তাকে গীতিকা বলা হয়। নাথগীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গগীতিকা ইত্যাদি গীতিকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
মৈমনসিংহ গীতিকা
ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে সংগৃহীত গীতিকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে চার খণ্ডে প্রকাশ করেন। মনসুর বয়াতি ও দেওয়ানা মদীনা পালাটি মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের শ্রেষ্ঠ গীতিকা।
কথা
গদ্যের মাধ্যমে বিধৃত কাহিনীকে কথা, লোককথা বা লোককাহিনী বলা হয়। এটি ইংরেজিতে ফোক-লোর নামে পরিচিত। লোককথা বা লোককাহিনী কাব্যে রূপায়িত হলে তা গীতিকা নামে অভিহিত হয়। অতএব গীতিকার গদ্যরূপকে কথা বা লোককথা কিংবা লোককাহিনী বলা যায়। রূপকথা, উপকথা, ব্রতকথা ইত্যাদি লোককাহিনীর উদাহরণ।
ধাঁধাঁ
ধাঁধাঁ লোকসাহিত্যের একটি প্রাচীনতম শাখা। রূপক ভাবলম্বনে জিজ্ঞাসার আকারে সুক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তির পরিশীলিত রূপায়নের অনুভবে জ্ঞানবুদ্ধি ও চিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও প্রকাশের জন্য রচিত স্বল্প পরিসরের লোকসাহিত্যকে ধাঁধাঁ বলে।
প্রবাদ/প্রবচন
সাধারণ অথচ উত্তম বুদ্ধিবৃত্তি ও গভীর দৃষ্টিসমৃদ্ধ কোনো মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় লব্ধ অভিব্যক্তির প্রামাণ্য আবহে আহৃত জ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে নীতি, উপদেশ ইত্যাদি প্রদানের লক্ষ্যে সংক্ষিপ্ত অথচ চমৎকার অবয়বে প্রকাশিত লোকসাহিত্যকে প্রবাদ বলে। খনার প্রবচন বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রবাদ।
পুঁথি সাহিত্য
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার সঙ্গে আরবি ও ফারসি শব্দমিশ্রিত বিশেষ ধরণের ভাষারীতিতে রচিত কাব্য পুঁথি সাহিত্য নামে পরিচিত। পুঁথি সাহিত্যকে বিভিন্ন সমালোচকগণ বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন। যেমন-বটতলার পুঁথি, দোভাষী সাহিত্য, মিশ্র সাহিত্য, মুসলমানি বাংলা সাহিত্য ইত্যাদি। পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় কবি ফকির গরীবুল্লাহ। ইউসুফ-জোলেখা, আমীর হামজা (প্রথম অংশ), জঙ্গনামা, সোনভান, সত্যপীরের পুঁথি ফকির গরীবুল্লাহর মিশ্র ভাষা রীতিতে রচিত পুঁথি। প্রাচীনতম বাংলা পুঁথির রচনাকাল ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ)। গোরক্ষ বিজয়ের সমস্ত পুঁথিতে বা পুঁথির বিভিন্ন অংশে ফয়জুল্লা, কবীন্দ্র, ভীমদাস এবং শ্যামদাস সেনের ভণিতা পাওয়া যায়। শেখ ফয়জুল্লা ‘গোরক্ষবিজয়’ পুঁথির আদি রচয়িতা।
বাউল
১৯ শতকের সবচেয়ে খ্যাতিমান বাউল ছিলেন লালন শাহ। ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলায় ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে লালনশাহ জন্ম গ্রহণ করেন। শৈশব-কৈশোরে তিনি গৃহ ত্যাগী হয়ে শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কুষ্টিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। বাউল কবিদের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। তবে ঊনিশ শতকের শেষভাগে হরিনাথ মজুমদার নামক জনৈক হিন্দু কবি বাউল সুরে আধ্যাÍিক বিষয়ক কবিতা রচনা করে কাঙ্গাল হরিনাথ নামে খ্যাতিমান হয়ে উঠেন।
তত্ত্ববোধিনী যুগ ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫)
রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ নামক জনৈক বৈদিক পণ্ডিতের পরামর্শে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর জোড়াসাঁকোয় নিজ বাসগৃহে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শাস্ত্রসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব ও বেদান্ত প্রতিপাদ্য ব্রহ্মবিদ্যার প্রচার তত্ত্ববোধিনী সভা প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম সমাজকে তত্ত্ববোধিনী সভার অন্তভূক্ত করে তত্ত্ববোধিনী যুগের সফল সূচনা ঘটান। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র হিসেবে ‘‘তত্ত্ববোধিনী ’ পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। অক্ষয়কুমার, বিদ্যাসাগর, মহির্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ, সে যুগের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখকগণ পত্রিকাটিতে নিয়মিত লিখে বাংলা সাহিত্যে একটি যুগের সৃষ্টি করেন। এ যুগটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তত্ত্ববোধিনী যুগ নামে পরিচিত। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় প্রথম ‘ঋগে¦দের’ অনুবাদ করেন। তিনি বাংলা গদ্যে প্রথম সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রনয়ণ করেন। বৃটিশ ভারতের পার্বত্য এবং গ্রামাঞ্চলের ভাষা-চিত্র অঙ্কনের অনন্য গ্রন্থ হিসেবে দেবেন্দ্রনাথের ‘স্বরচিত জীবন চরিত’ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬), পরিশ্রম-সূত্র ও বাংলা সাহিত্যের জড়তবিমুক্তকারী
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার লেখক গোষ্ঠীর অন্যতম অক্ষয়কুমার দত্ত সুদীর্ঘ ১২ বছর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার স¤পাদক ছিলেন। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট পত্রিকাটি বেদ-বেদান্ত ও পরব্রহ্ম উপাসনা প্রচার করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়। অক্ষয়কুমার দত্তের প্রথম গ্রন্থ ‘বাহ্যবস্তুর সাথে মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’। পরিশ্রমের উপর লেখা অক্ষয়কুমারের একটি প্রবন্ধে পরিশ্রম সংক্রান্ত্র সূত্রটি বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উক্তি। সূত্রটি নিুরূপঃ পরিশ্রম + প্রার্থনা = শস্য, পরিশ্রম = শস্য। অতএব, প্রার্থনা = শূন্য। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে অক্ষয়কুমার মৃত্যুবরণ করেন। পুস্তকাকারে প্রকাশিত অক্ষয়কুমারের গদ্য গ্রন্থের মধ্যে (১) তূগোল এবং (২) শ্রীযুক্ত ডেভিড হেয়ার সাহেবের নাম স্মরণার্থ তৃতীয় সাম্বৎসরিক সভার বক্তৃতা’ উল্লেখযোগ্য। অক্ষয় কুমারের হাতে বাংলা গদ্যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও ভাষা এবং পুরাতাত্ত্বিক বিষয় আলোচনার উপযোগী হয়ে উঠে। বাংলা গদ্যের জড়তা তাঁর লেখনীতে প্রথম কেটে যায়। এ জন্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের জড়তাবিমুক্তকারী বলা হয়। ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।
কল্লোল যুগ
১৩৩০ বঙ্গাব্দে ১৫ বছর বয়সে বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) বিখ্যাত পত্রিকা ‘কল্লোল’ প্রকাশিত হয়। ‘কবিতা’ পত্রিকা তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি। বুদ্ধদেব বসুর ‘কল্লোল’ এর নামানুসারে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ‘কল্লোল যুগ’ বলে অভিহিত করা হয়। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ‘কল্লোল যুগ’ বলা হয়। ‘কল্লোল’ পত্রিকার স¤পাদক ছিলেন দীনেশ রঞ্জন দাশ।
বীরবল
বাংলা কথ্যরীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম বীরবল। ‘বীরবলের হালখাতা’ গ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে বীরবল নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রমথ চৌধুরীর স¤পাদনায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজপত্র’ প্রকাশিত হয়। সবুজপত্র পত্রিকার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম চলতি রীতির মুখপত্র হিসেবে খ্যাত। প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম অভিনবত্ব প্রণয়নের প্রচেষ্টা নেন।
হুতোমী বাংলা
হুতোমী বাংলার প্রবর্তক কালীপ্রসন্ন সিংহ। কালীপ্রসন্ন সিংহ সাহিত্যে কলিকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর মৌখিক ভাষার প্রখম সুষ্ঠু প্রয়োগ করে খ্যাতিমান হয়ে আছেন। তাঁর ব্যবহৃত ভাষায় কথ্য ও সাধু ক্রিয়াপদের মিশ্রণ ছিল না। এ হিসেবে তাঁর ভাষা প্যারীচাঁদের ভাষার চেয়ে উন্নত ছিল। কালীপ্রসন্ন সিংহের ছদ্মনাম ছিল ‘হুতোম’। এ জন্য তার ভাষাকে হুতোমী বাংলা বলা হত। ‘হুতোম প্যাচার নকঁশা’ কালী প্রসন্ন সিংহের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ।
ইয়ং বেঙ্গল
১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরেজিও (১৮০৯-১৮৩১) ছিলেন হিন্দু কলেজের শিক্ষক। তাঁর অনুসারী শিষ্যগণ ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে তারাচাঁদ চক্রবর্তী (১৮০৬-১৮৫৫) ছিলেন সাংবাদিক, কোষকার, সরকারি কর্মচারী ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম রাজনীতিক চেতনা সৃষ্টিকারী অসাধারণ এক ব্যক্তি। কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় (১৮১৩-৮৫ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া জাতীয় গ্রন্থ ‘শব্দকল্পদ্রুম’ এর রচয়িতা। রাম গোপাল ঘোষ (১৮১৫-৬৮) ইংরেজি বক্তৃতার জন্য ‘ডিমোস্থিনিস’ নামে খ্যাত বাঙালির প্রথম রাজনীতিক বাগ্মী এবং রাধানাথ সিকদার (১৮১৩-১৮৭০) ছিলেন এভারেস্ট গিরিশৃঙ্গের প্রথম আবিষ্কারক ও মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তৎকালে ‘ইয়ং রেঙ্গল’রা সমাজচেতনার পুরোগামী মুখপাত্র হিসেবে খ্যাত ছিলেন।
অতসীমামী
অতসীমামী মানিক বন্দোপাধ্যায়ের একটি গল্প। ছাত্রজীবনে তিনি ‘অতসী মামী’ গল্প লিখে সাহিত্যমোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ‘জননী’ তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে খ্যাত। ‘পদ¥ানদীর মাঝি’ তাঁর আরেক জনপ্রিয় উপন্যাস।
হারামনি
‘হারামনি’ একটি লোকসঙ্গীত সংকলন। প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত সংগ্রাহক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন (১৯০৩-১৯৮৭) সংগৃহীত এবং দশখণ্ডে প্রকাশিত অজস্র লোকসংগীতের সমন্বয়ে ‘হারামনি’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। হারামনি বাংলা সাহিত্যে লোকসঙ্গীতের একটি বিখ্যাত দলিল।
অবক্ষয় যুগ
মধ্যযুগের শেষ এবং আধুনিক যুগের প্রারম্ভ-মধ্যবর্তী সময়টুকু বাংলা সাহিত্যের অবক্ষয়যুগ নামে অভিহিত। এ সময়টাকে সৈয়দ আলী আহসান ‘প্রায় শূন্যতার যুগ’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। আনিসুজ্জামান ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ক্রান্তিকাল বলেছেন। অবক্ষয়যুগ কবিওয়াল ও শায়ের এর যুগ নামেও খ্যাত। এ সময় কবিওয়াল ও শায়েরদের প্রসার ঘটে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদৌল্লার পরাজয়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ছিয়াত্তরের মন্বত্তর প্রভৃতি কারণে এ সময় কোনো সৃজনশীল সাহিত্য কর্ম সৃষ্টি হয় নি। এজন্য অনেকে এ সময়কে বাংলা সাহিত্যের অবক্ষয় যুগ বলে অভিহিত করেন।

error: Content is protected !!