বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

চতুর্দশ অধ্যায়
বিদ্রোহী কবি

নজরুলের পিতামাতা ও জন্মমৃত্যু
বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবী চেতনা, বিদ্রোহী সুর, অপরাজেয় দিকপাল ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার জামুরিয়া থানার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ নজরুলের পিতা মৃত্যুবরণ করেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের লেখকরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে নজরুল ইসলামকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
সাপ্তাহিক লাঙ্গল ও নজরুল
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে নজরুল ইসলাম কৃষক শ্রমিকদের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকাতে নজরুলের তিনটি বিখ্যাত কবিতা ‘সব্যসাচী’, ‘কৃষকের গান’ ও ‘সাম্যবাদী’ পরপর প্রকাশিত হয়।
মোসলেম ভারত পত্রিকা ও নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা
নজরুলের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার মাধ্যমে কবি হিসেবে নজরুলের প্রথম আত্মপ্রকাশ। কবিতা ছাড়াও নজরুল ইসলাম প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো গান লিখেছেন। চলচিত্রের জন্য তিনি ‘বিদ্যাপতি’ ও ‘সাপুড়ে’ নামক দুটি কাহিনী রচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কাব্যিক সম্পর্ক
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘গোরা’ অবলম্বনে নির্মিত ছায়াছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’(১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) নাটকটি উৎসর্গ করেছিলেন। নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংগ্রহ ‘সঞ্চিতা’ (১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ) রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। নজরুল আলিপুর জেলে থাকাকালীন ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন এবং পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে নজরুলের কাছে আলিপুর জেলে প্রেরণ করেন। নজরুল রবীন্দ্রনাথের এ উপহারে উল্লাসিত হয়ে ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি চয়ন করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট প্রকাশিত ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘ আয় চলে আয়রে ধুমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন’ আশীর্বাণীটি পাঠিয়েছিলেন। পত্রিকাটি সপ্তাহে দুইবার প্রকাশিত হত।
বিদ্রোহী কবি ও বুলবুল
নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বুলবুল বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রত্তোর যুগের আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবেও তিনি খ্যাত।
বাংলা সঙ্গীতের অণুবিশ্ব
নজরুল সঙ্গীতকে বাংলা সঙ্গীতের অণুবিশ্ব বলা হয়। তিনি আধুনিক বাংলা গানের পথিকৃৎ হিসেবেও খ্যাত।
লেটোদল ও নজরুল
বাংলা সাহিত্যে ইসলামি ঐতিহ্যের সার্থক ব্যবহারকারী নজরুল লেটো দল হতে গান রচনা শুরু করেন। লেটো জীবনই তাঁর কবিতা ও সঙ্গীত জীবনের শিক্ষানবিশীর কাল। লেটোদলে নজরুলের প্রথম সৃষ্টি ‘চাষার সঙ’।
সেনাবাহিনী ও নজরুল
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের শেষে প্রি-টেস্ট পরীক্ষার পর নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন।
নজরুলের প্রথম গল্প
‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ নজরুলের প্রকাশিত প্রথম গল্প। করাচি সেনানিবাসে থাকাকালীন তিনি গল্পটি লিখেন এবং প্রকাশের জন্য কলকাতায় প্রেরণ করেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জেষ্ঠ সংখ্যায় গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। অতএব জেলখানা হতে নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্য চর্চা শুরু।
নজরুলের প্রথম কবিতা
নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ এটি ‘ক্ষমা’ শিরোনামে পাঠানো হয়েছিল। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তি’ নাম দেয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য‘ পত্রিকায় শ্রাবণ ১৩২৬ সংখ্যায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ
১৯২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে কাজী নজরুল ইসলাম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে প্রথম রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য শান্তি নিকেতন যান।
নজরুলের প্রথম পত্রোপন্যাস ও গীতিনাট্য
নজরুলের প্রথম পত্রোপন্যাস ‘বাঁধনহারা’। এটি ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘ঝিলিমিলি’ নজরুল ইসলামের প্রথম গীতিনাট্য। গীতিনাট্যটি ‘নওরোজ’ পত্রিকায় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
নজরুলের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা
প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মুজফফর আহমদ ও নজরুলের যৌথ স¤পাদনায় ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই হতে সান্ধ্য দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত এ.কে ফজলুল হকের ‘নবযুগ’ পত্রিকার মাধ্যমে নজরুলের সাংবাদিক জীবন শুরু হয়।
নজরুলের গানের প্রথম সুরকার
ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেন গুপ্তা নজরুলের কিছু কবিতা প্রথম সুর দিয়ে স্বরলিপিসহ প্রকাশ করেন। নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গান ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন’ (বসন্ত-মোহিনী, দাদরা)। গানটি সওগাত পত্রিকায় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। নজরুলের গানের প্রথম সুরকার ছিলেন মোহিনী সেন গুপ্তা।
বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিতা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিতা হচ্ছে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। মাত্র ২২ বছর বয়সে কবিতাটি লিখে নজরুল যে খ্যাতি পেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসেও তাঁর কোনো নজির নেই। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে নজরুল সারাবিশ্বে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি রচনা করেন।
নজরুলের প্রথম গন্থ, প্রথম প্রবন্ধ ও প্রথম উপন্যাস
ব্যথার দান কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম গ্রন্থ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ পায়। ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ নজরুলের প্রথম প্রবন্ধ। ‘সওগাত’ পত্রিকায় কার্তিক ১৩২৮ বঙ্গাব্দে প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়। নজরুলের প্রথম উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’, প্রকাশ কাল ১৩৩৪। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাস (১৩২৭ বঙ্গাব্দ) হতে ‘বাাঁধনহারা’ উপন্যাস ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শরু হয়।
নজরুলের প্রথম সঙ্গীত গ্রন্থ
নজরুলের প্রথম সঙ্গীত গ্রন্থ ‘বুলবুল’-১ম খণ্ড। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
নজরুলের প্রথম প্রকাশিত নাটক
‘ঝিলিমিল’ নজরুলের প্রথম প্রকাশিত ‘নাটক’। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ‘পুতুলের বিয়ে’ নজরুল বিরচিত ও প্রকাশিত প্রথম ছোটদের নাটক। ১৩৪০ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে ‘পুতুলের বিয়ে’ প্রকাশিত হয়।
নজরুলের প্রথম গল্প গ্রন্থ ও প্রথম কবিতা গ্রন্থ
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ প্রকাশিত ‘ব্যথারদান’ নজরুলের প্রথম গল্প গ্রন্থ। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘যুগবাণী’। গ্রন্থটিা ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর প্রথম প্রকাশিত হয়।
নজরুলের প্রথম কাব্য গ্রন্থ বা কবিতা সংকলণ
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত কবিতা সংকলণ ‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম কবিতা গ্রন্থ। ছোটদের জন্য বিরচিত নজরুলের প্রথম কবিতা-গ্রন্থ ‘ঝিঙে ফুল’। গ্রন্থটি ১৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১ আষাঢ় প্রকাশিত ‘রুবাইয়াৎ- ই- হাফিজ’ নজরুলের প্রথম কাব্যানুবাদ।
নজরুলের প্রথম স্বরলিপি-গ্রন্থ
১৩৩৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে প্রকাশিত ‘নজরুল স্বরলিপি’ নামের গ্রন্থটি নজরুলের প্রথম স্বরলিপি গ্রন্থ। গ্রন্থের অন্তর্গত গানগুলোর স্বরলিপিকার ছিলেন নজরুল ইসলাম।
রেকর্ডে প্রথম নজরুল সঙ্গীত
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ও শিল্পী হরেন্দ্রনাথ দত্তের গাওয়া ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’ গানটি নজরুল ইসলামের রেকর্ড করা প্রথম নজরুল সঙ্গীত। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি নজরুলের রেকর্ডে বাজানো প্রথম ইসলামি সঙ্গীত।
নজরুলের স্বকন্ঠে রেকর্ড করা প্রথম সঙ্গীত, কবিতা ও রাগ
‘দিতে এলে ফুল হে প্রিয়’ গানটি নজরুলের স্বকন্ঠে রেকর্ড করা প্রথম গান। ‘নারী’ নজরুলের স্বকন্ঠে রেকর্ড করা প্রথম কবিতা এবং ‘বেণুকা’ নজরুল সৃষ্ট প্রথম রাগ।
প্রথম রেকর্ড নাট্য
‘ঈদুল ফেতর’ নজরুলের প্রথম রেকর্ড নাট্য। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে মনমোহন থিয়েটারের মাধ্যমে নজরুল প্রথম রঙ্গমঞ্চের সাথে যুক্ত হন।
প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা, প্রথম চলচ্চিত্র-কাহিনী ও অভিনয়
ম্যাডান থিয়েটার্সে নজরুল প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ‘বিদ্যাপতি’ (১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র কাহিনী। প্রহ্লাদ’ এ নারদের ভূমিকায় অভিনয় নজরুলের প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়।
প্রথম ভাষণ ও সম্বর্ধনা
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম এডুকেশন সোসাইটিতে প্রদত্ত ভাষণ নজরুলের জীবনে প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণ। কারামুক্তি উপলক্ষে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কবিকে প্রদত্ত সংবর্ধনা তাঁর জীবনের প্রথম সংবর্ধনা।
নজরুলের প্রথম পত্রিকা
‘ধুমকেতু’ নজরুলের প্রথম পত্রিকা। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট প্রকাশিত পত্রিকাটির জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘আয় চলে আয়রে ধুমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন’ আশীর্বাণীটি পাঠিয়েছিলেন।
‘ধুমকেতু’ এবং ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য গ্রেফতার
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর ধুমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামের একটি প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতার জন্য ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর ‘ধুমকেতু’ অফিসে পুলিশ হানা দেয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর নজরুলের প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘যুগবাণী’ বাজেয়াপ্ত করা হয়। ঐদিনই কুমিল্লা হতে নজরুলকে গ্রেফতার করে কলিকাতা পাঠিয়ে দেয়া হয়।
রাজবন্দীর জবানবন্দী
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কলকাতার চিপ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে শুনানীর সময় নজরুল তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে যে জবানবন্দী দিয়েছিলেন তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বিখ্যাত।
রায় ও বিচার
১৬ জানুয়ারি, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের বিরুদ্ধে আনীত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। উক্ত রায়ে নজরুলকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।
নজরুলের নিকট রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপহার
আলিপুর জেলে থাকাকালীন ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন এবং পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে নজরুলের কাছে আলিপুর জেলে প্রেরণ করেন। নজরুল রবীন্দ্রনাথের এ উপহারে উল্লাসিত হয়ে ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি চয়ন করেন।
বাংলা গজলের স্রষ্টা ও বাংলা সাহিত্যের প্রথম গজল
‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিস না আজি দোল’ গানটি নজরুলের প্রথম গজল। এটি বাংলা সাহিত্যের ও সঙ্গীতের ইতিহাসে প্রথম গজল হিসেবে খ্যাত। এ গানটি রচনার মাধ্যমে মাধ্যমে নজরুল বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে প্রথম গজলের প্রবর্তন করে গজলের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাত হয়ে আছেন।
জেলের কবিতা ও গান
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে হুগলী জেলে ‘এই শিকল পড়া ছল’ এবং বহরমপুর জেলে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ কবিতা ও গানটি রচনা করেন।
নজরুলের বিয়ে ও প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যোগদান
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল মিসেস এম রহমানের উদ্যোগে নজরুল ও প্রমীলার বিয়ে এবং হুগলীতে সংসার জীবন শুরু হয়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল প্রথম প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন।
প্রথম গান রেকর্ড
‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ কো¤পানী থেকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নজরুলের গান রেকর্ড করা হয়।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রচিত বলিষ্ঠতম সঙ্গীত, গণ সংগীতের সূচনা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত রচিত সঙ্গীতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বলিষ্ঠ এবং জনপ্রিয় সঙ্গীত হচ্ছে নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দীলিপকুমার রায় ও সহশিল্পীদের নিয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে প্রথম এ গানটি পরিবেশন করা হয়। ব্যতিক্রমী এ গানটি দিয়ে বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে গণসঙ্গীতের সূচনা ঘটে। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে গণসঙ্গীত সংযোজন করে নজরুল বাংলা গানে উদ্দীপনা সঞ্চারের মাধ্যমে বাংলা গানকে নবযৌবন দান করেন।
নজরুলের প্রথম রেকর্ড, প্রথম বেতার অনুষ্ঠান
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত স্বরচিত ‘নারী’ কবিতার আবৃতিই নজরুলের কন্ঠের প্রথম রেডিও রেকর্ড। বেতার হতে নজরুলের প্রথম অনুষ্ঠান ১২/১১/২৯ তারিখ সন্ধ্যায় প্রকাশিত হয়। স্বরচিত ‘নারী’কবিতার আবৃতি।
যুগপ্রবর্তক ও জাতীয় কবি উপাধি
১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘সাওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত কাব্য সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান প্রবন্ধে আবুল কালাম শামশুদ্দিন নজরুলকে ‘যুগপ্রবর্তক’ এবং ‘বাংলার জাতীয় কবি’ রূপে আখ্যায়িত করেন।
নজরুলের প্রথম ইসলামি গান ও তার শিল্পী
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটিই নজরুলের প্রথম ইসলামি গান। গানটির প্রথম গেয়েছিলেন আব্বাস উদ্দিন। হিজ মাস্টার্স ভয়েস হতে গানটি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে রেকর্ড করা হয়।
সাম্যবাদী গানের প্রবর্তক
‘বিদ্রোহী’ ও ‘বুলবুল’ কবি নজরুল বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের ইতিহাসে সাম্যবাদী গানের প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত।
কৃষাণ ও শ্রমিকের গান
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত ‘ উঠ্রে চাষী জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল’ এবং ‘ওরে ধ্বংস পথের যাত্রদল, ধর হাতুড়ি তোল কাধে শাবল’ গানদ্বয় বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে কৃষাণ এবং শ্রমিকের গান হিসেবে খ্যাত। গানদ্বয় কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত মজুর স্বরাজ পার্টির (বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল) সম্মেলনে পরিবেশন করা হয়।
নজরুলের অসুখ
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাস হতে নজরুলের অসুস্থতা দেখা দেয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঐ বছর ১৯ জুলাই তিনি মধুপুর গমন করেন এবং ৭ অক্টোবর কলকাতায় লম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন কিন্তু চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। রোগের অবনতি ঘটতে থাকে।
নজরুলকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে আনয়ন
ভারত সরকারের নিকট প্রার্থিত অনুমতি অনুমোদিত হওয়ার পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আত্নীয়স্বজনসহ স্থায়ীভাবে নজরুলকে বাংলাদেশে আনা হয়।
নজরুলের উপস্থিতিতে প্রথম নজরুল জয়ন্তী
বাংলাদেশে আসার পরদিন অর্থাৎ ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে কবির ৭৩-তম জন্মদিনে বাংলাদেশে নজরুলের উপস্থিতিতে প্রথম মহাসমারোহে ‘নজরুল জয়ন্তী’ উদযাপন করা হয়।
নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডি.লিট ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান
১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
রণসঙ্গীত ঘোষণা
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে জিয়াউর রহমান নজরুলকে বাংলদেশ সেনাবাহিনীর ‘আর্মিক্রেস্ট’ উপহার প্রদান করেন এবং ‘চল চল চল’ গানটিকে বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে ঘোষণা করেন।
মৃত্যু
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট, সকাল ১০টা ১০ মিনিটের সময় পি.জি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কক্ষে নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। কবি নজরুল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন হতে ১ বছর ১ মাস ৮ দিন পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুর দিন বিকেল ৫টায় তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
নজরুলের শবাধার বহনকারী
বাংলাদেশের তদকালীন রাষ্ট্রপতি সায়েম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম.এইচ.খান, বিমান বাহিনী প্রধান এ.জি মাহমুদ এবং বাংলাদেশ রাইফেলস্ এর তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল দস্তগীর নজরুলের শবধার বহন করেন।
নজরুলের নারী জাগরণমূলক প্রথম কবিতা
‘অগ্নিবীণা’য় প্রকাশিত ‘রক্তাম্বরধারিনী মা’ শীর্ষক কবিতাটি নজরুলের নারী জাগরণমূলক প্রথম কবিতা।

error: Content is protected !!