বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

অষ্টাদশ অধ্যায়
নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প

নাটকের সংজ্ঞা
নাটক সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। ‘নট’ ধাতু হতে ‘নাটক’ শব্দের উৎপত্তি। ‘নট’ অর্থ নৃত্ত। সাহিত্যের যে শাখা রঙ্গমঞ্চের মাধ্যমে দৃশ্য ও কাব্যের সাহায্যে চলমান মানব জীবনের প্রতিচ্ছবি দর্শকের সামনে মূর্ত করে জীবনের প্রতিফলন ঘটায় তাকে ‘নাটক’ বলে। কাহিনী, চরিত্র, ঘটনা সমাবেশ এবং সংলাপ নাটকের মূল চারটি অঙ্গ।
প্রথম নাট্যশালা বা রঙ্গালয়/ বাংলা নাটকের প্রথম অভিনয়
হিরোশিম লেবেডফ নামক রুশ দেশীয় একজন ভদ্রলোক ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর কলিকাতায় ‘বেঙ্গল থিয়েটার’ নামে একটি নাট্যশালা বা রঙ্গালয় স্থাপন করেন। এটি বাংলা নাটকের ইতিহাসের প্রথম নাট্যশালা বা রঙ্গালয়। এ নাট্যশালায় হিরোশিম লেবেডফ ‘ঞযব উরংমঁরংব’এবং ‘খড়াব রং ঃযব ইবংঃ উড়পঃড়ৎ’ নামে দুখানি নাটক বাংলায় ভাষান্তরিত করে এদেশীয় পাত্র-পাত্রীদের দ্বারা অভিনয় করিয়েছিলেন। এরপর আগুন্তুক লেবেডফ হঠাৎ করে নিজ দেশে চলে যান।
হিন্দু থিয়েটার ও বাংলা নাটকের সূত্রপাত
১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রসন্নকুমার ঠাকুর কলকাতায় ‘হিন্দু থিয়েটার’ নাম দিয়ে বাংলা নাট্যাভিনয়ের উপযোগী একটি রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। এ রঙ্গমঞ্চে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিদ্যাসুন্দর অংশের নাট্যরূপ প্রথম অভিনীত হয়েছিল। এ নাট্যশালা এবং মঞ্চস্থ নাটক হতে বাংলা নাটকের সূত্রপাত। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ রঙ্গমঞ্চ বা পাবলিক থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে অনেকগুলো শখের নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মৌলিক নাটক রচনার সূত্রপাত ও বাংলা নাটকের আদি নিদর্শন
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে মৌলিক নাটক রচনার সূত্রপাত ঘটে। যোগেশচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস’, তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’ ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। নাটক ও সাহিত্য বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলা নাটকের আদি নিদর্শন হচেছ ‘বাসব দত্তা’।
বাংলা ভাষায় অভিনীত প্রথম নাটক
বৈদ্য নন্দন কুমার রচিত ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলা’ বাংলা ভাষার অভিনীত প্রথম বাংলা নাটক। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে নাটকটি প্রকাশিত হয় এবং ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি সিমলার আশুতোষ দেব বা সতু বাবুর বাড়িতে প্রথম অভিনীত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাটক
বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাটক বলতে গবেষকেরা রামনারায়ন তর্করত্নের লেখা ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ কে আখ্যায়িত করেছেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম সার্থক নাট্যকার। পুরাণ কাহিনী নিয়ে রচিত ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘শর্মিষ্ঠা’ মধুসূদনের প্রথম নাটক। তাঁর অন্যান্য নাটকের মধ্যে পৌরণিক কাহিনী নিয়ে রচিত ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ), ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত ‘কৃষ্ণকুমারী’, সামাজিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) এবং প্রহসন নাটক ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ)।
অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহৃত প্রথম নাটক
‘পদ্মাবতী’ নাটকে মাইকেল মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। সুতরাং পদ্মাবতী নাটকে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহৃত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সর্বাধিক জনপ্রিয় নাটক
দীনবন্ধু মিত্র রচিত ও ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নীলদর্পণ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সর্বাধিক জনপ্রিয় নাটক। নাটকটি বেনামীতে মুদ্রিত হয়েছিল। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে রচিত নাটকটি প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘নবীন তপস্বিনী’ দীনবন্ধু মিত্রের দ্বিতীয় নাটক এবং ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘কমলে কামিনী’তাঁর শেষ নাটক।
বাংলা নাটকের সমৃদ্ধি ও পুরোধা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা নাটকের ইতিহাসে বাংলা নাটকের সমৃদ্ধি নামে খ্যাত। তিনি পঁচাত্তরটি সমাপ্ত, ৪ খানা অসমাপ্ত নাটক ও বহু প্রহসন রচনা করেছেন। গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাংলা নাটকের পুরোধা হিসেবেও খ্যাত।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি ও ঐতিহাসিক নাটক
মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘কৃষ্ণকুমারী’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি বা বিয়োগান্তক নাটক। মাইকেল মধুসূদন রচিত ‘কৃষ্ণকুমারী’ বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে খ্যাত।
পাশ্চাত্য রীতিতে লেখা প্রথম বাংলা নাটক
তারাচাঁদ সিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’ পাশ্চাত্য রীতিতে লেখা প্রথম বাংলা নাটক। ‘ভদ্রার্জুণ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাংলা নাটক, যেখানে কাহিনীর সুসংহত গতি, নাটকীয় কৌতুহল ও সাবলীল সংলাপ দেখা যায়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম রাজনীতিক নাট্যকার
বাংলা সাহিত্যের প্রথম রাজনৈতিক নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে রাজনীতিক নাটক রচনার সূত্রপাত ঘটান। ‘নীল দর্পণ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম রাজনীতিক নাটক।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিয়োগান্তক নাটক
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিয়োগান্তক নাটক যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তি বিলাস’। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এ নাটকটি বিয়োগান্ত নাটক রচনার প্রথম প্রয়াস হিসেবে খ্যাত।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক নাট্যকার
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। ‘তারাবাঈ’ তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক নাটক। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে হরচন্দ্র ঘোষ সেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ এর ভাবানুবাদে ‘ভানুমতি চিত্তবিলাস’ নাটকটি রচনা করেন।
বাংলা সাহিত্যে মুসলমান রচিত প্রথম সামাজিক নক্সা
১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গোলাম হোসেন রচিত ‘হাড়জ্বালানী’ বাংলা সাহিত্যে কোনো মুসলমান নাট্যকার রচিত প্রথম সামাজিক নক্সা।
মৌলিক নাটক রচনার সূত্রপাত
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মৌলিক নাটক রচনার সূত্রপাত ঘটে ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে। এ বছর যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস’ এবং তারাচরণ সিকদারের ‘ভদ্রার্জুণ’ প্রকাশিত হয়। ‘ভদ্রার্জুণ’ (১৮৫২ খ্রিস্টাব্দ) ইংরেজি ও সংস্কৃতের যুক্ত আদর্শে রচিত প্রথম মৌলিক মধুরান্তিক বাংলা নাটক।
বাংলা সাহিত্যে অনুদিত প্রথম নাটক
সেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ অবলম্বনে রচিত ও ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হরচন্দ্র ঘোষের ‘ভানুমতি চিত্তবিলাস’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম অনুদিত নাটক। এ নাটকটির মাধ্যমে বাংলা নাটকের ইতিহাসে অনুবাদ নাটকের সূত্রপাত ঘটে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক নাটক
রামনারায়ণ তর্করত্ন (১৮২২-১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ) লিখিত এবং ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ বাংলা নাটকের ইতিহাসের প্রথম সামাজিক নাটক। কৌলিন্যপ্রথার দোষ নির্দেশক এ নাটকটি তৎকালে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
সমকালীন সামাজিক দুর্নীতির উপর কটাক্ষপাত করে লিখিত প্রথম নাটক
রামনারায়ন তর্করত্নের (১৮২২-১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ) ‘নবনাটক’ সমকালীন সামাজিক দুর্নীতির প্রতি কটাক্ষপাত করে রচিত প্রথম নাটক। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এ নাটকটি রামনারায়ন তর্করত্নের লেখা শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে স্বীকৃত।
প্রথম মুসলমান নাট্যকার
মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২খ্রিস্টাব্দ) রচিত এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বসন্তকুমারী’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলমান লিখিত প্রথম বাংলা নাটক। মীর মশাররফ হোসেনকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নাট্যকার বলা হয়। তাঁর মোট নাটক চারটি। বাকি তিনটি হল- ‘জমিদার দর্পণ’(১৮৭৩), ‘বেহুলা গীতাভিনয়’ এবং ‘টালা অভিনয়’। ‘এর উপায় কি’, ‘ভাই ভাই এইতো চাই’, ‘ফাঁস কাগজ’ এবং ‘একি’ মীর মশাররফ হোসেন লিখিত চারটি প্রহসন।
মুসলমান চরিত্র অবলম্বনে রচিত প্রথম বাংলা নাটক
মীর মশাররফ হোসেন রচিত এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘জমিদার দর্পণ’ বাংলা নাটকের ইতিহাসে মুসলমান চরিত্রাবলম্বনে লেখা প্রথম বাংলা নাটক।
বাংলার প্রথম মঞ্চ নাটক
১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর কলিকাতার হিরোসিম লিয়েবেদফ ‘ছদ্মবেশী’ নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। এটিই বাংলা নাটকের ইতিহাসে মঞ্চস্থ প্রথম নাটক।
বাংলার প্রথম নাট্যশালা
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল থিয়েটার ’ বাংলা নাটকের ইতিহাসের প্রথম নাট্যশালা। এ নাট্যশালায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম দীনবন্ধু মিত্রের বিখ্যাত নাটক ‘নীলদর্পণ’ অভিনীত হয়।
প্রথম চলচ্চিত্র/বাংলা চলচ্চিত্রের জনক
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল বাংলা চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল সেন কলিকাতার ক্লাসিক্যাল থিয়েটারে প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন।
অমিত্রাক্ষর ছন্দে মুসলমান রচিত প্রথম নাটক
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘নৌফেল ও হাতেম’ বাংলা নাটকের ইতিহাসে কোনো মুসলমান দ্বারা অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত একমাত্র নাটক। এটি একটি কাব্য-নাটক। মুসলমান নাট্যকারদের মধ্যে কবি ফররুখ আহমদ অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রথম নাটক রচনা করেন।
নাটক ও পল্লী কবি জসীম উদ্দিন (১৯০৩-১৯৭৬)
জসীম উদদীনের প্রথম নাটক ‘পদ্মাপার’। ‘পদ্মাপার’, ‘বেদের মেয়ে’ এবং ‘মধুমালা’ তাঁর তিনটি জনপ্রিয় গীতিনাট্য।
রক্তাক্ত প্রান্তর
‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ মুনীর চৌধুরীর (১৯৫২-১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ) একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক নাটক। মহাকবি কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ কাব্যে বিধৃত কাহিনী অবলম্বনে মুনীর চৌধুরী এ নাটকটি রচনা করেন। এটি মুনীর চৌধুরীর প্রথম নাটক। ‘চিঠি’ মুনীর চৌধুরীর আরেকটি বিখ্যাত নাটক। ছাত্র আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত এ নাটকটি ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
ছোট গল্পের আভাস
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘যুগলাঙ্গুরীয়, (১৮৭৪) ও ‘রাধারাণী’ (১৮৭৫) গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে ছোট গল্পের প্রথম আভাস ও প্রয়াস দেখা যায়। আকৃতিতে ছোট হলেও গ্রন্থদ্বয় ছিল উপন্যাসধর্মী। এ সময় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মধুমতী’ এবং সঞ্জীবচন্দ্রের ‘রামেশ্বরের অদৃষ্ট’ ও ‘দামিনী’ প্রভৃতি গল্পজাতীয় রচনা প্রকাশিত হলেও তাতে উপন্যাসের লক্ষণই বেশি পরিদৃষ্ট হয়েছিল।
প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ
স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ) লিখিত গল্পগ্রন্থ ‘নবকাহিনী’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘ভিখারিনী’ ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম সার্থক ছোটগল্প ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘হিতবাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দেনাপাওনা’। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্প।
জাতীয় নাট্যশালা
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘নাট্যশালা থিয়েটার’ বাংলা নাটকের ইতিহাসে জাতীয় নাট্যশালা নামে খ্যাত। এ নাট্যশালায় প্রথম যে নাটকটি অভিনীত হয়েছিল সেটি হচ্ছে দীনবন্ধু মিত্রের বিখ্যাত নাটক নীলদর্পণ।
প্রথম অনুদিত নাটক
সেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিস অবলম্বনে রচিত ও ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হরশচন্দ্র ঘোষের ‘ভানুমতি চিত্তবিলাস’ বাংলা ভাষায় অনুদিত প্রথম নাটক।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিয়োগাত্বক নাটক
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত যোগেশচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তি বিলাস’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিয়োগাত্বক নাটক।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার
মাইকেল মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার।

কয়েকজন নাট্যকারের প্রথম নাটক
আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম নাটক ‘মায়াবী প্রহর’ (১৩৬৯বাং), সিকানদর আবু জাফর (১৯১৯-১৯৯৭) রচিত প্রথম নাটক ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’, সেলিম আল দী এর প্রথম নাটক ‘ সর্পবিষয়ক গল্প ও অন্যান্য নাটক’ (১৯৭৩)।
উপন্যাস, ছোট গল্প ও প্রবন্ধ
উপন্যাসের প্রাথমিক প্রয়াস ও প্রকারভেদ
ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত এ দেশীয় সমাজের ব্যঙ্গাত্বক চিত্র প্রকাশক গ্রন্থগুলো বাংলা উপন্যাসের প্রাথমিক প্রয়াস এবং বাংলা উপন্যাসের সূচনাকারী ইঙ্গিত হিসেবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যে রচিত উপন্যাসের মধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, হাস্যরসপ্রধান উপন্যাস, কাব্যধর্মী উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, পত্রোপন্যাস, সমস্যাপ্রধান উপন্যাস, রোমাঞ্চকর উপন্যাস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
বাংলা উপন্যাসের আভাস
ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় (১৭৮৭- ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ) স¤পাদিত ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ পত্রিকার মাধ্যমে অঙ্কিত তৎকালীন উচ্ছৃঙ্খল সমাজের বিবরণের মাধ্যমে বাংলা উপন্যাসের আভাস পাওয়া যায়। ভবানীচরণের ‘কলিকাতা কমলালয়’(১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ), ‘নববাবু বিলাস’ (১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ) ও ‘নববিবি বিলাস’ (১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ) এবং ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ (১৮৫৬-৫৭ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস সৃষ্টির আভাস হিসেবে আখ্যায়িত। অনেকে ভবানীচরণের ‘নববাবু বিলাস’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বলে থাকেন। উল্লেখ্য ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় প্রমথনাথ শর্মা ছদ্মনামে উপন্যাসগুলো লিখেছিলেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে পুস্তকারে মুদ্রিত ও প্রকাশিত প্যারীচাদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা সাহিত্যে বাংলা ভাষায় লিখিত প্রথম উপন্যাস। এ উপন্যাসটি প্রকাশের এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, প্রমথ চৌধুরীর ভাষা তাঁর ছদ্মনাম অনুসারে ‘আলালী বাংলা’ হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। ইংরেজ মহিলা হ্যানরি ক্যাথরিন ম্যালেন্স (১৮২৬-১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ উপন্যাসটি আলালের ঘরের দুলালের ছয় বছর পূর্বে (১৮৫২ খ্রি.) প্রকাশিত হয়। সে বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ‘। কিন্তু এ গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচার। তাই গবেষকেরা ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এটিই কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস কোন্টি? এ প্রশ্রের উত্তরে কেউ যদি লিখেন যে, ‘ফুলমনি ও করুণার বিবরণ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস, তাহলে কিন্তু উত্তরটি সঠিক বলে বিবেচিত হবে। ভবানী চরণের ‘নববাবু বিলাস’ কিংবা আলালের ঘরের দুলাল বললে কি ভুল হবে? উল্লিখিত তিনটি গ্রন্থের মধ্যে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের সর্বাধিক লক্ষণ বিশিষ্ট উপন্যাস। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) অনুরূপ দ্বিতীয় প্রয়াস।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি গ্র্যাজুয়েট ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এবং ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাঙলা সাহিত্যের উপন্যাসের ইতিহাসে সার্থক উপন্যাসের ধারা সৃষ্টির সূত্রপাত। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘জঅঔগঙঐঅঘ’ঝ ডওঋঊ’ (১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ)। দুর্গেশনন্দিনীকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উৎকৃষ্ট উপন্যাসও বলা হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক উপন্যাস
১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক উপন্যাস।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জেষ্ঠা ভগিনী স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। হাজী মুহম্মদ মহসীনের জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত হুগলীর ইমাম বাড়ি তাঁর অন্যতম একটি উপন্যাস। এ উপন্যাসটি হিন্দু ঔপন্যাসিক কর্তৃক মুসলিম মনীষীর জীবনী অবলম্বনে রচিত প্রথম উপন্যাস হিসেবেও খ্যাত। অনুরূপা দেবী (১১৮১-১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় মহিলা ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পোষ্যপুত্র’। উল্লেখ্য তিনি ২৫টি উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সচেতন শিল্পী বলা হয়।
বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস
১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘সীতারাম’ বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস। আনন্দমঠ, মৃণালিনী ও সীতারাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনীতিক উপন্যাস। আনন্দমঠ উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি ভারতের জাতীয় সংগীত। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ২২ বছরের সাহিত্য জীবনে ১৪ টি উপন্যাস রচনা করেছেন।
বাংলা উপন্যাসের জনক
বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয়। তাঁর স¤পাদনায় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বঙ্গদর্শন’ বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা। এ পত্রিকাতেই ১৩১২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যঙ্গাত্বক উপন্যাস
প্রহসন রচয়িতা ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (১৮৪৯-১৯১১খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘কল্পতরু’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যঙ্গাত্বক উপন্যাস।
রোমান্সধর্মী প্রথম সার্থক উপন্যাস
১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী বাংলা সাহিত্যের রোমান্সধর্মী প্রথম সার্থক উপন্যাস।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনধারার পরিচায়ক
১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবন ধারার পরিচায়ক এর উপর রচিত প্রথম উপন্যাস। এটি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবেও খ্যাত।
বাংলা সাহিত্যের গ্রাম ও বাস্তব জীবনভিত্তিক প্রথম সামাজিক উপন্যাস
১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তারাকানাথ বন্দোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রচিত গ্রাম ও বাস্তব জীবনভিত্তিক প্রথম সামাজিক উপন্যাস।
পুরোপুরি বাস্তব কাহিনী নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস
১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৮৪৩-১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ) ‘স্বর্ণলতা’ পুরোপুরি বাস্তব কাহিনী নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস। ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ এর মতে ‘স্বর্ণলতা’ বাংলা সাহিত্যের একমাত্র খাঁটি উপন্যাস। স্বদেশ ও স্বসমাজ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে তারকনাথ প্রথম বাংলা ভাষায় সামাজিক এ উপন্যাসটি রচনা করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস/বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম উপন্যাস
ভূদেব মুখোপাধ্যায় রচিত ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস নামে খ্যাত। এতে ‘সফলস্বপ্ন’ এবং ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ নামক দুটি আখ্যান রয়েছে। বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সুবৃহৎ উপন্যাসের সূচনা ঘটে।
শরৎচন্দ্রের শেষ উপন্যাস
‘শেষের পরিচয়’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ উপন্যাস, তবে উপন্যাসটি তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি। তাঁর মৃত্যুর পর শ্রীযুক্ত রাধারাণী দেবী উপন্যাসটি সমাপ্ত করেন।

অরণ্য নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস
অরণ্য নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ‘বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’।
কয়েকজন লেখকের প্রথম উপন্যাস
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘জননী’, শওকত ওসমানের প্রথম উপন্যস ‘ক্রীতদাসের হাসি’। শওকত ওসমানের আসল নাম শেখ আজিজুর রহমান। মাহবুবুল আলমের প্রথম উপন্যাস ‘মোমেনের জবানবন্দী’, আবু রুশদ এর প্রথম উপন্যাস ‘এলোমেলো’, দিলারা হাশেমের প্রথম উপন্যাস ‘ঘর মন জানালা‘। নীলিমা ইব্রাহীমের প্রথম উপন্যাস ‘বিশ শতকের মেয়ে’, সৈয়দ ওয়ালী উল্লার প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’, সত্যেন সেনের প্রথম উপন্যাস ‘ভোরের বিহঙ্গী’, আকবর হোসেনের প্রথম উপন্যাস ‘অবাঞ্চিত’। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’, জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, রাহাত খানের প্রথম উপন্যাস ‘অমল ধবল চকরী’,রশীদ করিমের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তম পুরুষ’, আবুল হাসনাতের প্রথম উপন্যাস ‘বিহঙ্গ মন’।
শওকত আলীর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’, সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম উপন্যাস ‘এক মহিলার ছবি’, আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রথম উপন্যাস ‘শর্মিষ্ঠা’, আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, আবু জাফর শামশুদ্দিনের প্রথম উপন্যাস ‘মুক্তি’। শামশুদ্দিন আবুল কালামের প্রথম উপন্যাস ‘কাশবনের কন্যা’। সরদার জয়েন উদ্দিনের প্রথম উপন্যাস ‘আদিগন্ত’, বন্দে আলী মিয়ার প্রথম উপন্যাস ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’। আনোয়ার পাশার প্রথম উপন্যাস ‘নীড় সন্ধানী’। শহীদ আখন্দের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তর সারথি’। রাজিয়া খানের প্রথম উপন্যাস ‘বটতলার উপন্যাস’। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘রমা সুন্দরী’।
ছোটগল্প
ইউরোপে প্রথম ছোট গল্পের উদ্ভব হয়। ইতালিতে রেঁনেসার যুগে প্রথম ছোট গল্পের প্রচলন হয়। ইতালীয় সাহিত্যে বোক্কাচিত্তর ‘উধপধসবৎড়হদ, ইংরেজি সাহিত্যে চসার এর ‘ঈধহঃবৎনঁৎুদং ঞধষবং’ এবং গ্রিক সাহিত্যে ‘অবংড়ঢ়দং ঋধনষবং ’ ছোট গল্পের আদি নিদর্শন। রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পের জনক বলা হয়। কারণ তাঁর পূর্বে বাংলা সাহিত্যের অন্যকোন লেখক যথার্থ ছোটগল্প রচনা করতে পারেন নি। রবীন্দ্রনাথের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে যে সকল লৌকিক ও ঐতিহাসিক গল্প প্রচলিত ছিল সেগুলো হচ্ছে রামরাম বসু রচিত ‘লিপিমালা’(১৮০২), উইলিয়াম কেরির ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১৫), এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’। তবে এগুলোর কোনোটিকে আদর্শ ছোটগল্প বলা যায় না। প্রাক-রবীন্দ্র যুগে বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ দ্বিতীয় ভাগের শেষে সংযোজিত ‘ভুবনের’ কাহিনীটি ছোটগল্পের প্রথম উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ডঃ সুকুমার সেন এটিকে বাংলা সাহিত্যের মৌলিক ছোটগল্পের উৎকৃষ্ট আদি নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শশিচন্দ্রের ভারত-ইতিহাস কাহিনী অবলম্বনে রচিত এবং ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘টেলস অব ইয়োর’ গল্পগ্রন্থটি ভারতীয় রচিত প্রথম ইংরেজি গল্পগ্রন্থ হিসেবে খ্যাত। সমালোচক সুধীর রায় চৌধুরীর মতে পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মধুমতি’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প। বাল্যকালে রচিত ‘ভিখারিণী’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্প। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সার্থক ছোটগল্প ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’।
কয়েকজন লেখকের প্রথম ছোট গল্প গ্রন্থ
মাহবুবুল আলম এর প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘তাজিয়া’। আবুল মনসুর আহমদের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘আয়না’ ও ‘ফুড কনফারেন্স’। আবুল ফজলের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মাটির পৃথিবী’। শওকত ওসমানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পিঁজরা পোল’ (১৯৪৮)। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়নচারা’, ছাত্রবস্থায় ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত। আবু জাফর শামসুদ্দিনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জীবন’ (১৯৪৮)। ‘শাহের বানু’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রথম গল্পগ্রন্থ। শাহেদ আলীর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জিবরাইলের ডানা’ (১৯৫৩), ‘শাড়ী বাড়ী গাড়ী’ (১৯৬৩) আবু রুশদের প্রথম গল্পগ্রন্থ। আশরাফ সিদ্দিকীর ১ম গল্পগ্রন্থ ‘রাবেয়া আপা’ (১৯৫৫)। সরদার জয়েন উদ্দিনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ান ঢুলি’ (১৯৫২)। জহির রায়হানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ (১৯৫৫)। আবদুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ ও আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রথম গল্পগ্রন্থ যথাক্রমে ‘রোকেয়ার নিজের বাড়ী’ (১৯৬৭), ‘জেগে আছি’ এবং ‘কৃষ্ণপক্ষ’। বোরহান উদ্দিন জাহাঙ্গীর, শহীদ সাবের ও রাহাত খানের প্রথম গল্পগ্রন্থ যথাক্রমে ‘অবিচিছন্ন’, ‘এক টুকরো মেঘ’ (১৯৪৪) ও ‘অনিশ্চিত লোকালয়’(১৯৭২)। হাসনাত আবদুল হাই, হাসান আজিজুল হক এবং আল মাহমুদের প্রথম গল্পগ্রন্থ যথাক্রমে ‘একা এবং একসঙ্গে’ (১৯৭৭), ‘সমুদ্রের স্বপ্ন’ (১৯৬৪) এবং ‘পানকৌড়ির রক্ত’ (১৯৭৫)। আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দিনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘শালবনের রাজা’ (১৯৮০)। আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাস’ (১৯৬৮) এবং রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’ (১৯৬৭)।
প্রবন্ধ
প্রকৃষ্টরূপে বন্ধনযুক্ত রচনাকে প্রবন্ধ বলা হয়। কথাসাহিত্যের আওতাবহির্ভূত যুক্তি নির্ভর সকল প্রকার রচনা প্রবন্ধ। মুসলমান লেখকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ
ফোর্ড উইলিয়াম কলেজের ইংরেজ শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহারের জন্য ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত বেদান্ত চন্দ্রিকা বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ।
পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রাজা রামমোহন রায়ের লেখা গ্রন্থ ‘বেদান্ত’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে তিনিই প্রথম গদ্যের প্রচলন করেন। তাঁকে ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক-মানুষ বলা হয়। রাজা রামমোহন রায় ফারসি ভাষায় ‘আখবার’ নামের একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

error: Content is protected !!