বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

ঊনবিংশ অধ্যায়
ভাষা আন্দোলন : সূচনা হতে পরিণতি

জনগণের মুখের ভাষায় রচিত প্রথম পুস্তক
খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর পূর্বে গৌতম বুদ্ধ জনগণের মুখের ভাষায় প্রথম পুস্তক ‘ত্রিপিটক’ রচনা করেন। গৌতম বুদ্ধ মাতৃভাষায় ‘ত্রিপিটক’ গ্রন্থটি রচনা করে পৃথিবীতে প্রথম মাতৃভাষায় কদর প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলা ভাষার জননী পালিকে অকাল মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা করে বাংলা ভাষা সৃষ্টির পথ সুগম ও নিশ্চিত করেন।
বাংলা ভাষার প্রথম রাজভিষেক
বঙ্গদেশে তুর্কি শাসন শুরু হওয়ার পর অবহেলিত বাংলা ভাষা প্রথম রাজ দরবারে ঠাই পাওয়ার সুযোগ পায়। মুসলমান তুর্কি শাসকেরা অবহেলিত বাংলা ভাষাকে পথ হতে কুড়িয়ে এনে সাধারণ লোকের ভাষা হিসেবে সসম্মানে রাজ দরবারে ঠাই দেন। তুর্কিদের হাতে পথের ভাষা বাংলা পথের সঙ্গে সঙ্গে রাজ দরবারেও সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পথ ও প্রসাদ দুটোই বাংলা ভাষার আয়ত্তে চলে আসে।
মাতৃভাষা চর্চার প্রথম বেসরকারি প্রচেষ্টা
প্রাচীনকালে বৌদ্ধ বিহারে এবং মধ্যযুগে মোগল আমলে পাঠশালায় বাংলাভাষা চর্চার জন্য বেসরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হত। ১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ গবেষক মিস্টার ওয়ার্ড লিখেছেন, বাংলার প্রায় সকল গ্রামে লেখা-পড়া এবং গণিতবিদ্যা শেখানোর পাঠশালা ছিল। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি বাংলা শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের রীতিমত আন্দোলনের চেয়েও নিবিড় কার্যক্রম শুরু করেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মাত্র সতের বছরে উইলিয়াম কেরি ও তাঁর বন্ধুদের প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুর মিশনের চারপাশে ৪৫ টি পাঠশালা গড়ে উঠে। অনুমান দুই হাজার শিক্ষার্থী পাঠশালাগুলোতে বিদ্যা শিক্ষা করত। একই সাথে পাদরি রবার্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্ব-উদ্ভাবিত প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে এ ধরণের পাঠশালার সংখ্যা ৩৬ ছড়িয়ে যায়। যাতে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছিল। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি হতে বাংলা পাঠশালার কাজ শুরু হয়।
পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যা
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে পাকিস্তানের মোট ছয় কোটি নব্বই লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে চার কোটি চলি¬শ লক্ষ ছিল বাংলা ভাষাভাষী। পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বালুচি, উর্দু, পশতু, ব্রাহুই, কাশ্মীরি ভাষাভাষীদের মোট সংখ্যার চেয়ে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যা বেশি ছিল। তবু পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা না করার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল।
বাংলা ভাষা চর্চার প্রথম সরকারি স্বীকৃতি
১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে বাংলা ভাষায় অধ্যয়ন সরকারিভাবে স্বীকৃত ছিল না। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর বঙ্গ-বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন প্রথমবারের মতো বৃটিশ সরকার স্বীকৃতি দেয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ সমগ্র বাংলা তথা বঙ্গদেশ, বিহার ও উড়িষ্যায় ১০১ টি আদর্শ বাংলা পাঠশালা স্থাপনের ব্যবস্থা নেন। এ লক্ষ্যে ১০১ জন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ লোকের শিক্ষার জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল মাত্র আট হাজার টাকা। যা তৎকালে একজন কালেক্টরের বার্ষিক বেতনের এক তৃতীয়াংশ। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বাংলা শিক্ষা পরিকল্পনা’ অনুযায়ী বাংলার ছোট লাট হ্যালিডে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায় সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রয়াস নেন। তিনি ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি মিস্টার ইডেনকে একটি পত্রের মাধ্যমে বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু ও উন্নয়নের আবেদন জানান।
প্রথম শিক্ষা কমিশন
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি বৃটিশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে হান্টার কমিশন গঠন করেন। এ কমিশনের প্রধান কাজ ছিল ভারতবর্ষে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ও প্রসারের জন্য একটি সুপারিশমালা তৈরী। হান্টার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৮৮৩-১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের আইন সভায় ‘জনহিতকর আইন’ এর অনুবলে সরকারি আওতা হতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবমুক্ত করে স্থানীয় সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়। একই সাথে রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ‘শিক্ষা বোর্ড’ গঠন করে প্রাথমিক শিক্ষার যাবতীয় কার্যক্রম ও সর্বময় কর্তৃত্ব শিক্ষাবোর্ডের উপর ন্যস্ত করে।
বৃটিশ আমলে বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা
১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস ‘কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা’ এবং ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে জোনাথন ডানকান কাশিতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটির কোনোটিতে ভারতীয়দের কোনো মাতৃভাষায় শিক্ষা চর্চার সুযোগ ছিল না। ধর্মীয় সহানুভূতি আদায়ের আড়ালে দেশের জনগণকে আধুনিক ভাষা ও শিক্ষা হতে বঞ্চিত রেখে কতিপয় অভিজাত শ্রেণী সৃষ্টি করে ভারতকে নিরাপদে শোষণ করে যাওয়ায় ছিল বৃটিশদের লক্ষ্য। উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত দেশীয় ভাষা থাকা স্বত্ত্বেও সংস্কৃত কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে বৃটিশরা বাংলা ভাষার সু¯পষ্ট অবেহলা প্রদর্শন করে। এটি হচেছ বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার তৃতীয় প্রয়াস।
লাহোর প্রস্তাব ও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দাবি
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগে’র অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব (পাকিস্তান প্রস্তাব) গৃহীত হবার পরপরই ঢাকা এবং কলিকাতার বুদ্ধিজীবী, লেখক ও চিন্তাবিদরা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকার স¤পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মুজিবর রহমান খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ পাকিস্তান অংশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে জোর দাবি তুলেন। বাংলা ভাষার ইতিহাসে এটাকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দাবির প্রথম প্রয়াস হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সংঘটন
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ঢাকায় ‘গণ আজাদী লীগ’ বা ‘পিপল্স ফ্রিডম লীগ’ নামক একটি সংঘটন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। সংঘটনটির আহবায়ক ছিলেন কমরুদ্দিন আহমদ। মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজ উদ্দিন আহমদ প্রমূখ বামপন্থী প্রগতিবাদী নেতারা ‘গণ আজাদী লীগে’র সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘গণ আজাদী লীগে’র নাম পরিবর্তন করে ‘সিভিল লির্বার্টিস লীগ’ রাখা হয়। কমরুদ্দিন আহমদের মতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের শেষদিকে তাঁর বাসায় অনুষ্ঠিত একটি সভায় ‘গণ আজাদী লীগ’ বা ‘পিপল্স ফ্রিডম লীগ’ গঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ‘গণ আজাদী লীগে’র প্রথম ম্যানিফেস্টো প্রকাশ হয়। ‘গণ আজাদী লীগে’র ঘোষণায়, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা উল্লে¬খ করে মাতৃভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবি ও দাবি পূরণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। ‘গণ আজাদী লীগ’ই প্রথম সংঘটন যা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী প্রথম বারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু সমর্থনকারী কয়েকজন বাঙালি
কবি গোলাম মোস্তফা এবং সাংবাদিক মুজিবর রহমান খাঁ, মোহাম্মাদ ওয়াজেদ আলী, নাদীয়ার সা’দ আহমদ, সেখ আবদুল হাকিম, কলকাতার মহবুব খান প্রমুখ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার সমর্থনকারী ব্যক্তিদের কয়েকজন।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানে বাংলা ভাষা বিষয়ক বিতর্ক এবং আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত বলে গণ্য করা হয়।
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষাকল্পে অনুষ্ঠিত প্রথম বিক্ষোভ
করাচির শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সংবাদ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভা করে। ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগ ওয়ার্কিং কমিটি’র শেষ বৈঠকে শিক্ষা সম্মেলনের সুপারিশের প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রথম প্রতিবাদ সভা
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথম প্রতিবাদ সভা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশে’র স¤পাদক জনাব আবুল কাশেমের (অধ্যক্ষ আবুল কাশেম) সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের তৎকালীন সহ-সভাপতি জনাব ফরিদ আহমদ প্রস্তাব পাঠ করেন।
বাংলা ভাষা আন্দোলন সমর্থনকারী প্রথম মন্ত্রী
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বরের প্রতিবাদ সমাবেশের পর বিক্ষোভ প্রদর্শনরত বিশাল ছাত্রসমাবেশে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মহাম্মদ আফজল বক্তৃতা প্রদান করেন এবং ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও একাÍতা ঘোষণা করেন।
প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিসের নুরুল হক ভুঁইয়াকে আহবায়ক করে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়।
প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত
পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ উত্থাপিত বাংলাকে গণ পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাবের বিপক্ষে মুসলিম লিগের সদস্যরা ভোট দেয়ার সংবাদ ঢাকায় পৌঁছামাত্র সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মুসলিম লিগ সদস্যদের এহেন ঘৃণ্য আচরণের প্রতিবাদে ১৯৪৮ খৃস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানানো হয় এবং ঢাকায় বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদানের দাবিতে প্রথমবারের মতো ছাত্র ধর্মগট পালিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাহসী ভূমিকা তাঁকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পূর্বপাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক কর্মীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কামরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার নিমিত্ত জনাব শামসুল আলমকে আহবায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামক একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাধারণ ধর্মঘট
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে সারা পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ডাক দেওয়া হয়। এ হরতালকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্যে আহুত প্রথম সাধারণ ধর্মঘট বলা হয়।
প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন
ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ স্মরণে প্রতিবছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হত। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির জন্য পালিত ছাত্র-ধর্মঘটে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের প্রাক্কালে সেক্রেটারিয়েট গেইটে পিকেটিং করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, মোঃ তোয়াহা, ডাঃ এম এ আযমল, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন, খালেক নেওয়াজ খান প্রমূখ পুলিশের হাতে আটক হন। উলে¬খ্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চের নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৪ মার্চ সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে পুনরায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের আহবান জানানো হয়। এ আহবানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ মার্চ সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে বিক্ষোভ ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে লেখার কারণে প্রথম নিষিদ্ধকৃত পত্রিকা
ভাষা আন্দোলন সমর্থন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সংবাদ-ফিচার ইত্যাদি প্রকশ করায় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’ এবং কলকাতা হতে আমদানি-করা সকল পত্রিকা সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা দিবস
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন হওয়ার পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ দ্বিতীয় বারের মতো রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়।
আরবি হরফে বাংলা চালুর অপপ্রয়াস
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার অজুহাতে বাংলা লিখন প্রণালীকে পরিবর্তন করে আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। এ লক্ষ্যে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত ‘কেন্দ্রীয় পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড’ এর সভায় পাকিস্তানে প্রচলিত সকল ভাষার লিখন প্রণালী আরবি হরফে পরিবর্তন করার সুপারিশ করা হয়। উল্লে¬খ্য বাংলা ছাড়া পাকিস্তানে প্রচলিত বাকি ভাষাগুলোর লিখন প্রণালী ছিল আরবি হরফে। স্বভাবতই প্রস্তাবটির একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাংলাকে পরিবর্তন করা। সুপারিশ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পূর্ব-পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার ২০টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্ত-বয়স্কদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার কাজ শুরু করেন।
পতাকা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ঘোষণা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিবাদ-জ্ঞাপনের কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত কবে নেয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে ৩১ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি এবং ৬ ফেব্রুয়ারি- তিনটি তারিখ পাওয়া যায়। অধিকাংশ গবেষক ও বর্ণনাকারীর অভিমত এবং পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি গৃহীত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশটি হতে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে সাধারণ ধর্মঘট তথা হরতাল পালন ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠানের ডাক দেয়া হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের খরচ সংগ্রহের জন্য ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১১, ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি হতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৭ (সতের) দিন ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি চলে।
২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি ঘোষণার কারণ
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন আহবান করা হয়েছিল। বাজেট অধিবেশনের দিন কর্মসূচি ঘোষণা ও পালনের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আইন পরিষদকে বাধ্য ও প্রভাবিত করে পূর্ব-পাকিস্তানের পক্ষ হতে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার কিংবা অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি প্রদান করা হয়েছিল।
সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে স¤পাদকীয় ও পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ‘অবজারভার’ পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘ছদ্ম ফ্যাসিজম’ শিরোণামে একটি স¤পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। তাসাদ্দুক হোসেন লিখিত এ প্রতিবেদনটি ছিল খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষা সংক্রান্ত্য মন্তব্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রকাশিত সবচেয়ে কড়া প্রতিবেদন। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন সমর্থনসহ আপত্তিকর স¤পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশের অভিযোগে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ‘অবজারভার’ পত্রিকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই কারণ দেখিয়ে পত্রিকার স¤পাদক আবদুস সালাম ও প্রকাশক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী না হওয়া পর্যন্ত ‘পাকিস্তান অবজারভার’ বন্ধ ছিল।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম টেলিগ্রাম সংখ্যা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার উপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে সর্বস্তরের জনগণের অংশ গ্রহণের ব্যাপকতাকে সাধারণ্যে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকা একটি টেলিগ্রাম সংখ্যা বের করে। এটি ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম টেলিগ্রাম সংখ্যা।
গণপরিষদের অধিবেশন বর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন চলছিল। ছাত্র-জনতার উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পরিষদগৃহ পরিত্যাগ করেন। আরও ৩ জন পরিষদ সদস্য তাঁকে অনসুরণ করে পরিষদ গৃহ হতে বেরিয়ে এসে ভাষা আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন।
দেশের প্রথম শহিদ মিনার
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলায় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতের বেলা দেশের প্রথম শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ শহিদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়।
পত্রিকা অফিসে আগুন
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ জনতা ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার ছাপাখানা জুবিলি প্রেসে আগুন লাগিয়ে দেয়। মর্নিং নিউজ পত্রিকায় ‘উযড়ঃরবং জড়ধসরহম ঝঃৎববঃং’ শিরোনামের লেখায় ‘ভারতীয় দালাল আর হিন্দুরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য এ আন্দোলন চালাচ্ছে’ মন্তব্য করায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে পত্রিকা অফিসে আগুন লাগায়।
বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম সুপারিশ
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল জনরোষে সারাদেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। সরকার ও প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিপর্যস্ত মুসলিম লিগ সরকার অনোন্যপায় হয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ সম্বলিত প্রস্তাব পাশ করে।
মুসলিম পার্লামেন্টারি দল হতে পদত্যাগ
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকার স¤পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন ছাত্র-জনতার উপর গুলীবর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে মুসলিম লিগ পার্লামেন্টারি দল হতে পদত্যাগ করে ভাষা আন্দোলনের প্রতি একাÍতা ঘোষণা করেন।
প্রথম কারফিউ বা সান্ধ্য-আইন জারি
গুলিবর্ষণের পর পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সরকারকে অচল করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধরার পাশাপাশি রাত ১০টা হতে ভোর ৫টা পর্যন্ত সান্ধ্য-আইন জারি করা হয়।
সরকারকে চরমপত্র প্রদান ও প্রথম শহিদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে, যেস্থানে আবুল বরকত পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেখানে ছাত্ররা রাতারাতি ১০-ফুটের অধিক উচ্চতার একটি ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করেন। সেদিন বিকেলের দিকে সশস্ত্র পুলিশ এসে স্তম্ভটি গুড়িয়ে দেয়। ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ ভেঙ্গে দেয়ায় ছাত্র-জনতা আরও সংগ্রামী, ক্ষুব্ধ, উত্তাল ও বেপরোয়া হয়ে উঠে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক সভায় মিলিত হয়ে সরকারকে ৭৫ ঘন্টার আলটিমেটাম (চরমপত্র) দেয় এবং ৫ মার্চ পূর্ব-পাকিস্তানে ‘শহিদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ভাষা আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বারের মতো বন্ধ ঘোষণা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ছাত্র-ছাত্রীদের জোর করে হল হতে বের করে দেওয়া হয়। প্রধান ৯ জন নেতার উপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং সংবাদপত্রের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষা আন্দোলনের ৯ জন মূল নেতার মধ্যে ৮ জনকে এক বাড়ি হতে গ্রেফতার করা হয়।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি এবং একুশে ফেব্রুয়ারি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয় এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করা হয় কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে সালাম, রফিক, জব্বার এবং বরকতসহ জানা-অজানা অনেক লোক শহিদ হন।
আরবি হরফে বাংলা শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত কমিটি
পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পূনর্গঠনের লক্ষ্যে মাওলানা আকরাম খাঁ-কে প্রধান করে ২৩ সদস্যের ‘পূর্ব বাংলা শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার কমিটি’ গঠন করা হয়। ক্ষমতাসীন সরকারের চাপ এবং সংস্কারের পক্ষে মাওলানা আকরাম খাঁ-র নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গী সত্ত্বেও সংস্কার কমিটি আরবি হরফে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও প্রচলনের বিষয়টি অনুমোদনের বিপক্ষে মতামত প্রদান করেন। ফলে ইজ্জত বাঁচানোর লক্ষ্যে সরকার কমিশনের প্রতিবেদন গায়েব করে দেয়।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ
অধিকাংশ বর্ণনাকারীর মতে সালাহ উদ্দিন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ। কিন্তু পত্রপত্রিকা, সরকারি বিবরণ, ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন গবেষণামূলক নিবন্ধ ও গ্রন্থাদি পর্যালোচনায়, সালাহ উদ্দিন নামের কেউ ২১ ফেব্রুয়ারি আদৌ শহিদ হন নি দেখা যায়। শহিদ রফিক উদ্দিনকে ভুলবশত সালাহ উদ্দিন অভিহিত করা হয়েছে। সে হিসেবে রফিক উদ্দিন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের আই কম ২য় বর্ষের ছাত্র, সিঙ্গাইর পারিল গ্রাম নিবাসী ও বাদামতলীর কমার্শিয়াল প্রেসের মালিক মোহাম্মদ আবদুল লতিফের জ্যৈষ্ঠ পুত্র রফিক উদ্দিন ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৪ নম্বর ব্যারাকের সামনে মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। সরকারি ঘোষণায় জানান হয়, “প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট জনাব ওবায়দুল¬ার উপস্থিতিতে হাফেজ আবদুল গফুর শহিদ রফিক উদ্দিনের জানাযা পড়েন এবং আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।” আজিমপুর গোরস্থানে এখন শহিদ রফিকের খবরের কোনো চিহ্ন নেই, খুজে পাওয়ারও কোনো অবকাশ আর নেই।
ভাষা শহিদ সলিল সিংহ, সুদেষ্ণা সিংহ ও মণিপুরি ভাষা আন্দোলন
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার স্বীকৃতির লক্ষ্যে আন্দোলনকালে পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতরভাবে আহত ভাষা সৈনিক সলিল সিংহ মৃত্যুবরণ করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক সুদেষ্ণা সিংহ। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জে গুংগাবাড়ি রেললাইনে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি স্টুডেন্ট এসোশিয়েশন’ ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আহুত ৫০১ ঘন্টার রেল বন্ধ কমসুচি পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এদিন প্রমোদিনী সিংহ, রত্না সিংহ, আরতি সিংহ, কমলাকান্ত সিংহসহ ১২ জনের অধিক ভাষাসৈনিক পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল গৌহাটি হাইকোর্ট বিষ্ণুপ্রিয়া নামের পূর্বে বা পরে মণিপুরি ব্যবহার করা যাবে মর্মে রায় দেন। এর ফলে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল হতে আসাম সরকার একটি নোটিফিকেশন জারি করে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি আসাম রাজ্যে প্রাইমারি স্তরে সরকারিভাবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা চালু করা হয়। সুদেষ্ণার আত্মত্যাগের স্মৃতি ও সম্মানার্থে প্রতি বছর ১৬ মার্চ ‘শহিদ সুদেষ্ণা দিবস’ পালিত হয়। মণিপুরি ভাষাভাষীদের কাছে দিবসটি ‘মণিপুরি ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবেও পরিচিত।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে। সংবিধানের মূল ভাষা ছিল ইংরেজি। সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ২১৪ অনুচ্ছেদটির বাংলা অনুবাদ হলঃ-
২১৪(১)- পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা, তবে শর্ত থাকে যে, সংবিধান দিবসের অব্যবহিত পূর্র্ব পর্যন্ত পাকিস্তাানের যে সব সরকারি উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, সে সকল উদ্দেশ্যে উক্ত ভাষা সংবিধান দিবস হতে আরম্ভ করে পরবর্তী বিশ বছর মেয়াদের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকবে এবং উক্ত বিশ বছর মেয়াদ অতিক্রম হওয়ার পর সংসদ আইন দ্বারা যেরূপ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন, সেরূপ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের বিধান করা যাবে। (২) সংবিধান দিবস হতে আরম্ভ করে দশ বছর মেয়াদ অতিবাহিত হলে ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনকল্পে সুপারিশ করার নিমিত্ত রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন গঠন করবেন। (৩) এ অনুচেছদে এমন কিছু নেই, যা উক্ত বিশ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত্র হওয়ার পূর্বে কোনো প্রাদেশিক সরকারকে সে প্রদেশে যে কোনো একটি রাষ্ট্রভাষার দ্বারা ইংরেজি ভাষাকে পরিবর্তিত করা হতে বিরত রাখতে পারবে।
রাষ্ট্রভাষা হতে জাতীয় ভাষা
১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান ‘দ্যা কনস্টিটিউশন অব দ্যা রিপাবলিক অব পাকিস্তান’ প্রবর্তন করেন। এ সংবিধানে বাংলা ভাষার মর্যাদা রাষ্ট্রীয় ভাষা হতে পরিবর্তিত করে জাতীয় ভাষায় আনা হয়। উক্ত সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-
২১৫(১)- পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু; কিন্তু সংবিধানের এ অনুচ্ছেদকে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকরূপে ব্যবহার করা যাবে না, বিশেষত ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এ ভাষা (ইংরেজি) সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশ্যসমূহ প্রতিপালনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে। (২) সরকারি উদ্দেশ্য প্রতিপালনের জন্য ইংরেজি ভাষা পরিবর্তনের প্রশ্নটি পরীক্ষা ও তার প্রতিবেদন উপস্থাপনকল্পে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন গঠন করবেন। উল্লেখ্য ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে কমিটি গঠনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে কমিটি পরবর্তীকালে অর্থহীন হয়ে যায়।
বাংলা ভাষার বর্তমান সংবিধানিক মর্যাদা
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ গৃহীত ও মূল ভাষা হিসেবে বাংলায় রচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে বাংলা ভাষাকে একক ও শর্তহীনভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে বলা হয় “প্রজাতন্তের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা”।

error: Content is protected !!