বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

বিংশ অধ্যায়
ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা ও অমর একুশে

উপমহাদেশের প্রথম ভাষাসৈনিক
মহামতি গৌতম বুদ্ধ উপমহাদেশের প্রথম ভাষা সৈনিক। তিনি আর্য ভাষার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করে জনগণের মুখের ভাষা পালিতে ‘ত্রিপিটক’ রচনা করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধ পালি ভাষায় ত্রিপিটক রচনা না করলে পৃথিবীতে বাংলা বলে কোনো ভাষার অস্তিত্ব থাকত কিনা সন্দেহ। গৌতম বুদ্ধের ত্রিপিটক বাংলা ভাষার আদিরূপে রচিত প্রথম গ্রন্থ। ‘বেদ’ এর ভাষাকে সংস্কার করে সংস্কৃত ভাষা সৃষ্টি করা হয়। সংস্কৃত ছিল মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ এবং গুটি কয়েক তথাকথিত উচুশ্রেণির লোকের ভাষা। বেদ বা সংস্কৃত ভাষা সাধারণ লোকদের শোনা কিংবা বলা নিষিদ্ধ ছিল। কেউ অসাবধানতা বশত শুনে ফেললে কানে গরম সীসা ঢেলে দেয়া হত। আর্যরা ছাড়া অন্য কেউ সংষ্কৃত ব্যবহার করতে পারত না। গৌতম বুদ্ধ বাংলা ভাষার আদিরূপ পালি ভাষায় প্রথম গ্রন্থ রচনা করে বাংলা ভাষার অকাল প্রাণনাশকারী হিন্দু ব্রাহ্মণদের হাত হতে বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। ব্রাহ্মণেরা বাংলা ভাষাকে এতই ঘৃণা করত যে, তারা বাংলা ভাষা চর্চাকারীদেরকে রৌরব নামক নরকের বাসিন্দা ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাষা বাংলাকে চিরতরে রূদ্ধ করে দেয়ার অপপ্রয়াসে মেতে উঠেছিল। জনগণের মুখের কথা পালি-প্রাকৃতের প্রচার ও চর্চা নিষিদ্ধ করে হিন্দু রাজারা বাংলা ভাষাকে শেষ করে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল। গৌতম বুদ্ধ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ পালি ভাষায় ত্রিপিটক রচনা করেন।
ভাষা কমিটি : বাংলা একাডেমী ও বাংলা উন্নয়ন বোর্ড
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ মওলানা আকরম খাঁকে চেয়ারম্যান এবং ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম ও ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হকসহ ১৪ জনকে সদস্য করে ভাষা কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলা অক্ষরমালা, ভাষা ও ব্যাকরণকে সহজীকরণের জন্য বিস্তারিত সুপারিশ প্রণয়ন করেন। কমিটির সুপারিশের আলোকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমী এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং একুশে ফেব্রুয়ারি
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে ফ্রেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, রফিক, জব্বার এবং বরকতসহ অনেকে শহিদ হন। পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা যাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার জন্য আন্দোলন ও রক্ত দিতে হয়েছে। জাতিসংঘ এর সম্মানে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ২১ ফ্রেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’ ঘোষণা করে।
প্রথম শহিদ মিনার
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গনে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়। তবে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি পুলিশ তা ভেঙ্গে দেয়।
সরকারিভাবে প্রথম একুশে ফ্রেব্রুয়ারি পালন
যুক্তফ্রন্টের অংশবিশেষের ভাগাভাগিতে আবু হোসেনের সরকার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে। অত:পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ হতে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী ত্রিপুরা রাজ্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা প্রদান করে। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গেও বেসরকারিভাবে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রথম অনানুষ্ঠানিক দাবি
১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে একুশের এক অনুষ্ঠানে ‘গফরগাঁও থিয়েটার’ নামক সংগঠন একুশে ফেব্রুয়ারি’র আন্তর্জাতিক মর্যাদার দাবি উত্থাপন করে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে একুশের সংকলনে ‘গফরগাঁও থিয়েটার’ তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। ‘অর্ঘ’ নামের সংকলনটিতে একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা দাবির সপক্ষে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ ছাড়াও প্রচ্ছদে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই; ‘একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই’ প্রভৃতি শ্লোগান মুদ্রিত করা হয়। উল্লেখ্য ভাষা-শহীদ জব্বারের জন্মস্থান গফরগাঁও।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।
বাংলা ভাষার প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা
“যে যো বিধি সো বিনা বিধি/ যো সো কো সেই স্বাধী/ টীলিত মোর ঘর নাহি পড় বেষী/ হাড়ীতে ভাত নাহি তিনি আবেশী/ বেঙ্গ সংসার মোর বড় ঢিল জাস/ চুলি দুধুকি বেণ্ঠে মামায়” চর্যাপদের এ অংশটি বাংলা ভাষার প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। এর অর্থ- যে বুদ্ধিমান বলে সেই বুদ্ধিহীন সাধু সেজেছে সততাবিহীন প্রতিবাদে কবি কণ্ঠে দিল তার আত্মপরিচয়। সে ব্রাহ্মণ নয়, সে অমিতাভ নয়, তার পরিচয় সে বাঙালি।’ এখানে কবি বড় গর্বের সঙ্গে নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম সু¯পষ্ঠ কবিতা
সতের শতকের কবি আবদুল হাকিমকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবি বলা যায়। তাঁর লেখা বিখ্যাত কবিতা–“যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি //দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুড়ায়/ নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যায়…//” কবিতাটি সু¯পষ্ঠভাবে মাতৃভাষা বাংলার উপর বাংলা ভাষা অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা প্রথম কবিতা। এ কবিতাটি মাতৃভাষা বিরোধী বা মাতৃভাষার প্রতি বৈরী প্রদর্শনকারীদের প্রতি একজন কবির সরাসরি বিদ্রোহের অনলবর্ষী প্রয়াস। তুর্কি শাসনামলে এদেশীয় উঁচু শ্রেণির লোকেরা শাসক শ্রেণির কাছাকাছি পৌঁছা কিংবা পদলাভের জন্য বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে তুর্কি-ফারসি ভাষাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। তথাকথিত উঁচু শ্রেণির কিংবা উঁচু শ্রেণিতে পরিগণিত হওয়ার প্রত্যাশীরা বাংলা ভাষার বদলে বিদেশি ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। আবদুল হাকিম কবিতাটির মাধ্যমে বাংলা ভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা প্রমাণে রচিত প্রথম প্রবন্ধ
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের নিবন্ধটি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে স্বীকৃত।
ভাষা সমস্যার উপর মহিলা রচিত প্রথম প্রবন্ধ
‘আজাদ’ পত্রিকার ‘মহিলা মাহফিলে’ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত আয়েষা বেগম বিরচিত ‘ভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষা সমস্যা স¤পর্কে কোনো মহিলা লিখিত প্রথম প্রবন্ধ। এরপূর্বে বাংলা ভাষা সমস্যা নিয়ে কোনো মহিলা প্রবন্ধ লিখেন নি।
রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ পর্যালোচনা
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে লিখিত কয়েকটি প্রধান প্রবন্ধের প্রথম পর্যালোচনা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে। ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রবন্ধ পর্যালোচনাটি প্রকাশিত হয়।
বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রচিত প্রথম প্রবন্ধ
আবদুল হক রচিত ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে রচিত প্রথম প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি দুই কিস্তিতে যথাক্রমে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ ও ২৯ জুন দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আবদুল হক রচিত এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রবন্ধ। আবদুল হক রচিত এবং ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই প্রকাশিত ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে” প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে লেখা তৃতীয় প্রবন্ধ। দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই প্রকাশিত ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিরচিত ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ নামক প্রবন্ধটি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে রচিত চতুর্থ প্রবন্ধ।
মহিলার ছদ্মনামে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রচিত প্রথম প্রবন্ধ
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সপক্ষে রচিত চতুর্থ প্রবন্ধ আবদুল হক বিরচিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। মিসেস এম এ হক ছদ্মনামে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি মহিলাদের এতই অনুপ্রাণিত করে যে, অনেক মহিলা এবিষয়ে লিখতে শুরু করেন।
ভাষা আন্দোলনের উপর লিখিত প্রথম গ্রন্থ
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ স¤পাদক আবুল কাশেম স¤পাদিত ও মজলিস প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- বাংলা না উর্দু’ নামক গ্রন্থটি ভাষা সমস্যার উপর রচিত প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ এবং আবুল কাশেমের লেখা তিনটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়। বইটি প্রকাশ হলে কেনার মতো ৫ জন লোকও পাওয়া যায় নি। গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা কম ছিল বলে অনেক এটিকে পুস্তিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটি ছিল অসাধারণ সাহসী একটি উদ্যোগ। পুস্তকটিতে আবুল কাশেম আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অফিস আদালতের ভাষা বাংলা হবে। উর্দু ও ইংরেজি হবে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা। উল্লেখ্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ঢাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাস
১৯৫২ খ্রিস্টব্দের জুন মাসে ৩১/১, আজিমপুর রোড এর ঠিকানায় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ হতে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উপর প্রকাশিত দ্বিতীয় পুস্তিকা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ১১ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবসে “রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন- কি ও কেন?” শিরোনামে যুবলীগ একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। পুস্তিকাটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম জাগরণমূলক পুস্তিকা। ডঃ আনিসুজ্জামান পুস্তিকাটি রচনা করেন। এরপর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ হতে মোহাম্মদ তোয়াহা রচিত আরেকটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনের উপর প্রকাশিত তৃতীয় পুস্তিকার নাম “আমাদের ভাষার লড়াই”। সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুবের অনুরোধে বদরুদ্দিন উমর পুস্তিকাটি রচনা করেন। উল্লেখ্য খন্দকার মোশতাক আহমদের দায়িত্বে পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছিল।
একুশের ফেব্রুয়ারি স্মরণে রচিত প্রথম কবিতা
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবায়ক চট্টগ্রাম নিবাসী কবি মাহবুবুল আলম রচিত ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি বাংলা ভাষা আন্দোলনে সংঘটিত ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির নৃশংস ঘটনা স্মরণে রচিত প্রথম কবিতা।
ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা
আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখিত ‘স্মৃতির মিনার’ নামক কবিতাটি শহিদ মিনার ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ স্বরূপ লেখা প্রথম এবং ভাষা আন্দোলনের উপর লেখা ২য় কবিতা। কবিতাটির প্রথম চারটি লাইন হচ্ছে-
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখানো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো! যে ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে…’।
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্রথম শহিদ ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ ভাঙ্গার দিন রচিত হয়েছিল। সে হিসেবে এটি ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত দ্বিতীয় কবিতা। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ লুতফুর রহমান জুলফিকারের লেখা সুদীর্ঘ ৬৩ পঙক্তির ‘রক্তের ডাক’ নামক কবিতাটি ভাষা আন্দোলনের উপর লেখা তৃতীয় কবিতা।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম গান
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত প্রথম গান ‘বাঙলা ভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি/ ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’। খুলনা নিবাসী কবি শামসুদ্দিন আহমদ রচিত এ গানটি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন স্মরণে রচিত প্রথম গান। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্বে গাজীউল হক রচিত নিজামুল হক সুরারোপিত ‘ভুলব না ভুলব না, ভুলব না আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি একুশে ফেব্রুয়ারির উপর রচিত দ্বিতীয় গান। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি একুশ স্মরণে রচিত তৃতীয় গান।
একুশের শহিদদের নাম উচ্চারিত প্রথম কবিতা
হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ কবিতা একুশের শহিদদের নাম উচচারিত প্রথম কবিতা। কবিতাটির প্রথম স্তবক ‘ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার কি বিষণ্ন থোকা থোকা নাম একসার জলন্ত নাম…’।
একুশের ভাষা আন্দোলনের ঘটনা নিয়ে রচিত প্রথম নাটক
বাংলা নাট্য শিল্পে ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রথম পথিৃকৎ মুনীর চৌধুরী। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে রচিত এবং ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘কবর’ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় লেখা প্রথম নাটক। নাটকটি আরউইন শ’র ‘ব্যারি দ্যা ডেড’ এর ছায়া অবলম্বনে রচিত। উল্লেখ্য ‘কবর’ নাটকে কোনো নারী চরিত্র নেই। দিয়াশলাইয়ের কাঠির আলোতে এটি প্রথম কেন্দ্রীয় কারাগারে অভিনীত হয়।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস
আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’,শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’, জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’, সেলিনা হোসেনের ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস ‘নিরন্তর’ ইত্যাদি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভেনিউ এলাকায় (তখনকার ব্রিটিানিয়া সিনেমা হলে) প্রথম আমার সোনার বাংলা গানটি গাওয়া হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফের সুরে আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গানটি আতিকুল ইসলামের কন্ঠে প্রথম গাওয়া হয়। গানটি প্রথমে কবিতা হিসেবে লেখা হয়েছিল। যা গেণ্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠে যুবলীগের একটি অনুষ্ঠানে প্রথম আবৃতি করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে যুবলীগের তৎকালীন সাংস্কৃতিক স¤পাদক সৈয়দ আহমদ হোসেনের কাছ হতে রফিকুল ইসলাম কবিতাটি নিয়ে আবদুল লতিফকে সুর করতে দেন। আবদুল লতিফের সুরে গাফফরার চৌধুরীর কবিতাটি আতিকুল ইসলামের কন্ঠে আবার গাওয়া হয়। পরবর্তীকালে গানটিতে আলতাফ মাহমুদ নতুনভাবে সুর দেন। বর্তমানে গানটি আলতাফ মাহমুদের সুরে গাওয়া হয়।
একুশের প্রথম সংকলন
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস কর্তৃক ১/৪ ডিমাই সাইজের ৪ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রচারপত্রটি একুশের প্রথম সংকলন। সংকলনটিতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি ‘একুশের গান’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন। তাই এটিকে অনেকে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম সংকলন বলে থাকেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো গানটি‘ এ সংকলনে দ্বিতীয়বারের মতো মুদ্রিত হয়। হাসান হাফিজুর রহমান স¤পাদিত একুশে সংকলনটি প্রকাশ করেছিলেন ‘পুথিপত্র প্রকাশনী’র পক্ষে মোহাম্মদ সুলতান। পচ্ছদ শিল্পী আমিনুল ইসলাম, রেখাঙ্কনে শিল্পী মর্তুজা বশীর। সংকলনটি প্রকাশিত হবার ২১ দিন পর সরকার বাজেয়াপ্ত করে।
পূর্ববাংলা পত্রিকার একুশে সংকলন ও দুটি বিখ্যাত কবিতা
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ার শহিদ দিবস পালন উপলক্ষে প্রকাশিত ‘পূর্ব বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনে’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর নামহীন ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা’ কবিতাটি এবং বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘বাতাসের সোহাগে রাত এল বুনো’ কবিতাটি ‘স্মৃতি’ নামে প্রকাশিত হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভাষা দিবসের আলেখ্যে লেখা যুগপৎ ব্যতিক্রমী উপন্যাস
স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভাষা দিবসের আলেখ্যে লেখা যুগপৎ ব্যতিক্রমী আদলের উপন্যাস আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা দিবসের উপর এ যাবত যত উপন্যাস লেখা হয়েছে তৎমধ্যে উপমা ও গভীরতা বিবেচনায় এটি শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস।
জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ
১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯-তম অধিবেশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।
একুশের প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শন
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে শিল্পকলা একাডেমিতে আলোকচিত্র শিল্পী মনোয়ার আহমদ এর একক আলোকচিত্র প্রদর্শন হয়। ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ আলোকচিত্র প্রদর্শন উদ্বোধন করেন।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রথম স্বীকৃতি
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাকে উর্দু ভাষার সাথে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
তমদ্দুন মজলিশ
ভাষা সৈনিক নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম (পরবর্তীকালে প্রিন্সিপাল) এর নেতৃত্বে কতিপয় ছাত্র ও অধ্যাপকের সম্মিলিত প্রয়াসে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়।
বাংলা ভাষা প্রচলন বিল
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি বাংলা ভাষা প্রচলন বিল পাশ হয়।
বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সংবিধান
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বাংলা ভাষায় রচিত। এটিই বাংলা ভাষায় রচিত কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের প্রথম আহবায়ক
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের প্রথম আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির প্রথম আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন এবং সবর্দলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি নওয়াবপুর রোডে আওয়ামীগ অফিসে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন জনাব আবুল হাসেম।
বাংলা একাডেমী আইন ও বর্ধমান হাউজ
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক আইন সভায় ‘বাংলা একাডেমী এ্যাক্ট ১৯৫৭’ পাস এবং ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট ‘বর্ধমান হাউজ’ তথা বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়।
সরকারিভাবে প্রথম একুশে ফ্রেব্রুয়ারি পালন
আবু হোসেনের সরকার এর আমলে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয়। এরপর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন জাতীয় মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী ত্রিপুরা রাজ্য একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গেও বেসরকারিভাবে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অমর একুশে ভাস্কর্য
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার সামনে স্থাপিত ‘অমর একুশে’ ভাস্কর্যটির স্থপতি শিল্পী জাহানারা পারভীন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশের বাইরে ভিন্ন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন
১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ হতে ভারতের বাংলাভাষী রাজ্য ত্রিপুরা সরকারিভাবে তাদের রাজ্যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরের বছর পশ্চিম বাংলায় বেসরকারিভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
একুশের ফেব্রুয়ারির ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ মর্যাদা লাভ
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আর্ন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর মর্যাদা স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের কারণে বদলীকৃত প্রথম জেলাপ্রশাসক
ঢাকার তৎকালীন জেলাপ্রশাসক জনাব হুসেন হায়দার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা হতে পরবর্তী একমাসের জন্য ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করার বিষয়ে অসম্মতি জ্ঞাপন করলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সিলেটে বদলি করা হয় এবং জনাব কোরেশিকে জেলাপ্রশাসক, ঢাকা হিসেবে বদলি করা হয়।
ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রচারিত প্রথম গোপন দলিল
ভাষা আন্দোলনকে সফল করে তোলার জন্য শুধু পার্টির সদস্যদের মধ্যে প্রচারের লক্ষ্যে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববাংলা কমিটির স¤পাদকমণ্ডলী ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি দলিল প্রচার করেন। গোপনীয়ভাবে প্রচারিত এ দলিলটি ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে প্রকাশিত প্রথম গোপন দলিল হিসেবে খ্যাত।
একুশে পদক
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষা শহিদ স্মরণে একুশে পদক প্রদানের রীতি চালু হয়।
আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলন
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বাংলায় কথা বলার কারণে অসমিয়রা আসামের বাঙ্গালিদের উপর আক্রমণ করে বসে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আসামের গোয়াল পাড়া জেলায় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন শুরু হয়। অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় দু লক্ষাধিক বাঙ্গালি উত্তরবঙ্গ ও অন্যান্য স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অসমিয়া ভাষাকে মাতৃভাষারূপে গ্রহণ করার শর্তে তাদেরকে আসামে পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসামের প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভায় অসমিয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উঠে। সংখ্যাঘরিষ্ঠতার কারণে এ প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং কার্যকর করার জন্য মন্ত্রিসভাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তে বাঙ্গালিরা ক্ষুব্ধ হয়। প্রদেশ জুড়ে সৃষ্টি হয় প্রবল উত্তেজনা। অসমিরা আবার ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২ ও ৩ মে আকর্ষণীয় উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরদিন অসমিয়ারা বাঙ্গালিদের উপর হায়েনার মতো ঝাপিয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব মতে চল্লিশের অধিক লোক নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ১০ সহস্রাধিক বাড়ি। ৫০ হাজার লোককে বসতবাটী হতে উচ্ছেদ করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই আসামের রাজ্যভাষাকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধান পরিষদে আসামের রাজ্যভাষাকে অসমিয়া করার পক্ষ বক্তব্য দেন এবং ১৪ অক্টোবর তীব্র বিতর্কের পর কেবল কাছাড়ের জন্য বাংলা ভাষার ব্যবহার স্বীকার করে নিয়ে মহকুমা পরিষদের উপর বাংলা ভাষার ভাগ্য ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতিবাদ করার পরও ই¯িপত ফল পাওয়া যায় নি। ২৪ অক্টোবর গৃহীত হয় আসাম সরকারি রাজ্যভাষা বিল। বাংলা ভাষার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলা ভাষার প্রাদেশিক মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে ১৯ মে হতে সমগ্র কাছাড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে রাাজ্য সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেন। আন্দোলনকারীরা বাংলা ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করায় জনসাধারণের উপর কোনোরূপ সতর্কীকরণ ছাড়া পুলিশ গুলি ছুড়লে সর্বমোট ১১ জন ভাষাসৈনিক শহিদ হন।

error: Content is protected !!