বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

চতুর্থ অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ

প্রাচীন যুগের নিদর্শন : বাংলাভাষার আদি-নির্মাতা
প্রাচীন যুগের পরিব্যাপ্তি ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিস্টব্দ। এ যুগে বাংলা সাহিত্য দূরে থাক, আদি রূপটিও সু¯পষ্টভাবে গড়ে উঠে নি। এ সময় বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা চর্যাপদ রচনা করেন। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ রচিত ‘চর্যাপদ’ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ তথা আদি যুগের একমাত্র নিদর্শন। সুতরাং বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ বাংলা ভাষার আদি-নির্মাতা।

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন
প্রাচীন যুগের প্রথম পর্বে অর্থাৎ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ লিখিত ‘চর্যাপদ’ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। এ পর্যন্ত ২৪ জন লেখকের লেখা প্রায় সাড়ে ৪৬টি ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কৃত হয়েছে। চর্যাপদের লেখকদের মধ্যে লুইপা, কাহ্নপাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২৪ জন চর্যাপদ রচয়িতার নাম জানা গিয়েছে। তন্মধ্যে দু একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিল বাঙালি।

বাংলা ভাষার প্রাচীন নাম
বাংলা ভাষার প্রাচীন নাম গৌড় অপভ্রংশ। প্রাকৃত বৈয়াকরণ মার্কণ্ডেয় ২৭টি অপভ্রংশের মধ্যে গৌড় অপভ্রংশের নাম করেছেন।

চর্যাপদের আবিষ্কারক
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা হতে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ঝধহংশৎরঃ ইঁফফযরংঃ খরঃবৎধঃঁৎব রহ ঘবঢ়ধষ’ গ্রন্থে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রথম নেপালের বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন। পুস্তকটিতে তিনি বিভিন্ন গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন। গ্রন্থটি পাঠে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কৌতুহলোদ্দীপ্ত হয়ে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। পরিদর্শন করে তিনি সেখানে চর্যাপদের সন্ধান পান। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

চর্যাপদ পাণ্ডুলিপির নাম
আবিষ্কৃত চর্যাপদের পাণ্ডুলিপির টীকায় প্রদত্ত নাম ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’। চর্যা অর্থ- যা করণীয় বা অনুসরণীয় বা উচিত এবং অচর্য্য অর্থ- যা করণীয় বা অনুসরণীয় নয় বা অনুচিত। অতএব ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ শব্দের অর্থ উচিত-অনুচিত। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার গান ও দোহা’ নামে আবিষ্কৃত চর্যাপদগুলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হতে সাড়ে ছেচল্লিশটি চর্যাগীতি গ্রন্থাকারে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর স¤পাদনায় প্রকাশিত হয়। আধুনিক পণ্ডিতদের অনুমান, পুথিঁটির নাম ছিল ‘চর্যাগীতিকোষ’ এবং ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ এর সংস্কৃত টীকার নাম।

চর্যাপদের রচনা কাল
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লার মতে চর্যাপদের রচনা কাল ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আবার ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় রচিত। চর্যাচর্যবিনিশ্চয় এর মোট ২৪ জন পদকর্তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। তন্মধ্যে কুক্কুরী, ডোম্বী, শবর, তাড়ক, কঙ্কণ, তন্ত্রী পমূখ উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলো পদকর্তাদের আসল নাম নয়, ছদ্মনাম। তাঁরা বাংলা বিদ্বেষী সেন বংশের ব্রাহ্মণদের অত্যাচার হতে বাঁচার জন্য ছদ্মনামে লিখতেন। তখন অভিজাত ব্রাহ্মণগণের নিকট বাংলাভাষা চর্চা ছিল পাপাচার। হিন্দুরা বাংলাভাষীদের উপর চরম অত্যাচার ও নির্যাতন করত।

চর্যাপদের আধুনিক গবেষক
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় চর্যাপদের ভাষা পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেন যে, চর্যাপদের ভাষা বাংলা। বিজয়চন্দ্র মজুমদার ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। ডঃ প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের তিব্বতি অনুবাদ আবিষ্কার করেন এবং ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে তা প্রকাশ করে চর্যার জট খোলেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লা ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চর্যাপদের ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় এর ঠিক পাঠ নির্ণয় করে চর্যাপদকে সহজ করে তুলেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত চর্যাগীতির অর্ন্তনিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র চর্যাপদ স¤পর্কিত বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘ইঁফফযরংঃ গুংঃরপ ঝড়হম’ চর্যাপদের ভাষা ও ভাবার্থ অনুধাবনে একটি সহায়ক গ্রন্থ।

চর্যাপদের প্রথম অনুবাদ ও অনুবাদের প্রকাশক
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ডঃ প্রবোধ চন্দ্র বাগচী চর্যাগীতির তিব্বতি অনুবাদ প্রকাশ করেন। এটাই চর্যাপদের প্রথম অনুবাদ। ডঃ প্রবোধচন্দ্র বাগচীই চর্যাগীতির তিব্বতি অনুবাদের প্রথম অনুবাদের প্রকাশক হিসেবে খ্যাত।

চর্যাপদের রচনাকাল ও চর্যাপদের ঐতিহাসিক মুল্য
বাংলার পাল বংশের বৌদ্ধ রাজাদের আমলে চর্যাপদ রচিত হয়েছে। চর্যাপদের ভাষা বেশ দুর্বোধ্য। তবু বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের ঐতিহাসিক মূল্য যেমন অপরিসীম তেমন ব্যাপক। বাংলা ভাষার বিবর্তন, সৃষ্টি তত্ত্ব, উৎস সন্ধানে চর্যাপদের কোনো বিকল্প নেই। চর্যাপদের ভাষা হচ্ছে প্রাচীন বাংলা। এ ভাষার উপর আধুনিক বাংলা ভাষার ভিত্তি।

চর্যাপদের আদি রচয়িতা
লুইপাকে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের টীকায় আদি সিদ্ধাচার্য বলা হয়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৫০টি চর্যাগীতির মধ্যে ১৩টির রচয়িতা কাহ্নপাদ। কাহ্নপাদের জন্ম কোথায় তা এখনও সঠিকভাবে জানা যায় নি। বিভিন্ন গবেষকদের গবেষণা ও পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তিনি উড়িষ্যার সোমপুর বিহারে বাস করতেন। চর্যাপদ এর ভাষা হতে মধ্যযুগের প্রথম গ্রন্থ ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের ভাষায় উন্নীত হতে যে আনুকূল্য, চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন ছিল তার সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুসলিম শাসকবর্গ প্রদান করেছেন।

চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের পদসংখ্যা
চর্যার পুঁথিতে ৫০টি পদ ছিল। তন্মধ্যে টীকাকার ১১ সংখ্যক পদের কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেন নি। তছাড়া প্রাপ্ত পুথিঁর কয়েকটি পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনটি ২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক পদের সম্পূর্ণ এবং ২৩ সংখ্যক পদের শেষাংশ পাওয়া যায় নি। সে হিসেবে পুঁথিতে সর্বমোট সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গিয়েছে।

চর্যাপদের কবি
চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের মোট চব্বিশ জন পদ কর্তার পরিচয় পাওয়া যায়। চব্বিশ জন পদকর্তা হলেন- লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, সবর, আজদেব, ঢেণ্ডন, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। উল্লেখ্য কুক্কুরী, ডোম্বী, শবর, তাড়ক, কঙ্কণ, তন্ত্রী, লাড়ীডোম্বী ইত্যদিসহ বেশ কয়েকটি ছদ্মনাম। চর্যাকারদের মধ্যে লুই, কুক্করী, বিরুআ, ডোম্বী, শবর, ধাম, জঅনন্দি প্রমূখ বাঙালি ছিলেন।

সর্বাধিক পদরচিয়তা
চর্যাপদের কবিগণের মধ্যে কাহ্নপাদ সর্বাধিক পদরচিয়তা। তাঁর তেরটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে রয়েছে। সংখ্যাধিক্যের কারণে তাঁকে কবি ও সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা যায়। ডঃ শহিদুল্লাহর মতে কাহ্নপাদের বাড়ি ছিল উড়িষ্যায়। তিনি সোমপুর বিহারে বসবাস করতেন। বাংলার পাল বংশের রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁদের আমলে চর্যাগীতিকাগুলোর বিকাশ ঘটে।

সান্ধ্যভাষা
চর্যাপদের ভাষাকে কেউ কেউ সান্ধ্যভাষা নামে অভিহিত করে থাকেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে চর্যপদ ‘ আলো আঁধারি ভাষা। কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে অনেকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘সান্ধ্যভাষা’ বলে অভিহিত করে থাকেন।

জয়দেব গোষ্ঠী
সেনযুগে লক্ষণসেনের সভায় যে পঞ্চরত্নের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁদেরকে একত্রে জয়দেবগোষ্ঠী বলা হত। পঞ্চরত্নের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে বিতাড়িত করে সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য চর্চা করা। পঞ্চরত্নগণের নাম ছিলেন যথাক্রমে- উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য এবং জয়দেব। এ পাঁচজনের মধ্যে কবি জয়দেব ছিলেন শ্রেষ্ঠ। তিনি পঞ্চরত্নের নেতা ছিলেন বলে এ গোষ্ঠী জয়দেব গোষ্ঠী নামে পরিচিতি পায়। লক্ষণ সেনের সভাকবি জয়দেব সংস্কৃত ভাষায় ‘গীতগোবিন্দম’ রচনা করে ভারতবর্ষে বিখ্যাত হয়ে আছেন। চৈতন্যদেব গীতগোবিন্দম কাব্যের ভক্ত ছিলেন। চেতন্যদেবের নবরসিক বিদ্যাপতি ‘অভিনব জয়দেব’ নামে খ্যাতি পান।

সেনযুগের সাহিত্য কর্ম
কাব্য সংকলন ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ ও ‘সদূক্তিকর্ণামৃত’ সেনযুগের দুটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ গ্রন্থের সংকলনকারীর নাম এখনও পাওয়া যায় নি। ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ গ্রন্থে ১১১ জন কবির কবিতা সংগৃহীত হয়েছে। কবিগণের অধিকাংশ ছিলেন বাঙালি। ‘সদূক্তিকর্ণামৃত’ ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে লক্ষণ সেনের প্রধান কর্মচারীর পুত্র শ্রীধর দাস সংকলন করেন। এতে ৪৮৫ জন কবির ২৩৭০টি কবিতা আছে। গ্রন্থদ্বয় সংস্কৃত ভাষায় রচিত।

চর্যাপদের অব্যবহিত পরের রচনা
প্রাচীন যুগে চর্যাপদের অব্যবহিত পর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ এবং গৌড় অভিনন্দনের ‘কথাসার’ উল্লেখযোগ্য।

বঙ্গের আদি কবি
মীননাথ ওরফে মৎসেন্দ্রনাথ বঙ্গের আদি কবি। তিনি প্রাচীন ধর্মের শাপে বিনষ্ট বঙ্গবাসীদের পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পৃথক কাব্য রচনার মাধ্যমে বঙ্গ বাণীর আমোদিত স্রোতধারায় বঙ্গদেশকে বিমোহিত করে তোলার প্রয়াস নেন। মাৎসেন্দ্রনাথের অপর নাম মীননাথ। চুরাশি জন সহজিয়া বৌদ্ধাচার্যগণের অন্যতম মীননাথ চন্দ্রদ্বীপে (বাকলা বর্তমান বরিশাল) জন্মগ্রহণ করেন। কথিত হয় তিনি মৎস্যের উদরে থেকে জলের নিচ হতে হরপার্বতীর রহস্য কথা শ্রবণ করে সিদ্ধিলাভ করেন। অধ্যাপক সিলভা লেভির মতে তিনি ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ৫২২ খ্রিস্টাব্দে) নেপাল গমন করেন। নাথ-সাহিত্যে মীননাথের নামান্তর মৎসেন্দ্রনাথ।

error: Content is protected !!