বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

পঞ্চম অধ্যায়
বৈষ্ণব সাহিত্য, মহাভারতের অনুবাদ, দোভাষী পুঁথি সাহিত্য ও পদাবলী

মধ্যযুগ
১২০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বলা হয়। ১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বঙ্গবিজয় বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন ধারায় বৈচিত্র্যময় অবদান ও সৃষ্টিসম্ভারকে প্রশস্ত করে। তখন হতে বাংলা সাহিত্যে আরবি ও ফারসি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইখতিয়ার উদ্দিনের বাংলা বিজয়ের ফলে সেনবংশীয় সংস্কৃতের অক্টোপাশ হতে বাংলা ভাষা ক্রমান্বয়ে নিজের স্বকীয় অস্তিত্ব রক্ষার সুযোগ পায়। মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ-সাহিত্য, বৈষ্ণবপদাবলী, জীবনী-সাহিত্য, নাথ সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, রাগতমালা, সওয়ালসাহিত্য, জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য, সুফীসাহিত্য, লৌকিক দেবতা ও পাঁচালী, শিবায়ন, লোকসাহিত্য ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম মধ্যযুগের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কবি বড়ূ চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মধ্যযুগের আদি নিদর্শন। মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলী ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। সংস্কৃত রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবত থেকে অনুবাদ মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন। প্রণয়োপাখ্যান কাব্যের সূত্রপাত মধ্যযুগের কীর্তি। জঙ্গনামা কিংবা যুদ্ধকাব্য জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টি মধ্যযুগের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক। বৈষ্ণবপদাবলী, জীবনী-সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, লোকসাহিত্য ইত্যাদি মধ্যযুগের মৌলিক রচনা। মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্যের মধ্যে কাশীরাম দাসের ‘মহাভারত’, কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’, মালাধর বসুর ‘পদ্মপুরাণ’ মধ্যযুগের আদি পর্বের উল্লেখযোগ্য অনুবাদ। এরপরও মধ্যযুগে আরও অনেক অনুবাদ হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যগ্রন্থ
১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বল্লভ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামে এক গৃহস্থ বাড়ির গোয়াল ঘর হতে পুঁথি আকারে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যগ্রন্থটি আবিষ্কার করে বাংলা সাহিত্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটান। বৈষ্ণব মহান্ত শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশজাত দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের অধিকারে গ্রন্থটি রক্ষিত ছিল। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বল্লভের স¤পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হতে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বড়ু চণ্ডীদাস রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের প্রকৃত নাম ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব’। এটি মধ্যযুগের প্রথম কাব্য এবং বড়ূ চণ্ডিদাস মধ্যযুগের আদিকবি। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে রচিত নয়। অনেকের ধারণা এটি ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত। চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতির দ্বিতীয় ফলক। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পুঁথিটি বড়ূ চণ্ডীদাসের স্বহস্তলিখিত নয়। পরবর্তী এক বা একাধিক কবির হতের লেখা। সংগত কারণে এর রচনাকাল লিপিকালের পূর্বে স¤পাদিত হয়েছে। ডঃ শহীদুল্লাহর মতে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যগ্রন্থটি রচিত। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যগ্রন্থটি ‘জন্মখণ্ড, তাম্বখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছাত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালিয়দমনখণ্ড, যমুনাখণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড ও রাধাবিরহ’ নামক মোট তেরটি খণ্ডে বিভক্ত।

বড়ূ চণ্ডীদাসের সময়কাল
বসন্তরঞ্জন রায়ের দেওয়া তথ্যানুসারে বড়ূ চণ্ডীদাস ১৪০৩ খ্রিষ্টাব্দ, ১৪১৭ খ্রিষ্টাব্দ বা ১৩৮৬ খ্রিষ্টাব্দহতে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময় জন্মগ্রহণ করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বড়ূচণ্ডিদাসের জীবনকাল ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিস্তৃত ছিল। চতুর্দশ শতকের শেষদিকে বড়ূ চণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচনা করেন। কারও মতে বীরভূমের নান্নুর গ্রামে বড়ূ চণ্ডীদাস জন্মগ্রহণ করেছেন। আবার কারও মতে বাঁকুড়ার ছাতনায় বড়ূ চণ্ডীদাসের জন্ম।

অদ্ভুতাচার্য
অদ্ভুতাচার্য ষোড়শ শতকের একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর আসল নাম নিত্যানন্দ আচার্য। অনুমান ১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা জেলার অমৃতাকুণ্ডা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সম্রাট আকবরের সমসাময়িক কবি ‘অদ্ভুত আশ্চর্য রামায়ণ কথা’ নামক কাব্যগ্রন্থ রচনা করে ‘অদ্ভুতাচার্য’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। তার আসল নাম নিত্যান্দ হারিয়ে যায় অদ্ভুতার্য নামে।

ছুটিখানী মহাভারত
শ্রীকরনন্দী ‘ছুটিখানী মহাভারত’ এর রচয়িতা। পরাগল খানের পুত্র ছুটি খানের আদেশে জৈমিনি মহাভারতের উপাত্ত নির্ভর করে কেবল অশ্বমেধ পর্বের অংশ নিয়ে শ্রীকরনন্দী যে কাব্য রচনা করেন তা ‘ছুটিখানী মহাভারত’ নামে পরিচিত।

মহাভারতের প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ
সপ্তদশ শতকের কবি কাশীরাম দাশ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের সংস্কৃত মহাভারত অনুসরণে ‘মহাভারত’ রচনা (রচনা কাল ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দ -১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ) করেন। তিনি চার পর্ব পর্যন্ত অনুবাদ সমাপ্ত করার পর মারা যান। বাকি অংশের অনুবাদ তাঁর ভ্রাত®পুত্র নন্দরায় এবং পরে আরও কয়েকজনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এটিই মহাভারতের প্রথম স্বয়ংস¤পুর্ণ বঙ্গানুবাদ।

ভাগবতের প্রথম বাংলা অনুবাদক
মালাধর বসু ভাগবতের প্রথম বাংলা অনুবাদক। ১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে সাত বছরের প্রচেষ্টায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্ধ অনুসরণে মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এটি মধ্যযুগের দ্বিতীয় অনুবাদ গ্রন্থ। এই অনুবাদ কাব্যটিকে বৈষ্ণব ঐতিহ্যের প্রবেশক গ্রন্থ বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যগ্রন্থটি ‘গোবিন্দবিজয়’ ও ‘গোবিন্দমঙ্গল’ নামেও পরিচিত। গৌড়েশ্বর রুকনুদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) মতান্তরে শামশুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দ) মালাধার বসুকে গুণরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যান রচয়িতা/বাংলা সাহিত্যে নবধারার জনক
হিন্দুদের রচিত মধ্যযুগের সমস্ত সাহিত্যকর্মই ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। সাহিত্যকে হিন্দু সাহিত্যিকরা ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাবার সাহস পান নি। মুসলিম সাহিত্যিকগণ সাহিত্যে মানব জীবনের সুঃখ-দুঃখ, প্রেম-প্রীতি ও রোমান্টিকতা এনে বাংলা সাহিত্য চর্চায় নবধারার সূচনা ঘটান। প্রণয়োপাখ্যান এবং অনুবাদজাতীয় সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে মধ্যযুগের মুসলিম কবি শাহ্ মোহাম্মদ সগীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন। সে হিসেবে তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নবধারার জনক বলা যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম প্রণয়োপাখ্যান ’ইউসুফ জোলায়খা‘ কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন।

শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) ও কড়চা
শ্রীচৈতন্যদেব ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল বিশ্বম্ভর এবং বাল্য নাম নিমাই। গাত্র বর্ণের জন্য তাঁকে গোরা বা গৌরাঙ্গ বলেও ডাকা হত। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ সংক্ষেপে চৈতন্য নামে পরিচিতি পান। বাংলা সাহিত্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি রাজা বা সম্রাট না হওয়া সত্বেও তাঁকে ও তাঁর মতবাদকে ঘিরে ‘বৈঞ্চব সাহিত্য’ নামে বিশাল এক সাহিত্য শাখা গড়ে উঠে। কড়চা বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। চৈতন্যদেবের জীবন কাহিনীকে ‘কড়চা’ বলা হয়।

চৈতন্যদেবের জীবন কাহিনি
চৈতন্যদেবের প্রথম জীবন কাহিনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল। তবে তাঁর প্রথম জীবনীকার হিসেবে মুরারী গুপ্ত খ্যাত। ‘কড়চা’ নামে পরিচিত মুরারী গুপ্তের কাব্য গ্রন্থটির প্রকৃত নাম ‘শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃত’। মুরারী গুপ্ত চৈতন্যের সমসাময়িক ছিলেন। চৈতন্যদেবের জীবন কাহিনী অবলম্বনে মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে জীবনী সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। বৃন্দাবন দাসের ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’(১৫৪৮ খ্রিষ্টাব্দ), লোচনদাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’(১৫৫০-১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ), জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ (১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দ), কৃষ্ণদাসকবিরাজের ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ (১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দ), ‘গোবিন্দদাসের কড়চা’, চূড়ামনিদাসের ‘গৌরাঙ্গবিজয়’ ইত্যাদি জীবনী সাহিত্য এ ধারার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন চৈতন্যদেব মারা যান।

এক লাইন না লিখেও সাহিত্য ইতিহাসে অমর ব্যক্তিত্ব
এক লাইনও না লিখেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে ব্যক্তি অমর হয়ে আছেন তিনি হচ্ছেন শ্রীচৈতন্যদেব। ষোড়শ শতকের শেষার্ধ হতে আঠার শতকের প্রথমদিক পর্যন্ত দেড়শ বছর চৈতন্য সাহিত্যের জোয়ারে বাংলা সাহিত্য সয়লাব হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের আর কোনো সাহিত্যে এমন ক্ষণজন্মা ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব আর নেই।

বৈষ্ণব সাহিত্য ও ব্রজবুলি ভাষা
বৈষ্ণব ধর্মমতকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগে যে বিশাল ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্য সম্ভারের সৃষ্টি হয়েছিল তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বৈষ্ণব সাহিত্য’ নামে পরিচিত। শুধু কবিতা নয় গান হিসেবেও বৈষ্ণব পদাবলীর যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীর অধিকাংশই রচিত হয়েছে ব্রজবুলি নামের একটি মিশ্র ভাষায়। বাংলা ভাষা ও মৈথিলি ভাষার মিশ্রণে সৃষ্ট ভাষা ব্রজবুলি ভাষা নামে পরিচিত। বৈষ্ণব সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের মধ্যে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গোবিন্দ দাসের ‘কড়চা’ বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল‘ এবং লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলীর আদি রচয়িতা চণ্ডীদাস।

বিদ্যাপতি, মৈথিল কোকিল, অভিনব জয়দেব
মিথিলার কবি বিদ্যাপতি দ্বারভাঙ্গা জেলার অন্তর্গত বিসফী নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মৈথিল কোকিল ও অভিনব জয়দেব নামে খ্যাত বিদ্যাপতি একাধারে কবি, শিক্ষক, কাহিনীকার, ঐতিহাসিক ও ভূ-বৃত্তান্ত লেখক। এছাড়া স্মার্ত নিবন্ধকার হিসেবে ধর্মকর্মের ব্যবস্থাদাতা এবং আইন জাতীয় প্রামাণ্য গ্রন্থের লেখক হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন। বিদ্যাপতি সহস্রাধিক পদাবলী রচনা করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে ১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, আবার ডঃ বিমান বিহারী মজুমদারের মতে সম্ভবত ১৩৮০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৪৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিদ্যাপতি জীবিত ছিলেন। অপভ্রংশে তিনি ‘কীর্তিলতা’ নামের একটি ঐতিহাসিক কাব্য লিখেছিলেন। বাঙালি না হয়েও অথবা বাংলা কবিতা রচনা না করেও তিনি বাঙালি বৈষ্ণবের গুরুস্থানীয় কবি হিসেবে নিজের আসন অবিস্মরণীয় করে গেছেন।

মধ্যযুগের মহিলা কবি
মধ্যযুগের মহিলা কবিদের মধ্যে রামী বোধানী, মাধবী দাসী, চন্দ্রাবতী, আনন্দময়ী, গঙ্গামণি ও রহিমুন্নিসা স্বকীয় কীর্তিতে ভাস্বর। এদের মধ্যে চন্দ্রাবতী ছিলেন শীর্ষ স্থানীয়া। ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে কিশোরগঞ্জ জেলার নীলগঞ্জের পাটোয়ারী গ্রামে চন্দ্রাবতী জন্মগ্রহণ করেন। ‘মনাসামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা দ্বিজ বংশীদাস ছিলেন চন্দ্রাবতীর পিতা। ‘রামায়ণ’ চন্দ্রাবতীর শ্রেষ্ঠ কাব্য কীর্তি। পিতার আদেশে তিনি কাব্যগ্রন্থটি রচনা শুরু করেন। রামের জন্ম হতে সীতার বনবাস পর্যন্ত লেখা শেষ হওয়ার পর এক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের কেন্দ্র
বড়-খাঁ গাজী নামে খ্যাত পির ইসমাইল গাজীকে আশ্রয় করে ভূরশূট-মন্দারণে দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের কেন্দ্র গড়ে উঠে। গরীবুল্লা এবং সৈয়দ হামজা ভূরশূট-মন্দারণের দুজন প্রখ্যাত কবি। গরীবুল্লা ছিলেন বড়-খাঁ গাজীর ভক্ত। তিনি উর্দু কাব্যগ্রন্থ ‘ দাস্তান-ই-আমীর হামজার ভাবালম্বনে ‘আমীর হামজা’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তবে তা সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ হামজা গরীবুল্লার অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ ‘আমীর হামজা’ রচনার কাজ সমাপ্ত করেন। গরীবুল্লার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ইউসুফ জোলেখা’। উল্লেখ্য বাংলায় ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যগ্রন্থের আদি রচয়িতা শাহ মুহম্মদ সগীর। গরীবুল্লার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ‘জঙ্গনামা’ (মুহম্মদ এয়াকুব আলীর নামে পরিচিত), ‘সোনাভানের পুঁথি’ (সৈয়দ হামজার নামে প্রচলিত), এবং সত্য-পীরের পুঁথি উল্লেখযোগ্য। দোভাষী পুঁথি রচয়িতাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন সৈয়দ হামজা। তাঁর রচিত চারটি কাব্যগ্রন্থ- ‘মধুমালতি’, আমির হামজা’(দ্বিতীয় খণ্ড), ‘জৈগুনের পুঁথি’ ও ‘হাতেম তাই’।

দোভাষী পুঁথির রোমান্টিক কাহিনী
দোভাষী পুঁথির রোমান্টিক কাহিনীর মধ্যে ‘লায়লি-মজনু’, ‘গোলে বকাউলি’, ‘চাহার দরবেশ’ এবং ‘হাতেম তাই‘ এর উপাখ্যান প্রসিদ্ধ। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ খাতের লায়লি-মজনু কাব্য রচনা করেন। এটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দোভাষী পুঁথির রোমান্টিক কাহিনী।
দোভাষী পদ্যে শাহনামার তরজমা ও মধুমালতি কাব্যের আদি রচয়িতা
দোভাষী পদ্যে শাহনামার প্রথম তরজমা করেন মুহাম্মদ খাতের। ষোড়শ শতকের হিন্দী-অবধী ভাষার কবি মন্ঝন ‘মধুমালতি’ কাব্যের আদি রচয়িতা।

কবিওয়ালা
যে সকল ব্যক্তি উপস্থিত ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয় নির্বাচন করে ছন্দোবদ্ধ পদ্য রচনা করতেন তারা কবিওয়ালা নামে পরিচিত ছিলেন। তাদের রচিত ছন্দোবদ্ধ পদ্য রচনাকে কবিগান বলা হত। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কবিগানের প্রসারকাল হিসেবে খ্যাত।

গীত গোবিন্দম
সেন আমলের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘গীতগোবিন্দম’। লক্ষ্মন সেনের সভাকবি জয়দেব গ্রন্থটি রচনা করেন। রাধাকৃঞ্চের প্রণয়লীলা ‘গীতগোবিন্দম’ গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু।

পদাবলী
পদাবলী মধ্যযুগের আদিপর্বের সর্বাপেক্ষা শ্রুতিমধুর সাহিত্যকর্ম। ‘পদাবলী’ সাহিত্যে কবির সংখ্যা ছিল ১৫০ জন। এদের মধ্যে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।

বাউল
ঊনিশ শতকের সবচেয়ে খ্যাতিমান বাউল লালন শাহ। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলায় লালন শাহ জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়ায় মৃত্যুবরন করেন। শৈশবে গৃহ ত্যাগ করে তিনি কুষ্টিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাউল কবিদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। তবে ঊনিশ শতকের শেষভাগে হরিনাথ মজুমদার নামক কুষ্টিয়ার একজন হিন্দু কবি বাউল সুরে আধ্যাত্বিক কবিতা রচনা করে কাঙ্গাল হরিনাথ নামে প্রসিদ্ধি হয়ে উঠেছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস
প্রাচীন ও আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস রচয়িতা পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে রামগতি ন্যায়রত্ন রচিত ‘বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাব’ বাংলা সাহিত্যের বিবরণ সম্বলিত ভাষা সর্ম্পকিত প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও ঊনিশ শতকের সাহিত্য সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করা হয়েছে। তিনটি অংশে বিভক্ত ভাষা সম্পর্কিত ইতিহাস গ্রন্থটি (১) আদ্যকাল অর্থাৎ প্রাক-চৈতন্য পর্ব, (২) মধ্যকাল অর্থাৎ চৈতন্যযুগ এবং (৩) ইদানীন্তন কাল নামক তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস ও কৃত্তিবাসের; দ্বিতীয় অংশে ভারতচন্দ্রের পূর্ব পর্যন্ত এবং তৃতীয় অংশে ভারতচন্দ্র হতে রামগতি ন্যায়রত্নের সমকালীন কবি সাহিত্যিকগণের বিবরণ রয়েছে।

error: Content is protected !!