বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

ষষ্ঠ অধ্যায়
মঙ্গলকাব্যের কথা

মঙ্গলকাব্য
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান-কাব্য ‘মঙ্গলকাব্য’ নামে পরিচিত। ‘মঙ্গল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘কল্যাণ’। যে কাব্যের কাহিনী শ্রবণ করলে কল্যাণ হয় এবং সর্ববিধ অকল্যাণ দুরীভূত হয়ে পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল ঘটে সেগুলো মঙ্গলকাব্য। বিভিন্ন দেবদেবীর গুণগান মঙ্গলকাব্যগুলোর উপজীব্য। মনসা ও চণ্ডী মঙ্গলকাব্যের অন্যতম দেবদেবী। পনের শতকে মঙ্গলকাব্যের উৎপত্তি ও বিকাশের পালা শুরু হয় এবং মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ রচনার মাধ্যমে মঙ্গলকাব্য যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে। মঙ্গলকাব্য দেবদেবীর মহাÍ্য বর্ণনা সমৃদ্ধ এক ধরণের পাঁচালীকাব্য। লৌকিক দেবতা ও পৌরণিক কাহিনী নিয়ে ‘মঙ্গলকাব্য’ রচিত। মঙ্গলকাব্য ধারার অসংখ্য কবিদের মধ্যে শিবায়নের কবি রামেশ্বর, গোরক্ষ বিজয়ের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ, মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্ত, চণ্ডীমঙ্গলের কবি মাধবাচার্য, মুকুন্দরাম ও অন্নদামঙ্গলের কবি ভারতচন্দ্র, ধর্মমঙ্গলের আদিকবি ময়ূরভট্ট, কনিকামঙ্গলের কবি কঙ্কন উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন প্রকার কাব্যে ‘মঙ্গল’ কথাটি ব্যবহার করা হলেও কেবল বাংলা লৌকিক দেবতাদের নিয়ে রচিত কাব্যই ‘মঙ্গলকাব্য’ নামে অভিহিত হয়। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে পৌরণিক শ্রেণির গৌরীমঙ্গল, ভবানীমঙ্গল, দুর্গামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, কমলামঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, চণ্ডিকামঙ্গল এবং লৌকিক শ্রেণির মধ্যে শিবায়ন বা শিবমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, কালিকামঙ্গল (বা বিদ্যাসুন্দর), শীতলামঙ্গল, রায়মঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, সারদামঙ্গল, সূর্যমঙ্গল উল্লেখযোগ্য।
মনসামঙ্গল
সর্পের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসা। মনসার কাহিনী নিয়ে রচিত কাব্য মনসামঙ্গল কাব্য নামে পরিচিত। ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেনের অভিমত এ যে, কমপক্ষে ৬২ জন কবি ‘মনসামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেছেন। নারায়ণ দেব, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, ষোড়শ শতকের কবি গঙ্গাদাস সেন, সপ্তদশ সতকের রামজীবন বিদ্যাভূষণ, বাণেশ্বর, জীবন মৈত্র প্রমূখ মনসামঙ্গল কাব্য ধারার উল্লেখযোগ্য কবি। কানা হরিদত্ত মনসা মঙ্গলের আদিকবি হিসেবে খ্যাত।
মনসামঙ্গল ধারার আদিকবি
কানা হরিদত্ত ছিলেন মনসামঙ্গল কাব্যের আদিকবি। চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে পূর্ববঙ্গে কবি কানা হরিদত্ত জন্মগ্রহণ করেন। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগের কবি বিজয়গুপ্ত কানা হরিদত্তকে মনসামঙ্গল কাব্যের আদিকবি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি
মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি নারায়ন দেব। কিশোরগঞ্জ জেলার বোরগ্রামে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে কবি নারায়ণ দেব জন্মগ্রহণ করেন। নারায়দেবের কাব্যের নাম ‘পদ্মপুরাণ’। কাব্যগ্রন্থটি তিন খণ্ডে বিভক্ত। মনসামঙ্গলে প্রতিফলিত করুণ রসের স্বাভাবিক বিবরণের সাবলীল বর্ণনা বিবেচনায় মনসামঙ্গল কাব্যে নারায়ন দেবের সমকক্ষ আর কেউ নেই। তাই তাঁকে মনসামঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি বলা হয়।
সু¯পষ্ট সনযুক্ত মনসামঙ্গল কাব্য
বাংলা সাহিত্যে সু¯পষ্ঠ সনযুক্ত মনসামঙ্গল কাব্যের প্রথম রচয়িতা বিজয়গুপ্ত। তিনি গৌড়েশ্বর সুলতান হুসেন শাহের আমলে ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। বরিশাল জেলার গৈলা গ্রামে কবি বিজয়গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। মনসামঙ্গল কাব্যের আর একজন কবি বিপ্রদাস পিপিলাই, যিনি সুনির্দিষ্ট সন উল্লেখ করে মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। তার রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘মনসাবিজয়’ ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
বিপ্রদাস পিপিলাই
বিজয়গুপ্তের সামসময়িক কবি বিপ্রদাস পিপিলাই। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল রচনার এক বছর পর ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘মনসাবিজয়’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন। কথিত হয় যে, বিপ্রদাস পিপিলাই স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের আমলে ‘মনাসবিজয়’ কাব্য রচনা করেন।
দ্বিজ বংশীদাস
কবি চন্দ্রাবতীর পিতা দ্বিজ বংশীদাস সপ্তদশ শতকের শেষভাগে, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘মনসামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেছিলেন। কাব্যে কবি দ্বিজ বংশী, বংশীধর, বংশীবাদন প্রভৃতি ভণিতা ব্যবহার করেছেন। কবি জীবিতকালে দল বেঁধে মনসার ভাসান গেয়ে বেড়াতেন।
বাইশা/ বাইশ কবির মনসা
মনসামঙ্গলের জনপ্রিয়তা এমন তুঙ্গে উঠেছিল যে, কবিরা মনসামঙ্গল কাব্য রচনার প্রতি ঝুকে পড়েছিলেন। কয়েক জন্য কবি মনসামঙ্গল কাব্যের জনপ্রিয়তাকে সামনে রেখে বিভিন্ন কবির রচিত কাব্য হতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংগ্রহ করে একটি পদসংকলন প্রকাশ করেছিলেন। বাইশ জন মনসামঙ্গল কবির অংশ নিয়ে সংকলণটি চয়িত হয়েছিল। তাই পদসংকলণটি ‘বাইশ কবির মনসামঙ্গল’ বা ‘বাইশা’ বা ‘বাইশ কবি মনসা’ নামে পরিচিতি পায়। এ ধরণের অন্য একটি মনসামঙ্গল সংকলন ‘ষটকবি মনসামঙ্গল’ নামে পরিচিত। বাইশ কবির মনসামঙ্গলে বাইশ জন কবির উল্লেখ থাকলেও সবার নাম পাওয়া যায় নি।
চণ্ডীমঙ্গল
চণ্ডীদেবীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত কাব্যকে ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য বলা হয়। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনী আক্ষেটিক ও বণিক নামের দুটি পৃথক খণ্ডে দুটি ভিন্ন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। চণ্ডীমঙ্গল ব্যতীত অন্যান্য মঙ্গল কাব্যে কেবল একটি কাহিনী রয়েছে। চণ্ডীমঙ্গলের কবিদের মধ্যে মাণিক দত্ত, দ্বিজ মাধব, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের পরবর্তী কবিগণের মধ্যে দ্বিজ রামদেব, মুক্তরাম সেন, হরিরাম, লালা জয়নারায়ণ সেন, ভবানীশঙ্কর দাস, অকিঞ্চন চক্রবর্তী খ্যতি লাভ করেছিলেন। উল্লেখ্য যোড়শ শতক চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের প্রসারকাল।
চণ্ডীমঙ্গলের আদিকবি
মাণিকদত্ত চণ্ডীমঙ্গলের আদিকবি। ষোড়শ শতকের পূর্বে আবির্ভূত কবি মাণিক দত্ত চণ্ডীমঙ্গল কাব্য ধারার প্রবর্তক। চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরামের কবি-বন্দনায় মাণিক দত্তের উল্লেখ রয়েছে। তিনি গৌড় বা মালদহের অধিবাসী ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। কারণ তাঁর কাব্যে যে সকল নদী ও গ্রামের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো মালদহ অঞ্চলের। মাণিক দত্তের আত্ম-বিবরণ হতে জানা যায় যে, তিনি কানা ও খোঁড়া ছিলেন। দেবীর আশীর্বাদে সুস্থ হন এবং স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ইস্ট দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য চণ্ডীমঙ্গল কাব্যটি রচনা করে বাংলা সাহিত্য ধারায় নতুন রসের সূচনা ঘটান।
চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি
কবি কঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (জন্ম ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বভাগে) চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে খ্যাত। তিনি ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বভাগে বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মঙ্গলকাব্য ছাড়াও তিনি তৎকালীন সাহিত্য বাসরের প্রতিটি জনপ্রিয় ধারার শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাঁকে মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কবি বলা হয়। ডিহিদার বা প্রধান রাজকর্মচারী মাহমুদ শরীফের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জন্মভূমি পরিত্যাগ করে মেদিনীপুর জেলার আড়রা গ্রামের ব্রাহ্মন জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেন। জমিদার বাঁকুরা রায় মুকুন্দরামকে তাঁর পুত্র রঘুনাথের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। বাঁকুরা রায়ের মৃত্যুর পর রঘুনাথ জমিদার হন এবং মুকুন্দরামকে নিজ সভাসদরূপে মর্যাদা প্রদান করেন। জমিদার রঘুনাথের নির্দেশে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘শ্রীশ্রীচণ্ডীমঙ্গল কাব্য’ (১৫৯৪-১৬০৩ খ্রি.) রচনা করেন। এ জন্য রঘুনাথ তাঁকে কবি কঙ্কণ উপাধিতে ভূষিত করে সম্মানিত করেন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ঐতিহ্য অবলম্বনে রচিত মঙ্গলকাব্য
১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে কবি দ্বিজ রামদেব রচিত ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ঐতিহ্য অবলম্বনের রচিত চণ্ডীমঙ্গল ধারার কাব্যগ্রন্থ। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার কবি মুক্তারাম সেন রচিত ‘সারদামঙ্গল’ একটি উল্লেখযোগ্য মঙ্গলকাব্য।
চণ্ডীমঙ্গলের শেষ কবি
কবি অকিঞ্চণ চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গলের শেষ কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর উপাধি ছিল কবীন্দ্র। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে তিনি চণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন। মেদিনীপুরের ঘটাল মহকুমার বেঙ্গারাল গ্রামে কবি অকিঞ্চন চক্রবর্তী জন্মগ্রহণ করেন।
ধর্মমঙ্গল
ধর্ম ঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলা সাহিত্যে ধর্মমঙ্গল কাব্য রচনার সূত্রপাত। ধর্মঠাকুর নামে কোনো এক পুরুষ দেবতার পূজা ডোম সম্প্রদায়সহ হিন্দু সমাজের নিচু স্তরের লোকদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনী রয়েছে। যথা- রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনী এবং (২) লাউসেনের কাহিনী। লাউসেনের কাহিনীই কাব্যে সমধিক প্রাধান্য পেয়েছে। এ ধারার কবিদের মধ্যে ময়ূরভট্ট, আদি রূপরাম, খেলারাম, মাণিকরাম, রূপরাম, শ্যাম পণ্ডিত, সীতারাম দাস, রাজারাম দাস, রামদাস আদক, দ্বিজ প্রভুরাম, ঘনরাম চক্রবর্তী, সহদেব চক্রবর্তী, নরসিংহ বসু, হৃদয়রাম সাউ প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। প্রায় বিশজন কবি ধর্মমঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন।
ধর্মমঙ্গলের আদিকবি
ময়ূরভট্ট ধর্মমঙ্গলের আদি কবি। তবে তাঁর কোনো পুঁথি পাওয়া যায় নি। পরবর্তীকালে রচিত কয়েকজন কবির রচনায় ময়ূরভট্টকে আদিকবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে তিনি সপ্তদশ শতকের কবি ছিলেন।
ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি
কবি ঘনরাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গলকাব্য ধারার অষ্টাদশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘শ্রীধর্মমঙ্গল’। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে কাব্য গ্রন্থটির রচনা শেষ হয়। বর্ধমান জেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে কবি ঘনরাম চক্রবর্তী জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মঠাকুরের অনুগৃহীত লাউসেনের কাহিনী তাঁর কাব্যের উপজীব্য।
শিবায়ন বা শিবমঙ্গলের কবি
হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, নাথধর্ম ও বাংলার বিভিন্ন জনপদের লৌকিক ধর্মের উপাদানের উপর ভিত্তি করে শিবের এক নতুন রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ নতুন রূপের উপর ভিত্তি করে পৌরণিক ও লৌকিক উপাদান মিশ্রিত শিবমঙ্গল বা শিবায়ন কাব্য রচিত হয়। সপ্তদশ শতকের পূর্বে শিবমঙ্গল কাব্য রচিত হয় নি। রামকৃষ্ণ রায় নামক জনৈক কবি অনুমান ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে পৌরণিক ও লৌকিক আখ্যান অবলম্বনে সুবৃহৎ শিবমঙ্গলকাব্য রচনা করেন। কবি কাব্যগ্রন্থটির নামকরণে ‘শিবায়ন’ বা ‘শিবের মঙ্গল’ নাম ব্যবহার করেছেন। শিবমঙ্গলের দ্বিতীয় কবি শঙ্কর কবিচন্দ্র। তিনি ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘শিবমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। রামেশ্বর ভট্টাচার্য অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে ‘শিবায়ন’ বা ‘শিব-সংকীর্তন’ নামক কাব্যটি রচনা করেন। এটি শিবমঙ্গল ধারার সর্বাধিক জনপ্রিয় শিবমঙ্গল কাব্য হিসেবে ব্যাপক প্রসার পেয়েছিল।
কালিকামঙ্গল
মূলত বিদ্যাসুন্দরের প্রেমকাহিনী কালিকামঙ্গল কাব্যের উপজীব্য। তন্ত্র শাস্ত্রে কালী শক্তিদেবতা চণ্ডীরই রূপভেদ মাত্র। পরবর্তীকালে নিচুস্তরের অনার্য সমাজ হতে কালিকাদেবীর আবির্ভাব ঘটে। চণ্ডীর সঙ্গে কালিকার মিল থাকলেও কাব্যক্ষেত্রে এদের কোনো মিল নেই। কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর কাব্যের আদিকবি কঙ্ক। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পৌত্র ফিরোজ শাহের উৎসাহে বিদ্যাসুন্দর কাব্যের অন্যতম কবি চট্টগ্রাম নিবাসী শ্রীধর কবিরাজ ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচনা করেন। এ ধারার অন্যান্য কবিদের মধ্যে সাবরিদ খান এবং গোবিন্দদাস (১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দ), রামপ্রসাদ সেন উল্লেখযোগ্য। ভারতচন্দ্রের সমসাময়িক শ্যামাসঙ্গীত খ্যাত রাম প্রসাদ সেন কলিকামঙ্গলের কবি হিসেবেও খ্যাত। নবদ্বীপের রাজা তাঁকে কবিরঞ্জন উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
রামপ্রসাদ সেন
শ্যামা সঙ্গীত খ্যাত রামপ্রসাদ সেন কালিকামঙ্গলের একজন বিশিষ্ট কবি। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে চব্বিশ পরগণা জেলার হালিশহরের নিকটবর্তী কুমারাই গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কাব্যের নাম ‘কবিরঞ্জন’। কাব্যটি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ (১৭৫২খ্রিস্টাব্দ) রচনার দুই বছর পূর্বে কিংবা পরে রচিত হয়েছিল। নবদ্বীপের রাজা তাঁকে কবিরঞ্জন উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
অন্নদামঙ্গল
মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে খ্যাত অষ্টাদশ শতকের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (জন্ম ১৭০৫-১৭১০ খ্রিস্টাব্দ) ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি হয়েছিলেন। অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে গুণাকর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মঙ্গলকাব্য ধারার শেষকবি ভারতচন্দ্র রায় বিদ্যসুন্দর কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে খ্যাত। অন্নদামঙ্গল কেবল মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত। ভারতচন্দ্রকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি বলা হয়। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে মৈথিলি কবি ভানুদত্তের ‘রসমঞ্জরী’ কাব্যের অনুবাদ অন্যতম। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘নাগাষ্টক’ ও ‘গঙ্গাষ্টক’ নামক দুটি কবিতা রচনা করেছিলেন। ‘চণ্ডীনাটক’ রায়গুণাকরের একটি অসমাপ্ত রচনা। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে কবি রায়গুণাকর মৃত্যুবরণ করেন।

error: Content is protected !!