বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

সপ্তম অধ্যায়
মধ্যযুগের প্রথম ও প্রধান

মধ্যযুগের প্রথম কাব্য
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মধ্যযুগের প্রথম কাব্য। কাব্যটির রচয়িতা বড়ূচণ্ডীদাস মধ্যযুগের আদিকবি। লোকসমাজে প্রচলিত রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক গ্রাম্য গল্প অবলম্বনে কবি বড়ূচণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন।
মধ্যযুগের প্রথম মহিলা কবি
কবি চন্দ্রাবতী মধ্যযুগের প্রথম মহিলা কবি। তিনি ছিলেন চিরকুমারী। ‘দস্যু কেনারাম‘ চন্দ্রাবতীর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
বিদ্যাসুন্দর প্রণয়কাহিনীর প্রথম রূপকার
বিদ্যাসুন্দর কবিদের অন্যতম সংস্কৃত কবি বিলহন চৌরপঞ্চশিকা বিদ্যাসুন্দর প্রণয়কাহিনীর প্রথম রূপকার হিসেবে পরিচিত।
মানবীয় আখ্যায়িকা ধারার প্রবর্তক
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য যখন দেবদেবীর মাহাত্ম্যকীর্তণে সয়লাব তখন আরাকানের বৌদ্ধ রাজাদের সভায় বাংলা সাহিত্য চর্চার ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে কবি দৌলত কাজী একটি নব ধারার সূচনা করেন। তিনি থিরি থুধর্ম্মা বা শ্রী সুধর্মার (১৬২২-১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) শাসনামলে লস্কর উজির বা সমরসচিব আশরাফ খানের অনুরোধে হিন্দি কবি সাধনের ‘মৈনাসত’ কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মানবীয় আখ্যায়িকা ধারার প্রবর্তন করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যান
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রোমান্টিক সাহিত্য ধারার প্রাচীনতম লেখক শাহ মুহাম্মদ সগীর। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যানের রচয়িতা। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি হিসেবেও খ্যাত। চতুর্দশ শতকের কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ জোলেখা’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যান। ১৮৩৯-১৪০৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত এ কাব্যগ্রন্থটি উপমহাদেশীয় সাহিত্যে প্রথম লৌকিক মানবীয় প্রণয় উপাখ্যান হিসেবেও পরিচিত। গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪০৯ খ্রিস্টাব্দ) কবি শাহ মুহম্মদ সগীর কাব্যটি রচনা করেন। কবি হিসেবে শাহ মুহম্মদ সগীর প্রথম গৌড়েশ্বরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন।
প্রথম মহিলা ঐতিহাসিক
সম্রাট হুমায়ুনের ভগ্নী গুলবদন বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঐতিহাসিক। তিনি তাঁর ভাই সম্রাট হুমায়ুনের রাজত্বকালের ইতিহাস লিখে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ঐতিহাসিক হিসাবে খ্যাত হয়ে আছেন।
পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীনতম লেখক
সৈয়দ হামজা পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীনতম লেখক। মধ্যযুগের শেষদিকে পুঁথি সাহিত্য রচিত হয়। তাঁর জন্ম ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে। মধুমালতি, আমির হামজা (২য় খণ্ড) জৈগুনের পুঁথি ও হাতেমতাই সৈয়দ হামজার বিখ্যাত পুঁথি গ্রন্থ।
বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক
ঢাকার ভাওয়ালে অবস্থানকালে পর্তুগিজ পাদরী ম্যানুয়েল দ্যা আস্ স¤পসাম্ ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে ভাওয়ালের প্রচলিত মৌখিক ভাষায় ‘কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ’ নামক একটি পুস্তক রচনা করেন। পুস্তকটি লিসবনে রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা গদ্যে লিখিত প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ ট্রাজেডি
ফারসি কবি জামির রচিত ‘লায়লী মজনু’ নামক কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে দৌলত উজির বাহরাম খান ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘লায়লী মজনু’ নামক যে কাব্যটি রচনা করেন সেটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ ট্রাজেডি হিসেবে স্বীকৃত। এরপূর্বে বাংলা সাহিত্যে কোনো যথার্থ ট্রাজেডি ছিল না।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম অলৌকিকতা-মুক্ত গ্রন্থ
ফারসি কবি জামীর ‘লায়লী মজনু’ নামক কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে দৌলত উজির বাহরাম খান কর্তৃক ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ ‘লায়লী মজনু’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম অলৌকিকতা বিবরণ মুক্ত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
প্রাচীনতম লোকসাহিত্য ও প্রাচীনতম ছন্দ/ বাংলা লোক সাহিত্যের উৎস
লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি ‘ছড়া’। বাংলা সাহিত্যে যত প্রকার লোকসাহিত্য আছে তন্মধ্যে ‘ছড়া’ প্রাচীনতম। ছড়ার ছন্দ বাংলা কবিতার প্রাচীনতম ছন্দ। ছড়ার পূর্বে বাংলা সাহিত্যে অন্য কোনো ছন্দ ছিল না। তাই ছড়াকে বাংলা লোকসাহিত্যের উৎস বলা হয়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম মৌলিক-কাব্য
শ্রী সুধর্মা (রাজত্বকাল ১৬২২-১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) এর শাসনামলে কবি মরদন (অনুমান ১৬০০-১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘নসীরনামা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম মৌলিক-কাব্য। সে হিসেবে কবি মরদনকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক কবি বলা যায়।
মধ্যযুগের প্রথম মৌলিক কাব্য
চট্টগ্রামের কবি দৌলত কাজীর ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’ কাব্য গ্রন্থকে মধ্যযুগের প্রথম মৌলিক কাব্য বলা হয়।
বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম জীবনী কাব্য
বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম জীবনী কাব্য বৃন্দাবন দাসের (জন্ম ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’। কাব্যটি ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। রচনাকালে গ্রন্থটি ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে পরিচিত ছিল।

মঙ্গলকাব্যের সমাপ্তি কাব্য
মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ রচনার মাধ্যমে মঙ্গলকাব্য রচনার সমাপ্তি ঘটান। তিনি শুধু মঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবিই নন, সমগ্র মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবেও খ্যাত। তাঁকে মঙ্গল কাব্য যুগের শেষ কবি বলা হয়।
ভাগবত এর প্রথম বাংলা অনুবাদক
মালাধর বসু ভাগবতের প্রথম বাংলা অনুবাদক। ১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সাত বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্ধ অনুসরণে মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্য গ্রন্থটি রচনা করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য
জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য সংক্রান্ত্র সাহিত্য সৃষ্টির বিষয়ে মধ্যযুগের মুসলিম কবিরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এরপূর্বে অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের লেখায় জঙ্গনামা জাতীয় কোনো ধারণা প্রকাশ পায় নি। পনের শতকে রচিত জৈনুদ্দিনের ‘রসুল বিজয়’ মধ্যযুগের প্রথম জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য। অতএব জৈনুদ্দিনের ‘রসুল বিজয়’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুদ্ধকাব্য।
মধ্যযুগের শেষকবি
কবি ভারতচন্দ্রকে মধ্যযুগের শেষকবি বলা হয়। তিনি ‘পর-মধ্য যুগের শ্রেষ্ঠ রূপকার’ হিসেবেও পরিচিত। তাঁকে মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিও বলা হয়। ‘অন্নদামঙ্গল’ ভারতচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুরোধে তিনি ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে ‘গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
মধ্যযুগের আদি-নিদর্শন
রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত বড়ূচণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যগ্রন্থটি মধ্যযুগের আদি নিদর্শন। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য গ্রন্থের রচয়িতা বড়ূচণ্ডীদাসকে মধ্যযুগের ‘আদিকবি’ বলা হয়। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’কে বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতির দ্বিতীয় পদক্ষেপ বলা হয়।
উপন্যাসিকের ভাবপরিলক্ষিত মধ্যযুগের কবি
মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে কেবল মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখায় ঔপন্যাসিকের ভাব পরিলিক্ষিত হয়েছিল। তাই তাঁকে উপন্যাসিকের ভাবপরিলক্ষিত মধ্যযুগের প্রথম কবি বলা হয়।
গোবিন্দদাস
ষোড়শ শতকের তৃতীয় দশকে গোবিন্দদাসের জন্ম এবং সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তিনি প্রায় সাত শত পদ রচনা করেছিলেন। তবে অধিকাংশ পদ ব্রজবুলি ভাষায় লিখিত।
মধ্যযুগের প্রথম নাগরিক কবি
কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রকে মধ্যযুগের প্রথম নাগরিক কবি বলা হয়।
মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের অন্যতম চরিত্র
মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের অন্যতম চরিত্র কালকেতু ও ফুল্লরা।
প্রাচীন ও নতুন যুগের যুগ-সন্ধি স্থলের কবি
কবি মুকুন্দরামকে প্রাচীন ও নতুন যুগের ‘যুগ সন্ধি স্থলে’র কবি বলা হয়।
চণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গল কাব্যের আদি-কবি
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আদি কবি মাণিক দত্ত এবং মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি কানা হরিদত্ত।
বিদ্যাসুন্দর কাব্যের অন্যতম কবি
শ্রীধর কবিরাজকে বাংলা সাহিত্যের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের অন্যতম কবি বলা হয়।
মানবরসের প্রথমকবি
মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে ষোড়শ শতকের মানবরসের প্রথম কবি বলা হয়। তাঁর উপাধি ছিল কবি কঙ্কন।
মধ্যযুগের অবসান
১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ভারতচন্দ্র গুণাকরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অবসান ঘটে। ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর হতে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনকে কবিওয়ালা ও পুঁথি লেখকগণই টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ চল্লিশ বছর ছির কবিওয়ালা ও পুঁথিকারদের যুগ।
লোকগীতির সম্রাট
হাসান রাজা ও লালন শাহ বাংলা সাহিত্যের লোকগীতির সম্রাট হিসেবে পরিচিত।

error: Content is protected !!