বাংলা ভাষা,  বাংলা সাহিত্যের  প্রথম ও প্রধান, বাংলা সাহিত্যের কথা, একনজরে বাংলা সাহিত্য, বিসিএস বাংলা  সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান

অষ্টম অধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মুসলমানের অবদান

বাংলা সাহিত্যে মুসলমান আমল ও আরাকান রাজসভা
মুসলমান আমলে বাংলা ভাষা প্রকৃত অর্থ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করে। এ আমলে বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তি. বিকাশ ও প্রচার ঘটতে শুরু করে। প্রাক মুসলমান আমলে সংস্কৃত ভাষা দেব ভাষা বলে গণ্য হত। দেব ভাষা অব্রাহ্মনদের ব্যবহারের কোনো অধকিার ছিল না। তখন দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে যে সকল গ্রন্থ রচিত হত তাকে প্রকৃত সাহিত্য কর্ম বলা যায় না। বঙ্গদেশ মুসলমান অধিকারে আসার পর সংস্কৃত সাহিত্যের দেবত্ব মর্যাদার অবসান ঘটে। বাংলা ভাষার মর্যাদা সংস্কৃতকে অতিক্রম করে যেতে শুরু করে। এ পর্যন্ত যতগুলো প্রাচীন বাংলা কাব্য পাওয়া গেছে তার কোনোটি মুসলমান আমলের পূর্বের নয়। মুসলমান আমলে মুসলমান রাজন্যদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের প্রসার ঘটে।
সুলতানি আমল ও বাংলা সাহিত্য
মুসলিম সুলতানেরা বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের জন্য ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। গৌড়ের সুলতানের আদেশে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু ‘ভাগবতের’ বিশেষ অংশ অনুবাদ করেন। শ্রী করনন্দী অষ্টাদশ পর্বে মহাভারত অনুবাদের প্রয়াস নেন। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে এবং তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্তিবাস রামায়ণ অনুবাদ করেন। হুসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় চট্টগ্রামের কবি পরমেশ্বর প্রথম বাংলায় ‘মহাভারত’ রচনা করেন।
বাংলা সাহিত্যে সুলতানগণের অবদান
জালাল উদ্দিন মুহম্মদ শাহ এর পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্তিবাস ‘রামায়ণ’ রচনা করেন। তাঁর প্রেরণা ও অনুসরণে পরবর্তীকালে অনেকে রামায়ণ রচনার উদ্যোগ নেন। তম্মমধ্যে কবীন্দ্র, অনন্ত এবং অদ্ভুতাচার্য প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। গৌড় শাসক সামশুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪ -১৪৮২ খ্রিস্টাব্দ) এর পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থানুকুল্যে মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত কুলিন গ্রাম নিবাসী মালাধর বসু ‘ভাগবত গীতা’র ১০ম ও ১১শ অধ্যায়ের স্কন্ধ অনুসরণে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ) কাব্য রচনা করেন। গৌড় শাসক রুকন উদ্দিন মোবারক শাহ (১৪৫৯-৭৯ খ্রিস্টাব্দ) তাঁকে গুণরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করে সম্মানিত করেন।
গৌড় শাসক সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর আমলে শ্রী চৈতন্যদেব (১৪৮৫-১৫৩৩ খ্রি.) আবির্ভূত হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। মনসামঙ্গল কাব্যের কবি বিজয়গুপ্ত এবং মনসাবিজয় কাব্যের কবি বিপ্রদাস পিপিলাই হুসেন শাহের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করেছিলেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর হুসেন শাহকে কৃষ্ণের অবতার বলেছেন। বিজয়গুপ্তের ভাষায় হুসেন শাহ ‘নৃপতি তিলক’। যশোরাজ খান হুসেন শাহকে ‘সাহ হুসন জগতভূষণ’ মর্মে আখ্যায়িত করেছেন। পরাগল খান ছিলেন হোসেন শাহ কর্তৃক ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিয়োগকৃত শাসনকর্তা। পরাগল খানের আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর ‘মহাভারত পাঁচালী’ রচনা করেন। কবীন্দ্র রচিত মহাভারতটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘পরাগলী মহাভারত’ নামে পরিচিত। হুসেন শাহের পুত্র নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় কবিরঞ্জন উপাধিধারী বিদ্যাপতি এবং শেখ কবির বৈষ্ণবপদ রচনা করেন। নসরত সাহের পুত্র ফিরোজ শাহের আদেশে কবি শ্রীধর বিদ্যসুন্দর কাব্য রচনা করেন। ফিরোজ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় কবি আফজাল আলি কিছু বৈষ্ণবপদ রচনা করেছিলেন। গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বৃন্দাবনদাস ‘চৈতন্যভাগবত’ এবং লোচনদাস ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। শৌখণ্ডের কবি রঞ্জন বিদ্যাপতি এবং প্রথম বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচয়িতা দ্বিজ শ্রীধর নসরত শাহ এর প্রশংসা করেছিলেন। মরদন দৌলত কাজীর সমসাময়িক এবং রোসাঙ্গ রাজ শ্রী সুধর্মার রাজত্বকালে (১৬২২ খ্রিস্টাাব্দ – ৩৮ খ্রিস্টাব্দ) আবির্ভূত হন। ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১৬/১৭ জন বৌদ্ধ রোসাঙ্গ রাজের সময়ে এ পৃষ্ঠপোষকতা চলে। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের মুসলমান কবিদের মধ্যে শেখ চান্দ রছুল বিজয় বা ‘মোহাম্মদ বিজয়’ বা ‘রছুলনামা‘ রচনা করেন।
বাংলাদেশের বাইরে বাংলা সাহিত্য চর্চা
মধ্যযুগে বাংলাদেশের বাইরে আরাকান রাজসভায় বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা হত। দৌলত কাজী এবং আলাওল আরাকান রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। রোসাঙ্গ রাজসভায় রাজ পৃষ্টপোষকতা লাভকারী কবি, যারা বাংলা সাহিত্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে কবি দৌলত কাজী, আলাওল, মরদন, আবদুল করীম খোন্দকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আরাকান বাংলা সাহিত্য ‘রোসাঙ’ নামে পরিচিত। রোসাঙ্গের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ। বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাঁরা ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন।
দৌলত কাজী
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য যখন দেব দেবীর মাহাত্ম্যকীর্তনে সয়লাব তখন আরাকানের বৌদ্ধ রাজাদের সভায় বাংলা সাহিত্য চর্চার ব্যতিক্রমী নিদর্শন হিসেবে কবি দৌলতকাজী (১৬০০-১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) থিরি থুধর্ম্মা বা শ্রী সুধর্মা (রাজত্বকাল ১৬২২-১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) এর লস্কর উজির বা সমরসচিব আশরাফ খানের অনুরোধে হিন্দি কবি সাধন রচিত লোকগাঁথা-বিষয়ক কাব্য ‘মৈনাসত’ কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে ‘সতীময়না’ ও লোরচন্দ্রানী’ (রচনাকাল- ১৬২২-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ) কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মানবীয় আখ্যায়িকা ধারার প্রবর্তন করেন। কাব্যগ্রন্থটি সংক্ষেপে ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ নামে খ্যাত। এর পূর্বে বাংলা সাহিত্যে কাব্যগ্রন্থ কিংবা সাহিত্য রচনার একমাত্র উপজীব্য ছিল দেব-দেবীর মাহাত্ম্য। মানুষের কাহিনী অবলম্বনে ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ কাব্য রচনা করে দৌলত কাজী বাংলা সাহিত্যে নবযুগের সুচনা ঘটান। তবে কাব্যটি তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি। মাত্র দুই খণ্ড সমাপ্ত করার পর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন রোসাঙরাজ শ্রীচন্দ্র সুধর্মার মহাপাত্র সোলেমানের আদেশে কবি আলাওল দৌলত কাজীর অসমাপ্ত কাব্যটির শেষাংশ রচনা করেন। দৌলত উজিরের আসল নাম ছিলেন বাহরাম খাঁ। দৌলত কাজীকে বাংলা রোমান্টিক কাব্যধারার পথিকৃৎ বলা হয়। চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার অন্তর্গত সুলতানপুর গ্রামে কবি দৌলত কাজী (১৬০০-১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন।
আলাওল
মধ্যযুগে ‘কবিগুরু মহাকবি আলাওল’(১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ -১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ) এবং ‘শিরোমণি আলাওল’ হিসেবে পরিচিত আরাকান রাজসভার বিখ্যাত কবি আলাওল ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠতম কবি। তিনি প্রাকৃতপিঙ্গল, যোগশাসত্র, যাদুবিদ্যা, নৌকাবাইচ, অশ্বচালনা, কামশাস্ত্র,আধ্যাÍ্যবিদ্যা, ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম শাসত, ক্রিয়া, সংগীত ইত্যাদিতে পারদর্শী। তিনি বাংলা, হিন্দি, ফাসিী, বর্মি, সংস্কৃত, আরবি ইত্যাদি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘পদ্মাবতী’ তাঁর প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম। এ ছাড়া, ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’ (১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ), সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী (উত্তরাংশ-১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ), ‘হপ্ত পয়কর বা সপ্ত পয়কর’ (১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দ), সিকান্দরনামা’ (১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ), ‘তোহফা’ (১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ), সংগীতশাস্ত্র (রাগতালনামা) এবং ‘রাধাকৃষ্ণ রূপকে রচিত পদাবলী’ তাঁর সাহিত্য কর্মের অনন্য সৃষ্টির বিজয় কেতন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে অনুমান ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে কবি আলাওল জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৬ বছর বয়সে অনুমান ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমন করেন।
পদ্মাবতী
পদ্মাবতী আলাওলের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। এটি হিন্দি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সী ‘অবধী’ অর্থাৎ ‘পুবী হিন্দী’ ভাষায় চিতোরের ‘পদ্মিনী’ উপাখ্যাানের রপককাব্য ‘পদমুবাত’ (১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ) কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ। আরাকানরাজ সাদ উমাদার বা থাদোমিন্তারের আমলে (১৬৪৫-১৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) মাগন ঠাকুরের আদেশে ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্য রচনা করেন। অনুবাদ হলেও ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে আলাওল তাঁর মৌলিকত্ব ও কাব্য শক্তিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন যে, গবেষকেরা এটাকে আর শুধুমাত্র অনুবাদ কর্ম মনে করেন না।
আলাওলের শেষ কাব্যগ্রন্থ
সেকান্দরনামা’ কবি আলাওলের শেষ কাব্যগ্রন্থ। এটি আলাওলের ষষ্ঠ গ্রন্থ। গ্রন্থটি নিজামী গঞ্জভির ফারসি গ্রন্থ ‘সেকান্দরনামা’ গ্রন্থের অনুবাদ। আরাকানরাজ চন্দ্রসুধর্মার আমাত্য নবরাজ মজলিসের অভিপ্রায় ও আদেশে ১৬৭৩ (মতান্তরে ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দ) খ্রিস্টাব্দে আলাওল গ্রন্থটি রচনা করেন। আলাওল বাংলা ও ব্রজবুলিতে বৈষ্ণব পদাবলীও রচনা করেছিলেন।
কোরেশী মাগন ঠাকুর
আরাকান রাজ থাদোমিন্তার (১৬৪৫-১৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) ও সুধর্মার রাজমন্ত্রী এবং ‘চন্দ্রাবতী’ প্রণয় কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা কোরেশী মাগন ঠাকুর (১৬০০-১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত পৃষ্ঠপোষক। তাঁর প্রকৃত নাম মাগন সিদ্দিকী। তাঁর নিঃসন্তান পিতামাতা আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা করে বা মাগিয়া তাকে পেয়েছিলেন বলে পিতামাতা তাঁর নাম ‘মাগন’ রেখেছিলেন। ঠাকুর হচ্ছে রোসাঙ্গ রাজার ভূষিত উপাধি। তিনি আরবি, বাংলা, ফারসি, বর্মি, সংস্কৃত, পালি ও হিন্দি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। মাগন ঠাকুরের নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার প্রথম সৈনিক-কবি ও মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল হিন্দি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর পদুমাবৎ অবলম্বনে ‘পদ্মাবতী’ ও পারসি কাব্য অবলম্বনে রচিত ‘সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামাল’ রচনা করেছিলেন। পদ্মাবতী ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে থাদোমিন্তাারের সময় এবং সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামাল ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত। রোসাঙ্গ রাজের সমরসচিব সৈয়দ মোহাম্মদ খানের আদেশে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে আলাওল পারসি কবি নিজামী রচিত ‘হফত পয়কর’ বা ‘সপ্ত পয়কর’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তিনি রোসাঙ্গ রাজের আমাত্য শ্রীকান্ত সোলায়মানের আদেশে ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ-১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পারসি কবি ইউসুফ গাদার ‘তোহ্ফা’ রচনা করেন।
বটতলার সাহিত্য ও শাহ গরীবুল্লাহ
পুথি সাহিত্যকে বটতলার সাহিত্য বলা হয়। শাহ গরীবুল্লাহ ছিলেন পুথিঁ সাহিত্যের খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কবি। ‘আমীর হামজা’ গরীবুল্লাহর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থটি উর্দু কাব্য ‘দাস্তান-ই-আমীর হামজার’ ভাবালম্বনে রচিত। এছাড়া ‘দেওয়ানা মদীনা’ শোকগাঁথার কবি মনসুর বয়াতী, ‘রসুল বিজয়ের কবি’ জৈনুদ্দিন প্রমূখ শাহ গরীবুল্লার সমকালীন অন্যতম কবি। উল্লেখ্য পুথি সাহিত্যকে ‘বটতলার সাহিত্য’ বলা হয়।
সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল
আলাওলের দ্বিতীয় কাব্য ‘সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’। আরাকানরাজের প্রধান আমাত্য মাগন ঠাকুরের উৎসাহে কবি আলাওল ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের কাব্যটির রচনা কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাগন ঠাকুরের মৃত্যু হলে কবি ভগ্নোৎসাহ হয়ে কাব্যরচনা বন্ধ রাখেন। অনুমান ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ মুসার অনুরোধে তা সমাপ্ত করেন। আলিফ লায়লা বা আরব্য উপন্যাস কাব্যের ফারসি অনুবাদ এর ভাব অবলম্বনে এ কাব্যটি রচিত।
‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’র উত্তরাংশ
দৌলত কাজী রচিত ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’র অবশিষ্টাংশ আলাওলের তৃতীয় রচনা। আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্রসুধর্মার আমাত্য সোলেমানের উৎসাহে কবি আলাওল ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটি সমাপ্ত করেন।
সপ্তপয়কর, তোহফা ও সেকান্দরনামা
‘সপ্তপয়কর’ আলাওলের চতুর্থ রচনা এবং পারস্য কবি নিজামী গঞ্জভীর ‘হপ্তপয়কর’ নামক কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে রচিত। আরাকানরাজের সমরমন্ত্রী সৈয়দ মুহম্মদের আদেশে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে কবি আলাওল কাব্যটি রচনা করেন। ‘তোহফা’ আলাওলের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। এটি বিখ্যাত সুফী সাধক শেখ ইউসুফ গদা দেহলভীর ‘তোহ্ফাতুন নেসায়েহ্’ নামক ফারসি গ্রন্থের অনুবাদ। ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটি সমাপ্ত হয়। পঁয়তাল্লিশ অধ্যায়ে পরিব্যপ্ত ইসলাম ধর্মীয় নীতিকথা ও আদর্শ আচার-আচরণের বিবরণ সম্বলিত কাব্যটি আরাকানরাজের আমাত্য শ্রীমন্ত সোলেমানের উৎসাহে রচিত হয়।
মরদন/সচেষ্টায় কাব্য রচনার পথিকৃৎ
কবি মরদন ‘নসীরনামা’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা। এটি একটি মৌলিক রচনা। রোসাঙ্গরাজ শ্রীসুধর্মার রাজত্বকালে (১৬২২-১৬৩৮) তাঁর আবির্ভাব মর্মে অনুমিত। রোসাঙ্গের কাঞ্চি নগরে কবি বসবাস করতেন এবং সেখানে কাব্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। এটি রোসাঙ্গের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, যেটি কোনো রাজ পৃষ্টপোষকতা ছাড়া কবির সচেষ্টায় রচিত হয়। এ বিবেচনায় এটি একটি অসাধারণ সাহিত্য কর্ম।
আবদুল করীম খোন্দকার
আরাকানের অধিবাসী এবং রোসাঙ্গের রাজধানী ম্রোহং বা মুরুং নিবাসী আবদুল করিম খোন্দকার রোসাঙ্গরাজ প্রদত্ত ‘সাদিউকনামা’ উপাধিধারী রাজ-কোষাধ্যক্ষ আতিবর নামক জনৈক বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির আদেশে ফারসি গ্রন্থের ভাবলম্বনে ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ‘দুল্লা মজলিস’ কাব্য রচনা করেন। ‘হাজার মসাইল’ ও ‘নুরনামা’ নামে দুটি কাব্যও তিনি রচনা করেন।
শাহ মুহাম্মদ সগীর ও ইউসুফ জোলেখা
প্রথম মুসলমান কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর গৌড়েশ্বর সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের রাজত্বকালে (১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দ-১৪০৯ খ্রিস্টাব্দ) ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্য রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ধারার প্রবর্তন করেন। কাব্যটি পঞ্চদশ শতকের প্রথম দশকে রচিত বলে গবেষকদের ধারণা। বাইবেল ও কুরআন শরীফে নৈতিক উপাখ্যান হিসেবে সংক্ষেপে ইউসুফ জোলেখার কাহিনী বিধৃত আছে। ইরানের মহাকবি ফেরদৌসী ইউসুফ জোলেখা কাব্য রচনা করেছিলেন। কুরআন ও ফেরদৌসীর কাব্যের বর্ণনায় মুসলিম কিংবদন্তির সঙ্গে স্বীয় প্রতিভার সামঞ্জস্য ঘটিয়ে শাহ মুহম্মদ সগীর বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন। শাহ মুহম্মদ সগীর ব্যতীত ইউসুফ জোলেখা কাব্যের অন্যান্য রচয়িতাদের মধ্যে আবদুল হাকিম, শাহ গরীবুল্লাহ, গোলাম সফাতউল্লাহ, সাদেক আলী ও ফকির মুহম্মদ উল্লেখযোগ্য।
দৌলত উজির বাহরাম খান ও লায়লী মজনু
দৌলত উজির বাহরাম খান চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ কিংবা জাফরাবাদ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতা মোবারক খানকে চট্টগ্রামের অধিপতি দৌলত উজির উপাধিতে ভূষিত করেন। বাহরাম খান ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বা তার কাছাকাছি সময়ে নিজাম শাহ সুর কর্তৃক দৌলত উজির উপাধিতে ভূষিত হন। ফারসি কবি জামীর ‘লায়লী মজনু’ নামক কাব্যের ভাবানুবাদ অবলম্বনে দৌলত উজির বাহরাম খান ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্য্যে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রোমান্টিক উপাখ্যান ‘লায়লী মজনু’ রচনা করেন। ডঃ আহমদ শরীফের মতে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে এবং ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে ‘লায়লী মজনু’ রচিত হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ ট্রাজেডি, প্রথম অলৌকিকতামুক্ত বাস্তব ঘটনাবলীর বিবরণ ও অশ্নীলতামুক্তমুক্ত প্রণয়কাহিনী, নিছক মানবিক প্রণয়োপাখ্যাণ এবং সর্বোপরি মৌলিক রচনা হিসেবে ‘লায়লী মজনু’ কাব্যটি বাংলা সাহিত্যে অনন্যসাধারণ সাহিত্য কর্ম হিসেবে স্বীকৃত।
সাবিরিদ খান
রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের অন্যতম কবি সাবিরিদ খান চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানায় জন্মগ্রহণ করেন। ডঃ আহমদ শরীফের মতে তিনি ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তাঁর প্রথম প্রণয়োপাখ্যান ‘বিদ্যাসুন্দর’। সংস্কৃত কবি বিলহন চৌরপঞ্চাশিকা কাব্যে বিধৃত কাহিনী অবলম্বনে সাবিরিদ খান কালিকামঙ্গল কাব্যধারার আদলে বিদ্যাসুন্দর কাব্যটি রচনা করেন। তবে সাবিরিদ খানের কাব্য কাহিনীর সাথে কালিকামঙ্গলের বিশেষ কোনো স¤পর্ক নেই। নিছক কাব্যরস সৃষ্টির লক্ষ্যে কাব্যটি রচিত। সাবিরিদ খানের বিদ্যসুন্দর ছাড়া কালিকামঙ্গলের আর কোনো কবির কাব্যকে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান বলা যায় না। ‘হানিফা ও কয়রাপরী’ সাবিরিদ খানের আরেকটি প্রণয়কাব্য। কাব্যটি মূলত জঙ্গনামা জাতীয় যুদ্ধকাব্য হলেও প্রেমকাহিনীর বর্ণনা ও পরিণতি কাব্যটিকে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মর্যাদা এনে দিয়েছে।। ‘রসুলবিজয়’ সাবিরিদ খানের বিখ্যাত কাব্য। গ্রন্থটিতে রাজ্যজয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে।
দোনাগাজী ও সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল
আলাওলের পূর্ববর্তী কবি দোনাগাজী ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’ কাব্যের প্রথম রচয়িতা হলেও দোনাগাজীর নামে যে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া গিয়েছে তা খণ্ডিত। সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল কাব্যের আদি উৎস আলফ লায়লা। আরব্য উপন্যাস এর ফারসি অনুবাদ হতে দোনাগাজী কাব্যটি রচনা করেন। দোনাগাজী ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে অনুমান করা হয়। তিনি চাঁদপুর জেলার অধিবাসী ছিলেন। দোনাগাজী ছাড়াও আলাওল, ইব্রাহিম ও মালে মুহম্মদ ‘সয়ফুমূলুক বদিউজ্জামাল’ কাব্য রচনা করেছিলেন।
মুহম্মদ কবির ও মধুমালতী
মধুমালতী কাব্যের রচয়িতা মুহম্মদ কবির চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার, মুহম্মদপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটি রচিত। তবে কাব্যের ভাষার প্রাচীন বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হয় রচনাকাল ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দ। ভারতীয় লোকগাথা অবলম্বনে কবি মনঝন রচিত কোনো কাব্য হতে মুহম্মদ কবির ‘মধুমালতী’ কাব্যটি রচনা করেন। মধুমালতী অবলম্বনে অন্যান্য যারা কাব্য রচনা করেছিলেন তাদের মধ্যে সৈয়দ হামজা, মুহম্মদ চুহর, শাকের মুহম্মদ, গোপীনাথ দাস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
নওয়াজিস খান ও গুলে বকাওয়ালী
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রণয়োপাখ্যান ‘গুলে বকাওয়ালী’’ কাব্যের রচয়িতা নওয়াজিস খান চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত সুখছড়ি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। চট্টগ্রামের বানীগ্রামের জমিদার বংশের আদিপুরুষ বৈদ্যনাথ রায়ের আদেশে অষ্টাদশ শতকেরর দ্বিতীয়ার্ধে কবি নওয়াজিস খান ‘গুলে বকাওয়ালী’ প্রণয়োপাখ্যান রচনা করেন। ‘পাঠান প্রশংসা’, ‘বয়ানাত’ এবং ‘গীতাবলী’ নওয়াজিস খানের অন্যান্য গ্রন্থ। উল্লেখ্য ‘গীতাবলী’ গানের সংগ্রহ। গুলেবকাওয়ালী কাব্যের অন্যান্য রচয়িতাদের মধ্যে চট্টগ্রামের কবি মুহম্মদ মকীম (রচনা কাল ১৭৬০-১৭৭০) উল্লেখযোগ্য।
আবদুল হাকিম
ইউসুফ জোলেখা, ‘লালমতি সয়ফুলমুলুক’ প্রভৃতি রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের রচয়িতা আবদুল হাকিম বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবিদের অন্যতম। প্রণয়োপাখ্যান ছাড়াও তিনি বহু শাস্ত্র ও তত্ত্বমূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘নুরনামা’, ‘নসিয়তনামা’, সভারমখতা’, ‘চারিমোকামভেদ’, ‘দোররে মজলিস’ ইত্যাদি আবদুল হাকিমের তত্ত্বমূলক গ্রন্থ। আবদুল হাকিমের সময় শাস্ত্রকথা বাংলা ভাষায় লেখা দুষণীয় বলে গণ্য করা হত। তিনি তা উপেক্ষা করে বাংলা ভাষায় শাস্ত্রকথা রচনা করায় নিন্দিত হয়েছিলেন। তাই বিক্ষুব্ধ কবি ‘নুরনামা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি// দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়াএ/ নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যাএ//…।”

 

error: Content is protected !!