বাংলা ভাষা ব্যাকরণ বানান ও সাহিত্য: শত প্রশ্ন হাজার উত্তর: বাংলা সাধারণ জ্ঞান: বিসিসিএস প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা ভাষা ব্যাকরণ বানান ও সাহিত্য: শত প্রশ্ন হাজার উত্তর: বাংলা সাধারণ জ্ঞান: বিসিসিএস প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা

সংযোগ: https://draminbd.com/বাংলা-ভাষা-ব্যাকরণ-বানান/

 

শুবাচ প্রায়োগিক বাংলা ও সাধারণ জ্ঞান শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) থেকে শুবাচির প্রশ্ন শুবাচির উত্তর সমগ্র

শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
১. ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও’ কথাটা কোত্থেকে এসেছে? নাকে তেল দিলে কি ভালো ঘুম হয়?

“নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো” কথাটির আলংকারিক অর্থ দুশ্চিন্তাহীন নিদ্রা। এখানে তেল বলতে সরিষার তেলের কথা বুঝানো হয়েছে। আগেকার দিনে স্নানের আগে কানে, নাকে দু-এক ফোঁটা সরিষার তেল দেওয়া হতো। সরিষার তেলের অনেক রকম গুণ। সরিষার তেল নাসারন্ধ্রকে পরিষ্কার রাখে। ফলে প্রশ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া খুব মসৃণ হয় এবং ঘুমের ব্যাঘাত হয় না। সরিষার তেলে “গ্লুকোসাইনোলেট” নামে একটি রাসায়নিক উপাদান থাকে যা “মাইক্রোব” ও “ব্যাক্টেরিয়া” ধ্বংস করে। সর্দি লেগে নাক বদ্ধ হয়ে গেলেও, নাকে এই তেল দেওয়া হয় উপকার পাওয়ার জন্য। বলা বাহুল্য, খাঁটি সরষের তেলেই এই উপাদানটি থাকে।ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে কারো নাক বন্ধ হয়ে গেলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটত অর্থাৎ ঘুম ভেঙে যেত । এই সমস্যার সমাধানের জন্য তখনকার চিকিৎসকগণ  ঝাঁঝাল গন্ধের সরিষার তেল নাকে দিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দিতেন । ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্ট কমে যেত। ভালো ঘুম হতো।  দুশ্চিন্তামুক্ত ঘুমকে ইঙ্গিত করে দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন বোঝাতে কথাটি ব্যবহৃত হয়।  যেমন, “যাক, পরীক্ষা শেষ, এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও। আর চিন্তা নেই, এবার নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই।

২. করবো  করব; ধরবো  ধরব; আসবো আসব; দেখবো  দেখবসঠিক কোনটি?
 
করব, ধরব, আসব, দেখব শুদ্ধ। অর্থ বিভ্রাটের আশঙ্কা না থাকলে ক্রিয়াপদে অযথা ও-কার দেবেন না। অর্থ বিভ্রাটের আশঙ্কা থাকলে ওকার দেবেন। যেমন: হলো (হইল অর্থে), মতো ( অভিন্নতা প্রকাশে), হত( মৃত অর্থে)। তবে অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়ায় ও-কার দেওয়া হয়। যেমন: এক্ষুনি বলো। আমার সঙ্গে স্কুলে চলো।
 
৩. কেঁচে গণ্ডূষ কথার অর্থ কী?
‘কেঁচে গণ্ডূষ’ কথার অর্থ নতুন করে পুনরায় শুরু করা। কেঁচে <কাঁচিয়া=ভণ্ডুল। গণ্ডূষ অর্থ  খাওয়া শুরু করার পূর্বে হিন্দুরা হাতে একটু জল নিয়ে ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করার পর সেই জলটি গ্রহণ করে আহার পর্ব শুরু করে। গণ্ডূষের অর্থ অঞ্জলি ভরা জল। কোনো কারণে আহার পর্ব শুরু করার পর যদি বিঘ্ন ঘটে তখন পুনরায় গণ্ডূষ করে আহার পর্ব শুরু করতে হয়। একেই ‘কেঁচে গণ্ডূষ’ বলে। অন্যান্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এরকম ঘটলে পুনরায় প্রথম থেকে শুরু করতে হয়। এটাই ‘কেঁচে গণ্ডূষ’। হিন্দু শাস্ত্রমতে পুজা বা মন্ত্র পাঠ করে পবিত্র (গণ্ডূষ) হয়ে পুনরায় কাজ আরম্ভ করতে হয় আর এই আচরণ থেকেই কেঁচে গণ্ডূষ বাগধারার উৎপত্তি।
 
৪. কোমা এবং কোমায় চলে যাওয়া মানে কী?
 
কোমা, ব্যক্তি বা প্রাণীর এমন একটি গভীর অচেতন অবস্থা যেখান থেকে জাগানো সম্ভব হয় না। ওই অবস্থায় থাকা কেউ ব্যথায় কোনো উদ্দীপনা কিংবা আলো বা শব্দের উপস্থিতি-অনুপস্থিতে কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে না। কোনো ব্যক্তির এমন অবস্থায় অবস্থানকে কোমায় চলে যাওয়া বলে। কোমায় থাকা ব্যক্তির স্বাভাবিক ঘুমচক্র থাকে না। কোমা শুধু অসুস্থতার কারণে বা প্রাকৃতিক কারণে নয়: চিকিৎসার অংশ হিসেবে কৃত্রিমভাবেও সৃষ্টি করা হতে পারে।
মাথার বাইরে অথবা ভেতরে কিংবা উভয় দিকে আঘাত প্রাপ্ত হওয়া, মস্তিষ্কের যেকোনো ধরনের রোগ, শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা, তীব্র ভয় পাওয়া, উদ্‌বিগ্নতা, যেকোনো ধরনের স্ট্রোক, প্রচণ্ড আঘাত পাওয়াসহ অন্যান্য কারণে যখন কেউ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় অথবা অচেতন হয়ে যায় তখন এই তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কোমায় চলে যাওয়া বলা হয়ে থাকে। কোমা এমন একটা অবস্থা যেটা রোগীর মানসিক নিয়ন্ত্রণকারী সত্তাকে জাগতিক ও বাস্তবতা থেকে অবচেতম জগতে নিয়ে যায়। যেহেতু এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে যায় তাই এখানে চলে যাওয়া কথাটার ব্যাবহার করা হয়ে থাকে।
 
 
৫. ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না’ প্রবাদ বাক্যটির মর্মার্থ কী?
কথাটির আলংকারিক অর্থ বুঝেও না বোঝার ভান করা, ভণ্ডামি করা, জেনেও না জানার অজুহাত উপস্থাপন করা। ভাজা মাছ উলটে খাওয়া সহজ কাজ। যে-কেউ এটি পারে। কিন্তু যখন কেউ এমন ভান করে যে সহজ কাজটি পারে না বা  পারলেও নিজেকে নিরীহ প্রমাণের জন্য না-জানার বা না পারার অজুহাত তুলে নিষ্ক্রিয় থাকে তখন তাকে উদ্দেশ করে কথাটি বলা হয়। এটি একটি নেতিবাচক কথা। কারো থালায় খাবার হিসেবে মাছ দেওয়া হলো। ভোজক এমন ভান করে  আছে যে মাছের এক পাশ খাবার পর আরেক পাশ উল্টালেই যে একই আরেকটি পাশ পাওয়া যাবে, সে তা না-জানার ভান করে এড়িয়ে যায়।এর উদ্দেশ্য থাকে নিজেকে ভালো, নিরীহ, সহজসরলভাবে উপস্থাপন করে অন্যের সহানুভূতি আদায়ের প্রয়াস। যদিও তা শেষ পর্যন্ত অপপ্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত হয়।
 
৬. কিভাবে না কি কীভাবে?
কি এবং কী এ দুটির পার্থক্য থেকেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।  হ্যাঁ বা না দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া গেলে ‘কি’ হয়। অন্যসব ক্ষেত্রে লেখা হয় ‘কী’। ‘কীভাবে’ কথার সঙ্গে যুক্ত বিষয়ের উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায় না। তাই ‘কীভাবে’ শুদ্ধ। আবার ‘কি ভাবে’, ‘কী ভাবে’ এগুলোও শুদ্ধ। যেমন
সে কী ভাবে? ( What does he think?)
সে কী ভাবে? (Does he think?)
সে কীভাবে এটা করল? (How did he do it?)
 
৭. ‘মাৎসন্যায়’ শব্দটা শুনি।কিন্তু এর অর্থ কী?
‘মাৎস্যন্যায়ম’ শব্দটি সংস্কৃত। যার অর্থ- বড়ো মাছ যেভাবে ছোটো মাছকে খেয়ে ফেলে। পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপাল ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় ২০০ বছর পূর্বেকার কোন ইতিহাস জানা যায় না। যতটুকু জানা যায়, ওই সময় দেশে চরম অরাজকতা বিদ্যমান ছিল। তখন জোর যার মুল্লুক তারথঅবস্থা বিরাজ করছিল। ছোটো মাছ বড়ো মাছকে খেয়ে পুষ্ট হওয়ার মতো আরাজকতা চলছি। ইতিহাসে সেই সময়কে ‘মাৎস্যন্যায়ম’ বলে।
 
৮. ভিক্ষা চায় না, কুত্তা সামলাওএকথার ব্যাখ্যা জানতে চাই।
ভিক্ষে করতে এসে গৃহস্থের কুকুরের পাল্লায় পড়ে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন ভিক্ষুক ভিক্ষার প্রত্যাশা ত্যাগ করে নিজেকে কুকুরের আক্রমণ হতে রক্ষা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন তার মনে ধ্বনিত হয়, “ভিক্ষা চাই না, কুত্তা সামলাও”। অর্থাৎ, লাভের উদ্দেশ্যে গিয়ে যখন দেখে আসলটাও যাচ্ছে, কিংবা প্রাপ্তির চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি; তখন লাভ নয়,  আসলটা রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।  কেউ যখন কারো কাছে উপকারের প্রত্যাশায় গিয়ে তার কাছে অপকারের আশঙ্কায় পড়ে যায় তখন কথাটি বলা হয়।
 
৯. নন-ফিকশন এর বাংলা প্রতিশব্দ কি হবে?
সাহিত্যের যে সকল অংশ কাল্পনিক নয়; সাধারণত রচনা, জীবনী, আত্মজীবনী প্রভৃতি ইংরেজিতে নন-ফিকশন নামে পরিচিত।  অনেকের মতো, এরকেম লেখা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত।। তাই এর বাংলা হতে পারে তথ্যসাহিত্য। অনেকে বলেন, নন-ফিকশন বাস্তব ঘটনা নিয়ে রচিত সাহিত্য। তাই নাম হতে পারে বাস্তবধর্মী। শুবাচি মোহাম্মদ মামুন মিয়ার মতে নন-ফিকশন শব্দের পরিভাষা নিষ্কল্প।  শুবাচি জনাব মেহেদি হাসানের ভাষায়, Fiction এর বাংলা করা হয়েছে কথাসাহিত্য। তাই একটু ভেবেচিন্তে নন-ফিকশনের জন্য বলতে পারি অকথ্যসাহিত্য।
 
১০. কোন অর্থ নৈকট্যের জন্য “পাগল-ছাগল” শব্দদ্বয়কে পাশাপাশি বলা হয়ে থাকে?
কাউকে বোধহীন, এলোমেলো, উন্নাসিক বোঝাতে এই কথাটি ব্যবহৃত হয়। পাগল আর ছাগলকে নির্বোধ মনে করে এমন উক্তির সৃষ্টি করা হয়েছে।  ধারণা করা হয় গৃহপালিত পশুদের মধ্যে ছাগল বুদ্ধিহীন। অনুরূপ বুদ্ধিহীন হচ্ছে পাগল। তখনকার লোকের ধারণা ছিল মানুষ পাগল হয়ে গেলে ছাগলের মতো বুদ্ধিহীন হয়ে যায়।
 
১১. ব্যবহার আর ব্যবহৃত শব্দ দুটির সঠিক ব্যবহার জানতে চাই।
ব্যবহার শব্দটি বিশেষ্যপদ। যেমন:  আমরা লেখার জন্য কলম ব্যবহার করি।  ভদ্র ব্যবহার সুশিক্ষার পরিচায়ক। ব্যবহৃত বিশেষণপদ। যেমন: অপরের ব্যবহৃত চিরুণী,গামছা ব্যবহার করা অনুচিত। তোমার ব্যবহার এত খারাপ কেন? কারো ব্যবহৃত মাস্ক কখনো ব্যবহার করবে না।
 
 
১২. দিবাগত’ শব্দটি কী অর্থ প্রকাশ করে?
দিবাগত অর্থ ১. দিবা+গত। শুক্রবার দিবাগত রাত বলতে শুক্রবার দিন গত হওয়ার পর যে রাত আসে  সে রাতে। মধ্য রাতের পর শনিবার এসে যায়। দিবা অর্থাৎ দিবস। তাই দিবস গত হবার পর যে রাতের শুরু তাই ‘দিবাগত’ রাত। অর্থাৎ, দিন শেষে যে রাত আসে সেটাই দিবাগত রাত। দিনের শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে এবং দিনের ১ম অর্ধাংশ দিন আর শেষ অর্ধাংশ রাত। তাই দিবাগত রাতের অর্থ সহজেই অনুমেয়। সোমবার দিবাগত রাত মানে সোমবার দিনের অংশ গত হওয়ার পরে যে রাত অর্থাৎ মঙ্গল বার এর ঊষা উদিত হওয়ার আগের রাত ।দিবা বা দিন দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি হলো পুরো ২৪ ঘণ্টা অর্থে; অন্যটি শুধু সূর্যের আলো থাকাকালীন সময় বোঝাতে। দিবাগত শব্দটিতে সূর্যের আলো বোঝানো হয়েছে। দিবাগত রাত হলো দিনের পর যে রাত আসে। খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী রাত ১২ টায় নতুন দিন শুরু হয়। কিন্তু তখন সূর্যের আলো থাকে না। পরে ভোরবেলায় সূর্য উঠে। এরপর আবার সন্ধ্যার সময় অস্ত যায়। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২ টার পূর্ব পর্যন্ত (অর্থাৎ নতুন দিন শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) হলো ওই তারিখের দিবাগত রাত। অর্থাৎ এই রাতটি দিনের পর আগমন করে।
 
১৩. উৎস ও উৎপত্তি বনাম ব্যুৎপত্তি জানতে চাই।
 সংস্কৃত উৎস অর্থ (উ্‌+স) অর্থ উৎপত্তিস্থল, আদিকারণ; প্রস্রবণ, ঝরনা, ফোয়ারা প্রভৃতি। যেমন:
জলাশয় মাছের উৎস। চাঁদ শব্দটির উৎস সংস্কৃত। বাক্‌স্বাধীনতা জ্ঞানের উৎস। বিশ্বাস কুসংস্কারের উৎস।
সংস্কৃত উৎপত্তি (উৎ+√পদ্‌+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) উৎস, উদ্ভব, শুরু, জন্ম, সূচনা, প্রকাশ, অভ্যুদয়। যেমন:
বিশ্বের উৎপত্তি, প্রাণের উৎপত্তি, পানির উৎপত্তি, মানুষের উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিজ্ঞানের উৎপত্তি, ধর্মের উৎপত্তি, বাংলাদেশের উৎপত্তি, সাগরের উৎপত্তি; অগ্নিপরীক্ষা কথার উৎপত্তি, ব্যাকরণের প্রভৃতি।
ব্যুৎপত্তি মূলত একটি ব্যাকরণিক শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে ব্যুৎপত্তি (বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি) অর্থ (ব্যা.) প্রকৃতি-প্রত্যয়াদি বিশ্লেষণদ্বারা শব্দের গঠনবিচার’; যেমন:
অগ্নিপরীক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. অগ্নি+পরীক্ষা]’;
ব্যুৎপত্তি শব্দের ব্যুৎপত্তি—[স. বি+উদ্‌+√পদ্‌+তি];
প্রত্যেক শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. প্রতি+এক];
ব্যূহ শব্দের ব্যুৎপত্তি— [স. √বি+ঊহ্‌+অ]।
মনে রাখুন, য-ফলা পরের বিষয়। ভাষার উৎপত্তির পর শব্দের ব্যুৎপত্তি। তাই উৎপত্তিতে য-ফলা নেই, ব্যুৎপত্তিতে আছে।
 
১৪. নিচ নীচ বনাম নিচ নিচে
‘নীচ’ আর ‘নিচ’ শব্দকে অনেকে অভিন্নার্থক মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে শব্দ-দুটো ভিন্নার্থক। ‘নিচ’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ (under)। স্থান-জ্ঞাপক এই (নিচ) শব্দটি ‘উর্ধ্ব/ ঊর্ধ্ব’ শব্দের বিপরীত তথা ‘নিম্ন’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। যেমন— (১) ভবনের নিচে লাশের স্তূপ। (২) জাফর সাহেব আমাদের নিচ তলায় থাকেন।(৩) নিচু ক্লাশের শিক্ষার্থীরা দুষ্টোমিতে ওস্তাদ। (৪) পাহাড়ের নিচে শীতল জল, আনতে হবে নিচে চল।
অন্যদিকে ‘নীচ’ শব্দটি হীন, ইতর, নিকৃষ্ট, অবহেলা, অবজ্ঞা ইত্যাদি অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। যেমন— (১) সন্তান হয়ে মায়ের গায়ে হাত তুললে, তুমি এত নীচ! (৩) নীচু জাত বলতে কিছু নেই, নীচ কর্মই মানুষকে উঁচু-নীচু করে।(৩) নিচ তলায় থাকা মানে নীচ তলায় থাকা নয়।
 
১৫. ‘যুগ্ম’ এই শব্দটির সঠিক উচ্চারণ কী: হবে যুগ-ন নাকি যুগ-ম?
 
শব্দটির প্রমিত উচ্চারণ: যুগ্‌মো। গ-যে ম যুক্ত হলে ম-এর উচ্চারণ সাধারণত অক্ষুণ্ন থাকে। যেমন: বাগ্মী।
 
সূত্র:

অভিধান ও বাংলা বানানবিধি লিংক

বাংলা অভিধান ও বাংলা বানানবিধির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লিংক এখানে দেওয়া হলো। নিচের লিংকসমূহে ক্লিক করলে বাংলা একাডেমির সর্বশেষ সংশোধন করা বাংলা বানানসমূহ পাওয়া যাবে। জানা যাবে বাংলা একাডেমি কেন এবং কোন বিধানের বলে কীভাবে বানানগুলো সংশোধন করেছে।
 

শুবাচ প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, বাংলা একাডেমির সর্বশেষ সংশোধিত বানান-সহ

বাংলা অভিধান ও বাংলা বানানবিধির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লিংক

 

এক মিনিট সময় দিন বানানগুলো শিখে নিন

 
 
 


১৫. ‘যুগ্ম’ এই শব্দটির সঠিক উচ্চারণ কী: হবে যুগ-ন নাকি যুগ-ম?

শব্দটির প্রমিত উচ্চারণ: যুগ্‌মো। গ-যে ম যুক্ত হলে ম-এর উচ্চারণ সাধারণত অক্ষুণ্ন থাকে। যেমন: বাগ্মী।
 
১৬. চর্যা অর্থ কী?
প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত চর্য (√চর্‌+য) অর্থ (বিশেষণে) পালনীয়, অনুষ্ঠেয়, আচরণ, কর্তব্যাদি প্রভৃতি। চর্য থেকে চর্যা। অর্থাৎ, ব্যক্তি হতে ক্রমান্বয়ে সমষ্টিতে এবং তদ্পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট, গৃহীত ও প্রতিষ্ঠিত সমকালীন সামাজিক আচার-আচরণ, কর্তব্য প্রভৃতি হচ্ছে চর্য বা চর্যা। চর্যা থেকে চর্যাপদ। চর্যাপদ শব্দের অর্থ বৌদ্ধ সহজিয়াদের বাংলা ভাষায় রচিত গীতিকবিতা। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকে রচিত  এই গীতিকবিতাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন মনে করা হয়।
 
১৭. বেয়ারা ও বেয়াড়া
 বেয়ার শব্দের বহুল প্রচলিত অর্থ—  অফিসের ‘বেয়ারা’ । বেয়ারা ইংরেজি bearer ( বেয়ারার) শব্দের বিকৃত রূপ। এর বাংলা অর্থ— বাহক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,   ইংরেজি বেয়ারা অর্থ— (বিশেষ্যে) আজ্ঞাবাহী, পরিচারক। এরূপ আর একটি শব্দ আছে— বেয়াড়া। বাংলা বেয়াড়া শব্দের অর্থ—  (বিশেষণে)  সহজে বশে আনা যায় না এমন, একরোখা। অনেক বেয়ারা খুব বেয়াড়া হয়। বেয়াড়া বেয়ারাকে মনিব পছন্দ করেন না।
 
১৮. বিসর্গ ও কোলন
আমরা অনেকে বিসর্গ আর কোলন এক করে ফেলি। এটা দৃষ্টিকটু। মনে রাখতে হবে বিসর্গ একটা বর্ণ আর কোলন একটা চিহ্ন। তাই কাউকে ‘দু:খ’ না-দিয়ে ‘দুঃখ’ দিন আর ‘নি:শ্বাস’ না-নিয়ে ‘নিঃশ্বাস’ নিন।
অনেকে কবিতা লেখেন। শিরোনাম দেন এভাবে —
কবিতাঃ
কবিঃ
তারিখঃ
মনে রাখবেন, এটা ভুল। এই ক্ষেত্রে কোলন ব্যবহার করুন।
কবিতা :
কবি :
তারিখ :
আরেকটা বিষয়, শব্দ-সংক্ষেপণের জন্য বিসর্গ নয়, বিন্দু ব্যবহার করুন। যেমন :
মোঃ নয়, মো.
খ্রিঃ নয়, খ্রি.
বিঃদ্রঃ নয়, বি.দ্র.
বিসর্গ ব্যবহার করলে উচ্চারণ হয়ে যাবে মোহ্, খ্রিহ্, বিহ্‌দ্রোহ্ ইত্যাদি।
আর হ্যাঁ, আমার কথায় কেউ দু:খ পাবেন না; তবে দুঃখ পান, সমস্যা নেই। দুঃখে বিসর্গ থাকলে তা-ও স্বর্গসুখ হয়ে উঠবে।
 
১৯. আর্য শব্দটির অর্থ কি?
ভারতীয় পুরাণ এবং শাস্ত্রগ্রন্থসমূহে কিছু উত্তম গুণের অধিকারী ব্যক্তিকে আর্য বলা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে: হিন্দুধর্মাবলম্বী অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের আর্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মাত্রই আর্য। আবার, কিছু গ্রন্থমতে, কেবল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরাই হচ্ছে আর্য। চতুর্থ বর্ণকে শূদ্র বলা হয়েছে। তাই অনেকে মনে করেন, শূদ্র আর্য নয়। আর্যরা ভারতবর্ষ দখল করে শূদ্রদের নিজেদের সমাজভূক্ত করে নেন। কিন্তু সেই অনার্য শূদ্র কারা, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
 
২০. বৃটিশ না ব্রিটিশ? ব্যাখ্যাসহ জানতে চাই।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] লিখেছে ‘ব্রিটিশ’ ও ‘ব্রিটেন’।
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম [পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১২ (মুদ্রণ-২০১৫)] অতৎসম শব্দে ঋ-কার ব্যবহার করা-না-করা সম্পর্কে কোনো বাধ্যবাধকতা বা পরামর্শ বা মতামত দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি গৃহীত বানানবিধি ‘[প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ১৯৯৭। পরে পরিমার্জিত] মত প্রকাশ করে বলেছে: “বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ঋ-কার ব্যবহার না-করে র-ফলা ই-কার ব্যবহার করাই উচিত হবে। যেমন, … বৃটিশ নয়, ব্রিটিশ।’
পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ ও সাহিত্য সংসদ প্রকাশন সংস্থার বাংলা বানানবিধি ৩. (ক) স্পষ্ট বলেছে: “বাংলায় গৃহীত সংস্কৃত শব্দ ছাড়া অন্য শব্দে … ঋ-কার হবে না। … ব্রিটেন, খ্রিস্টাব্দ।”
বাংলার দিকপাল কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি─’যায় যায় দিন’ ছাড়া─’বৃটিশ’ বা ‘বৃটেন’ লেখা সমর্থন করে না।
 
২০. ঋ কি স্বরধ্বনি?
বাংলা একাডেমি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৯৯)-এর নবম পুনর্মুদ্রণ (২০১৬)] লিখেছে:
“ঋ বাঙলা ভাষায় এ-বর্ণটির উচ্চারণ ‘রি’ (র্‌-এর সঙ্গে ই-স্বরধ্বনির সংযুক্তি)। সংস্কৃত ভাষায় ‘ঋ’ শুদ্ধ স্বরধ্বনির মর্যাদা পেলেও বাঙলা ভাষার প্রমিত উচ্চারণে এটাকে আর স্বরধ্বনিরূপে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।” এবং “ঋ/ঋ-কারকে বাঙলা ভাষায় স্বরধ্বনির মর্যাদা দেওয়া ঠিক নয়; কারণ সংস্কৃত ভাষার শুদ্ধ স্বরধ্বনির মতো এর উচ্চারণ আর অবশিষ্ট নেই। বাঙলায় এর উচ্চারণ পরিষ্কার ‘রি’ (‘র’-এর সঙ্গে সংযুক্ত ‘ই’)। সংস্কৃত ভাষার অন্ধ অনুকরণে এটিকে এখনও বর্ণমালায় স্বরবর্ণের মধ্যে স্থান দেওয়া হয় এবং কতিপয় সংস্কৃত শব্দের বানানে এর লিখিত রূপ দেখা যায়।”
 
২১. ‘২১ এ ফেব্রুয়ারি’ না কি ‘২১ শে ফেব্রুয়ারি'(একুশ শে)? ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ লিখলে বা বললে কি ভুল হবে?
প্রথমে বলে রাখি: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (পরিশিষ্ট গ) অনুযায়ী (বাংলা তারিখ ও সময়) একমাত্র প্রমিত শব্দ ২১শে। ওখানে ২১এ বানানের কোনো শব্দ নেই। ওই অভিধানমতে ২১শে কথার উচ্চারণ একুশে। অতএব, শুদ্ধ ও প্রমিত হচ্ছে ২১শে। ২১এ কথার উচ্চারণ হয় একুশ-এ; এমন লিখবেন না। ২১শে লিখুন, ২১এ লিখবেন না।
বাংলায় তারিখ লেখার নিয়ম
বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে কী বলে? ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান। যা ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। ওই অভিধানের পরিশিষ্টে (পরিশিষ্ট গ) বাংলা তারিখ ও সময় কীভাবে লেখা হবে তা বর্ণিত হয়েছে।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে—
১ তারিখ লেখা হয়েছে: ১লা, উচ্চারণ /পয়্‌লা/ [যেমন: ১লা জানুয়ারি।]
২ তারিখ লেখা হয়েছে: ২রা, উচ্চারণ /দোশ্‌রা/ [ যেমন: ২রা ফেব্রুয়ারি।]
৩ তারিখ লেখা হয়েছে: ৩রা, উচ্চারণ /তেশ্‌রা/;[ যেমন: ৩রা মার্চ।]
৪ তারিখ লেখা হয়েছে: ৪ঠা, উচ্চারণ /চোউ্‌ঠা/; [ যেমন: ৪ঠা এপ্রিল]
৫ তারিখ লেখা হয়েছে: ৫ই, উচ্চারণ /পাঁচোই/; [ যেমন: ৫ই মে]
৬ তারিখ লেখা হয়েছে: ৬ই, উচ্চারণ ছওই; [ যেমন: ৬ই জুন]।
১৯ তারিখ লেখা হয়েছে: ১৯শে, উচ্চারণ /উনিশে/; [ যেমন : ১৯শে জুলাই]।
২১ তারিখ লেখা হয়েছে: ২১শে, উচ্চারণ /একুশে/;[ যেমন: ২১শে ফেব্রুয়ারি]।
 
২২. ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’, এই বাগধারাটির উৎস, অর্থ, প্রয়োগ, ব্যবহার, ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন কেউ?
আশুতোষ দেব সংকলিত ও দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত নূতন বাঙ্গালা অভিধান প্রবচন-সংগ্রহ (সংশোধিত তৃতীয় সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৫৯) থেকে পাই: “শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ … শঠের সহিত শঠতাই বিধেয়! যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। Tit for tat.
“স্বর্ণখণ্ডং ভবেৎ তাম্রং বণিকপুত্র মর্কটং
সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ”
অর্থ: স্বর্ণখণ্ড হয়েছে তাম্র, বণিকপুত্র মর্কট(বানর) কাজেই সরলের সাথে সারল্য করবে, শঠের সাথে শঠের সমান আচরণ করবে”। এটা একটা উপদেশমূলক প্রাচীন গল্পের সারকথা। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের হিতোপদেশমূলক একটি গল্পের কাহিনি থেকে শ্লোকটি গৃহীত ও প্রচলিত।  এক পণ্ডিত তীর্থযাত্রাকালে প্রতিবেশি বণিকের কাছে কিছু স্বর্ণমূদ্রা গচ্ছিত রাখতে গেলে বণিক তাঁকে নিজহাতে বণিকের সিন্দুকে রেখে যেতে বলল। পণ্ডিত ফিরে আসার পর বণিক সিন্দুক খুলে দিয়ে তাঁকে বলে, কর্তা আপনি যেভাবে রেখে গিয়েছিলেন সেভাবেই আপনার থলেটে আছে, নিজহাতে নিয়ে যান। থলে বাড়িতে নিয়ে পণ্ডিত দেখলেন ভেতরে সব তাম্রমূদ্রা। পরে বণিক বাণিজ্যযাত্রাকালে তার পুত্রকে পণ্ডিতের বাড়িতে রেখে গেল। ফিরে এলে পণ্ডিত বললেন, যে ঘরে রেখে গিয়েছিলে ওখানেই তোমার পুত্র আছে নিয়ে যাও। বণিক দেখল: ওই ঘরে একটি বানর(মর্কট) বাঁধা আছে।
“স্বর্ণখণ্ডং ভবেৎ তাম্রং বণিকপুত্র মর্কটং
সরলে সারল্যং কুর্যাৎ, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ।।
 
২৩. ধরণি দ্বিধা হও— এর অর্থ কী?
“ধরণি দ্বিধা হও” কথাটির শাব্দিক অর্থ— পৃথিবী দ্বিখণ্ডিত হও, পৃথিবী দুই খণ্ড হয়ে যাও। আলংকারিক অর্থে কথাটি লজ্জা, ক্ষোভ, দুঃখ, শোক, অনুতাপ, আক্ষেপ প্রভৃতি প্রকাশে ব্যবহৃহ হয়। ভীষণভাবে অপ্রত্যাশিত এমন লজ্জাকর বা দুঃখজনক কিছু ঘটার বা ঘটার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে এমন আক্ষেপোক্তির অবতারণা হয়। মধ্যযুগের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। এই কাব্যগ্রন্থে একটি বাক্য আছে— “মেদিনি বিদার হও পশিঁ আ লুকাই”। বলা হয় এ কথা থেকে ‘ধরণি দ্বিধা হও’ বাগ্‌ভঙ্গিটির উদ্ভব। “মেদিনি বিদার হও পশিঁ আ লুকাই” কথার অর্থ, পৃথিবী তুমি দ্বিখণ্ডিত বা ফাঁক হয়ে যাও তাতে আমি লুকাই। পৃথিবী তুমি দুইভাগ হয়ে যাও। আমি তোমার গহ্বরে ঢুকে পড়ি। কথাটি লজ্জা-ক্ষোভ; কিংবা দুঃখ বা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জীবন থেকে পালানোর আক্ষেপ। অনেকের মতে, “ধরণি দ্বিধা হও” কথাটি রামায়ণ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম চরিত্র সীতার সংলাপ। নিজের সতীত্বের পরীক্ষা দেওয়াটা তাঁর কাছে লজ্জার ছিল। রামচন্দ্রের কাছ থেকে এমন কিছু সে আশা করেনি। তারপরও পেতে হচ্ছে। এমন অপমানকর ঘটনার পরে রসাতলে যাওয়ার জন্য সীতা আক্ষেপবশত পৃথিবীকে বিভক্ত হতে বলেছিল।
 
২৪. বিদেশি শব্দের বানান
বিদেশি শব্দের বানানে ‘ত’ বসবে; খণ্ড-ৎ নয়: তৎসম শব্দের বানানে ‘ত’ ও ‘খণ্ড-ৎ’ উভয়ের ব্যবহার আছে। তবে বিদেশি শব্দের বানানে কোথাও ‘খণ্ড-ৎ’ হবে না। সবসময় ‘ত’ ব্যবহৃত হবে। যেমন:
আখেরাত, আদালত, আমানত, আয়াত, কিসমত, কুদরত, কেয়ামত, কৈফিয়ত,
খেসারত, জালিয়াত, তফাত, তবিয়ত, দস্তখত, দৌলত, নসিহত, ফেরত,
বজ্জাত, বেহেশ্‌ত, মওত, মজবুত, মতলব, মেহনত, শরবত,
শরিয়ত, শাহাদত, সওগাত, সুন্নত,
হিম্মত, হেফাজত ইত্যাদি।
 
২৫. আরকি আর কি আর কী
আরকি: ‘আরকি’ বাক্যের মধ্যে অলংকার হিসেবে থাকে। বাক্য থেকে আরকি উঠিয়ে নিলে অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন:
ক. তুমি খাবার কখন খাবে?
— বাড়ির কাজ শেষ করে খাব আরকি।
খ. ভালোভাবে পড়েনি, তাই ফেল করেছে আরকি।
প্রসঙ্গত, ‘আরকি’ শব্দটি মুদ্রাদোষ হিসেবেও নির্দেশ করা যায়। আর, শব্দটি অতৎসম হওয়ায় ‘দীর্ঘ-ঈ-কার’ দিয়ে ‘আরকী’ লেখা সমীচীন নয়।
আর কী: বাক্যের মধ্যে ‘এছাড়া কী’ জানতে চেয়ে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে ‘আর কী’ লিখতে হয়। কারণ, এক্ষেত্রে ‘আর’ ও ‘কী’ স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং প্রশ্নের জবাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়। বাক্য থেকে ‘আর কী’ তুলে নিলে বাক্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায় কিংবা অর্থ বদলে যায়। যেমন:
১. তুমি আর কী কিনবে?
২. আমার জন্যে আর কী করতে পারবে?
৩. ছাফিয়া আর কী নিতে বলেছে?
আর কি: ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর পাওয়ার জন্যে প্রশ্নবোধ বাক্যে ‘আর কি’ শব্দযুগল ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রেও ‘আর’ ও ‘কি’ স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু প্রশ্নের জবাব ‘হ্যাঁ কিংবা ‘না’-তে দিতে হয় বলে ‘আর কি’ লিখতে হয়। যেমন:
i. আর কি খেতে পারবে না?
ii. আর কি কোনো পথ খোলা নেই? (এবি ছিদ্দিক) 
 
২৬. প্রক্ষালন ও প্রক্ষালন কক্ষ
সংস্কৃত প্রক্ষালন (প্র+√ক্ষালি+অন) অর্থ— (বিশেষ্যে) ধৌতকরণ। প্রক্ষালক অর্থ— ধৌতকারী। যে কক্ষে ধৌত করা হয় তাকে বলা হয় প্রক্ষালন কক্ষ। ধৌতককর্ম এবং মলমূত্র ত্যাগ ও মলমূত্র ত্যাগের কারণে অত্যাবশ্যক ধৌতকর্মাদি একই কক্ষে করা হয়। যে কক্ষে মলমূত্র ত্যাগ করা হয় সে কক্ষে ধৌত বা শৌচকরণ কার্য অনিবার্য। তাই মঞ্জুভাষ হিসেবে মলমূত্র ত্যাগ করা যায় এমন কক্ষকে সাধারণত প্রক্ষালন কক্ষ বলা হয়। তবে কিছু কিছু কক্ষ আছে যেখানে কেবল প্রক্ষালন কর্ম করা যায়, মলমূত্র ত্যাগ করা যায় না। এগুলোকেও প্রক্ষালন কক্ষ বলা হয়।

২৭. প্রকৃত বনাম প্রক্রীত

প্রকৃত: সংস্কৃত প্রকৃত (√প্র+কৃ+ত) অর্থ (বিশেষণে)— সত্য, আসল, যথার্থ, বিশুদ্ধ। প্রকৃতির মতো প্রকৃত আর কিছু নেই।
প্রয়োগ: প্রকৃত অর্থে কোনো মতবাদই চূড়ান্ত বিবেচনায় প্রকৃত নয়। মৃত্যুই জীবনের প্রকৃত বিষয়।
 
প্রক্রীত: সংস্কৃত প্রক্রীত (প্র+√ক্রী+ত) অর্থ— (বিমান জলযান প্রভৃতি) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছে এমন। সাধারণত বিমান, জলযান প্রভৃতি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নেওয়াকে প্রক্রীত বলা হয়।  
প্রয়োগ: প্রক্রীত জাহাজটি তিন দিন পর ফেরত দিতে হবে। হুজুর প্রক্রীত হেলিকপ্টারে চড়ে ওয়াজ করতে এলেন।
 
২৮.রশনা কী?
রশনা মহিলাদের অলংকারবিশেষ। নারীর কটিদেশে পরিধেয় মেখলা, চন্দ্রহার প্রভৃতি রশনা নামে পরিচিত। রশনা (√রশ্‌+অন+আ) তৎসম শব্দ এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
 
২৯.মাঝিমাল্লা শব্দের মাল্লা অর্থ কী?
মাঝি ও মাল্লা শব্দের মিলনে মাঝিমাল্লা শব্দের উদ্ভ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা মাঝিমাল্লা অর্থ: মাঝি ও তার সহকর্মী। নৌযানের মাঝি এবং মাঝিকে নৌ পরিচালনার কাজে সহায়তাকারীদের একত্রে মাঝিমাল্লা বলা হয়। আরবি মল্লাহ্ থেকে উদ্ভূত মাল্লা অর্থ: (বিশেষ্যে) নৌকার মাঝি বা তার সহযোগী, মাঝির সহযোগী, নাবিক।

৩০. রয়ানি

রয়ানি দেশি শব্দ। মনসামঙ্গলের গানকে রয়ানি বলা হয়। একসময় রয়ানি বাংলাদেশের সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় ছিল। মনসামঙ্গলের কবিগণ রয়ানির মূল রচয়িতা।
 

 

৩১. ন্যাড়া বেলতলায় একবার‌ই যায়: কথার উৎস ও ব্যাখ্যা
প্রবাদটি নিয়ে একটি গল্প আছে। ন্যাড়ার হাত দেখে একজন জ্যোতিষী বলেছিলেন তার অপঘাতে মৃত্যু হবে। এই মৃত্যুটা হবে তার মাথায় গাছ থেকে বেল পড়ার আঘাতে। ন্যাড়ার মা এটি নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কারণ ন্যাড়াদের এলাকাসহ আশেপাশের এলাকায় প্রচুর বেলগাছ। নিরাপত্তার জন্য মা, তার ন্যাড়া ছেলেকে  বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সে এলাকায় কোনো বেল গাছ নেই। ন্যাড়া বোনের বাড়ি যাওয়ার পর ভালোই দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন অন্য এলাকায় ঘুরতে গিয়ে সে একটি বেলগাছ তলায় চলে গেল। তখনই একটা পাকা বেল তার মাথার ওপর পড়ে। এই আঘাতেই ন্যাড়ার মৃত্যু হয়। একারণে বলা হয় ন্যাড়া বেল তলায় একবারই যায়। কেননা মারা যাওয়ার কারণে সে দ্বিতীয় বার বেল তলায় যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এই প্রবাদটি দিয়ে  বোঝানো হয় একবার ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার সেই ভুল কেউ করে না। ন্যাড়ামাথার কেউ যদি বেলতলায় একবার যায়, তাহলে তার মাথায় পাকা বেল পড়ে সে মারা যায। দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এজন্য বলা হয়ে থাকে, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।
 
৩২. কে রে: দ্বিতীয়া বনাম চতুর্থী
 
কে, রে কেবল নিমিত্তার্থে ও সম্প্রদান কারকের ক্ষেত্রে চতুর্থী বিভক্তি হয়, অন্য সকল ক্ষেত্রে দ্বিতীয়া বিভক্তি হয়।
যেমন: ১. ভিক্ষুককে* ভিক্ষা দাও।— সম্প্রদান কারক, তাই চতুর্থী বিভক্তি।
২. বেলা যে পড়ে, এল জলকে* (জলের নিমিত্তে) চল।— নিমিত্তার্থে সম্প্রদান, তাই চতুর্থী বিভক্তি।
৩. ধোপাকে* কাপড় দাও।— কর্ম কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি।
৪. আমারে* তুমি করিবে ত্রাণ, এ নহে মোর প্রার্থনা।— কর্ম কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি।
৫.  মোহাম্মদ আলীকে* সব মুষ্টিযোদ্ধা ভয় পায়।— অপাদান কারক, তাই দ্বিতীয়া বিভক্তি। [সূত্র: তাহসিন ঐশী, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)]
 
 
৩৩. স্বচ্ছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বানান মনে রাখার নিমোনিক
সংস্কৃত ‘স্বচ্ছন্দ(স্ব+ছন্দ)’ অর্থ— অবাধ, স্বাধীন, সুস্থ, অযত্নসম্ভূত, স্বীয় ইচ্ছা, স্বেচ্ছাচার প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘স্বাচ্ছন্দ্য (স্বচ্ছন্দ+য)’ শব্দের অর্থ স্বচ্ছন্দতা, বাধাহীনতা, সুস্থতা, স্বাধীনতা প্রভৃতি। অনেকে শব্দটির বানান লিখেন ‘সাচ্ছন্দ’ কেউ লিখেন, ‘সাচ্ছন্দ্য’ আবার অনেকে লিখেন স্বাচ্ছন্দ। উচ্চারণ এবং যুক্তাক্ষরজনিত জটিলতার কারণে বানানে এমন সংশয় সৃষ্টি হয়। একটি নিমোনিক থাকলে বানান সংশয় কেটে যায়।
নিমোনিক:
‘স্বচ্ছন্দ’ এবং ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ শব্দের অর্থের সঙ্গে ‘স্ব (নিজ)’ এবং স্বাধীনতা কথাটি জড়িত। তাই উভয়র শব্দের বানান ‘স্ব’ দিয়ে শুরু করুন, দন্ত্য-স দিয়ে নয়। জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনা যেমন জটিল তেমন কষ্টের। তাই বানানটিও জটিল। ‘স্বচ্ছ’ ও ‘স্বাধীন’ না থাকলে ‘অনিন্দ্য’ হওয়া যায় না।এজন্য ‘স্বচ্ছ’ ও ‘অনিন্দ্য’ মিলে‘ স্বাচ্ছন্দ্য’। ফলে ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ বানান শেষ হয় ‘ন্দ্য’ দিয়ে। আপনি আরও সুন্দর নিমোনিক তৈরি করে মন্তব্য কলামে দিতে পারেন। আমরা ঋদ্ধ হব।
 
৩৪. Sequoia (সিকুইয়া): দুর্লভ বানান
Sequoia শব্দটির সরল বাংলা উচ্চারণ সিকুইয়া। এটি বৃক্ষবিশেষ। সাধারণভাবে  ক্যালিফোর্নিয়া রেডউডকে সিকুইয়া বলা হয়। Sequoia একটি চমৎকার শব্দ। ইংরেজি ৭ বর্ণে গঠিত এই শব্দে খুব কম ব্যবহৃত q এবং ৫টি vowel রয়েছে। q-এর সঙ্গে vowel-এর এমন দুর্লভ মিলন আর কোনো শব্দে নেই।
 
৩৫. পরিচয় পরিচিতি এবং পরিচিত
পরিচয়: সংস্কৃত পরিচয় (পরি+√চি+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) নামধাম প্রভৃতি বিবরণ। জানাশোনা, আলাপ। অভিজ্ঞান, চিহ্ন, নিদর্শন (পরিচয়পত্র), প্রণয়।
 
প্রয়োগ: আমি তার পরিচয় সংগ্রহ করেছি। তার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। পরিচয় কোনো বিষয়কে জানার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
 
পরিচিতি: সংস্কৃত পরিচিতি (পরি+√চি+তি) অর্থ— (বিশেষ্যে) পরিচয়। সুতরাং, পরিচয় ও পরিচিত সমার্থক।
 
প্রয়োগ: আমি তার পরিচিতি সংগ্রহ করেছি। তার সঙ্গে আমার পরিচিতি আছে। পরিচতি কোনো বিষয়কে জানার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
পরিচিত: সংস্কৃত পরিচিত (পরি+√চি+ত) অর্থ— (বিশেষণে) পরিচায় জানা আছে এমন (পরিচিত ব্যক্তি)। অভ্যস্ত। জানাশোনা, জ্ঞাত (পরিচিত শহর)। আগে পরিচয় বা পরিচিতি। তারপর হয় পরিচিত। পরিচয় বা পরিচিতি আছে এমন বিষয়কে পরিচিত বিষয় বলা হয়।
 
প্রয়োগ: অক্সিজেনের গঠন সম্পর্কে আমি পরিচিত। লোকটি আমার পরিচিত। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার দিন থেকে আমরা পরস্পর পরিচিত। এই পরিচয়/পরিচিতি আমাদের জীবনের একটি মাইল ফলক।
 
৩৬. পুকুর জলাশয়  ও জলাধার 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত পুষ্কর থেকে উদ্ভূত পুকুর অর্থ— (বিশেষ্যে) পুষ্করিণী, ছোটো জলাশয়। এটি মূলত স্থির জলের ক্ষুদ্র জলাশয় যা হ্রদের চেয়ে ছোটো।পুকুর সাধারণত কৃত্রিমভাবে মানুষের প্রয়োজনে খনন করা হয়। পুকুর নামে পরিচিত জলাশয় সাধারণত আকারে দিঘি নামে পরিচিত জলাশয় থেকে ছোটো হয়। জল এবং আশয় মিলে জলাশয়। জল অর্থ— পানি এবং আশয় অর্থ— আধার, যা ধারণ করে, সংরক্ষণ করে যে। সুতরাং যেখানে  জল থাকে সে স্থানটি জলাশয়। অভিধানমতে, সংস্কৃত জলাশয় (জল+আশয়) অর্থ— (বিশেষ্যে) জলের আধার (পুকুর, নদী, হ্রদ, সমুদ্র প্রভৃতি)। সুতরাং,  যে-কোনো জলের আধারই জলাশয়। হোক সে পুকুর, দিঘি, গর্ত,  নদী, সাগর বা সমুদ্র। এ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরও জলাশয়। সংস্কৃত জলাধার (জল+আধার) অর্থ— (বিশেষ্যে) জল রাখার পাত্র, জলাশয়, পুকুর। বাংলায় জলাশয় ও জলাধার প্রায় সমার্থক হলেও, সংস্কৃতে দুটির অর্থ সুনির্দিষ্ট। সংস্কৃতে মাটি দ্বারা বেষ্টিত স্থির ও চলমান জলপূর্ণ সবকিছুকেই জলাশয় বলে। তবে  জলাধার বলতে পানিপূর্ণ পাত্র, বাসন, কলস, ইত্যাদি; কিংবা পানিপূর্ণ দ্রব্য কিংবা রসালো ফল যেমন: আঁখ, লেবু ইত্যাদিকেও ব্যাপকার্থে জলাধার বলা হয়। অন্যদিকে ‘জলধি’ অর্থ সাগর। এই আলোচনা থেকে  দেখা যায়, বাংলায়  মাটি দ্বারা বেষ্টিত স্থির ও চলমান সকল স্থানই জলাশয় বা জলাধার। সুতরাং, সব পুকুর জলাশয় বা জলাধার কিন্তু সব  জলাশয় বা জলাধার পুকুর নয়।
 
৩৭. জটিল বনাম কঠিন 
জটিল: সংস্কৃত জটিল (জটা+ইল) অর্থ— (বিশেষণে) জট পাকিয়েছে এমন, গোলমেলে, দুর্বোধ্য; বুঝতে কষ্ট হয় এমন; সহজে বোধগম্য নয় এমন।
প্রয়োগ:  এমন জটিল সমস্যায় আর পড়িনি। রোগটা খুব জটিল। ডাক্তারি পেশায় এমন জটিল রোগ আর পাইনি। লোকটি খুব জটিল। এত জটিল হলে সংসার চলবে কীভাবে?
কঠিন: সংস্কৃত কঠিন (কঠ্+ইন) অর্থ— (বিশেষণে) শক্ত, দৃঢ়, অনমনীয়। গাঢ়, নিশ্ছিদ্র। দুর্বোধ্য, দূরধিগম্য। নির্দয়। ভয়ানক। দুরারোগ্য (কঠিন পীড়া) এবং (বিশেষ্যে) কঠিনতা।
প্রয়োগ:  কাষ্ঠ খণ্ডটি বেশ কঠিন। কঠিন সমস্যায় পড়লাম। খুব কঠিন রোগ। অধস্তনদের প্রতি এত কঠিন হওয়া উচিত নয়।
 
জটিল ও কঠিন: এখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা জটিল (দুর্বোধ্য/গোলমেলে) ও কঠিন (দুরারোগ্য/ভয়ানক) রোগের  চিকিৎসা করা হয়।
 
৩৮.দরিদ্র দারিদ্র্য হতদরিদ্র
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত দরিদ্র (√দরিদ্রা+অ) অর্থ— (বিশেষণে) অভাবগ্রস্ত, দীন। সংস্কৃত দারিদ্র্য (দরিদ্র+য) অর্থ— (বিশেষ্যে) দীনতা, দরিদ্র অবস্থা, অভাব। অন্যদিকে, হতদরিদ্র (হত+দরিদ্র) অর্থ— (বিশেষণে) অতি দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত। দরিদ্র যাদের হত করে দিয়েছে তারাই হতদরিদ্র। এ হচ্ছে আভিধানিক অর্থ।
 
সাধারণভাবে জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য সামগ্রী বা সেবা ক্রয়ের ন্যূনতম আয় যারা করতে পারে না তারা দরিদ্র। দরিদ্রের এ অবস্থার নাম দারিদ্র্য। আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী— দারিদ্র্য  এমন একটি আর্থনৈতিক অবস্থা, যখন ব্যক্তিবিশেষ জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জনে এবং নিম্ন আয়ের কারণে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য দ্রব্যাদি ক্রয় করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
 
১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সহায়তায় দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে। সে মানদণ্ড বা সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী দারিদ্র্য হচ্ছে খাদ্য গ্রহণের এমন একটি স্তর যা থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিলো-ক্যালরি পাওয়া যায় না। কয়েকটি পদ্ধতিতে দারিদ্র্যপীড়িত জনসংখ্যা চিহ্নিত করা হয়।  প্রথমত: ভোগ-অভ্যাস এবং ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করে  খাদ্য তালিকা চিহ্নিত করা হয় যা নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টি তথা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রতিদিন ২,১১২ কিলো ক্যালরি এবং ৫৮ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করতে পারে।
 
উপর্যুক্ত খাদ্যতালিকার ব্যয় অপেক্ষা ১.২৫ গুণ কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলোকে মধ্যম শ্রেণির দরিদ্র এবং নির্ধারিত প্রারম্ভিক আয়ের চেয়ে ৮৫% কম মাথাপিছু আয়সম্পন্ন পরিবারগুলিকে চরম দরিদ্র বা হতদরিদ্র পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যারা হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য তারাই হতদরিদ্র।
 
তবে বিষয় ও শর্তগুলো আপেক্ষিক। সময় এবং স্থানভেদেও ভিন্ন হতে পারে। অধিকন্তু, দেশের জিডিপি অনুযায়ী মানদণ্ড পরিবর্তন করা হয়।। পৌর এলাকার দারিদ্র্য পরিমাপের ক্ষেত্রে ক্যালরি গ্রহণের প্রারম্ভিক মাত্রা পল্লি এলাকার জন্য নির্ধারিত মাত্রা অপেক্ষা কিছুটা উচ্চতর হয়। বাংলাদেশেও  বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং নীতিমালার কারণে জনপ্রতি কিলো ক্যালরির প্রারম্ভিক মাত্রা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে দারিদ্র্যাবস্থা প্রাক্কলনের জন্য ব্যবহৃত তথ্য ও উপাত্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা-ব্যয় নির্ধারণ জরিপ থেকে নেওয়া হয়।
 
৩৯. লেখ লেখা লেখনী ও লেখসামগ্রী
সংস্কৃত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসাবে প্রযুক্ত ‘ লেখ 😊 √লিখ্+ অ)’ শব্দের অর্থ লিখন, লিপি, লিখিত বিষয় প্রভৃতি। যে লিখে বা লিপিবদ্ধ করে সে-ই লেখক (√লিখ্+ অক)। লেখক শব্দের আরো অর্থ রয়েছে। যেমন : গ্রন্থরচয়িতা, লিপিকর, সাহিত্যিক, গ্রন্থকার প্রভৃতি। যেমন : হায়াৎ মামুদ একজন লেখক।
 
লেখা [√লিখ্+ অ + আ (টাপ্)] শব্দটি সংস্কৃত এবং বাক্যে একাধিক পদ হিসেবে প্রযুক্ত হয়। ক্রিয়া বিশেষণে ‘লেখা’ শব্দের অর্থ : লিপিবদ্ধ করা, রচনা করা, লিখিতভাবে অবহিত করা, অাঁকা প্রভৃতি। বিশেষ্যে লেখা শব্দের অর্থ : রচনা, লিখন, হস্তলিপি, শ্রেণি, চিহ্ন, রেখা প্রভৃতি। বিশেষণে শব্দটির অর্থ লিখিত। অতএব, লেখা অর্থ লিপিবদ্ধ করার কাজও হতে পারে আবার লেখক যা লিপিবদ্ধ করেছে তা-ও হতে পারে। এটি নির্ভর করে শব্দটি বাক্যে, কোন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তার ওপর। যেমন: শুভাষ বাবুর লেখা, লেখাগুলো পড়ে মজা পেলাম।
 
লেখনী (√লিখ্+ অন+ ঈ) সংস্কৃত শব্দ এবং বাক্যে বিশেষ্য পদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ কলম, পেন্সিল, ছবি আঁকার তুলি। এককথায় যা দিয়ে লেখা হয় সেটিই লেখনী। যেমন : শুধু দামি লেখনী দিয়ে লেখা হলে ওই লেখা দামি হয় না। দামি লেখা হতে হলে লেখায় মান থাকতে হয়।
 
তবে, লেখসামগ্রী এবং লেখনী এক নয়। লেখসামগ্রী বললে, লেখার কাগজ, কলম, পেন্সিল প্রভৃতি বোঝাবে। যাকে ইংরেজিতে Stationery বলা হয়। অর্থাৎ সকল ‘লেখনী’ লেখসামগ্রী কিন্তু সকল ‘লেখসামগ্রী’ লেখনী নয়।
 
৪০. প্রভাষক শব্দের আভিধানিক অর্থ
ভাষ থেকে ভাষক এবং ভাষক থেকে প্রভাষক। সংস্কৃত ভাষ (ভাষ্‌+অ) অর্থ—  (বিশেষ্যে) উক্তি,  বাক্য, ভাষা প্রভৃতি। ভাষা থেকে ভাষক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ভাষক (ভাষ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষ্য ও বিশেষণে)  বক্তা, কথক, বক্তব্য প্রদান করে যে। এর স্ত্রীলিঙ্গ ভাষিকা।  ভাষক শব্দের সঙ্গে উত্তম বা উৎকৃষ্ট অর্থে প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে প্রভাষক। সে হিসাবে প্রভাষক অর্থ এমন একজন যিনি ভালো বলতে পারেন, যার উক্তি উত্তম, ভালো বাক্য যিনি গঠন করতে পারেন, ভালো শিক্ষা যিনি দিতে পারেন, ভালো কথা যিনি বলতে পারেন।  এককথায়, প্রভাষক অর্থ উৎকৃষ্ট বক্ত, ভালো শিক্ষক।
 
৪১. যাই যাই যা-ই
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে যাই শব্দের দুটি ভুক্তি পাওয়া যায়। প্রথমত: সংস্কৃত যদা থেকে উদ্ভূত যাই অর্থ— (অব্যয়ে) যা, যাহা (তুমি যাই বলো, তুমি যাই চাও, যাই হোক আমি আছি)। যা কিছু (যাই দাও তাই নেব)।
দ্বিতীয়ত: বাংলা যাই অর্থ— (ক্রিয়ায়) গমন করি (আমি এখন বাড়ি যাই)।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘যা-ই’ বানানের কোনো শব্দ নেই। কোন শব্দের কী অর্থ তা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অতএব, যা-ই বানানটি অপ্রয়োজনীয়।
 
৪২. গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৪ঠা ডিসেম্বর
১৭৯১:  ব্রিটেনে প্রথম দি অবজারভার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮২১: ১৮২১: ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাচরণ দত্তের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সম্বাদ কৌমুদী’ প্রথম প্রকাশিত। সম্বাদ কৌমুদীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা রামমোহন রায় এবং প্রকাশক ছিলেন তারাচাঁদ দত্ত। ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮২৯:  সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ আইন জারি করেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। ১৮৯৯: টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের টিকা মানব দেহে ব্যবহার। ১৯৫৩:  শেরে বাংলা, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন। ১৯৭০: পল্টনে বিশাল জনসমুদ্রে মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি উত্থাপন। ১৯৭৪:  শ্রীলংকায় বিমান দুর্ঘটনায় ১৯১ জন নিহত হয়। ১৯৯০:  নয় বছর প্রেসিডেন্ট থাকার পর গণআন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা।
 
৪৩.থানা বনাম উপজেলা
থানারর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান অফিসার ইনচার্জ (OC)। উপজেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO)। একটি উপজেলায় একাধিক থানা থাকতে পারে। তবে একটি থানায় একাধিক উপজেলা থাকতে পারে না। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির প্রধান হলো উপজেলা নির্বাহী অফিসার।,উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান থাকে ও ভাইস চেয়ারম্যান থাকে। একটি উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বিশেষ এলাকা।
 
৪৪. পাতিস নে শিলাতলে পদ্মপাতা
পদ্মপাতা অনেক কোমল একটি জিনিস। শিলা হচ্ছে কঠিন পাথর। অর্থগত দিক হচ্ছে শিলার নিচে পদ্মপাতা দিস নে। ভাবগত বিষয় হচ্ছে কোন পাষাণ মানুষের কাছে দু:খের কথা বলতে নেই। অথবা যার আপনার প্রতি মায়া বা অনুভূতি নেই তার কাছে আপনার আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করতে নেই। সমান না হলে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক করা সমীচীন নয়।  পাথরের নিচে চাপা পড়লে কোমল পদ্মপাতার যে করুণ দশা হয় তেমনি ধনীর সঙ্গে দরিদ্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই দশা হয়।
 
৪৫. অতিথি
যার অত্ গতি (ক্ষণকালের জন্য) থেমে গেছে- সে-ই অতিথি। যার তিথি নেই; স্থিতি নেই; যে যায়, থাকে না তিনিই অতিথি। অনিত্যাবস্থানের কারণে যার তিথি বা দিন বা সময়-অসময় নেই তিনিও অতিথি। আবার অভ্যাগত, গৃহাগত, আগন্তুক/একরাত্র পরগৃহবাসী ব্রাহ্মণ অর্থেও অতিথি বুঝানো হতো। মিতাক্ষরা মতে অতিথি তিন প্রকার। যথা : পথিক, শ্রোত্রিয় ও বেদপারগ। রামচন্দ্রের পৌত্র ও কুশের পুত্রকেও অতিথি বলা হতো। অতিথি শব্দটি এখন ‘আমন্ত্রিত-অভ্যাগত’ অর্থে বহুল প্রচলিত। তবে প্রারম্ভে এর অর্থ ছিল কিছুটা ভিন্ন।
 
প্রাচীনকালে ‘তিথি’ অর্থে তৎকালীন গোষ্ঠীর বা যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে (যারা স্থিতি করে) এবং অতিথি অর্থে (যারা স্থিতি করে না) এমন সমাজের পরিদর্শক গোষ্ঠীর প্রত্যেক ব্যক্তিকে বোঝাত। অত্রি (পরিদর্শক) প্রজাপ্রতির কালে, যখন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়নি, অথচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোটখাট বিভাজন ঘটে গেছে, তখন গৃহকর্তার দায়িত্ব ছিল অতিথি সৎকার। আর অতিথির দায়িত্ব ছিল ঘুরে ঘুরে পরবর্তী উৎপাদন কর্মযজ্ঞ কীভাবে চালাতে হবে, প্রত্যেকটি যৌথ পরিবার বা গোষ্ঠীকে পরমার্শ দেওয়া। এরা এক বাড়িতে তিনি রাত্রির বেশি কাটাতেন না।
 
আচারটি বহু পরেও ব্রাহ্মণদের মধ্যে কমবেশি প্রচলিত ছিল। মানুষ ছাড়া অন্য জীবও অতিথি হতে পারে। যেমন অতিথি পাখি। তবে মানুষ সুযোগ পেলে অতিথির ক্ষতি করতেও ছাড়ে না। কী সুন্দর অতিথি পাখিগুলো মানুষের লালসার শিকার হয়। আবার এমন অনেক অতিথি আছে, যারা সুযোগ পেলে আশ্রয়দাতার ক্ষতি করতে ছাড়ে না। পরজীবীদের কথা ভাবা যায়। মানুষের মধ্যেও এমন স্বভাব লক্ষণীয়।

৪৬. লুডুম্যানিয়া

ইংরেজি Ludomania অর্থ জুয়াবাতিক, জুয়ার প্রতি প্রচণ্ড নেশা, gambling addiction, জুয়া খেলার অপ্রতিরোধ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত নেশা। ক্যাসিনো, ঘোড়দৌড় কিংবা নানা অনিশ্চিত বিষয়ে বাজি প্রভৃতি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। যারা জুয়া না খেলে থাকতে পারে না এবং জুয়া খেলতে না পারলে উন্মাদের মতো আচরণ করে তাদের লুডুম্যানিয়াক বলে। জুয়ার প্রতি এরা এত আসক্ত হয় যে, নিজের সহায়সম্পদ এমনকি স্ত্রীপুত্র পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি মারাত্মক মানসিক রোগ।
 
৪৭. বাংলা আচ্ছা এখন Accha রূপে ইংলিশ 
বাংলায় বহুল ব্যবহৃত আচ্ছা শব্দটি ইংরেজি বর্ণে accha বানানে ক্যামব্রিজ ডিকশনারি (Cambridge Dictionary) গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে। ফলে আচ্ছা শব্দটি ইংরেজি নাগরিকত্ব পেয়ে  ইংরেজি শব্দ হয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত শব্দে পরিণত হলো। ওই অভিধানে (ক্যামব্রিজ ডিকশনারি) বলা হয়েছে, ‍accha ভারতীয় ইংলিশ। তবে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, এটি খাঁটি বাংলা শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধনমতে, সংস্কৃত অস্তু থেকে উদ্ভূত আচ্ছা অর্থ— (অব্যয়ে) হ্যাঁ, সম্মতিসূচক শব্দ। ধরা যাক এবং (বিশেষণে) বেশ, খাসা; ব্যঙ্গার্থে— বিলক্ষণ।
 
প্রতিবছর কিছু নতুন শব্দ ইংরেজি অভিধানে স্থান পায়।  এজন্য একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্যগণ বলেছেন— ভারতীয় (বাংলা) আচ্ছা শব্দটি যুক্তরাজ্যে বহুল প্রচলিত। দীর্ঘকাল হতে শব্দটি ব্রিটেনের প্রায় সর্বত্র  সর্বভাষীর কাছে ভারতীয় অর্থে  ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই শব্দটিকে অভিধানভুক্ত করা যৌক্তিক। ক্যামব্রিজ অভিধানে  আচ্ছা শব্দকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:
accha
exclamation Indian English (also achha) UK /ˈætʃ.ɑː/ US /ˈætʃ.ɑː/
used for showing that you agree with something or understand something: Accha, that’s good. Go ahead!
 
used for showing surprise or happiness:
“I managed to buy it for half the price.” “Accha!”
 
৪৮. পি-পু-ফি-শু 
পি-পু-ফি-শু একটি ব্যতিক্রমী, কিন্তু বেশ অর্থবহ বাংলা শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে এটি দেশি শব্দ। বিশেষ্যে শব্দটির অর্থ, পিঠ পুড়ছে ফিরে শুই, কিন্তু বিশেষণে শব্দটির অর্থ অত্যন্ত অলস, কুঁড়ের বাদশা প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় একটি শব্দে তিনটি হাইফেন, চাট্টিখানি কথা নয়।
 
৪৯.মাইরি বলছি!
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, পোর্তুগিজ (maria) থেকে উদ্ভূত মাইরি অর্থ (অব্যয়ে) যিশু খ্রিষ্টের মা মেরির নামে দিব্যি; বিরক্তি বা ক্রোধসূচক উক্তি। পোতুর্গিজদের মুখে চড়ে maria কথাটি ভারতবর্ষ আসে। পরবর্তীকালে তা ভারতবাসীর মুখে মাইরি হয়ে যায়। এখন অনেকের মুখে শুনি ‘মাইরি’।
ছেলে বলছে: মাইরি বলছি মা, বাবার পকেট থেকে চুরি করে তোমার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা টাকাগুলো আমি চুরি করিনি।
মা বলছেন, মাইরি বলছি খোকা, ওই টাকাগুলো তোমার বাবার পকেট থেকে নয়, আমার বাবার বাড়ি থেকে এনেছি। আমার টাকা না নিলে তোমার পকেটে টাকা এল কোত্থেকে?
মাইরি বলছি মা, এগুলো আমার বাবার টাকা।
 
৫০. চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ
 
চাক্ষুষ : সংস্কৃত ‘চাক্ষুষ (চক্ষুস্‌+অ)’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, চোখে চোখে লব্ধ, চোখে দেখা, প্রত্যক্ষ (চাক্ষুষ প্রমাণ) ইত্যাদি। বাক্যে এটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রত্যক্ষ : সংস্কৃত ‘প্রত্যক্ষ (প্রত্যক্ষ+অ)’ শব্দের অর্থ, দৃষ্ট, চাক্ষুষ (প্রত্যক্ষ প্রমাণ), ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, প্রত্যক্ষজ্ঞান প্রভৃতি। বাক্যে এটি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সমক্ষ: সংস্কৃত, ‘সমক্ষ (সমক্ষ+অ)’ শব্দের অর্থ– প্রত্যক্ষ, অগ্রবর্তী প্রভৃতি।
শাব্দিক অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, শব্দ তিনটির (চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ ) অর্থের মধ্যে মিল রয়েছে এবং আপাত-বিবেচনায় বাক্যে অভিন্ন অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা যায়। তবে অর্থের মিল থাকা আর অভিন্ন শব্দ হওয়া এক নয়। যমজ ভাইয়ের চেহারা অভিন্ন হতে পারে, দুজন মানুষের চেহারাও প্রায় অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অবয়ব আর আচরণে অবশ্যই ভিন্নতা থাকে। নইলে, ‘উভয়’ শব্দটির প্রয়োজন হতো না। কেউ বলতে পারেন, দুজনের চেহারা একই, কিন্তু কেউ বলতে পারেন না– দুজন অভিন্ন। ভাষার প্রতিটি শব্দের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। শব্দের এমন বৈচিত্র্যময়তা ভাষিক সৌন্দর্যের অন্যতম দিক।
বাক্যে শব্দত্রয় (চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ সমক্ষ ) অভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা গেলেও একই বিষয় প্রকাশে একই বাক্যে অভিন্ন শব্দে প্রয়োগ করা যায় না। তা করতে গেলে অর্থে, অনর্থ কিংবা বাক্যের সৌন্দর্যের হানি ঘটতে পারে, লাঞ্ছিত হতে পারে বাক্যের উদ্দেশ্য, দ্যোতনা এবং মোহনীয়তা। অভিন্নার্থের হলেও একাধিক শব্দের প্রয়োগের ধরণ বাক্যের প্রকৃতি ও গঠনের উপর নির্ভর করে। আলোচ্য তিনটি শব্দেরই সাধারণ অর্থ ‘প্রত্যক্ষ’, কিন্তু এই অর্থ প্রকাশে তিনটি শব্দ অভিন্ন ঘটনের বাক্যে প্রয়োগ করা হলে তা সুবুদ্ধির হবে না। যেমন :
একটি ঘটনা ঘটেছে, এটি কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে নয়, স্যাটেলাইটেও নয়; আপনি নিজ চোখে আপনার সামনে ঘটনাটি ঘটতে দেখেছেন, মানে প্রত্যক্ষ করেছেন। বিষয়টা আপনি সহজে কীভাবে বলবেন? আমি হলে বলতাম :
(১) ঘটনাটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি।
(২) চাক্ষুষ ঘটনা।
চাক্ষুষ, প্রত্যক্ষ ও সমক্ষ- শব্দের সাধারণ একটি অর্থ ‘প্রত্যক্ষ’ বলে যদি লিখে বসি :
(২) ঘটনাটা আমি সমক্ষ করেছি।
(৩) ঘটনাটা আমি চাক্ষুষ করেছি।
তাহলে, আমার প্রকাশ আদর্শ হয়েছে এমন বলা যাবে না। আপনি প্রত্যক্ষ করে বলুন, শেষের দুটি বাক্য কেমন মনে হয়? মনে রাখতে হবে, সাধারণত বাক্যের গঠন আর বক্তার উদ্দেশ্যের উপর শব্দের প্রয়োগ নির্ভর, অর্থের উপর নয়। তা না হলে,
“বল, বুদ্ধিমানেরা বুদ্ধি দিয়ে বল খেলে, বল দিয়ে নয়” বাক্যের তিনটি ‘বল’ এর অর্থ ‘বলা, ফুটবল বা শক্তি’ হয়ে যেত।
এ বিষয়ে আপনারা আরও উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে নিবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।
 
৫১.  দীর্ঘপাদ
দীর্ঘ ও পাদ মিলে দীর্ঘপাদ শব্দের উদ্ভব। দীর্ঘপাদ শব্দের দীর্ঘ অর্থ— লম্বা এবং পাদ অর্থ— পা। সুতরাং, দীর্ঘপাদ অর্থ— লম্বা পা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত দীর্ঘপাদ (দীর্ঘ+√ পদ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) লম্বা পা-বিশিষ্ট (উট বক সারস প্রভৃতি প্রাণী)।
 
৫২. অকাম ও অকাম
বাংলা ভাষায় দুটি অকাম আছে। একটি সংস্কৃত অকাম এবং আর একটি বাংলা অকাম। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত অকাম (ন+√কম্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) নিষ্কাম, জিতেন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়পরায়ণ নয়, যংযমী; অত্যন্ত চরিত্রবান এমন। অর্থাৎ অত্যন্ত চরিত্রবান এবং ভালো ও সংযমী মহৎ ব্যক্তি সংস্কৃত অকাম গুণের অধিকারী হয়। বাংলা অকাম অর্থ— (বিশেষ্যে) অকাজ, কুকাজ, চরিত্রহীনের কাজ। বাংলা অকাম খারাপ। সংস্কৃত অকাম ভালো।
 
৫৩. রাজাকার অর্থ কী
রাজাকার ফারসি শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত রাজাকার অর্থ— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) নারীনির্যাতন ও গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটতরাজের জন্য দায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তাকারী ব্যক্তি; (২) ঘৃণ্য ব্যক্তি; (৩) গালিবিশেষ; (৪) স্বেচ্ছাসেবক। শব্দটির অর্থ একসময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ইতিবাচক ছিল। তবে এখন এটি মারাত্মক নেতিবাচক একটি শব্দ। ব্যক্তির কাজ শুধু ব্যক্তিকে নয়, শব্দকেও দূষণীয় করে দেয়। যেমন: মীরজাফর, হিটলার, বয়কট প্রভৃতি।
 
৫৪. যুদ্ধপরাধী
সংস্কৃত যুদ্ধপরাধী (যুদ্ধ+অপরাধ+ইন্) অর্থ— যুদ্ধ চলাকালে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে যুদ্ধপরাধী শব্দের আর একটি অর্থ দেওয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ব্যাপক নারী-নির্যাতন, গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিবর্গ।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  রাজাকার কেবল তারাই যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) নারীনির্যাতন ও গণহত্যা-সহ বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটতরাজের জন্য দায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করছে। কিন্তু  অনুরূপ অপরাধকারী ও সহায়তাকারী উভয়ে যুদ্ধপরাধী। সুতরাং, সকল রাজাকার যুদ্ধপরাধী, কিন্তু সকল যুদ্ধপরাধী রাজাকার নয়।
৫৫. ঝোপ, ঝাড় ও ঝোপঝাড়
 
ঝোপ ও ঝাড় মিলে ঝোপঝাড় । সংস্কৃত ক্ষুপ থেকে উদ্ভূত ঝোপ অর্থ — (বিশেষ্যে) মাঝারি উচ্চতার বিভিন্ন উদ্ভিদের ঝাড় বা জঙ্গল। ঝোপঝাড় শব্দের সঙ্গে যুক্ত ঝাড় দেশি শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) ছোটো গাছের জঙ্গল, ঝোপ। এছাড়া দেশি ঝাড়-এর আরও কিছু অর্থ আছে। যেমন— স্তবক, গুচ্ছ; গোষ্ঠী, বংশ; শাখাপ্রশাখা দীপাধার। অভিধানে পৃথক ভুক্তিতে আর একটি ঝাড় রয়েছে। সেটি হিন্দি ঝাড়। এর অর্থ— পরিমার্জন, পরিষ্করণ; ভর্ৎসনা, প্রহার, অপহরণ। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ঝোপঝাড় অর্থ— (বিশেষ্যে) গুল্ম ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত স্থান।
ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আাছে কয়েকটি শিয়াল। গ্রামেও এখন ঝোপঝাড় তেমন দেখা যায় না। ৫৫.

৫৬. অধর্ম মিথ্যা দম্ভ মায়া লোভ ক্রোধ হিংসা কলি ভয় ও মৃত্যু-এর জন্মবৃত্তান্ত

ভারতীয় পুরাণমতে, দ্বাপরের অবসানে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্মের সৃষ্টি হয়। অধর্মের স্ত্রীর নাম মিথ্যা। মিথ্যার গর্ভে ও অধর্মের ঔরসে দম্ভ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। দম্ভ নিজ ভগিনী মায়াকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের ‘লোভ’ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। লোভ নিজের ভগিনী নিবৃতিকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ক্রোধ নামের এক পুত্র ও হিংসা নামের এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ক্রোধ নিজ ভগিনী হিংসাকে বিবাহ করেন। তাঁদের কলি নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। কলি নিজের ভগিনী দ্বিরুক্তিকে বিয়ে করেন। তাদের ‘ভয়’ নামের এক পুত্র এবং ‘মৃত্যু’ নামের এক কন্যার জন্ম হয়। এ কলিই ‘কলি’ যুগের প্রতিষ্ঠাতা।‘কলি’ যুগপ্রবর্তক দেবতা। তাঁর নামানুসারে বর্তমান যুগের নাম কলিযুগ। পৃথিবী ৪,৩২,০০০ বছর এ দেবতার অধিকারে থাকবে। এ যুগের শেষে ভগবান বিষ্ণু কল্কিরূপে আবির্ভূত হবেন।
 
৫৭.  বিপক্ষ বনাম বিরুদ্ধ
বিপক্ষ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত বিপক্ষ (বি+পক্ষ) অর্থ— (বিশেষ্যে) বিরুদ্ধপক্ষ; অনিষ্টকারী পক্ষ; শত্রু। বিপক্ষপাতী অর্থ— বিরুদ্ধ মতাবলম্বী বা শত্রুর পক্ষ অবলম্বনকারী। কিন্তু বিপক্ষীয় অর্থ— বিরোধী দলভুক্ত; বিপক্ষসংক্রান্ত। বিপক্ষীয় ছাড়া বাকি দুটো শব্দের অর্থে  শত্রু রয়েছে।
 
বিরুদ্ধ:  সংস্কৃত বিরুদ্ধ (বি+√রুধ্+ত)  অর্থ— (বিশেষণে) ১. প্রতিকূল, পরিপন্থি (প্রথবিরুদ্ধ, মানবতাবিরুদ্ধ);  উল্টা, বিপরীত (বিরুদ্ধ কথা, বিরুদ্ধ মত); বিরোধী ( বিরুদ্ধ দলের খেলোয়াড়), বিপক্ষীয়।
 
বিপক্ষ শব্দটি বাক্যে সাধারণত বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু বিরুদ্ধ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিশেষণ রূপে। আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণে দেখা  যায়— বিরুদ্ধ শব্দে শত্রু ও অনিষ্টকারী পক্ষ  রয়েছে, কিন্তু বিপক্ষ শব্দে সরাসরি শত্রু বা শত্রুতা কিংবা অনিষ্টের কোনো ইঙ্গিত নেই। তাই, শত্রু বা শত্রুতা প্রকাশে বিপক্ষ শব্দটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। সুতরাং, বিরুদ্ধ শব্দের চেয়ে বিপক্ষ শব্দটি অধিক নেতিবাচক।  শত্রুতা বা অনিষ্টকারী বাদ দিলে উভয় শব্দ সমার্থক। যেমন: জার্মান-ইংল্যান্ড খেলায় রহিম
, কামালের বিপক্ষ দলের সমর্থক ছিল। জার্মান-ইংল্যান্ড খেলায় রহিম, কামালের বিরুদ্ধ দলের সমর্থক ছিল। অভিধানের অর্থ অনুযায়ী,  “সে আমার শত্রু” কথাটি “সে আমার বিপক্ষ” কথা দিয়ে প্রকাশ করা যায়; কিন্তু “সে আমার বিরুদ্ধ” বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।
অর্থাৎ, সকল বিপক্ষই বিরুদ্ধ; কিন্তু সকল বিরুদ্ধ, বিপক্ষ নয়।
 
৫৮. ক্ষেত্রজ, ক্ষেত্রজ পুত্র
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  সংস্কৃত ক্ষেত্রজ (ক্ষেত্র+√জন্‌+অ) অর্থ— (বিশেষণে) জমিতে উৎপন্ন, কৃষিজাত; খেত থেকে উৎপন্ন; নিজ পত্নীর গর্ভে, কিন্তু অন্য পুরুষের ঔরসজাত। কারও স্ত্রীর গর্ভে অন্য পুরুষের  শুক্রাণু থেকে জাত সন্তানকে বলা হয় ক্ষেত্রজ সন্তান বা ক্ষেত্রজ পুত্র। মহাভারতে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন ক্ষেত্রজ বা ক্ষেত্রজ পুত্র। 
পাণ্ডু  রাজাকে  কিমিন্দম মুনি  অভিশাপ দিলেন যে,  কোনো নারীর সঙ্গে সংগম করলে পাণ্ডু মারা যাবেন।। তাই তিনি স্ত্রী সংগম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। ফলে তিনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এ অবস্থায় পাণ্ডু তাঁর স্ত্রী কুন্তীকে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিন দেবতাকে আহ্বান করেন। প্রথমে তিনি ধর্মকে এবং দ্বিতীয় বার পবনকে সন্তান প্রদানের জন্য আহ্ববান করেন।  ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির এবং পবনের ঔরসে ভীম জন্মগ্রহণ করেন। শেষবার কুন্তি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। ইন্দ্রের ঔরসে  অর্জুনের জন্ম  হয়।  এজন্য অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত। 
 
৫৯. বৎসর ও বছর
 বৎসর:  সংস্কৃত বৎসর (বৎ+সর) অর্থ— (বিশেষ্যে) বারো মাসকাল, বছর, বর্ষ; অব্দ, সন। বছর: সংস্কৃত বৎসর থেকে উদ্ভূত বছর অর্থ ১২ মাসব্যাপী কালপর্ব; বৎসর-এর চলিত রূপ। অর্থাৎ বছর হলো বৎসর শব্দের চলিত রূপ। দুটো সমার্থক।
 
৬০. ল্যাটা ও ল্যাঠা
ল্যাটা দেশি শব্দ।  এর অর্থ— (বিশেষ্যে) মাছবিশেষ, লইট্টা, লটে, লটিয়া। অন্যদিকে, দেশি ল্যাঠা অর্থ— (বিশেষ্যে) উৎপাত, ঝামেলা, বিপদ, বিঘ্ন, সংকট। ল্যাটা কোনো ল্যাঠা ঘটায় না। ল্যাটা খুব নরম প্রকৃতির মাছ।
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 

৬১. অপাঙ্‌ক্তেয়

 পঙ্‌ক্তির সঙ্গে নেতিবাচক অ-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে অপাঙ্‌ক্তেয় শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ অনুপযুক্ত বা অসমকক্ষ। শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হল একই পঙ্‌ক্তিতে বা একই সারিতে বসার অনুপযুক্ত। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে সমবেত মর্যদাশীল ব্যক্তিদের পঙ্‌ক্তিতে বা সারিতে নিম্নশ্রেণির মানুষদের বসতে বা খেতে দেয়া হত না। তাই তাদের বলা হত অপাঙ্‌ক্তেয় বা পঙ্‌ক্তিতে বসার অনুপযুক্ত। তখন অপাঙ্‌ক্তেয় বলতে একঘরে, পতিত, ঘৃণিত, নিন্দিত ও অবজ্ঞেয় ব্যক্তিবর্গকে বুঝানো হত। এখন অযোগ্য, অনুপযুক্ত কিংবা অসমকক্ষ বুঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

৬২. হ য ব র ল

এটি একটি বহুল প্রচলিত বাগ্‌ভঙ্গি যার আভিধানিক অর্থ: বিপর্যস্ত, বিশৃঙ্খলা, গোঁজামিল, অব্যবস্থা প্রভৃতি। বাংলায় স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিত থাকে। যেমন: অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ; ক খ গ ঘ ঙ প্রভৃতি। শিশুদের যখন বর্ণপরিচয় শুরু হয়, তখন বর্ণগুলো শিশুরা শুধু মুখস্থ করেছে না কি চিনে চিনে ভালোভাবে রপ্ত করেছে তা পরীক্ষা করার জন্য বর্ণগুলো পর পর না-দেখিয়ে এলোমেলো ও বিশৃঙ্খলভাবে দেখানো হয়। এটাই ছিল বর্ণমালা পরিচয় পরীক্ষার রেওয়াজ। যেমন: ‘য র ল ব শ হ’ এ নির্ধারিত ক্রম ভেঙে হয়তো শিশুদের দেখানো হতে পরে: ‘হ য ব র ল’। বর্ণপরিচয়ের পরীক্ষার জন্য বর্ণসমূহের ক্রমবিন্যাসের চ্যুতি, গোঁজামিল বা বিশৃঙ্খল বিন্যাস থেকে ‘হ য ব র ল’ কথাটির উদ্ভব।
৬৩. রুগ্ন বানান ভুল কেন?
রুগ্‌ণ, রুগ্‌ণতা, রুগ্‌ণা শব্দগুলির একমাত্র শুদ্ধ বানান যথাক্রমে রুগ্‌ণ, রুগ্‌ণতা, রুগ্‌ণা। একই পদের মধ্যে প্রথমে ঋ ঋৃ র ষ-এর পরে যদি স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ, য-ব-হ এবং অনুস্বারের ব্যবধান থাকে তাহলে পরবর্তী ন, ণ হয়ে যায়। সে হিসেবে “রুগ্‌ণ’ শব্দটির বানানে গ-এর পর মূর্ধন্য-ণ। অর্থাৎ শুদ্ধ বানান রুগ্‌ণ। সংগত কারণে, রুগ্ন অশুদ্ধ বানান। গ-এর সঙ্গে মূর্ধন্য-ণ-যুক্ত কোনো বর্ণচিহ্ন নেই, কিংবা যুক্ত করে লেখা হলে গ-এর নিচে মূর্ধন্য-ণ না কি দন্ত্য-ন তেমন বোঝা যায় না। তাই বানানটি যুক্তব্যঞ্জনে লেখা সমীচীন নয়।অবশ্য কম্পিউটারে রুগ্ণ লেখা যায়, কিন্তু হাত দিয়ে লিখতে হলে ন আর ণ এক হয়ে যায়। অতএব, রুগ্ন লিখবেন না, লিখুন রুগ্‌ণ
 
৬৪. মাত্রা ও বাংলা বর্ণ
 
বাংলা বর্ণমালায় মাত্রা হলো- স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণের মাথায় সোজা দাগ। স্বরবর্ণ ‘এ’ কিংবা ‘ও’-এর মাথায় দাগ নেই সুতরাং ‘এ’ এবং ‘ও’ হলো মাত্রাহীন বর্ণ। আবার ‘এ’ এবং ‘ও’ -এর মাথায় দাগ দিয়ে দিলে (মাত্রা দিলে) হয়ে যায় যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ ‘ত্র’ (ত+র = ত-য়ে র-ফলা) আর ‘ত্ত’ (ত+ত= ত -য়ে ত)।
বাংলা বর্ণে মাত্রা দুই প্রকার। যথা : পূর্ণমাত্রা ও অর্ধমাত্রা।
পূর্ণমাত্রার বর্ণ মোট ৩২টি। যথা : অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ক, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, দ, ন, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ষ, স, হ, ড়, ঢ় এবং য়।
অর্ধমাত্রার বর্ণ আটটি। যথা : ঋ, খ, গ, ণ, থ, ধ, প এবং শ।
বাংলা বর্ণমালার মোট ৫০টি বর্ণের বাকি দশটি অক্ষর হলো মাত্রাহীন।
সেগুলো হচ্ছে : এ, ঐ, ও, ঔ, ঙ, ঞ, ৎ, ং, ঃ, এবং ঁ।
 

৬৫. স্বার্থনিজ না-হয়ে বানানটি স্বার্থপর কেন? 

সংস্কৃত স্বার্থ (স্ব+অর্থ) শব্দের অর্থ— (বিশেষ্যে) নিজ প্রয়োজনের বিবেচনা; নিজের মঙ্গল বা হিত। অন্যদিকে, স্বার্থপর (স্বার্থ+পর) অর্থ (বিশেষণে)— পরের বা অন্যের সুবিধা-অসুবিধা না দেখে সর্বদা নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে তৎপর এমন, পরকে উপেক্ষাকারী ব্যক্তি স্বার্থপর।
আভিধানিক অর্থ হতে দেখা যায়, স্বার্থপর লোক নিজের স্বার্থ অর্থাৎ নিজের মঙ্গল বা হিত করার জন্য অন্যকে পর করে দেয়। তাই শব্দটির বানান স্বার্থপর।যদি এমন লোক নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে নিজের করে নিত তাহলে শব্দটির বানান হতো স্বার্থনিজ
 
৬৬. পুন-এর পর বিসর্গ বসে যখন (নিমোনিক)
 পুন-এর পর  থাকলে ওই -এর আগে বিসর্গ হবে। যেমন: পুনঃপুন, পুনঃপ্রচার, পুনঃপ্রচারিত, পুনঃপ্রবেশ। অনুরূপ পৌন-এর পর থাকলেও ওই প-এর আগে বিসর্গ হবে। যেমন: পৌনঃপুনিক, পৌনঃপুনিকতা, পৌনঃপুন্য প্রভৃতি। মনে রাখবেন, এটি নিমোনিক। ব্যাকরণের অন্যান্য সূত্রের মতো এই নিমোনিকেরও ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
 

৬৭. বাংলা লাইনোটাইপের উদ্ভাবক ও লাইনো টাইপের প্রথম ছাপা

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় বাংলা টাইপ ও কেস শিরোনামে অজরচন্দ্র সরকারের একটি প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলা টাইপসংখ্যা ৫৬৩ এবং টাইপ কেসসংখ্যা ৪৫৫। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর সুরেশচন্দ্র মজুমদার ও রাজশেখর বসু বাংলা লাইনোটাইপ উদ্ভাবন করেন। লাইনোটাইপে বাংলা টাইপসংখ্যা ৫৬৩ থেকে কমে ১৭৪-এ চলে আসে। ফলে বাংলা ছাপায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রথম লাইনোটাইপে ছাপা শুরু হয়।
 
৬৮. বদ্ধ বন্‌ধ  বন্দ ও বন্ধ
 
বদ্ধ: সংস্কৃত বদ্ধ (√বধ্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) বাঁধা, আবদ্ধ (নিয়মবদ্ধ, জলাবদ্ধ)। গ্রথিত (বেণিবদ্ধ কবরী)। রুদ্ধ (বদ্ধপথ, বদ্ধদরজা)। গতিহীন (বদ্ধস্রোত, বদ্ধজীবন)। বন্দি, আটক (পিঞ্জরাবদ্ধ পাখি)। যুক্ত (বদ্ধাঞ্জলি)। স্থির(বদ্ধদৃষ্টি)। সজ্জিত, সুবিন্যস্ত (শ্রেণিবদ্ধ পুস্তক)। দৃঢ় ও অনমনীয় (বদ্ধমূল বিশ্বাস)। নিরেট, সম্পুর্ণ, পুরেপুরি (বদ্ধ উন্মাদ)।  নজরুল লিখেছেন: থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে- – -।
 
বন্‌ধ: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত বন্ধ থেকে উদ্ভূত বন্‌ধ অর্থ— (বিশেষ্যে) বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ শক্তি প্রদর্শন বা শ্রমিক সংগঠনের দাবি আদায়ের জন্য আহুত ধর্মঘট, হরতাল।  বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ জনগণকে আগামী তিন দিন বন্‌ধ পালনের আহ্বান করেছেন। ভারতে আজ বন্‌ধ।
 
বন্দ: ফারসি বন্দ (উচ্চারণ বন্দো) অর্থ— দৈর্ঘ্যপ্রস্থের সমষ্টির পরিমাণ। অংশ। অবরোধ।
 
বন্ধ:সংস্কৃত (√বন্ধ+অ) অর্থ— বাঁধার উপকরণ, বন্ধনী (কোমরবন্ধ, বাজুবন্ধ)। বন্ধন, বাঁধন (মুক্ত করো হে বন্ধ, রবীন্দ্রনাথ)। রোধ (দমবন্ধ, নিঃশ্বাস বন্ধ)। গ্রন্থন, সংযোগ (সেতুবন্ধ)। আবেষ্টন (ভুজবন্ধ)। ছুটি, অবকাশ (আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, রবীন্দ্রনাথ)। বিশেষণে বন্ধ অর্থ— রুদ্ধ (বদ্ধ কপাট)। আড়ি (কথা বন্ধ)। স্থগিত আছে এমন ( নিয়োগ বন্ধ, চলাচল বন্ধ)। অচল, নিশ্চল, নষ্ট (বন্ধ ঘড়ি)। বাধাপ্রাপ্ত । আটক, বন্দি (বন্ধ শিশু)। বন্ধ করো সব অনৈতিক কাজকর্ম।
বন্‌ধ ও বন্দের কারণে গৃহবদ্ধ নগরবাসী দরজাজানালা বন্ধ করে  বন্‌ধ উপভোগ করছেন।
 
৬৯. লোকনিরুক্তি
 
অপরিচিতি বা ব্যুৎপত্তিগত বিস্মৃতির কারণে কিংবা প্রচলিত বিশ্বাস, জ্ঞান বা অনুমান বশত অনেক সময় মানুষ তার পরিচিত, প্রায়োগিক অর্থে সমতুল ও প্রায়-সমোচ্চারিত শব্দের আদলে কোনো-কোনো শব্দের বানান বা উচ্চারণ পরিবর্তন করে নতুন শব্দ সৃষ্টি করে। এটি হচ্ছে লোকনিরুক্তি। অন্যভাবে বলা
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. মূল্য: ৭০০ টাকা
যায়, সাধারণ জ্ঞান, বিশ্বাস, অনুমান, লোকশ্রুতি,  প্রবীণদের মন্তব্য, অভিজ্ঞতা প্রভৃতির উপর নির্ভর করে মূল শব্দের যে ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে নতুন  শব্দ তৈরি হয়, তাকে লোক-নিরুক্তি বলে।  লোকনিরুক্তির ক্ষেত্রে আদি বানান ও পরিবর্তিত বানানের শব্দ বা শব্দগুচ্ছের বানান পরিবর্তিত হলেও অর্থ অভিন্ন থেকে যায়। যেমন: ঊর্ণবাভ থেকে  ঊর্ণনাভ, কালজার থেকে কালাজ্বর, টাকার কুবের থেকে টাকার কুমির,  আর্ম চেয়ার হতে আরাম কেদারা, বিস্ফোটক থেকে বিষফোড়া ইত্যাদি। সহজ কথায়, সাধারণ মানুষের ব্যবহার থেকে সৃষ্টি হওয়া শব্দকে লোকনিরুক্তি বলা যায়।
 
৭০. উর্ণনাভ
উর্ণবাভ থেকে   উর্ণনাভ। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায়  মাকড়সাকে ‘উর্ণবাভ’ বলা হতো। উর্ণবাভ শব্দের আক্ষরিক অর্থ—  যে কীট লোম বয়ন করে।  লোম বয়নের কাজটি করে মাকড়সা। তাই তাকে বলা হতো উর্ণবাভ। পরবর্তীকালে ‘বাভ’ শব্দটি নাভি অর্থে নাভ শব্দে পরিণত হয়। কারণ: সেকালের লোকদের মধ্যে এমন একটি বদ্ধমূল বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে, মাকড়সা নিজের নাভ বা নাভি থেকে লালা বের করে তাকে সুতোর মতো করে ওই সুতো দিয়ে জাল বুনে বা জাল বয়ন করে। তাই উর্ণবাভ শব্দটি  হয়ে যায় উর্ণনাভ
 
৭১.  কালাজ্বর
কালজার থেকে কালাজ্বর। বর্তমানে কালাজ্বর বানানে প্রচলিত শব্দটির উৎস বানান ছিল কালজার । আসামি  কাল ও ফরাসি  আজার (ব্যাধি) শব্দ মিলে কালজার (কাল+আজার) শব্দটি গঠিত হয়েছিল। এর অর্থ ব্যাধির সময়, ব্যাধিকাল। আসাম ও ফরাসি শব্দের অর্থ সাধারণ বাঙালিদের জানা ছিল না। তাই তাদের কাছে কালজার শব্দের কোনো গ্রহণযোগ্য অর্থ বা ব্যাখ্যা ছিল না। তবে রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। এ রোগ হলে শরীর জ্বরের মতো তপ্ত এবং চামড়া কালো হয়ে যায়। তাই মানুষের ধারণা হলো শব্দটি কালজার নয়, কালাজ্বর।  রোগটি হলে শরীর জ্বরের মতো গরম  এবং চামড়া কালো হয়ে যায় বলে কালজার শব্দটি বাংলায় কালাজ্বর বানানে স্থিতি পায়।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, অসমীয় কালাজ্বর অর্থ— (বিশেষ্যে) ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলে জীবাণু সংক্রমণের ফলে জ্বর, রক্তশূন্যতা, গায়ের চামড়া কালো হয়ে যাওয়া এবং যকৃৎ ও প্লীহার স্ফীতি প্রভৃতি উপসর্গ; ইংরেজিতে kala-azar.
 
৭২. টাকার কুমির
টাকার কুমির কথাটির আদি রূপ টাকার কুমির ছিল না। আদি কথাটি ছিল টাকার কুবের। যা পরিবর্তিত হয়ে টাকার কুমির হয়ে গেছে।  এটি ধাতব মুদ্রা যুগের কথা। তখন কাগুজে মুদ্রা ছিল না। পৌরাণিক বিশ্বাসমতে, কুবের হচ্ছে ধন-সম্পদের দেবতা। তাঁর কাছে প্রচুর টাকা, সোনাদানা ও নানা  সম্পদ জমা থাকত। এই দেবতা কুবের থেকে টাকার কুবের কথাটির উদ্ভব।  কিন্তু পরে টাকার কুবের কথাটি টাকার কুমির হয়ে গেল কেন?  কুমির মানুুষ খায়। সাধারণ জনগণের ধারণা, কুমির যাকে খেত তার সঙ্গে রক্ষিত সব টাকা-পয়সা, সোনাদানা বা অন্যান্য সম্পদ কুমিরের পেটে জমা পড়ে থাকত। যে কুমির অধিক মানুষ  খেত, সে কুমিরের পেটে অনেক টাকা জমা হতো। এভাবে টাকা, সোনাদানা ও সম্পদাদি জমতে জমতে ওই কুমিরের পেট টাকায় ভরে যেত। এই বিশ্বাস থেকে যে মানুষের প্রচুর ধনসম্পদ হতো তাকে টাকার কুমির আখ্যায়িত করা শুরু হয়।  এভাবে বেচারা কুবের হয়ে যায় টাকার কুমির।
 
৭৩.  আরাম কেদারা
 আরাম কেদারা কথার মুল বানান ছিল আর্ম চেয়ার বা আর্ম কেদারা। ইংরেজি আর্ম চেয়ার ( Arm chair) থেকে আর্ম চেয়ার বা আর্ম কেদারা কথার উদ্ভব। কিন্তু তা  আরাম কেদারা হয়ে গেল কীভাবে?  আর্ম অর্থ বাহু এবং চেয়ার অর্থ কেদারা। যে চেয়ারে হেলান দিয়ে হাতকে শুয়ে রাখার সুযোগ থাকে তাকে বলা হতো আর্ম চেয়ার। বাংলায় আসার পর আর্ম চেয়ার হয়ে যায় আরাম কেদারা। আর্ম চেয়ারে শরীর রাখলে আরাম পাওয়া যায়। তাই বাঙালিদের কাছে ইংরেজি আর্ম চেয়ার আরাম কেদারা হয়ে যায়।
 
৭৪.বিষফোড়া
 সংস্কৃত বিস্ফোটক থেকে বাংলা বিষফোড়া শব্দের উদ্ভব। বিস্ফোটক শব্দটির ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে পাই: বি-√স্ফুট্(বিকশিত হওয়া)+অক বা বি+স্ফোটক। বি অর্থ বিশেষ এবং স্ফোটক অর্থ ফোড়া। যার আক্ষরিক অর্থ বিশেষ ফোড়া। কিন্তু বাংলা বলা হয় বিষফোড়া। অথচ  এর সঙ্গে বিষের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু বিস্ফোটক নামের ছোটো ফোড়াটি হলে মানুষ বিষের মতো জ্বালা অনুভব করে। তাই লোকপ্রচলিত বিশ্বাস, ওই ফোড়ার মধ্যে বিষ থাকে। ওই বিষ থেকে জ্বালাযন্ত্রণা হয়। তাই বিস্ফোটক বা বিশেষ ফোড়া হয়ে গেছে বিষফোড়া।
 
৭৫. নাসিক্যধ্বনি ও নাসিক্যবর্ণ: নাসিক্য ব্যঞ্জন বা নাসিক্য বর্ণ
যে ধ্বনি বা শব্দ উচ্চারণের সময় ধ্বনিতাড়িত বায়ু মুখ দিয়ে বের না হয়ে নাক দিয়ে কিংবা  নাক ও মুখ উভয় স্বরযন্ত্র দিয়ে একসঙ্গে বের হয়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলে। ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের জন্য নাসিকা  আবশ্যক। তাই এদের নাম নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ। বাংলায় নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি ৩টি। যথা— ঙ, ন, ম। তবে নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ ৭ টি। যথা: ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং, ঁ।  ঙ, ঞ, ণ, ন, ম  এই ৫টি বর্ণ পৃথক পাঁচটি বর্গের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পাঁচটি বর্ণকে বর্গীয় নাসিক্য বর্ণ বলা হয়। সুুতরাং, বাংলায় নাসিক্য বা অনুনাসিক বর্ণ— ৭টি।  তবে, মুহম্মদ আবদুল হাই মনে করেন, বাংলায় নাসিক্য বর্ণ ৬টি। যথা— ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং। তাঁর মতে, (চন্দ্রবিন্দু) ঁ  কেবল অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। এটি স্বতন্ত্র ধ্বনি পরিজ্ঞাপক কোনো বর্ণ নয়। তাই তিনি চন্দ্রবিন্দুকে বর্ণ স্বীকৃতি দেননি।
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 

৭৫. নাসিক্যধ্বনি ও নাসিক্যবর্ণ: নাসিক্য ব্যঞ্জন বা নাসিক্য বর্ণ:

যে ধ্বনি বা শব্দ উচ্চারণের সময় ধ্বনিতাড়িত বায়ু মুখ দিয়ে বের না হয়ে নাক দিয়ে কিংবা  নাক ও মুখ উভয় স্বরযন্ত্র দিয়ে একসঙ্গে বের হয়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলে। ধ্বনিসমূহ উচ্চারণের জন্য নাসিকা  আবশ্যক। তাই এদের নাম নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ। বাংলায় নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি ৩টি। যথা— ঙ, ন, ম। তবে নাসিক্য বর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ ৭ টি। যথা: ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং, ঁ।  ঙ, ঞ, ণ, ন, ম  এই ৫টি বর্ণ পৃথক পাঁচটি বর্গের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পাঁচটি বর্ণকে বর্গীয় নাসিক্য বর্ণ বলা হয়। সুুতরাং, বাংলায় নাসিক্য বা অনুনাসিক বর্ণ— ৭টি।  তবে, মুহম্মদ আবদুল হাই মনে করেন, বাংলায় নাসিক্য বর্ণ ৬টি। যথা— ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং। তাঁর মতে, (চন্দ্রবিন্দু) ঁ  কেবল অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। এটি স্বতন্ত্র ধ্বনি পরিজ্ঞাপক কোনো বর্ণ নয়। তাই তিনি চন্দ্রবিন্দুকে বর্ণ স্বীকৃতি দেননি।
 
৭৬. ওষুধ না কি ঔষধ; ঔষধি কী
ওষুধ ও ঔষধ দুটোই শুদ্ধ। ঔষধ সংস্কৃত বা তৎসম এবং ওষুধ খাঁটি বাংলা শব্দ। তবে ঔষধালয়, ওষুধালয় নয়। সংস্কৃত ঔষধ (ওষধি+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের জন্য প্রযুক্ত দ্রব্যাদি।ওষুধ ও ঔষধ পরস্পর সমার্থক। ঔষধি বাংলা শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষে) যে সকল গাছগাছড়া থেকে ওষুধ/ঔষধ তৈরি হয়।
 
৭৭. লবণ লাবণ লাবণি ও লাবণ্য
সংস্কৃত লবণ (√লু+অন) অর্থ— (বিশেষ্যে) সোডিয়াম ও  ক্লোরিন পরমাণুর রাসায়নিক বিক্রিয়াজাত কেলাসিত খনিজপদার্থ, সমুদ্রের জল শুকিয়ে প্রাপ্ত লবণাক্ত সাদা যৌগবিশেষ, নুন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়: salt. সংস্কৃত লবণাক্ত (লবণ+অক্ত) অর্থ—  (বিশেষণে) লবণমিশ্রিত, ক্ষারযুক্ত, লোনা স্বাদযুক্ত, লোনা, নোনা। লাবণ (লবণ+অ) অর্থ— (বিশেষণে) লবণাক্ত, লোনা, নোনা। অর্থাৎ, লবণাক্ত ও লাবণ সমার্থক। 
 
লাবণি ও লাবণ্য শব্দের উদ্ভব লবণ থেকে। তবে শব্দদুটোর সঙ্গে তাদের জন্মদাতা লবণের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। সংস্কৃত লাবণ্য থেকে উদ্ভূত লাবণি অর্থ— (বিশেষ্যে) সৌন্দর্য, কান্তি, শ্রী, শোভা, লাবণি। অর্থাৎ লাবণি ও লাবণ্য (লবণ+য) সমার্থক।
 
৭৮. প্রাক্তন ও সাবেক
সংস্কৃত শব্দ ‘প্রাক্তন’ এর অর্থ বিশেষণে ভূতপূর্ব, জন্মান্তরবিষয়ক এবং বিশেষ্যে পূর্বজন্মে কৃতকর্মের ফল, ভূতপূর্ব কর্মী প্রভৃতি। তবে সাধারণত শব্দটি ভূতপূর্ব অর্থে অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আরবি ‘সাবিক’ থেকে উদ্ভূত এবং বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘সাবেক’ শব্দের অর্থ প্রাচীন, পুরাতন, পূর্বেকার প্রভৃতি। শব্দার্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ খুব ক্ষেত্রে সমার্থক।
 
জনাব খুরশেদ আহমেদ লিখেছেন, “ ‘অভিধানতত্ত্বে এমন কথা বলা হয় যে, কোনো শব্দেরই আর একটা হুবহু প্রতিশব্দ হয় না।’যেখানে সমার্থক, সেখানেও ওরা অভিন্ন নয়; কোনো-না-কোনো ভাবে এদের অনন্য দ্যোতনা থাকে। যেখানে ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ সমার্থক, সেখানে, সাধারণভাবে, তৎসম-প্রধান শৈলীতে ‘প্রাক্তন’-এর ব্যবহার ও অতৎসম-প্রধান শৈলীতে ‘সাবেক’ ‘সাবেকি’ ইত্যাদির ব্যবহার অধিকতর লাগসই হতে পারে। আবার, তৎসম-অতৎসম-নির্বিশেষে আলোচনার প্রসঙ্গ-প্রতিবেশ ও বাগ্বিধি ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ ইত্যাদির প্রয়োগের নির্ণায়ক হতে পারে।”
 
অতএব, আমরা বলতে পারি – ‘প্রাক্তন’ ও ‘সাবেক’ শব্দের প্রয়োগে কোনো কঠিন বিধি নেই। তবে, অনেকে মনে করেন, গত হওয়া সময় তুলনামূলকভাবে কম হলে ‘প্রাক্তন’ এবং অধিক হলে ‘সাবেক’ লেখা সমীচীন। যেমন : প্রাক্তন অধ্যক্ষ সাহেব মাঝে মাঝে কলেজে বেড়াতে আসেন। সাবেক অধ্যক্ষ মৃদুল বাবু তিন বছর আগে মারা যান। ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত প্রাক্তন শব্দটি বেশি লেখা হয়। যেমন : প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শাসনামল, বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি; সাবেক সরকারের আমল প্রভৃতি।
 
৭৯. মহামান্য আগত, শুভেচ্ছা ও স্বাগত
যুক্তরাজ্যের রানিকে বলা হয় Her Majesty এবং রাজাকে বলা হয় His Majesty। ল্যাটিন maiestas শব্দ থেকে Majesty শব্দের উদ্ভব। যার অর্থ greatness, যা, জানামতে — খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসকবৃন্দের সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান শাসকের সম্বোধনে Imperial Majesty কথাটিও ব্যবহৃত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব দশম অব্দ পর্যন্ত এই সম্বোধনটির ব্যবহার বেশ আকর্ষণীয় ছিল।
স্বাধীন ভূখণ্ডের শাসকদের সম্বোধন হিসেবে ইউরোপের অনেক দেশে Majesty ছাড়াও Imperial/Royal- Highness ব্যবহৃত হতো। এসব শব্দের ব্যবহার শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্য থেকে।যা ক্রমশ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এসব রাজকীয় সম্বোধন কার জন্য এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার একটি নির্দিষ্ট বিধান ছিল। রোমান ও বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে রাষ্ট্রদূত, সরকারের প্রতিনিধি, আদালতের বিচারক এবং উচ্চপদে নিয়োজিতদের Highness সম্বোধন করা হতো। রাজ পরিবারের সদস্যদেরও Highness (His/Her) বলা হয়। এখন পৃথিবীর সর্বত্র কুটনীতিকদের Highness সম্বোধন করা হয়।
হায়দ্রাবাদ (Hyderabad) এবং বেরার (Berar) নিজামকে ব্রিটিশরা Exalted Highness উপাধি দিয়েছিলেন। তাই তাঁদের Exalted Highness সম্বোধন করা হতো। মূলত এসব শব্দের অনুসরণে বাংলায় ‘মহামান্য’ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে বলা হয়, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি”। ‘মহামান্য’ শব্দটি কেবল রাষ্ট্রপতির জন্য ব্যবহার করা যাবে – এমন কোনো বিধান নেই। তাই যে-কেউ যে-কাউকে ‘মহামান্য’ বলতে পারে। স্মর্তব্য, ‘মহামান্য’ কথাটি অন্য কোনো ভাষার বাংলা অনুবাদ নয়, বরং একটি পারিভাষিক শব্দ।
 
৮০. শুভদৃষ্টি রুসুমাত
রুসুমাত আরবি হতে আগত। বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত রুসুমাত শব্দের অর্থ (মুসলমানদের বিবাহ অনুষ্ঠানে) বর-কনের প্রথম পরস্পর মুখ দেখার সংস্কার; শুভদৃষ্টি।অর্থাৎ শুভদৃষ্টি ও রুসুমাত পরস্পর সমার্থক। 
 
৮১. -জি জি
 
বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত জি-জি আরবি উৎসের শব্দ। -জি হচ্ছে নামান্তে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ। যেমন: মিয়াজি, লতাজি, প্রণবজি। -জি  সম্মানসূচক ও সম্বোধনবাচক শব্দ হিসেবেও নামের শেষে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ওস্তাদজি, গুরুজি, নানাজি। জি মান্যব্যক্তির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। -জি বা জি আরবি উৎসের শব্দ। তাই বানানে ঈ-কার বিধেয় নয়।
 
৮২. গৎবাঁধা
গৎবাঁধা কথাটির আভিধানিক অর্থ— নিয়ম বাঁধা, রুটিনমাফিক, একই প্রকার, অভিন্ন, গতানুগতিক প্রভৃতি। এটি একটি সংগীতসম্পৃক্ত শব্দ। ভারতীয় সংগীতে শব্দটির বহুল প্রচলন লক্ষণীয়। ‘গৎ’ শব্দের মূল অর্থ হলো— বাজনার বোল। বোলের ওপর নির্ভর করে যন্ত্র বাজানোর উপযোগী ছন্দোবদ্ধ সংগীতই হলো ‘গৎ’। ‘গৎ’ মূলত খেয়াল গানের অনুকরণে রচিত একটি সংগীত কৌশল। ‘গৎ’-এর মাধ্যমে ধীরগতি ছন্দের খেয়াল চয়নের একটি সুনির্দিষ্ট অনড় নিয়ম আছে। এ নিয়ম সর্বত্র অভিন্ন এবং অপরিবর্তনীয়। এর মাধ্যমে পুরো সংগীত অভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। কখনো কোনো হেরফের হয় না। গানের এ দৃঢ় রীতিটি মানুষের নিয়মবদ্ধ গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি ও অভিন্নতা প্রকাশে ব্যবহার করা হয়।

 

৮২. উরু বনাম ঊরু

উরু: সংস্কৃত উরু (√ঊর্ণূ+উ) অর্থ— (বিশেষণে) প্রশস্ত, বিশাল, মহৎ।
প্রয়োগ: উরু বক্ষে তার অনন্ত দয়ার মহিমা। যেমন উরু তার বক্ষ তেমন উরু তার হৃদয়।
ঊরু: সংস্কৃত ঊরু (√ঊর্ণু+উ) অর্থ— (বিশেষ্যে) মানবদেহের কুঁচকি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ। এর সমার্থক শব্দ উরুত।
যেমন: দুর্ঘটনায় তার ঊরুর হাড় ভেঙে গেছে।
 
৮৩. স্পর্শ ধ্বনি: প্রাচীন বনাম আধুনিক
 প্রাচীন সংজ্ঞার্থ: যেসব ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময়  জিভ বা জিব বা জিহ্বা  কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দন্ত প্রভৃতি স্বরতন্ত্রীর কোনো না কোনো স্থান স্পর্শ করে তাদের স্পর্শধ্বনি বলে। ক থেকে ম পর্যন্ত মোট পঁচিশটি ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনি বা স্পৃষ্টব্যঞ্জন। এসব ধ্বনির চিহ্নকে  স্পর্শবর্ণ বলে।  প্রাচীন সংজ্ঞার্থ  অনুযায়ী বাংলায় স্পর্শবর্ণের সংখ্যা ২৫ টি।
 
আধুনিক বা প্রমিত সংজ্ঞার্থ: যেসব ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ রূদ্ধ থেকে পরক্ষণে হঠাৎ  মুখ দিয়ে বেরিয়ে ধ্বনিটি উচ্চারিত হয়, তাদের স্পৃষ্টধ্বনি বা স্পর্শধ্বনি বলে। যেমন— ‘ট’  উচ্চারণের সময়  প্রথমে জিহ্বা ও তালু মিলে মুখের বাতাস বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর আবার হঠাৎ‌ বাতাস বের হয়ে ধ্বনিটি উচ্চারিত হচ্ছে। প্রমিত বা আধুনিক সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী স্পর্শ বর্ণের সংখ্যা ১৬টি। যথা: ক, খ, গ, ঘ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, প, ফ, ব, ভ। প্রমিত বাংলায় “ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, চ, ছ, জ, ঝ”  বর্ণ স্পর্শধ্বনির অন্তর্ভুক্ত নয়।
 
৮৪. শব্দার্থ ও বানান: অনতি যখন যুক্ত হয়
অনতি: সংস্কৃত অনতি (ন+অতি) অর্থ বেশি নয়, অল্প; তেমন বেশি নয় প্রভৃতি। অনতি অন্য শব্দের পূর্বে বসে অল্পতা প্রকাশ করে। যেমন:
অনতিকাল: অল্পসময়, বেশি সময় নয়।
অনতিক্রম: অতিক্রম না করে, লঙ্ঘন না করে।
অনতিদীর্ঘ: বেশি লম্বা নয় এমন, অল্প লম্ব।
অনতিদূর: খুব বেশি দূরে নয় এমন, অল্পদূরত্ববিশিষ্ট।
অনতিপক্ব: অল্প পাকা, বেশি পাকা নয়, ডাঁসা, অল্পবয়সি।
অনতিপূর্বে: ক্ষণকাল পূর্বে, অল্পকাল পূর্বে, একটু আগে।
অনতিবিলম্বে: খুব বেশি দেরি না করে, অল্প সময়ের মধ্যে।
অনতিব্যক্ত: প্রায় অপ্রকাশিত, খুব স্পষ্ট নয় এমন, অস্পষ্টভাবে ব্যক্ত।
অনতিমূল্যবান: তেমন মূল্যবান নয় এমন, সাধারণ।
অনতিস্ফুট: পুরোপুরি ফোটেনি এমন।
অনতীত: অতিক্রান্ত হয়নি এমন।
অনতীতবাল্য: বাল্যকাল অতিক্রম হয়নি এমন।
 
৮৫. ময়না ও ময়নাতদন্ত 
‘ময়না’‘তদন্ত’ শব্দের সমন্বয়ে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দ গঠিত।‘তদন্ত’ শব্দের অর্থ কোনো বিষয়ে তদন্ত করে সত্য নিরূপণ। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের তিনটি অর্থ আছে। ‘ময়না’ যখন দেশি শব্দ তখন এর অর্থ, কালো পালকাবৃত শালিকজাতীয় পাখি। ‘ময়না’ যখন সংস্কৃত শব্দ তখন এর অর্থ, ডাকিনি বা খল স্বভাবের নারী। অভিধানে সংস্কৃত ‘ময়না’ শব্দ দ্বারা বাংলা লোকসংগীতের রাজা মানিকচন্দ্রের জাদুবিদ্যায় পারদর্শী পত্নীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘ময়না’ যখন আরবি শব্দ তখন এর অর্থ অনুসন্ধান। আরবি ‘মু’আইনা’ শব্দের অর্থ, চক্ষু দিয়ে, চোখের সামনে, প্রত্যক্ষভাবে, পরিষ্কারভাবে । বাংলায় এসে শব্দটি তার আসল রূপ হারালেও অন্তর্নিহিত অর্থ পুরোপুরি হারায়নি। ‘মু’আইনা’ বাংলায় এসে ‘ময়না’ হয়ে গেলেও ‘অনুসন্ধান’ অর্থ নিয়ে সে তার মূল অর্থকে আরও ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছে। এভাবে শব্দার্থের নানা পরিবর্তন ঘটে।
‘ময়নাতদন্ত’ শব্দের ‘ময়না’ বাংলা ও সংস্কৃত ‘ময়না’ নয়। এটি হচ্ছে ‘আরবি’ ময়না। মূলত আরবি ‘মু’আয়িনা’ শব্দ থেকে বাংলায় অনুসন্ধান অর্থে ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের উদ্ভব। এই আরবি ‘ময়না’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ‘তদন্ত’ শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দ। যার অর্থ, অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনের উদ্দেশ্যে শবব্যবচ্ছেদ। বাংলায় ব্যবহৃত ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটির ইংরেজি অর্থ Post-mortem এবং এর অর্থ, An examination of a dead body to determine the cause of death.
 
৮৬. স্থূল বুদ্ধি বিকৃত বুদ্ধি ও বুলি
স্থুল বুদ্ধি : সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিহীন। অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন। বিকৃতবুদ্ধি: বুদ্ধির বিকার ঘটেছে এমন। যথাযথ চিন্তাচেতনাহীন। বুলি: যথাযথ অর্থ বহন করে না এমন কথা যা অভ্যাসের বশে বলা হয়ে থাকে। যে কথা পরবর্তীকালে আর খেয়াল থাকে না, মূল্য থাকে না।
 
৮৭: আর্থিক ও আত্মিক
আত্মিক: মনোজাগতিক। চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে।
আর্থিক: অর্থ-সম্পদবিষয়ক, টাকাপয়সা ও ধনদৌলতসংক্রান্ত।
 
৮৮. মনুষ্যত্ব, তপোবন, চর্মচক্ষু
মানুষ্যত্ব অর্থ মানবোচিত সদগুণাবলি। মানুষের বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। তপোবন: অরণ্যে ঋষির আশ্রম। মুনি ঋষিরা তপস্যা করে এমন বন। চর্মচক্ষু: দৈহিক চক্ষু। [মানসিক বা দিব্যদৃষ্টির বিপরীত]
 
৮৯. নতি, সাধনা মনুষ্যত্ব ও সৃজনশীল সৃষ্টিধর্ম
  নতি: অবনত ভাব। বিনয, নম্রতা। সাধনা: সাফল্য বা সিদ্ধি অর্জনের জন্য নিরন্তন প্রচেষ্টা। মনুষ্যত্ব: মানবোচিত সদগুণাবলি। মানুষের বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। সৃজনশীল: নির্মাণ ও সৃষ্টিতে তৎপর। সৃষ্টিধর্ম: সৃষ্টি বা সৃজনের বৈশিষ্ট্য।
 
৯০. কোন বানানগুলো সঠিক?
১। বট গাছ নাকি বটগাছ; ২। নারিকেল গাছ নাকি নারিকেলগাছ; ৩। তাল গাছ নাকি তালগাছ; ৪। পুঁটি মাছ নাকি পুঁটিমাছ; ৫। কৈ মাছ নাকি কৈমাছ;  ৬। গোলাপ ফুল নাকি গোলাপফুল; ৭। চাঁদ মামা নাকি চাঁদমামা; ৮। মন্ত্রী মশাই নাকি মন্ত্রীমশাই; ৯। ছোটো ভাই নাকি ছোটোভাই; ১০। মজিদ মিয়া নাকি মজিদমিয়া; ১১। রাতুল সোনা নাকি রাতুলসোনা; ১২। মৃদুল বাবু নাকি মৃদুলবাবু; ১৩। মন্ত্রী বাবু নাকি মন্ত্রীবাবু; ১৪। বাবু সোনা নাকি বাবুসোনা? (শুবাচি জনাব নাবিদ হাসানের প্রশ্ন)।
 
উপর্যুক্ত প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে শুবাচি জনাব মাহমুদ হাসান (Mahmudul Hasan)-এর মন্তবোত্তর দেখুন:
একসঙ্গে লেখা আর আলাদা লেখা নিয়ে ব্যাপক মতভেদ আছে। লেখকদের লেখার মাঝে এ ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। ছোটোবেলায় ‘‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ…পুঁটি মাছ পাই না” পড়েছি। কিন্তু সেসব বইয়ে বানানের প্রতি গুরুত্ব লেশমাত্রও ছিল বলে মনে হয় না। তাই এক্ষেত্রে অভিধানের উপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে আমি মনে করি।
 
নিম্নে আমি সর্বশেষ সংশোধিত এনসিটিবির উচ্চমাধ্যমিক ‘সাহিত্যপাঠ’-টি অনুসরণ করেছি। পাশাপাশি আগের যা কিছু পড়াশোনা ছিল, তার উপর ভিত্তি করে লিখেছি। কারো দৃষ্টিতে ভুল ধরা পড়লে যুক্তিসুন্দর সংশোধনী(সম্ভব হলে উৎস-সহ) আশা করছি।
 
১+২+৩। বটগাছ, নারিকেলগাছ, তালগাছ। [সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে হয়। সহজে, সকল গাছের নাম একসঙ্গে লিখুন। তবে চারা গাছ, মরা গাছ বিশেষণ নির্দেশ করায় আলাদা হবে। তদ্রূপ ‘বাগান’, ‘ঝাঁড়’, ‘ক্ষেত’ প্রভৃতি যুক্ত শব্দগুলোও একসঙ্গে হবে। যেমন: আমবাগান, বাঁশঝাড়(তবে ‘মুলি বাঁশ’ আলাদা), মরিচক্ষেত ইত্যাদি।]
 
৪+৫। পুঁটি মাছ, কই মাছ। [❎কৈ ✅কই || সব মাছের নাম আলাদা লিখুন। আমরা ‘কই মাছের প্রাণ’ লিখি কিন্তু ‘কইমাছের প্রাণ’ লিখি না। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের একটি গবেষণাপত্রে ‘পুঁটি মাছ’ লেখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ‘চারা গাছ’-এর মতো ‘পোনা মাছ’ না লেখাই ভালো। কারণ পোনা অর্থই ছোটো মাছ। তাই শুধু ‘পোনা’ ব্যবহার করুন। একইভাবে সরপুঁটি, রাজপুঁটি প্রভৃতি শব্দগুলোও একসঙ্গে হবে। ]
 
৬। গোলাপফুল [গাছের মতোই এক নিয়ম। “দশ ফ্রাঁ দিলে তুমি দুটি কি তিনটি অত্যন্ত চমৎকার গোলাপফুল পাবে।”—নেকলেস]
 
৭। চাঁদমামা [ছোটোবেলায় সবাই হয়তো পড়েছে আলাদাভাবে। তবে শব্দটি কর্মধারয় সমাস; আর সমাসবদ্ধ পদ বরাবরই একসঙ্গে হয়। ]
 
৮। মন্ত্রীমশাই [‘মশাই’ হলো ‘মহাশয়’-এর সংক্ষিপ্ত কথ্যরূপ। শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে লেখা হয়। ষোলো আনার বৃথা জীবনের ‘বাবুমশাই’য়ের কবিতাটি নিশ্চয় মনে পড়ছে! “মন্ত্রীমশাই আসবেন আজ বিকেলবেলায়”—মন্ত্রীমশাই,শঙ্খ ঘোষ]
 
৯। ছোটো ভাই [ছোটো বা বড়ো এসব বিশেষণ নির্দেশ করে। তাই স্বভাবতই আলাদা হবে।]
 
১০।মজিদ মিয়া [সঠিক হবে ‘মিয়াঁ’ বা ‘মিঞা’। এটি ফার্সি শব্দ এবং বংশের নাম। তাই এ জাতীয় সকল শব্দই আলাদা হবে।] তবে নামের ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। 
 
১১। রাতুল সোনা।[আদুরে ভাব নির্দেশ করলে আলাদা হবে। একই কথা ‘খোকা’-র ক্ষেত্রে।]
 
১২+১৩। মৃদুলবাবু, মন্ত্রীবাবু। [‘বাবু’ হিন্দু ভদ্রলোকের নামের শেষে উপাধি বা সম্মানার্থে যুক্তাবস্থায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন: হরিবাবু, রামবাবু, বড়োবাবু, ছোটোবাবু ইত্যাদি। “ইহার পরে শম্ভুনাথবাবুর ব্যবহারটাও ঠাণ্ডা। ”—অপরিচিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তদ্রূপ ‘দা’-ও একসঙ্গে হবে। যেমন: ঠাকুরদা। “মানার দরুন ওর ঠাকুরদাকে কাঁধের চাদর দিয়ে…”—মৌসুম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম।]
 
১৪। বাবুসোনা [এটি একটি নাম। এখানে ‘সোনা’ কোনো স্নেহাস্পদ ভাব প্রকাশ করছে না। তাই একসঙ্গে হবে। “রংপুরের বাবুসোনা হত্যাকাণ্ড…”। অবশ্য কিছু প্রত্রিকা আলাদা করেও লিখেছে।]
 
বলা বহুল্য যে, উল্লিখিত উচ্চমাধ্যমিকের ‘সাহিত্যপাঠ’-এ লেখকদের লেখাকে অবিকৃত রাখা হয়েছে বলে মনে হয়। নয়তো একই বইয়ে ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনি’, ‘নারিকেল গাছ’, ‘আম-জাম-কাঁঠাল গাছ’ কিংবা ‘জামাই বাবু’—এসব লেখা হতো না। তাই অভিধান ও উল্লেখযোগ্য লেখকদের লেখার সাহচর্য নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
 
বড়োলোক, বড়োমানুষ, বড়োবাবু, ছোটোলোক, ছোটোগল্প, ভালোমানুষ, ভালোকথা ইত্যাদি শব্দগুলো কি বিশেষণযোগে গঠিত হয়নি? একজন শুবাচির প্রশ্ন। জনাব মাহমুদুল হাসানের উত্তর, “বড়োলোক, বড়োমানুষ, বড়োবাবু, ছোটোলোক, ছোটোগল্প, ভালোমানুষ, ভালোকথা ইত্যাদি শব্দগুলো কর্মধারয় সমাসসাধিত শব্দ। যেমন: ভালো মনের মানুষ=ভালোমানুষ (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)। এসব শব্দে পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং, সমাসসাধিত হওয়ায় শব্দগুলো একসঙ্গে লেখা হবে। “ভালোমানুষ হওয়ার কোনো ঝঞ্ঝাট নাই, তাই আমি নিতান্ত ভালোমানুষ।” — অপরিচিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”
 
সূত্র:
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 

 

৯১. ছদ্মবেশী সমাস
যে  শব্দ বা পদ সমাসবদ্ধ, কিন্তু   ধ্বনিগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিশেষ গঠনের ফলে সমাসবদ্ধ পদ কি না সহজে বোঝা যায় না, তাকে ছদ্মবেশী সমাস বলে। মূল সমাসবদ্ধ পদ পরিবর্তিত শব্দের মধ্যে ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে। তািই এদের ছদ্মবেশী সমাস বলে। যেমন—  ভ্রাতৃ-জায়া থেকে ভাজ। ভাজ শব্দের মধ্যে ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে ভ্রাতৃ ও জায়া। কিন্তু ‘ভাজ’ শব্দটি দেখে তা বোঝা যায় না। অনুরূপ: ভ্রাতৃ ও শ্বশুর থেকে ভাশুর। তেমনি কুমোর < কুম্ভকার, কামার < কর্মকার, চামার< চর্মকার, অঘ্রান < অগ্রহায়ন, বাসর < বাসগৃহ, ধোঁয়াশা< ধোঁয়া ও কুয়াশা প্রভৃতি।
 
৯২. বাক্যাশ্রয়ী সমাস
বাক্যের মধ্যে লুকায়িত বা আপাতদৃষ্টে বাক্যের অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী  সমাসকে বাক্যাশ্রয়ী সমাস বলা হয়। যদি কোনো সমাসবদ্ধ পদ  একটি বাক্যের ন্যায় গঠন নিয়ে বাাক্যের মতো অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বাক্যাশ্রয়ী সমাস বলে। প্রথমে মনে হয় এগুলো সমাসবদ্ধ পদ নয়,  ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, সমাসবদ্ধ পদ। যেমন:  পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন। রক্তদান কর্মসূচি। কোরোনা প্রতিরোধ করো। দুনিয়ার মজদুর এক হও।
 
৯৩. সুপসুপা সমাস
বিভক্তিযুক্ত একটি পদের সঙ্গে অন্য একটি বিভক্তিযুক্ত পদ একত্রিত হয়ে যে সমাস হয়, তাকে সুপসুপা সমাস বা সহসুপা সমাস বলা হয়। যেমন – ভূতপূর্ব; সংস্কৃতে পূর্বম – দ্বিতীয়া বিভক্তির পদ এবং ভূতঃ – প্রথমা বিভক্তির পদ। এখানে বিভক্তিযুক্ত উভয় পদ যুক্ত হয়ে সমাস হয়েছে। তাই এটি সুপসুপা সমাস। এরূপ উদাহরণ– প্রত্যক্ষভূত, নাতিশীতোষ্ণ, পূর্বকায়, পূর্বরাত্র ইত্যাদি। বাংলা ব্যাকরণে সুপসুপা সমাসকে তৎপুরুষ, কর্মধারয় প্রভৃতি সমাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
 
৯৪. প্রত্যয়ান্ত সমাস
যে সমাসে সমস্যমান পদ একত্র হয়ে গঠিত সমস্তপদের শেষে অতিরিক্ত একটি প্রত্যয় যুক্ত হয়, তাকে প্রত্যয়ান্ত সমাস বা সমাসান্ত প্রত্যয় বলে। যেমন—কীর্তি নাশ করে যে: কীর্তিনাশ + আ = কীর্তিনাশা (আ-প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে)। বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত এর প্রয়োগ বেশি পাওয়া যায়। অনুরূপ:
প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
১) স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ এবং ঋ-কারান্ত শব্দ বহুব্রীহি সমাসের শেষে থাকলে ‘ক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন – পত্নীর সাথে বর্তমান = সপত্নীক, সস্ত্রীক, অভীক, নির্ভীক, নদীমাতৃক ইত্যাদি।
২) প্রতি, সম, পর – এসব উপসর্গের পর ‘অক্ষি’ শব্দ থাকলে ‘অক্ষি’ শব্দের ‘ই’ লোপ পেয়ে সমস্তপদে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন- প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, সমক্ষ, বিরুপাক্ষ, হর্ষক্ষ।
৩) অপ – এর পর ‘অ’ প্রত্যয়। যেমন- দ্বি অপ যার = দ্বিপ, অন্তরীপ, অনূপ।
৪) পথিন্‌ শব্দের ‘ন’ লুপ্ত হয়ে ‘অ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন – জলপথ, বিপথ, কুপথ ।
৫) শব্দের শেষে অস্‌ থাকলে তার পরে ‘ক’ যুক্ত হয়। যেমন- অন্য দিকে মন যার = অন্যমনস্ক।
বাংলা প্রত্যয়ান্ত সমাস বা সমাসান্ত প্রত্যয়:
বাংলায় সাধারণত সমস্তপদে ‘আ, এ, ও- প্রত্যয় যুক্ত হতে দেখা যায়। যেমন- একচোখা (একচোখ+আ), একরোখা, একতারা, দোতারা, দোনলা, নির্জলা, সর্বনাশা, হাঘরে, ঊনপাজুরে, ডাকাবুকো, বিড়ালচোখা, বে-আইনি, বারমাস্যা ইত্যাদি।
 
৯৫. অলুক সমাস
‘লুক’  অর্থ ‘লোপ’। সুতরাং অলুক অর্থ  অ+লু। অর্থ ‘যার লোপ নেই’। যে সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি সমস্তপদ গঠিত হওয়ার পরও লোপ পায় না, তাকে অলুক সমাস বলে। যেমন: চোখের বালি = চোখের বালি। এখানে ‘চোখের বালি’ সমস্যমান পদের ‘চোখের’ পদটিতে ষষ্ঠী বিভক্তি (র) আছে এবং সমস্তপদ গঠিত হওয়ার পরও সেই ষষ্ঠী বিভক্তি বিদ্যমান রয়েছে; অর্থাৎ কোনো বিভক্তি লোপ পায়নি। তাই এটি অলুক সমাস। ঘরের বউ,  নদীর জল, হাতেনাতে প্রভৃতি। অলুক সমাসের প্রকারভেদ: বাংলা সমাসে তিন প্রকার অলুকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, অর্থাৎ অলুক সমাস তিন প্রকার। যথা: ১) অলুক দ্বন্দ্ব, ২) অলুক তৎপুরুষ, ৩) অলুক বহুব্রীহি।
 
৯৬. নিত্য সমাস  ও অনিত্য সমাস বা সাধারণ সমাস
 
নিত্য সমাস: যে সমাসবদ্ধ পদের ব্যাসবাক্য নির্ণয় করা যায় না বা করতে গেলে অন্য পদের সাহায্য নিতে হয় তাকে নিত্য সমাস বলে। যেমন- শিয়ালকাঁটা (এখানে শিয়ালের সাথে কাঁটার কোন সম্পর্ক নেই); এর ব্যাসবাক্য সম্ভব নয়। এরূপ- দাঁড়কাক, কালসাপ। দেশান্তর = অন্য দেশ; এখানে ব্যাসবাক্য করতে নতুন একটি পদের সাহায্য লাগছে, তাই এটি নিত্য সমাস।
বাংলা ভাষায় নিত্য সমাসের অন্তর্ভুক্ত সমাস হচ্ছে অব্যয়ীভাব সমাস। অব্যয়ীভাব সমাসকে ব্যাসবাক্যে পরিণত করার জন্য অন্য পদের প্রয়োজন হয়। যেমন- উদ্‌বেল = বেলাকে অতিক্রান্ত। সমস্তপদটিকে বিশ্লেষণ করতে ‘অতিক্রান্ত’ পদটির সাহায্য লাগছে।
 
অনিত্য সমাস: যে সমাসবদ্ধ পদের ব্যাসবাক্য নির্ণয় করা যায় তার সমস্তপদ থেকেই, তাকে অনিত্য সমাস বা সাধারণ সমাস বলে। যেমন- বাবা ও মা = বাবা-মা; কাঁচা অথচ মিঠা = কাঁচামিঠা। অনিত্য সমাসের অন্তর্ভুক্ত সমাস হচ্ছে- ১. দ্বন্দ্ব সমাস, ২.বহুব্রীহি সমাস, ৩. তৎপুরুষ সমাস,  ৪.কর্মধারয় এবং ৫. দ্বিগু।
 
৯৭. হরির লুস থেকে হরিলুট
শুবাচি অসিত দাস তাঁর ‘নামধামের উৎসকথা গ্রন্থে লিখেছেন, “বহুল প্রচলিত হরিলুট কথাটির আদি রূপ ছিল হরির লুস এবং লুস কথাটির প্রাচীন অর্থ ভোজন।”
 
পরবর্তীকালে হরির লুস কথাটি হয়ে যায় হরিলুট। কিন্তু, এমন হওয়ার কারণ কী? প্রধান কারণ— লোকনিরুক্তি। হরিলুট কথাটি  লোকনিরুক্তির কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের মুখে এসে হরিলুট হয়ে গেছে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ অভিধানেও লুস কথাটির অর্থ দেওয়া হয়েছে ভোজন। সে হিসেবে হরির লুস অর্থ— হরির ভোজন।
 
 
মূলত হরি বা ঈশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত অর্ঘ্য বা ভুজ্যি, মিষ্টি প্রভৃতি প্রসাদ ভক্তদের দিকে ছুড়ে দেওয়ার দীর্ঘ সংস্কার হরির লুস নামে প্রচলিত ছিল।  লুস শব্দর অর্থ, যে ভোজন তা অধিকাংশ বাঙালি জানত না। তারা দেখত— যা হরির লুস নামে পরিচিত তা অসংখ্য লোকজন লুটেরার মতো হুড়োহুড়ি করে লুটিয়ে নিচ্ছে। এখানে কোনো শৃঙ্খলা নেই। লুটের মতো যার শক্তি বা লোকবল বেশি সে অধিক পাচ্ছে।  যারা নিরীহ তারা কিছুই পাচ্ছে না। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। এমন ঘটনা লুটের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে লুস কথাটি হয়ে যায় লুট। ফলের হরির লুস হয়ে যায় হরির লুট বা হরিলুট।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত হরি ও বাংলা লুট শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হরিলুট অর্থ— (বিশেষ্যে) হরি সংকীর্তনের পর ভক্তদের মাঝে হরির নামে বাতাসা প্রভৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার সংস্কার। এটি নেতিবাচক নয়। অভিধানে যাই থাকুক না কেন, বর্তমানে হরিলুট শব্দটি নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়।  অধুনা এর আলংকারিক ও বহুল প্রায়োগিক অর্থ— জোর যার মুল্লুক তার, সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল। অর্থাৎ, সেই বেশি ভোগ করতে পারবে, যার  শক্তি বেশি।  যার শক্তি ও ক্ষমতা নেই সে ন্যূনতম  মৌলিক চাহিদা মেটানোর সুযোগও পাবে না।  তেলাপোকার দৌঁড় আর ইুঁদরের খুট, সরকারি টাকাপয়সার চলছে হরিলুট।
 

৯৮. শব্দের ডিজিটাল অভিধার্থ : শুশ্রূষা

শুশ্রূষা শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিচর্যা, সেবা ইত্যাদি।  আবার ‘শ্রবণ করার ইচ্ছা’ বাগ্ভঙ্গিকে এককথায় ‘শুশ্রূষা’ বলা হয় (সংস্কৃতে)।
 
অর্থাৎ
শুশ্রূষা = পরিচর্ষা ————————————(১)
শুশ্রূষা = সেবা ————————————— (২)
শুশ্রূষা = শ্রবণ করার ইচ্ছা ————————– (৩)
সেবা = পরিচর্যা = আদর = সোহাগ, ধাত্রীগিরি ——-(৪)
সুতরাং সমীকরণ (১), (২), (৩) ও (৪) হতে পাই
 
শ্রবণ করার ইচ্ছা = শুশ্রূষা = পরিচর্যা= সেবা= আদর= মমতা= ধাত্রীগিরি। অতএব ভাষা-গণিত অনুসারে, কেবল ‘শোনার ইচ্ছা’ থাকলেই হলো; প্রকৃতপক্ষে আর্থিক, শারীরিক বা মানসিকভাবে কারও সেবা, পরিচর্যা, আদর, মমতা, ধাত্রীগিরি না-করেও শ্রবণ করার ইচ্ছা থাকলে ‘শুশ্রূষা’ হয়ে যায়। হয়তো এজন্য আমরা, অসহায়-আহত বা দরিদ্র মানুষ, বৃদ্ধ-পিতামাতা কিংবা অত্যাচারিতের করুণ আর্তনাদ শুধু ‘শ্রবণ করার ইচ্ছা’ করি মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে শুনে যাই।
শোনার ইচ্ছা = শুশ্রূষা; তাই কোনো কিছু না-করেও, এমনকি না শুনেও কেবল ‘শোনার ইচ্ছা’ থেকে আমরা শুশ্রূষার যশ, অর্থ, সওয়াব, পুণ্য, কর্তব্যপালন সব কিছু পেয়ে যাই। এ হিসাবে যে কেউ বুড়ো মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে ঘরে বসে পিতা-মাতার ‘কথা শ্রবণের ইচ্ছা’ও শুশ্রূষা দাবি করতে পারেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, আমরা পিতামাতার শুশ্রূষায় নিয়োজিত।
কী মজা!
 
৯৯. ‘টি’ ‘টা’- কোনটি কখন
টি টা নিয়ে সংশয়ে পড়লে গুনগুন করে গাইতে পারেন:
“চুপ চুপ লক্ষ্মিটি শুনবে যদি গল্পটি
এক যে ছিল তোমার মতো ছোট্ট রাজকুমার- – -।”
এই গানেই পেয়ে যাবেন টি কোথায় বসাবেন— লক্ষ্মিটি আর গল্পটি। মাটি বানানেও টি, খাঁটি বানানেও টি।
অনেকে প্রশ্ন করেন, “শব্দের শেষে ‘টা’ বা ‘টি’ কখন কোনটি বসাব?” একটা না কি একটি? বাঁশটা না কি বাঁশটি? কলমটা নাকি কলমটি?
আসলে, এ বিষয়ে কঠিন কোনো লিখিত নিয়ম নেই। ব্যাকরণও কিছু বলে না, তবে বৈয়াকরণ অনেক কিছু বলেন। একটি বাংলা প্রবাদে তুচ্ছার্থে ‘টা’ এবং গৌরবার্থে ‘টি’ প্রত্যয় ব্যবহার করার নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রবাদটি দেখুন :
“আমার ছেলে ছেলেটি, খায় শুধু এতটি
বেড়ায় যেন গোপালটি।
ওদের ছেলে ছেলেটা, খায় দেখ কতটা
বেড়ায় যেন বাঁদরটা।”
আমি সাধারণত তুচ্ছার্থে ‘টা’ এবং অন্যার্থে ‘টি’ প্রয়োগ করে থাকি। মনে রাখবেন, টি বা চা অনেকের প্রিয়। তাই প্রিয় জিনিসে ‘টি’ বসান। এটি কিন্তু শক্ত কোনো বিধি নয়। এ নিয়ম পালিত না-হলে ভুল হবে— এমন বলা যাবে না।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
১০০. শব্দের আদিতে /ব্য/ ও /ব্যা/ এর প্রয়োগ
১. শব্দের আদিতে /ব্য/ এর প্রয়োগ (বি+অ= ব্য)
/বি-/ উপসর্গের পর /অ/-বর্ণ দিয়ে শুরু শব্দ সন্ধিবদ্ধ হয়ে /ব্য/ হয়। যেমন: বি + অগ্র = ব্যগ্র; বি +অঙ্গ = ব্যঙ্গ। তেমনি: ব্যক্ত, ব্যক্তি, ব্যঙ্গাত্মক, ব্যঙ্গোক্তি, ব্যজন, ব্যঞ্জন, ব্যঞ্জনা, ব্যতিক্রম,ব্যতিব্যস্ত, ব্যতিরেক, ব্যতিহার, ব্যতীত, ব্যত্যয়, ব্যপদেশ, ব্যবচ্ছিন্ন, ব্যবচ্ছেদ, ব্যবধান, ব্যবসায়ী, ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপক, ব্যবহার, ব্যবহারিক, ব্যবহৃত, ব্যভিচার, ব্যয়, ব্যর্থ, ব্যষ্টি, ব্যস্ত।
 
২. শব্দের আদিতে /ব্যা / এর প্রয়োগ (বি+আ= ব্যা)
/বি-/ উপসর্গের পর /আ/ বর্ণ দিয়ে শুরু শব্দ সন্ধিবদ্ধ হলে /ব্যা/ হয়। যেমন: বি+ আকুল = ব্যাকুল; বি+ আঘাত = ব্যাঘাত। তেমনি: ব্যাকরণ, ব্যাখ্যা, ব্যাদান, ব্যাধি, ব্যাপক, ব্যাপার, ব্যাপী, ব্যাপৃত, ব্যাপক, ব্যাপ্ত, ব্যাপ্তি, ব্যায়াম, ব্যাহত।
 
ব্যতিক্রম: /বি-/ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়নি এমন কিছু শব্দের বানানের শুরুতে /ব্য/ দেখা যায়। যেমন: ব্যথা, ব্যথিত, ব্যথী।
ব্যতিক্রম: /বি-/ উপসর্গযোগে গঠিত নয় এমন কিছু শব্দের বানানে /ব্যা/ দেখা যয়। যেমন: ব্যাঘ্র, ব্যাঙ, ব্যাজস্তুতি, ব্যাটা, ব্যাধ, ব্যামো, ব্যারাম, ব্যাস ইত্যাদি।
 
৩. বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/:
বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/ হয়, /ব্য/ হয় না। যেমন: ব্যাংক, ব্যাগ, ব্যাজ, ব্যাট, ব্যাটারি, ব্যাডমিন্টন, ব্যান্ড, ব্যান্ডেজ, ব্যাপটিস্ট, ব্যানার, ব্যারাক, ব্যারিস্টার, ব্যালট, ব্যালে, ম্যাগাজিন, ম্যান, ফ্যান, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি।
মনে রাখুন: ব্যবহারিক শব্দের বানানে /ব্যা/ ও /ব্য/ দুটিই শুদ্ধ। একসময় অভিধানে দুটো শব্দই ভুক্তি হিসেবে ছিল। যেমন: ব্যবহারিক, ব্যাবহারিক। তবে, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে একমাত্র ‘ব্যাবহারিক’ বানানকে ভুক্ত করা হয়েছে। ‘ব্যবহারিক’ বানানকে স্থানই দেওয়া হয়নি।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
১০১. উপলক্ষ বনাম উপলক্ষ্য
উপলক্ষ্য = উপ + লক্ষ্য; লক্ষ্য এর উপ বা সহকারী যে; আশ্রয়, অবলম্বন, প্রয়োজন, উদ্দেশ্য, অভিপ্রায়, ব্যাপদেশ, ছল, ছুতা, occasion বা আয়োজন অর্থে প্রচলিত।
উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ শব্দের মতো লক্ষ, লক্ষ্য, উপলক্ষ ও উপলক্ষ্য শব্দের বানান ও প্রয়োগ নিয়েও বিভ্রাট দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে ‘চক্ষু বা মনশ্চক্ষুর’ দ্বারা কোনও কোনও বস্তু বা বিষয়কে নিজের মধ্যে নেওয়া বা লওয়ার কাজটি দিশাগ্রস্ত থাকে যাতে, তাকে লক্ষ বলা হয়। এ লক্ষ যাতে থাকে সেটিই হচ্ছে লক্ষ্য।
কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর মতে, বাংলায় দর্শন করাকে কিছুটা পরিবর্তন করে যে যুক্তিতে ‘ দেখা’ করা করে নেওয়া হয়েছে, একই যুক্তিতে লক্ষ করাকে ‘লখ’ বা ‘লখি’ করে নেওয়া হয়েছে। এই ‘খ’ প্রকৃতপক্ষে ‘ক্ষ’-এর একটি রূপ। দর্শন দিশগ্রস্ত হয়ে গেলে তাকে ‘ দেক্ষা’ বলাই যুক্তিসঙ্গত। সে সুবাদে চক্ষু বা মনশ্চক্ষু মারফত নিয়ে আসা হল ‘লক্ষ’; এবং সে লক্ষ করা বস্তু বা বিষয়টি বাস্তবে যেখানে রয়েছে, সেটি লক্ষ্য।
সংগতকারণে উপলক্ষ ও উপলক্ষ্য ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। উপলক্ষ হচ্ছে লক্ষ এর সহকারী অন্যদিকে উপলক্ষ্য হচ্ছে লক্ষ্য এর সহকারী। লক্ষ্য থাকলেই উপলক্ষ্য থাকতে পারে কিন্তু লক্ষ থাকলে উপলক্ষের সম্ভবান খুবই ক্ষীণ। সে কারণে উপলক্ষ শব্দটির প্রয়োগ প্রায়শ ত্রুটিপূর্ণ হয়।
বাংলাভাষীগণ শব্দটি যেভাবে প্রয়োগ করেন, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে শব্দটি আসলে ‘উপলক্ষ্য’কেই বোঝায়; ভুল বানানের কারণে সেগুলো ‘য’ফলাহীন হয়ে রয়েছে।
 
১০২. অনুসরণ বনাম অনুকরণ
অনেক ক্ষেত্রে ‘অনুসরণ’ ও ‘অনুকরণ’ শব্দ দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে শব্দ দুটির বিশদ ব্যবহারে কিছুটা পার্থ্যক্য রয়েছে। অনুকরণ হচ্ছে ‘অনুরূপ-করণ’। সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে রকম কাজ কাজ করে, ঠিক একই রকম কাজ করাই হচ্ছে অনুকরণ। অর্থাৎ, ‘নকল’ বা ‘সদৃশীকরণ’ অর্থে ‘অনুকরণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনুকরণ করা ভালো নয়। এটি নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। পরীক্ষার হলে কারও খাতা দেখে অবিকল বা প্রায় অবিকল লেখা অনুকরণের পর্যায়ে পড়ে।
 
আবার, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে চিন্তা-চেতনা নিয়ে কাজ করে, সেই চিন্তা-চেতনা অনুকরণ করাই হচ্ছে ‘অনুসরণ’। অনুসরণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দিয়েও কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়। ‘অনুগমন’ অর্থে ‘অনুসরণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনুসরণ, চিন্তার সঙ্গে নতুন চিন্তা যুক্ত করে। তাই এটি ইতিবাচক। মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করেছে গমন – – -। এটি অনুসরণ।
 
১০৩.  অঙ্ক বা সংখ্যার পর ম য় র্থ ষ্ঠ শ তম প্রভৃতি  বসে কেন?
 
 সংখ্যার পূরকে কোনোটির পর (১ম), কোনোটির পর (২য়), কোনোটির পর র্থ (৪র্থ), কোনোটির পর (২০শ) আবার কোনোটির পর তম (৮৭তম) প্রভৃতি বর্ণ বা যুক্তব্যঞ্জন বসে। কিন্তু কেন বসে? এ বর্ণচিহ্নগুলো হচ্ছে অঙ্ক বা  সংখ্যার পূরক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। বিষয়টি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো?
 
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১৮ ৩০ ৪০ ৪৮ ৪৯ ৫০ ৫৯ ৯০ ৯৩ ১০০ ১০০০ – প্রভৃতি হচ্ছে সংখ্যা। এসব সংখ্যার পূরক হলো যথাক্রমে— প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম ষষ্ঠ সপ্তম অষ্টম নবম দশম একাদশ অষ্টাবিংশ ত্রিংশ চত্বারিংশ অষ্টচত্বারিংশ ঊনপঞ্চাশত্তম পঞ্চাশত্তম ঊনষষ্টিতম নবতিতম ত্রিনবতিতশততম এবং সহস্রতম। এই পূরকসমূহের সংক্ষিপ্ত রূপ যথাক্রমে— ১ম ২য় ৩য় ৪র্থ ৫ম ৬ষ্ঠ ৭ম ৮ম ৯ম ১০ম ১১শ ১৮শ ৩০শ ৪০শ ৪৮শ  ৪৯তম ৫০তম ৫৯তম ৯০তম ৯৩তম  ১০০তম  ১০০০তম। সংখ্যার সঙ্গে পূরকের পূর্ণ নামের শেষ অংশটি দিয়ে সংক্ষিপ্ত পূরক লেখা হয়। যেমন?
১ প্রথম (১ম)
২ দ্বিতীয় (২য়)
৪ চতুর্থ (৪র্থ)
৫ পঞ্চম (৫)ম
৬ ষষ্ঠ (৬ষ্ঠ)
১১ একাদশ (১১শ)
৩০ ত্রিংশ (৩০শ)
৫৯ ঊনষষ্টিতম (৫৯তম)
১০০০ সহস্রতম (১০০০তম)
৪৯ ঊপঞ্চাশত্তম>ঊনপঞ্চাশত্‌তম (৪৯তম)
 
১০৪.হিম্মত; সাহস, মনোবল; ক্ষমতা, শক্তি, বীরত্ব:
হিম্মত আরবি উৎসের শব্দ। আগে শব্দটির বানানে খণ্ড-ৎ ছিল। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে আস্ত-ত দিয়ে প্রমিত নির্দেশ করা হয়েছে। বাক্যে সাধারণভাবে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হিম্মত অর্থ— সাহস, মনোবল; ক্ষমতা, শক্তি, বীরত্ব।
 
সাহস, মনোবল:
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভূলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ? (নজরুল)
 
ক্ষমতা, শক্তি, বীরত্ব:
হিম্মত দেখানোর আগে হিম্মত সঞ্চয় করো। হিম্মত যার কিসমত তার।
 
 ১০৫. হতশ্রী: হতভাগা হতাস্মি হত আছে যত
হতশ্রী যুক্ত হয়ে হতশ্রী। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হত (√হন্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) মৃত, নিহত। ব্যাহত,, বাধাপ্রাপ্ত। লুপ্ত (হতগৌরব)। অশুভ, মন্দ (হতভাগা) প্রভৃতি।
কোনো বিষয় হত, লুপ্ত, আহত, ব্যাহত বা বাধাপ্রাপ্ত, দুর্দশাগ্রস্ত, নষ্ট, ধ্বংস হয়েছে কিংবা হ্রাস পেয়েছে বা অপমানিত হয়েছে প্রভৃতি প্রকাশ করার জন্য শব্দের আগে হত যুক্ত করা হয়। যেমন: হতগৌরব (গৌরব ধূলিসাৎ হয়েছে এমন), হতচকিত (হতভম্ব), হতচেতন (অচেতন, অজ্ঞান), হতচ্ছাড়া
প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।
(দুর্দশাগ্রস্ত), হতজীব (প্রাণহীন, মৃত), হতজ্ঞান (অচেতন, হতচেতন), হতত্রপ (নির্লজ্জ, বেহায়া), হতদরিদ্র, হতধী (বুদ্ধিহীন, বুদ্ধিহারা), হতপ্রভ (নিষ্প্রভ, ম্লান), হতপ্রায় (মুমূর্ষু, মৃতপ্রায়), হতবল (দুর্বল), হতবাক (নির্বাক, বিস্মিত), হতবুদ্ধি (হতভম্ব), হতভাগা (মন্দভাগ্য), হতমান (অপমানিত, অপদস্থ), হতমূর্খ (মহামূর্খ), হতলক্ষ্মী (লক্ষ্মীছাড়া), হতশ্রদ্ধ (শ্রদ্ধাহীন, বীতশ্রদ্ধ), হতশ্রী (শ্রীহীন, হতভ্যাগ্য, লক্ষ্মীছাড়া, সম্পদহীন), হতাদর (অনাদৃত, অনাদর, অমর্যাদা), হতাশা (হত+আশা), হতাশ্বাস (আশা-প্রত্যাশা লুপ্ত হয়েছে এমন), হতাস্মি [(হত+অস্মি); অর্থ: আমি মরে গেলাম, আমি শেষ হয়ে গেলাম এরূপ খেদোক্তি] প্রভৃতি হত দিয়ে গঠিত কয়েকটি শব্দ।
এত হত থেকে হওয়া শব্দকে মুক্ত রাখার জন্য হওয়া অর্থ প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত শব্দের বানানে ত-য়ে ও-কার দিতে হয়। যেমন:
তেমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম ধানের গোলার মতো।
 
১০৬. বুদ্ধিজীবি নয়, বুদ্ধিজীবী
গতকাল (১৪ই ডিসেম্বর) গেল শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। অনেকে লিখেছেন— বুদ্ধিজীবি । শুদ্ধ হচ্ছে— বুদ্ধিজীবী। যে-কোনো জীবী দুটো ঈ-কার নিয়ে চলে। যেমন: মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী, চিকিৎসাজীবী, কৃষিজীবী – – -। জীবি কখনো শুদ্ধ নয়। মনে রাখুন, √জীব+ইন্‌= জীবী। -জীবী ইন্‌-প্রত্যয়ন্ত শব্দ। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দে ইন্‌-এর পরিবর্তে ঈ-কার হয়।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
 
সূত্র:
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 

১০৫. হতশ্রী: হতভাগা হতাস্মি হত আছে যত

হতশ্রী যুক্ত হয়ে হতশ্রী। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হত (√হন্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) মৃত, নিহত। ব্যাহত,, বাধাপ্রাপ্ত। লুপ্ত (হতগৌরব)। অশুভ, মন্দ (হতভাগা) প্রভৃতি।
কোনো বিষয় হত, লুপ্ত, আহত, ব্যাহত বা বাধাপ্রাপ্ত, দুর্দশাগ্রস্ত, নষ্ট, ধ্বংস হয়েছে কিংবা হ্রাস পেয়েছে বা অপমানিত হয়েছে প্রভৃতি প্রকাশ করার জন্য শব্দের আগে হত যুক্ত করা হয়। যেমন:
 
হতগৌরব (গৌরব ধূলিসাৎ হয়েছে এমন), হতচকিত (হতভম্ব), হতচেতন (অচেতন, অজ্ঞান), হতচ্ছাড়া (দুর্দশাগ্রস্ত), হতজীব (প্রাণহীন, মৃত), হতজ্ঞান (অচেতন, হতচেতন), হতত্রপ (নির্লজ্জ, বেহায়া), হতদরিদ্র, হতধী (বুদ্ধিহীন, বুদ্ধিহারা), হতপ্রভ (নিষ্প্রভ, ম্লান), হতপ্রায় (মুমূর্ষু, মৃতপ্রায়), হতবল (দুর্বল), হতবাক (নির্বাক, বিস্মিত), হতবুদ্ধি (হতভম্ব), হতভাগা (মন্দভাগ্য), হতমান (অপমানিত, অপদস্থ), হতমূর্খ (মহামূর্খ), হতলক্ষ্মী (লক্ষ্মীছাড়া), হতশ্রদ্ধ (শ্রদ্ধাহীন, বীতশ্রদ্ধ), হতশ্রী (শ্রীহীন, হতভ্যাগ্য, লক্ষ্মীছাড়া, সম্পদহীন), হতাদর (অনাদৃত, অনাদর, অমর্যাদা), হতাশা (হত+আশা), হতাশ্বাস (আশা-প্রত্যাশা লুপ্ত হয়েছে এমন), হতাস্মি [(হত+অস্মি); অর্থ: আমি মরে গেলাম, আমি শেষ হয়ে গেলাম এরূপ খেদোক্তি] প্রভৃতি হত দিয়ে গঠিত কয়েকটি শব্দ।
 
এত হত থেকে হওয়া শব্দকে মুক্ত রাখার জন্য হওয়া অর্থ প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত শব্দের বানানে ত-য়ে ও-কার দিতে হয়। যেমন:
তেমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি সবাই হতো  ধানের গোলার মতো।
 
১০৬. বুদ্ধিজীবি নয়, বুদ্ধিজীবী
গতকাল (১৪ই ডিসেম্বর) গেল শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। অনেকে লিখেছেন— বুদ্ধিজীবি । শুদ্ধ হচ্ছে— বুদ্ধিজীবী। যে-কোনো জীবী দুটো ঈ-কার নিয়ে চলে। যেমন: মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী, চিকিৎসাজীবী, কৃষিজীবী – – -। জীবি কখনো শুদ্ধ নয়। মনে রাখুন, √জীব+ইন্‌= জীবী। -জীবী ইন্‌-প্রত্যয়ন্ত শব্দ। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দে ইন্‌-এর পরিবর্তে ঈ-কার হয়।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
১০৭. ন্যাংটা থেকে ন্যাংটাগোরা
ন্যাংটাগোরা মিলে ন্যাংটাগোরা। সংস্কৃত ন্যগ্রট থেকে উদ্ভূত ন্যাংটা অর্থ— বিবস্ত্র, দিগম্বর এবং গোরা অর্থ— শ্বেতাঙ্গ, ফরসা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা ন্যাংটাগোরা অর্থ (বিশেষ্যে)— ব্যঙ্গার্থে স্কটল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী। খাটো প্যান্ট পরতে অভ্যস্ত বলে তাদের বাংলা ব্যঙ্গার্থে ন্যাংটাগোরা বা ন্যাংটোগোরা বলা হয়। ভারতবর্ষে এরূপ পোশাককে ন্যাংটার তুল্য মনে করে ব্যঙ্গার্থে যারা খাটো প্যান্ট পরিধান করত তাদের ন্যাংটাগোরা ডাকা হতো। সাধারণত স্কটল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী এবং কিছু কিছু ইউরোপীয় এমন খাটো প্যান্ট পরিধান করত। তাই বাঙালিরা উহাস করে তাদের ন্যাংটাগোরা বলত।  ন্যাওটা ও ন্যাংটো হচ্ছে ন্যাংটা শব্দের সমার্থক।
 
১০৮. লাল সালাম
লাল সালাম ( red salute ) বা লাল সেলাম কথাটি বিপ্লবী স্লোগান, দলীয় বিপ্লবী অভিবাদন, শ্রদ্ধা নিবেদনমূলক অভিব্যক্তি, সমর্থকদের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা জ্ঞাপন প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত অভিবাদন হিসেবে কথাটির প্রয়োগ সর্বাধিক। অনেক সময় বিশেষ বার্তা, বাণী বা ইঙ্গিত প্রদান কিংবা বিশেষ নির্দেশ জ্ঞাপনের জন্যও ব্যাবহার করা হয়। রক্তের রং লাল। বিপ্লবে রক্তপাত হয়, প্রয়োজনে রক্ত বা জীবন দানের শপথ নিতে হয়। তাই লাল দ্বারা বিপ্লব বোঝানো হয়। এজন্য বিপ্লবীদের পতাকার রঙও  লাল। কোনো কমিউনিস্ট নেতা মারা গেল তাঁর সম্মানার্থে surkh salam শব্দটিও ব্যাবহার করা হয়। ফারসি surkh শব্দের অর্থ লাল। এটা দক্ষিণ এশিয়া—  বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কমরেড বা কমিউনিস্টগণ বলে থাকেন। কমিউনিস্টদের মধ্যে পরস্পর প্রাত্যহিক অভিবাদন হিসেবেও কথাটি ব্যবহৃত হয়। এখন কমিউনিস্ট ছাড়াও উদারপন্থি অনেক  রাজনীতিক দলের সমাবেশে কথাটি শোনা যায়।
 
১০৯. নোড়া এবং পাটাপুতা
সংস্কৃত লোষ্ট্র থেকে উদ্ভূত নোড়া অর্থ— (বিশেষ্য) মসলা পেষণের উপযোগী প্রস্তরখণ্ড, শিলের ওপর রেখে বাটনা পেষণের প্রস্তরখণ্ড, পুতা (শিলনোড়া), পাটাপুতা।  বাংলা পাটা অর্থ  (বিশেষ্যে) বাটনা পেষণের শিল। তবে পাটা শব্দের আরও অর্থ রয়েছে। যেমন: তক্তা, ভূমি ক্রয়ের দলিল, পাট্টা, বুকের বিস্তৃতি এবং আলংকারিক অর্থে সাহস (বুকের পাটা)।
 
 
১১০. নদীশাসন
নদী ও শাসন মিলে নদীশাসন। এটি অনেকটা ব্যক্তি বা প্রাণী বা প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা প্রভৃতির স্বাধীন চলাচল বা ইচ্ছাকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো একটি ব্যবস্থা। রাষ্ট্রশাসন, প্রশাসন প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিভিন্ন কৌশল। প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য বৃহত্তর কল্যাণ সাধন। কাউকে শাসন করা মানে তার স্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। নদীকে শাসন করা মানে নদীর স্বাধীন চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করা।
 
নদীশাসন বলতে এমন কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা বোঝায়, যাতে নদী প্রকৃতির ইচ্ছেমতো দামাল রূপ নিয়ে যেদিকে খুশি ছুটে যেতে না পারে। তার গতিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার নামই হচ্ছে নদীশাসন। নদী প্রাকৃতিক কারণে ইচ্ছেমতো ধাবিত হয়। দুকূল উপচে তীর-পাড় ভেঙে যখন যেদিকে খুশি চলে যায়। নদীশাসন বলতে এমন কিছু কার্যক্রম গ্রহণ বোঝায়, যাতে নদী তার ইচ্ছেমতো যাতে তীর-পাড় ভেঙে যেদিকে খুশি সেদিকে যেতে না পারে।
নদী প্রতিনিয়ত ধেয়ে চলে। চলার পথে  উভয় পাড়ের ভুমি ক্ষয় করে। একূূল ভাঙে ওকূল গড়ে। আবার উভয় পাড় ভেঙে অনির্ধারিত পথে ছুটে চলে। ক্ষতি করে জনপদের, লোকবল আর সহায়সম্পদের। ধ্বংস করে ঘরবাড়ি, গবাদিপশু। এসব ক্ষয়ক্ষতি রোধ করার লক্ষ্যে নদীপৃষ্ঠ থেকে উভয় পারের নির্ধারিত উচ্চতা পর্যন্ত পাথরাদি ফেলে বা অন্যকোনো উপায়ে নদীর স্বাধীন প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টাকে নদীশাসন বলা হয়। নদীর স্বাধীন প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণপূর্বক মানুষের সহায়সম্পদ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা নদীশাসনের উদ্দেশ্য। এর ভালো ও খারাপ উভয় দিক রয়েছে। হেমন্তের গানে ধ্বনিত হয় নদীশাসনের আবশ্যকতা:
এ কূল ভেঙে ও কূল তুমি গড়ো,
যার এ কূল ও কূল দু-কূল গেল তার লাগি কী করো- – -।
 
১১১. খদ্দের বনাম খরিদদার (ম্যানুয়েল ত্রিপুরা)
ফারসি খরিদ অর্থ ক্রয় বা কেনা। আর দার হলো অধিকারী, মালিক, যুক্ত প্রভৃতি অর্থবাচক ফারসি প্রত্যয়বিশেষ। এই খরিদ ও দার যোগে গঠিত খরিদদার অর্থ ক্রেতা বা ক্রয়কারী (Consumer/Purchaser)। আর খদ্দের হলো খরিদদার হতে উদ্ভূত শব্দ— যার অর্থ গ্রাহক বা মক্কেল (Client/Customer)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরিদদার আর খদ্দের প্রায় সমার্থক।
হাটবাজারে আমরা অনেক মানুষজন দেখি, তাঁদের কেউ খদ্দের আবার কেউ খরিদদার। যেকোনো ব্যক্তি কোনো কিছু ক্রয় করার আগপর্যন্ত বিক্রেতার কাছে খদ্দের হিসেবেই বিবেচিত। আর দ্রব্যপণ্য ক্রয় করলে পর পরিগণিত হন খরিদদার (Consumer/Purchaser) হিসেবে।
সুতরাং কাঁচাবাজার, গোরুবাজার, মাছবাজার, কসমেটিকসের দোকান, কাপড়ের দোকান, চালের দোকান, মাংসের দোকান যেখানেই যান, কোনোকিছু খরিদ না-করলে আপনি কেবল খদ্দের হতে পারেন— খরিদদার নন।
 
আবার, চুল কাটাতে বা শেভ করাতে যে ব্যক্তি সেলুনে উপস্থিত হয়, সে ব্যক্তি সেলুনের মালিকের কাছে খরিদদার নয়— খদ্দের (Customer)।
তেমনি, কোনো মামলা নিয়ে যে উকিলের কাছে যায়, তাকেও খরিদদার নয়— খদ্দেরই বলা হয় (Client)। আরও যেমন— আমলা, কারিগর, চর্মকার, দালাল, ভ্রষ্টা যারই কাছে যান, খরিদদার নন, তাদের কাছে আপনি শুধু লোভনীয়— খদ্দের (Client/Customer)। ক্ষেত্রবিশেষে খদ্দের রকমারি হয়ে থাকে, যাদের সংখ্যা খরিদদারের তুলনায় নেহাত কম নয়। ক্লিনিক-হাসপাতালেও আমরা কেউ মৌলিক চাহিদার দাবিদার অথবা চিকিৎসা বা সেবাপ্রার্থী নই, তাদের কাছে আমরা খরিদদার না-হই— একেকজন খদ্দের অবশ্যই। [ ম্যানুয়েল ত্রিপুরা, সব খদ্দের খরিদদার নয়,শুদ্ধ বানান চর্চ (শুবাচ)।]
 
১১২. যতিচিহ্ন হিসেবে ‘কমা’:  ব্যবহার-কৌশল
 
কোনো গ্রন্থ বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে কিছু লিখবার জন্যে ওই গ্রন্থ বা ব্যক্তির বরাত দিতে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’ লেখার ক্ষেত্রে একটি নিয়ম মানা উচিত। কেননা, ওই নিয়মটির মাধ্যমে গ্রন্থ বা ব্যক্তির বক্তব্য হুবহু উল্লেখ করা হয়েছে, না কি বক্তব্যটি নিজের পছন্দমতো পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে, তা নির্দেশ করা হয়। নিয়মটি একেবারেই সহজ, এবং তা নিম্নরূপ:
‘ক (যে-কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের নাম) গ্রন্থ বা ব্যক্তি অনুসারে/অনুযায়ী’— এতটুকু লেখার পর পরবর্তী অংশটুকু কোনো গ্রন্থ বা ব্যক্তির বক্তব্য অবিকল হলে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’-র পর একটি কমা ব্যবহার করতে হবে। কারণ, এরূপ ক্ষেত্রে পরবর্তী অংশটুকু প্রত্যক্ষ উক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং প্রত্যক্ষ উক্তিতে বক্তার মূল বক্তব্যের পূর্বে কমা ব্যবহার করা আবশ্যক। কিন্তু, যদি ‘ক (যে-কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের নাম) ব্যক্তি বা গ্রন্থ অনুসারে/অনুযায়ী’— এতটুকু লেখার পর পরবর্তী অংশটুকুতে কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থের বক্তব্য অবিকল উল্লেখ না-করে মূল বক্তব্যটুকু নিজের মতো করে গুছিয়ে লেখা হয়, তাহলে ‘অনুসারে’ বা ‘অনুযায়ী’-র পরে কোনো কমা বসবে না। কারণ, তখন বাক্যটি আর প্রত্যক্ষ উক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয় না; লেখার স্বাভাবিক ধারায় উল্লেখ করা হয়মাত্র। কয়েকটি প্রয়োগোদাহরণ দিচ্ছি—
১. ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে, বিশেষণ পদ সাধারণভাবে পরবর্তী পদের সঙ্গে যুক্ত হবে না।’— এখানে ‘অনুসারে’-র পরের বক্তব্যটুকু ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ গ্রন্থ থেকে অবিকল উল্লেখ করা হয়েছে, তাই ‘অনুসারে’-র পরে কমা ব্যবহার করা হয়েছে।
 
২. ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে বিশেষণ পদ সাধারণত পরবর্তী পদ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে লিখতে হয়।’— এই বাক্যটিতে বাংলা একাডেমির নিয়মটি নিজের মতো করে সাজিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে বিধায় ‘অনুসারে’-র পরে কোনো কমা ব্যবহার করা হয়নি।
 
৩. ‘ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুল থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল।’— ১ নম্বর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
 
৪. ‘ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্য অনুযায়ী ভুল থেকেই ফুল ফোটে এবং সেই ফুল থেকে ফল হয়।’ ২ নম্বর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
 
১১৩.  উপনেত্র মানে কী?
নেত্র মানে চোখ, নয়ন, চক্ষু। কিন্তু উপনেত্র মানে চশমা। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত উপনেত্র (উপ+নেত্র) অর্থ— (বিশেষ্যে) চশমা।  নয়ন ও নেত্র সমার্থক। উভয়ের অর্থ— চোখ। নয়ন অর্থ নেত্র হলেও উপনয়ন মানে কিন্তু উপনেত্র বা চশম নয়।  সংস্কৃত উপনয়ন (উপ+নয়ন) অর্থ— (বিশেষ্যে) বালকের উপবীত ধারণের অনুরষ্ঠান; বেদ অধ্যয়নের জন্য গুরুর সান্নিধ্যে আনয়ন।
 
১১৪. উপ বনাম উপ
সংস্কৃত উপে অব্যয় পদ। এটি নৈকট্য (উপকণ্ঠ); সাদৃশ(উপকথা), সহকারী (উপনেতা), উৎকর্ষ (উপাদেয়); অতিরিক্ত (উপকর) প্রভৃতি সূচক সংস্কৃত অব্যয়। শব্দের আগে উপ দিলে এসব অর্থ যুক্ত হয়। ধ্বন্যাত্মক উপ অর্থ— হনুমানের ডাক; ক্রিয়াবিশেষণে অকস্মাৎ।
 
১১৫. বাংলা বানান
 নয়ন কিন্তু পরিণয়ন। নাম কিন্তু পরিণাম। নেতা কিন্তু পরিণেতা। বহন কিন্তু পরিবহণ। বাহন কিন্তু পরিবাহণ যান কিন্তু পরিযাণ। সেক কিন্তু পরিষেক। সেবক কিন্তু পরিষেবক। সেবা কিন্তু পরিষেবা। পরিষ্কার কিন্তু পরিষ্করণ।
 
১১৬. রুপা ও রূপ নিমোনিক
সংস্কৃত ‘রূপা’ থেকে উদ্ভুত তদ্ভব ‘রুপা’ শব্দের অর্থ, অলংকার তৈরির জন্য ব্যবহৃত মূল্যবান উজ্জ্বল সাদা ঘাতসহ মৌলিক ধাতু যার পারমাণবিক সংখ্যা ৪৭, রৌপ্য, রুপো, রজত, চাঁদি প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘রূপ (√রূপ+অ)’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে- মূর্তি (মনুষ্য রূপ), সৌন্দর্য, শ্রী, আকৃতি, চেহারা, প্রকার, রকম, বিভক্তিযুক্ত শব্দ বা ধাতু (ধাতুরূপ), দৃষ্টিগ্রাহ্য বা প্রত্যক্ষ বিষয় এবং বিশেষণে তুল্য, অভিন্ন প্রভৃতি। “এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী–জননী (রবীন্দ্রনাথ)।”
 
অনেক সময় ‘রুপা’ ও ‘রূপ’ শব্দ লেখার সময় ভুল হয়ে যায়। ভুল যাতে না হয় সেজন্য একটা নিমোনিক বানানো যেতে পারে : বর্ণমালায় আগে উ-কার তারপর ঊ-কার। এজন্য আগে ‘রুপা’ তারপর ‘রূপ’। মনে রাখুন, ‘রুপা’ পরিধান করার পর ‘রূপ’ বৃদ্ধি পায়। আসলে, রুপ বানানের কোনো শব্দ নেই। আছে রুপা।
১১৭. চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক, লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৭৭  খ্রিষ্টাব্দের ১১ই অক্টোবর অবিভক্ত বাংলার মালদহের চাঁচল এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল  যশোর।  তিনি ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বলাগড় হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফ এ এবং ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। ‘মেঘদূত’, ‘মাঘ’ প্রভৃতি পত্রিকায় সংস্কৃত সাহিত্যের সমালোচক হিসাবে তাঁর সাহিত্য জীবনের সূচনা। তিনি কিছুদিন ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘প্রবাসী’র সহ-সম্পাদক হিসাবে সমধিক পরিচিতি পান। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়  তাঁর প্রথম মৌলিক রচনা ‘মরমের কথা’ ছোটগল্প প্রকাশিত হয়।  ১৯১৯  খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগদানের জন্য তিনি ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা চলে আসেন। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে যে কয়েক জন লেখক বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জগতে প্রবল পাঠক প্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম একজন চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সামসময়িক অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসিক হচ্ছেন: ইন্দিরা দেবী, অনুরূপা দেবী, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু প্রমুখ। তাঁর লেখা মোট উপন্যাস পঁচিশ। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:  ‘স্রোতের ফুল’ ও ‘পরগাছা’।  শিশুতোষ গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন। ভাতের জন্মকথা তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ।  গবেষক হিসেবেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। রবীন্দ্র-গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘রবি-রশ্মি’ একটি অনবদ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থের জন্য তিনি প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন।  অনুবাদের তিনি পারদর্শী ছিলেন।  আগুনের ফুলকি (১৯১৪),  সেরাতের ফুল (১৯১৫),  পরগাছা (১৯১৭),  দুই তীর (১৯১৮), হেরফের (১৯১৮), পঙ্কতিলক (১৯১৯), দোটানা (১৯২০),  আলোকপাত (১৯২০), রূপের ফাঁদে (১৯২৫),  কবিকঙ্কণ-চণ্ডী,  প্রথম ভাগ (পরিলেখন প্রকল্প)(১৯২৫),  সুর বাঁধা (১৯৩৭), অগ্নিহোত্রী (১৯৩৮) প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সাহিত্যকর্ম। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
 
১১৮. কৃত বনাম ক্রীত
সংস্কৃত কৃত (কৃ+ত) অর্থ (বিশেষণে)— রচিত (সৈয়দ মুজতবা আলী কৃত পুস্তক)। সম্পাদিত (সুকৃত সংকলন, প্রকৃত কর্ম)। লব্ধ, সুশিক্ষিত (কৃতবিদ্য, কৃতজ্ঞান)। নির্মিত, গৃহীত (লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কৃত চিত্রকর্ম)। পূর্ণ, সফল (কৃতকার্য) এবং (বিশেষ্যে)— পুরাণে কল্পিত সৃষ্টির আদি যুগ, সত্যযুগ। সংস্কৃত ক্রীত (ক্রী+ত) অর্থ (বিশেষণে)— অর্থের বিনিময়ে লব্ধ। যেমন: ক্রীতদাস, ক্রীতপুস্তক, ক্রীতবাড়ি, ক্রীতগাড়ি, ক্রীতজমি। যা ক্রয় করা হয়েছে তা ক্রীত। অনেকে লিখেন: ক্রয়ক্রীত। তা বাহুল্য। ক্রীত শব্দের মধ্যে ক্রয় করা হয়েছে অর্থ নিহিত। কৃত হতে হলে চেষ্টা, জ্ঞান, মহানুভবতা, প্রজ্ঞা, বিদ্যা, কর্ম, চেতনা, বোধ প্রভৃতি বিষয় জড়িত। কৃত হতে হলে প্রজ্ঞার স্ফুরণ ঘটানো অনিবার্য। প্রত্যক্ষভাবে শুধু অর্থ দিয়ে এসব করা যায় না। কিন্তু ক্রীত অর্জনে শুধু অর্থ হলেই চলে। অর্থ-সম্পদ থাকলে একজন মূর্খ মানুষও সহস্র কোটি ডলারের বই কিনে বিশাল পাঠাগার দিতে পারে, কিন্তু কৃতবিদ্য হতে পারবেন না। প্রজ্ঞা-অধ্যবসায় প্রভৃতি না-থাকলে কারও পক্ষে কৃতবিদ্য বা সুকৃত ইত্যাদি হওয়া সম্ভব নয়।
 
১১৯. জগদ্দল পাথর জগদ্দলপাথর
জগদ্দল পাথর জগদ্দল ও পাথর মিলে জগদ্দল পাথর। আবার জগৎদল মিলে জগদ্দল।  দলন (দল্‌+অন) থেকে উদ্ভূত দল অর্থ— (বিশেষ্যে) মর্দন, চূর্ণীকরণ, নিপীড়ন; যা দলিত করে। যা দলন করে তাই দলন বা দল। সুতরাং,  জগদ্দল কথার আক্ষরিক অর্থ—জগতের দলন কর্তা;  জগৎকে দলনে সক্ষম গুরুভার পাষাণ, নিপীড়ক, কষ্ট দেয় এমন।   জগৎকে দলিত করতে সক্ষম পাথর কত ভারী হতে পারে তা সহজে অনুমেয় হলেও অত ভার বহন করা সম্ভব নয়। জগদ্দল পাথর অর্থ এমন একটি পাথর যা দলিত করে, দলন করে, পীড়া দেয় এবং যে  পাথরের গুরুভার বহন করা কষ্টসাধ্য; কিংবা আদৌ সম্ভব নয় । যখন কোনো অব্যক্ত বেদনা  বা সীমাহীন কষ্ট জগদ্দলের মতো পাথর হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে তখন কথাটি ব্যবহার করা হয়। যেমন: একমাত্র সন্তানের মৃত্যুকথা পিতার বুকে জগদ্দল পাথর হয়ে আছে।  এটি এমন একটি ঘটনা বা বিষয় যা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবল চেষ্টা সত্ত্বেও সম্ভব হয় না।  বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, জগদ্দল (জগৎ+দল) অর্থ: অতি বিশাল ও গুরুভার, অত্যন্ত ভারি। নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার জগদ্দল গ্রামে জগদ্দল বিহার নামের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বিহারের চারপাশে অনেক ভারি পাথর ছিল এবং এখনো আছে। অনেক ভারি ভারি পাথর দিয়ে বিহারটি নির্মিত। কথিত হয়, পাথরসমূহ কারও পক্ষে উত্তোলন করা সম্ভব হতো না। এসব  পাথর জগতের বুকে অলৌকিকভাবে চেপে বসা ছিল। তাই নাম হয় জগদ্দল মন্দির।
 
১২০ ইদ না কি ঈদ?
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী—
ইদ: ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব (ইদুল ফিতর বা ইদুল আজহা); খুশি, উৎসব; ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচলিত বানান।
ড. মোহাম্মদ আমীন
ঈদ: ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ইদ ও ঈদ উভয় শব্দকে পৃথক ভুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে ইদ বানানকে ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচলিত বানান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আমার প্রশ্ন— ঈদ বানান অসংগত হবে কেন?
উত্তর পাওয়া গেল বাংলা একাডেমি থেকে— বিদেশি শব্দে ঈ-কার বিধেয় নয়, তাই ঈদ বানান অসংগত।
অনেকে প্রশ্ন করেন চীন ও শ্রীলঙ্কা বিদেশি শব্দ। তাদের ঈ-কার পরিয়ে অসংগত না বলে সরাসরি প্রমিত ঘোষণা করা হয়েছে কেন? চীন বিদেশি শব্দ নয়। তৎসম শব্দ। শ্রীলঙ্কাও বিদেশি শব্দ নয়, তৎসম শব্দ। তাই মূল বানান অনুযায়ী ঈ-কার দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কী-বোর্ড বানানে ঈ-কার কেন? এটি তো বিদেশি শব্দ?
একাডেমি কোনো উত্তর দিতে পারল না।
বাংলা একাডেমি যদি—
১. ইংরেজি ‘Key board’- এর ‘ঈ-কার’-যুক্ত ‘কী-বোর্ড’ বানানকে প্রমিত নির্দেশ করতে পারে;
২. “বিদেশি শব্দের বানানে ‘মূর্ধন্য-ষ’ সমীচীন নয়”— বিধি উপেক্ষা করে বিদেশি ‘Christ” শব্দকে উচ্চারণানুগ করার অজুহাতে ‘মূর্ধন্য-ষ’-যুক্ত ‘খ্রিষ্ট’, ‘খ্রিষ্টাব্দ’ প্রভৃতি বানানকে প্রমিত নির্দেশ করতে পারে; তাহলে আরবি ‘عيد (Eid)’-এর বাংলা ‘ঈদ’ বানানকে প্রমিত নির্দেশ করবে না কেন?
 
১২১. কিন্ডারগার্টেন 
কিন্ডারগার্টেন (kindergarten) শব্দটির প্রবক্তা জার্মান শিশু-শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল (Friedrich Wilhelm August Froebel)। এর বাংলা অর্থ— হয় শিশুদের বাগান। ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গ শহরে শিশুদের জন্য একটি শিক্ষপ্রতিষ্ঠান খুলেন। এই প্রতিষ্ঠানে খেলাচ্ছলে শিশুদের পড়ানো এবং খেলাধুলা-সহ নানা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিষয় যুক্ত করা হয়। ফ্রোয়েবল এর নাম দেন কিন্ডারগার্টেন।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, জর্মন কিন্ডারগার্টেন অর্থ (বিশেষ্যে) যে বিদ্যালয়ে ক্রীড়াচ্ছলে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়, শিশুদের প্রারম্ভিক বিদ্যালয়।
১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে দার্শনিক ও শিশু-শিক্ষাবিদ রবার্ট ওয়েন স্কটল্যান্ডের নিউ ল্যানার্ক এলাকায় তাঁর বাসস্থানের কাছে ‘ইনফ্যান্ট স্কুল’ নামের একটি শিশুশিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয়— এটিই শিশু শিক্ষার বর্তমান চলমান ধারার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে শিশু-শিক্ষাবিদ স্যামুয়েল ওয়াইল্ডারস্পিন লন্ডনে আরেকটি শিশু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মে কাউন্টেস থেরেসা ব্রুন্সভিক (১৭৭৫-১৮৬১) হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট-এর নিজ বাড়িতে ‘এঙ্গিয়েলকার্ট’ বা পরিদের বাগান নামের একটি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলেন। অল্পসময়ে এটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এখান থেকে প্রাণিত হয়ে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন কিন্ডারগার্টেন
— — — — — — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
 

১২২. মাইকেলি ধাতু  ( এবি ছিদ্দিক)

ব্যাকরণের আলোচনায় বাংলা ধাতুগণের নির্দিষ্ট শ্রেণিভাগ রয়েছে। কর্, মার, মিটা, উঠ্, লিখ্, মুচড়া, চাহ্, খা, শু, হ প্রভৃতি সেসব ধাতুগণের কয়েকটি। এসব ধাতুর সঙ্গে কাল ও পুরুষ অনুসারে বিভক্তি (প্রত্যয়) যুক্ত করে বাক্যে ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলা ভাষায় এই নির্দিষ্ট ধাতুশ্রেণির বাইরে আরও একপ্রকার ধাতু রয়েছে, যা ‘মাইকেলি ধাতু’ নামে পরিচিত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এধরনের ধাতুর ব্যবহার প্রচলন করেন বলে তাঁর নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। মাইকেলি ধাতু প্রকৃতপক্ষে কোনো ধাতু নয়, মূলত এগুলো কতিপয় বিশেষ্য ও বিশেষণ। মাইকেল মধুসূদন দত্ত সেসব বিশেষ্য-বিশেষণের সঙ্গে ধাতুর অনুকরণে কাল ও পুরুষ অনুসারে বিভক্তি যুক্ত করে ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে এধরনের শব্দ ‘মাইকেলি ধাতু’ তকমা পেয়ে গিয়েছে। পবিত্র থেকে পবিত্রি (পবিত্র করি), লক্ষ থেকে লক্ষি (লক্ষ করি/করে), উত্তর থেকে উত্তরিলা (উত্তর দিল/দিলো), ইচ্ছা থেকে ইচ্ছি (ইচ্ছে /করি/করে/হচ্ছে) প্রভৃতি এই শ্রেণিভাগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নিম্নে মাইকেল মধুসূদন দত্তের “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” থেকে দুইটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করা হলো, যেখানে শব্দের এরূপ প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে—
১. ‘… উত্তরিলা কাতরে রাবণি;—
“হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে! …” ‘
২. ‘… উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে; …’
 
১২৩. বিশেষণ,  দূরে রাখুন সর্বক্ষণ
কোনও পদের পূর্বে বিশেষণ বসানো প্রয়োজন হলে কাঙ্ক্ষিত বিশেষণটি পরবর্তী পদের সঙ্গে যুক্ত না -হয়ে পৃথক বসানো বিধেয়। যেমন – নীল আকাশ, লাল শাড়ি, পাকা বাড়ি ইত্যাদি। তবে বিশেষের সঙ্গে যে বিশেষণ বসানো হয় তার কোনও বিশেষণ থাকলে পদ দুটো সেঁটে বসে। যেমন – বিশ্বসুন্দরী, কৃষ্ণকালো, রক্তলাল ইত্যাদি।
 
১২৪. সুগন্ধি বনাম সুগন্ধী
 
সুগন্ধি (সুগন্ধ+ই) অর্থ—  (বিশেষণে) মধুর গন্ধ বিশিষ্ট। সুবাসিত (সুগন্ধি ফুল)। অন্যদিকে, সংস্কৃত সুগন্ধী (সুগন্ধ+ইন্) অর্থ—   (বিশেষণে) মধুর গন্ধ বহন করে এমন। যেমন, সুগন্ধী বায়ু, সুগন্ধী জল।

১২৫. ফতুর

‘ফতুর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ— রিক্ত, নিঃশেষ, শূন্য, নিঃস্ব, অসহায় প্রভৃতি। এটি আরবি শব্দ। আরবি ‘ফুতুর’ থেকে বাংলা ‘ফতুর’ শব্দের উদ্ভব। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দের প্রয়োগ ও অর্থ দুটোই শরীর-সম্পর্কিত। আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ—দুর্বলতা, অবসন্নতা, অলসতা, আলস্য, নির্জীবতা প্রভৃতি। বাংলায় ‘ফতুর’ শব্দটির প্রয়োগ ও অর্থ শুধু শরীর সম্পর্কিত নয়। পার্থিব সম্পদ সম্পর্কিত নিঃস্বতা প্রকাশে এর অধিক প্রয়োগ দেখা যায়। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দের প্রসঙ্গে শরীর দুর্বল হলে যেমন মানুষের সবকিছুতে অসহায়ত্বের সূচনা ঘটে, তেমিন বাংলা ‘ফতুর’ শব্দের প্রসঙ্গে সহায়-সম্পদে ব্যক্তিবিশেষ রিক্ত হলে তার সবকিছুতে অসহায়ত্বের অনুপ্রবেশ দেখা যায়। তাই ‘ফতুর’ শব্দটি আরবি ভাষা হতে বাংলায় মেহমান হয়ে এলেও তার বাহ্যিক কিংবা অন্তর্নিহিত কোনো অর্থের বিপর্যয় ঘটায়নি।
 
১২৬. অনিওম্যানিয়া: ক্রয়োন্মত্ততা বা ক্রয়োন্মাদনা

ইংরেজি অভিধানমতে, অনিওম্যানিয়া অর্থ— An uncontrollable desire to buy things. অর্থাৎ, দ্রব্যাদি ক্রয়ের লাগামহীন বাতিক,

ড. মোহাম্মদ আমীন

অত্যধিক ক্রয়াসক্তি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি একটি মারাত্মক রোগ হিসেবে চিহ্নিত। যাদের এমন বাতিক রয়েছে বা যারা এই বাতিকে আক্রান্ত তাদের বলা হয় Oniomaniac, বাংলায় বলা যায়: ক্রয়োন্মাদ। প্রয়োজন থাক বা না থাক যা দেখে তা কেনার জন্য উন্মাদ হয়ে যাওয়া— এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। এই উন্মত্ততা এত প্রবল যে, রোধ করা সম্ভব হয় না। ক্রয়োন্মাদদের জীবনের অধিকাংশই কাটে বাজারে-বাজারে।তাদের ক্রয়-ইচ্ছায় বাধা দিলে সৃষ্টি হয় সংঘর্ষ।

পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে এমন রোগী বেশি দেখা যায়। এটি প্রথমে শরীরকে আঘাত করে না, মনকে আঘাত করে। ক্রমশ ক্রয়োন্মত্ততা এমন জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ক্রয় করতে না পারলে শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়ে পারে। যার স্ত্রী-কন্যা এই রোগে আক্রান্ত তার চেয়ে দুর্বিষহ জীবন আর হতে পারে না। ক্রয়োন্মাদরা সংসার ও নিজেকে আর্থিক এবং মানসিকভাবে ফতুর করে দেয়। এদের নিয়ে কোথাও বের হওয়া যায় না। শুধু কিনতে চায় আর কিনতে চায়। অনেকে এ রোগ হতে বাঁচার জন্য ঘুম আসে এমন কিছু খেয়ে ঘুমানোর অভ্যাস রপ্ত করার চেষ্টা করে। এমন অনেক লোক আছে যারা এই রোগে এত বেশি আক্রান্ত যে, সারাদিন বিভিন্ন মার্কেটে-মার্কেটে ঘুরাঘুরি করে  এবং রাতের বেলা বাসায় ফিরে কী ক্রয় করা হলো তা দেখে। রাত কাটতে না কাটতে তাদের আবার ক্রয়েচ্ছা জেগে উঠে। ভোর হতে না হতে আবার প্রস্তুতি নেয় মার্কেটে যাওয়ার।

১২৭. জোড়া ডিম্ব এবং বিসর্গমুক্ত প্রাতরাশ
 
হরি ঠাকুর প্রাতরাশ বানানে বিসর্গ (ঃ) দেন না কেন?
হরি ঠাকুর প্রাতঃসন্ধ্যা সম্পন্ন করে বাজার থেকে দুটো ডিম এনেছিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে প্রাতঃক্রিয়া ও প্রাতঃস্নান সেরে প্রাতঃস্মরণীয়দের প্রাতঃপ্রণাম করে নাশতার টেবিলে বসে দুটো ডিমই খেয়ে ফেললেন। জোড়া ডিম নেই বলে প্রাতরাশ বানানে বিসর্গ দিতে পারলেন না। না-থাকলে দেবেন কীভাবে?
 
১২৮. উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী
লেখক, শিশুসাহিত্যিক, বাংলা ছাপাখানার অগ্রপথিক, চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক  এবং সুরকার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই মে মোতাবেক ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৭শে বৈশাখ কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন আরবি, ফারসি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। পিতার ডাকনাম শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দর মুন্সীর আট সন্তানের তৃতীয় পুত্রসন্তান। তাঁর পৈতৃক নাম  কামদারঞ্জন রায়। চার বছর বয়সে তাঁর পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাঁকে দত্তক নিয়ে  নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।  উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় একটি নাম। তিনি সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পিতা এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা।  উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী  ছিলেন সন্দেশ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। গুপি-গাইন-বাঘা-বাইন, টুনটুনির বই ইত্যাদি উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে ডিসেম্বর বাহান্ন বছর বয়সে মারা যান।
 
১২৯. বিধবা বনাম বিপত্নীক:
বিধবা: বিধ্ব+আ= বিধবা।  বৈয়াকরণ জ্যোতিভূষণ চাকী তাঁর ‘বাগর্থ কৌতুক’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৩, চতুর্থ মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০১৩) লিখেছেন, শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ — “যার কোনো পুরুষ বন্ধু নেই।“ অর্থাৎ, যার কোনো পুরুষ বন্ধু নেই— নর হোক বা নারী হোক সেই বিধবা। সে হিসেবে, কোনো পুরুষ লোকের যদি কোনো পুরুষ বন্ধু না-থাকে তাকেও বিধবা বলা যায়। পুরুষ বন্ধুহীন মানুষকে নির্দেশ করার জন্যই ‘বিধবা’ শব্দটির জন্ম হয়েছিল। পুরুষের পুরুষ বন্ধু থাকবে না—এমন ঘটনা বর্তমান কালের মতো আগেও ছিল বিরল। তাই শব্দটির উৎসার্থে ব্যবহার ক্রমশ কমে আসতে থাকে। ফলে ‘বিধবা’ নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রান্তে চলে যায়। এমন একটি সুন্দর শব্দকে মৃত্যু হতে বাঁচানোর জন্য বৈয়াকরণগণ বিধবা শব্দের নতুন অর্থ নির্ধারণ করার চেষ্টা করলেন। তারা দেখলেন— পুরুষ মানুষের পুরুষ বন্ধু না-থাকার ঘটনা বিরল, কিন্তু নারী মানুষের পুরুষ বন্ধু না-থাকার ঘটনা প্রচুর। অর্থাৎ পুরুষ বন্ধুহীনের ঘটনা সাধারণত নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং পুরুষের ক্ষেত্রে তা একটি ব্যতিক্রম। তাই বিধবা শব্দের অর্থ হয়ে যায় পুরুষ বন্ধুহীন নারী। যা নিত্য স্ত্রীবাচক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত বিধবা (বিধব+আ) অর্থ— যে নারীর ধব বা স্বামী মৃত এবং বিশেষণে পতিহীনা।
বিপত্নীক: বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত বিপত্নীক (বিপত্নী+ক) শব্দের মুখ্য অর্থ—  (১) পত্নী নেই এমন এবং গৌণার্থ (২) মৃতদার। শব্দটির আদি অর্থ ছিল:  পত্নী নেই এমন।  এখানে নেই কথাটি  “পত্নী জীবিত আছে কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে” অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে  গৌণার্থে পত্নী মারা গেছে অর্থও প্রকাশেও বিপত্নীক শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। বিধবা হচ্ছে বিশেষ্য এবং বিপত্নীক হচ্ছে বিশেষণ।  বিধবা শব্দটি উৎস অর্থ বিবেচনায় নিত্য স্ত্রীবাচক ছিল। অধিকন্তু, যেহেতু উৎসকালে বিধবা ও বিপত্নীক শব্দের অর্থ পদ এবং লৈঙ্গিক বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক ছিল না, তাই বিধবা শব্দটিকে বিপত্নীক শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত না-করে সংস্কৃত ব্যাকরণে নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

১৩০. মৃতদার ও বিধবা

স্বামীর মৃত্যু হলে ওই মৃত স্বামীর স্ত্রী বা স্ত্রীদের বলা হয় বিধবা। কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যু হলেও মৃত স্ত্রীর স্বামীকে কেবল তখনই মৃতদার বলা যাবে, যখন যার স্ত্রী মারা গেছে তার আর কোনো স্ত্রী জীবিত বা বর্তমান না থাকে। কারণ মৃতদার অর্থ বিপত্নীক।
 
— — — — — — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — — — — — — — — —  — — — — — — —  — —
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!