বাংলা ভাষা সিলেটে আহত চট্টগ্রামে নিহত

প্রমিতা দাশ লাবণী

বাংলা ভাষা সিলেটে আহত চট্টগ্রামে নিহত

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/বাংলা-ভাষা-সিলেটে-আহত-চট্-2/

 
বাংলা ভাষা সিলেটে আহত চট্টগ্রামে নিহত ড. মোহাম্মদ আমীনের একটি উপন্যাস। ভূমিকা লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। উপন্যাসটি  ১৫ই মার্চ, ২০২১ থেকে শুবাচে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
বইটির কয়েকটি পরিচিত চরিত্র: প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমূখ।
 
উপন্যাসটির ভূমিকা নিচে দেওয়া হলো। এটি পড়লে উপন্যাসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা পাওয়া যাবে। প্রসঙ্গত, উপন্যাসটি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় (২০২১) মাদার্স পাবলিকেশন্স-এর ৫৩৭ নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে। যোগাযোগ: ০১৭১২ ৭১৯৮২৭
 
ভূমিকা
আমার মতে, এটি কিশোরদের উপযোগী করে লেখা সর্ব বয়সের পাঠকদের জন্য সাগ্রহে পঠনীয় একটি উপন্যাস। আপনি যে বয়সেরই হোন না, বাংলা পড়ার এবং বোঝার সামর্থ্য থাকলে বইটি ভালো লাগবে। এর কাহিনি বিন্যাস মুগ্ধকর। প্রতিটি অধ্যায়ে ভালো লাগার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। বইটি পড়ে আমি যত না হেসেছি, তার চেয়ে বেশি শিখেছি।
মাদার্স পাবলিকেশন্স

 

আকর্ষণীয় কৌশলে বিংশ শতকের অন্যতম প্রাবন্ধিক কবি ও লেখক প্রমথ চৌধুরীর একটা উক্তিকে কেন্দ্র করে রচিত উপন্যাসটি যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, “বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে আর নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে।” তাঁর এই উক্তির জন্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বসাবাসকারীগণ কষ্ট পেয়েছেন। তাদের মতে, প্রমথ চৌধুরী এই দুই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাকে কটাক্ষ করে কথাটি বলেছেন। অনেকে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে নানা কটাক্ষ করে থাকেন। আমি মনে করি-কারও ভাষার প্রতি কখনো এমন কটাক্ষ করা উচিত নয়। আঞ্চলিক ভাষা অঞ্চলের মানুষের প্রাণের ভাষা।
প্রমথ চৌধুরী এ উক্তিটি কেন করেছেন, কীভাবে কোন প্রেক্ষাপটে তার মুখ দিয়ে এমন উক্তি বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল— ইত্যাকার বিষয় লেখক, কল্পশৈলীর রসালো বুদ্ধিমত্তার থালায় পরিবেশন করে পরিতৃপ্তির দিকে নিয়ে গেছেন।
আমি কোনো বই পড়ে এত হাসিনি, এত ভাবিনি। আশা করি আমার মতো আপনাদেরও এই বইটি পড়ে একই অনুভূতির অবতারণা ঘটবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
 
নিচে দেখুন উপন্যাসটির প্রথম অধ্যায়ের কিয়দংশ
ড. মোহাম্মদ আমীন
শুবাচে প্রকাশ: ১৫/৩/২০২১ খ্রিষ্টাব্দ।
 
[প্রচ্ছদ দেখে এবং ভূমিকা পড়েও যাঁরা উপন্যাসের উদ্দেশ্য, পরিণতি এবং বিষয়বস্তু সম্পর্ক ধারণা নেওয়ার মতো প্রজ্ঞার অধিকারী নন, তারা অনুগ্রহপূর্বক উপন্যাসটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। বইটিতে প্রমথ চৌধুরীর উক্তিকে কীভাবে দেখা হয়েছে তা জানা পর্যন্ত যারা অপেক্ষা না করে বিরূপ মন্তব্য করলে পরবর্তীকালে লজ্জা পেতে হবে। ৫২ পর্বে প্রচারণীয় একটি উপন্যাসের প্রথম পর্ব দেখে বিচার করা হলে লেখকের প্রতিও অবিচার করা হবে। উপন্যাস শুরু হওয়া মাত্র পুরো না পড়ে যারা বিরূপ মন্তব্য করেছেন তাদের কিন্তু উপন্যাসটির শেষ অনুচ্ছেদ পড়ার পর অনুতপ্ত হতে হবে। ]
ইংরেজি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে সবুজ।
সেই ষষ্ঠ শ্রেণির ঘটনা। মনে পড়ে গেল হঠাৎ।
হাতে বই। ঠোঁটে জপ। চোখ মিটমিট। মন অনাগত প্রশ্নপত্রে হাবুডুবু। হঠাৎ তাকালে মনে হবে মনে মনে জপছে। হিন্দু হলে বলা যেত— রামনাম। পরীক্ষাকেন্দ্র দূরে নয়। স্বাভাবিকভাবে হাঁটলে হেলেদুলে বিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। সবুজ আসলে আল্লাহ-রসুল জপছে না; রামনামও নয়। পরীক্ষার পড়া জপছে। জামাকাপড় পরার সময় মা বলেছে, পড়া, পড়াগুলো পথে পড়ে পড়ে যেতে। হাঁটা-পড়া নাকি বহুদিন মনে থাকে। মায়ের কথায় সবুজের বড়ো আস্থা।
সবুজের মা তসলিমা খাতুন।
তিনি খান বাহাদুর আবদুল আলিমের বড়ো ছেলের বড়ো মেয়ে। দাপুটে পরিবারের আদুরে কন্যা ছিল একসময়। ফারসি জানেন, উর্দু জানেন। ইংরেজিতে অনর্গল— ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি শেক্সপিয়র সাহেবের হ্যামলেট তাঁর মুখস্থ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভ্রান্তিবিলাসও আছে। এটি শেক্সপিয়র সাহেবের “কমেডি অব দ্যা এররস”-এর ভাবানুবাদ।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মা এসব কাহিনি সবুজকে গল্প করে শোনাত। সবুজ অবাক হয়ে শুনত। তখন সে কচি গাছের কচি পাতার মতো ভালো ছেলে ছিল। ছোটোবেলায় সবাই সবুজের মতো সবুজ থাকে। রবীন্দ্রনাথ বুড়োদের পছন্দ করতেন না; নজরুলও। অথচ দুজনই মরেছেন জরাজীর্ণ বুড়ো হয়ে। মরার সময় কারো শরীরে বিশ কেজির বেশি মাংস ছিল না।
বালিকাবেলায় মা বঙ্কিমচন্দ্র পড়েছে। পড়েছে শরৎবাবুর বড়দিদি, পল্লীসমাজ, দেবদাস, চরিত্রহীন, শ্রীকান্ত, পথের দাবী। রবীন্দ্রনাথও পড়েছে প্রচুর—গল্পগুচ্ছ বহুবার পড়েছে। চোখের বালি মায়ের খুব প্রিয়। সবুজ মনে করত চোখের বালি মানে স্যান্ড ইন আই। মা বলেছে, রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি আসলে বালি নয়। খালি খালি লোকে বালি বলে।
তাহলে কী? সবুজ জানতে চেয়েছিল।
একটি উপন্যাস।
ইস, কোথায় বালি আর কোথায় উপন্যাস। মানুষ কত্তো খারাপ।
সবুজের মা অনেক জানেন। মায়ের কথা ফেলতে নেই। পরীক্ষার হলে যাবার সময় মায়ের কথা না-রাখলে উত্তরপত্রে আন্ডা জোটে। তাই সবুজ মায়ের নির্দেশ পালন করছে। মনে মনে শব্দার্থ পড়ে পড়ে পথ চলছে—
জেন্ডার (gender) অর্থ লিঙ্গ, বডি (body) অর্থ শরীর,
পিক (peak) অর্থ শৃঙ্গ, ডিপ (deep) অর্থ গভীর।
টলেমি (Ptolemy)-তে পি, নাইফে (knife) লাগে কে।
হর্ন (horn) অর্থ পশুর শিং, কাদামাটি ক্লে (clay) ।
পরীক্ষার হলে যেতে যেতে পড়তে হবে কেন? সিরাজ চাচাকে জিজ্ঞাসা করেছিল সবুজ।
সিরাজ চাচা বলেছিলেন, বাঙালিরা কোনো বিষয় বেশিক্ষণ মনে রাখতে পারে না। এজন্য তোমার চেয়ারম্যান দাদা ভোটের এক দিন আগে ভোটারদের টাকা দেওয়ার জন্য বের হন। এর বেশি সময় আগে দিলে ভুলে যায়। বাঙালির স্মৃতি বাঙালির শরীরের চেয়েও ক্ষীণ। তুমি বাঙালি। তাই তুমি সবুজের স্মরণ শক্তিও বাঙালির মতো ক্ষীণ এবং ক্ষণস্থায়ী।
চাচার কথাটা বেশ মনে ধরেছে সবুজের। এ বিষয়ে সবুজের নিজেরও একটা ব্যাখ্যা আছে। তাও কম যৌক্তিক নয়। পথে যেতে যেতে পড়লে ভুলে যাবার আগে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেওয়া যায়। হজম হওয়ার আগে বমি আসার মতো। মুখস্থ করে উত্তরপত্রে উগড়ে দিতে পারলেই হলো। তাজা তাজা নম্বর। ফার্স্ট ডিভিশন পাশ।
এটাই বাঙালির পরীক্ষা।
পথের পড়ায় মায়ের দোয়া আছে। বাড়িতে পড়লে সবুজ ভুলে যায়। ওই পড়ায় থাকে বাবার শাসন। শাসন এক প্রকার অভিশাপ। অভিশাপের ছোবল সাপের চেয়েও বিষাক্ত। এজন্য বাবার বেতটা সাপের মতো চিকন আর কালো। শ এর পর স। তাই শাপ-এর পর সাপ। শাপই বিষাক্ত সাপ হয়ে আসে অবশেষে।
— — — — — — — — — — — — — — — —
পরবর্তী: বাংলা ভাষা সিলেটে আহত চট্টগ্রামে নিহত ২
প্রকাশিত হবে মাদার্স পাবলিকেশন্স, অমর একুশে বইমেলা  ২০২১; স্টল নম্বর ৫৩৭।
 
error: Content is protected !!