বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস: বস্তাপচা বুলি, ফোড়ন কাটা, ফুলঝুরি

ড. মোহাম্মদ আমীন

বস্তাপচা বুলি: ‘বস্তা’ ও ‘পচা’ শব্দের সমন্বয়ে ‘বস্তাপচা’ শব্দের উদ্ভব। বস্তা মানে থলে এবং পচা মানে নষ্ট। বস্তাপচা মানে বস্তায় পচা। বস্তায় রাখা বস্তু পচে গেলে তাকে বস্তাপচা বলা হয়। বস্তাপচা পণ্য সবসময় ফেলে দেওয়া হয় না। অনেক সময় তা বাজারে

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সস্তা দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অথবা রাস্তার পাশে ফুটপাথে ফেলে দেওয়া হয় এবং যে কেউ তা দেখে ও বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারে। বস্তাপচা শব্দের পাশে বুলি বসলে হয়— বস্তাপচা বুলি। ‘বুলি’ শব্দের অর্থ— কথা। সুতরাং বস্তাপচা বুলি কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ—বস্তায় পচা বুলি। কিন্তু এর প্রায়োগিক অর্থ— সস্তা কথা। অধিক ব্যবহারে যা সহজলভ্য হয়ে যায় তাকেও ‘বস্তাপচা’ বলা হয়। বস্তাপচা দ্রব্য যেমন সহজলভ্য ও তেমনি প্রচুর এবং অবহেলার। তেমনি যেসব বাণী বা কথা যত্রতত্র প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয় এবং অর্থও খুব হালকা সেগুলোই হচ্ছে ‘বস্তাপচা বুলি’। বাংলা ছবি, নাটক ও আলাপ-আলোচনায় এটি একটি বহুল ব্যবহৃত কথা। যেমন— জীবন একটা রঙ্গমঞ্চ… মায়ের পায়ের নিচে…, বাবা কেন চাকর। কথাগুলো ভালো, তবু বস্তাপচা হলো কেন? তবে কি বেশি ব্যবহারে ভালো জিনিসও মূল্যহীন হয়ে যায়? হ্যাঁ, অধিক ব্যবহারে ভালো জিনিসও মূল্যহীন হয়ে পড়ে বইকি। 

ফুলঝুরি: ‘ফুলঝুরি’ শব্দের অর্থ— ‘বাগাড়ম্বর, অর্থহীন বাগ্‌বিস্তার, অলঙ্কারবহুল কথা। কথা ও ফুলঝুরি শব্দের মিলনে ‘কথার ফুলঝুরি’ বাগ্‌ধারার উদ্ভব। ফুলঝুরি একপ্রকার আতশবাজি। দেখতে অনেকটা আগরবাতির মতো। এটি হাতে ধরে আগুন দিলে স্ফুলিঙ্গ বের হয়ে পুষ্পবৃষ্টির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই স্ফুলিঙ্গ কিছু দেখার মতো আলো ছড়ায় না, এই আলোতে কোনো কাজ করা যায় না। নিমিষে তা মিশে যায়। ফুলঝুরি নামের আতশবাজির এ বৈশিষ্ট্য থেকে ‘কথার ফুলঝুরি’ বাগ্‌ধারার জন্ম। বক্তার মুখ দিয়ে কথার ফুলঝুরি ফুটতে পারে, লেখার মধ্যেও ফুলঝুরি থাকতে পারে। ‘ফুলঝুরি’ যেখান থেকেই ফুটুক তা অর্থহীন বাগ্‌বিস্তার ছাড়া কিছু নয়।
ফোড়ন কাটা:  ‘ফোড়ন কাটা’ বাগ্‌ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ— কথার মধ্যে মন্তব্য করা, টিপ্পনী কাটা, বিরূপ মন্তব্য করা, বিব্রতকর কিছু বলা। তরকারিতে ‘ফোড়ন দেওয়া’ থেকে ‘ফোড়ন কাটা’ শব্দের উদ্ভব। তরকারি সুস্বাদু করার জন্য গরম তেলের উপর জিরা, মরিচ, তেজপাতা প্রভৃতির সম্বরা দেওয়াকে ‘ফোড়ন দেওয়া’ বলা হয়। তবে তরকারির ফোড়ন আর বাগ্‌ভঙ্গির ফোড়ন অভিন্ন নয়। বাংলা ভাষায় বাগ্‌ধারা  হিসেবে ব্যবহৃত ‘ফোড়ন দেওয়া’ অর্থ হলো— দু-জনের বা দু-পক্ষের কথা বা আলোচনার মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তি বা পক্ষের মন্তব্য করা। তরকারিতে ফোড়ন দিলে তরকারি সুস্বাদু হয়, কিন্তু কথায় ফোড়ন কাটলে বক্তার মেজাজ গরম হয়ে ওঠে, চ্যাৎ করে উঠে তরকারিতে ফোড়ন দেওয়ার মতো। তবে বক্তার মেজাজ গরম হয়ে উঠলেও কথায় ফোড়ন কাটলে অনেকে মজা পায়। তাই পরোক্ষভাবে ‘তরকারির ফোড়ন’ আর ‘কথার ফোড়ন’-এর মধ্যে  মিল পাওয়া যায়।
সূত্র: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমনি, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।
error: Content is protected !!