বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

 

প্রকাশক :পুথিনিলয়, মূল্য: ৩৫০ টাকা।

প্রথম অধ্যায়


‘অ’ বর্ণের কয়েকটি অর্থ আছে। অ অর্থ অস্তিত্বের আধার, অস্তিত্বকে যে ধরে রাখে, বহন করে বা রক্ষা করে। আবার ‘অ’ বর্ণ দিয়ে বিষ্ণু, ব্রহ্মা, শিব, বায়, বৈশ্বানর প্রভৃতিও বোঝায়। এটি নঞ্্-অর্থেও ব্যবহার করা হয়। যেমন ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ; এরূপ অলোভ, অহিংসা, অসৎ, অনিচ্ছা ইত্যাদি প্রকাশেও বর্ণটির বহুল ব্যবহার দেখা যায়। স্বীকৃতি বোঝাতেও এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন আমি কিন্তু সব কাজ শেষ করে এসেছি। বাবু বললেন : অ তাই বুঝি! মঅ-কে বহন করে তাকে বলে অব। প্রকৃতপক্ষে ‘অ’ হচ্ছে আধারের একক। এখান থেকে গণনার শুরু।

অকবজ
‘অকবজ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় অনায়ত্ত ও অনধিকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। মূল শব্দ ছিল ‘কবজ’। শব্দটির শুরুতে যুক্ত হয়েছে বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ ‘অ’। এ হরফটি ‘না-বোধক’ অর্থ প্রকাশেও ব্যবহৃত হয়। যেমন অনিয়ম, অশুভ ইত্যাদি। যথাক্রমে নিয়ম ও শুভ শব্দদ্বয়ের পূর্বে ‘অ’ যুক্ত হয়ে শব্দটিকে হ্যাঁ-বোধক থেকে না-বোধকে রূপান্তরিত করেছে। ঠিক তেমনি ‘কবজ’ শব্দের অর্থ আয়ত্ত করা, গ্রহণ করা, অধিকারভুক্ত করা। শব্দটির শুরুতে ‘অ’ যুক্ত হওয়ার পর সংগতকারণে এটি না-বোধক শব্দে পরিণত হয়েছে।

অকালকুষ্মাণ্ড
অকালকুষ্মাণ্ড শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘অকালজাত কুষ্মাণ্ড বা অকালজাত কুমড়া’। বিশেষ্য মনে হলেও, শব্দটি বিশেষ ধরনের বিশেষণ। বাংলায় এমন বিশেষণের সংখ্যা কম নয়। এবার শব্দটির ব্যুৎপত্তি জেনে নেওয়া যাক। পাণ্ডুর পত্নী কুন্তী ও ধর্মের মিলনে যুধিষ্ঠির, বায়ুর সঙ্গে মিলনে ভীম, ইন্দ্রের সঙ্গে মিলনে অর্জুন এবং পাণ্ডুর দ্বিতীয়া স্ত্রী মাদ্রীর গর্ভে নকুল ও সহদেব জন্ম নিলে পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী গর্ভবতী গান্ধারী প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। গর্ভধারণের দুই বছর পার হলেও গান্ধারীর কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হচ্ছিল না। এ অবস্থায় তিনি রাগে ও ক্ষোভে নিজেই নিজের গর্ভপাত ঘটিয়ে ফেলেন। গর্ভপাতের ফলে কুমড়া বা কুষ্মাণ্ড আকৃতির একটি মাংসপিণ্ড অকালে নির্গত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, গান্ধারী অকালে একটা কুষ্মাণ্ড প্রসব করেছেন। এ অকালকুষ্মাণ্ড থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য দায়ী দুর্যোধন, দুঃশাসন প্রমুখসহ কুলবিনাশী শতপুত্রের জন্ম হয়। বস্তুত মহাভারতের এ কাহিনির অনুষঙ্গে বাংলা শব্দসম্ভারে অকালকুষ্মাণ্ড শব্দের প্রবেশ। যার অর্থ কাণ্ডজ্ঞানহীন, অপদার্থ, অদক্ষ, অনিষ্টকারী বা মূর্খ। মহাভারতের অকালকুষ্মাণ্ডের ন্যায় বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অকালকুষ্মাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ও কর্মকাণ্ড তেমন মারাত্মক না-হলেও কাণ্ডজ্ঞানহীনতার জন্য কোনো আধুনিক অকালকুষ্মাণ্ড যেকোনো সময় নিজের বা অন্যের বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে।

অকালবোধন
‘অকালবোধন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অসময়ে কাজ আরম্ভ করা। সংস্কৃত ‘অকাল’ ও সংস্কৃত ‘বোধন’ শব্দের মিলনে অকালবোধন শব্দের উৎপত্তি। অকাল শব্দের অর্থ অসময়ে, নির্ধারিত সময়ের বাইরে এবং বোধন শব্দের অর্থ জাগানো। শব্দটির রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ : অ-কাল {√কল্ (গণনা করা) + অ (ঘঞ্), করণবাচ্য} + বোধন {√বুধ্ (জানা) + অন, ভাববাচ্য}। অকালে বোধন = অকালবোধন। এটি সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে অসময়ে আরাধ্য দেবতার নিদ্রাভঙ্গ বা আহ্বান করা বা অসময়ে জাগরণ। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে রাবণকে বধ করার উপযুক্ত শক্তি লাভের জন্য রামচন্দ্র অকালে তথা শরৎকালের আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার বোধন বা নিদ্রাভঙ্গ করেছিলেন। এই নিদ্রাভঙ্গ থেকে ‘অকালবোধন’ বাগ্ধারাটির উৎপত্তি। এ নিদ্রাভঙ্গের কারণে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, দুর্গাপূজার আদি সময় হিসাবে বসন্তকাল নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু অকালবোধনের কারণে বাংলাদেশসহ অনেক স্থানে এটি শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয়।


অকুণ্ঠ
‘অকুণ্ঠ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অকাতর, অসঙ্কুচিত, অব্যাহত, অপ্রতিহত, নিঃশঙ্ক প্রভৃতি। সংস্কৃত ভাষা হতে আগত এই শব্দটি বাংলায় অনেক পরিবর্তন ও অর্থসম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় অকুণ্ঠ শব্দের অর্থ : তীক্ষè বা ধারালো। অর্থাৎ যা ভোঁতা নয়, যাতে মরিচা পড়েনি; যা সহজে অন্যকে কর্তন করতে পারে, খণ্ডিত করতে পারে তা-ই অকুণ্ঠ। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় অকুণ্ঠ শব্দের অর্থ অকাতর, অসঙ্কুচিত, অব্যাহত, অপ্রতিহত, নিঃশঙ্ক প্রভৃতি। এমন অর্থ পরিবর্তনের কারণ কী? যা ধারালো ও তীক্ষè তা অকাতরে বা নির্ভীকচিত্তে অন্যকে কর্তন করতে পারে। সংস্কৃত অকুণ্ঠ শব্দের এ যোগ্যতাকে বাংলা বিচক্ষণতার সঙ্গে ‘অকুণ্ঠ’ অর্থে ধারণ করে নিয়েছে। সংস্কৃত ‘অকুণ্ঠ’ বসে যন্ত্রপাতির আগে কিন্তু বাংলা ‘অকুণ্ঠ’ বসে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ, সোহাগ, আদর, ভালোবাসা, সমর্থন প্রভৃতি শব্দের আগে। এসব শব্দের আগে ভোঁতা বা মরচে-পড়া কোনো বিশেষণ উপযুক্ত নয়। প্রেম-ভালোবাসা ও আদর-সোহাগ তীক্ষè না-হলে কি চলে! ‘নাপিত অকুণ্ঠ ক্ষুর দিয়ে পরম আদরে শিশুটির চুল ছেঁটে দিল’ এমন কথা বাংলায় কেউ বলে না। সংস্কৃত ভাষায় বলে। বাঙালিরা বলতে পারেন, ‘বিরোধী দল অকুণ্ঠচিত্তে সরকারি দলকে সমর্থন দিল।’ সংস্কৃত ভাষায় অবশ্য এ বাক্যটি কেউ বলবে না। কারণ সংস্কৃত ‘অকুণ্ঠ’ আর বাংলা ‘অকুণ্ঠ’ প্রায়োগিক দিক থেকে ভিন্ন। তবে এ পরিবর্তনের কারণ আছে। বাঙালিদের ভালোবাসা-দাতাদের হুজুগে চরিত্রের মতোই বিস্ময়কর। প্রকাণ্ড ভালোবাসার প্রবল টান দুদিন পরই ক্ষুরের মতো তীব্র ব্যথায় কাটতে থাকে।

অক্ষয়বট
‘অক্ষয়বট’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষয় পরমায়ু, প্রাচীন ব্যক্তি, অতি-বয়স্ক জ্ঞানী ব্যক্তি প্রভৃতি। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত অক্ষয়বট হতে শব্দটির উৎপত্তি। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ব্যাসকুণ্ডের পশ্চিম পাড়ে এবং ভৈরব মন্দিরের পাশে একটি বিশাল বটবৃক্ষ রয়েছে। এটি ভক্তদের কাছে অক্ষয়বট নামে পরিচিত। ভারতীয় পুরাণ মতে, গয় ছিলেন একজন ধার্মিক রাজা। তাঁর পিতার নাম ছিল অমূর্তরয়। তিনি যজ্ঞ-আহুতির অবশিষ্টাংশ আহার করে শতবর্ষ উপাসনা করেন। এতে ভারতবর্ষের তিন জন দেবতার মধ্যে অগ্রগণ্য অগ্নিদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রার্থনামতে তাঁকে বেদ অধ্যয়ন করার অধিকার দেন। অগ্নির বরে ইনি পৃথিবীর উপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন। এরপর তিনি বিশাল এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। এই যজ্ঞকালে একটি বটবৃক্ষ চিরজীবী হয়। এই চিরজীবী বটবৃক্ষটি অক্ষয়বট নামে পরিচিত। মূলত এ কাহিনি থেকে বাংলা শব্দ ‘অক্ষয়বট’-এর উৎপত্তি। বাংলায় এখন ‘অক্ষয়বট’ বলতে কোনো বটবৃক্ষ বোঝায় না। দীর্ঘজীবী, প্রাচীন ব্যক্তি প্রভৃতি বোঝায়।

অক্ষৌহিণী (অক্ষ + ঊহিনী)
পুরাণ মতে পদাতিক, অশ্ব, হস্তী ও রথ মিলিয়ে ২১৮৭০০ সৈন্যে এক অক্ষৌহিণী। ১০৯৩৫০ পদাতিক, ৬৫৬১০ অশ্ব, ২১৮৭০ হস্তী, ২১৮৭০ রথ এই সংখ্যক চতুরঙ্গ সেনাদলকে ১ অক্ষৌহিণী বলে।

অগস্ত্য যাত্রা
শব্দটির অর্থ চিরকালের জন্য প্রস্থান, জন্মের মতো বিদায়। মহাভারতের অন্যতম চরিত্র অগস্ত্য মুনি, তার শিষ্য বিন্ধ্য পর্বত ও সূর্যদেব ‘অগস্ত্য যাত্রা’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎস-কাহিনির সঙ্গে জড়িত। সূর্যদেব তাঁর যাত্রাপথে উদয়াস্তকালে নিত্য সুমেরু পর্বত প্রদক্ষিণ করেন। একদিন বিন্ধ্য পর্বতের বাসনা হলো, সূর্যদেব তাঁকেও ওইভাবে প্রদক্ষিণ করুক। সূর্য তা মানলেন না। সূর্যের আচরণে বিন্ধ্য পর্বত প্রচণ্ড রেগে যান। তিনি স্বীয় দেহ বর্ধিত করে সূর্যের গতিপথ আটকে দেন। বিপর্যয়ে পড়ে যায় পৃথিবী। দেবতা, মানুষ, গাছপালা সবাই সঙ্কটে নিপতিত হয়। বিন্ধ্যের এ সর্বনাশা কাণ্ডে সন্ত্রস্ত দেবতারা বিন্ধ্যগুরু অগস্ত্য মুনির শরণাপন্ন হন। অগস্ত্য মুনি ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে বিন্ধ্যের নিকট উপস্থিত হন। বিন্ধ্য গুরুকে প্রণাম করার জন্য ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে রাখেন। অগস্ত্য বিন্ধ্যকে বললেন : “আমি যাচ্ছি, যতক্ষণ ফিরে না-আসি ততক্ষণ তুমি যে অবস্থায় আছ, সে অবস্থায় থাকবে।” শিষ্যকে নির্দেশ দিয়ে অগস্ত্য মুনি দক্ষিণাপথের দিকে যাত্রা করলেন। অগস্ত্য গেলেন তো গেলেন আর ফিরলেন না। সূর্যের গতিপথ মুক্ত হলো। মহাভারতের অগস্ত্য মুনির এ যাত্রা হতে ‘অগস্ত্য যাত্রা’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি।


অগ্নিকোণ
পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের মধ্যবর্তী কোণ। ওই কোণের দিক্্পাল অগ্নি, তাই এ দিকের নাম অগ্নিকোণ। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষের তিন জন অগ্রগণ্য দেবের মধ্যে অগ্নি ছিলেন অন্যতম। ঋগ্বেদ-সংহিতায় অগ্নি সম্পর্কে যতগুলো সূক্ত আছে, ইন্দ্র ভিন্ন অন্য কোনো দেব সম্পর্কে তত সূক্ত নেই। অগ্নির ত্রিমূর্তি। যথা : আকাশে সূর্য, অন্তরীক্ষে বিদ্যুৎ এবং পৃথিবীতে অগ্নি।

অগ্নিপরীক্ষা
‘অগ্নিপরীক্ষা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা, ভয়াবহ সমস্যা প্রভৃতি। তবে অগ্নিপরীক্ষা বাগ্্ভঙ্গির মূল অর্থ হলো আগুনে পুড়িয়ে বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। অনেক ধাতু আছে যা আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হয়, সেটি আসল নাকি নকল। বস্তুত এ পরীক্ষাই হলো অগ্নিপরীক্ষা। অনেক প্রাচীনকাল থেকে এটি প্রচলিত ছিল। তবে বাংলা ভাষায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’ কথাটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। মূল্যবান কোনো ধাতুকে আগুনে দিয়ে যাচাই করার জন্য শব্দটির ব্যবহার বাংলায় নেই। মানুষের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত বিপদ-আপদ বা ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে মুক্ত হওয়ার কঠিন পরীক্ষা বোঝাতে অগ্নিপরীক্ষা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন ভারতে কোনো নারীর সতীত্ব বা পবিত্রতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হলে তাকে আগুনে পোড়ানো হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল স্ত্রীলোকটি পবিত্র হলে আগুন তাকে স্পর্শ করবে না। বস্তুত এটি ছিল সম্পূর্ণ কুসংস্কার, তবে কুসংস্কার হলেও প্রাচীন ভারতীয় সমাজে এর প্রচলন ছিল। রামায়ণ মহাকাব্যে রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতার অগ্নিপরীক্ষা এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। রাক্ষসরাজ রাবণ সীতাকে অপহরণ করে রাবণপুরীতে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন রাবণপুরীতে অবস্থান করতে বাধ্য হওয়ায় সীতার চরিত্র সম্পর্কে রামচন্দ্র ও প্রজাগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় সীতা অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন। অগ্নি তাকে যথামর্যাদায় অক্ষতভাবে ফিরিয়ে দেয়।

অগ্নিপুরাণ
প্রথমে অগ্নিদেবতাগণের মুখ হতে নির্গত বলে এর নাম অগ্নিপুরাণ। মহামুনি বশিষ্ঠকে ব্রহ্মজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য অগ্নিদেবের মুখনিঃসৃত অষ্টাদশ মহাপুরাণের অষ্টম পুরাণ ‘অগ্নিপুরাণ’ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থে ১৫,৪০০টি শ্লোক রয়েছে।

অগ্ন্যুৎপাত
‘অগ্ন্যুৎপাত’ (অগ্নি + উৎপাত) শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত লাভা বা জ্বলন্ত পদার্থের ভূমিতে পতন। অর্থ দেখে বোঝা যায়, কেবল আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হয়। তবে এর মূল অর্থ শুধু এটাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো : আগুনের উৎপাত। যেখানে আগুনের উৎপাত সেখানে অগ্ন্যুৎপাত। একসময় অগ্ন্যুৎপাত বলতে বোঝাত আকাশের অগ্নি থেকে সৃষ্ট উৎপাত। এ অর্থে বজ্রপাত, বিজলি-চমক, উল্কা, ধূমকেতু প্রভৃতি অগ্ন্যুৎপাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এখন অগ্ন্যুৎপাত বলতে এর কোনোটাই বোঝায় না। শব্দটির মূল অর্থ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে গিয়েছে।

অগ্রসর
অগ্রসর = অন্গ্ ও সরণ অর্থাৎ যার পরে আর গমন নেই। মূলত অগ্ (রহে যাতে) অর্থ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যে আগে আগে সরে বা যে আগে আগে যায় সেটিই অগ্রসর। এগোনো অর্থে শব্দটি বহুল প্রচলিত। ইংরেজি ‘ধমমৎবংংড়ৎ’ শব্দটি ‘অগ্রসর’ শব্দের সহোদর বলে মনে হয়। পার্থক্য কেবল এই যে, ‘অগ্রসর’-এর দর্শক থাকে ‘অগ্রসর’-এর পেছনে; অন্যদিকে ‘ধমমৎবংংড়ৎ’-এর দর্শক থাকে ‘ধমমৎবংংড়ৎ’-এর সামনে। ‘আগ্রাসন’ ও ‘ধমমৎবংংরড়হ’ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়।

অঙ্ক
√অঙ্ক্ + অ (অচ্্) ণ; অঙ্ক্ + অ (অচ্্) ক। এর অর্থ অস্তিত্বের রহস্যরূপ কৃত যাতে, যার দ্বারা (কোনো সত্তাকে) অন্্ করে রাখা হয়, লক্ষণ, চিহ্ন, দাগ, কলঙ্ক, রেখা, আঁক, মান, আঁকড়া, বক্রভাব, বাঁক ও সধঃযবসধঃরপং প্রভৃতি অর্থে অঙ্ক শব্দ ব্যবহৃত হয়। ‘কোনো সত্তাকে বা অস্তিত্বকে অন্ করে রাখে’ বলে চিহ্ন, দাগ, রেখা, নাটকের অঙ্ক, আঁক এবং ছোটদের যে কোলে রাখা হয় এসব কিছুকে অঙ্ক বলা হয়। নাটকের এক একটি অধ্যায় নাটকের বিষয়-কে কোলে রাখার মতো অন্্ করে রাখে বলে তাদের নাটকের অঙ্ক বলা হয়। অঙ্কন বা অঙ্কিত শব্দ থেকে অঙ্ক (সধঃযবসধঃরপং) শব্দের উৎপত্তি। অঙ্কিত বলতে এমন কিছু বোঝায় যা অঙ্কন করা হয়েছে বা আঁকা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘অঙ্ক-অন্্’ করা মানে দাগ দিয়ে চলা; আর তাতে হিসাব বা গণনাও হয়ে যায়। তাই অঙ্কন থেকে অঙ্ক। নিরক্ষর মানুষরা একসময় এক এক ক্ষেপ মাল এনে ফেলতেন, আর দেয়ালে দাগ দিতেন। এতে তাঁদের কাজের অঙ্ক কষাও হয়ে যেত। সেকালে এভাবে আঁকার মাধ্যমে গণনার উদ্ভব হয়েছিল বলে সধঃযবসধঃরপং-কে অঙ্ক বলা হয়।

অঙ্গ
শব্দের আভিধানিক অর্থ শরীর। যা কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত তা-ই অঙ্গ। ভারতীয় পুরাণের বলিরাজের ক্ষেত্রজ পুত্র ‘অঙ্গ’। তাঁর অধিকৃত রাজ্যসমূহ অঙ্গদেশ বা অঙ্গজ নামে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ অঙ্গ-এর সঙ্গে যা যুক্ত ছিল সেটিই অঙ্গজ।

অজাতশত্রু
বাংলা ভাষায় ‘অজাতশত্র“’ শব্দের আভিধানিক অর্থ যার কোনো শত্র“ জন্মায়নি। ভারতীয় পুরাণ থেকে শব্দটির উৎপত্তি। উপনিষদে ‘অজাতশত্র“’ নামের এক রাজা ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল বারানসি। মহর্ষিগণ তাঁকে ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ে উপদেশ দিতে আসেন, কিন্তু রাজার ব্রহ্মজ্ঞান দেখে মহর্ষিগণই শেষ পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে পড়েন। ব্রহ্মজ্ঞানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঋদ্ধ। তাঁর কোনো শত্র“ ছিল না। তাই বাংলায় শত্র“হীন কোনো লোক বোঝাতে বলা হয় অজাতশত্র“।

অঞ্চল
অঞ্চ্ + অল। অস্তিত্বের চ্-অন (আঁচ) যে পর্যন্ত গিয়ে নিজ পরিধিতে লয় প্রাপ্ত হয়। অথবা যা প্রান্ত-প্রাপ্ত হয়। আঁচল, দেশ, প্রদেশ, ভূভাগ, বস্ত্রান্ত, এলাকা প্রভৃতি অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। রেখা বা অস্তিত্ব যে পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে সে পর্যন্ত তার বৃত্তের শেষ সীমা। একজন স্ত্রীলোকের অস্তিত্বের শেষ সীমা হলো তার আঁচল, যেখানে ধরতে পারলে তার ‘অঞ্চল’ বা বস্ত্রান্তে টান পড়ে। একজন রাজা বা ভূস্বামীর অস্তিত্বেও শেষ সীমা হলো তার রাজ্যের প্রান্তসীমা। সেখানে হাত দিলে রাজার অঞ্চলে হাত পড়ে, তার অস্তিত্ব ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ অঞ্চল বলতে বোঝায় বাংলাদেশিদের স্বাধীন অস্তিত্ব যে পর্যন্ত প্রসারিত রয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রে একটি সক্রিয় অস্তিত্ব রয়েছে, তার সক্রিয়তার এলাকা যে পর্যন্ত বিস্তৃত সে পর্যন্ত তার অঞ্চল। গ্রামাঞ্চল, বনাঞ্চল, শহরাঞ্চল, অঞ্চলপ্রধান, নগরাঞ্চল প্রভৃতি শব্দগুলো মূলত ‘অঞ্চল’ শব্দেরই শুদ্ধ-অশুদ্ধ প্রয়োগ।

অঞ্জলি
শব্দটির আভিধানিক অর্থ করপুট, যুক্তকর, হাতজোড় করে নৈবেদ্য প্রদান প্রভৃতি। একসময় গ্লাস বা পাত্রাদির এত প্রচলন ছিল না। নদী বা পুকুরের পানি বিশুদ্ধ ছিল। তখন অধিকাংশ মানুষ নদী বা পুকুর হতে বা বালতির পানি দুই হাত জড়ো করে তুলে পান করতেন। এভাবে পানি পান করার সময় দুই হাতের পাঞ্জা সামান্য বেঁকে গিয়ে একটা বিশেষ আধারের আকৃতি ধারণ করে। মূলত এ আকৃতিটাই হচ্ছে অঞ্জলি। অঞ্জলি সাধু ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ। এর চলিত রূপ হচ্ছে ‘আঁজলা’। অঞ্জলির ব্যবহার শুধু হাত জড়ো করে জলপানে নয়। এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রূপকার্থে বহুল ব্যবহৃত একটি মাধুর্যময় শব্দ। যেমন শ্রদ্ধাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, বর্ণাঞ্জলি প্রভৃতি। অঞ্জলি শব্দটি মূলত প্রায়োগিক ভাবনার চেয়েও আলঙ্করিক অর্থে অধিক ব্যবহৃত হয়।

অতিকায়
শব্দটির আভিধানিক অর্থ বিশাল, প্রচণ্ড, বিকট প্রভৃতি। ভারতীয় পুরাণ হতে বাংলায় ‘অতিকায়’ শব্দটির আগমন ঘটে। রাবণের পুত্রগণের মধ্যে একজন ছিলেন পর্বতের মতো বিশাল আকারের। বিশাল দেহ ছিল বলে তাঁকে ‘অতিকায়’ নামে অভিহিত করা হয়।

অতিথি
যার অত্ গতি (ক্ষণকালের জন্য) থেমে গেছে সে-ই অতিথি। যার তিথি নেই; যার স্থিতি নেই; যে যায়, থাকে না; অনিত্যাবস্থান হেতু যার তিথি বা দিন নেই/আবেশিক, অভ্যাগত, গৃহাগত, আগন্তুক/একরাত্র পরগৃহবাসী ব্রাহ্মণ। মিতাক্ষরা মতে পথিক, শ্রোত্রিয় ও বেদপারগ এই তিন অতিথি। রামচন্দ্রের পৌত্র ও কুশের পুত্র। অতিথি শব্দটি এখনও ‘আমন্ত্রিত-অভ্যাগত’ অর্থে বহুল প্রচলিত। সম্ভবত তিথি অর্থে সেকালের গোষ্ঠীর বা যৌথপরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে (যারা স্থিতি করে) এবং অতিথি অর্থে (যারা স্থিতি করে না) এমন সমাজের পরিদর্শক গোষ্ঠীর প্রত্যেক ব্যক্তিকে বোঝাত। অত্রি (পরিদর্শক) প্রজাপ্রতির কালে, তখনও রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়নি, অথচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোটখাটো বিভাজন ঘটে গেছে, তখন গৃহকর্তার দায়িত্ব ছিল অতিথি সৎকার। আর অতিথির দায়িত্ব ছিল ঘুরে ঘুরে পরবর্তী উৎপাদন কর্মযজ্ঞ কীভাবে চালাতে হবে, প্রত্যেকটি যৌথপরিবার বা গোষ্ঠীকে তার পরমার্শ দেওয়া। এঁরা এক বাড়িতে তে-রাত্তিরের বেশি কাটাতেন না। আচারটি বহু পরেও ব্রাহ্মণদের মধ্যে বহুদিন ধরে কম-বেশি প্রচলিত ছিল।

অথর্ববেদ
এটি চতুর্থ বেদ নামে পরিচিত। কথিত হয়, ব্রহ্মার উত্তর দিকের, মতান্তরে পূর্ব দিকের, মুখ হতে অথর্ববেদ প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকে এটাকে বেদ বলে গণ্য করেন না। মনুসংহিতা ও অমরকোষে ঋক, সাম ও যজুঃ এ তিন বেদের উল্লেখ আছে। তবে ছান্দোগ্য উপনিষদে অথর্ববেদকে চতুর্থ বেদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চতুর্থবেদ প্রধানত নয় ভাগে বিভক্ত। তবে এখন শৌনশাখা ছাড়া আর কোনো ভাগ পাওয়া যায় না। অথর্ববেদের ব্রাহ্মণ-ভাগের নাম গো-পথব্রাহ্মণ। এতে ৭৩০টি সূক্ত ও ২০টি খণ্ড রয়েছে। যার কিয়দংশ গদ্যে ও কিয়দংশ পদ্যে রচিত।

অধিগ্রহণ ও হুকুম-দখল
আইন বিজ্ঞানে অপয়ঁরংরঃরড়হ আর জবয়ঁরংরঃরড়হ দুটি আলাদা শব্দ। জবয়ঁরংরঃরড়হ অর্থ হুকুমদখল এবং অপয়ঁরংরঃরড়হ মানে অধিগ্রহণ। জবয়ঁরংরঃরড়হ-এর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বল্প সময়ের হুকুমে যানবাহন বা স্থাপনা সাময়িক দখলে নেওয়া হয়। অপয়ঁরংরঃরড়হ-এর ক্ষেত্রে স্থায়ী অধিকারসহ ভূমির মালিকানা গ্রহণ করা হয়। ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ম্যানুয়াল, ১৯৯৭’-এ অপয়ঁরংরঃরড়হ কার্যক্রমকে সর্বত্র ‘অধিগ্রহণ’ বলা হয়েছে। অন্যদিকে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল অধ্যাদেশ ১৯৮২’-তে অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলকে আলাদা কার্যক্রম হিসাবে দেখানো হয়েছে, সুতরাং শব্দদ্বয় পরস্পর বিনিময়যোগ্য বা সমার্থক নয়। কিন্তু জেলাপ্রশাসকের কার্যালয় বা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে খধহফ অপয়ঁরংরঃরড়হ ঙভভরপবৎ-কে ‘ভূমি হুকুমদখল কর্মকর্তা’ এবং খধহফ অপয়ঁরংরঃরড়হ শাখাকে ‘ভূমি হুকুমদখল শাখা’ লেখা হয়। বিষয়টি বিভ্রান্তিকর। আসলে শব্দ দুটি হবে ‘ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা’ এবং ‘ভূমি অধিগ্রহণ শাখা’। শব্দভাণ্ডার বিবেচনায় বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা, এজন্য শব্দচয়ন ও ব্যবহারেও সতর্কতা একটু বেশি প্রয়োজন।


অনঙ্গ
অনঙ্গ শব্দের অর্থ অঙ্গহীন। এ শব্দের উৎপত্তির সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের অন্যতম চরিত্র কন্দর্পের একটি কাহিনি জড়িত। কথিত হয়, পুরাকালে দেবতারা বারবার অসুরদের কাছে পরাজিত হচ্ছিলেন। তারকাসুরের কাছে পরাজিত হয়ে দেবতারা সাহায্যের জন্য ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা জানালেন যে, ধ্যানমগ্ন মহাদেবের ঔরসে যে পুত্র জন্মগ্রহণ করবে সে-ই হবে দেবগণের সেনাপতি এবং তিনিই কেবল তারকাসুরকে শাস্তি দিতে সক্ষম হবেন। এ কথা শুনে কন্দর্প হিমালয়ে গিয়ে পুষ্পধনুতে আকর্ণ টঙ্কার লাগিয়ে কন্দর্প বাণ নিক্ষেপ করেন। পুষ্পবাণের আঘাতে মহাদেবের ধ্যান ভেঙে যায়। ধ্যানভঙ্গ করার কারণে মহাদেব প্রচণ্ড ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন। তাঁর ক্রোধাগ্নিতে কন্দর্প ভস্মীভূত হয়ে যান। সে হতে কন্দর্প অঙ্গহীন বা অনঙ্গ নামে পরিচিত।

অনর্গল
অবিরাম, অনবরত। অনর্গল শব্দের অর্থ অর্গলহীন। যার কোনো অর্গল নেই সেটিই অনর্গল। অর্গল শব্দের অর্থ হলো দরজার হুক বা হুড়কা। হুক বা হুড়কা দরজার অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্র। হুড়কা না-লাগালে দরজার উদ্দেশ্য অর্থহীন হয়ে যায়। হুড়কা দরজার প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করে। এ জন্য অর্গলের আলঙ্করিক অর্থ প্রতিবন্ধক, অন্তরায়, বাধা প্রভৃতি। অনর্গল হলো অর্গলের বিপরীত। সুতরাং অনর্গলের অর্থ হয় অবারিত, প্রতিবন্ধকতাহীন, অন্তরায়বিহীন। দরজায় হুক না-থাকলে যে কেউ, যে কোনো কিছু কোনোরূপ বাধা ব্যতিরেকে অবারিতভাবে যাওয়া-আসা করতে পারে। মুখে যদি অর্গল না থাকে তা হলে যেকোনো কথা অবিরাম গতিতে বেরিয়ে আসে মুখ দিয়ে। দরজার অর্গল না-লাগালে যেমন সবার বাহির-প্রবেশ অবারিত ও অবিরাম হয়ে যায় তেমনি মুখে অর্গল না-থাকলেও তেমনটি ঘটে। এ ধারণার সূত্র ধরে ঘরের দরজার অর্গল বাংলা বাগ্্ভঙ্গিতে উঠে এসেছে।

অনসূয়া
যার অসূয়া নেই তিনিই অনসূয়া। ভারতীয় পুরাণ হতে অনসূয়া শব্দের উৎপত্তি। পৌরাণিক কাহিনি মতে, দক্ষ-প্রজাপতি ও প্রসূতির এক কন্যার নাম ছিল অনসূয়া। তিনি ছিলেন মহর্ষি অত্রির স্ত্রী। তিনি সম্পূর্ণ অসূয়াশূন্য ছিলেন বলে তাঁর নাম হয় অনসূয়া। বাংলা ভাষায় ‘অনসূয়া’ শব্দটি ‘অসূয়া-হীন’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।


অনামিকা
কনিষ্ঠ বা কড়ে আঙুলের পাশের আঙুলটির নাম ‘অনামিকা’। অনামিকা মানে যার নাম নেই। অনামিকা নিয়ে বাংলা ভাষায় বহু গান ও কবিতা রচিত হয়েছে। অনামিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এ আঙুলে আংটি পরা হয়। তাই অনামিকা বিশ্বব্যাপী হর্দ্যকি সম্পর্ক, গভীর প্রেমানুভূতি, প্রবল আবেগ ও মুগ্ধকর রোমাঞ্চের পরিচিহ্ন হিসাবে বিবেচিত। তবে অনামিকা নামের ব্যুৎপত্তি খুব ভয়ানক। কথিত হয়, মহাভারতের অন্যতম চরিত্র মহাদেব শিব একদিন ভীষণ রাগান্বিত হয়ে চতুর্মুণ্ডু ব্রহ্মার একটি মুণ্ডু ঘাড় থেকে খসিয়ে ফেলেন। ভয়ানক এ কাজটি করতে তিনি কোনো অস্ত্র ব্যবহার করেননি। শুধু নিজের অনামিকা দিয়ে মুণ্ডুটি ভূপাতিত করেছিলেন। ক্রোধ তিরোহিত হবার পর মহাদেব অনুতপ্ত হন। তিনি অনুশোচনায় অস্থির হয়ে নিজের আঙুলকে অভিশাপ দিয়ে বললেন : ‘আজ থেকে তুই নাম গ্রহণের যোগ্যতা হারালি।’ এরপর থেকে আঙুলটির নাম হয়ে যায় অনামিকা। আসলেই অনামিকা অভিশপ্ত আঙুল। প্রেমিক বা প্রেমিকার এ আংটি দুজন মানুষকে চিরদিনের জন্য পরস্পর পরস্পরের নিকট অসহনীয় দাসত্বে অনিবার্য করে তোলে।

অনুগীতা
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে জানান, তিনি নিজের বুদ্ধিলোপের কারণে গীতার উপদেশসমূহ ভুলে গিয়েছেন। তাই তিনি শ্রীকৃষ্ণকে আবার গীতার উপদেশবাণীসমূহ শোনাবার অনুরোধ করেন। অর্জুনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীকৃষ্ণ জানান, তিনি গীতার বাণী প্রচার করার সময় যোগযুক্ত হয়ে যে ব্রহ্মতত্ত্ব প্রচার করেছিলেন, তা পুনরায় বলা সম্ভব নয়। তৎপরিবর্তে তিনি এক সিদ্ধ ব্রাহ্মণ ধর্মাত্মা কশ্যপকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা অর্জুনকে বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ সে সব বিবিধ উপাখ্যান প্রসঙ্গে সবিস্তারে যে অধ্যাত্মতত্ত্ব বিধৃত করেছেন সেটি অনুগীতা নামে পরিচিত।

অনুগ্রহ
কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ অনুযায়ী অনুগ্রহ শব্দের বিশ্লেষণ হচ্ছে : অনু + গ্রহ্ + অ (অপ্); যাহাতে অল্প গ্রহণ আছে। এর আভিধানিক অর্থ প্রসাদ, কৃপা, আনুকূল্য, দরিদ্রাদিপোষণ, পালন, পোষণ, রক্ষণ ইত্যাদি এবং ইংরেজি প্রতিশব্দ শরহফহবংং. অল্প (অনু/অণু) গ্রহণ থেকে অনুগ্রহ শব্দের উৎপত্তি। ভারতের মন্দিরকেন্দ্রিক সভ্যতায় চাষের জমি ছিল মন্দিরের। চাষি জমি চাষ করে মন্দিরের পাওনা ধান-চাল নিয়ে মন্দিরে পৌঁছলে এবং অনাবৃষ্টি ইত্যাদির কথা বললে, পুরোহিত অনেক সময় পাওনা পুরো বস্তা ধান-চাল না-নিয়ে, প্রতিবস্তা থেকে দু-এক মুঠো গ্রহণ করে বলতেন : ‘নিয়ে যা, বউছেলেমেয়ে নিয়ে ভালো করে চাষ-বাস কর।’ তখন চাষিরা বলত : মন্দির অনু (অণু) গ্রহণ করেছে বা অল্প গ্রহণ করেছে। এ অনু/অল্প গ্রহণ বাগ্্ভঙ্গি থেকে অনুগ্রহ শব্দের উৎপত্তি।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!