বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

পঞ্চম অধ্যায়
এ ঐ ও ঔ


ঐতরেয়
‘ঐতরেয়’ ঋগ্বেদের শাখা বিশেষ। মহিদাস ঐতরেয় নামক এক ঋষি এ শাখার প্রবর্তক। ইতরার পুত্র বলে এ ঋষির নাম ঐতরেয় এবং ঐতরেয় মুনির দ্বারা প্রণীত বলে এর নাম ঐতরেয়। ঐতরেয় শাখায় ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় আরণ্যক ও ঐতরেয় উপনিষদ পাওয়া যায়। এটি একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। বঙ্গদেশের বিভিন্ন স্থানের ভৌগোলিক বিবরণও এখানে পাওয়া যায়।

ঐশ্বর্য
সংস্কৃত হতে আগত ‘ঐশ্বর্য’ শব্দটির বর্তমান অর্থ ‘বৈভব’ বা ‘ধনসম্পত্তি’। তবে এর মূল অর্থের সঙ্গে ধনসম্পদের কোনো যোগসূত্র ছিল না। ঈশ্বর থেকে ‘ঐশ্বর্য’ শব্দটির উৎপত্তি। সংস্কৃত ভাষায় ঐশ্বর্য শব্দের অর্থ ঈশ্বরের ভাব বা কর্ম; অলৌকিক গুণ বা শক্তি। ধনসম্পদ দিয়ে ঈশ্বরের ন্যায় অলৌকিক বিষয় সম্পাদন করা যায় বলেই হয়তো বাংলায় ‘ঐশ্বর্য’ শব্দটি ধনসম্পত্তি প্রকাশে প্রচলিত হয়ে পড়েছে। এটি শব্দের গৌরবহানির একটি চমৎকার উদাহরণ। তবে এখন ঐশ্বর্যের প্রয়োজনীয়তা ঈশ্বরের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।


ওকে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুইগ্ দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডরষষরধস ঐবহৎু ঐধৎৎরংড়হ-এর নির্বাচন প্রচার-কাহিনির সঙ্গে ঙক বাগ্ভঙ্গিটির ব্যুৎপত্তি জড়িত। ঔড়যহ জড়পশ ছিলেন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসনের নির্বাচন-প্রচারে নিয়োজিত অন্যতম একজন। একবার তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। ভাষা ও বানান সম্পর্কে অধিকাংশ বাঙালির মতো বোধশোধহীন একজন কর্মী জড়পশ-এর শ্র“তিলিখনে ধষষ পড়ৎৎবপঃ-এর পরিবর্তে ড়ষষ শড়ৎৎবপঃ লিখে পত্রিকায় পাঠিয়ে দেন। পত্রিকা যথারীতি কোনো পরিবর্তন ছাড়া খবরটি ছাপিয়ে দেয়। এ নিয়ে বেশ কৌতুক করলেও জড়পশ ভাবলেন মন্দ কী, ‘ট্রেড-নেম’-এর ফোনেটিক বানানের মতো এটি একটা নির্বাচন স্লোগান হয়ে যাক। এরপর ঙষষ কড়ৎৎবপঃ-এর আদ্যাক্ষর দুটো নিয়ে গড়ে ওঠে ঙক. নির্বাচন-প্রচারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঙক.
অনেকে মনে করেন ঙক শব্দটি প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের উদ্ভাবিত (ঙরষ/ঙৎষ) কড়ৎৎবপঃ এ লড়পঁষধৎ ংঢ়বষষরহম থেকে এসেছে। ঙক-এর বিশ্বময় দ্রুত পরিব্যাপ্তির আর একটি কারণ আছে। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গধৎঃরহ ঠধহ ইঁৎবহ-এর জন্ম হয়েছিল নিউইয়র্কের করহফবৎ ঐড়ড়শ নামক স্থানে। তাঁর ডাক নাম ছিল ঙষফ করহফবৎ ঐড়ড়শ। তাঁর নামের দুটো আদ্যাক্ষর নিয়ে ঙক নামের একটি ক্লাব গঠন করা হয়। ঙক ক্লাবটি ভ্যান ব্যারেনের নির্বাচন-প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিল। এভাবে ঙক শব্দটি আবার নতুন শক্তিতে প্রবল হয়ে ওঠে। মার্টিন ভ্যান ব্যারেন ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে পরাজিত হলেও ঙক শব্দটি পুরো বিশ্ব জয় করে নেয়।
ওডিকোলন
‘ওডিকোলন’ একপ্রকার সুগন্ধি সুরাসার বিশেষ। ওডিকোলন শব্দের মূল অর্থ কোলন নদীর জল। ফরাসি ভাষায় নামকরণ হলেও এ সুরভিত নির্যাসটি প্রথম জার্মানির কোলন্ নদীর তীরে অবস্থিত কোলন্ শহরে প্রস্তুত হয়। তাই নাম ওডিকোলন বা কোলন নদীর জল। ফরাসি উচ্চারণ ও (অর্থাৎ জল) দ্য কোলন্ (অর্থাৎ কোলনের)।

ওতপাতা
‘ওতপাতা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ আক্রমণের জন্য বিচক্ষণতার সঙ্গে অপেক্ষা, আক্রমণ করার নিমিত্ত সতর্ক পদক্ষেপ। সংস্কৃত ‘ওতুবৎ’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ওতপাতা’ শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃতে ‘ওতু’ শব্দের অর্থ বিড়াল। সুতরাং ‘ওতুবৎ’ শব্দের অর্থ বিড়ালের মতো। তাই ‘ওতপাতা’ শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হয় বিড়ালের মতো পেতে থাকা। বিড়াল শিকার ধরার জন্য সতর্ক পদক্ষেপে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করে কিংবা শিকারির দিকে এগিয়ে যায়। বিড়ালের এ কৌশল অবলম্বন করে ইঁদুরের মতো চঞ্চল ও দ্রুতগামী প্রাণীকেও সহজে ধরে ফেলে। বস্তুত সংস্কৃত ‘ওতুবৎ’ শব্দের অর্থে বিড়ালের শিকার-ধরার কৌশলকে যোজিত করা হয়েছে। ফলে এর অর্থ দাঁড়িয়েছে আক্রমণের জন্য সতর্কতার সঙ্গে অপেক্ষা।

ওতপ্রোত
‘ওতপ্রোত’ শব্দটির প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ বিশেষভাবে জড়িত, পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত, আন্তঃপরিব্যাপ্তি, পরস্পর সংযুক্ত, পরস্পর অন্তর্ব্যাপ্ত প্রভৃতি। ‘ওত’ ও ‘প্রোত’ শব্দ দুটোর সমন্বয়ে সংস্কৃত ‘ওতপ্রোত’ শব্দের সৃষ্টি। সংস্কৃত ভাষায় ‘ওতপ্রোত’ একটি চিত্রকল্পময় রূপক বাগ্্ভঙ্গি। এবার ‘ওত’ ও ‘প্রোত’ অর্থ কী তা জানা যাক। কাপড়ের টানার সুতোকে বলা হয় ‘ওত’ অন্যদিকে পড়েনের সুতোকে বলা হয় ‘প্রোত’। সুতরাং ওতপ্রোত শব্দের অর্থ দাঁড়ায় টানা ও পড়েনের সুতোতে যা পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। একটি নকশা যা ‘ওত’ ও ‘প্রোত’ উভয়ের সঙ্গে পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে গ্রথিত হয়ে ফুটে থাকে সেটিই ওতপ্রোত। বাংলায় সংস্কৃত ‘ওতপ্রোত’-এর প্রায়োগিক অর্থ ভিন্ন হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ অভিন্ন।

ঔষধি
ভারতীয় পুরাণ মতে, হিমালয়ে স্বর্ণময় ঋষভ পর্বত ও কৈলাস পর্বতের মাঝে একটি পর্বত রয়েছে। এটি ঔষধি পর্বত। এ পর্বতের শীর্ষদেশে মৃত-সঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী ও সন্ধানী এ চার প্রকার মহৌষধি পাওয়া যেত। হনুমান, রাম-রাবণের যুদ্ধকালীন দু-বার ঔষধি পর্বত উৎপাটন করে আনেন। প্রথমবার ঔষধির গন্ধ শুকিয়ে রাম-লক্ষ্মণ শল্য-মুক্ত ও বানরও সুস্থ হয়। পরে লক্ষ্মণ রাবণের শক্তিশেলে মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলে হনুমান ঔষধি চিনতে না-পেরে ঔষধি-শৃঙ্গ পুরোটাই তুলে নিয়ে আসেন। ঔষধি পর্বতের আর এক নাম গন্ধমাদন। এ পর্বতের গন্ধ সকলকে মত্ত করে দেয় তাই এর নাম গন্ধমাদন।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!