বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

কলহ
‘কলহ’ সংস্কৃত হতে আগত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় শব্দটির অর্থ যুদ্ধ। তবে ‘কলহ’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ ঝগড়া, বিবাদ, বচসা, বাগবিতণ্ডা প্রভৃতি। ‘কল’ মানে শব্দ, ‘অহ’ মানে হনন করা। সুতরাং ব্যাকরণগতভাবে শব্দটির মূল অর্থ ছিল যা মনোহর ধ্বনি হনন করে। আসলেই কলহ মনোহর ও মধুময় ধ্বনি হনন করে মানুষের কানে কষ্ট ও যাতনা বর্ষণ করে।

কল্প
পুরাণ মতে, পৃথিবীর সাধারণ মানুষের ৪৩২ কোটি বছর ব্রহ্মার এক অহোরাত্র। ৪,৩২,০০,০০,০০০ বছর ব্রহ্মার একদিন এবং এ পরিমাণ সময়ে ব্রহ্মার এক রাত। দিনে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয় এবং রাতে লয়প্রাপ্ত হয়। এ সৃষ্টি ও লয়কে ‘কল্প’ বলা হয়। এক সপ্ততি দৈবযুগে এক মন্বন্তর এবং চতুর্দশ মন্বন্তরে এক কল্প। এই কল্পই হচ্ছে বিধাতার দিন।

কল্পতরু
কল্পতরু = কল্প + তরু, যে তরু (ব্যবস্থা) পরিকল্পনা করে সৃজন করা হয়েছে, বাঞ্ছিতবস্তুপ্রদ নন্দনস্থিত দেবতরু বিশেষ, কল্পবৃক্ষ, সর্ব-পুরুষার্থোপায়, প্রার্থিতবস্তুদাতা, অতিবদান্য, কল্পতরুর ন্যায় সম্পদসমৃদ্ধ, দানে পটু কল্পতরুর ন্যায় ক্রিয়ামাত্রে নিপুণ। এটি ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি বৃক্ষ। সমুদ্রমন্থন হতে উত্থিত এ বৃক্ষ কল্পাস্ত হলে পুনরায় সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়। এ জন্য এর নাম কল্পতরু বা অভীষ্টদায়ক বৃক্ষ। কল্পতরুর নিকট কোনো কিছু প্রার্থনা করলে অভীষ্ট লাভ হয়। তরুর আর একটি অর্থ হলো সরকারি ব্যবস্থা যার শাখা-প্রশাখা রয়েছে, যেখানে গিয়ে আবেদন করে প্রার্থনা করতে হয়। আবেদন করলে প্রার্থিত বস্তু বা বিষয় পাওয়া যায়। এরই প্রতীকী আচরণ করা হয় অশ্বত্থবৃক্ষ ও বটবৃক্ষে সুতো বেঁধে। এ রীতি এখনও গ্রামঞ্চলে প্রচলিত আছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, সমাজতান্ত্রিক সরকারি ব্যবস্থাকে অশ্বত্থবৃক্ষ ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বটবৃক্ষ বলে। আধুনিক ভাষায় যাকে ‘প্রাশাসনিক প্রতিষ্ঠান’ বলা হয় সেকালে তাকেই ‘কল্পতরু’ বলা হতো। এ প্রতিষ্ঠানগুলো ভেবে-চিন্তে পরিকল্পনা করে সৃজন করা হয়েছে। তাই এগুলোকে কল্পতরু বলে।

কলি
‘কলি’ যুগপ্রবর্তক দেবতা। তাঁর নামানুসারে বর্তমান যুগের নাম কলিযুগ। ৪,৩২,০০০ বছর পৃথিবী এ দেবতার অধিকারে থাকবে। এ যুগের শেষে ভগবান বিষ্ণু কল্কিরূপে আবির্ভূত হবেন। দ্বাপরের অবসানে ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ হতে অধর্মের সৃষ্টি হয়। অধর্মের স্ত্রীর নাম মিথ্যা। মিথ্যার গর্ভে ও অধর্মের ঔরসে দম্ভ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। দম্ভ নিজ ভগিনী মায়াকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের ‘লোভ’ নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। লোভ নিজের ভগিনী নিবৃতিকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ক্রোধ নামের এক পুত্র ও হিংসা নামের এক কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ক্রোধ নিজ ভগিনী হিংসাকে বিবাহ করেন। তাঁদের কলি নামের এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। কলি নিজের ভগিনী দিরুক্তিকে বিয়ে করেন। তাদের ‘ভয়’ নামের এক পুত্র এবং ‘মৃত্যু’ নামের এক কন্যার জন্ম হয়। এ কলিই ‘কলি’ যুগের প্রতিষ্ঠাতা।

কলিযুগ
চার যুগের শেষ যুগ। কলি এ যুগের অধিষ্ঠাতা। ১২০০ দিব্য বছর অর্থাৎ ১২০০  ৩৬০ = ৪,৩২,০০০ বছর এর পরিমাণ। ৩১০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এ যুগের শুরু হয়েছে। কলিযুগ অধর্মের যুগ। এ যুগে ধর্ম শুধু এক-চতুর্থাংশ থাকবে। এ যুগে ত্রিপাদ পাপ ও একপাদ পুণ্য। এ যুগের শেষে ভগবান বিষ্ণু কল্কীরূপে জন্মগ্রহণ করে দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করে ধর্মরাজ্য স্থাপন করবেন। এরপর সত্যযুগের সূচনা ঘটবে।

কাইসর/কায়সার
‘কাইসর/কায়সার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্রাট, রাজা, বাদশাহ বা প্রচণ্ড ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ল্যাটিন শব্দ ঈধবংধৎ হতে কাইসর/কায়সার শব্দটির উৎপত্তি। এখন রাজা-বাদশা নেই, তবে ক্ষমতাধর ব্যক্তি আছেন। কেউ রাজা-বাদশার মতো ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী এটি বোঝাতে শব্দটির প্রচলন এখনও আছে। তবে এটি আগের মতো প্রচলিত নয়। একসময় শব্দটির বহুল প্রচলন ছিল।

কাক
সংস্কৃত ‘কৈ’ বা ‘কা’ শব্দের সঙ্গে ‘কন্’ প্রত্যয়-যোগে গঠিত হয়েছে কাক। এর অর্থ ‘যে কৈ কৈ বা কা কা করে’। কাকের সংস্কৃত নাম হচ্ছে বায়স। প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসাবে পরিচিত কাকের ‘বায়স’ নামটি রামায়ণ ও মহাভারতে বারবার এসেছে। ‘বায়স’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘যার বয়স বোঝা যায় না’। কাকের বেলায়ও ব্যাপারটি সত্য। একটু বড় হবার পর কাকের বাহ্যিক চেহারা দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে, বাড়ির পাশে খাম্বার তারে বা গাছের ডালে বসে থাকা কাকটির এখন যৌবন না কি বার্ধক্য চলছে। হিন্দুপুরাণ মতে, মহর্ষি কশ্যপ ও তার স্ত্রী তাম্রার সন্তান কাকী থেকেই পৃথিবীতে সব কাকের জন্ম। অবশ্য পুরাণে যে ভূষণ্ডীর কাকের কথা বলা হয়েছে, সেটা ত্রিকালজ্ঞ। সে এখনও মরেনি, কখন মরবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পৃথিবীকে পাঁচবার জলমগ্ন হতে দেখেছে এই কাক। বারো বার দেখেছে সমুদ্রমন্থন। পরশুরাম ও রামের ছয় বার জন্মগ্রহণের সাক্ষী এই কাক।

কাকতালীয়
‘কাকতালীয়’ এটি একটি বহুলপ্রচলিত শব্দ। মানুষ কথায় কথায় প্রায় সময় বলেন : কাকতালীয়। শব্দটির অর্থ আকস্মিক যোগাযোগজাত কোনো বিষয় বা ঘটনা, হঠাৎ ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনা বা বিষয়, কার্যকরণহীন দুটি ঘটনা। কাক ও তাল থেকে কাকতালীয় বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। কিন্তু কাক ও তাল কেন? একটি কাক তাল গাছের উপর বসল এবং বসামাত্র টুপ্ করে একটা তাল মাটিতে পড়ে গেল। কাকটি না-বসলেও তালটি পড়ত এবং তালটি না পড়লেও কাকটি বসত। কাকের মতো ছোট একটা পাখির তাল গাছে বসার সঙ্গে তাল-পড়ার কোনো যোগসূত্র ছিল না এবং সংগতকারণে থাকতে পারে না। কিন্তু ঘটনাচক্রে তালের পতন ও কাকের বসা দুটোই একসঙ্গে ঘটে গেল। এটাই কাকতালীয়। আসলে প্রকৃত কারণ না-হলেও কোনো বিষয় বা ঘটনাকে অন্য কোনো বিষয় বা ঘটনার অনিবার্য কারণ বলে মনে করাকে বলা হয় ‘কাকতালীয়’।  শিক্ষক কাকতালীয় কী তা বুঝিয়ে দিয়ে ছাত্রকে বললেন : এবার তুমি কাকতালীয় ঘটনার একটা উদাহরণ দাও। ছাত্র বলল : আমার বাবার বিয়ে হলো, সঙ্গে সঙ্গে আমার মায়ের বিয়েও!

কাকবলি
কাক + বলি = কাকবলি। কাককে দেয় বলি, কাককে দেয় অন্নাদি, কাককে দেয় নবান্নের অংশ প্রভৃতি। সম্ভবত আগের যুগে দ্বারে দ্বারে যাচ্ঞাকারী ফেরিওয়ালাকে কিছু পরিমাণ উৎপন্ন দিয়ে দিতে হতো। হয়তো দাম নিয়ে অথবা বিনামূল্যে। সে প্রদত্ত উৎপন্নকে বলা হতো কাকবলি। একসময় গ্রামাঞ্চলে বছরের একটা বিশেষ দিনে কাকের উদ্দেশ্যে রুটি, পিঠা প্রভৃতি গাছের ডালে ডালে ঝুলিয়ে রাখার আচার প্রচলিত ছিল। বাচ্চারা নানা রকম ছড়াগান গেয়ে কাককে খাদ্যবস্তু ভক্ষণের জন্য ডাকত। এটাও কাকবলি। বর্তমানে এমন আচার আর দেখা যায় না।

কাক ভূষণ্ডী
‘কাক ভূষণ্ডী’ বাগ্্ভঙ্গির অর্থ : দীর্ঘজীবী ব্যক্তি, বহুদর্শী অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের প্রসিদ্ধ ত্রিকালজ্ঞ কাক হতে বাগ্ধারাটির উৎপত্তি। কাক ভূষণ্ডী বলতে আসলে ‘ভূষণ্ডী’কেই বোঝায়। ভূষণ্ডী নিজেই কাক; সেখান থেকেই ‘কাক ভূষণ্ডী’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘজীবী ব্যক্তিকে কেন কাক বলা হবে? কারণ, পৌরাণিক এই কাকটির বিশেষত্ব হলো, সে আবহমানকাল জুড়ে বেঁচে আছে। আর সেই আদিকাল থেকে পৃথিবীতে আছে বলে পৃথিবীর সমস্ত ঘটনাই জানে। একবার নাকি কৃষ্ণ, ভূষণ্ডী মানে কাক ভূষণ্ডীকে জিজ্ঞেস করেছিল কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ সম্পর্কে। তখন সে যা বলেছিল, সংক্ষেপে তা এরকম। সত্যযুগের শুম্ভ-নিশুম্ভ যুদ্ধের সময় সে ছিল। কাকদের কাজই তো ময়লা-এঁটো খাওয়া। সেই যুদ্ধের সময়ও নিহত দৈত্যদের রক্ত-মাংস সে খেয়েছিল। তার একদমই কষ্ট হয়নি খেয়ে শেষ করতে। পরে ত্রেতাযুগে লঙ্কাযুদ্ধে সে-সব খেয়ে শেষ করতে তার একটু কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবু সে তা সামলে উঠতে পেরেছিল। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তার কষ্টের সীমা ছিল না।

কাণ্ডজ্ঞান
কাণ্ড + জ্ঞান = কাণ্ডজ্ঞান; কাণ্ড বিষয়ে জ্ঞান থাকে যাতে, কাণ্ডের বোধ, প্রকরণজ্ঞান, বিষয়বোধ, দেশকালপাত্রানুসারে বিষয়বিশেষের কর্তব্যাকর্তব্য- বোধ, পড়সসড়হ ংবহংব প্রভৃতি অর্থে প্রচলিত। কাণ্ড শব্দের আর একটি অর্থ ‘বাণ’, কিন্তু সেটি বাণ নয়, ধন অর্থে প্রচলিত। এ ধন হলো সমাজের সকল রীতিনীতি বা আইনের ব্যবস্থা। তাকে জানলে সব জানা যায়, মানুষের ‘কাণ্ডজ্ঞান’ হয়। অনেকে বলেন, গাছের কাণ্ড থেকে শব্দটির উৎপত্তি। কোনো গাছের কাণ্ড পুরো গাছটি নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো গাছের কাণ্ড হাত দিয়ে মুঠো করে ধরতে পারলে তার শাখা-প্রশাখা সবই অধিকারীর এখতিয়ারে চলে আসে। তাই এর আর এক অর্থ হলো অখণ্ড জ্ঞান। অখণ্ড জ্ঞানের অধিকারী হলেই সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করার যোগ্যতা অর্জিত হয়, খণ্ডজ্ঞানের অধিকারী কেবল শাখা বা প্রশাখার বিষয়ে ভাবতে পারে, তাই তার অনেক ত্র“টি হয়ে যায়। তখন তাকে বলা হয় ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’। তবে প্রশাখার জ্ঞানও মানুষের কাজে লাগে। তাকে বিশেষায়িত জ্ঞান বলা হয়। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে সে বিশেষায়িত বা প্রশাখাজ্ঞানও কোনো কাজে লাগে না, অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে যায়। একজন চক্ষু-বিশেষজ্ঞের যদি পুরো শরীর সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান না থাকে তা হলে তার প্রশাখাজ্ঞান (চক্ষু) রোগীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ চক্ষু শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!