বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

ষষ্ঠ অধ্যায়

কানাঘুষা
‘কানাঘুষা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ গোপন রটনা। এটি একটি মিশ্র শব্দ। বাংলা ‘কান’ ও ফারসি ‘ঘুসা’ শব্দের মিশ্রণে কানাঘুষা শব্দটির উৎপত্তি। ফারসি ‘গুস’ শব্দের অর্থও হচ্ছে কান। সুতরাং কানাঘুষা শব্দের অর্থ হয় : কানকান। ব্যাখ্যা করলে যার অর্থ হয় কান থেকে কানে। বাংলায় এরূপ আর একটি বাগ্্ভঙ্গি আছে। সেটি হচ্ছে কানাকানি। কানে কানে কথা বলাকে বলা হয় কানাকানি। এটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় অর্থে ব্যবহার করা যায়। তবে কানাঘুষা কিন্তু কানে কানে কথা নয়, এটি নেতিবাচক অর্থে প্রয়োগ করা হয়। কোনো খারাপ ঘটনা গোপনে জনে জনে প্রচার ও আলোচনাকে কানাঘুষা বলা হয়। যেমন নায়িকা তাঁর পরকীয়ার কানাঘুষা অস্বীকার করলেন।

কারচুপি
‘কারচুপি’ শব্দের অর্থ ছিল কাপড়ের সূচিকর্ম ফুলতোলা, লতাপাতা কাটা ইত্যাদি, জরির কারুকার্য, রেশমি কাপড়ে বা ভেলভেটে জরির সূচিশিল্প, গুলকারী। কিন্তু এখন কারচুপি শব্দের অর্থ যদি এগুলো বলা হয় তা হলে অনেকে বিশ্বাসই করতে চাইবে না। এখন যদি কোনো বাংলাভাষীকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কারচুপি শব্দের অর্থ কী? উত্তরে তিনি বলতে পারেন, ‘চুপিচুপি কিছু করার ব্যাপার আছে যাতে সেটিই কারচুপি। ‘কার’ ও ‘চুপি’ দুটো শব্দ বাংলায় আছে। তবে এ দুটো শব্দ যুক্ত করে ‘কারচুপি’ শব্দ গঠন করা হয়নি। ফারসি ‘র্কাচোবি’ শব্দের অর্থ থেকে কারচুপি শব্দের সৃষ্টি হয়েছে।

কারসাজি
‘কারসাজি’ শব্দের অর্থ চালাকি, কূটকৌশল, কৌশলে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি। ফারসি ‘কারসাজ’ থেকে বাংলা কারসাজি শব্দের উৎপত্তি। ফারসি কারসাজ শব্দের মূল অর্থ ছিল কর্মসম্পাদনকারী, ভাঙাগড়ার নিয়ামক; এককথায় সৃষ্টিকর্তা। যিনি ‘কারসাজ’ করেন তিনি কারসাজি। বাংলায় ফারসি ‘কারসাজি’ বা ‘সৃষ্টিকর্তা’ চরম অর্থাবনতির কবলে পড়ে যে অর্থ ধারণ করেছে তা বিস্ময়কর মনে হলেও অনেকে এর পেছনেও সুন্দর যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার কাজে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তিনি যখন ইচ্ছা গড়েন, যখন ইচ্ছে ভাঙেন। তাঁর কাছে কেউ হন লাভবান কেউ হন প্রবঞ্চিত। সে সর্প হয়ে দংশন করে আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ে এটি এক ধরনের চালাকি, কূটকৌশল বা চাতুরী। হয়তো সৃষ্টিকর্তার এমন খামখেয়ালি চরিত্রই ফারসি ‘কারসাজি’ শব্দের অর্থাবনতির অন্যতম কারণ।

কালনেমি
কালনেমি রাবণের মাতুল। শক্তিশেলে হতচেতন লক্ষ্মণকে পুনর্জীবন দান করার জন্য হনুমান গন্ধমাদন পর্বত হতে ঔষধি আনতে গেলে, রাবণ মাতুল কালনেমিকে পথিমধ্যে হনুমানকে নিহত করার জন্য পাঠান এবং পুরস্কারস্বরূপ মাতুলকে অর্ধেক লঙ্কারাজ্য দান করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। হনুমানকে নিহত করার পূর্বেই কালনেমি লঙ্কার কোন অংশ গ্রহণ করবেন সেটি মনে মনে স্থির করে নেন। লঙ্কার ওপর রাবণ বা কালনেমির কোনো অধিকার ছিল না। হনুমান নিহত হবে তারপর লক্ষ্মণ প্রাণত্যাগ করবেন, অতঃপর লঙ্কা ভাগ। এরপরও লঙ্কা দখলে তাদের অনেক প্রতিপক্ষ এবং বাধা ছিল। তারপর হনুমান নিহত হওয়ার পূর্বে লঙ্কা ভাগ এবং কালনেমির লঙ্কার কোন অংশ নেবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছিল যেমন অবাস্তব তেমনি হাস্যকর। শেষ পর্যন্ত কালনেমি হনুমানকে নিহত করতে পারেননি, পক্ষান্তরে কালনেমি নিজেই হনুমানের হাতে নিহত হন। কালনেমির লঙ্কা ভাগের এ হাস্যকর সিদ্ধান্ত থেকে বাংলায় ‘কালনেমির লঙ্কা ভাগ’ প্রবাদটির উৎপত্তি।

কালাপাহাড়
‘কালাপাহাড়’ শব্দটির অর্থ বিশাল ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক, প্রচলিত সংস্কার বা রীতিনীতি যিনি গ্রাহ্য করেন না, বিদ্রোহী প্রভৃতি। মূলত এ সকল অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। গৌড়ের সুলতান সুলায়মান র্করানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের নাম থেকে কালাপাহাড় বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। কালাপাহাড়ের আসল নাম ছিল রাজু। জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী হিসাবে পরিচিত। কৃষ্ণ বা কালো রঙের রাজুর শরীর ছিল পাহাড়ের মতো বিশাল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো কালো পাহাড়। তাই তাঁর নাম হয় কালাপাহাড়। কথিত হয়, পূর্বে আসাম, দক্ষিণে উড়িষ্যা ও পশ্চিমে কাশী পর্যন্ত কোনো দেবমন্দির কালা পাহাড়ের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ হতে রেহাই পায়নি। কালাপাহাড় পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথদেবের মন্দির ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এ ঘটনা তৎকালীন হিন্দু সমাজের মনে গভীর রেখাপাত করে। কালাপাহাড়ের এ ঘটনা থেকে যে ব্যক্তি প্রচলিত প্রথা বা বিশ্বাসকে ধ্বংস করে তাকে কালাপাহাড় বলা শুরু হয়। আসামের অনেক অঞ্চলে কালাপাহাড় ‘কালযবন’ নামেও পরিচিত।

কালি
‘কালি’ শব্দের অর্থ কালো রঙ, মসী প্রভৃতি। খালি চোখের সামনে কালো রঙের কিছু ভেসে উঠলেও আসলে কালি অর্থ শুধু কালো রঙের জিনিস বোঝায় না। লাল কালি, নীল কালি, হলুদ কালি, সবুজ কালি এমনকি সাদা কালিও কালির অন্তর্ভুক্ত। ছোটবেলার একটা ধাঁধা মনে পড়ে গেল। কালো কালি দিয়ে তুমি কী লাল লিখতে পারবে? হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম শিশুবেলায় প্রথম এ প্রশ্নটি শুনে। বাবা বলেছিলেন : তোমার হাতের কালো রঙের কালি দিয়ে ‘লাল’ বানানটা লিখলেই তো হয়ে যায়! আবিষ্কারের প্রারম্ভে ‘কালি’ নামে পরিচিত লেখার তরলটি শুধু কালো রঙেরই হতো। অন্য কোনো রঙের ছিল না। তাই এর নাম হয়ে যায় ‘কালি’। যদিও এখন নানা রঙের কালি আছে। তবু লেখার নিমিত্ত ব্যবহৃত তরলটি তার কালো নাম ঘোচাতে পারেনি। কলমের কালি ছাড়াও আর নানা রকম কালি আছে। যেমন চুনকালি, কুলে কালি, মুখে কালি, বংশে কালি ইত্যাদি।

কালী
দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা। শাক্তরা কালীকে আদ্যাশক্তি বলে উপাসনা করেন। তাঁর চারটি হাত আছে। দুই দক্ষিণ হাতে খট্টাঙ্গ ও চন্দ্রহাস আর দুই বাম হাতে চর্ম ও পাশ। গলায় নরমুণ্ড, দেহ বাঘের চামড়ায় আবৃত। দীর্ঘদন্তী, রক্তচক্ষু, বিস্তৃত মুখ ও স্থূল কর্ণ। কালীর বাহন হচ্ছে মস্তকবিহীন শিব যাকে এককথায় ‘কবন্ধ’ বলা হয়।

কালেভদ্রে
‘কালেভদ্রে’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কদাচিৎ, খুব অল্পকাল, অল্প সময়, মাঝে মাঝে প্রভৃতি। কালে ও ভদ্রে শব্দদ্বয়ের মিলনে ‘কালেভদ্রে’ বাগ্্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। ‘কাল’ মানে সময় এবং ‘ভদ্র’ মানে ভালো, উচিত প্রভৃতি। সুতরাং ভদ্রকাল মানে ভালো সময়। লোকমুখে এটি উল্টে গিয়ে কালেভদ্রে কথায় স্থিতি লাভ করেছে। মানুষের জীবনে ভালো সময় খুব কদাচিৎ আসে। তাই কালেভদ্রে শব্দটির অর্থ ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে ‘কদাচিৎ’ অর্থ ধারণ করে।

কাসুন্দি ঘাঁটা
‘কাসুন্দি ঘাঁটা’ বাগভঙ্গির অর্থ পুরনো অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ উত্থাপন করা। ‘কাসুন্দিকে ঘাঁটা’ বাক্য হতে কাসুন্দি ঘাঁটা শব্দের উৎপত্তি। এবার কাসুন্দি কী দেখা যাক। কাসুন্দি রান্নায় ব্যবহৃত একটি অতিপরিচিত মসলাজাতীয় বস্তু। সরষে বাটা দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। এটি খাদ্যের গন্ধ ও স্বাদ বাড়ায়। কিন্তু কাসুন্দি যখন পুরনো হয়ে যায় তখন এর স্বাদ ও গন্ধ দুটোই অসহ্যকর ও খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। সুগন্ধের পরিবর্তে বের হয় প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। মুখরোচক ও সুগন্ধিময় কাসুন্দি পুরনো হয়ে গেলে যেমন দুর্গন্ধ ছড়ায় তেমনি মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা বা কাহিনি থাকতে পারে যা উত্থাপন করলে কাসুন্দির মতো অসহ্যকর দুর্গন্ধের ন্যায় অনেক ভালো মানুষের জন্যও অনেক কিছু কষ্টকর হয়ে ওঠে। মূলত কাসুন্দির এ ব্যবহার থেকে ‘কাসুন্দি ঘাঁটা’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়
কিংকর্তব্যবিমূঢ় = কিং (কিম্ = কী) + কর্তব্য (= করতে হবে) + বিমূঢ় [কী করতে হবে তা নিয়ে (বিমূঢ় = হতবুদ্ধি)]। কিম্ সংস্কৃত শব্দ, অব্যয়; বাংলায় এর স্বাধীন ব্যবহার নেই; অন্য শব্দের আগে যুক্ত হয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ, বিতর্ক, প্রয়োজনাভাব, নিষেধ, নিন্দা ইত্যাদি অর্থ প্রকাশ করে; আরও বোঝাতে পারে কী, কে, কুৎসিত ইত্যাদি।

কিন্নর
‘কিন্নর’ শব্দের অর্থ কুৎসিত নর। কিন্নর দুই প্রকার। যথা : শরীর মানুষের মতো এবং মুখ অশ্বের মতো; দ্বিতীয় প্রকার কিন্নর : শরীর অশ্বের মতো কিন্তু মুখ মানুষের মতো। এদের অন্য নাম কিম্পুরুষ। এদের রাজা কুবের এবং এরা স্বর্গের গায়ক। ব্রহ্মার ছায়া হতে উৎপন্ন কিন্নরগণ কৈলাসে বিচরণ করেন।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!