বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

ষষ্ঠ অধ্যায়

কুশপুত্তলিকা
‘কুশপুত্তলিকা’ হচ্ছে ঘাস দিয়ে তৈরি একপ্রকার পুতুল, কাপড় দিয়ে তৈরি একপ্রকার পুতুল। কুশ + পুত্তলিকা = কুশপুত্তলিকা। কুশ দিয়ে তৈরি হয় যে পুতুল সেটিই কুশপুতুল বা কুশপুত্তলিকা। কুশ অর্থ তৃণ। কুশ বা তৃণে বা শরপত্রে রচিত পুত্তলিকাই হচ্ছে কুশপুত্তলিকা। যার দাহ হয়নি বা মুখাগ্নি পর্যন্ত হয়নি এবং যার অস্থি পাওয়া যায়নি, তার দাহকার্যার্থ পর্ণনর বা কুশপুত্তলিকা দাহ করতে হয়। ইদানীং কুশপুত্তলিকা শব্দটি রাজনীতিক ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত। এখন যাঁরা রাজনীতির দুনিয়াতে কুশপুতুল পোড়ান, তাঁরা যেমন জানেন না, এটি প্রাচীন মানুষের নিদান; তেমনি এখন যাঁরা লাল রঙকে প্রতিবাদের রং বলে মনে করেন তাঁরাও জানেন না, এটিও প্রাচীন মানুষেরই নিদান।

কুশাসন
একটা অদ্ভুত শব্দ কুশাসন। এটা দুইভাবে গঠিত হতে পারে। কুশাসন = কু + শাসন, অর্থ খারাপ শাসন। আবার ‘কুশাসন = কুশ + আসন’, অর্থ কুশের বা খড়ের আসন। ধরুন কেউ বলল ‘রাজার মানায় না কুশাসন/তবু করে থাকলেও বারণ।’ এই কথার দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথমত, নিষেধ থাকলেও রাজা অন্যায় শাসন করেন, যা তাকে মানায় না, দ্বিতীয়ত, হাতি (বারণ) থাকা সত্ত্বেও রাজা খড়ের আসনে বসেন, যা তাঁকে মানায় না।

কূপমণ্ডূক
কূপমণ্ডূক শব্দের প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ সীমাবদ্ধ জ্ঞানবিশিষ্ট, সংকীর্ণচিত্ত প্রভৃতি। ‘কূপ’ ও ‘মণ্ডূক’ শব্দের মিলনে ‘কূপমণ্ডূক’। কূপ শব্দের অর্থ ‘কুয়ো’ ও ‘মণ্ডূক’ শব্দের অর্থ ব্যাঙ। সুতরাং কূপমণ্ডূক শব্দের অর্থ কুয়োর ব্যাঙ। কূপমণ্ডূক অর্থাৎ কুয়োর ব্যাঙ সবসময় কুয়োর অতি ক্ষুদ্র আয়তনের স্বল্পপরিমাণ জলে বাস করে। ওখানে বাস করে সে মনে করে কূপই বিশ্ব, কূপই সব। কূপের বাইরে যে আরও নদী, সাগর রয়েছে এবং সেখানে সীমাহীন জলের অসীম সঞ্চয় রয়েছে সেটি তার ধারণার বাইরে। কুয়োর ব্যাঙের দৃঢ় বিশ্বাস, কুয়োর মধ্যে যা আছে তা নিয়েই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এর বাইরেও যে আরও অগণিত প্রাণী রয়েছে, সুবিশাল মাটি জলে নক্ষত্ররাজির লীলা চলে নিয়ত তা সে জানে না। কুয়োর সীমাবদ্ধ জল ও তার বাসিন্দাদের বাইরে চিন্তা করার শক্তিও তার নেই। এমন অনেক মানুষ আছে, তারা যা জানেন এবং দেখেছেন সেটার বাইরে আর কোনো ধারণা তাঁদের নেই। তাঁদের ধারণার চৌহদ্দি অত্যন্ত সংকীর্ণ। জীবন আর বিশ্বকে এমন মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে বিচার করেন। এঁদেরকে কূপমণ্ডূক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

কৃপাণ
√কৃপ + আন (আনক্্)। এর অর্থ যা ছেদনে সমর্থ, খড়্গ, অসি, করবাল, ছুরি, কাটারি ইত্যাদি। শব্দটি কীভাবে প্রস্তুত হয়েছিল তা ঠিকভাবে জানা যায় না। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর মতে, কৃপণ যে নীতি গ্রহণ করেছিল, সে নীতিটার নাম হতে পারে কৃপাণ। কিন্তু তার সমর্থনে কোনো তথ্য তাঁরা পাননি। তাঁরা মনে করেন, যৌথসমাজের কোনো সদস্যকে কোনো কৃপণ যখন ‘তুমি এ কাজ করে দিলে আমি এ বস্তু দেব’ এরূপ ‘মজুরি’ দেওয়ার পণ করত এবং তার ফলে সে সদস্য যৌথসমাজের কাজ ছেড়ে সে কৃপণের কাজ করতে লেগে যেত, তখন ‘মজুরি’ স্বরূপ বস্তুকে কৃপাণ বলা হতো। যেহেতু যৌথসমাজ থেকে সে সদস্য কৃপণতার কারণে ছিন্ন হয়ে যেত। সে কারণে, যা ছেদনে সমর্থ তাকে কৃপাণ বলা হতো। পরে এ অদৃশ্য কৃপাণের বাহ্যিক উদাহরণ হয়ে যায় খড়্গ বা কাটারি।

কৃষ্ণচূড়া
√কৃষ্্ + ন (নক্্), কৃ দিশাগ্রস্ত হয়ে নিঃশেষিত যাতে বা কেন্দ্রীভূত যাতে, কর্ষণজাত-এর রহস্যকরূপ থাকে যাতে বা যিনি প্রলয়ে বিশ্বকে নিজেতে আকর্ষণ করেন, অসিত, কালো, নষধপশ অর্থে শব্দটি বহুল প্রচলিত। কৃ ও ষ্্ বর্ণের অর্থ যোগ করলে যে ক্রিয়াটি পাওয়া যায়, তার স্বরূপ অনেকটা টর্চের আলোর বিপরীত স্বভাবের। টর্চের আলো ত্রিমাত্রিক শঙ্কু আকৃতির, যা টর্চ থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে প্রসারিত হয়। কিন্তু ঠিক বিপরীত যদি হয় তা হলে, প্রসারিত আলো বিপরীত মুখে ধাবিত হয়ে টর্চে প্রবেশ করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সত্তার প্রসারিত অংশ যদি তার নিজের কেন্দ্রের দিকে বিপ্রসারিত বা আকৃষ্ট হয়ে না-কৃত হতে হতে কেন্দ্রে বিলীন হয়ে যায় তাকে কৃষ্ণ বলে। তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘কৃষ্্’-এর না-করণ যাতে তাকে কৃষ্ণ বলে। এটিই চরম সত্য। কালো মানেই তো, যা সঙ্কুচিত হতে হতে বিন্দুতে পৌঁছে স্বরূপকে অনালোকিত করে ফেলেছে। এটিই আধুনিক বিজ্ঞান চিহ্নিত ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর যা থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ অনুযায়ী, যিনি প্রলয়ে বিশ্ব আপনাতে আকর্ষণ করেন, তিনিই কৃষ্ণ; অর্থাৎ কালো/কাল বা ইংরেজিতে নষধপশ। এই ‘কাল’-এর ভেতরে স্থান-কাল-পাত্রের কল-কল পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। তাই সে কাল বা মহাকাল এবং কাল বা কালো; তাই সে কৃষ্ণ। তার থেকেই এ মহাবিশ্ব উৎসারিত। রূপের চোখে এ কৃষ্ণই নিরাকার। আধুনিক বিজ্ঞানও বলে, সকল রঙের অনুপস্থিতিই হচ্ছে কৃষ্ণ। এ কালো থেকে আকারবিশিষ্ট বিশ্বজগতের উদ্ভব। এ কালোই বাংলাভাষীর কাছে ‘কালো, গুণে আলো’। পশ্চিমের ধারণাজগতে কালো মাত্রই মন্দ। কারণ, ‘কালীকৃষ্ণ-শ্যাম-গৌর’ এ তিনের মধ্যে তারা ‘কালো’-র শুভ উত্তরাধিকার হতে চরমভাবে বঞ্চিত। তাই তাঁদের উবারষ বা শয়তান কালো। শেক্স্পিয়রের যুগের নাট্যকার ওয়েব্স্টারের ডযরঃব উবারষ ব্যতিক্রম মাত্র। আমাদের কবি যখন বলেন, ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখি আলোর নাচন’ তখন কালো কত রূপময় হয়ে ওঠে বাংলাভাষীর চোখে! কারণ কালোই যে জগতের আলো। এ জন্য চোখের মণি কালো, মাথার চুল কালো। জ্যোৎস্নাকে উপভোগ করা কী কৃষ্ণ-রাত ছাড়া সম্ভব? কৃষ্ণচূড়া গাছটি অপেক্ষাকৃত অধিক সবুজ, তাই কিছুটা কালো। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রচণ্ড গরমে চারদিক অসহ্য হয়ে ওঠে। তন্মধ্যে গাছটির চুড়োয় রক্তলাল ফুলগুলো কৃষ্ণগহ্বরের মতো সৃষ্টির উল্লাসে মণির মতো আলো এবং চুলের মতো সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে চারদিক আলোময় করে তোলে। রাতে কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো সত্যি কৃষ্ণগহ্বরের মতো নিকষ হয়ে ওঠে। এ নিকষ কৃষ্ণই দিনের বেলা গাছের চুড়োয় রঙিন স্বপ্নে জ্যৈষ্ঠ মাসের অসহ্য গরমেও দু দণ্ড শান্তির বারতা বয়ে আনে। তাই তো এটি কৃষ্ণচূড়া।
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন
ব্যাসদেবের অপর নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। ব্যাসদেব দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁর নাম হয় দ্বৈপায়ন। দ্বৈপায়ন একটি সমাসবদ্ধ পদ। যার সমস্তপদ হচ্ছে : দ্বীপ হয়েছে অয়ন (আশ্রয়) যার। কুরুবংশীয় চেদিরাজ উপরিচরবসু মৃগয়াকালে স্ত্রী গিরিকাকে স্মরণ করে কামাতুর হয়ে স্খলিত শুক্র এক শ্যেনপক্ষীর মাধ্যমে স্ত্রীর নিকট প্রেরণ করেন। পথিমধ্যে অন্য এক শ্যেনপক্ষীর আক্রমণে ওই শুক্র যমুনায় পতিত হয়। অদ্রিকা নামের মৎস্যরূপিণী ঋষি-শাপগ্রস্তা এক অপ্সরা সে শুক্র গ্রহণ করে গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং এক ধীবর কর্তৃক ধৃত হয়ে এক পুত্র ও এক কন্যার জন্মদান করেন এবং শাপমুক্ত হয়ে আকাশপথে উধাও হয়ে যান। কন্যার গায়ে মাছের গন্ধ থাকায় নাম রাখা হয় মৎস্যগন্ধা। মৎস্যগন্ধা ধীবরের নৌকা পারাপার করত। একদিন পরাশর মুনি নদী পারাপারের সময় কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গম প্রার্থনা করে। উন্মুক্ত নদীবক্ষে সঙ্গমকার্যে রত হতে মৎস্যগন্ধা লজ্জাবোধ করলে, পরাশর মুনি নদীবক্ষে কুজ্ঝটিকা সৃষ্টি করেন। অতঃপর পরাশর সত্যবতীর (মৎস্যগন্ধা) গর্ভসঞ্চার করেন এবং তপোবলে তাঁর গায়ের মৎস্যগন্ধ দূর করে সুগন্ধযুক্ত করেন। মৎস্যগন্ধা যমুনার তীরে এক পুত্রসন্তান প্রসব করেন। দ্বীপ-জাত বলে এ পুত্রের নাম রাখা হয় দৈ¦পায়ন এবং কৃষ্ণবর্ণ ছিল বলে নাম হয় কৃষ্ণ। দুটো মিলে নাম হয় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। ইনি মহাভারতের রচয়িতা।

কেওকেটা
কেওকেটা শব্দের অর্থ তুচ্ছ, নগণ্য, যেমন-তেমন, গণ্যমান্য (ব্যঙ্গার্থে)। বিশেষণটির উৎপত্তি নিয়ে একটি মজার বিশ্লেষণ আছে। বলা হয় : ‘কে + ও + কে + টা’ সংক্ষিপ্ত বাক্যটি হতে কেওকেটা শব্দের উংপত্তি। এর অর্থ : কে ও? কেটা? (ক্যাডা?)। প্রশ্ন-দুটোর ভাবভঙ্গি থেকে অনুমান করা যায়, যাকে নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে তিনি গণ্যমান্য লোক নন। অবশ্য বাগ্ভঙ্গিটি দুইভাবে প্রয়োগ করা যায়। যেমন ‘তিনিই তো এ শহরের কেওকেটা’ বললে ব্যঙ্গার্থে বোঝায় তিনি শহরের গণ্যমান্য লোক। আবার যদি বলা হয় : ‘তিনি কেওকেটা কেউ নন’, তা হলে বোঝাবে তিনি নগণ্য লোক।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!