বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

ষষ্ঠ অধ্যায়

কেল্লাফতে
কেল্লাফতে শব্দের অর্থ সিদ্ধিলাভ/বাজিমাত/সফলকাম। কোনো কঠিন কাজে সফলকাম হলে বাঙালিরা মহানন্দে এ শব্দটি ব্যক্ত করেন। আরবি শব্দ ‘কিল্আ’ ও ‘ফতৌ’ শব্দ থেকে কেল্লাফতে শব্দটির উৎপত্তি। আরবি ‘কিল্আ’ শব্দ থেকে এসেছে বাংলা ‘কেল্লা’, যার অর্থ দুর্গ। অন্যদিকে ফৌত থেকে এসেছে বাংলা ফতে। যার অর্থ জয়। অতএব, কেল্লাফতে শব্দের অর্থ দুর্গজয়। দুর্গজয়ের যে আনন্দ সেটা ‘কেল্লাফতে’ শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়।

কৈলাস
ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি বিখ্যাত পর্বত। মহাদেব ও কুবেরের বাসস্থান। এটি মানস সরোবরের উত্তর-পশ্চিম দিকে হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত।

কোজাগরি
শরৎকালের পূর্ণিমার রাত বৎসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এ রাতে ধনসম্পদ, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে ধরায় নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন (নিশীথে বরদা লক্ষ্মী কোজাগর্তিভাষিণী অর্থ নিশীথে বরদাত্রী লক্ষ্মীদেবী ‘কে জেগে আছ’ বলে সম্ভাষণ করেন)। যিনি বা যাঁরা এই রাতে লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকেন দেবী তাঁর কাছ থেকে সাড়া পান এবং তাঁর গৃহে প্রবেশ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন। কোজাগর বা কোজাগরি শব্দের আক্ষরিক অর্থ “কে জেগে আছ?” তবে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি এবং ওই তিথিতে অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপূজাকে যথাক্রমে কোজাগরি পূর্ণিমা এবং কোজাগরি লক্ষ্মীপূজা বলে অভিহিত করা হয়।

মজা : লক্ষ্মী দেবী মর্ত্যে এলেন, প্যাঁচা আনন্দচিত্তে দেবীর সঙ্গে সঙ্গে সারা রাত কোলাহল করে বেড়াল। প্যাঁচা ভোরের আলো দেখে গাছের কোটরে ঢুকে পড়ে এবং কাঠঠোকরা আলো দেখে গাছের কোটর হতে বেরিয়ে আসে। দেবী কাঠটোকরাকে দেখে ভাবলেন ইনিই তিনি, যিনি সারা রাত তাঁর আগমনে কোলাহল করে বেড়িয়েছেন। খুশি মনে চমৎকার এক মুকুট তুলে দিলেন কাঠঠোকরার মাথায়। জন্ম হলো চাকমা প্রবাদের “প্যাঁচায় কুড়কুড়ায়, খোড়ইল্যা সোনার তুক পায়।”
কোলাব্যাঙ
কোলাব্যাঙ একধরনের ব্যাঙ বিশেষ। এটি উভচর। পেট মোটা আকারের সামান্য বড় ব্যাঙকে কোলাব্যাঙ বলে। কোলা ও ব্যাঙ এ দুটো শব্দের মিলনে কোলাব্যাঙ শব্দের উৎপত্তি। ‘কোলা’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ ডোবা, ছোট পুকুর, অগভীর জলাশয়। কোলাব্যাঙ সাধারণত অগভীর জলাশয় বা ছোট পুকুরে বাস করে। তাই এর নাম ‘কোলাব্যাঙ’। আর এক ধরনের ব্যাঙ আছে যা দেখতে কুৎসিত, চলফেরাতেও তেমনি। এর নাম কুনোব্যাঙ, গ্রামাঞ্চলে স্যাঁতসেঁতে ঘরের মেঝের কোণে এদের পাওয়া যায়। ঘরের কোণে বসবাস করে বলে এদের নাম ‘কুনো ব্যাঙ’।

কৌমদকী
‘কৌমদকী’ ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি বিখ্যাত অস্ত্র। অগ্নির দেওয়া কৃষ্ণের গদা কৌমদকী নামে পরিচিত। খাণ্ডবদাহনকালীন অগ্নি বরুণের নিকট সবিনয় অনুরোধের ফলে কৃষ্ণার্জুনকে যে সকল অস্ত্র দেন, তন্মধ্যে কৃষ্ণকে কৌমদকী গদা ও সুদর্শনচক্র দান করেন।

কৌশল
‘কৌশল’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ কুশলতা, দক্ষতা, নৈপুণ্য, ফন্দি, ছল, চাতুর্য, কারিগরি ইত্যাদি। ‘কুশল’ শব্দ থেকে কৌশল শব্দের উৎপত্তি। তবে বাংলা ভাষায় কুশল শব্দ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রথমত, কুশল বলতে বোঝায় নিপুণ, দক্ষ, বিচক্ষণ প্রভৃতি। ‘কৌশল’ শব্দ থেকে কুশলী ও কৌশল শব্দের উৎপত্তি। অন্যদিকে ‘কুশল’ শব্দের আরেক অর্থ হলো : মঙ্গল, শুভ, কল্যাণ প্রভৃতি। তবে সংস্কৃতে ‘কুশল’ শব্দটি বাংলার মতো দু-রকম অর্থ বহন করে না। সংস্কৃত ‘কুশল’ শব্দটি ‘কুশ’ শব্দ হতে এসেছে। কুশ একজাতীয় তৃণ বা ঘাস। এটি অতি চিকন ও ধারালো এবং মাটির সঙ্গে শেকড় দিয়ে শক্তভাবে লেপ্টে থাকে। মাটি থেকে উত্তোলন করতে গেলে হাত কেটে যায়। যে হাতকে অরক্ষিত রেখে দ্রুত ‘কুশ’ উত্তোলন করতে পারে সে হচ্ছে ‘কুশ’ এবং কার্যক্রম বা ভাবটা হচ্ছে কৌশল। আবার অন্যদিকে ‘কুশ’ তৃণটি পবিত্র বিবেচনায় যজ্ঞ ও পূজা-পার্বণের অনিবার্য উপকরণ। এ কারণে ‘কুশ’ শব্দটি বাংলায় পবিত্র, মঙ্গল, কল্যাণ প্রভৃতি অর্থ পেয়েছে। তাই কুশল কথাটির অর্থ হয়েছে কুশযুক্ত অর্থাৎ পবিত্র, শুভ, কল্যাণযুক্ত ও মঙ্গলময়।

কৌস্তভ
সমুদ্রমন্থনের সময় উত্থিত মহামূল্য উজ্জ্বল মণি-বিশেষ। বিষ্ণু ও কৃষ্ণ এই মণি বক্ষে ধারণ করতেন।

ক্যাঙারু
অনেকদিন আগের কথা। বর্তমানে ‘ক্যাঙারু’ নামে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার এ জন্তুটি অদ্ভুত ভঙ্গিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বনের প্রান্ত দিয়ে যাচ্ছিল। একজন পর্যটক স্থানীয় এক অস্ট্রেলীয় বনবাসীকে জিজ্ঞেস করেছিল : ওটা কী? বনবাসী উত্তর দিয়েছিল : কাং গা রু। যার বাংলা অর্থ আমি জানি না। প্রশ্নকর্তা মনে করল জন্তুটির নাম ‘কাং গা রু’। তিনি তাঁর ডায়েরিতে জন্তুটির ছবি এঁকে পাশে লিখলেন অস্ট্রেলিয়ার এ জন্তুটির নাম ক্যাঙারু (কধহমধৎড়ড়)। এভাবে অদ্ভুত-সুন্দর ও নিরীহ জন্তুটা ভাষার ফাঁদে পড়ে ‘আমি জানি না’ হয়ে যায়।

ক্রীড়নক
যে অন্যের অনুগত, বশংবদ, বাধ্য, পুতুল তাকে বলা হয় ক্রীড়নক। যে ক্রীড়নক সে অন্যের ইশারায় চলে, অন্যের ইশারায় বলে। শব্দটির আদি ও ব্যাকরণগত অর্থ খেলার পুতুল। কিন্তু বাংলা ভাষায় এখন ক্রীড়নক বলতে খেলার পুতুল বোঝায় না। বরং খেলার পুতুল যেমন অন্যের ইচ্ছায় নড়েচড়ে, ওঠেবসে তেমন কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাসের ন্যায় খেলার পুতুলের মতো আচরণ করে তাকে বলা হয় ক্রীড়নক। শব্দটিকে অনেকে লেখেন ক্রীড়ানক। এটি ভুল। অবশ্য আকার থাকলে শব্দটি এত দুরুচ্চার্য হতো না। ‘খেলার পুতুল’ শিশুদের কাছে যতই হেলাফেলার বস্তু হোক না কেন কিন্তু ক্রীড়নক শব্দটির উচ্চারণ সত্যি কঠিন।
ক্রোধ
‘ক্রোধ’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ধহমবৎ. নিজের ইচ্ছানুযায়ী কোনো কিছু করার প্রবল ইচ্ছা, যা কিনা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় অতি তীব্র আকার নিয়েছে সেটাও ক্রোধ। ক্রোধ শব্দটি ‘কোপ, রোষ, রৌদ্ররসের স্থায়ী ভাব, ষড়রিপুর দ্বিতীয়, লোভ ও নিকৃতির পুত্র’ অর্থেও প্রচলিত। ভাগবত মতে ক্রোধ লোভের পুত্র। তিনি নিজের বোন হিংসাকে বিয়ে করেন। তাঁদের পুত্রের নাম কলি, কন্যার নাম দ্বিরুক্তি। সত্যযুগ গত হওয়ার সময় অতি ধনসম্পদ গ্রহণ ও গ্রহণের আকাক্সক্ষা তীব্র হওয়ায় তাদের শরীর গুরুভার হয়েছিল। শরীরের গুরুভার হওয়ায় শ্রান্তি, শ্রান্তিবোধ হতে আলস্য; আলস্য হতে ধন সঞ্চয়ের আকাক্সক্ষা, সঞ্চয়েচ্ছা হতে প্রতিগ্রহ এবং প্রতিগ্রহ হতে লোভের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। অতঃপর ত্রেতাযুগ আরম্ভ হলে, লোভ হতে জিঘাংসা, জিঘাংসা হতে মিথ্যা কথা, মিথ্যা কথা হতে ‘কাম ক্রোধ অভিমান দ্বেষ পরুষতা অভিঘাত ভয় তাপ শোক চিন্তা ও উদ্বেগাদি’র প্রাদুর্ভাব হয়েছিল।

ক্ষণ
খুব অল্প সময়, অবকাশ, মুহূর্ত প্রভৃতি অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। ক্ষণ-এর একটি নির্দিষ্ট হিসাব আছে। প্রাচীন হিসাব মতে, নিমিষের এক-চতুর্থাংশ সময়কে ‘ক্ষণ’ বলে। সে হিসাবে ‘ক্ষণ’-এর স্থায়িত্ব হলো চার মিনিট। তবে জ্যোতিষশাস্ত্রানুসারে কালের সময়সীমা হচ্ছে ৪৮ মিনিট। কিন্তু বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ক্ষণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। বস্তুত অল্পসময় বোঝাতে ‘ক্ষণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসব। এটি একটি অনির্দিষ্ট কিন্তু স্বল্পসময়-জ্ঞাপক শব্দ। কেউ যদি বলেন আমি এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসব, বা ৪৮ মিনিটের মধ্যে চলে আসব, তা হলে এটি ‘ক্ষণ’ হবে না। ক্ষণ যেমন অনির্দিষ্ট তেমনি তার ব্যবহারও অনির্দিষ্ট। শব্দটি মূলত এতক্ষণ, খানিকক্ষণ, কিছুক্ষণ, বহুক্ষণ, অনুক্ষণ, ক্ষণস্থায়ী প্রভৃতি শব্দরূপে ব্যবহৃত হয়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

আমি শুবাচ থেকে বলছি

error: Content is protected !!