বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

 

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

সপ্তম অধ্যায়

খই ফোটা/খৈ ফোটা
‘খই ফোটা’ বাগ্ভঙ্গি দিয়ে অনর্গলভাবে অতিদ্রুত কথা বলা, বক্তৃতার মতো দ্রুত কথা বলা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশ করা হয়। ‘খই’ ও ‘ফোটা’ শব্দ দিয়ে ‘খই ফোটা’ বাগ্্ভঙ্গিটি গঠিত। ‘খই’/‘খৈ’ ধান্যজাত একপ্রকার শুকনো ও সুস্বাদু খাদ্য। এ খই প্রস্তুত-প্রণালির কার্যক্রম থেকে বাগ্ধারাটির সৃষ্টি। হাঁড়িতে বালু গরম করে তাতে ধান দিয়ে খই ভাজা হয়। তপ্ত বালিযুক্ত কড়াইতে ধান দিয়ে নাড়াচাড়া করলে তা অবিরাম শব্দে হাঁড়ির ভেতর ফুটতে থাকে। হাঁড়ির এ ধানকে কোনো অবস্থাতে সশব্দ ফোটা থেকে থামানো যায় না। ফুটতেই থাকে। এভাবে খই ফোটার কার্যক্রম ও ধরন থেকে বাংলা বাগ্ধারা ‘খই ফোটা’/‘খৈ ফোটা’-র উৎপত্তি।

খয়ের খাঁ
‘খয়ের খাঁ’ বাগ্ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ চাটুকার, চামচা প্রভৃতি। আরবি ‘খায়ের’ মানে শুভ আর ফারসি ‘খাহ্’ মানে চাওয়া। এ-দুয়ে মিলে বাগ্ধারাটি শুদ্ধার্থে বোঝায় ‘শুভার্থী’। তবে বঙ্গদেশে নকল শুভার্থী বেড়ে গেলে ‘খায়ের খাহ্’ হয়ে যায় ‘খয়ের খাঁ’ এবং বোঝাতে লাগল চাটুকার বা মোসাহেব। বাংলাদেশে এসব স্তাবকের মোসাহেবি আরও বেড়ে গেলে তুচ্ছার্থে ‘খয়ের খাঁ’ হয়ে গেল ‘চামচা’।

খাণ্ডবদাহ
পাণ্ডবগণ যমুনা নদীর তীরে খাণ্ডবপ্রস্থে ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে ইন্দ্রপ্রস্থ নগর স্থাপন করে বসবাস করতে থাকেন। একদিন কৃষ্ণার্জুন যমুনায় জলবিহারের পর যমুনাতীরের খাণ্ডববনের সন্নিকট পানভোজনে রত ছিলেন। এমন সময় ব্রাহ্মণবেশে অগ্নি তাঁদের কাছে এসে খাণ্ডববন দগ্ধ করার জন্য তাঁদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। শ্বেতকী রাজার যজ্ঞে বারো বছর ঘি পান করে অগ্নিমান্দ্যে ভুগছিলেন তিনি। ব্রহ্মা তাঁকে বলেন যে, খাণ্ডববন দগ্ধ করে সেখানকার প্রাণীদের চর্বি ভক্ষণ করলে তাঁর অজীর্ণ রোগ সেরে যাবে। খাণ্ডববন ইন্দ্রের প্রিয় ছিল। ইতঃপূর্বে অগ্নি সাতবার এ বন দগ্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কারণ হাজার হাজার হাতি, শুণ্ড ও নাগ মস্তকের সাহায্যে জলসিঞ্চন করে তার চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতেন। কৃষ্ণার্জুন অগ্নিকে সাহায্য করতে সমর্থ হন। তবে তাঁরা নিরস্ত্র বলে অগ্নি বরুণের নিকট থেকে অর্জুনকে গাণ্ডীব ধনু, ক্ষয় তূণ ও কপিধ্বজ রথ এবং কৃষ্ণকে কৌমোদকী গদা ও সুর্দশনচক্র দান করেন। সশস্ত্র কৃষ্ণার্জুন ইন্দ্রের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও খাণ্ডব দহনক্রিয়ায় সহায়তা করতে সক্ষম হন। এভাবে কৃষ্ণার্জুন ইন্দ্রের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও খাণ্ডববন দহন করার কাজে সহায়তা করার মাধ্যমে অগ্নিকে তৃপ্ত করেন। পনেরো দিন ধরে অগ্নি খাণ্ডববন দগ্ধ করে। বনে সকল প্রাণীর মধ্যে ময় নামক দানব, তক্ষক নাগের পুত্র অশ্বসেন ও চারটি মাত্র শর্ঙ্গক পক্ষী রক্ষা পায়। বাকি সব অগ্নির দহনে লয়প্রাপ্ত হয়।

খাণ্ডারনি
অতি বদমেজাজি, কলহপ্রিয়, ঝগড়াটে প্রভৃতি। উপমহাদেশের প্রাচীন গীতপদ্ধতির অন্যতম হলো খাণ্ডারি গীতি। খাণ্ডারি গীতি থেকে ধ্রুপদের বাণী চতুষ্টয়ের অন্যতম খাণ্ডারবাণীর সৃষ্টি হয়েছে। মূলত এই খাণ্ডারবাণী থেকে বাংলা ‘খাণ্ডারনি’ শব্দের উৎপত্তি। খাণ্ডারি গীতি ও খাণ্ডারবাণী ‘বীররস-প্রধান’ এক বিশেষ গায়নভঙ্গি। এটি খুব উচ্চৈঃস্বরে নানা বীরভঙ্গিতে গাওয়া হয়। এ বীররসের আধিক্য যে নারীর মধ্যে থাকে, সে নারীকে পুরুষ তার আড়ালে খাণ্ডারনি বলে থাকে। তবে সামনে বলে মহারানি। বস্তুত কলহপ্রিয় ও ভীষণ উগ্রমেজাজের অধিকারী মহিলাকে আড়ালে খাণ্ডারনি বলা হয়। সাধারণত নরম, দুর্বল ও ভদ্রস্বভাবের পুরুষের স্ত্রী খাণ্ডারনি হয়। কোনো পাষণ্ড পুরুষের স্ত্রী কখনো খাণ্ডারনি হতে পারে না।

খাপছাড়া
‘খাপছাড়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ : মিলহীন, বেমানান, অসংলগ্ন, অদ্ভুত, উদ্ভট প্রভৃতি। ‘খাপ’ ও ‘ছাড়া’ শব্দের মিলনে ‘খাপছাড়া’ শব্দের উৎপত্তি। ‘খাপ’ অর্থ আবরণ। সুতরাং ‘খাপছাড়া’ অর্থ আবরণহীন। অনেক বস্তু বা বিষয় আছে যাকে আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় বা আড়াল করে রাখতে হয়। নইলে সংশ্লিষ্ট বিষয়-বস্তু অসংলগ্ন হয়ে পড়ে, নষ্ট হয়ে যায়, উদ্ভট দেখায়। খাদ্য ঢেকে না-রাখলে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। তলোয়ার খাপে না ভরলে তো বহনকারীর সমূহ বিপদ থেকেই যায়। কিছু কিছু কথা আড়াল করে না-রাখলে অনেকের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। আচরণের মধ্যেও কার্যকারণ ও পরম্পরা থাকতে হয়। এ সম্পর্ক বা পরম্পরাটি হলো কাজের বা আচরণের আবরণ। পোশাক সভ্য মানুষের একটি অনিবার্য খাপ বা আবরণ। যার আবরণ আবশ্যক তার আবরণ না-থাকলে তাকে খাপছাড়া, অসংলগ্ন, উদ্ভট ও বেমানান মনে হবে। আবরণ-আবশ্যক বস্তু বা বিষয় আবরণহীন হলে অসংলগ্ন, উদ্ভট ও বেমানান হয়ে যায়। বস্তুত এ বিষয় থেকে বাংলা ‘খাপছাড়া’ শব্দের উৎপত্তি।

খামচাখামচি
আঙুলের সব নখ দিয়ে আঘাত বা খোঁচা দেওয়া। আরবি শব্দ ‘খমস’ থেকে বাংলা খামচাখামচি শব্দের উৎপত্তি। খমস শব্দের অর্থ হলো পাঁচ। মানুষের একটি হাতে পাঁচটি আঙুল রয়েছে। পাঁচটি আঙুল দিয়ে আঘাত করা হলে আঘাতকারীর শরীরে পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বস্তুত এ পাঁচ আঙুল দিয়ে আঘাত করা এবং আঘাতকারীর শরীরের পাঁচ আঙুলের দাগ হতে বাংলা বাগ্্ভঙ্গি ‘খামচাখামচি’ শব্দের উৎপত্তি। খামচাখামচি ছাড়াও বাংলায় খামচা শব্দের আরও বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। যেমন এক খামচা চিনি, পেট খামচানো প্রভৃতি। একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, পাঁচ আঙুল দিয়ে আঘাত বা খোঁচা না-দিলে তা কিন্তু খামচাখামচি হবে না। তবে একজন কিন্তু খামচা দিল একবার আর একজন কিছুই করল না অথবা শুধু একবার খামচা দিয়ে থেমে গেল তা কিন্তু ‘খামচা দেওয়া’ হবে। খামচাখামচি হবে না। খামচাখামচি বহুবচনাত্মক শব্দ। তাই এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আবশ্যক।

খালি
বাংলায় ‘খালি’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে। প্রথমটির অর্থ হচ্ছে : বিশুদ্ধ, অবিমিশ্র, কেবল, একমাত্র প্রভৃতি। আবার ‘খালি’ শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে : অনাবৃত, শুধুশুধু, রিক্ত, শূন্য ইত্যাদি। যেমন আমি খালি কাজ করে যাই কোনো পারিশ্রমিক পাই না। চারদিকে খালি, কোথাও কিছু নেই। পাত্রটি খালি করা হলো। আবার বিশুদ্ধ, অবিমিশ্র, কেবল, একমাত্র, ক্রমাগত ইত্যাদি অর্থ প্রকাশেও ‘খালি’ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। দ্বি-অর্থ প্রকাশক ‘খালি’ শব্দের কোনোটির মূল কিন্তু বাংলা নয়। দুটোই আরবি শব্দ। প্রথম ‘খালি’ শব্দটি আরবি ভাষা হতে প্রায় অবিকৃত অবস্থায় বাংলা ভাষায় মেহমান হয়ে এসেছে। দ্বিতীয় খালিও ‘আরবি’ হতে আগত। এটি আরবি ‘খালিস’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ। আরবি ভাষায় যার অর্থ খাঁটি। আরবিতে খাঁটি লোক বলতে ‘খালিস’ লোক বলা হয়, কিন্তু বাংলায় তেমন বলা হয় না। এর অর্থ ও উচ্চারণ দুটোই পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় বিশুদ্ধ, অবিমিশ্র, কেবল প্রভৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

খেই
খেই শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রসঙ্গ, ধারা, সূত্র, সন্ধান প্রভৃতি। ‘খেই’ শব্দের অর্থ সুতোর মুখ বা প্রান্ত। তাঁতে কাপড় বোনার সময় মাঝে মাঝে টানা বা পড়েনের সুতো আকস্মিক নানা কারণে কেটে যায়। কেটে যাবার পর তাঁতি কিন্তু থেমে থাকে না। খেই জোড়া দিয়ে আবার কাপড় বোনার কাজ শুরু করে। অনেক সময় তাঁতি সহজে খেই খুঁজে পায় না। খেই হারিয়ে গেলে তাঁতিকে পুনরায় কাপড় বোনার কাজ শরু করতে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। খেই না পাওয়া পর্যন্ত তাঁতি অস্থির হয়ে খেই খুঁজতে থাকে। কারণ এ খেই বা সূত্র ছাড়া পুনরায় কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। কারণ খেই হচ্ছে তাঁতির কাজের সূত্র, ধারা ও সন্ধান। এ খেই দিয়ে তাকে কাজ শরু করতে হয়। তাঁতির এ খেই বোনা কর্মকাণ্ড থেকে ‘খেই’ শব্দটি মানুষের বাগ্্ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। মানুষ কথা বলে, কিন্তু অনেক সময় তাঁতির সুতোর মতো কথার সূত্র হারিয়ে ফেলে। অনেকে কথার সূত্র খুঁজে পায় আবার অনেকে সহজে পায় না। এটাও একপ্রকার ‘খেই হারানো’।

খোশামোদ
‘খোশামোদ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ চাটুকারিতা, তোষামোদ, স্তাবকতা প্রভৃতি। ফারসি ‘খোশ আমাদ’ কথা হতে বাংলা খোশামোদ শব্দের উৎপত্তি। খোশ আমাদ বাগ্্ভঙ্গির অর্থ স্বাগত, শুভাগমন। কারও আগমনকে স্বাগত জানাবার জন্য বলা হয় ‘খোশ আমাদ’। এ ‘খোশ আমাদ’ বাগ্ভঙ্গিটি বাংলার কবলে পড়ে ‘খোশামোদ’-রূপে অর্থের চরম অবনতি ঘটিয়ে তোষামোদ ও চাটুকারিতার অর্থ ধারণ করে। অবশ্য এর কারণও রয়েছে। যাদের ‘খোশ আমাদ’ করা হয় তারা সবাই অর্থ কিংবা বিত্তে শক্তিশালী, জ্ঞান বা গরিমায় মহান। কিন্তু বাঙালিরা শব্দটিকে কোনোরূপ বাছবিচার ছাড়া ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতাশীলদের সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু কিছু ব্যক্তি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্ত শব্দটিকে যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করে। বাঙালিরা ‘খোশ আমাদ’ কার্যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বেশ উদার। এর পেছনে যতটুকু না অমায়িকতা তার চেয়ে বেশি দেখা যায় পার্থিব লোভ। সামান্য পার্থিব বিষয়ের বিনিময়ে নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। অতিভক্তি চোরের লক্ষণের ন্যায় অনেকে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার মানসে যে যা নয় তারও অধিক স্তাবকতা করার স্বভাব বাঙালিদের মজ্জাগত অভ্যাস। এজন্য ফারসি ‘খোশ আমাদ’ কথাটি বাংলায় তার আসল অর্থ হারিয়ে আসল কার্যকরণ বিবেচনায় যথার্থ অর্থই ধারণ করেছে বলা যায়।

error: Content is protected !!