বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

অষ্টম অধ্যায়

গঙ্গার অনার্য নাম গাঙ
‘গাঙ’ শব্দের অর্থ নদী। একসময় ‘গাঙ’ বলে কোনো শব্দ বাংলা ভাষায় ছিল না। সংস্কৃত ভাষায় বহুল-ব্যবহৃত ‘গঙ্গা’ বাংলা ভাষায় এসে ঐতিহ্য হারিয়ে ‘গাঙ’ হয়ে যায়। বঙ্গদেশ ছিল অনার্য-প্রধান অঞ্চল। কেউ কেউ বলেন, বঙ্গদেশের অনার্যরা যাতে উৎস থেকে প্রবাহিত পবিত্র গঙ্গার জলে স্নাত হয়ে সহজে পুণ্য লাভ করতে না-পারেন সেজন্য আর্যরা বঙ্গদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গাকে ‘গাঙ’ বানিয়ে দেন। যা থেকে ‘গাঙ’ শব্দের উৎপত্তি।

গজকচ্ছপ
ভারতীয় পুরাণ মতে, বিভাবসু নামের একজন কোপনস্বভাব মহর্ষি ছিলেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুপ্রতীক পিতৃসম্পত্তি বিভাজন করার জন্য বারবার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে পীড়াপীড়ি করায় বড় ভাই ক্ষুব্ধ হয়ে কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে অভিশাপ দেন : ‘তুমি হস্তী হয়ে যাও’। কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুপ্রতীকও অভিশাপ দেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে : ‘তুমি কচ্ছপ হও।’ দুই ভাই একই পুকুরে দীর্ঘদিন ঝগড়ারত থাকেন। গরুড় অমৃত আনয়নের জন্য যাত্রাকালে পিতার পরামর্শে গজকচ্ছপকে তুষারাবৃত এক পর্বতশৃঙ্গে নিয়ে আরামে ভোজন করেন। এভাবে ঝগড়ারত দু-ভাই ধ্বংস হয়ে যায়।

গড্ডলিকা প্রবাহ
গড্ডল = মেষ, ভেড়া, গাড়ল, গড্ডল + ইক + আ = গড্ডলিকা। অর্থ ১. এক মেষের অনুবর্তী মেষদল (কাঁচা ভাষায় ভেড়া/ভেড়ীর পিছে ভেড়া/ভেড়ীর পাল) ২. মেষপালের সর্বাগ্রবর্তিনী ভেড়ী। গড্ডলিকা প্রবাহের সরলার্থ হচ্ছে : ভেড়ার পালের মতো অনুকরণ/অনুসরণ বা ভালো-মন্দ না-বুঝে অন্ধ অনুকরণ/অনুসরণ। গতানুগতিক, ভালো-মন্দ না-বুঝে অন্ধের মতো অন্যকে অনুকরণ/অনুসরণ প্রভৃতি অর্থে বাগ্ধারাটি ব্যবহার করা হয়। গড্ডল শব্দের অর্থ হলো মেষ বা ভেড়া। ‘গড্ডল’ শব্দ থেকে গড্ডলিকা শব্দের উৎপত্তি। গড্ডলিকা শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হচ্ছে ভেড়ার পালের মধ্যকার অগ্রবর্তিনী স্ত্রী ভেড়া। সুতরাং গড্ডলিকা শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ দাঁড়াচ্ছে স্ত্রী ভেড়ার পেছনে পেছনে চলা ভেড়ার দল। এরূপ ভেড়ার ন্যায় কিছু মানুষ আছে যারা ভালোমন্দ বিবেচনা না-করে অন্যকে অন্ধ অনুকরণ করে। এমন লোকের কোনো স্বকীয়তা বা ব্যক্তিত্ব থাকে না। এরা গড্ডলিকা প্রবাহে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়। এমন লোকদের প্রকাশের জন্য ‘গড্ডলিকা প্রবাহ’ বাগ্ধারাটি সত্যিকার অর্থে অসাধারণ। এ রকম আর একটি শব্দ আছে। সেটি হচ্ছে ভেড়ুয়া, কিন্তু শব্দটি কিঞ্চিৎ অমার্জিত।

গণেশ
ভারতীয় পুরাণ মতে, গণেশ একজন দেবতা। তিনি শিব ও পার্বতীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। গণেশ সফলতাদায়ক সিদ্ধিদাতা। তাই সকল কর্মের সূচনায় সকল দেবতার আগে গণেশের পূজা করা হয়। গণেশের জন্মবৃত্তান্ত বেশ চমকপ্রদ। দীর্ঘকাল পর বিষ্ণুর বরে পার্বতীর এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। দেবতারা স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল প্রভৃতি হতে নবজাতককে দেখার জন্য ছুটে আসেন। শনিও এসেছিলেন। তবে শনি শিশুর দিকে তাকাচ্ছিলেন না। পার্বতী বারবার শনিকে অনুরোধ করছিলেন তাঁর শিশুপুত্রের মুখ দেখার জন্য। তখন শনি বললেন : “আমি চিত্ররথের কন্যাকে বিবাহ করি। একদিন আমার স্ত্রী ঋতুস্নান করে আমার সঙ্গম প্রার্থনা করেন। তখন আমি এমনই ধ্যানমগ্ন ছিলাম যে, স্ত্রীর কথা রাখতে পারিনি। ঋতু বিফলে যাওয়ায় স্ত্রী আমাকে অভিশাপ দেন যে, আমি যার দিকে দৃষ্টিপাত করব সে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে।” সকল বিবরণ শুনেও পার্বতী নবজাতককে দেখার জন্য শনিকে অনুনয় করছিলেন। নিরূপায় শনি নবজাতকের দিকে দৃষ্টিপাত করামাত্র নবজাতকের মস্তক দেহচ্যুত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। বিষ্ণুর কাছে এ দুঃসংবাদ পৌঁছলে তিনি প্রতিকার করার জন্য বাড়ির দিকে আসতে থাকেন। পথিমধ্যে একটি নিদ্রিত হস্তীকে দেখে সুদর্শনচক্রের মাধ্যমে তার মুণ্ড কেটে নিয়ে গণেশের গলায় লাগিয়ে দেন। হস্তীর মুণ্ডের কারণে যাতে গণেশ কারও কাছে অনাদৃত না হন, সে জন্য দেবতারা নিয়ম করে দেন যে, প্রথমে গণেশের পূজা না-হলে তাঁরা কেউ কোনো পূজা গ্রহণ করবেন না। তাই প্রত্যেক দেবকার্য ও পিতৃকার্যে গণেশের পূজা প্রথমে করা হয়।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে উল্লেখ আছে, শিবের প্রতি কশ্যপের অভিশাপের কারণে গণেশের মুণ্ডচ্ছেদ হয়। পরে ইন্দ্রের ঐরাবত হস্তীর মস্তক গণেশের গলায় লাগিয়ে দেওয়া হয়। স্কন্দপুরাণ মতে, পার্বতী গণেশকে গর্ভধারণের অষ্টম মাসে সিন্দুর নামের এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে প্রবেশ করে গণেশের মস্তক কর্তন করেন। জন্মের পর নারদ গণেশের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে গণেশ মস্তকচ্যুত হওয়ার কারণ বর্ণনা করেন। নারদ গণেশকে নিজেই নিজের মস্তক সংগ্রহ করার পরামর্শ দেন। শিশু গণেশ তখন আপন তেজে গজাসুরের মাথা কেটে নিজের দেহে যুক্ত করে নেন। সে হতে গণেশের নাম হয় ‘গজানন’।

গৎ বাঁধা
শব্দটির আভিধানিক অর্থ নিয়ম বাঁধা, রুটিনমাফিক, একই প্রকার, অভিন্ন রকম, গতানুগতিক প্রভৃতি। এটি একটি সংগীতসম্পৃক্ত শব্দ। ভারতীয় সংগীতে শব্দটির বহুল প্রচলন লক্ষণীয়। ‘গৎ’ শব্দের মূল অর্থ হলো বাজনার বোল। বোলের ওপর নির্ভর করে যন্ত্র বাজানোর উপযোগী ছন্দোবদ্ধ সংগীতই হলো ‘গৎ’। ‘গৎ’ খেয়াল গানের অনুকরণে রচিত একটি সংগীত কৌশল। ‘গৎ’-এর মাধ্যমে ধীরগতি ছন্দের খেয়াল চয়নের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এ নিয়ম সর্বত্র অভিন্ন এবং এর মাধ্যমে পুরো সংগীত অভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। গানের এ নিয়মবদ্ধ রীতিটি মানুষের নিয়মবদ্ধ গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি ও অভিন্নতা প্রকাশে ব্যবহার করা হয়।

গন্ধমাদন
শব্দটির অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। গন্ধ + মাদন, যা গন্ধে মাদয়িত (মত্ত) করে বা গন্ধ যার মাদয়িতা, গন্ধ দ্বারা মাদয়িতা, সুগন্ধি বন-যুক্ত পর্বতবিশেষ, এটি ইলাবৃত ও ভদ্রাশ্ব বর্ষের সীমাপর্বত এবং মেরুর পূর্বে অবস্থিত, ভ্রমর, রামসৈন্যস্থ বানরবিশেষ, গন্ধমাদনস্থ বনবিশেষ; হিমালয়ে স্বর্ণময় ঋষভ পর্বত ও কৈলাস পর্বতের মধ্যস্থিত দীপ্তিমান ঔষধি পর্বত। এ পর্বতের শীর্ষদেশে মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী ও সন্ধানী এ চার প্রকার মহৌষধি জন্মাত। হনুমান রাম-রাবণের যুদ্ধকালে দুইবার ঔষধি পর্বত উৎপাটন করে নিয়ে এসেছিলেন। প্রথমবার ঔষধির গন্ধ আঘ্রাণ করে রাম-লক্ষ¥ণ শল্যমুক্ত হন ও বানরেরা সুস্থ হয়। পরে লক্ষ্মণ রাবণের শক্তিশেলে মৃতপ্রায় হলে হনুমান ঔষধি চিনতে না-পেরে পুরো ঔষধি-শৃঙ্গ তুলে নিয়ে আসেন। এ ঔষধি মৃতকল্পকে জীবন দান করে। ঔষধি বৃক্ষের গন্ধ সবাইকে মত্ত করে দেয়, তাই এ পর্বতের নাম গন্ধমাদন। সেকালের বৈদিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বলা হতো হিমালয়। এ রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর যত বিভাগ ছিল, সেগুলোকে বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছিল। তারই একটি গন্ধমাদন। এটি সম্ভবত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যকার ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা। এটাকে একেবারে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে হলে, ১০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন ছিল, তার কী কী বিভাগ ছিল, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা দরকার।

গন্ধর্ববেদ
ভারতীয় পুরাণে সংগীতশাস্ত্রকে ‘গন্ধর্ববেদ’ এবং সংগীতবিদ্যাকে ‘গন্ধর্ববিদ্যা’ বলা হয়। এখনও সংগীতশাস্ত্র গন্ধর্ববেদ নামে পরিচিত।

গন্ধর্বলোক
গুহ্যকলোকের উপরে কিন্তু বিদ্যধরলোকের নিচে অবস্থিত একটি স্থান। এখানে দেবগায়ক গন্ধর্বগণ বসবাস করেন। গন্ধর্বলোক সর্বদা সংগীতের অনুপম মূর্ছনায় বিমোহিত থাকে।

গবেষণা
গো + এষণা = গবেষণা। সাধারণ অর্থে ‘গো’ মানে গরু এবং ‘এষণা’ মানে : অনুসন্ধান, অন্বেষণ, আবিষ্কার, বাসনা, কামনা, ইচ্ছা ইত্যাদি। এটি ইংরেজি ৎবংবধৎপয শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। তা হলে গরু অনুসন্ধান বা গরু খোঁজাই কী বাংলায় গবেষণা! কিন্তু কেন? গবেষণা শব্দটির বিশ্লেষণ অর্থ করেছে : গো + এষণা, গতিশীল বিষয় ও বস্তু সম্পর্কে দিশাগ্রস্ত জ্ঞানের আহরণ থাকে যাতে, অনুসরণ, অনুসন্ধান, অন্বেষণ, তর্কাদি দ্বারা যথাবোধিত ধর্মাদির অন্বেষণ, বিচারণ, বিষয়বিশেষের তত্ত্বান্বেষণ, ইংরেজি ৎবংবধৎপয প্রভৃতি। বস্তুত রিসার্চ শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে গবেষণা শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। অনেকে বলেন ইংরেজি ৎবংবধৎপয বোঝাতে বাংলায় যে ‘গবেষণা’ শব্দ ব্যবহার করা হয় তাতে ‘গো’ বা ‘গরুর’ প্রাদুর্ভাব কেন? এ প্রশ্নটি একটি বিষয়কে পরিষ্কার করে দেয় এবং সেটি হলো, বাংলা ‘গবেষণা’ যে বিশাল অর্থ ধারণ করে ইংরেজি ‘ৎবংবধৎপয’ তার সামান্য অংশ মাত্র। উভয়ের মিল হচ্ছে দুটোই দিশাগ্রস্ত জ্ঞানীর খোজাখুঁজি এবং অমিল হলো ‘ৎবংবধৎপয’ যেখানে ‘পুনরায় খোজাখুঁজি’ মাত্র, গবেষণা সেখানে যে কোনো গাভীর বা ‘গো’-এর অর্থাৎ গতিশীল বিষয় ও বস্তুর বিষয়ে অনুসন্ধান। এ বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রিসার্চ স্কলার’কে ডক্টর বলা যেতে পারে, কিন্তু আইনস্টাইন বা রবীন্দ্রনাথের মতো ‘গো-গণ’ বিষয়ে যথার্থ জ্ঞানীদের গোস্বামী বলাই সমীচীন।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!