বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

অষ্টম অধ্যায়

গরিবের উঠোনে হাতির পা
বাগ্্ভঙ্গিটির অর্থ অপ্রত্যাশিত কোনো বিষয় বা বস্তুর প্রাপ্তি, দুর্লভ কোনো ব্যক্তির আগমন। বাক্যটি একটি প্রবচন, হাতি উপমা। হাত + ই = হাতি, যার হাত আছে। হাতের মূলে হস্ত, তাই হাতির মূলেও হস্তী। বাংলায় ‘গরিবের উঠোনে হাতির পা’ বাগ্্ভঙ্গির অর্থ হচ্ছে অপ্রত্যাশিতভাবে বিশেষ কোনো ব্যক্তির অপ্রত্যাশিত স্থানে আগমন। এই একটি বাক্য ব্যতীত হাতি বলতে একটি পশুকে বোঝানো হয়। কিন্তু হিন্দি, উর্দু, পশ্তু ও নেপালি-ভাষায় হস্তী সবসময় বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। হস্তী যেমন বিলুপ্তপ্রায়, হস্তীর পশুত্বও তেমনি। তাই হয়তো তারা হস্তী বলতে প্রভাবশালী, ধনবান, জ্ঞানবান ব্যক্তিকেই বোঝায়।

গরুড়পুরাণ
অষ্টাদশ মহাপুরাণের অন্তর্গত সপ্তদশ পুরাণ। এখানে চিকিৎসাদি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যতম একটি বলে বিবেচিত হয়।

গরু মেরে জুতো দান
ইংরেজিতে ঞড় ৎড়ন চবঃবৎ ঃড় ঢ়ধু চধঁষ বাগ্ভঙ্গির অর্থ একজনের কাছ থেকে নিয়ে অন্যজনকে দেওয়া। তবে বাংলায় এর অর্থ ‘গরু মেরে জুতো দান’। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডে ওয়েস্টমিনিস্টারের ঝঃ. চবঃবৎ ঈযঁৎপয-কে ঝঃ. চবঃবৎ’ং ঈধঃযবফৎধষ-এ পরিণত করা হয়। এ সময় ঝঃ. চধঁষ’ং ঈধঃযবফৎধষ-এর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ, ক্যাথিড্রালটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। এ দুরবস্থা কাটিয়ে তোলার জন্য ঝঃ. চবঃবৎ’ং ঈধঃযবফৎধষ-এর ফান্ড থেকে অর্থ নিয়ে ঝঃ. চধঁষ’ং-এর আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়। এর থেকে এ প্রবাদটির জন্ম। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশের প্রশাসনে এমন ব্যবস্থা দেখা যায়। দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করার জন্য সরকার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থ প্রদান করে।

গলগ্রহ
বাগ্ভঙ্গিটির অর্থ অনভিপ্রেত বোঝা বা দায়িত্ব, পরের ওপর যা ভারস্বরূপ বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও যার ভার নিতে হয়। গলগ্রহ প্রকৃতপক্ষে গলার এক প্রকার কঠিন যন্ত্রণাদায়ক রোগ। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত চিকিৎসক ‘সুশ্র“ত’-এর লেখায় দুশ্চিকিৎস্য এ রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। গলগ্রহ রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির কোনো কিছু গলাধঃকরণ করা অতি কষ্টকর। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা কিন্তু গলার যন্ত্রণায় কোনো কিছু গেলা সম্ভব হয় না এটাই ‘গলগ্রহ’ রোগের লক্ষণ। বস্তুত, এ অবস্থাটিই উপমাস্বরূপ বাগ্ভঙ্গিটিতে ব্যবহার করা হয়। যাকে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না আবার ত্যাগ করাও সম্ভব নয় এমন অবস্থা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ই হচ্ছে ‘গলগ্রহ’।

গাঁটছড়া
‘গাঁটছড়া’ শব্দের অর্থ : বর ও কন্যার বস্ত্র অন্য বস্ত্রখণ্ড দ্বারা সংযোগপূর্বক বন্ধন/গাঁটছড়া’ বাঁধা বর-বধূর ন্যায় দুজনের সতত সাহচর্য। গাঁটছড়া একটি প্রাচীন প্রথা। বৈদিক যুগের আগে সনাতন যুগ থেকে এ প্রথার প্রচলন। ফলে এর উত্তরাধিকার পৃথিবীর সকল জাতিতে কম-বেশি রয়েছে। তবে হিন্দু বিবাহে এ প্রথা এখনও স্পষ্টভাবে প্রচলিত। বর-কনের কাপড়ের খুঁট বা প্রান্ত দুটোকে বেঁধে দেওয়া বা গ্রন্থিবদ্ধ করা বা গিঁট দেওয়া হয় যে সংস্কারে তাকেই ‘গাঁটছড়া’ বলা হয়। বদ্ধ গিঁটকে গাঁট বলা হয়, তা হলে ছড়া কেন? বস্তুত বিয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট সন্তান-সন্ততির সংখ্যা জলধারার মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাই বিয়ের গাঁটের সঙ্গে ছড়া শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।

গান্ধার
পুরাণ মতে সিন্ধু নদের পশ্চিম তীর হতে আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকা পুরাকালে গান্ধার দেশ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে কান্দাহার নামে পরিচিত স্থানটি প্রাচীন গান্ধার নগরী। ভারতীয় পুরাণের বিশেষ চরিত্র সুবল ছিলেন গান্ধার দেশের রাজা। সুবলের কন্যার নাম ছিল গান্ধারী। গান্ধার দেশের রাজকন্যা বলে নাম গান্ধারী। গান্ধারীর স্বামীই জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র। এই গান্ধারীই হচ্ছেন দুর্যোধনাদির মাতা।

গারদ
‘গারদ’ শব্দের অর্থ কয়েদ, জেলখানা, কারাগার। ইংরেজি গার্ড (এঁধৎফ) শব্দ থেকে বাংলা ‘গারদ’ শব্দের উৎপত্তি। গার্ড শব্দের অর্থ পাহারা, প্রহরী প্রভৃতি। থানার গারদেও গার্ড থাকে। জেলখানাতেও গার্ড থাকে। আবার পাগলাগারদেও গার্ড থাকে। গার্ডের কাজ পাহারা দেওয়া। গার্ডের চারিত্রিক অনুষঙ্গ থেকে বাংলা গারদ শব্দটি এমন অর্থ ধারণ করেছে। গারদে গার্ড থাকে। তাই ইংরেজি গার্ড থেকে আসা বাংলা গারদ অর্থটি বিচিত্র হলেও অযৌক্তিক নয়।

গীতা
মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত অষ্টাদশ অধ্যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধস্থলে অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ। এ যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর আত্মীয়গণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং তাঁদের বধ করতে হবে ভেবে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েন। অর্জুনের সারথিরূপে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধে উৎসাহিত করার জন্য যে উপদেশ দেন, সে উপদেশ-সমষ্টির সংকলনকে শ্রীমদ্ভগবদ্্গীতা বলা হয়। এর প্রধান বক্তা শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রোতা অর্জুন। এতে সাতশ শ্লোক আছে। তাই এর অপর নাম ‘সপ্তশতী’।

গুলতানি
‘গুলতানি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ গালগল্প, গল্পগুজব, আড্ডা, অহেতুক গল্প, আষাঢ়ে গল্প প্রভৃতি। ফারসি ‘গুল্তান্’ শব্দ থেকে গুলতানি শব্দের উৎপত্তি। ফারসি গুল্তান্ শব্দের অর্থ গড়াগড়ি দেওয়া, ঘুরপাক খাওয়া, গোলাকার বা পিণ্ডাকার কোনো বস্তুর গড়িয়ে চলা প্রভৃতি। তা হলে কেন গুলতান বাংলায় এসে গল্পগুজব বা আড্ডা হয়ে গেল? এর একটা সম্পর্ক ও হেতু রয়েছে। আড্ডায় যখন গালগল্প শুরু হয় তখন আড্ডায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকে হাসি বা আনন্দে উদ্বেল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। এ গড়িয়ে পড়া অনেকটা ফারসি গুল্তানের মতো। তাই ফারসি ‘গুল্তান্’ বাংলায় এসে গালগল্পের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

গেঞ্জি
মানুষের ঊর্ধ্বাঙ্গের অন্তর্বাসকে গেঞ্জি বলে। অভিধানে বলা আছে গেঞ্জি হচ্ছে যন্ত্রে বোনা সুতি জামা, যা পুরুষের দেহের ঊর্ধ্বাংশের অন্তর্বাস হিসাবে পরা হয়। ইংলিশ চ্যানেল ও ফ্রান্সের মধ্যিখানে ‘চ্যানেল আইল্যান্ডস’ নামের চারটি ছোট আকারের দ্বীপ রয়েছে। চারটি দ্বীপের মধ্যে একটির নাম গার্নজি এবং অন্যটির নাম জার্সি। খেলার সময় খেলোয়াড়দের পরিহিত ‘জার্সি’ নামের পরিধেয়টি জার্সি দ্বীপে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রস্তুত করা হয়। তাই এ পরিধেয়টির নাম হয় জার্সি। অন্যদিকে পুরুষদের পরিহিত ঊর্ধ্বাংশে পরিধেয় অন্তর্বাসটি ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে গার্নজি দ্বীপে প্রথম প্রস্তুত করা হয়। তাই এর নাম হয় গার্নজি। যা ক্রমান্বয়ে কিছুটা বিকৃত হয়ে ‘গেঞ্জি’ নামে স্থিতি পায়।

গোঁফখেজুরে
‘গোঁফখেজুরে’ শব্দটির মানে হচ্ছে অলস। তো কেমন অলস? একটা পাকা খেজুর গোঁফের উপর পড়ে আছে তবু সেটি মুখের ভেতরে নেবার মতো শ্রম বা চেষ্টা করে না এমন অলস! অন্যভাবে বলা যায়, আলস্যজনিত পরিচর্যার অভাবে গোঁফের অবস্থা এমন হয়েছে খেজুর যে গোঁফের ভেতর আটকে আছে তা নিজে বুঝতেই পারছে না।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!