বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

নবম অধ্যায়

ঘটি-বাঙাল
কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে প্রথম হতে বসবাসরত বাংলাভাষী একটি উচ্চশ্রেণি দাবিদার গোষ্ঠী, রাঢ় দেশীয় ব্রাহ্মণ, বন্দ্যঘট গ্রামের অধিবাসী প্রভৃতি। এ ঘটি কিন্তু জল-রাখার কোনো ঘটি নয়। ঘটি শব্দটি এসেছে ‘বন্দ্যঘটী’ থেকে। আদি রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের উপাধি ছিল ‘বন্দ্যঘটী’। ‘বন্দ্যঘট’ গ্রামের নাম থেকে ‘বন্দ্যঘটী’ উপাধির উৎপত্তি। বন্দ্যঘটে বাস যার সে ‘বন্দ্যঘটীয় > বন্দ্যঘটী’। ‘বন্দ্যঘট’-এর অপভ্রংশ বাঁড়র (বন্দ্যঘট > বন্দহড় > বন্দঅড় > বাঁড়ড় > বাঁড়র)। বাঁড়ুর্জে বা বাঁড়ুজ্জে-এর উৎপত্তিও বাঁড়র থেকে। ঘটী প্রথমে কেবল রাঢ়দেশীয় ব্রাহ্মণকেই বোঝাত, ক্রমে তা শুধু রাঢ়দেশ বা পশ্চিমবঙ্গ অর্থে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। অর্থেরও অবনমন ঘটে। প্রাদেশিক প্রতিযোগিতাজনিত ঈর্ষায় শব্দটি ক্রমশ তাচ্ছিল্যমিশ্রিত বিদ্রƒপার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
জ্যোতিভূষণ চাকী তাঁর ‘বাগর্থকৌতুকী’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ঘটি-বাঙালের পারস্পরিক রেষারেষি সুপ্রাচীন। এ-বাংলা ও-বাংলাকে তেমন প্রীতির চোখে দেখত না। বিয়ে-শাদির ব্যাপারও এড়াতে চেষ্টা করত।” প্রমাণস্বরূপ তিনি বলেন, সরহপাদের একটি দোহায় আছে বঙ্গে জায়া নিলেসি পরে/ভাগেল তোহর বিণাণা। অর্থাৎ বঙ্গে (= পূর্ববঙ্গে) যখন বিয়ে করেছিস তোর বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেল বলে (বিণাণা = চিত্তবান অর্থাৎ সু-চেতনা)। ভুসুকপাদেও দেখছি ‘আদি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী/ণিঅ ঘরণি চণ্ডালী লেলী।’ অর্থাৎ ভুসুক বঙ্গালীকে যেদিন নিজের গৃহিণী করলেন সেদিন তিনি বাঙালি বনে গেলেন অর্থাৎ বঙ্গালসুলভ ভ্রষ্টাচারের ফাঁদে পড়লেন। বাঙ্গালদের বিষয়ে প্রাচীন মুনি-ঋষিদের ধারণা কতটুকু সত্য তা ভুক্তভোগী মাত্রই বলতে পারেন।

ঘটিকা
সময়ের একক, ষাট মিনিটে ঘটিকা, ঘণ্টা প্রভৃতি। সময় পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রদর্শিত ষাট মিনিট সময়কে এক ঘটিকা বলা হয়। আধুনিক যুগের কাঁটা-ঘড়ি বা ডিজিটাল-ঘড়ি আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ জলঘড়ি বা বালিঘড়ি বা সূর্য-ঘড়ির মাধ্যমে সময়ের হিসাব রাখতেন। সে সময় মানুষ সময় জানার জন্য বালি বা জলভর্তি ঘড়া ও ঘড়ি বা ঘটিকা ব্যবহার করতেন। বড় একটা ঘড়াতে জল বা বালি রেখে নিচে একটা নির্দিষ্ট পরিমাপের ছিদ্র করা হতো। সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়া হতে নিচে রাখা ঘটিকায় বিন্দু বিন্দু জল বা বালি পড়ত। ঘটিকা পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে দেওয়া হতো। এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো সময় বলা হতো তত ঘটিকা। ঘড়ার নিচের রাখা ঘড়িটি জল বা বালি দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে সময় জ্ঞাপন করত বলে সময় পরিমাপক যন্ত্রের নাম হয় ‘ঘড়ি’। আমাদের বর্তমান ঘটিকা শব্দটি এ ঘটিকা হতে এসেছে।

ঘটোৎভব
কুম্ভজাত। ঘটের মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছিল বলে অগস্ত্যমুনির আর এক নাম ঘটোৎভব।

ঘড়ি
সময় পরিমাপক যন্ত্র। আধুনিক যুগের কাঁটা-ঘড়ি বা ডিজিটাল ঘড়ি বেশিদিনের কথা নয়। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য বালি বা জলভর্তি ঘড়া ও ঘড়ি বা ঘটিকা ব্যবহার করতেন। বলা প্রাসঙ্গিক যে, ঘড়া মানে বড় আকারের জলপাত্র বা কলস এবং ঘড়ি বা ঘটি বা ঘটিকা মানে ছোট আকারের জলপাত্র বা কলসি। বড় একটা ঘড়াতে জল বা বালি রেখে নিচে একটা নির্দিষ্ট পরিমাপের ছিদ্র করা হতো। সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়ার নিচে রাখা ঘড়িতে বিন্দু বিন্দু জল বা বালি পড়ত। ঘড়ি পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘড়ি সরিয়ে আর একটি খালি ঘড়ি ঘড়ার নিচে দেওয়া হতো। এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো তত ঘটিকা সময় বলা হতো। ঘড়ার নিচে রাখা ঘড়িটি জল বা বালি দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে সময় জ্ঞাপন করত বলে সময় পরিমাপক যন্ত্রের নাম হয় ‘ঘড়ি’।

ঘড়েল
ঘড়েল শব্দের আভিধানিক অর্থ ফন্দিবাজ, কুচক্রী, ধুরন্ধর প্রভৃতি। আমরা জানি, ঘড়া মানে বড় আকারের জলপাত্র বা কলস এবং ঘড়ি বা ঘটি বা ঘটিকা মানে ছোট আকারের জলপাত্র বা কলসি। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য জলঘড়ি ব্যবহার করতেন। এ জলঘড়ি থেকে ঘড়েল শব্দটির উৎপত্তি। বড় একটা ঘড়া থেকে ঘটিকা বা ঘটিতে জল ফেলে সময় জানার জন্য বিশেষ কৌশলে জলঘড়ি তৈরি করা হতো। ঘড়ার নিচে থাকত ছিদ্র, সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়ার নিচে রাখা ঘটিকায় বিন্দু বিন্দু জল পড়ত। ঘটি পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে রেখে দেওয়া হতো। এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো, সময় বলা হতো তত ঘটিকা। আমাদের বর্তমান ঘটিকা শব্দটি এ ঘটি ও ঘড়া হতে এসেছে। ঘড়ি শব্দটি এসেছে ঘড়া হতে। সাধারণ কোনো লোকের বাড়িতে এ জলঘড়ি ছিল না। রাজা, জমিদার প্রমুখ বিত্তশীলদের বাড়িতে জলঘড়ি রাখা হতো। কেউ সময় জানতে চাইলে রাজবাড়িতে এসে তা জেনে নিতেন। রাজবাড়িতে জলঘড়ির পূর্ণ ঘটিকার হিসাব রাখার দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত থাকত তার পদবি ছিল ‘ঘটিকাপাল’। এ ঘটিকাপাল শব্দটি ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে ‘ঘড়েল’ শব্দে এসে রূপ নিয়েছে।
এখন একটা প্রশ্ন থেকে যায়, ঘটিকাপাল কীভাবে ফন্দিবাজ, কুচক্রী বা ধুরন্ধর হয়ে যায়? ঘটিকাপালকে ঘটিকা পূর্ণ হওয়া মাত্র ঘণ্টা বাজিয়ে ঘটিকার হিসাব জানিয়ে দেওয়ার জন্য সদাসতর্ক থাকতে হতো। এক মুহূর্তের অসতর্কতার জন্য সময়ের হেরফের হয়ে যেত। তাই চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে সবসময় ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হতো। কোনো লোক চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান না-হলে তাকে ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হতো না। তাদের বেতনও ছিল অন্যান্য সম-মানের কর্মচারীদের তুলনায় অধিক। তাই চালাকচতুর, বুদ্ধিমান বিশেষণগুলো ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগের অন্যতম শর্ত হয়ে যায়। আর এ কথা কার না-জানা, যিনি বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর তিনি সাধারণত ধুরন্ধর, ফন্দিবাজ ও কুচক্রীও হন!

ঘণ্টকর্ণ
প্রচণ্ড বিষ্ণুবিদ্বেষী। হরিনাম কানে যাবে এ শঙ্কায় তিনি কানে সর্বদা ঘণ্টা বেঁধে রাখতেন এবং তা নাড়িয়ে সবসময় বাজাতেন। বিষ্ণু-বিরোধী হলেও তিনি প্রবল শিবভক্ত ছিলেন। শিবের ভক্ত এটা প্রমাণের জন্য তিনি কানে ঘণ্টা বেঁধে রাখতেন। এখনও অনেকের এমন আচরণ দেখা যায়।

ঘরের শত্রু বিভীষণ
এ বাংলা বাগ্্ভঙ্গিটির অর্থ স্বজন-শত্রু, অর্থাৎ যিনি নিজের আপনজনের ক্ষতি করেন তিনিই ‘ঘরের শত্র“ বিভীষণ’। বিভীষণ ছিলেন রাবণের ছোট ভাই। রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ ছিলেন বিশ্রবা মুনির সন্তান। তাঁদের মা নিকষা ছিলেন সুমালী রাক্ষসের মেয়ে। নিকষার আরেক নাম কৈকসী। সুমালী তাঁর মেয়ে নিকষাকে বিশ্রবা মুনির কাছে পাঠান। বিশ্রবা মুনি তখন ধ্যান করছিলেন। নিকষা আসায় তাঁর ধ্যান ভেঙে যায়। ক্ষুব্ধ মুনি অভিশাপ দিয়ে বসেন নিকষাকে : ‘তোমার সব সন্তানই হবে ভীষণাকার রাক্ষস’। অভিশাপ শুনে বিমূঢ় নিকষা। মুনিকে অনেক অনুনয়-বিনয় করেন নিকষা। অবশেষে বিশ্রবা মুনি শান্ত স্বরে বললেন : শাপ পুরো বন্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে তোমার শেষ সন্তানটি রাক্ষস হলেও ধর্মনিষ্ঠ হবে। রাম-রাবণের যুদ্ধের গল্প অনেকের জানা। রাবণ সীতাকে উঠিয়ে নিলে রাম সীতাকে উদ্ধারের জন্য ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। তখন রাবণের এই ধর্মনিষ্ঠ ছোট ভাই রামের পক্ষে যোগ দেন। রাক্ষস-রাজ্যের নানা গোপন কথা ফাঁস করে রামকে তিনি জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সহায়তা করেন। বিভীষণের এই কাজ ধর্মের পক্ষে হলেও, তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে শত্র“র মতো আচরণ করেছিলেন। তাই, ঘরের বা পরিবারের কেউ শত্র“র মতো আচরণ করলে, তাকে ‘ঘরের শত্র“ বিভীষণ’ বলা হয়। বিভীষণের সঙ্গে আধুনিক যুগের মীরজাফরের তুলনা করা যায়।

ঘুণাক্ষর
‘ঘুণাক্ষরে’ শব্দটির অর্থ সামান্যতম ইঙ্গিত বা আভাসমাত্র। ঘুণাক্ষর শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘ঘুণপোকা দ্বারা তৈরি অক্ষর’। ঘুণপোকা কাঠ কাটে, অবিচল কেটে চলে। দৈবাৎ কোনো কোনো কাটা অংশ কাকতালীয়ভাবে অক্ষরাকৃতি ধারণ করে। ঘুণপোকা দ্বারা সৃষ্ট অক্ষরাকৃতির এ কাটাকুটিই হচ্ছে ঘুণাক্ষর। মানুষের ভাষার অক্ষর তৈরির ইচ্ছে, জ্ঞান বা সচেতনতা কোনোটাই ঘুণপোকার নেই। তবু নিজের অজান্তে কাটা-কাঠের কোনো কোনো অংশ অক্ষরের মতো লাগে। বস্তুত ঘুণপোকার অক্ষর সৃষ্টির এ অসচেতন প্রয়াস থেকে ‘ঘুণাক্ষর’ শব্দটির উৎপত্তি। যা হবে বলে কখনো চিন্তা করা হয়নি, তা যদি হয়ে যায় বা দৈবাৎ ঘটে যায়, তখনই ‘ঘুণাক্ষরে’ জানা-অজানা বিষয়টি উঠে আসে।

ঘৃণা
‘ঘৃণা’ শব্দের অর্থ বিতৃষ্ণা, অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা, অবহেলা, বিরাগ প্রভৃতি। এটি ভালবাসার বিপরীত শব্দ। প্রীতি, দয়া, করুণা, সহানুভূতি, প্রেম, মর্যাদা প্রভৃতি সুকুমারভিত্তিক হার্দিক গুণ। এ সব গুণাবলির উল্টো প্রত্যয়কে ‘ঘৃণা’ বলা হয়। যার প্রতি এমন ঘৃণা বর্ষিত হয় সে হচ্ছে ঘৃণ্য। মানুষ নানা কারণে পরস্পরকে ঘৃণা করে। তবে ঘৃণা শব্দের আদি অর্থ বিবেচনা করলে এর বর্তমান অর্থ নিয়ে বিস্মিত না-হওয়ার কোনো হেতু থাকে না। সংস্কৃত হতে আগত ‘ঘৃণা’ শব্দের আদি অর্থ ছিল ‘করুণা, দয়া, কৃপা, প্রীতি’ প্রভৃতি। কালক্রমে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে মূল অর্থের পুরো বিপরীত অর্থ ধারণ করে। ‘অপরূপ’ শব্দটির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। এর আদি অর্থ ছিল অসুন্দর, কদর্য। কেন এমন হলো? স্বজনদের মধ্যে ঘৃণা আর ভালবাসা পরস্পর চক্রাকারে আবর্তিত। কোনো অপরিচিত লোককে মানুষ যেমন ভালবাসে না তেমনি ঘৃণাও করে না। ভালবাসা ও ঘৃণার যে কারণ বা শর্ত আবশ্যক তা কেবল পরিচিতদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এবং ঘনিষ্ঠতা যত গভীর ভালবাসা ও ঘৃণাও তত গভীর হয়। মূলত যার প্রতি যত ভালবাসা, প্রীতি, শ্রদ্ধা, আদর, নানা কারণে তার প্রতি সৃষ্টি হতে পারে বিতৃষ্ণা, অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা, অবহেলা ও বিরাগ। একটি অপরটির বিপরীত। যেকোনো মুহূর্তে কারও প্রতি কারও ভালবাসা ঘৃণায় পরিণত হতে পারে। সংস্কৃত ‘ঘৃণা’ শব্দের অর্থের বেলাতেও তা ঘটেছে।

ঘোল খাওয়া
‘ঘোল খাওয়া’ বাগ্্ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ বিপর্যস্ত হওয়া, নাকাল হওয়া, বেকায়দায় পড়া প্রভৃতি। ‘ঘোল’ দুগ্ধজাত একটি সুপেয় খাদ্য। ননী-মিশ্রিত মথিত দধিকে ‘ঘোল’ বলা হয়। বাঙালি সমাজে ঘোলের কদর এখনও আগের মতো প্রবল। ননী-মিশ্রিত বলে এ ঘোল সবাই খেতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের এ বাগ্্ভঙ্গিতে বর্ণিত ঘোল কিন্তু দুগ্ধজাত ও ননী-মিশ্রিত সে সুপেয় ঘোল নয়। এ ঘোল মারাত্মক ও বিপর্যয়কর। একসময় গ্রামবাংলায় একটা উদ্ভট শাস্তির ধরন ছিল। শাস্তিটি হলো ক্ষুর দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ন্যাড়া-মাথায় ঘোল ঢেলে গাধার পিঠে চড়িয়ে গ্রামময় ঘুরিয়ে আনা। শাস্তিকে আরও কঠোর ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য অপরাধীর মুখের একপাশে চুন ও অন্যপাশে কালি মাখিয়ে দেওয়া হতো। গাধার পেছনে ঢোলকদল কী কারণে তাকে এ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে নানা ঢঙে তার বর্ণনা দিতেন। অনেক সময় অপরাধীর পিঠে বা গাধার গলাতেও অপরাধীর নাম ও অপরাধের বিবরণ সংক্ষেপে লিখে দেওয়া হতো। প্রাচীনকালের এ উদ্ভট অথচ অপমানজনক শাস্তিপ্রক্রিয়ার ঘোল-ঢালা হতে ‘ঘোল খাওয়া’ বাগ্ধারাটির উৎপত্তি। শাস্তিস্বরূপ যার ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢালা হয় আসলে তার বিপর্যস্ত না-হয়ে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয়। যার মাথায় এমন ঘোল ঢালা হয় সে-ই নাকাল হয় ও বেকায়দায় পড়ে যায়। তাই ঘোল-খাওয়া শব্দের অর্থ দাঁড়ায় বিপর্যস্ত হওয়া, নাকাল হওয়া, বেকায়দায় পড়া প্রভৃতি।

error: Content is protected !!