বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

চালচুলোহীন
‘চালচুলোহীন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বৃত্তিহীন, কর্মহীন বেকার। চাল ও চুলো এ দুই শব্দের মিলন ‘চালচুলো’। ‘চাল’ অর্থ ঘরের ‘চাল বা ছাদ’ এবং ‘চুলো’ হলো ‘রান্নাঘরের উনুন’। যার ‘চাল’ ও ‘চুলো’ দুটোই রয়েছে সে চালচুলোওয়ালা ব্যক্তি। চাল চুলোয় রান্না করে জীবন নির্বাহের সহজ ও অত্যাবশ্যক বিষয় তার আয়ত্তে। এমন ব্যক্তি সচ্ছল ও স্বনির্ভর। যার চাল ও চুলো কোনোটাই নেই সে চালচুলোহীন। তার শস্য ও শস্য খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করার সামর্থ্য নেই। অর্থাৎ যার অর্থ আশ্রয়হীন ও খাদ্যসংস্থানহীন ভবঘুরে।

চালশে
দৃষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত বয়সের কারণে ক্ষীণদৃষ্টি, দৃষ্টির ক্ষীণ অবস্থা, চোখের দৃষ্টি হ্রাস পাওয়ার লক্ষণ প্রভৃতি। সংখ্যাবাচক শব্দ চল্লিশ থেকে ‘চালশে’ শব্দের উৎপত্তি। বয়স যখন চল্লিশ বা চল্লিশের কাছাকাছি হয় তখন সাধারণত চোখের দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। কাছের জিনিস দেখতে বা বইপত্রের অক্ষর চিনতে সমস্যার সূচনা ঘটে। তখন মানুষ ভালোভাবে দেখার জন্য চশমা পরতে শুরু করে। চল্লিশের প্রভাবে চোখের এ সমস্যার সূচনাকে ‘চালশে’ বলা হয়।

চাষবাস
‘চাষবাস’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ কৃষিকর্ম। ‘চাষ’ ও ‘বাস’ শব্দ দুটোর সমন্বয়ে চাষবাস শব্দের উৎপত্তি। ‘চাষ’ শব্দের অর্থ হলো ভূমি কর্ষণ এবং ‘বাস’ শব্দের অর্থ হলো বসবাস করা। বসবাস অর্থ ঘড়বাড়ি নির্মাণ করে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে শান্তিতে দিনাতিপাত করা। অতএব চাষবাস শব্দের অর্থ হলো কৃষিকর্মে নিয়োজিত থাকা এবং বসবাস করা। যার অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে সুন্দরভাবে জীবনযাপন ও পরিবার-পরিজন লালন-পালনের জন্য কৃষিকর্ম। একসময় চাষ বা কৃষিকর্মই ছিল মানুষের মূল পেশা। এর মাধ্যমে মানুষের আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি ও মৌলিক চাহিদা পূরণ হতো। তাই কৃষির সঙ্গেই ছিল মূলত সুষ্ঠু ও সুন্দর বসবাসের নিবিড় সম্পর্ক। তখন কৃষি হতে বসবাসকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো উপায় ছিল না।

চিকামারা
এক কালের ‘দেওয়াল-লিখন’ কথাটি বর্তমানে চিকামারা নামে পরিচিত। ‘চিকামারা’ শব্দটির উৎপত্তি ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত। তবে ‘দেওয়াল-লিখন’ অনেক প্রাচীন একটি পদ্ধতি। আদিম যুগের মানুষদের হাতে এর উৎপত্তি। তারা পাহাড়ের গুহাগাত্রে নানা সংকেত এঁকে সংবাদ আদান-প্রদান করত। ব্রিটিশ আমলে কাগজের অভাবে দেওয়ালে বিভিন্ন স্লোগান লেখা হতো। এটা শুধু সরকার-বিরোধীরাই করত তা নয়। সরকারের পক্ষেও স্লোগান লেখা হতো। অক্ষর আবিষ্কারের পর পর মূলত দেওয়াল বা পাথরে লিখে সরকারি বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জনগণকে অবহিত করার জন্য জারি করা হতো। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেওয়াল-লিখন শুরু করে। কিন্তু অল্পসময় পরে পাকিস্তানি শাসকদের বাংলাদেশ-বিরোধী কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা গোপনে দেওয়ালে বিভিন্ন স্লোগান লিখে এর প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ‘দেওয়াল-লিখন’ কথাটা ‘চিকামারা’ শব্দে প্রতিস্থাপিত হয়। বাংলা ভাষা নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের অযৌক্তিক ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেওয়ালে বিভিন্ন স্লোগান ও দাবি-দাওয়া লেখার প্রবণতা বেড়ে যায়। সর্বদলীয় বাংলা ভাষা পরিষদ এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাষা-আন্দোলনসহ বিভিন্ন কারণে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জিগা গাছের ডাল ভেঙে এর আগা থেঁতলিয়ে ব্রাশের ন্যায় তুলি বানাত। নিচে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের ওপরেও যাতে স্লোগান লেখা যায় সে জন্য তুলিগুলো করা হতো লাঠির মতো লম্বা। সে সব ব্রাশ বা তুলিতে আলকাতরা লাগিয়ে দেওয়ালে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের পক্ষে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হতো। গ্রেফতারের ভয়ে সাধারণত রাতেরবেলা টর্চ জ্বালিয়ে দেওয়ালে এ সব স্লোগান লেখা হতো। তবে সুযোগ হলে দিনেরবেলাতেও সাহসী শিক্ষার্থীরা স্লোগান লিখে সটকে পড়ত। জিগা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ব্রাশে আলকাতরার মাধ্যমে লেখা দেওয়াল-লিখন সহজে মুছে ফেলা যেত না।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের কোনো একদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী জিগা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি লাঠি-আকৃতির লম্বা ব্রাশ দিয়ে দেওয়ালে স্লোগান লিখছিল। এ সময় একদল টহল পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখে শিক্ষার্থীরা ঝোপের আড়ালে আলকাতরার টিন লুকিয়ে লাঠির মতো লম্বা তুলি দিয়ে ঝোপঝাড়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে শুরু করে। টহল পুলিশ এগিয়ে এসে বলে : এত রাতে তোমরা বাইরে কী করছ? শিক্ষার্থীরা বলল : হলে চিকার জ্বালায় থাকতে পারছি না। এ ঝোপ দিয়ে হলে চিকা ঢোকে। এ জন্য আমরা লাঠি দিয়ে চিকা মারছি।
ইতোমধ্যে কয়েকটা চিকাও মেরে ফেলা হয়। শিক্ষার্থীদের কথায় পুলিশের সন্তুষ্ট না-হয়ে কোনো উপায় ছিল না। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ছিল একতলা এবং অধিকাংশ টিনশেডের ও স্যাঁতসেঁতে মেঝের। পাশে ছিল ঝোপঝাড়, সেখান থেকে চিকা হলে হানা দিত। শুধু হলে নয়, পুলিশের ব্যারাকেও চিকার উপদ্রব ছিল। পুলিশ দল সন্তুষ্টচিত্তে চলে যায়। শিক্ষার্থীরা এবার দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল চিকামারার ভানে ঝোপঝাড়ে আঘাত করতে থাকে আর একদল দেওয়াল লিখন শুরু করে। এরপর থেকে ‘দেওয়াল-লিখন’ লিখতে গেলে শিক্ষার্থীরা বলত চিকামারতে যাচ্ছি। এভাবে ‘দেওয়াল-লিখন’ বাগ্ভঙ্গিটি ‘চিকামারা’ শব্দে পরিণত হয়। এখন শুধু দেওয়ালে নয়, রাস্তাতেও চিকামারা হয়।

চিনি
‘চিনি’ বহুল প্রচলিত একটি দানাদার শর্করা, বিশেষভাবে আখ থেকে তৈরি দানাদার মিষ্টি রাসায়নিক পদার্থ। ‘চিনি’ বললে এর অর্থ কী তা বলে দিতে হয় না। ‘চিনি’ চেনে না এমন লোক কারও চেনার মধ্যে হয়তো নেই। ‘চিনি’ সবাই চিনলেও ‘চিনি’ শব্দের ব্যুৎপত্তি অনেকের অজানা। চিনি কিন্তু প্রাচীন বাংলায় ছিল না। বাংলাদেশ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে গুড়ের দেশ হিসাবে পরিচিত ছিল। তবে গুড় থেকে একপ্রকার শুষ্ক শর্করাজাতীয় মিষ্টি দ্রব্য তৈরি করা হতো। কিন্তু সেটাকে ‘চিনি’ বলা হতো না। যদি এটাকে চিনি বলা হতো তা হলে প্রাচীন কোনো না কোনো গ্রন্থে ‘চিনি’ শব্দটি পাওয়া যেত। কিন্তু তা নেই, তবে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ গ্রন্থে শর্করা শব্দের তদ্ভব হিসাবে ‘শাকর’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের একেবারে গোড়ার দিকে চীনে প্রথম ‘চিনি’ নামের অতি প্রিয় ও প্রয়োজনীয় বস্তুটি উৎপন্ন হয়। চীন হতে দ্রব্যটি উপমহাদেশে আসে। চীনে উৎপাদিত চিনি এ দেশেও অভিন্ন উৎপাদন কৌশল অবলম্বন করে তৈরি করা হতো। ‘চীন’ দেশ হতে আগত বলে এর নাম হয় চিনি।

চিরজীবী
যারা চিরদিন বেঁচে থাকেন তারা চিরজীবী। ভারতীয় পুরাণ মতে বিষ্ণু, কাক, মার্কণ্ডেয়, অশ্বত্থামা, বলি, ব্যাস, হনুমান, বিভীষণ, কৃপ, পরশুরাম প্রমুখ চিরজীবী।

চিরুনি-তল্লাশি
চিরুনি ও তল্লাশি এ দুটো শব্দ মিলে চিরুনি-তল্লাশি শব্দের উৎপত্তি। এটি ইংরেজি ঈড়সনরহম ড়ঢ়বৎধঃরড়হ শব্দের অনুবাদ। এর প্রচলিত অর্থ ভালোভাবে কোনোকিছু অনুসন্ধান করা। চিরুনি দিয়ে যেমন অগণিত চুলের রাজ্য থেকে উকুন, ময়লা বা খুশকি বের করে নিয়ে আসা হয় তেমনি এ তল্লাশির মাধ্যমে পুলিশ হাজার হাজার লোকের মধ্য থেকে প্রকৃত অপরাধীকে বের করে নিয়ে আসে।

চেনি
ইর্মদা ও গোদাবরীর মধ্যখানে জব্বলপুরের নিকট অবস্থিত একটি সুন্দর উপশহর।

চোল
কাবেরী নদীর উত্তর তীরবর্তী একটি প্রসিদ্ধ দেশ।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!