বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন
একাদশ অধ্যায়

ছত্রভঙ্গ
‘ছত্রভঙ্গ’ শব্দের অর্থ এলোমেলা, বিশৃঙ্খলা, সারি ভাঙা প্রভৃতি। ‘ছত্র’ ও ‘ভঙ্গ’ শব্দ দুটির সংযোগে ছত্রভঙ্গ শব্দের উৎপত্তি। তবে মনে রাখা আবশ্যক যে, বাংলা ভাষায় দুটি ছত্র আছে। একটি ছত্র শব্দের অর্থ হচ্ছে : ছাতা, যা রোদ-বৃষ্টি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথার উপর দেওয়া হয়। সংস্কৃত হতে আগত এ ‘ছত্র’ রোদ-বৃষ্টি ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও রীতি-রেওয়াজের কারণেও মাথার উপর ধরা হয়। এখানে যে ‘ছত্র’ নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে সেটি কিন্তু সংস্কৃত ছত্র নয়। এ ‘ছত্র’ আরবি হতে আগত। আরবি ভাষায় ‘সত্র’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে আলোচ্য ‘ছত্র’। আরবি ভাষায় ‘সত্্র’ শব্দের অর্থ লাইন, পঙ্ক্তি, সারি ইত্যাদি। ছত্রভঙ্গ মানে সারি, লাইন বা পঙ্ক্তি ভঙ্গ করা। সুচারুভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য কিংবা সৌন্দর্য বা নানা সুবিধার জন্য সারি, পঙ্ক্তি, লাইন প্রভৃতি করা হয়। কিন্তু কোনো কারণে যখন এ লাইন, সারি বা পঙ্্ক্তি ভেঙে যায় তখন নিশ্চয় মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এ জন্য পুলিশ মিছিলের ওপর লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অবশ্য মিছিলকারীর অসুবিধা হলেও পুলিশের সুবিধা। আসলে কারও অসুবিধাই তো অন্যের সুবিধা। ছত্র ভেঙে গেলে যে অসুবিধা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় শব্দটির মাধ্যমে তা-ই প্রকাশ করা হয়।

ছবি
প্রতিকৃতি, চিত্র, আলেখ্য, প্রতিমূর্তি, আলোকচিত্র প্রভৃতি বোঝাতে ‘ছবি’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। আরবি ‘শবিহ্’ শব্দ থেকে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ছবি শব্দের উৎপত্তি। ‘শবিহ্’ শব্দের অর্থ মুখের ছবি। যার অর্থ হলো চিত্র প্রতিকৃতি, তৈলচিত্র, আঁকা-ছবি, তোলা-ছবি প্রভৃতি। মুখের ছবি আর মুখচ্ছবি এক নয়। মুখের ছবি আর মুখচ্ছবি অভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে না। মুখচ্ছবি শব্দের অর্থ মুখের সৌন্দর্য, দীপ্তি, ঔজ্জ্বল্য প্রভৃতি। ‘মুখচ্ছবি’ অর্থ মুখের ছবি নয়। আর মুখের ছবি অর্থ হলো : মুখের প্রতিকৃতি, মুখের ছবি, মুখের তৈলচিত্র প্রভৃতি। তেমনি রবিচ্ছবি অর্থ প্রভা, কান্তি, আলোময়, শোভা, সৌন্দর্য ইত্যাদি।

ছাঁৎ
‘ছাঁৎ’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ: বুকের মধ্যে তীব্র শিহরণের অনুভূতি। হঠাৎ উদ্বেগজনক কিছু দর্শন বা শ্রবণে বুকের মধ্যে ছাঁৎ করে ওঠে। বাংলায় এটি যুগপৎ ধ্বন্যাত্মক ও ভাবাত্মক শব্দ। ছাঁৎ ধ্বনিটি রান্নাঘরে অহরহ শোনা যায়। শাক-সবজি, মাছ-মাংস বা অন্যকিছু কড়াইয়ের তপ্ত তৈলের স্পর্শে আসামাত্র ‘ছাঁৎ’ ধ্বনিটি উৎপন্ন হয়। মূলত রান্নাঘরে সৃষ্ট এ ‘ছাঁৎ’ ধ্বনি হতে বাংলায় প্রচলিত ‘ছাঁৎ’ শব্দের উৎপত্তি। ধ্বনি থেকে শব্দটির জন্ম। তাই এটি একটি ধ্বন্যাত্মক অব্যয়।

ছাত্র
‘ছাত্র’ শব্দের আভিধানিক অর্থ শিক্ষার্থী, বিদ্যার্থী বা শিষ্য। এটি সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃতে শব্দটির মূল অর্থ ছিল : ‘যে গুরুর দোষ ঢেকে রাখে, গুরুর কোনো বদনামকে প্রকাশ হতে দেয় না’ প্রভৃতি। কিন্তু বাংলায় ছাত্র শব্দের অর্থ শিক্ষার্থী, বিদ্যার্থী বা শিষ্য। শিক্ষক যাই করুন না কেন, শিষ্য বা শিক্ষার্থীর কাজ হলো তা মেনে নেওয়া, গুরুর সকল কাজকে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে গ্রহণ ও মান্য করে তাঁর প্রশংসা করাই ছাত্রের কাজ। প্রাচীনকালের গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এমনই ছিল। শিষ্য তার আচার-আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুর প্রশংসা করত। তাই গুরুর কোনো দোষ থাকলেও তা প্রকাশ হতো না, শিক্ষার্থীর প্রশংসার আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। এ কারণে সংস্কৃত ছাত্র তথা গুরুর দোষ ঢেকে রাখা ব্যক্তিটি বাংলায় ‘ছাত্র’ তথা শিক্ষার্থী, বিদ্যার্থী বা শিষ্যের রূপ পরিগ্রহ করে।
ছাত্রী
ছাত্র শব্দের আভিধানিক অর্থ পুরুষ শিক্ষার্থী, পুরুষ শিষ্য, পুরুষ বিদ্যার্থী। প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নে নিয়োজিত সকল পুরুষই ছাত্র। বাংলায় ‘ছাত্র’ শব্দের নারীবাচক রূপ হলো ছাত্রী। সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে এটি ভুল। সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে ছাত্র শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ হলো ‘ছাত্রা’। ‘ছাত্রী’ শব্দটিও সংস্কৃতে রয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় ‘ছাত্রী’ শব্দের অর্থ ‘ছাত্রের পত্নী বা স্ত্রী’। তবে বাংলায় ‘ছাত্রী’ বলতে এখন ‘ছাত্র’ শব্দের স্ত্রীবাচক রূপই বোঝায়।

ছিঁচকে চোর
‘ছিঁচকে চোর’ বাগ্ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ সামান্য চোর, যারা ছোটখাটো চুরি করে প্রভৃতি। ছিঁচকে অর্থ ‘ছোট’। সুতরাং ‘ছিঁচকে চোর’ অর্থ ছোট চোর। পান খাওয়ার জন্য বাঁশের তৈরি হামানদিস্তার মতো ছোট শাবল সদৃশ বস্তু দ্বারা দরজার খিল/ছিটকিনি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে চুরি করে যারা তাদের ‘ছিঁচকে চোর’ বলা হয়। এরা সিঁধেল চোরের তুলনায় নগণ্য জিনিস চুরি করে, অর্থাৎ সামান্য জিনিস চুরি করে এরা স্থান ত্যাগ করে চলে যায়।

ছিনিমিনি
উচ্চারণ ও বানানে চমৎকার ছিনিমিনি শব্দটির অর্থ ‘অনর্থক নষ্ট করা/ বেহিসাবিভাবে ব্যয় করা’। নিস্তব্ধ জলাশয় বা পুকুরে শিশুদের একপ্রকার জলখেলার নাম ছিনিমিনি। বস্তুত এ খেলার নাম থেকে ছিনিমিনি বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। এ খেলায় খোলামকুচি অর্থাৎ মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ভাঙা টুকরো বা চ্যাপ্টা ঢিল পানিতে এমনভাবে ছোঁড়া হয় যে, ওইটি ক্রমান্বয়ে একবার পানি ছুঁয়ে, একবার শূন্যে ভেসে অদ্ভুত গতিতে জীবন্ত প্রাণীর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে অনেকদূর ছুটে যায়। ইংরেজিতে খেলাটির নাম চষধু ধঃ ফঁপশং ধহফ ফৎধশবং. খেলাটি একসময় শিশুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। গ্রামে এখনও ‘ছিনিমিনি’ নামের এ খেলাটি শিশুরা পরম আনন্দে উপভোগ করে। শিশুরা সাইজমতো খোলামকুচি না-পেলে অনেক সময় বাড়ির ভালো হাঁড়ি-পাতিল ভেঙে টুকরো করে ছিনিমিনি খেলায় মেতে উঠত। খেলার ছলে মূল্যবান কিছু নষ্ট করার শিশুসুলভ প্রক্রিয়াটা শিশুদের হাত থেকে বড়দের মুখের ভাষায় চলে আসে। শুধু এটা নয়, ছোটবেলার খামখেয়ালিপূর্ণ কিন্তু আনন্দ-উৎসারিত সব খেলাকেই ‘ছিনিমিনি খেলা’ বলা হতো। একে অপরের গায়ে ধুলি ছোড়াছুড়ি করতে দেখে কী করা হচ্ছে প্রশ্নের জবাবে বলা হতো : ‘ছিনিমিনি’ খেলা হচ্ছে।

ছেঁদো
‘ছেঁদো’ শব্দের অর্থ সাজানো, কপট, তুচ্ছ, মূল্যহীন প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘ছন্দ’ থেকে বাংলা ‘ছেঁদো’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো অভিপ্রায়, ইচ্ছা, খেয়াল, চাতুর্য, মনোবাঞ্ছা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি। আবার কারও কারও অভিমত সংস্কৃত ‘ছন্দঃ’ শব্দ হতে বাংলা ‘ছেঁদো’ শব্দের উৎপত্তি। তবে সংস্কৃত ‘ছন্দ’ ও সংস্কৃত ‘ছন্দঃ’ শব্দের অর্থ অভিন্ন হওয়ায় উৎপত্তিগত বিষয় নিয়ে জটিলতা, দি¦মত কিংবা মতাবলম্বীদের জয়পরাজয়ের কোনো সুযোগ নেই। ‘ছন্দ’ ও ‘ছন্দঃ’ উভয় শব্দের অর্থ হচ্ছে অভিপ্রায়, খেয়াল, ইচ্ছা, চাতুর্য, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি। তবে এগুলো ছাড়াও ‘ছন্দঃ’ শব্দের আর একটি অর্থ আছে। সেটি হচ্ছে কবিতার ছন্দ।
বাংলায় ‘ছন্দ’ ও ‘ছন্দঃ’ তাদের উৎসাচরণ হারিয়ে দুটোই অভিন্ন হয়ে গেছে। ‘সংস্কৃত’ ছন্দ শব্দটিই বাংলায় এসে ‘ছেঁদো’ হয়ে গেছে। ‘ছন্দ’ শব্দের ‘দন্ত-ন’ চন্দ্রবিন্দুরূপে ‘ছ’-এর মাথায় গিয়ে বসেছে। তবে যদি বলা হয় সংস্কৃত ‘ছন্দঃ’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ছেঁদো’ শব্দ এসেছে, তা হলেও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কারণ এখানে দন্ত্য-ন ও চন্দ্রবিন্দুর বিনিময় খেলা দেখা যায়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!