বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

দ্বাদশ অধ্যায়
জ ঝ

জগন্নাথ
বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের অবতার। বাংলাদেশ, উড়িষ্যা ও ভারতবর্ষের নানা অংশে মহাসমারোহে জগন্নাথ পূজিত হন। উড়িষ্যার পুরী শহরের জগন্নাথ মন্দির বিখ্যাত। জ্যৈষ্ঠ মাসে স্নানযাত্রার সময় ও আষাঢ় মাসে রথযাত্রার সময় তিনি পূজিত হন। প্রথম উৎসবে জগন্নাথকে স্নান করানো হয় এবং দ্বিতীয় উৎসবে জগন্নাথ, তাঁর ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে রথের উপর স্থাপন করে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। জগন্নাথের জন্ম সম্পর্কে একটি কাহিনি আছে। এক ব্যাধের তীরবর্ষণে শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু হলে, তাঁর মৃতদেহ একটি বৃক্ষের তলায় পড়ে থাকে। কৃষ্ণের কয়েকজন ভক্ত মৃতদেহ হতে কৃষ্ণের কয়েকটি অস্থি সংগ্রহ করে একটি পাত্রে স্থাপন করেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন নামের এক রাজা বিষ্ণুকে পূজা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কিন্তু কী মূর্তিতে পূজা করবেন তা নিয়ে মহা চিন্তায় পড়ে যান। বিষ্ণু বললেন : “তুমি আমার সনাতন মূর্তি প্রস্তুত করে সে মূর্তিতে কৃষ্ণের অস্থি রক্ষা করো।” বিশ্বকর্মা মূর্তি প্রস্তুতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শর্ত দেন যে, মূর্তি প্রস্তুত সম্পন্ন না-হওয়া পর্যন্ত কেউ তাঁকে মূর্তির জন্য বিরক্ত করতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন অস্থিরচিত্তে মূর্তি দেখার জন্য বিশ্বকর্মার নিকট উপস্থিত হন। এতে বিশ্বকর্মা ক্রোধান্বিত হয়ে মূর্তির কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যান। ইন্দ্রদ্যুম্ন ব্রহ্মার কাছে গিয়ে এর বিহিত করার অনুরোধ করেন। ব্রহ্মা তখন অসম্পূর্ণ মূর্তিতে চক্ষু ও প্রাণ দান করেন এবং নিজে পুরোহিত হয়ে মূর্তি স্থাপনপূর্বক পূজা শুরু করেন।

জগাখিচুড়ি
খিচুড়ি শুনলে অনেকেরই জিভে জল আসে এবং আসাটাই স্বাভাবিক। জগাখিচুড়ি শব্দের প্রথম অংশ যেখান থেকেই আসুক না কেন ‘খিচুড়ি’ শব্দ থাকাটা অপরিহার্য। চাল ডাল তেল নুন পরিমাণমতো না হলে এই সুখাদ্য কিন্তু অখাদ্য হয়ে যেতে পারে। জগাখিচুড়ি শব্দের অর্থের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। কোনো কিছুর জটপাকানো উপস্থাপনাকে ‘জগাখিচুড়ি’ বলে। অন্যভাবে বলতে গেলে, অনেক কিছুর বেমানান, বিসদৃশ কিংবা এলোমেলো সমাবেশকে বলা হয় জগাখিচুড়ি। জগন্নাথ নামের লোককে জগা নামে ডাকতে প্রায়ই শোনা যায়। ভারতের পুরীর জগ্ননাথ মন্দিরে জাতপাতের বালাই নেই। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ গিয়ে অবলীলায় একসঙ্গে পেটপুরে খিচুড়ি খায়। সেই খিচুড়ি সুস্বাদু হোক বা না হোক খেয়ে যে সবাই মজা পায় তা খাদকদের আচরণ দেখেই অনুধাবন করা যায়। কুলীনরা এটাকে ভালো চোখে কখনও দেখেনি। তারাই ব্যঙ্গার্থে ‘জগাখিচুড়ি’ অভিব্যক্তিটি সৃষ্টি করতে পারে। জগাখিচুড়িকে তুচ্ছার্থে বা নিন্দার্থে ব্যবহার করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মূলত সাহিত্যিকরা এই ধারাটি চালু করেছেন। কোনো শব্দকে জাতে তুলতে অথবা টেনে নামাতে সাহিত্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক, বিবিধ তরিতরকারি দিয়ে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে এই খিচুড়ি রান্না করা হয় বলে এর নাম ‘জগাখিচুড়ি’। এই খিচুড়ি অত্যন্ত উপাদেয়। উপাদেয় এ খিচুড়ি নানা রকম বস্তু দিয়ে নিয়মনীতি ছাড়া ইচ্ছেমতো রান্না করা হয়। খিচুড়ি রান্নার এ এলোমেলো প্রক্রিয়া থেকে ব্যঙ্গার্থে ‘জগাখিচুড়ি’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি।

জঘন্
‘জঘন্য’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : ঘৃণিত, গর্হিত, নোংরা, কদর্য। তবে ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শব্দটির মূল অর্থ এমন কদর্য ছিল না। সংস্কৃত ‘জঘন’ থেকে ‘জঘন্য’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ স্ত্রীলোকের কটিদেশ, তলপেট, নিতম্ব এবং নিতম্বের সম্মুখভাগ। স্ত্রীলোকের দেহের এ অংশ সাধারণ্যে প্রদর্শন মারাত্মক অসভ্যতা ও চরম লজ্জাকর বিবেচিত ছিল। শুধু স্ত্রীলোক কেন, পুরুষের দেহের এ অংশটিও জনসমক্ষে প্রদর্শন অগ্রহণীয় ও সভ্য সমাজে অসভ্য হিসাবে বিবেচিত। ‘জঘন্য’ ও ‘জঘন’ দুটিই সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় জঘন্য শব্দের অর্থ নিতম্বস্থ, জঘনের মতো বা জঘনতুল্য। যা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়, তা প্রদর্শন গর্হিত ব্যাপার। তাই যারা এমন কাজ করে তারা জঘন্য। মূলত এ গর্হিত ভাবটি জঘনের মাধ্যমে ‘জঘন্য’ শব্দে জড়িয়ে পড়ে।

জটিল
‘জটিল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দুর্বোধ্য, সমস্যাসংকুল। ‘জটিল’ একটি তৎসম শব্দ। শব্দটির মূল অর্থ জটাধারী বা জটাবান। ‘জটা’ শব্দের উৎপত্তি ‘জট’ থেকে। না-আঁচড়ানোর ফলে ক্রমাগত জড়িয়ে চুল শক্ত হওয়ার অবস্থাকে ‘জটা’ বলা হয়। চুলে জটা লাগলে তা সোজা করা সত্যি কঠিন কাজ। তাই কোনো কঠিন, দুর্বোধ্য বা সমস্যাসংকুল বিষয়কে চুলের জট খোলার মতো কঠিন বিবেচনায় ‘জটিল’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

জড়ভরত
বিষ্ণুপুরাণে উল্লেখ আছে, প্রাচীনকালে ভরত নামের এক রাজা বানপ্রস্থ অবলম্বন করে ঈশ্বরচিন্তায় বনে কালাতিপাত করতেন। এভাবে তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। একদিন স্নান করার জন্য নদীতে গেলে এক অসহায় মৃগশিশুকে নদীর জলে ভেসে যেতে দেখেন। ভরত সেটি আশ্রমে নিয়ে এসে পরম যত্নে লালন করতে থাকেন। মৃগশাবকের প্রতি তিনি এতই আসক্ত হয়ে পড়েন যে, তার পূজা, অর্চনা এবং ধ্যানজ্ঞান সব মৃগশিশুকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। ফলে তাঁর সব ধর্মকর্ম লোপ পেয়ে যায়। মৃত্যুকালেও তিনি ঈশ্বর বাদ দিয়ে কেবল মৃগশাবকের কথা ভাবতে ভাবতে মারা যান। ফলে পরবর্তী জন্মে তিনি জাতিস্মর হয়ে হরিণরূপে জন্মগ্রহণ করে পূর্বাশ্রমে কালাতিপাত করতে থাকেন। যথাসময়ে আবার মারা যান এবং জাতিস্মর হয়ে পুনরায় এক ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে আবার যাতে তার অধোগতি না হয় সেজন্য তিনি সংসারে সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে দিন কাটাতে থাকেন। তিনি সর্বদা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের ন্যায় আচরণ করতেন। জড়িতস্বরে কথা বলতেন এবং সংসার ও যাবতীয় কর্মে বিমুখ ছিলেন বলে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘জড়ভরত’। জড়ব্যক্তির ন্যায় থাকলেও তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে যাবতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে ঋদ্ধ একজন ঋষি। সবাই তাঁকে জড়বুদ্ধি ভেবে অপমান করত এবং তাঁকে দিয়ে নামমাত্র মূল্যে নানাপ্রকার কাজ আদায় করে নিত।
ফলে আজও সরল-সোজা, সহজ বুদ্ধিসম্পন্ন, নিষ্কর্মা লোকজনকে ‘জড়ভরত’ বলা হয়ে থাকে। আর ওই কারণেই ‘জড়ভরত’ বাংলা বাগ্ধারায় প্রচলন। উল্লেখ্য, রাজা ভরতের শাস্ত্রজ্ঞান ছিল প্রচুর, ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে সে-জন্মেই তিনি মোক্ষলাভ করেছিলেন।

জনাব/জনাবা
‘জনাব’ একটি সম্মানজ্ঞাপক পদ। পুরুষের নামের পূর্বে শব্দটি সম্মান ও ভদ্রতা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়। অনেকে মহিলাদের নামের পূর্বে ‘জনাব’-এর স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুসারে ‘আ’ যুক্ত করে জনাবা লিখে থাকেন। কিন্তু ‘জনাবা’ লেখা আদৌ সমীচীন নয়। কারণ ‘জনাবা’ শব্দের অর্থ ঋতুমতী নারী। নারীর নামের পূর্বে বেগম লেখা যায়। বেগম অর্থ বেগের স্ত্রী। তবে এখন ‘বেগম’ বলতে সম্মানিত মহিলা বোঝায়। অভিধানেও এমন উল্লেখ আছে। বাংলা একাডেমির ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ বলা হয়েছে, ‘জনাব’ শব্দটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে ব্যক্তির নামের পূর্বে ব্যবহার করা যায়। তবে কারও নামের পূর্বে সৈয়দ, খান, খন্দকার বা অন্য কোনো পদবি থাকলে ‘জনাব’ লেখা সমীচীন নয়। আমরা বাংলাতে কোনো পুরুষকে ‘জনাব’ বলে সম্বোধন করব, তেমনি কোনো মহিলার নামের পূর্বেও সম্মানসূচক জনাব ব্যবহার করব। তবে কোনো অবস্থাতে ‘জনাবা’ নয়।

জমিজমা
শব্দটির আভিধানিক অর্থ সম্পত্তি, ভূসম্পত্তি, জমি প্রভৃতি। এটি বাংলায় এখন বহুল প্রচলিত শব্দ। জমিজমা বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঠ, বিস্তৃত ক্ষেত, দামি জমি, বাড়ি করার ভিটা প্রভৃতি। ফারসি ‘জমিন’ ও আরবি ‘জমা’ শব্দ হতে বাংলা জমিজমা শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ‘জমিন’ শব্দের অর্থ ভূমি বা ভূখণ্ড এবং আরবি ‘জমা’ শব্দের অর্থ হলো নগদ যা রয়েছে। সুতরাং জমিজমা শব্দের অর্থ হচ্ছে : ভূমি ও হাতে থাকা নগদ টাকা। কিন্তু বাংলা ভাষায় জমিজমা বলতে শুধু ভূখণ্ডকে বোঝায়। অবশ্য নদীতে মৎস্যচাষ করার অধিকারও ভূমির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু জমিজমা দিয়ে নগদ টাকা বোঝায় না। তবে যেহেতু জমিই সকল সম্পত্তি ও নগদ টাকার উৎস, সে অর্থে জমিজমা দিয়ে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ভূখণ্ড ও নগদ জমার প্রকাশ বিচক্ষণতার পরিচায়ক বৈ কি।

জল
‘জল’ মানে পানি। এটি আগুনের বিপরীত। আগুন বা প্রজ্বলিত কিছু নেভানোর বিষয়ে প্রথমে যে দ্রব্যটির কথা মনে পড়ে সেটি হচ্ছে জল। ‘জল’ ধাতুযোগে গঠিত শব্দে ‘ব-ফলা’ ব্যবহার করা হয় না। যেমন জলজ্যান্ত, জলযান, জলদস্যু, জলাতঙ্ক, জলোচ্ছ্বাস, জলযোগ, সজল, নির্জলা। জলের জ-য়ে ব-ফলা দিলে জল কিন্তু আগুন (জ্বলা) হয়ে যায়।

জলপানি আর জলপান
‘জল’ ও ‘পানি’ একই পদার্থ। আধা গ্লাস জল পান কিংবা আধা গ্লাস পানি পান একই অর্থ বোঝায়। কিন্তু ‘জল’ আর ‘পানি’ শব্দ-দুটো যদি পরস্পর সেঁটে বসে কিংবা গায়ে গায়ে লেগে যায় তা হলে ‘জল’ ও ‘পানি’ কোনোটাই আর ‘জল বা ‘পানি’ থাকে না জলপানি হয়ে যায়। এবার দেখা যাক, জলপানি অর্থ কী। অভিধানমতে, জলপানি শব্দের অর্থ ছাত্রবৃত্তি, স্কলারশিপ, জলযোগের পয়সা। বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রকে ‘জলপানি’ পাওয়া ছাত্র বলা হয়। যে ছাত্র ‘জলপানি’ পায় সে মেধাবী। যারা পানিকে ‘জল’ বলতে চান না তারা ‘জলপানি’ শব্দকে ‘পানিপানি’ বলতে পারেন যদিও এটি অর্থহীন শব্দ। পাকিস্তান আমলে ‘জলপানি’ শব্দটা ‘বৃত্তি’ শব্দের আড়ালে হারিয়ে যায়।
‘জলপানি’ লিখতে যদি ‘জলপাণি’ লিখে ফেলেন তা হলে কিন্তু হাতে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নিজ দায়িত্বে। জলপানির একটা অর্থ জলযোগের পয়সা। জলযোগ মানে হালকা খাবার গ্রহণ, সোজা কথায় নাস্তা করা। একে জলপানও বলা যায়। সহজ অর্থে, ‘যে কর্ম নিষ্পত্তিতে জল-প্রয়োগ করতে হয় তা-ই জলযোগ’। জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতার সেই লাইন “আমার বাড়ি যাইও বন্ধু বসতে দেব পিঁড়ে, জলপান যে করতে দেব শাইল ধানের চিঁড়ে” এখনও মনে পড়ে।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!